Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মেশিনের বুদ্ধিমত্তা কি মানবসভ্যতাকে বদলে দেবে? (৪)

নন্দিনী মুখার্জী
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণা করছেন যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিবিদ, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আবার বলছেন যে আগামীদিনে মেশিনের বুদ্ধিমত্তা এতটাই উন্নতস্তরে পৌঁছবে যে তা মানবিকতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যদিও কি ঘটতে পারে অদূর ভবিষ্যতে তাই নিয়ে তাঁরা যে খুব নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পেরেছেন তা নয়। অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতই তাঁরা অনুমান করছেন যে এই মেশিন বুদ্ধিমত্তা আগামীদিনে সমস্ত রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মানুষের জায়গা নিতে চলেছে।
Artificial Intelligence and Human Civilization- 4

চতুর্থ পর্ব 

মেশিন কি মানুষের মত চিন্তা করতে পারে? – যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা যে সময় থেকে ভাবতে শুরু করেছেন, সেই সময় থেকেই প্রশ্নগুলো এইরকম – মেশিন কি মানুষের মত সব কাজই করতে পারবে? মেশিনের পক্ষে কি মানুষের মত সৃজনশীলতা সম্ভব? মেশিন কি মানুষের মত আবেগপ্রবণ হতে পারে? মেশিন কি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে উপযোগী করে তুলতে পারে? 

টিউরিং একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন যাতে তিনি রেখেছিলেন সেইসব কাজকে যেগুলি মেশিন করতে পারবে না বলেই সেই সময়ে ধারণা ছিল। এই তালিকায় ছিল – “মেশিন কখনো দয়ালু, বন্ধুত্বপূর্ণ, উদ্যোগী, পরিহাসপ্রিয় হতে পারবে না, ঠিক বা বেঠিকের ফারাক করতে পারবে না, ভুল করতে পারবে না, প্রেমে পড়তে পারবে না, স্ট্রবেরি ও ক্রিম (অর্থাৎ ভালো খাবার) উপভোগ করতে পারবে না, অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারবে না, নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারবে না, একেবারে নতুন কিছু করতে পারবে না” ইত্যাদি। এর মধ্যে কয়েকটি কাজ ততটা কঠিন নয় এবং বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে কয়েকটি কাজ মেশিন করতে পারে বা মেশিনকে দিয়ে করানো যায় – যেমন অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, ঠিক বা বেঠিকের ফারাক করা এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু সৃজনশীল কাজ বা একেবারে নতুন কোন চিন্তার উদ্ভব ঘটানো কি মেশিনের পক্ষে সম্ভব?  

জন শার্লে (John Searle) ১৯৮০ সালে একটি প্রবন্ধ লেখেন যাতে তিনি টিউরিং টেস্ট-এর সমালোচনা করে বলেন যে, কোন কম্প্যুটার যন্ত্রে বুদ্ধিমত্তা আরোপ করলে যন্ত্র হয়তো সেই আরোপিত বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী কাজ করতে পারে, কিন্তু তার ফলে যন্ত্রের বিচারবুদ্ধি তৈরী হয় না বা মানুষের স্বাভাবিক ভাষা (natural language) অনুধাবন করার ক্ষমতা জন্মায় না। অর্থাৎ টিউরিং প্রস্তাবিত imitation game – এ কোন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম জয়ী হলেও এটা বলা যাবে না যে কম্প্যুটারটি মানুষের মত চেতনাসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। চেতনা উৎপন্ন হওয়া একটি জৈবিক প্রক্রিয়া এবং জৈবিকভাবেই এই ঘটনা ঘটতে পারে। শার্লে তাঁর তত্ত্বের স্বপক্ষে একজন ইংরেজি ভাষায় জ্ঞানসম্বলিত মানুষের উদাহরণ দেন, যে কিছু সংকেতচিহ্ন ভিত্তিক নির্দেশ শুধুমাত্র অনুসরণ করে চাইনিজ ভাষায় কথোপকথন চালাতে পারে। এর থেকে সে চাইনিজ না জেনেও অন্যদের কাছে প্রতিপন্ন করতে পারে যে সে চাইনিজ জানে। শার্লের দর্শানো উদাহরণটির পক্ষে এবং বিপক্ষে আবার অনেক দার্শনিকই সমর্থন বা সমালোচনা করেছেন। এই পরিসরে এইসব বিতর্কগুলি আলোচনা করা সম্ভব নয়। 

এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তির যতটা অগ্রগতি ঘটেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে নিয়মমাফিক যে কাজগুলি মানুষ করে, যেমন টেলিফোন অপারেটর, রিসেপশনিস্ট বা ক্যাশিয়ার থেকে শুরু করে আরও বহু কাজ বর্তমানে কম্প্যুটার এবং সফটওয়ারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হচ্ছে। সিনোভেশন ভেঞ্চারসের সিইও এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ কাই ফু লি-র ২০১৮ সালে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন আগামী দিনে অন্তত ৫০ শতাংশ পেশায় যন্ত্র দিয়ে মানুষকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। এর মধ্যে আছে “অ্যাকাউন্ট্যান্ট, গাড়ি চালক, আইনী সহায়ক, রেডিওলজিস্ট” ইত্যাদি। কিন্তু শুধু এই ধরণের কাজগুলি নয়। কিছু কাজ যার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা লাগে সেইসমস্ত কাজেও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর সাহায্যে মানুষের বদলে কম্প্যুটারকে কাজে লাগানো সম্ভব। যেমন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে এমন সফটওয়ার বর্তমানে আছে যা নিজেই ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী কম্প্যুটার প্রোগ্রাম লিখতে সক্ষম, এমন কি একটি কম্প্যুটার ল্যাংগোয়েজ (যে ভাষা ব্যবহার করে কম্প্যুটার প্রোগ্রাম বা সফটওয়ার তৈরী হয়, যেমন “C”, Java, Python ইত্যাদি) থেকে অন্য ল্যাংগোয়েজে প্রোগ্রামটি পরিবর্তিত করতে সক্ষম। সুতরাং সাধারণ কম্প্যুটার প্রোগ্রামার বা ওয়েব ডেভেলপার –এর কাজেও আর মানুষ প্রোগ্রামারের বিশেষ একটা প্রয়োজন নেই। 

আমাজন যে ২৭,০০০ কর্মীকে সম্প্রতি বরখাস্ত করেছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিবিদ এবং প্রোগ্রামার যারা ক্লাউড কম্প্যুটিং বা ওয়েব-ভিত্তিক পরিষেবা ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করত। ২০২৩ সালেই জানুয়ারী থেকে মে – এই পাঁচ মাসের মধ্যে সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে দুই লাখের কাছাকাছি প্রযুক্তিবিদ ছাঁটাই হয়েছে। সুতরাং আগামীদিনে অনেকগুলি কাজ, যেগুলির জন্য দক্ষতা অর্জন একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল, সেগুলির জন্যও আর মানব কর্মীর প্রয়োজন থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা এখনও মনে করছেন যে কাজগুলিতে যন্ত্র মানুষকে সরিয়ে তার জায়গা নিতে পারবে না, তার মধ্যে আছে “শিক্ষক, আইনজ্ঞ, সামাজিক কর্মী, ডাক্তার, লেখক এবং সম্পাদক” ইত্যাদি। ম্যানেজমেন্ট পেশাতে যাঁরা যুক্ত তাঁদের জন্যও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এই মুহূর্তে কোন আশংকার বিষয় নয়। তবে অনলাইনের দুনিয়ায় কতদিন এই সমস্ত ক্ষেত্রে মানুষের প্রাধান্য বজায় থাকে সেটাই এখন দেখার।

