Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মমতায় ‘মুক্তি’, সঙ্ঘ বলছে এই ভোটে!

চন্দন দাস
তবে কি ‘আগে রাম পরে বাম’ ঝুঠা প্রচারে আর ভরসা রাখতে পারছে না সঙ্ঘ? কমিউনিস্টদের দূরবীন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না, কমিউনিস্টরা আর ফিরতে পারবে না– এই প্রচার তো দেশজুড়ে! বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। সেই প্রচারেরই অংশ হিসাবে ‘আগে রাম পরে বাম’– এই স্লোগান আরএসএস এবং তৃণমূল সুকৌশলে নিয়ে এসেছিল ২০১৮’র পঞ্চায়েতের পরে। কিন্তু ‘বাম আমলে এসব ছিল না। অনেক ভালো ছিলাম’– এই বাক্য ইদানিং শোনা যাচ্ছে গ্রাম, শহরে, বাসে, ট্রেনে। পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে সঙ্ঘ-তৃণমূলের এত মাথাব্যথার কারণ তাহলে সহজবোধ্য।
 Mamata 'liberation', Sangh says in this vote!

লোকসভা নির্বাচন সামনে। এখন আরএসএস কী বলছে?

আরএসএস বলছে, ‘ইহা প্রমাণিত সত্য যে, কমিউনিস্ট শাসন মানবতার পক্ষে সর্বাপেক্ষা বড়ো হুমকি। এই রাজ্যের মানুষের ভাগ্য ভালো যে বিলম্বে হইলেও তাহাদের শাসন হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছে।’

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)’র মুখপত্র স্বস্তিকা। তার সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি। মূলত কমিউনিস্টদের সম্পর্কিত এই সংখ্যা। সেই সংখ্যার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ‘মানবতার শত্রু’। আর সেই সম্পাদকীয়র শেষ দু’টি বাক্যই উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।

কী অর্থ বাক্য দু’টির? 

প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের প্রবলভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর আশঙ্কা করছে আরএসএস। নাহলে এখন কেউ ‘কমিউনিস্টদের বিপদ’ বোঝাতে নামে? 

দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে ‘কমিউনিস্ট শাসন মানবতার পক্ষে সর্বাপেক্ষা হুমকি।’ অর্থাৎ তৃণমূলের শাসনে রাজ্যে যে শাহজাহান-শিবু হাজরা-অনুব্রত মন্ডল-ভাদু সেখদের রাজত্ব গড়ে উঠেছে, তা সমাজ সভ্যতার পক্ষে ততটা বিপজ্জনক নয়, যতটা কমিউনিস্ট শাসন। 

তৃতীয়ত এবং মুখ্য বার্তা– ‘এই রাজ্যের মানুষের ভাগ্য ভালো যে বিলম্বে হইলেও তাহাদের শাসন হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছে।’ অর্থাৎ, মমতা ব্যানার্জির মুখ্যমন্ত্রীত্বে, তৃণমূল-শাসনে মানুষের ‘মুক্তিলাভ’ ঘটেছে! 

লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে আরএসএস-র এটিই বার্তা। মূল কথা– বিজেপি-কে না দিলে তৃণমূলকে ভোট দিন। কমিউনিস্টদের কিছুতেই নয়।

তবে কি ‘আগে রাম পরে বাম’ ঝুঠা প্রচারে আর ভরসা রাখতে পারছে না সঙ্ঘ? কমিউনিস্টদের দূরবীন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না, কমিউনিস্টরা আর ফিরতে পারবে না– এই প্রচার তো দেশজুড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। সেই প্রচারেরই অংশ হিসাবে ‘আগে রাম পরে বাম’– এই স্লোগান আরএসএস এবং তৃণমূল সুকৌশলে নিয়ে এসেছিল ২০১৮’র পঞ্চায়েতের পরে। কিন্তু ‘বাম আমলে এসব ছিল না। অনেক ভালো ছিলাম’– এই বাক্য ইদানিং শোনা যাচ্ছে গ্রাম, শহরে, বাসে, ট্রেনে। পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে সঙ্ঘ-তৃণমূলের এত মাথাব্যথার কারণ তাহলে সহজবোধ্য। 

