সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যুদ্ধ বদলে দেবে পশ্চিম এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মানচিত্র
প্রবীর পুরকায়স্থ
প্যালেস্তাইন একটি আন্তর্জাতিক বিষয় এবং বিশ্বের উপনিবেশ মুক্ত করার অভিন্ন অংশ। ইরানের তরফে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবী কতটা পরস্পর সংযুক্ত এবং পশ্চিম এশিয়াকে ঘেটোয় পরিণত করে কাজ হবে না। আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, এই অঞ্চল থেকে শুধু তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়াটাই আমাদের জন্যে একমাত্র বিষয় নয়। সেখানে কর্মরত দেশান্তরী ভারতীয়রা ভারতে বহিরাগত নগদ-প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখেন সেটাও বিপদাপন্ন হবে যদি পশ্চিম এশিয়া বিপর্যস্ত হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এই যুদ্ধ শুধু বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ফাটল ধরিয়েছে তাই নয়। এর ফলে কৃষির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ সার তৈরির কাঁচামালেও আঘাত এসেছে। এশীয় দেশগুলির জন্য এগুলি জরুরি প্রয়োজনের সামগ্রী। বিশেষ করে ভারত, যে দেশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস জাতীয় হাইড্রোকার্বন ও সার উৎপাদনের সিংহভাগ কাঁচামাল সরবরাহের জন্যে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির উপর নির্ভরশীল। এটা মোটেই আশ্চর্যের নয় যে তেলের দাম এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যারেল প্রতি ৬০-৬৫ ডলার থেকে কয়েকদিনের মধ্যেই একলাফে প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছে যায়। তারপর, ইরান যুদ্ধ সম্ভবত সমাপ্তির পথে বলে ট্রাম্পের ঘোষণার পর সেটা আবার নেমে আসে ৯০ ডলারে। রাশিয়ার তেলের ওপর মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব ৬০-৬৫ ডলার দামে ফিরবে বলে মনে হয় না।
এটা ভারতের মত দেশের জন্যে বিশাল একটা ভার। রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীল ভারতকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জন্যে ব্যারেল প্রতি অতিরিক্ত ২০-২৫ ডলার খরচ করতে হবে। আমরা রাশিয়ার তেল কেনার জন্যে ‘মার্কিন’ ছাড় পেয়েছি এক মাসের জন্যে মাত্র। তার বেশি নয়। ভারত সরকার ইতিমধ্যেই রেস্টুরেন্ট ও অন্য বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করার পর প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরো গুরুতর হয়ে উঠেছে। সংকট অব্যাহত থাকলে সিলিন্ডার বা পাইপলাইনের মাধ্যমে পাওয়া গ্যাসের গৃহস্থ গ্রাহকরা এর পরবর্তী আঘাতের আওতায় আসবে কারণ সার ও অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রের ব্যবহারকারীরা হয়ত অগ্রাধিকার পাবে তখন।
এটাও এখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে ইরানের প্রতিরোধ, বিশেষ করে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শুধু ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যেই নয়, সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে দেওয়া আরব ভূখণ্ডের মার্কিন মিত্রদের জন্যেও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের বক্তব্য হল—আরব দেশগুলির মার্কিন ঘাঁটিগুলি যদি ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্যে ব্যবহৃত হয়, তবে যুক্তিসঙ্গত কারণেই সেগুলি ইরানেরও প্রত্যাঘাতের নিশানা হবে। যদিও মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ‘বিজয়’-এ খবর করছে এবং ইরানের দুর্বল ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছে, ইরানী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রত্যাঘাত কিন্তু অব্যাহতই রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘থাড’ নামের র্যাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যাটারি চালিত বহনক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসিয়েছে ইজরায়েল, জর্ডন, কাতার, সংযুক্ত আমিরশাহী (দুটো ব্যাটারি) এবং সৌদি আরবে। এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত এক্স-ব্যান্ড নজরদাারিগুচ্ছের এএন/ টিপিওয়াই-২ রাডার হল এই থাড ব্যবস্থার মুখ্য অংশ। এটা না থাকলে থাড ব্যাটারি লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট