সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আর জি কর: কাজের জায়গা নিরাপদ করো
মালিনী ভট্টাচার্য
মানুষ বুঝছে, এ কোনও ব্যক্তির অস্বাভাবিক যৌনতাড়না থেকে সংঘটিত আচমকা অপরাধ নয়। তরুণী ডাক্তারের অপমৃত্যু এবং সমস্তরকম সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার বিপুল আয়োজন প্রমাণ করছে এর পিছনে রয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সার্বিক দূষণ। তাকে উন্মূল করা না গেলে মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে কোনও নিরাপত্তাই সম্ভব নয়। আন্দোলন তুলে নেওয়ারও তাই প্রশ্ন নেই।।

আর জি কর সরকারি হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজপথ যখন উত্তাল, সেই সময়ের মধ্যেই কিন্তু এরাজ্যে ও গোটা দেশেই প্রায় প্রতিদিন অনুরূপ ঘটনা ঘটে চলেছে। এইসব ঘটনার যারা শিকার তাদের অনেকে ঘরের বাইরে কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত। আবার এরাজ্যেই এমন নৃশংস ঘটনারও কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে যেখানে ঘরের মধ্যে শুয়ে-থাকা গৃহবধূকে দুর্বৃত্তেরা সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকে অত্যাচার করার পরে হত্যা করেছে। কাজেই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে যারা মেয়েদের ঘরে ঢুকে থাকার পরামর্শ দেয় তাদের কথা মানা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। গৃহে বা কাজের জায়গায় মেয়েদের নিরাপত্তা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।
আজ যে তরুণী চিকিৎসকের হত্যাকাণ্ড আমাদের আলোড়িত করছে এবং এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, ভেবে দেখলে বোঝা যায় তার চিকিৎসক হয়ে-ওঠার পথটিই কত কন্টকাকীর্ণ ছিল। খুবই সাধারণ ঘরে তার জন্ম। সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা আজ যে পথে যাচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় সে যে স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ করে চিকিৎসাবিদ্যার দুর্লভ রাস্তায় পা রাখতে পেরেছিল তার কারণ শুধু তার নিজের মেধা নয়, একমাত্র সন্তানের উচ্চশিক্ষালাভে দর্জির দোকান চালানো তার পরিবারের পূর্ণ সহায়তা এবং সংকল্প। অনুরূপ অবস্থায় তথাকথিত ‘নয়া শিক্ষানীতি’র যুগে তো ক্রমেই বেশি বেশি মেধাবী কন্যাসন্তানকে এমন উচ্চাকাঙ্খা জলাঞ্জলিও দিতে হচ্ছে এবং হবে পরিবারের অনিচ্ছা বা অপারগতার কারণে!
তারপর আর জি করে পাঠ সম্পূর্ণ করে তার গবেষক-চিকিৎসকের পদে আসা। আজ আমাদের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে যেসব ভয়ংকর তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে তাতে মনে হয়, এখানে মেয়েটির পুরো পঠনপাঠনের সময়েও যে কোনও পর্বেই তার মতো যে কোনও ছাত্রীর পক্ষেই যে কোনও রকমের আক্রমণের শিকার হওয়া সম্ভব ছিল। প্রশ্নটা এই নয় যে সে কাজের জায়গায় কী করে আক্রান্ত হল; মূল কথাটা এই যে, তার আরও আগে আক্রান্ত না হওয়াটা নেহাৎই কাকতালীয়। আজ কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিক এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এ রাজ্যে এবং এদেশের অন্যত্র অহরহ শুনতে হচ্ছে ‘রেপ-কালচার’ ও ‘হুমকি-কালচারে’র কথা। এই একটি হত্যাকাণ্ড মানুষকে এতটা আলোড়িত করছে কারণ আমরা বুঝতে পারছি এটা আসলে কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, মেয়েদের কাজের জায়গার সাধারণ বাস্তব অবস্থাই এই।
আজ আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, তথা পুলিশ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কোনো হযবরল’র দেশের আইন পাশ করিয়ে একুশ দিনের মধ্যে আসামীর জরিমানা ও ফাঁসির সাজা দিতে চাইছেন। যাঁরা এ আইন বানাতে তাঁকে সাহায্য করেছেন তাঁদের নিজের বৃত্তি সম্বন্ধে ন্যূনতম সম্মানবোধ থাকলে এটা তাঁরা করতে পারতেন না। কিন্তু আমরা জানি, অবস্থা যে এইখানে এসেছে তার কারণ এই নয় যে এ ধরনের অপরাধের জন্য এ দেশে আইনের অভাব আছে। ভাইপো-কথিত এনকাউন্টারের আইনি গুণ্ডামির তত্ত্বকে কোনো বিকল্প বলেও আমাদের আইনব্যবস্থা কখনও ভাবেনি। বস্তুত মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রতিকারে সব আইনই অনেক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গিয়ে তবেই মেয়েরা পেয়েছে।
২০১৩র যে ধর্ষণবিরোধী আইন বর্তমানে তথাকথিত ন্যায়সংহিতায় প্রায় অবিকৃতভাবেই স্থান পেয়েছে তার কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধন হতে পারে বৈকি। কিন্তু তা কখনওই বিচারের সময় কমিয়ে বা সাজার মাত্রা ফাঁসি পর্যন্ত বাড়িয়ে হতে পারে না। সাজা যথেষ্ট কড়া নয় বলে কি বিলকিস বানুর সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষকেরা ছাড়া পায়? হাথরসের আসামীরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়? না কামদুনির অপরাধীদের উচ্চতর আদালত মুক্তি দিয়ে দেয়? কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের ওপর সংঘটিত অপরাধ ফৌজদারি আইনের আওতায় আসার আগেই তার প্রতিকার করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিশাখা নির্দেশিকার ভিত্তিতে যে আইন ২০১৩তেই তৈরি হল, তাই বা দেশের কোন্ কর্মক্ষেত্রে এপর্যন্ত সঠিকভাবে কার্যকরী হয়েছে? জাতীয় কুস্তি ফেডারেশন থেকে শুরু করে সেরকম কমিটি কোথায় কটা আছে যেখানে গিয়ে মেয়েরা নিশ্চিন্ত হতে পারবে যে কর্মক্ষেত্রে রোজকার লাঞ্ছনা, অপমান এবং অসাম্যের সুবিচার পাওয়া যাবে?