আরও একটি কারণ আছে। গত কয়েক বছরে রাজ্যে বামপন্থীদের নেতৃত্বে অনেকগুলি আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে রাজ্য। আর সেই আন্দোলনগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল উপস্থিতি। কোচবিহার থেকে যাদবপুর– যুবদের ইনসাফ যাত্রা আলোড়ন তৈরি করেছে রাজ্যে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে। মমতা ব্যানার্জি এবং নরেন্দ্র মোদীর পরিচালিত রাজ্য এবং কেন্দ্রের সরকারের নীতিতে বিধ্বস্ত মানুষের নানা ক্ষোভ, দাবি, যন্ত্রণার চলমান বিবরণ হয়ে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মের সেই পদযাত্রা। পরবর্তীকালে তাঁদের ডাকে ব্রিগেড এক অবিস্মরণীয় সমাবেশের সাক্ষী থেকেছে। 

কমিউনিস্টদের পতাকা আজ কয়েক লক্ষ ছাত্র, যুব’র হাতে। মানুষের রুটি, জীবিকা, গণতন্ত্রের দাবি আজও সেই কমিউনিস্টদের কন্ঠেই। পশ্চিমবঙ্গের গত কয়েক বছরের বৃত্তান্ত জানাচ্ছে, কমিউনিস্ট এবং বামপন্থীদের পক্ষে মানুষের সমর্থন বাড়ছে। সমবায় হোক কিংবা পঞ্চায়েত– মানুষ যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন বামপন্থীদের জেতাচ্ছেন। অথচ ২০১১-র মে’তে মনে করা হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামপন্থা মুছে যাবে। আমেদাবাদ থেকে গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উচ্ছ্বসিত হয়ে পরামর্শ পাঠিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জিকে– ‘প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন।’

বেড়াল মারা যায়। কিন্তু স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের প্রহরীদের খতম করা যায় না। কারণ– দেশের আত্মা কমিউনিস্টদের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। আর তাঁদের খতম করতে আরএসএস- এর প্রয়োজন হয়, এজেন্ট কিংবা ভাড়াটেদের। তৃণমূল আরএসএস’র সেই এজেন্ট। আজ নয়, প্রথম থেকে। তৃণমূল তৈরির সময় থেকেই।

একটি ক্রনোলজি এই ক্ষেত্রে খেয়াল রাখার মত। ১৯৯০-’৯১-এ দেশে নয়া আর্থিক নীতির নামে আমেরিকার ইকোনমিক প্রেসক্রিপশন প্রয়োগ শুরু হয়। তার আগে সোভিয়েতের সাময়িক বিপর্যয় হয়েছে। উদারনীতি, বেসরকারিকরণের পক্ষে প্রবল প্রচার সত্ত্বেও ১৯৯৬-এ অকংগ্রেসী দলগুলির মিলিত সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয় দেশে। কমিউনিস্টরা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সেই সময়। বিপরীতে, ১৯৯৭’র ডিসেম্বরে মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ‘বিজেপি অচ্ছুৎ নয়।’ আর ১৯৯৮’র জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ তৈরির কথা ঘোষণা করেন। সেদিন ১৯৯৭’র ২২ ডিসেম্বরে সবার আগে, স্বাগত জানিয়েছিলেন সদ্য ‘ভারতরত্ন’ হয়ে ওঠা লালকৃষ্ণ আদবানী। আসলে ১৯৯৬’র পর আরএসএস আর দেরি করতে চায়নি। রাজ্যে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ‘লড়াই’ করার জন্য হিংসাত্মক, দুর্নীতিগ্রস্ত, দুষ্কৃতীদের স্বাভাবিক পছন্দের একটি দল তাদের প্রয়োজন ছিল। আর ১৯৯৮ থেকেই রাজ্যে বিজেপি’র লঞ্চিং প্যাড হিসাবে হাজির হয় মমতা ব্যানার্জির দল।

জ্যোতি বসু বলতেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড়ো অপরাধ তারা রাজ্যে বিজেপি-কে ডেকে এনেছে।’

বিজেপি আরএসএস’র রাজনৈতিক মুখোশ। মমতা ব্যানার্জি বিজেপি’র সঙ্গে বোঝাপড়া করেই চলেছেন। আসলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা সঙ্ঘের কাছে। দু’জনেরই প্রধান শত্রু কমিউনিস্টরা। তাই বিজেপি’র নেতারা যাই বলুন, সঙ্ঘ কখনও মমতা ব্যানার্জির পক্ষ ছাড়েনি। ছাড়ে না।

প্রমাণ? ২০১১। কী বলেছিল সঙ্ঘ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর? 

