Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বঙ্কিমের সেই বিড়াল: বাঙলায় সমাজবাদ-চৰ্চা

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
যাঁরা ‘বিড়াল’ পড়েছেন ও যাঁরা পড়েন নি তাঁদের দুপক্ষকেই রচনাটির চালচিত্র মনে করিয়ে দেওয়া বা জানানোর জন্যে। এরপর শুরু হয় বেড়ালের লম্বা এক ভাষণ। সেটিই এই রচনাটিকে বিশেষ এক তাৎপর্য দেয়। বেড়ালের মুখ দিয়ে বঙ্কিম ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিএর জোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯-৬৫)-র মতটি হাজির করেন।
Bankimer Biral

কমলাকান্তকে বলা হয় বঙ্কিমের অন্য এক রূপ। নিজের নামে যেসব ভাবনা লিখতে তাঁর অসুবিধে ছিল (বা অনিচ্ছা), সেগুলিকেই তিনি কমলাকান্ত চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। লোকটি ‘আফিঙ্গখোর’ একেবারেই নিষ্কর্মা, কিছু লেখাপড়া জানেন বটে; তবে সেই বিদ্যে ভাঙিয়ে বড়লোক হওয়া দূরের কথা, নিজের পেট চালানোর ব্যবস্থাও করতে পারেন না। নসীরামবাবু বলে এক জমিদারের আশ্রয়ে তাঁকে থাকতে হয়। তাঁরই হেঁশেল থেকে যা দুমুঠো দেওয়া হয়, সেটুকুই তাঁর সম্বল। কমলাকান্তর আবার একটু দুধ পেলে ভালো হয় (আফিঙখোরদের নাকি দুধ না-পেলে চলে না), সেই দুধ জুগিয়ে চলেন প্রসন্নময়ী গোয়ালিনি। কমলাকান্ত ব্রাহ্মণ বলে ঐ গোয়ালিনি তাঁকে ‘ঠাকুর’ বলে ডাকেন; আবার রেগে গেলে ‘তবে রে বিট্‌লে’ বলে গালাগালও দেন।

এইরকম একটি অদ্ভুত চরিত্রকে নিয়ে বঙ্কিম জগৎ ও জীবনের নানা বিষয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশ করেছেন। এমনকি উপযোগবাদ (ইউটিলিটেরিয়ানইজ্‌ম্‌) নামক উনিশ-শতকী দর্শন নিয়েও কমলাকান্ত মারফত বা তার বকলমে অনেক ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা হয় (তৃতীয় সংখ্যায়)।

কমলাকান্তের দপ্তর-এর প্রতিটি লেখাই আলাদা আলাদা, আগেরটির সঙ্গে পরেরটির কোনো বিষয়গত বা যুক্তিগত যোগ নেই। যেমন দশম সংখ্যার বিষয় ‘বড়বাজার’। তবে এ বাজার যে-কোনো জিনিসের বাজার নাম। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ভারততত্ত্ব, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদির বাজার। এই সবকিছুই পণ্য। এগুলো নিয়েও কেনাবেচা চলে।

তার পরের সংখ্যার বিষয় কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। ছোটো এই লেখাটির নাম ‘আমার দুর্গোৎসব’। দেশের সমস্ত দুর্গতি একদিন নাশ হবে, সোনার বাঙলার গৌরব ফিরে আসবে— এই আশাই সেখানে প্রকাশ পেয়েছে। দ্বাদশ সংখ্যায় আবার একটু কীর্তনের খেই ধরে বাঙলার অতীত গৌরব নিয়ে কিছু কথা শোনা যায়।

