Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

সঙ্ঘাতের নতুন পটভূমি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বনাম একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা দেশ

সুচিক্কণ দাস
১৯৮৯ সালে এক বিরাট সামাজিক বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরেছিল হুগো শাভেজের ভেনেজুয়েলা। সেই পথ ধরে নয়া উদারবাদের বিরোধিতায় এগিয়ে এসেছিলেন বলিভিয়া, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, চিলি, মেক্সিকোর মতো দেশের মানুষ। আরও অনেক আগে থেকে দিশারী হিসাবে কিউবা তো ছিলই। এই প্রতিরোধের জেরে লাতিন আমেরিকার ওপর আলগা হয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মুঠি। সেই পর্বে লাতিন আমেরিকার নয়া উদারবাদ বিরোধী দেশগুলি গড়ে তুলেছিল একাধিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মঞ্চ। গড়ে উঠেছিল বিকল্প ব্যাঙ্ক এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রা সুক্রে। একবিংশ শতকের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা সেই ভেনেজুয়েলাকে একেবারে ধ্বংস করে সেখানে ট্রাম্প নিখাদ উপনিবেশবাদী দখল কায়েম করতে চাইছেন। তাঁর আসল লক্ষ্য, ভেনেজুয়েলার বিপুল অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভাণ্ডার, তা দখল করা।
The New Context of Conflict: US Imperialism vs. Countries Dreaming of 21st Century Socialism

‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’-এর উদ্গাতা, প্রয়াত হুগো শাভেজের দেশ ভেনেজুয়েলা বিপন্ন। যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুনিয়া জুড়ে অনেক যুদ্ধ থামানোর জন্য প্রতিদিন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তিনিই ভেনেজুয়েলায় একেবারে ইরাকের ধাঁচে প্রকাশ্যে হামলা ও আগ্রাসনের হুমকি দিয়েছেন। যে ভাষায় তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন, এই দেশটিকে ঘিরে যে বিপুল রণসজ্জা তিনি প্রস্তুত করেছেন, তাতে মনে হচ্ছে একবিংশ শতকের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা দেশটিকে একেবারে ধ্বংস করে সেখানে তিনি নিখাদ উপনিবেশবাদী দখল কায়েম করতে চাইছেন। তাঁর আসল লক্ষ্য, ভেনেজুয়েলার বিপুল অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভাণ্ডার, তা দখল করা। সঙ্কটগ্রস্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বাঁচাতে একদিকে ট্রাম্প যেমন চড়া হারে শুল্ক আরোপ করছেন, তেমনই হাতছাড়া হওয়া লাতিন আমেরিকার দেশগুলিকে ফের তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘পিছনের উঠান’ হিসাবে ফিরে পেতে চাইছেন এই দেশগুলির বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের আশায়। এক কথায় লাতিন আমেরিকার ইতিহাসকে তিরিশ বছর বা তারও বেশি সময় পিছিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন ট্রাম্প। 

সামরিক আগ্রাসনই সঙ্কটদীর্ণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার

১৯৮৯ সালে এক বিরাট সামাজিক বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরেছিল হুগো শাভেজের ভেনেজুয়েলা। সেই পথ ধরে নয়া উদারবাদের বিরোধিতায় এগিয়ে এসেছিলেন বলিভিয়া, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল, ইকুয়েডর, চিলি, মেক্সিকোর মতো দেশের মানুষ। আরও অনেক আগে থেকে কিউবা তো ছিলই। এই প্রতিরোধের জেরে লাতিন আমেরিকার ওপর আলগা হয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মুঠি। সেই পর্বে লাতিন আমেরিকার নয়া উদারবাদ বিরোধী দেশগুলি গড়ে তুলেছিল একাধিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মঞ্চ। গড়ে উঠেছিল বিকল্প ব্যাঙ্ক এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রা সুক্রে। সম্ভবত এই সব আইডিয়ার পথ ধরেই বর্তমান বিশ্বে বিকশিত হয়ে উঠেছে ব্রিকস, যার অন্যতম লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো।