২০১১-র ২৩শে মে প্রকাশিত সেই স্বস্তিকায় কী লেখা হয়েছিল? সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল: ‘দুঃশাসনের অবসান’। সেখানে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা লিখেছিলেন, ‘অবশেষে দুঃশাসনের অবসান। গত ৩৪ বৎসর ধরিয়া বাংলার বুকের উপর ফ্যাসিবাদী দলতন্ত্রের যে জগদ্দল পাথর চাপিয়া বসিয়াছিল, রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সেই পাথরকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছে। আলিমুদ্দিনওয়ালাদের যে ধরাশায়ী করা সম্ভব ইহা লইয়া অনেকেরই সন্দেহ ছিল। ...যদিও কমিউনিস্টরা বিজেপিকেই শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পয়লা নম্বর শত্রু বলিয়াই মনে করে। ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।’

সঙ্ঘের বোঝাপড়ায় কোনও বদল ঘটেনি। মমতা ব্যানার্জিও সঙ্ঘের প্রতি তাঁর প্রীতি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বারবার। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেও তিনি সঙ্ঘের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। 

যেমন গত নভেম্বরে। দলের নেতা, কর্মীদের সভায় আরএসএস’র প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ‘অনুরোধ’ করেছিলেন আরএসএস-কে, ‘আপনারা ধর্ম করুন, আমার কোনও আপত্তি নেই। আমার আপনাদের বিরুদ্ধে কোনও কিছু বলার নেই। কিন্তু দেশের জন্য যে লোকটা সবচেয়ে ক্ষতিকারক, তাঁকে সাপোর্ট দেবেন না।’

‘লোকটা’ বলতে মমতা ব্যানার্জি নরেন্দ্র মোদীর কথা বুঝিয়েছেন। কিন্তু মানুষকে বোকা বানানোর কী কৌশল। যিনি স্বয়ংসেবক, যিনি সঙ্ঘের হয়ে দেশ চালাচ্ছেন, তাঁকে সমর্থন না দেওয়ার জন্য আবেদন করা হচ্ছে সঙ্ঘেরই কাছে! 

সঙ্ঘ ভালো, মোদী খারাপ– বোঝানোর চেষ্টা কেন? মোদীকে তৃণমূল ভয় পাচ্ছে, মোদীকেই শত্রু মনে করছে শুধু, একথা বোঝাতে পারলে আসলে স্বয়ংসেবক মোদীর ভাবমূর্তি তৈরি করা যাবে। তৃণমূলের অপশাসনে বিধ্বস্ত মানুষের মনে হওয়া সহজ হবে– ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।’ রাজ্যে ক্রমশঃ কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করা যাবে এই পথে। 

এই কৌশল সঙ্ঘের– কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের ঠেকাতে ‘তৃণমূল বনাম বিজেপি’, দুই মেরুর রাজনীতি বজায় রাখতেই হবে। কিন্তু আসলে কোনো অন্তর নেই।


প্রকাশের তারিখ: ২১-মার্চ-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

একদা বিবিসি-র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, বিজেপি তাদের ন্যাচারাল এলি(স্বাভাবিক বন্ধু)। যারা রাজনীতির সাথে যোগাযোগ রাখেন তাদের কাছে খুব পরিষ্কার ধারণা আছে, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মের বিভাজনের ভিত্তিতেই ক্ষমতা দখল করেন।এই রাজ্যে ধর্মান্ধতার অন্ধকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কারণ উনিই এই উত্থান শক্তির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেন না।সম্প্রতি ২২শে জানুয়ারি রাম মন্দির উদবোধনের দিন যে সম্প্রীতি যাত্রা শুরু করেন তার শুরুতেই তিনি সম্ভবত কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন।
- স্নেহাশীষ গাঙ্গুলি , ২১-মার্চ-২০২৪


Absolutly right .
- Krishna Kumar Banerjee, ২১-মার্চ-২০২৪


বাস্তব এবং সঠিক বিশ্লেষণ। আরএসএস মমতা ব্যানার্জিকে দুর্গা বলেছেন কারন বামপন্থী দের উপর প্রশাসন কে ব্যবহার করে আক্রমন নামিয়ে এনেছিল। এটা সত্যি আগে রাম পরে বাম এই প্রচার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মানুষকে ভাবতে শিখেয়েছিল তৃনমূলের বিকল্প বিজেপি। কিন্তু বাংলার মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছে বামপন্থীরাই বিকল্প।
- শুভাশীষ মুখার্জ্জী , ২২-মার্চ-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