করতে বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কাতার এবং অন্য উপসাগরীয় দেশগুলির আগাম সতর্ককারী থাড ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এখন ইজরায়েলের আইরন ডোম বা লৌহ আচ্ছাদনী, ডেভিড’স স্লিং এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থাগুলি আগাম সতর্কতা জ্ঞাপনের সামর্থ্য হয়েছে। একটি থাড রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্রধ্বংসী ব্যবস্থাপনার দাম অনুমান করা হয় ১১০ কোটি ডলার। থাড রাডার ব্যবস্থাপনার দামই ন্যূনতম ৫০ কোটি ডলার। এর ব্যয় শুধু বিপুলই নয়, নির্মাণ করতেও সময় লাগে ৮ বছর। এই কারণেই দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার থাড ব্যবস্থাপনাকে পশ্চিম এশিয়ায় নিয়ে গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, থাডের সতর্কতাকারী ব্যবস্থাপনা খোয়ানোর পর ইজরায়েল ও মার্কিন প্রতিরক্ষার জন্যে যে কোনও ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হানার প্রত্যুত্তরের প্রস্তুতির সময় কমে দাঁড়িয়েছে ১০-১৫ মিনিট থেকে ১-২ মিনিটে। একটি ইউটিউব ভিডিওতে থিয়োডর পোস্টল দেখিয়েছেন— এই মুহূর্তে ইজরায়েলের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র-ধ্বংসী ব্যবস্থাপনাগুলি মন্থরগতির ড্রোন প্রতিরোধ করারও ক্ষমতা হারানোর ফলে কীভাবে ইরানের পক্ষে তুলনায় স্বল্পসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেও একই সংখ্যার লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে পারা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান আরো অনেক দিন স্বল্পব্যয়ের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলি নিক্ষেপ করে যেতে পারবে। ইরান তাদের ড্রোন নির্মাণ ব্যবস্থাপনাকে ভূগর্ভে স্থানান্তর করেছে। ফলে ইরান ও মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের জন্যে সেগুলি দুর্ভেদ্য হয়ে পড়েছে। তাদের স্বল্পব্যয়ের ড্রোন নির্মাণ ফলে আরো অনেকটা সময় ধরে অব্যাহত থাকবে।
ইরান নিঃসন্দেহে ইজরায়েল ও মার্কিন বর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দ্বারা ব্যাপকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ইজরায়েলকে কী মাত্রায় খেসারত দিতে হয়েছে সেটা জনগণের কাছে গোপন রাখা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হাফিয়া তেল শোধনাগারের বিপুল ক্ষতিসাধন হয়েছে এবং ক্ষতি হয়েছে একইভাবে ইজরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ ব্যবস্থাপনারও। তারা ইজরায়েলের কতটা ক্ষতিসাধন করতে পেরেছে, ইরানের জন্যে এটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কৌশলগত অভিঘাত বিশ্বের ওপর, বিশেষ করে জায়নবাদের পৃষ্ঠপোষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির ওপর পড়বে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হৌতি-সহ প্রতিরোধের অক্ষশক্তির সামনে এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, তারা কতদিন হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজগুলির চলাচলকে স্তব্ধ করে রাখতে সক্ষম থাকবে?
এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে, শুধু ভারত-সহ এশীয় দেশগুলিই নয়, রাশিয়ার সাথে ইতিমধ্যেই সমস্ত সংযোগ ছিন্ন করে বসা ইউরোপকেও বিপুল খেসারত দিতে হবে। ইরান এটা ভালোভাবেই জানে যে, তাদের শক্তি নিহিত রয়েছে তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও এমন পরিস্থিতি তৈরি করার সামর্থ্যে— যার অভিঘাতে ভারত, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সম্পর্কিত সংকটের মুখোমুখি হবে। এরপর কি ওই দেশগুলি পূর্বতন ঔপনিবেশিক ও জবরদখলকারী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির সামনে দাঁড়াবে যাদের লক্ষ্য এখনও তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ করে যাওয়ার? ধ্বংসকারী ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে যখন খুশি পৃথিবীর যে কোনও দেশকে অন্যায় হুমকি দিয়ে নিজেদের লাভ তুলে নেওয়ার এই মার্কিন বন্দোবস্তকে আর কতদিন সহ্য করবে এই দেশগুলি? সহ্য করবে একটি দৃশ্যত নিয়মবদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে পরিবর্তিত হিংস্র মার্কিন আধিপত্যের জঙ্গলের শাসনের এই বর্তমান ব্যবস্থাকে?