ত্রয়োদশ সংখ্যার বিষয় একেবারেই আলাদা। শুধু তার আগের বা পরের সংখ্যার লেখা থেকে না, দপ্তর-এর আর-সব লেখা থেকেই এর তফাত একেবারে চরিত্রগত। রচনাটির নাম: ‘বিড়াল’ (বঙ্গদর্শন, চৈত্র ১২৮১, ৫৬৩-৬৭)। তার বিষয় সংক্ষেপে এই: কমলাকান্তর জন্যে প্রথম গোয়ালিনি একটু দুধ রেখে গিয়েছিলেন। আফিঙের ঝোঁকে কমলাকান্ত সেটি খেয়াল করেনি, তিনি তখন নেপোলিয়ন-এর হয়ে ওয়াটারলু যুদ্ধে জেতার মতো ব্যূহ রচনায় ব্যস্ত ছিলেন। সেই ফাঁকে একটি বেড়াল এসে দুধটুকু খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু বেড়ালটি পালায় নি, নির্জলা দুধ খেয়ে খুশি হয়ে সেখানেই বসে রয়েছে। কমলাকান্তর মনে হলো: বেড়ালে দুধ খেয়ে গেলে তাকে তেড়ে মারতে যেতে হয়। তাই একটা ভাঙা লাঠি খুঁজে বার করে তিনি বেড়ালটিকে মারতে গেলেন। কমলাকান্ত তাঁর দপ্তর-এ লিখছেন: ‘মার্জ্জারী কমলাকান্তকে চিনিত; সে যষ্টি দেখিয়া বিশেষ ভীত হওয়ার কোনো লক্ষণ প্রকাশ করিল না। কেবল আমার মুখপানে চাহিয়া হাই তুলিয়া, একটু সরিয়া বসিল। বলিল ‘মেঁও!’ এরপরেই কমলাকান্ত যেন দিব্যচক্ষুর মতো দিব্যকর্ণ পেয়ে গেলেন। ওই ‘মেঁও’-এর পেছনে বেড়ালের বক্তব্যটি পরিষ্কার শুনতে পেলেন।

এইটুকু হলো আমার বক্তৃতার সূচনা বা গৌরচন্দ্রিকা। যাঁরা ‘বিড়াল’ পড়েছেন ও যাঁরা পড়েন নি তাঁদের দুপক্ষকেই রচনাটির চালচিত্র মনে করিয়ে দেওয়া বা জানানোর জন্যে। এরপর শুরু হয় বেড়ালের লম্বা এক ভাষণ। সেটিই এই রচনাটিকে বিশেষ এক তাৎপর্য দেয়। বেড়ালের মুখ দিয়ে বঙ্কিম ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিএর জোসেফ প্রুধোঁ  (১৮০৯-৬৫)-র মতটি হাজির করেন।

সম্পত্তি কী (১৮৪০) নামে একটি বইয়ে প্রুধোঁ ঘোষণা করেছিলেন: ‘সম্পত্তি মানে চুরি।’ অবশ্য তিনিই প্রথম একথা বলেন নি। তাঁর আগেও এধরনের কথা শোনা গেছে। তবে প্রুধোঁর দৌলতেই কথাটি ব্যাপক ভাবে চালু হয়। ‘বিড়াল’ লেখার আগে সাম্য (দ্বিতীয় সংখ্যা)-য় বঙ্কিম প্রুধোঁকে ‘রূসোর মানস শিষ্য’ বলে পরিচয় দিয়েছেন আর তাঁর বিখ্যাত কথাটিকে হাজির করেছেন এইভাবে: অপহরণেরই নাম সম্পত্তি (বঙ্গদর্শন, আষাঢ় ১২৮০, পৃ. ১১৯)। রূসো বলেছিলেন: যে-লোক প্রথমে জমির কোনো টুকরো দাগিয়ে বলেছিল, এটা আমার, সে-ই সমাজকর্তা। যদি কেউ তাকে উঠিয়ে দিয়ে বলত, ‘এই লোকটি ঠগ, তোমরা ওর কথা শুনো না, পৃথিবী কারুর না, তার ফসল সকলেরই’, সে মানব জাতির অশেষ উপকার করত। রূসোর এই কথাটি কিন্তু তাঁর বিখ্যাত বই, সামাজিক চুক্তি (১৭৬৪)-তে নেই, আছে মানুষের মধ্যে অসাম্য উৎপত্তি ও ভিত্তি (১৭৫৫) বইটিতে।