শাভেজের নেতৃত্বে লাতিন আমেরিকার এই বিকল্প পথে যাত্রা নিয়ে রীতিমতো আশঙ্কিত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৮ সালেই তারা এই সব দেশের সরকারগুলিকে উচ্ছেদ করে পরিকল্পনা তৈরি করেছিল লাতিন আমেরিকায় ঔপনিবেশিক দখলদারি ফিরিয়ে আনার। মেক্সিকোর গবেষক অ্যানা এসথার সেসনা একসময় বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনা হল সমগ্র লাতিন আমেরিকাকে নতুন করে উপনিবেশে পরিণত করা এবং সব দেশকে সবক শেখানো। তবে ইতিমধ্যে আরও অনেক সমস্যায় নিজেদের জড়িয়ে ছিল মার্কিন সাম্রজ্যবাদ। ইরান, ইরাক, প্যালেস্তাইন সমস্যার সমাধান তারা করতে চেয়েছে ঔপনিবেশিক কায়দায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে বা আগ্রাসনে মদত দিয়ে। কিন্তু ইরাক ও লিবিয়াকে পদানত করলেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধীনতা স্বীকার করেনি ইরান। গাজায় ইজরায়েলের একতরফা হামলা সত্ত্বেও প্রতিরোধ জারি রয়েছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ আমেরিকার মাথাব্যথার নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের দশা এমনই দাঁড়িয়েছে যে দরকারে মহাকালের রথের ঘোড়ার নিচে প্রায় চাপা পড়া ইউরোপকে ত্যাগ করেও পুতিনের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী আমেরিকা। কারণ, আমেরিকা একথা বুঝেছে যে তাদের সঙ্কটের দিনে ইউক্রেনকে ঠেকা দেওয়ার জন্য অর্থ জোগানোর কোনও মানে হয় না। বরং যুদ্ধ মিটে গেলে রাশিয়ার বাজারের কিছুটা দখল পেলেও লাভ। তাছাড়া, রাশিয়া ও চীনের নেতৃত্বে বিশ্ব এখন বহুমেরু বিশিষ্ট। প্রযুক্তি ও অর্থনীতির যুদ্ধে চীনের কাছে পিছিয়ে পড়েছে মার্কিন সাম্রজ্যাবাদ। এসব ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য আর একচেটিয়া নয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি মার্কিন আধিপত্যের বাইরে এসে নিজস্ব উন্নতির পথ ধরতে চাইছে। সেকারণে বলা যায়, বহুমেরু বিশ্ব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্কটকে তীব্রতর করেছে। সেই সঙ্কট মেটাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার লুঠের হৃত সাম্রাজ্য পুনর্দখল করা। লাতিন আমেরিকায় সেই ছকের আশু নিশানা ভেনেজুয়েলা। 



সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রস্তুতি ও অস্ত্রসজ্জা

অপারেশন স্পিয়ার। এটাই ভেনেজুয়েলা দখলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক অভিযানের নাম। এবং হিসাবে দেখা যাচ্ছে ২২ বছর আগে ইরাক হামলার পর এটাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ প্রস্তুতি। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডকে সামিল করা হয়েছে এই অভিযানে। রয়েছে আরও ১২টির বেশি যুদ্ধজাহাজ। কয়েকটি জলযানে রয়েছে উভচর যান, যেগুলি জল থেকে সরাসরি সৈন্যদের নিয়ে স্থলভূমিতে ঢুকে পড়তে পারবে। এই অভিযানে সামিল হচ্ছে কমপক্ষে ১৫ হাজার মার্কিন সেনা। ১০টি এফ ৩৫ যুদ্ধবিমান। এগুলো রয়েছে পুয়ের্তো রিকোর সামরিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে। এগুলোর সাহায্যে ভেনেজুয়েলার রাজধানী ক্যরাকাস সহ সেদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিমান হানা চালনো সম্ভব। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেই ভেনেজুয়েলার ছোট ছোট নৌকার ওপর ড্রাগ পাচারের অভিযোগে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন সেনারা। পরে দেখা গেছে নৌকাগুলি ছিল হয় জেলেদের কিংবা পরিযায়ীদের যারা সুখী জীবনের হাতছানিতে জলপথে আমেরিকার উপকূলে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিল। এভাবে অন্তত ২০টি নৌকার ওপর হামলা চালিয়ে সেগুলি ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসবই উস্কানি ও ভীতি প্রদর্শনের মুখপাত মাত্র। সংক্ষেপে বললে, মার্কিন হামলার ছকটি সুপরিচিত। দেশটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে প্রথমে বিমান-হানা চালিয়ে সম্ভাব্য প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করা। মাদুরো সহ দেশের শীর্ষনেতাদের হত্যা করা। এরপর মার্কিন সেনা পাঠিয়ে দেশটাকে দখল করে ও পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুঠ করা, সেদেশের মানুষ গত তিরিশ বছরে যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন তা ধ্বংস করে দেশটাকে সাম্রাজ্যবাদের লুন্ঠনভূমিতে পরিণত করা এবং দেশের মানুষকে দাসত্ব মেনে নিতে বাধ্য করা। 

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

প্রতিরোধের পরীক্ষিত পথেই হবে মোকাবিলা 

সাম্রাজ্যবাদী, বিশেষ করে সোভিয়েতের পতনের পর থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী হামলার যেমন পরীক্ষিত ছক রয়েছে, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী হামলা প্রতিরোধ করারও পরীক্ষিত রণনীতি ও রণকৌশল রয়েছে। এই কৌশল বহুমাত্রিক।

ক) প্রতিরোধের রাজনীতি

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র, এই তিন নীতির পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থানই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার মূল রাজনৈতিক স্তম্ভ। ঔপনিবেশিক দখলদারি প্রতিরোধ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, দেশের মানুষকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধে সামিল করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করা এবং সাম্রাজ্যবাদী তথা নয়া উপনিবেশবাদী অর্থনীতির বিকল্প হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মানজনক আর্থিক অবস্থান সুনিশ্চিত করা যা দিতে পারে একমাত্র সমাজতন্ত্রই— এগুলিকে যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে জড়ো করা সম্ভব। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই তিনটি শর্তই হাজির।  টানা কয়েক দশক সেদেশে ক্ষমতায় রয়েছে ইউনাইটেড সোশালিস্ট পার্টি অফ ভেনেজুয়েলা বা পিইউএসভি। মতাদর্শগত দিশা হিসাবে রয়েছে বলিভারিয় বিপ্লব ও একুশ সতকের সমাজতন্ত্র। এবং পিইউএসভি নেতৃত্বে এই দুই মতাদর্শের প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে বহুতর সফল অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। এসবের মধ্যে দিয়েই সচেতন হয়ে উঠেছেন ভেনেজুয়েলার শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্তরা। তৃণমূল স্তরে তাঁদের ক্ষমতায়নও হয়েছে। এ সব তাঁরা সহজে ছেড়ে দিতে চাইবেন না। সুতরাং, ধরে নেওয়া যায় যে তাদের সমস্ত অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই মার্কিন আগ্রাসনের হুমকির বিরুদ্ধে জনগণকে সমাবেশিত করবে পিইউএসভি। এটা হবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এখানেই ইরাক বা ইরানের সঙ্গে ফারাক ভেনেজুয়েলার।

