সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
স্তালিনগ্রাদের ঐতিহাসিক জয়
শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
বিধ্বস্ত ও নব্বই ভাগ অধিকৃত স্তালিনগ্রাদ নিয়ে নতুন করে রণনীতি গ্রহণ করে রণসজ্জা তৈরি করে লালফৌজ। এই সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন স্তালিন। প্রাথমিক জয়ের পর সোভিয়েত সেনার প্রত্যাঘাত হানার ক্ষমতা ও সোভিয়েত জনগণের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঐক্যের ক্ষমতাকে খাটো করে রেখেছিল হিটলার সহ নাৎসি সমরনায়কেরা। সোভিয়েত সেনার পশ্চাদপসরণে দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের মনে। ভারতের কৃষ্ণ মেনন থেকে চীনের কমিউনিস্ট নেতা চু তে'র বিবরণে জানতে পারা যায় উদ্বেগ- উৎকণ্ঠার কথা। ১৯৪৩ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে স্তালিনগ্রাদের চূড়ান্ত বিজয়ের খবরে উদ্বেল হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ব।

হিটলারের স্বপ্ন ছিল ব্রিটিশদের মত সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ের জীবনীকারদের মতে, তার কাছে দখল ও শোষণের আদর্শ ছক ছিল ব্রিটিশ রাজ। সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর দখলদারি কায়েমের অভিযানে তার কাছে অনুপ্রেরণা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। প্রায়ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠতে দেখা যেত হিটলারকে। এই প্রশংসার ছলেই ঘুরেফিরে আসত ভারতবর্ষের কথা। হিটলারের যুক্তি ছিল, ব্রিটেনের মত একটা খুদে দেশ যদি ৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতবর্ষে সাদা চামড়ার শাসন কায়েম করতে পারে, তবে হিটলারের পক্ষেও বড়সড় সেনাবাহিনী ছাড়াই সোভিয়েত ইউনিয়নে দখলদারি কায়েম করা সম্ভব। হিটলারের ধারণায় ভারতবর্ষই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মূল শক্তি যার জোরে তারা বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। 'ব্রিটিশদের কাছে ভারতবর্ষ যা, আমাদের কাছে পূর্বপ্রান্তের বিস্তৃত সোভিয়েত জনপদও তাই', এই ছিল হিটলারের কথা। আত্মগর্বস্ফীত হিটলারের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন এভাবেই নাৎসি মতাদর্শ ও তার নিষ্ঠুর হত্যালীলার রূপ নিয়েছিল।
৮০ বছর আগে, ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হিটলারের এই স্বপ্নই চুরমার হয়ে যায় ছ'মাস ধরে চলতে থাকা স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম একনায়ক হিটলারের বর্বর নাৎসি ফৌজ হাঁটু গেড়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর শ্রমজীবী জনতার লাল ফৌজের কাছে। এই জয় ছিল যুগান্তকারী কারণ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পরাক্রম তখন অতিকথায় পরিণত হয়েছে। নৌ, বায়ু ও স্থলসেনার সমন্বয়ে গঠিত তার বিশাল সামরিক বাহিনীর ঝটিকা অভিযানের মুখে পদানত হয়ে গেছে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল। হিটলার ও তার যুদ্ধবাজ ফৌজকে অপরাজেয় বলে মেনে নিয়েছে সব দেশের বুর্জোয়া শাসকেরা। তাদের ধারণা ছিল, নাৎসিদের আক্রমণের মুখে বালির বাঁধের মত ভেঙে পড়বে শিশু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক প্রতিরোধ। আত্মতুষ্ট নাৎসি সেনাপ্রধানেরও দাম্ভিক ঘোষণা ছিল, ‘এটা মোটেই অত্যুক্তি হবে না যদি বলি আমাদের সোভিয়েত অভিযানে সময় লাগবে বড়জোর দু'সপ্তাহ।’এমনকী তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও অক্টোবরের ৩ তারিখ নাৎসি দলের এক সভায় হিটলারের সদম্ভে ঘোষণা ছিল, ‘আমি আজ জানিয়ে দিচ্ছি, দ্বিধাহীনভাবেই জানিয়ে দিতে চাই, পূর্বদিকের শত্রুদের উপর এতটাই তীব্র আঘাত হানতে সমর্থ হয়েছি আমরা যে তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসার সময়ে জার্মান সাম্রাজ্যের যে আয়তন ছিল তার দ্বিগুণ ভূমি ইতিমধ্যেই আমাদের করতলগত হয়ে গেছে।’ এর মাসখানেক আগে এক সেনাকর্তার উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য ছিল, ‘আমাদের শুধুমাত্র দরজায় একটা লাথি মারতে হবে। তারপরই এই পচে যাওয়া কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বসে যাবে।’