আবার বিড়াল-এই ফেরা যাক।

বেড়ালের যুক্তি খুবই সরল: সাধ করে কেউ চোর হয় না। চুরি করার দরকার নেই বলেই কিছু লোক চুরি করে না। কিন্তু দরকারেরও বেশি ধন থাকতেও সে চোরের দিকে মুখ তুলে চায় না; এতেই চোরে চুরি করে। অধর্ম চোরের নয়— চোরে যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর।

বেড়ালের অভিযোগ: চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তার চেয়ে শত গুনে দোষী। চোরের শাস্তি হয়; চুরির মূল যে কৃপণ তার শাস্তি হয় না কেন? কমলাকান্তকে একটু তোয়াজ করে বেড়াল বলে চলে: তুমি কমলাকান্ত, দূরদর্শী, কেননা আফিমখোর, তুমি কি দেখতে পাও না যে বড়লোকের দোষেই গরিব চোর হয়? এখানে একই সঙ্গে রসিকতা আর সমাজবিজ্ঞান চমৎকার মিলে গেছে। আফিমখোর হলে দুরদর্শী হয়— এটি বেড়ালের অভিনব আবিষ্কার। কিন্তু রসিকতাতেই ব্যাপারটা শেষ হয় না। বেড়াল দাবি করে: পাঁচশ গরিবকে বঞ্চিত করে একজনে পাঁচশ লোকের খাবার জড়ো করবে কেন? যদি তা-ই করল, তবে সে তার যা যাওয়ার তা খেয়ে যা গড়িয়ে পড়ে, গরিবকে তা দেবে না কেন? যদি না দেয় তবে গরিব অবশ্যই তার কাছ থেকে চুরি করবে; ‘কেন না, অনাহারে মরিয়া যাইবার জন্য এ পৃথিবীতে কেহ আইসে নাই।’

বেড়ালের গোটা বক্তৃতার সুর বেশ চড়া। সব শেষে ঝঙ্কারের মতো বেজে ওঠে এই বাক্যটি: না খেয়ে মরার জন্যে কেউ এ দুনিয়ায় আসেনি। ভারতের ইতিহাসে কথাটি শুধু নতুন নয়, একেবারেই অভাবিত। না-খেয়ে মরা তো পূর্বজন্মের কর্মফল; একান্তভাবেই ব্যক্তির নিজের দোষ। হাজার হাজার বছর ধরে এই কথাই মানুষ শুনে এসেছে। সেখানে মানুষের অধিকার নিয়ে এমন ঘোষণা উনিশ শতকের পাঠককে কেমন ও কতখানি ধাক্কা দিয়েছিল তার পরিমাপ এখন আর সহজ নয়।

এই অবধি একরকম হলো। কমলাকান্তের ওপর কী প্রভাব পড়ল এই বক্তৃতার? প্রভাব সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। বেড়ালের সঙ্গে একমত হওয়ার বদলে কমলাকান্ত হয়ে ওঠেন স্থিতাবস্থার সমর্থক ও মুখপাত্র। বেড়ালের কথা সহ্য করতে না পেরে তিনি বলে ওঠেন; ‘থাম! থাম মার্জ্জার পণ্ডিতে! তোমার কথাগুলি ভারি সোশিয়ালিষ্টিক! সমাজ-বিশৃঙ্খলার মূল!’ এইখানেই একটা গোলমাল হয়ে যায়। সম্পত্তি যে চুরি— এই কথাটি প্রুধোঁর। তিনি আদৌ সমাজবাদী ছিলেন না, ছিলেন নৈরাজ্যবাদী। বেড়ালের বক্তব্যও নৈরাজ্যবাদী প্রচারের সঙ্গে মেলে।