খ) প্রতিরোধের সামরিক নীতি

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার পরীক্ষিত পথ হল দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ। এর রূপ বিভিন্ন। শত্রুর ঘাঁটি বা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু থেকে সরে গিয়ে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া। এবং সেখানে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘকালীন প্রতিরোধ গড়ে তুলে শত্রুকে ক্রমশ হীনবল করে ফেলা। পরে সুবিধামতো ভাবে চারপাশ থেকে ঘেরাও করে শত্রুকে নিকেশ করা। দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের এই ধরনটা সফল হয়েছিল চীনে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েতে দেখা গেছে জনযুদ্ধের আরেক ধরন। মস্কো, লেনিনগ্রাড বা স্তালিনগ্রাড — এগুলো ছিল শহরই। তবে এগুলিকেই প্রতিরোধের কেন্দ্রে পরিণত করে দীর্ঘস্থায়ী, রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল লাল ফৌজ। এই যুদ্ধে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি তলাকে প্রতিরোধের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল। এর ফলে জার্মান ব্লিৎসক্রিগের গতি কমিয়ে এনে দ্রুত নিষ্পত্তির যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধে পরিণত করা হয়েছিল। এতে শেষ পর্যন্ত ফ্যাশিস্তদের রসদ ও সরবরাহে টান পড়ে, তাদের অর্থনীতি শক্তি হারায় এবং তাদের পরাজয়ের পথ সুগম করে। এর ওপর রয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার রাজনীতিতে স্থিত থেকে ও কৌশলকে সমন্বিত করে ভিয়েতনামের মতো ছোট দেশ প্রথমে ফরাসি ও পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শক্তি নিঃশেষিত করে দিয়েছিল। সেই ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠে পারেনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ভিয়েতনামও তাই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনযুদ্ধের আর একটা রূপ। সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের দ্রুত নিষ্পত্তির যুদ্ধ কৌশলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ হল পাল্টা কৌশল যা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দেওয়া যায়। 



গ) ভেনেজুয়েলার প্রস্তুতি

মার্কিন অস্ত্রসজ্জা থেকে ভেনেজুয়েলার আশঙ্কা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রথমে বিমান হানা চালিয়ে কারাকাস ধ্বংস করবে। তারপর ঢুকবে স্থলসেনা। তাই প্রতিরোধের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। কারাকাসের মফঃস্বল এলাকা পেটারের জমায়েতে মাদুরো ঘোষণা করেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ফ্যাশিস্ত অলিগার্ক ও সাম্রাজ্যবাদীদের ফের ক্ষমতায় আসতে দেব না। এদেশে ক্ষমতা চিরকাল থাকবে তৃণমূল স্তরের মানুষের হাতে।’ এখানেই নির্ধারিত হয়ে গেছে প্রতিরোধের লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনীতির মূল দিশা। মার্কিন হামলার বিরোধিতায় ভেনেজুয়েলা সরকার ইতিমধ্যেই গঠন করেছে ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ‘‌বলিভারিয় স্ট্রিট কমিটি’‌। এগুলোর সদস্য সংখ্যা ৪৫ লক্ষ। বোঝাই যায়, আগ্রাসন শুরু হলে এই কমিটিগুলোই হয়ে উঠবে গণ-প্রতিরোধের হাতিয়ার। দরকারে এগুলিই হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের মিলিশিয়া। এ হবে এক রাজনৈতিক বাহিনী যাদের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলার কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো জানিয়েছেন, তাঁরা সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি গেরিলা যুদ্ধের জন্যও তৈরি হচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘ওরা বিপুল নৌ-সেনা ও বায়ু-সেনা নিয়ে ক্যারিবিয়ান এলাকা থেকে আমাদের ওপর হামলার ছক কষছে। আমরা এসবের জবাব দেব স্বাধীন পাহাড়ি এলাকা থেকে।’ পাদ্রিনো কী বলতে চাইছেন তা সহজেই বুঝে যাবেন জনযুদ্ধের কৌশলে অভিজ্ঞরা। এভাবেই দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের প্রস্তুতি গড়ে তুলছে ভেনেজুয়েলা। এছাড়া রয়েছে কিউবার অতন্দ্র নজরদারি এবং সহযোগিতা। মার্কিনসাম্রাজ্যবাদের বিরোধিথায় পোড় খাওয়া, অভিজ্ঞ কিউবার সহযোগিতার মূল্যও অনেক।