হিটলার ও তার দাম্ভিক সেনার সমস্ত দিবাস্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায় ১৯৪৩ এর ২ ফেব্রুয়ারি। ছ'মাসের নিষ্ঠুরতম হামলাবাজি ও হত্যালীলার মধ্য দিয়ে স্তালিনগ্রাদের নব্বই শতাংশ দখল করে নেওয়ার পরও লাল ফৌজের বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও সোভিয়েত সেনানায়কদের বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধ পরিকল্পনার মুখে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে, হাঁটু মুড়ে আত্মসমর্পণ করতে হয় হিটলারের বাহিনীকে। এমন পরাজয়ের মুখোমুখি এর আগে কখনো হয়নি নাৎসিরা। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের পরিণামই মোড় ঘুরিয়ে দেয় গোটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের। এই বিজয় থেকে উদ্দীপ্ত হয়ে লালফৌজ পশ্চিম অভিমুখী অভিযানকে তীব্রতর করে। লালফৌজের এই উদ্দীপ্ত অভিযানের ধারাবাহিকতাতেই ১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের পরিণাম ভিন্নতর হলে বিংশ শতকের পৃথিবী হয়ে উঠতে বিভীষিকাময়। অসউইচের মারণশালা গড়া হত বিশ্বময়। মানবজাতির এক বড় অংশ হয়ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো ভূলোক থেকে। আরো কী কী হতে পারত তার হিসেব এই মুহূর্তে দেওয়া হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু এটা সহজেই অনুমেয় যে স্তালিনগ্রাদের বিজয়ের তাৎপর্য সীমাবদ্ধ শুধু সোভিয়েত ভূমির সার্বভৌমত্ব ও সমাজতান্ত্রিক পথকে অক্ষত রাখায় নয়। সে সময়ের ও পরবর্তীকালের বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষিতে স্তালিনগ্রাদের বিজয়ের তাৎপর্য গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এই বিজয়ের জন্যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে সোভিয়েত জনগনকে। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ অবধি ব্যাপ্ত ফ্যাসিবিরোধী জনযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে ২.২ কোটি মানুষ। গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন ৪ কোটি মানুষ। ‘অপারেশন বারবারোসা’ নামে কুখ্যাত এই নাৎসি অভিযান ছিল মানবজাতির ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম যুদ্ধ। ১৯২০-র দশকেই ‘ওয়েইমার রিপাবলিক’ এর গর্ভে জন্ম হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তথাকথিত 'ইহুদি বলশেভিকবাদ' খতমের মতাদর্শগত ঝাঁঝ। হিটলারের আত্মজীবনী 'মেইন কাম্ফ'-এ এর বিবরণ রয়েছে। এটা শুধু হিটলারের ব্যক্তিগত যুদ্ধাভিযান ছিল না, ১৯১৮ সালে জার্মানির ব্যর্থ নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা প্রতিবিপ্লবী অভিযানের পরিসমাপ্তি হিসেবেই পরিকল্পিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিহ্ন করার ছক। গোটা ইউরোপের বুর্জোয়া শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার অনুপ্রেরণায় সংহত হতে থাকা বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেই দেখতে পেয়েছিল ‘পুঁজির মূর্ত শত্রু’কে। ভীতগ্রস্ত সমগ্র ইউরোপিয় বুর্জোয়াদের প্রত্যাঘাতের পরাকাষ্ঠা ছিল নাৎসিদের প্রতিবিপ্লবী অভিযান। নাৎসিদের যুদ্ধ পরিচালনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদ লুন্ঠন ও জ্বালানির উৎস দখলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিল সেখানকার জনগনকে নিশ্চিহ্ন করার অভিপ্রায়ও। এক নাৎসি সেনানায়কের ভাষায়, ‘লাল রাশিয়ায় আমাদের যুদ্ধ ব্রিটিশ নাইটদের আদলে হবে না। কারণ এই যুদ্ধটা হচ্ছে মতাদর্শগত এবং বর্ণগত অভিযান। ক্ষমাহীনভাবে দৃষ্টান্তহীন নিষ্ঠুরতায় অবিশ্রান্ত আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে।’ হিটলারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল স্তালিনগ্রাদের সমস্ত পুরুষদের হত্যা করতে হবে এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করে নিয়ে আসতে হবে। হিটলারের অভিমত ছিল, স্তালিনগ্রাদ একটি ভয়ঙ্কর স্থান কারণ এখানকার লক্ষ লক্ষ অধিবাসী কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন।
স্তালিনগ্রাদের বিজয় শুধু ফ্যাসিবাদের বিশ্বব্যাপী পরাজয়ের সূচনাই করেনি, সারা পৃথিবী জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনে পদানত সমস্ত জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে নতুন নতুন রাষ্ট্র যা শোষণহীন সমাজ গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তোলে সেখানে। প্রকৃতপক্ষে সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষই তাকিয়েছিল তখন সোভিয়েতের রণাঙ্গনের দিকে। নাৎসি বাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রথম পর্বে সোভিয়েত সেনা ও জনগণের এক বিরাট অংশের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। প্রবল আক্রমণের মুখে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে স্তালিনগ্রাদ। এক সপ্তাহের মধ্যে শহরের প্রায় ৬০,০০০ নারী, পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। স্তালিনগ্রাদের উপর আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করাটা নাৎসিদের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অঙ্গ। মারাত্মক ক্ষতিসাধন সত্ত্বেও ১৯৪২ এর বসন্ত কাল থেকে গ্রীষ্মের মধ্যে নাৎসিরা এলাকাগতভাবে দখলদারির সীমা বিস্তৃত করতে সফল হয়েছিল। তবে তাদের দুর্ভিক্ষের কবলে পরা অবরুদ্ধ লেনিনগ্রাদ শহরকে দখল করার পরিকল্পনা আগস্ট মাসে ব্যর্থ হয়ে যায় সোভিয়েত সেনার প্রতি আক্রমণের মুখে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৪২ সালে ৪৫তম নির্দেশিকায় হিটলার একযোগে তেলসমৃদ্ধ ককেশাস এবং যোগাযোগ ও শিল্পের দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র স্তালিনগ্রাদে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ছিল তেলক্ষেত্রের দখল ও ভলগার নদীপথকে অবরুদ্ধ করে সোভিয়েত সেনার যোগাযোগকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া। বলতে দ্বিধা নেই, নাৎসি সেনার আক্রমণ হানার ক্ষমতাকে প্রথম অবস্থায় বুঝে উঠতে পারে নি লালফৌজ। বিধ্বস্ত ও নব্বই ভাগ অধিকৃত স্তালিনগ্রাদ নিয়ে নতুন করে রণনীতি গ্রহণ করে রণসজ্জা তৈরি করে লালফৌজ। এই সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন স্তালিন। প্রাথমিক জয়ের পর সোভিয়েত সেনার প্রত্যাঘাত হানার ক্ষমতা ও সোভিয়েত জনগণের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ঐক্যের ক্ষমতাকে খাটো করে রেখেছিল হিটলার সহ নাৎসি সমরনায়কেরা। সোভিয়েত সেনার পশ্চাদপসরণে দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের মনে। ভারতের কৃষ্ণ মেনন থেকে চীনের কমিউনিস্ট নেতা চু তে'র বিবরণে জানতে পারা যায় উদ্বেগ- উৎকণ্ঠার কথা। ১৯৪৩ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে স্তালিনগ্রাদের চূড়ান্ত বিজয়ের খবরে উদ্বেল হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ব। নাৎসিদের