সকলেই জানেন, কিন্তু বোধহয় খেয়াল করেন না: আদর্শ রাজ্য বা ইউটোপিআ দু’ধরনের হয়। ১. সর্বসাধারণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যেখানে বহাল থাকে; ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু নেই, তাই চোরের হাতে কিছু খোয়া যাওয়ারও ভয় নেই (যেমন রামায়ণ-মহাভারত-এ উত্তরকুরু বলে দেশটি); ২. স্রেফ বড়লোকদের ইউটোপিআ, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ইত্যাদি সবই আছে (যেমন ছান্দোগ্য উপনিষদ-এ কেকয় নামক জনপদ)। অশ্বপতি গর্ব করে অন্য রাজ্যের লোকদের বলেন, আমার জনপদে চোর নেই, কদর্য (শঙ্করাচার্যর মতে অদাতা, মতান্তরে কৃপণ) নেই, মদ্যপ নেই ইত্যাদি (ছান্দোগ্য ৫।১১।৫)। চোর না-থাকাটা নিঃসন্দেহে বড়লোকের ইউটোপিআর চরিত্র লক্ষণ। সমস্যা হচ্ছে প্রুধোঁ আদপেই সোশিয়ালিস্ট ছিলেন না; তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তার নাম ছিল মিউচুয়ালিজ্‌ম্। একে সোশিয়ালিজ্‌ম্‌-এর কোনো রূপ বলা যায় কিনা তাতেই সন্দেহ আছে। সম্পত্তি বলতে প্রুধোঁ বুঝতেন; পুঁজিবাদী সম্পত্তি, যেটি অন্যায় সঞ্চয় ও শোষণের ফল। ছোটোখাটো সম্পত্তিতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। প্রুধোঁ যা চাইতেন তা পুঁজিবাদও নয়, সমাজবাদও নয়, দুইয়ের মাঝামাঝি একটা ব্যবস্থা। চাষিদের মধ্যে সমস্ত জমি ভাগ করে দেওয়া হবে, ব্যাবসা-বাণিজ্য চলবে পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সমাজবাদের চেয়ে পুঁজিবাদের সঙ্গেই তার অর্থনৈতিক চিন্তার মিল বেশি। প্রুধোঁ-কে তার মতবাদকে সোশিয়ালিস্টিক বলা ভুল, খুবই কাঁচা ভুল। বঙ্কিম এই ভুলটিই করেছিলেন। আর তার ফলে কয়েক লক্ষ বাঙালি পাঠক প্রুধোঁর মতকেই সমাজবাদ বলে ধরে নিয়েছেন। অবশ্য শুধু আমাদের দেশে নয়, ইওরোপে প্রুধোঁ-র কথাটি ভুল বোঝা হয়েছিল। একটি কার্টুন-এ দেখা যায়: গাঁইতি হাতে প্রুধোঁ সম্পত্তি ধ্বংস করছেন। অথচ এরকম কোনো দুর্বাসনাই প্রুধোঁ-র ছিল না। মার্কসীয় সমাজবাদের বিকল্পে তিনি সীমিত রূপে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।

নৈরাজ্যবাদ-কে সমাজবাদ বলে ভুল করা সত্ত্বেও ‘বিড়াল’ বাঙলা সাহিত্যে একটি অনন্য রচনা। বেড়ালের যুক্তির কাছে কমলাকান্তকে হার মানতে হয়। তিনি তখন বেড়ালকে বুঝিয়ে বলেন: যার যত ক্ষমতা সেই যদি তত ধন সঞ্চয় করতে না-পায়, কিংবা সঞ্চয় করেও চোরের জ্বালায় নির্বিঘ্নে ভোগ করতে না-পায়, তবে কেউ আর ধন সঞ্চয়ে যত্ন করবে না, তাতে সমাজের ধন বাড়বে না।

এই হলো বড়লোকি যুক্তি। বেড়াল কিন্তু এককথায় এর ফাঁকিটা ধরিয়ে দেয়: না হলো তো আমার কী? সমাজের ধন বাড়ার মানে বড়লোকের ধন বাড়া। বড়লোকের ধন না-বাড়লে গরিবের কী ক্ষতি? কমলাকান্ত আবার বড়লোকের হয়ে সাফাই গান: সামাজিক ধনবৃদ্ধি ছাড়া সমাজের উন্নতি নেই। এতে এতটুকু না-ঘাবড়ে বেড়াল উলটে রাগ করে বলে। আমি যদি খেতে না পেলাম, তবে সমাজের উন্নতি নিয়ে কী করব?