যদি ধরেও নিই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ের নিরিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই দুর্বল একটি শক্তি, তা সত্ত্বেও এ নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই যে বিশ্ব মোড়লকে অগ্রাহ্য করার কারণেই বিপুল খেসারত দিতে হচ্ছে ইরান এবং তার জনগণকে। যদিও তাদের অর্থনীতি এখনও বিশ্বে বৃহত্তম, তারপরও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মত মিত্রদেশ-সহ ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের যোগ করলেও, বিশ্বে আগের মত খবরদারির ক্ষমতা আর নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। চীন, ভারত, দক্ষিপূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা নিজেদের শিল্পায়ন ঘটিয়েছে। এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতার নিরিখে ব্রিকসের ৫টি দেশ জি-৭ দেশগুলিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিনদের যুদ্ধে যাওয়াটা তাদের শক্তির প্রদর্শন নয়। বরং এই বিষয়টির স্বীকৃতি যে একটি মাত্র ক্ষেত্র, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী তা হচ্ছে তাদের সামরিক সক্ষমতা। তাদের যুদ্ধ বিষয়ক ব্যয় যা পরের ৯টি দেশের এই খাতের মোট বরাদ্দের চেয়েও বেশি। প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবেই তাদের প্রতিরক্ষা বিভাগের নাম বদলে যুদ্ধ বিভাগ করেছে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-উত্তর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩০টি দেশকে আক্রমণ করেছে। পৃথিবীর আর কোনও দেশ এই রেকর্ডের ধারে কাছে নেই। এই ‘সাফল্য’-এর উৎসে রয়েছে তাদের নাগরিকদের এই কথা বোঝাতে পারার তাদের সক্ষমতায় যে, আক্রান্ত না হলে অথবা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা না দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানায় না। সাদ্দাম হোসেনের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা মনে পড়ে কি? কিংবা কোরিয়ায় মার্কিন সেনার বোমা হামলা করে গণতান্ত্রিক কোরিয়াকে প্রস্তর যুগে পিছিয়ে দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় তাদের পুতুল সিংমান রীকে অধিষ্ঠিত করা? কিংবা ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের স্বপক্ষে এই যুক্তি দিয়েছিল যে, নাহলে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলি দাবাখেলার গুটির মত একেএকে সব ‘লালদের’ করায়ত্ত হবে? গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত চিলির সরকারকে উচ্ছেদ করে পিনোচেতের অত্যাচারী সামরিক একনায়কতন্ত্রী শাসনকে অধিষ্ঠিত করা? সার্বিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ? ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বাতিস্তার অত্যাচারী একনায়কতন্ত্রী শাসনের অবসান ঘটানোর পর বে অব পিগ হানা? লিবিয়ায় গদ্দাফির অপসারণ? অথবা ইরানের বিরুদ্ধে আগেরবারের যুদ্ধ বা এখন যেটা চলেছে সেটা? ভেনিজুয়েলার ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা?
এই মার্কিন সামরিক অভিযানের অনেকগুলির ক্ষেত্রেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র বিদ্যমান সরকারের অপসারণ করে নতুন সরকার বসানোয় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। বেশ কয়েকটি দেশে তারা পেছনে রেখে এসেছে ইরাকের মত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। এবং প্রতিবেশীদের জন্যে একটি স্থায়ী সমস্যাকে। লিবিয়ার উদাহরণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেটা শুধু আরব দুনিয়া নয়, গোটা উত্তর আফ্রিকার জন্যে অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ‘নীতিবাক্য’টি হল, হয় তুমি আত্মসমর্পন করে আমাদের নয়া উপনিবেশে পরিণত হও, নয়তো আমরা তোমাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেব।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং তাদের মিত্ররা ভেবেছিল কুর্দ বা বালোচদের মত সংখ্যালঘুদেরকে ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে খেপিয়ে দেওয়া যাবে। যেহেতু ওই সরকার ধর্মতন্ত্রীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটা সত্য যে, ইরানের বহু মানুষ বর্তমান শাসকদের পছন্দ করেন না— যারা মানুষকে খাঁচাবন্দী করে রেখে পশ্চাদমুখী পোশাকবিধি চাপিয়ে দেয় এবং ধর্মগুরুদের বিশেষাধিকার দেয়। কিন্তু কুর্দরাও এ বিষয়টা ভালোভাবেই জানে যে এটা পশ্চিমী শাসকদের একটা খেলা— যা শুরু হয় স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, শেষ হয় পশ্চিমী যুদ্ধের উদ্দেশ্য পূরণের পর বুড়ো আঙুল দেখানো দিয়ে। এই খেলা তাদের সাথে বারবার খেলা হয়েছে। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ সিরিয়া। ইরাকেও এমনটাই ঘটেছে আগে। মনে হয় না কুর্দরা আবার মার্কিনদের ফাঁদে পা দেবে বলে। এটা সত্যি যে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অনেক ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু ইজরায়েলের সাথে হাত মিলিয়ে ইরানের ধ্বংস করা তাদের অভীষ্ট নয়।