চ্যাটজিপিটি – চ্যাটজিপিটি নামক এই সফটওয়ার বাজারে আসার পর থেকেই সৃজনশীলতার প্রশ্নে পৃথিবী জুড়ে আরও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চ্যাটজিপিটি বাস্তবে একটি চ্যাটবট, অর্থাৎ এমন একটি কম্প্যুটার প্রোগ্রাম যা মানুষের মতই অন্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে লিখিত বা মৌখিক কথোপকথন চালাতে পারে। সাধারণ চ্যাটবটগুলি একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কোন ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে সক্ষম, যেমন এয়ারলাইন্সের তরফে বিমানের অনলাইন টিকেট বুকিং-এর সময় ব্যবহারকারীকে সহায়তা করা ইত্যাদি। এই সমস্ত সাধারণ চ্যাটবটের থেকে চ্যাটজিপিটি অনেক বেশি শক্তিশালী। তার প্রথম কারণ হল চ্যাটজিপিটি কোন সীমাবদ্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল নয়। এটির প্রশিক্ষণের জন্য আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের উপর কার্যকরী শক্তিশালী অ্যালগরিদম (এই ধরণের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যালগরিদমগুলিকে ডিপ লার্নিং বলা হয়) ব্যবহার করে ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যম, সংবাদ নিবন্ধ বা বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ, ডিজিটাইজড বই ইত্যাদি থেকে চ্যাটজিপিটিকে প্রশিক্ষিত করা হয়। একই সঙ্গে কোন ব্যক্তি যখন চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন চালায়, তখন সেই ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাক থেকে এই সফটওয়ারটি তার জ্ঞান বা কোন বিষয় নিয়ে বোঝাবুঝিকে আরও উন্নত করে। এই বিশেষ ক্ষমতাই এই সফটওয়ারটিকে অন্যান্য যে কোন চ্যাটবট বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়ার থেকে আলাদা করেছে। অর্থাৎ, চ্যাটজিপিটি ইন্টারনেটে উপলব্ধ সমস্ত তথ্য থেকে জ্ঞান আহরণ করে, এবং একই সাথে আলাপচারিতার সময়ে মানব প্রশিক্ষকের দ্বারাও নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষিত হয়। এই প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে চ্যাটজিপিটি যে শুধুমাত্র ব্যবহারকারীর সঙ্গে আলাপচারিতায় সক্ষম তাই নয়, এটি প্রোগ্রামারের হয়ে কম্প্যুটার প্রোগ্রাম লিখে দিতে পারে, শিল্প সম্পর্কিত বা সাহিত্য সম্পর্কিত কোন প্রশ্নের দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে পারে, কোন একটি বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লিখে দিতে পারে – এইরকম আরও অনেকগুলি কাজ করতে পারে যেগুলিতে এতদিন মানুষকেই দক্ষ বলে মনে করা হত। টিউরিং তাঁর ১৯৫০ সালের নিবন্ধে এইরকম কোন কম্প্যুটার প্রোগ্রামের কথাই হয়তো চিন্তা করেছিলেন।  

কিন্তু চ্যাটজিপিটি কি মানুষের মতই সৃজনশীল? না, কারণ এই সফটওয়ার এমন কিছু করতে পারে না যা মানুষ কখনো করে নি বা ভাবে নি। কিন্তু চ্যাটজিপিটি প্রশিক্ষণের সময় যে সমস্ত তথ্য আহরণ করেছে তার ভিত্তিতে একেবারে নতুন বিষয়বস্তু তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ শুধুমাত্র কোন ওয়েবসাইট থেকে পুরোটা নকল করে নয়, বিভিন্ন ওয়েবপেজ বা প্রবন্ধ থেকে শিক্ষিত হয়ে একদম নতুন একটা প্রবন্ধ লিখে দিতে পারে। তবে চ্যাটজিপিটির পক্ষে ভুল করা সম্ভব, প্রাসঙ্গিক নয় এইরকম কিছু সৃষ্টি করাও সম্ভব। 