কমলাকান্ত তারপর লেখেন: ‘বিড়ালকে বুঝান দায় হইল। যে বিচারক বা নৈয়ায়িক, কস্মিন কালে কেহ তাহাকে কিছু বুঝাইতে পারে না, এ মার্জ্জার সুবিচারক, এবং সুতার্কিকও বটে, সুতরাং না বুঝিয়ার পক্ষে ইহার অধিকার আছে।’

এইভাবেই বঙ্কিম বেড়ালকে দিয়ে বড়লোকের তরফদার, কমলাকান্তকে পান পদে নাকাল করেন। কমলাকান্ত হার স্বীকার করতে বাধ্য হন। কিন্তু তিনি অন্য ধাতুতে গড়া, মচকালেও ভাঙেন না। তিনি লেখেন: ‘বিজ্ঞ লোকের মত এই যে, যখন বিচারে পরাস্ত হইবে, তখন গম্ভীরভাবে উপদেশ প্রদানারম্ভ করিবে। আমি সেই প্রথানুসারে মার্জ্জারকে বলিলাম যে, “এ সকল অতি নীতিবিরুদ্ধ কথা, ইহার আন্দোলনেও পাপ আছে। তুমি এ সকল দুশ্চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া ধর্ম্মাচারণে মন দাও। তুমি যদি চাহ, তবে পাঠার্থে তোমাকে আমি নিউমান ও পার্কারের গ্রন্থ দিতে পারি।”

‘দুশ্চিন্তা’ মানে আক্ষরিক অর্থে কুচিন্তা, যা কিনা ধর্মীয় আচরণের বিরোধী। অধার্মিকতার দাওয়াই হিসেবে কার্ডিনাল জন হেনরি নিউমান (১৮০১-৭০) আর থিওডর পার্কার (১৮১০-৬০)-এর নাম দুটি দেখে বেশ মজা লাগে। এঁরা দুজনেই ছিলেন উনিশ শতকের খ্রিস্টান ধর্মগুরু। প্রথমজন ইংল্যান্ড-এর দ্বিতীয়জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-র। ‘খ্রিস্টান’ বলতে অবশ্য কখনও একই ধরনের মানুষ বোঝায় না, তাঁদের মধ্যে শ-এ শ-এ (হয়তো বা হাজারে হাজারে) সম্প্রদায় ও সেগুলির উপসম্প্রদায় আছে। নিউমান প্রথমে ছিলেন চার্চ অফ ইংল্যান্ড (প্রেটেস্টান্ট) সম্প্রদায়ভুক্ত ধর্মতত্ত্ববিদ; পরে তিনি ক্যাথলিক ধর্মমতে দীক্ষা নেন আর সেই মতই প্রচার করেন। অন্যদিকে পার্কার ছিলেন মার্কিন একত্ববাদী (ইউনিটেরিয়ান) খ্রিস্টান ধর্মযাজক— নিউমান-এর দলের নন। শুধু ধর্মতত্ত্ববিদ নন, তিনি ছিলেন সক্রিয় যাজক; সামাজিক পীড়নের বিরুদ্ধে জোর গলায় নিজমত প্রচার করতেন। নিউমান এসব ব্যাপারে বড় একটা মুখ খুলতেন না, মাথাও ঘামাতেন না। ধর্ম তাঁর কাছে একান্তই অন্তরের বিষয়, সমাজ-সংসারের গতিবিধির সঙ্গে তার যেন কোনো যোগ নেই।

