Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে আম্বেদকরের মতাদর্শ কি সঙ্গতিপূর্ণ?

রাম পুনিয়ানি
আম্বেদকরের সঙ্গে হিন্দুত্ব মতাদর্শের মূল বিরোধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৩৫ সালের ১৩ অক্টোবর, নাসিকের কাছে ইয়েওলার একটি সভায় তিনি বোমা ফাটিয়ে ঘোষণা করেন, “আমি হিন্দু পরিচয়ে মারা যাব না!” তার মতে, এই ধর্মে স্বাধীনতা, করুণা ও সমতার কোনও স্থান নেই। তার বই থটস অন পাকিস্তান-এর পরিমার্জিত সংস্করণে তিনি ইসলামী পাকিস্তানের গঠনকে বিরোধিতা করেন, কারণ এটি হিন্দু রাজ বা রাষ্ট্রের পথ প্রশস্ত করতে পারে, যা দেশের মানুষের জন্য ‘একটি বড়ো দুর্যোগ’ হয়ে উঠবে।
Does Babasahebs Ideology Match With Hindu Nationalist Politics

লোকসভায় অমিত শাহ বাবাসাহেবকে ‘অপমান’ করায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে, ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিকরা একটি আখ্যান তৈরি করার চেষ্টা করছেন যে বাবাসাহেব নাকি সাভারকার, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) এবং বিশেষত ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতির সঙ্গে একমত ছিলেন। (বলবীর পুঞ্জ টুইটার বা এক্সে লিখেছেন: "ড. আম্বেদকরের পুনরুত্থান")। তাঁরা আম্বেদকরের বিশাল রচনাসমগ্র থেকে এখানে-ওখানে থেকে খানিকটা বেছে নিয়ে একটি ছবি তৈরির চেষ্টা করছেন, যাতে দেখানো যায় যে বাবাসাহেব হিন্দুত্বের মতাদর্শের প্রশংসা করেছিলেন। 

তাঁরা আম্বেদকরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ছিলেন “অস্পৃশ্যদের সবচেয়ে মহান এবং আন্তরিক সমর্থক”। তাঁরা এই সত্যটা উপেক্ষা করছেন যে একই স্বামী শ্রদ্ধানন্দ শুদ্ধি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা মুসলমানদের হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ ছিল। এই কারণেই মুসলিম ধর্মগুরুরা বিরক্ত হন। শুদ্ধি সম্পর্কে আম্বেদকর বলেছিলেন, “যদি হিন্দু সমাজ টিকে থাকতে চায়, তবে তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির কথা ভাবা বন্ধ করে ঐক্য বৃদ্ধি করার কথা ভাবতে হবে, আর এর অর্থ হল জাতিভেদের বিলোপ। জাতিভেদের বিলোপই হল হিন্দুদের প্রকৃত সংগঠন, এবং যখন জাতি বিলুপ্তির মাধ্যমে সংগঠন সম্ভব হবে, তখন শুদ্ধি প্রয়োজনীয় হবে না।”

এই শুদ্ধির ধারণাটি তবলিগি জামাতের সমান্তরাল ও সম্পূর্ণ বিপরীত, এঁরা চেষ্টা করছিলেন হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত করার। যদিও পরে শ্রদ্ধানন্দ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি হিন্দু মহাসভার পুনরুজ্জীবিত অংশ হিন্দু সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, যাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।

এখন এমন ধারণা প্রচার করা হচ্ছে যে আম্বেদকর ও সাভারকার নাকি একই মুদ্রার দুই পিঠ। সত্য যে সাভারকার পতিতপাবন মন্দির চালু করেছিলেন, যেখানে দলিতদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বাবাসাহেবের মতে, এটায় এমন একটি পৃথক মন্দির তৈরি হল যেখানে শুধু দলিতরাই যাবে। “১৯২৯ সালের ১২ এপ্রিলের বহিষ্কৃত ভারত পত্রিকার একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে যে আম্বেদকর শুরু থেকেই পতিতপাবন মন্দির নির্মাণের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরে এই মন্দিরগুলিকে ‘অস্পৃশ্যদের মন্দির’ বলে অভিহিত করা হবে।” তবে, আম্বেদকর সাভারকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছিলেন, যদিও তিনি এগুলিকে তেমন প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেননি।

হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিকরা এই ধরনের কিছু বিষয় তুলেছেন। তারা আম্বেদকরের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ককে বর্ণনা করতে গিয়ে প্রায়শই অতিরঞ্জিত করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেন, গান্ধী ও প্যাটেলের মৃত্যুর পর নেহরু কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন এবং বিরোধীদের উপেক্ষা করতে থাকেন। বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, আম্বেদকর নেহরু মন্ত্রিসভা থেকে নাকি পদত্যাগ করেছিলেন অনুচ্ছেদ ৩৭০, পররাষ্ট্রনীতি, এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের (এসসি/এসটি) অবস্থার বিষয়ে নেহরুর সঙ্গে ‘মতপার্থক্যের’ কারণে।

মূল বিষয়টি হল, আম্বেদকরের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের প্রধান কারণ ছিল হিন্দু কোড বিলকে কেন্দ্র করে তার হতাশা। এই বিলকে উপেক্ষা ও খারিজ করার ঘটনায় তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন। হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করে আরএসএস এবং একাধিক সভা-সমাবেশ আয়োজন করে। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা সংসদ ভবনের সামনে প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন। এর শীর্ষবিন্দু ছিল ১৯৪৯ সালের ১১ ডিসেম্বর রামলীলা ময়দানে আয়োজিত বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ, যেখানে আম্বেদকর ও নেহরুর কুশপুতুল দাহ করা হয়।

হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করে আরএসএসের মুখপত্র দ্য অর্গানাইজার ১৯৪৯ সালের ৭ ডিসেম্বর সংখ্যায় লেখে: “আমরা হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করি। কারণ এটি একটি অপমানজনক প্রস্তাব, যা বিদেশি এবং অনৈতিক নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি হিন্দু কোড বিল নয়। এটি কিছুতেই হিন্দু নয়।”

হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে আরএসএসের এই আগ্রাসী প্রচারণার ফলে বিলটি বিলম্বিত ও দুর্বল হয়। এই ঘটনা বাবাসাহেবের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল এবং এটাই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।

মনুস্মৃতি এবং চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক আম্বেদকর ও সাভারকার, তথা বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য চিহ্নিত করে। ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাবাসাহেব মনুস্মৃতিকে পোড়ান, অথচ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক এম.এস. গোলওয়ালকর মনুস্মৃতির প্রশংসায় ভূয়সী লেখালেখি করেছিলেন।

সাভারকারও চতুর্বর্ণ ব্যবস্থার প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন এবং মনুস্মৃতির প্রশংসা করেছিলেন: “মনুস্মৃতি হল সেই শাস্ত্র যা আমাদের হিন্দু জাতির জন্য বেদসমূহের পরে সবচেয়ে পূজ্য এবং যা প্রাচীন কাল থেকে আমাদের হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, রীতি-নীতি, চিন্তা ও অনুশীলনের ভিত্তিভূমি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বইটি আমাদের জাতির আধ্যাত্মিক ও দেবত্বের অগ্রগতি নির্ধারণ করেছে। আজও কোটি কোটি হিন্দু তাদের জীবনে এবং কার্যপদ্ধতিতে যে নিয়মগুলি অনুসরণ করে, তা মনুস্মৃতির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। আজ মনুস্মৃতি হিন্দু আইন। এটিই প্রাথমিক।”

তিনি আরও বলেন, “ভারতের নতুন সংবিধানের সবচেয়ে খারাপ দিক হল এতে ভারতীয় কিছুই নেই… [এতে] প্রাচীন ভারতীয় সাংবিধানিক আইন, প্রতিষ্ঠান, নামকরণ বা শব্দচয়নের কোনও ছাপ নেই।”

আম্বেদকরের সঙ্গে হিন্দুত্ব মতাদর্শের মূল বিরোধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৩৫ সালের ১৩ অক্টোবর, নাসিকের কাছে ইয়েওলার একটি সভায় তিনি বোমা ফাটিয়ে ঘোষণা করেন, “আমি হিন্দু পরিচয়ে মারা যাব না!” তার মতে, এই ধর্মে স্বাধীনতা, করুণা ও সমতার কোনও স্থান নেই। তার বই থটস অন পাকিস্তান-এর পরিমার্জিত সংস্করণে তিনি ইসলামী পাকিস্তানের গঠনকে বিরোধিতা করেন, কারণ এটি হিন্দু রাজ বা রাষ্ট্রের পথ প্রশস্ত করতে পারে, যা দেশের মানুষের জন্য ‘একটি বড়ো দুর্যোগ’ হয়ে উঠবে।

এই ঘোষণার পর, তাকে শিখ ধর্ম বা ইসলাম গ্রহণের জন্য বিভিন্ন চাপের মুখে পড়তে হয়। হিন্দু মহাসভার ড. মুঞ্জে আম্বেদকরের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেছিলেন যে, যদি তিনি ইসলাম ধর্মে রূপান্তর এড়িয়ে চলেন, তাহলে হিন্দু মহাসভা তার এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে না। তবে বাবাসাহেবের গভীর অধ্যয়ন এবং চিন্তাভাবনা তাকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করে।

আজ বিজেপি দাবি করছে যে তারা বাবাসাহেবকে ‘সম্মান’ জানিয়েছে তার মূর্তি স্থাপন, তার স্মৃতিতে একটি আন্তর্জাতিক জাদুঘর নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রতীকী কাজের মাধ্যমে। এগুলি মূলত পরিচয়-সম্পর্কিত বিষয়, তবে বাবাসাহেবের আদর্শ ও মূল্যবোধকে বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে। মণ্ডল কমিশনের (সংরক্ষণ) সুপারিশ কার্যকর হওয়ার সময়, বিজেপি কামণ্ডল (হিন্দুত্ববাদী) রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছিল। প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি তার রথযাত্রার সময় (কামণ্ডল রাজনীতির অংশ হিসাবে) গ্রেপ্তার হলে, বিজেপি, যা তখন ভি পি সিংয়ের সরকারকে সমর্থনকারী দলগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল, তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং সরকার ভেঙে পড়ে।

লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে মিলে আম্বেদকরের বিরোধিতা করেছিল। তবু, পরে কংগ্রেসই নিশ্চিত করেছিল যে তিনি রাজ্যসভার সদস্য হবেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য এবং ভারতীয় সংবিধান রচনা কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সুতরাং, বিজেপির এই প্রচেষ্টা যে আম্বেদকর হিন্দুত্ব রাজনীতির অংশ ছিলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কৃত্রিম প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে তারা সেই ব্যক্তির স্মৃতি থেকে বৈধতা আদায় করতে চাইছে, যিনি ঘটনাচক্রে হিন্দু রাষ্ট্রের মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছিলেন।

আশ্চর্যজনক ঘটনা এই যে, যাঁরা হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বা দাঁড়িয়ে আছেন, তারা আজ আম্বেদকরকে তাদের আদর্শগত পরিবারভুক্ত হিসাবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন এবং হিন্দু রাষ্ট্রের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন!

ভাষান্তর- নবারুণ চক্রবর্তী

 


প্রকাশের তারিখ: ২৬-জানুয়ারি-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫১ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