ঘ) প্রতিরোধের কূটনীতি

তবে রাজনীতি ও সামরিক নীতি ও কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কূটনীতিকে। কারণ যুদ্ধ হল রক্তপাতময় রাজনীতি। আর রাজনীতি হল রক্তপাতহীন যুদ্ধ। তাই যুদ্ধ প্রস্তুতির পাশাপাশি কাজে লাগাতে হবে কূটনীতিকেও। লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক স্তরে সমমনোভাবাপন্ন শক্তিগুলিকে সমাবেশিত করে সাম্রাজ্যবাদের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। ইতিমধ্যেই চীন জানিয়ে দিয়েছে, আমেরিকা যেভাবে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করার কথা বলছে তার বিরোধিতা করবে তারা। চীনের এই অবস্থান আরও অনেক দেশকে এই অবস্থানে টেনে আনতে সাহায্য করবে। চাপ তৈরি হবে আমেরিকার ভেতরেও। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় ও মার্কিন সেনাদের মৃতদেহ কফিনবন্দি হয়ে দেশে পৌঁছতে শুরু করে, তাহলে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কোণঠাসা করতে সুবিধা হবে ডেমোক্র্যাটদের। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন ফিরিয়ে আনবে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন নিপীড়নের পুরনো স্মৃতি। তার জেরে রিপাবলিকানরা হারাতে পারে লাটিনো ভোটারদের সমর্থন। তাছাড়া হামলা শুরু হলে বিপুল সংখ্যক ভেনেজুয়েলার লোকজন পাড়ি জমাতে পারে আমেরিকার উদ্দেশে। তাতে ট্রাম্পের অভিবাসী সমস্যা বাড়বে বই কমবে না। ফলে এসব নেতিবাতচক বিষয়গুলিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে ট্রাম্পকে।

যুদ্ধের ঝুঁকি কি সত্যিই নেবেন ট্রাম্প?

শেষ পর্যন্ত আমেরিকা যদি সত্যিই আগ্রাসন শুরু করে তাহলে ভেনেজুয়েলাকে যেতে হবে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের পথে। সেই পথেই অনেক দিন ধরে শক্তি ক্ষয় করিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে দুর্বল করে ফেলার কৌশল কাজে লাগাতে হবে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়াতে চায় আমেরিকা। তারা চায় হাইটেক, দ্রুত নিষ্পত্তির যুদ্ধ। বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি চাইবে প্রতিরোধ দীর্ঘায়িত করে সাম্রাজ্যবাদের শক্তি ক্ষয় করিয়ে তাকে রক্তশূন্য করে ফেলতে।

তবে এনিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্যান দেঙ। তিনি চায়না ইউনিভার্সিটি অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ল-এর লাতিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান রিজিয়ন ল সেন্টারের ডিরেক্টর। তাঁর কথায়, বার বার হামলার হুমকি এবং হামলার সময় নির্দিষ্ট করতে না পারা — এর মানে হতে পারে এই হামলার পরিণতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। তাই কড়া কথা বলে যাওয়া ও হুমকি দেওয়ার অর্থ হতে পারে ভবিষ্যতের কোনও আলোচনার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন ট্রাম্প। তিনি যেহেতু ডিল মেকার, তাই চাপ দিয়ে ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে সুবিধা আদায় করাটাও তার কৌশল হতে পারে। তেমনটা যদি সত্যিই হয়, তাহলে বুঝতে হবে ক্রমশ নখদাঁত হারাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। পাছ দুয়ারের ভেনেজুয়েলাকেও এখন সমঝে চলতে হচ্ছে তাকে।


প্রকাশের তারিখ: ০৮-ডিসেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

সুন্দর লেখা, বেশ ইনফরমেটিভ। এই লেখাটির বাইরে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মোকাবিলা নিয়ে আরও সবিস্তারে জানতে চাই।
- Surjendu Saha, ০৯-ডিসেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫১ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