এরকম দুজন খ্রিস্টীয় ধর্মগুরুর নাম করে বেড়ালকে কমলাকান্ত অপ্‌শন-এর সুযোগ দেন। তবে একটা শর্ত আছে: আর কখনও অন্য লোকের ঘরে ঢুকে হাঁড়ি খেতে পারবে না; খিদেয় যদি নিতান্ত অধীর হও, তবে আবার এসো, ‘এক সরিষা ভোর আফিংগ দিব’। ‘সরিষা ভোর’ মানে একটি সরষে দানার পরিমাণ, অর্থাৎ খুবই অল্প। তাতে অবশ্য বেড়ালের মন গলে না। আফিঙ-এ তার বিশেষ দরকার নেই; তবে হাঁড়ি খাওয়ার কথা, খিদে অনুসারে বিবেচনা করা যাবে। এখানে কোনো কোনো পাঠকের হয়তো আফিঙ-এর সঙ্গে ধর্মর তুলনার কথা মনে পড়বে। কার্ল মার্কস-এর যৌবনে, হেগেল বিষয়ক একটি লেখার (১৮৪৩) ধর্মকে ‘জনসাধারণের আফিঙ’ বলা হয়েছে। কিন্তু সে-আফিঙ নেশার জিনিস নয়, বেদনানাশক হিসেবে তার ব্যবহারটি মার্কস বোঝাতে চেয়েছিলেন। রচনাটির আগের ও পরের কথাগুলি মিলিয়ে দেখলে সেই মানেই করতে হয়। বঙ্কিম কোনোদিনই মার্কস-এর লেখা পড়েননি। সুতরাং তাঁর বেলায় আফিঙ আর ধর্মর সমীকরণ করা ঠিক হবে না। বরং যে-কথা দিয়ে ‘বিড়াল’ শেষ হয় সেটি নজর করার মতো: ‘মার্জ্জার বিদায় হইল। একটি পতিত আত্মাকে অন্ধকার হইতে আলোকে আনিয়াছি, ভাবিয়া কমলাকান্ত পাদ্রির বড় আনন্দ হইল।’ (কমলাকান্তের দপ্তর বই হয়ে বেরানোর সময়ে ‘পাদ্রি’ কথাটি বাদ পড়ে।)

এই আনন্দ অবশ্য অকারণ; বেড়াল কোথাও কমলাকান্তর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়নি, উল্‌টে সমানে তক্ক করে গেছে। কিন্তু কমলাকান্তর মনে হয়: একজন অধার্মিককে তিনি ধর্মপথে এনেছেন। এই অন্ধকার থেকে আলোয় আনা-র সঙ্গে অবশ্য ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১/৩/২৮)-র কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নেহাতই পাদ্রিদের প্রচার-ভাষণের ব্যঙ্গ।

সব মিলিয়ে ‘বিড়াল’ তাই বঙ্কিমের এক অপরূপ সৃষ্টি। ভাববস্তুর দিক থেকেও বটে, বিদ্রুপ-রচনা হিসেবেও বটে। একটি নৈরাজ্যবাদী মতকে সমাজবাদী মত হিসেবে চালিয়ে দিলেও, আর্থিক অসাম্য আর বঞ্চনার দিকটি তিনি ভালোভাবেই তুলে ধরেছিলেন। ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ আর ‘সাম্য’-র পাশাপাশি ‘বিড়াল’ও একযোগে পড়ার মতো।

সবশেষে দুটি কথা।

প্রথম কথা, আমার বিশ্বাস: যত লোক কমলাকান্তের দপ্তর পড়েছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি লোক পড়েছেন ‘বিড়াল’। তার কারণ: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট বেঙ্গলি সিলেকশন্‌স্ (প্রথম প্রকাশ ১৯২৪)-এ অন্তত ১৯৩৮ (পঞ্চম সং) থেকেই ঐ ‘বিড়াল’ রচনাটি ছিল; কোনো কোনো বছর পাঠক্রমেও সেটি থাকত। বোধহয় ১৯৪৮-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল: ‘হোয়াট ডিড কমলাকান্ত টেল হিস ইন্টারলোকিউটর. . .?’ (তখনও বাঙলার প্রশ্নপত্র হতো ইংরিজিতে)। কলেজে কলেজে পরীক্ষার হল-এ গুঞ্জন: ‘ইন্টারলোকিউটর আবার কী বস্তু!’