মানবিক সৃজনশীলতা – আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণা করছেন যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিবিদ, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আবার বলছেন যে আগামীদিনে মেশিনের বুদ্ধিমত্তা এতটাই উন্নতস্তরে পৌঁছবে যে তা মানবিকতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যদিও কি ঘটতে পারে অদূর ভবিষ্যতে তাই নিয়ে তাঁরা যে খুব নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পেরেছেন তা নয়। অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতই তাঁরা অনুমান করছেন যে এই মেশিন বুদ্ধিমত্তা আগামীদিনে সমস্ত রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মানুষের জায়গা নিতে চলেছে। 

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মেশিন কতটা ভূমিকা পালন করবে তার মধ্যে এখনই না ঢুকে এটা বলা যায় যে বর্তমানে মেশিনের বুদ্ধিমত্তা যে স্তরে আছে তাতে সুদূর ভবিষ্যতেও মানবিক সৃজনশীলতা বা মানবিক আবেগ এবং চেতনার অধিকারী কোন রোবট বা কম্প্যুটার হয়ে উঠবে তা কখনোই বলা যায় না। তবে অন্যদিক থেকে বলা যায় যে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং মেশিন লার্নিং-এর ব্যবহারে বেশ কিছু মানবিক গুণ হয় ধ্বংস হয়ে যাবে বা চাপা পড়ে যাবে। ছোটবেলা থেকেই মানুষের ভিতরকার বেশ কিছু মানবিক গুণকে পরিপোষণ করা হয় বা লালন করা হয়। প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে দিয়েও এই গুণগুলি যাতে দক্ষতায় পরিণত হয় তার দিকে শিক্ষকদের এবং সার্বিকভাবে সমাজের নজর থাকে। কিন্তু মেশিন যদি ক্রমান্বয়ে অনেকগুলি মানবিক কাজ করে দিতে থাকে তাহলে এই দক্ষতা বা সৃজন ক্ষমতা পরিপোষিত হবে না। সুতরাং বহু মানুষের মধ্যে মানবিক গুণের বিকাশ সাধন থমকে যাবে।

যেমন কয়েকটি উদাহরণ নেওয়া যাক। উচ্চ শিক্ষার জগতে প্রবন্ধ বা গবেষণাপত্র লেখা একটি আবশ্যিক কাজ যার মধ্যে দিয়ে আগামীদিনে নিজের মতামত বা চিন্তাভাবনা নিজস্ব সম্প্রদায় বা জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু অনেকসময় দেখা যাচ্ছে লেখক এবং গবেষকরা চ্যাটজিপিটি বা সমপর্যায়ের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়ারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে এই দক্ষতা তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না। এমন কি সফটওয়ারের কোন ভুলভ্রান্তি থাকলেও তা সংশোধন করার ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। যাঁরা বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে মৌলিক লেখা লেখেন, তাঁরাও এইধরণের সফটওয়ারের উপর প্রাথমিক খসড়া তৈরির জন্য নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে রচনার মৌলিকত্ব। এইরকমভাবেই হয়তো ছবি আঁকা বা কবিতা লেখার যে মানবিক গুণগুলি তা আর মানবিক থাকবে না।

কে শাসন করবে আগামী পৃথিবী – অনেকগুলি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী অতীতে তৈরী হয়েছে যেখানে দেখানো হয়েছে যে মানুষকে সরিয়ে দিয়ে দুনিয়ার দখল নিয়েছে যন্ত্রমানবের দল। আপাতত সেই সম্ভাবনার কথা না ভেবেও এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে যদি পুঁজিবাদ বজায় থাকে, তাহলে আগামীদিনে সামগ্রিকভাবে মানব সমাজের চেহারাটা পালটে যাবে। সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা মানুষের হাতেই থাকবে, কিন্তু তা ঘনীভূত হবে ধনিক শ্রেণী ও তাদের সহায়ক অতি সামান্য সংখ্যক মানুষের হাতে, যারা বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন মেশিনগুলিকে চালিত করবে। একদিকে যেমন অটোমেশন বহু মানুষকে কর্মহীন করবে, তেমনি সাধারণ কাজগুলি করার জন্য মানুষের প্রয়োজন ফুরাবে। মানুষকে খুঁজে নিতে হবে নিজেকে কাজে লাগানো বা সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার উপায়। 