আসলে আইন যাঁরা তৈরি করেছিলেন তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রের পরিচালনায় যারা থাকবে তারা রাজনৈতিক দলভুক্ত হলেও আইন কার্যকরী করার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়ের কথাটা ভুলবে না। আইন কার্যকরী করতে গিয়ে নিজেদের স্বার্থে চোরাগোপ্তা অন্তর্ঘাত চালানোর প্রবৃত্তিকে তারা অন্তত কিছুটা সংযত রাখবে। এটা তাঁদের ভাবনায় ছিল না যে একদিন সমাজবিরোধীরাই গদিয়ান রাজনৈতিক দলে প্রধান ভূমিকা নেবে। এরা সমাজবিরোধী এজন্য নয় যে সবারই পুলিশের খাতায় নাম আছে। তাদের সমাজবিরোধী বলছি, কারণ রাষ্ট্রপরিচালনা এরা বাহুবল এবং অর্থবলেরই সাহায্যেই করে থাকে, আইন বা সংবিধানের কোনও তোয়াক্কা করে না।
গত দশ-পনেরো বছরে এরাজ্যে এবং কেন্দ্রে আইন তাদের হাতে বিরোধীমাত্রকেই দমন করার অস্ত্রমাত্র; পুলিশ, সেনাবাহিনী, এমনকী আদালতকেও তারা উৎপীড়নের যন্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করতে সক্রিয়। তারা যথেচ্ছাচারী এবং তাদের প্রসাদভোগীরাও এমনই ভাবতে অভ্যস্ত যে বিনা বাধায় তারা যা খুশি তাই করতে পারে। তথাকথিত ‘রেপ কালচার’ ও ‘হুমকি কালচারেরও’ এরাজ্যে এবং অন্যত্র উদ্ভব এখান থেকেই। এদের হাতে ধ্বংস হয়েছে পঞ্চায়েতের গণতান্ত্রিক কার্যক্রম, জনমুখী যা কিছু প্রতিষ্ঠান, সরকারি খাদ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যের সরকারি পরিকাঠামো যার সবগুলোই জনসাধারণের অনেক দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছিল। এসবের মধ্যে যে সম্পদ সঞ্চিত ছিল তা আজ এদের গোগ্রাসী লালসার খাদ্য জোগাচ্ছে।
মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার মানে তো শুধু এই নয় যে এই হুকুমতের অধীন থেকে চোখকান বুজে তারা আজ্ঞাপালন করে যাবে। যেখানে কর্মক্ষেত্র এই লালসার কবলে আদ্যোপান্ত দূষিত হয়ে উঠছে সেখানে তা নিয়ে সোচ্চার হওয়াতেও অন্য সব কর্মীদের সঙ্গে নারীকর্মীর অধিকার রয়েছে। আর জি কর কেসে পুলিশসহ কর্তৃপক্ষের ভাবগতিক দেখে আমজনতার মনে আজ আর সন্দেহ থাকছে না যে, সেই দূষণের দুর্গন্ধ চাপা দিতেই এত আয়োজন। মানুষ বুঝছে, এ কোনও ব্যক্তির অস্বাভাবিক যৌনতাড়না থেকে সংঘটিত আচমকা অপরাধ নয়, তরুণী ডাক্তারের অপমৃত্যু এবং সমস্তরকম সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার বিপুল আয়োজন প্রমাণ করছে এর পিছনে রয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক দূষণ। তাকে উন্মূল করা না গেলে মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে কোনও নিরাপত্তাই সম্ভব নয়। আন্দোলন তুলে নেওয়ারও তাই প্রশ্ন নেই।
আরও পড়ুন: শুধুমাত্র নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয় – নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে দাঁড়াতে হবে
প্রতিবাদী স্পর্ধার ফাঁসে বাঁকা শিরদাঁড়ার ফোঁস
দহনে বড় বিষ, দহনে বড় জ্বালা
পশ্চিম বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থায় তৃণমূলের গুন্ডামি: আরজি কর হিমশৈলের চূড়ামাত্র
কুস্তির রিঙ ছাপিয়ে বীনেশ ফোগতের প্রসারিত রণক্ষেত্র
অভয়ারা কোনদিনও মরেনি, অভয়ারা মৃত্যুহীন!
প্রকাশের তারিখ: ১১-সেপ্টেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