পরাক্রম বিষয়ে মস্ত অতিকথা নস্যাৎ হয়ে যায়। সোভিয়েত শ্রমিকশ্রেণির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিয়ে গঠিত লাল ফৌজের বীরগাথা দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে বিদ্রোহে গর্জে উঠতে। কৃষ্ণ মেননের মত বুর্জোয়া রাজনীতিবিদও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন যে, স্তালিনগ্রাদের বিজয় বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির অপ্রতিহত অগ্রগতিকে সুনিশ্চিত করবে। স্তালিনগ্রাদের বিজয়কে কৃষ্ণ মেনন যদি ঐতিহাসিক গুরুত্বের জায়গা থেকে বিবেচনা করে থাকেন, তাহলে গেরিলা যুদ্ধে রত চীনের কমিউনিস্ট নেতারা এই যুদ্ধকে সরাসরি নিজেদের যুদ্ধের মধ্যে প্রতিফলিত হতে দেখেছেন। তাঁরা বলেছেন, স্তালিনগ্রাদের পশ্চাদপসরণকে মনে হয়েছে আমাদের পশ্চাদপসরণ। ঠিক তেমনি স্তালিনগ্রাদের বিজয়কে আমাদের বিজয় হিসেবে গণ্য করে দ্বিগুণ বিক্রমে আমাদের লড়াইয়ে স্তালিনগ্রাদের শিক্ষার বাস্তবায়নের প্রয়াস নিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সময়পর্বে চীনের গণমুক্তি ফৌজের লাগাতার বিজয় অভিযান স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধের তত্ত্ব ও প্রয়োগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমনকি ভিয়েতনামের ভিয়েতমিন গেরিলাদের যুদ্ধকৌশলেও স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধের কৌশলের প্রতিফলনও দেখতে পেয়েছেন অনেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসন ছুড়ে ফেলার যে জোয়ার আসে তার পেছনে ছিল স্তালিনগ্রাদের জয়ের অনুপ্রেরণা। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্যের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল স্তালিনগ্রাদের বিজয়। অন্যদিকে হিটলার পরাস্ত হলেও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধের পরিণাম থেকে নিজেদের মত শিক্ষা নিয়েছে যার সূত্র ধরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীতে আত্মপ্রকাশ করা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রকে নতুন কৌশলে সাজাতে শুরু করে তারা। চার্চিলের নির্দেশে ড্রেসডেনে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের হত্যা ও পর্যুদস্ত জাপানে মার্কিন বাহিনীর পরমাণু বোমা নিক্ষেপ- এসব কিছুরই মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মাধ্যমেই তারা বোঝাতে চেয়েছিল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের মুখ্য কর্মসূচি হবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা।
এটা আজ স্পষ্ট যে সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পতনের পেছনে অভ্যন্তরীণ কারণ ছাড়াও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ষড়যন্ত্রমূলক নীল নকশা। একইসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পশ্চাদপসরণের সঙ্গে সঙ্গেই আত্মপ্রকাশ করেছে সভ্যতা বিরোধী ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ বিরোধী নয়া উদারবাদ। নয়া উদারবাদের ছত্রছায়ায় এখন ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে নয়া নাৎসি ও নব্য ফ্যাসিবাদীরা। বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় আরোহণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসীবিরোধী বিজয়ের সুফলকে নস্যাৎ করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ৮০ বছর আগেকার স্তালিনগ্রাদের বিজয়ের রাজনৈতিক শিক্ষা থেকেই শুরু করতে হবে নব্য ফ্যাসিবাদ ও তাদের জন্মদাতা নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই।
প্রকাশের তারিখ: ০২-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