শেষে সাব্যস্ত হলো বেড়ালের দুটো ইংরিজি হয়: ক্যাট আর ইন্টারলোকিউটর। আসলে ইন্টারলোকিউটর মানে: পারস্পরিক আলোচনায় যাঁরা যোগ দেন। খুবই কেতাবি শব্দ। সে যা-ই হোক, সাম্য-র চেয়ে ‘বিড়াল’ কিন্তু পুরুষানুক্রমে— এখন যাকে বলে প্রজন্মর পর প্রজন্ম ধরে— কিঞ্চিৎ শিক্ষিত বাঙালিকে সোশালিজ্‌ম্‌-এর শিক্ষা দিয়েছে, তার প্রতি সহানুভূতি জাগিয়েছে। অবশ্যই ভুল শিখিয়েছে, সোশালিজ্‌ম্‌-এর নামে শিখিয়েছে অ্যানারকিজ্‌ম্‌। পুঁজিবাদের শ্রেণি-সম্পর্ক বোঝায়নি, আটকে থেকেছে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বড়লোক আর গরিব-এ। সাম্য-তে সোশালিজ্‌ম্‌, কমিউনিজ্‌ম্‌-এর কথা ছিল, ‘বিড়াল’-এর চেয়ে বিস্তৃতভাবেই ছিল। কিন্তু সে হলো ভাবগম্ভীর প্রবন্ধ, আর ‘বিড়াল’ রসে টইটুম্বুর। তাই নিতান্ত অন্যমনস্ক পাঠকের মনেও ‘বিড়াল’-এর ছাপ অনেক, অনেক বেশি; সেটি থেকেও যায় কমবেশি পাকা হয়ে।

দ্বিতীয় কথাটি আরও মোক্ষম। বঙ্কিম-কে একটু সরিয়ে রেখে যদি শুধু ‘বিড়াল’ রচনাটির দিকে তাকান, তাহলে একটি ব্যাপার খেয়াল করতে হয়। লেখক তাঁর মত পাল্টাতেই পারেন, কিন্তু আগের মতের লেখাগুলি যদি থেকে যায়, তবে শুরু হয় সেগুলির এক নতুন জীবন। লেখক নন, লেখাই হয়ে ওঠে আসল। আর ‘বিড়াল’-এর ক্ষেত্রে সেটিই ঘটে। উনিশ শতকে একে বলা হতো: এ নিয়তির পরিহাস, কেউ কেউ এর সঙ্গে একটি বিশেষণ জুড়তেন: নিয়তির নির্মম পরিহাস। আসলে এটি অবশ্য আইরনি অফ ফেট-এর বাংলা তর্জমা। কমলাকান্ত যাকে উদ্ধার করে আনন্দ পায়, সেই বেড়ালই কিন্তু পাঠকদের মন জয় করে চলল দেড়শ বছর হবে। বঙ্কিমের মতামত পরে যতই ঘুরে যাক, ‘বিড়াল’ কিন্তু তার অবস্থানে অচল, অটল হয়ে রইল। আজও ভুল করে সেটি ঠিক বার্তা দিয়ে চলে: ‘অনাহারে মরিয়া যাইবার জন্য এ পৃথিবীতে কেহ আইসে নাই।’

—লেখাটি অমিয় রায়চৌধুরী স্মারক বক্তৃতার লিখিত রূপ।

 


প্রকাশের তারিখ: ১৮-অক্টোবর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

বঙ্কিম-এর অসাধারণ লেখার অপরূপ, সময়োপযোগী বিশ্লেষণ। যা রামকৃষ্ণবাবুর ট্রেডমার্ক। মনে পরলো, দেশ তো অধুনা বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আফগানিস্তানের থেকে এগিয়ে। নিশ্চিত বেয়াড়া সব প্রশ্ন। কমলাকান্তের উত্তরসূরী না আমরা !
- শ্যামলকুমার চক্রবর্তী, ১৮-অক্টোবর-২০২২


অনেক ভালো লেগেছে। লেখাটি যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক। মূলত, বড়লোকের বড়লোকি হাজার শ্রমিকের গায়ের রক্ত ও ঘামে। "কার্ল মার্কস-এর যৌবনে, হেগেল বিষয়ক একটি লেখার (১৮৪৩) ধর্মকে ‘জনসাধারণের আফিঙ’ বলা হয়েছে। " কোট-টি ভালো লেগেছে, কারন, অনেকেই এটি মিসএন্টারপ্রেট করে। "দুনিয়ায় মজদুর একব হও"
- শান্ত, ২০-ডিসেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