কয়েকজন কর্পোরেট অধিকর্তা ও প্রযুক্তিবিদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন কাজ তৈরি হবে। সুতরাং, বাস্তবে কর্মসংকোচন ঘটবে না। কিন্তু আগের পর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে প্রত্যেক নতুন কাজের জন্য একজন শ্রমিক বা কর্মীকে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজন হবে। এই দায়িত্ব গ্রহণ করবে কে? রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কিন্তু ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনোই এই দায়িত্ব স্বীকার করে না। আবার একজন কর্মীর পুঁজিপতি নিয়োগকর্তা প্রয়োজন ফুরালে সেই কর্মীকে ছাঁটাই করে দায় সারে। কর্মীর প্রশিক্ষণের দায় সেই নিয়োগকর্তা বা মালিকও স্বীকার করে না।

অন্যদিকে সমস্ত জীবন জুড়ে নতুন নতুন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য বর্তমান পৃথিবীতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে, তাও গরিব বা প্রান্তিক মানুষের পক্ষে জোটানো সম্ভব হবে না। এমনিতেই সাধারণ স্কুলের শেষ ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া চালানো বহু গরিব পরিবারের ছেলেমেয়ের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। উপরন্তু অধিকতর যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়া মানুষ হয়তো দক্ষতা অর্জনের জন্য যে নিয়ত পরিশ্রম প্রয়োজন সেই লক্ষ্যে ততটা স্থির থাকতে পারবে না। ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে। 

সমাজবিদরা দেখিয়েছেন যে নব্বই-এর দশক থেকে বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীতে বৈষম্য বেড়েছে। যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের ফলাফল যদি শুধুমাত্র ধনিক শ্রেণির দখলেই থাকে তবে বৈষম্য এই সমাজে আরও বাড়বে। প্রযুক্তি মানুষের সহায়ক হিসাবেই কাজ করে। মানুষকে প্রতিস্থাপিত করা প্রযুক্তির কাজ নয়। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে কারখানার মালিকরা যন্ত্র চালানোর জন্য শ্রমিকের শ্রমশক্তির উপরেই নির্ভরশীল ছিল। বিগত শতাব্দীতে এবং এই শতাব্দীতে প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির দরুণ মানুষের শ্রমশক্তির প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই কমতে চলেছে। বেশ কিছু পেশায় যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন ছিল, সেখানেও মানুষের বদলে কাজে  লাগানো হচ্ছে মেশিন এবং সফটওয়ারকে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে মানুষের শ্রমশক্তি বা কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগানোর সময় কমছে। কিন্তু এই উদবৃত্ত সময়ের যদি সমবন্টন হত, তাহলে কর্মসংকোচন ঘটত না, বরং শ্রমিক বা কর্মীরা তাদের উদবৃত্ত সময় সৃজনশীল কাজে বা বিনোদনে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু তা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সম্ভব নয়। 

পুঁজিবাদী সমাজ শুধুমাত্র নিজের স্বার্থেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে, মানব সমাজের স্বার্থে নয়। একমাত্র সেই সমাজেই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার হতে পারে, বা অন্যভাবে বললে একমাত্র সেই সমাজেই প্রযুক্তি মানব সমাজকে সার্বিক উন্নতির পথে এগিয়ে দিতে পারে যেখানে সকলের সমান অধিকার। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া গড়ে তোলা তাই প্রত্যেক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদের লক্ষ্য হওয়া দরকার।


লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের  কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক 


প্রকাশের তারিখ: ২৭-জুলাই-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