ইরান এবং মার্কিন-ইজরায়েল জোটের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহতই থাকবে যদি না এই যুদ্ধের সূচনাকারী ট্রাম্প নিজে পিছিয়ে আসেন। ইজরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক বন্ধ করতে না পারলেও তিনি নিজের বিজয় ঘোষণা করে দিতে পারেন এই বলে যে বিভিন্ন শহর নগর এবং তেলক্ষেত্রগুলি ধ্বংস করে দিয়ে ইরান ও তার মিত্রদেরকে যথেষ্ট শিক্ষা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। গত ১০ মার্চের সাংবাদিক সম্মেলনে তার আগের ১০ দিনে ইরানের ওপর চালানো বিধ্বংসী অভিযানকে ‘ছোট্ট পর্যটন’ বলে অভিহিত করে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ খুব শীঘ্রই শেষ হতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের উক্তিগুলিকে তবুও বিশ্বাস করা যায় না। যতক্ষণ না বলা কথাগুলি তার কাজে প্রতিফলিত হয়। এখন তিনি এটাও মেনে নিয়েছেন ক্ষেপণাস্ত্র হানায় ইরানে বালিকা বিদ্যালয়ের যে ১৭০ জন কন্যাশিশুর মৃত্যু এবং অগণিত আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে সেটা মার্কিন টোমাহওক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলাই ছিল। সেটা তার আগের উক্তি মতো দিক্ভ্রান্ত ইরানী ক্ষেপণাস্ত্রের নয়।
ইরানের জন্যে এটা দুর্ভাগ্যেরই যে, এই যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের জনমতের কোনও অর্থই নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলের কাছে। ইজরায়েলের এখন স্থির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য— একটি জায়নবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্যালেস্তিনীয়দের কোনও ধরনের অধিকারের প্রশ্ন থাকবে না। বাঁচতে হলে তাদেরকে প্রতিবেশী আরব দেশগুলিতে শরণার্থী হতে হবে। ইজরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত খ্রিস্টান জায়নবাদী মার্ক হুকাবির সমর্থন পেয়ে সেখানকার জায়নবাদীরা এখন নীল নদী থেকে ইউফ্রেটিস অবধি ইজরায়েলের ‘বাইবেল-স্বীকৃত অধিকার’-এর কথা ঘোষণা করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত জবরদখলকারী ঔপনিবেশিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র ইউরোপীয় আদি ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি ইজরায়েলকে অস্ত্র, অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখবে, পশ্চিম এশিয়া বা জবরদখলকারী ঔপনিবেশিক বা আদি-ঔপনিবেশিক শক্তি বর্ণিত মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যাও অপরিবর্তিতই থাকবে।
প্যালেস্তাইন একটি আন্তর্জাতিক বিষয় এবং বিশ্বের উপনিবেশ মুক্ত করার অভিন্ন অংশ। ইরানের তরফে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবী কতটা পরস্পর সংযুক্ত এবং পশ্চিম এশিয়াকে ঘেটোয় পরিণত করে কাজ হবে না। আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, এই অঞ্চল থেকে শুধু তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়াটাই আমাদের জন্যে একমাত্র বিষয় নয়। সেখানে কর্মরত দেশান্তরী ভারতীয়রা ভারতে বহিরাগত নগদ-প্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখেন সেটাও বিপদাপন্ন হবে যদি পশ্চিম এশিয়া বিপর্যস্ত হয়।
জোট নিরপেক্ষতা ভিত্তিক ভারতের দীর্ঘদিনের বিদেশ নীতির পরিবর্তে ‘একাধিক জোটভুক্তি’-র এই নতুন নীতির ভান কোনও কাজে আসছে না। রূঢ় বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে ভারতের বর্তমান বিদেশনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। যত দ্রুত সরকার এটা অনুধাবন করে ততই আমাদের সকলের জন্যে মঙ্গল। এটা সত্যি যে আমরা একটি বহুমেরু বিশ্বে বাস করছি। কিন্তু নয়া উপনিবেশবাদ এখনও পুরোমাত্রায় সক্রিয়। দেশ হিসেবে আমরা আমাদের ঔপনিবেশিক অতীত সম্পর্কে বিস্মৃত হতে পারি না এবং আমাদের প্রতিরোধের ইতিহাসই আমাদেরকে স্বাধীন ভারতে পৌঁছে দিয়েছিল। একজন মার্কিন দার্শনিক যেভাবে বলেছিলেন: ‘যারা অতীত বিস্মৃত, তারা আবার সেটার পুনরাবৃত্তিকে আমন্ত্রণ করে।’ মার্কিনদের ফাঁদে পড়ে একাধিক জোটভুক্তির বাহানায় আমাদের নয়া উপনিবেশবাদের খপ্পরে পড়া চলবে না। পরিবর্তে, আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই প্রতীতীতে, যেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অধিকার রয়েছে— আদি ও নব্য উপনিবেশবাদী আধিপত্যমুক্ত স্বাধীন পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ রচনার।
ইরান এই অধিকারটিকেই ব্যক্ত করছে। ইজরায়েল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত করার প্রয়োজন তাদের নেই। ইরানের কাছে এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্ব রয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিজয়ী। এটাই চলমান ইরান যুদ্ধের সারকথা। এবং এর জন্যেই এই যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মানচিত্র বদলে দেবে।
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ১৯-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
