সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুখোমুখি কমিউনিস্ট ও দক্ষিণপন্থী প্রার্থী
পাবলো মেরিগুয়েত
অর্থনীতির ভাষায় বললে, মধ্য-বাম জোটের প্রার্থী জারার প্রস্তাব হল শ্রমিকদের মাসে ন্যূনতম বেতন হবে ৭৫০,০০০ পেসো (প্রায় ৮০০ মার্কিন ডলার)। এর ফলে শ্রমিক পরিবারগুলির মাসে একটা স্থির আয়ের ব্যবস্থা করা যাবে। তাঁর আরও প্রস্তাব ‘ভাইটাল ইলেকট্রিসিটি কনজামপশন’ চালু করা ও কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়া। এতে বেশির ভাগ দুঃস্থ পরিবারের অর্থনীতির হাল ফিরবে। ইউনিয়নের মাধ্যমে যৌথ দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চান তিনি। এবং পেনশন সংস্কারের মাধ্যমে যে অগ্রগতি হয়েছিল তাকে টিকিয়ে রাখতে চান। এই সব নীতিতেই সম্প্রতি সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে তাঁর জোট।

রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। এই ভোটের ফলাফলেই নির্ধারিত হবে কে বসবেন চিলির প্রেসিডেন্ট পদে— চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য জ্যানেট জারা, নাকি চরম দক্ষিণপন্থী প্রার্থী হোসে অ্যান্তনিও কাস্ট। আন্দিজ পাহাড় এলাকার এই দেশটি শাসনের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কর্মসূচি সামনে রেখেছেন বিপরীত মতাদর্শের দুই প্রার্থী। মতাদর্শের একেবারে পরস্পর বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা। জ্যানেট চিলির কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিসি)–র সদস্য। পিসিসি একই সঙ্গে মধ্য–বাম জোট ইউনিডাড পোর চিলে–র শরিক। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় তিনি পেয়েছেন ২৬.৮৬ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে চরম দক্ষিণপন্থী হোসে আন্তনিও কাস্ট পেয়েছেন ২৩.৯৩ শতাংশ বৈধ ভোট। তার মানে কাস্ট জ্যানেটের তুলনায় খুব একটা পিছিয়ে নেই।
তৃতীয় স্থানে রয়েছেন মধ্যপন্থী ফ্র্যাঙ্কো প্যারিসি। পেয়েছেন ১৯.৭১ শতাংশ ভোট। এর পরেই রয়েছে দক্ষিণপন্থী ব্যক্তি স্বাধীনতাবাদী প্রার্থী জোহানেস কাইজার। পেয়েছেন ১৩.৯৪ শতাংশ ভোট। এবং দক্ষিণপন্থী প্রার্থী এভেলিন মাট্টেই পেয়েছেন ১২.৪৭ শতাংশ ভোট।
সেকারণে দ্বিতীয় দফার ভোট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, দক্ষিণপন্থীরা তাদের টুকরো টুকরো হওয়া অনেক ভোট এক সঙ্গে জড়ো করতে সক্ষম হবে। তবে জারাও রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থীদের অনেক ভোট পেতে পারেন। কারণ তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচির অত্যন্ত মডারেট একটা ভাষ্য হাজির করেছেন। তাছাড়া, মধ্যপন্থীরা কাস্টের উগ্র–লিবারাল এবং রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী। সব মিলিয়ে এ-কথা বলা যায় যে, পুরো গল্পটা এখনও লিখে ফেলা হয়নি এবং চমক জাগানোর মতো উপাদান এখনও রয়েছে।
জারার সমাজ গণতান্ত্রিক প্রস্তাবসমূহ
জারা ঘোষণা করেছেন মধ্য–বাম জোটের অনুসরণ করা কয়েকটি ইস্যু তিনি চালিয়ে যাবেন। এবং বাকি ইস্যুগুলিকে আরও গভীরে নিয়ে যাবেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এমন কাঠামো গড়ে তোলা যার মধ্যে রাষ্ট্রকে তিনি শক্তিশালী করবেন যাতে চিলির সবচেয়ে অভাবী মানুষের সমস্যাগুলির সমাধান করা যায় এবং তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়। এটা করতে না-পারলে তার মানে দাঁড়াবে, তিনি যে বেসরকারি সেক্টরের সঙ্গে বোঝাপড়ার কথা বলছেন তাদের স্বার্থের কাছে জোটের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া।

অর্থনীতির ভাষায় দেখলে, জারার প্রস্তাব হল শ্রমিকদের মাসে ন্যূনতম বেতন হবে ৭৫০,০০০ পেসো (প্রায় ৮০০ মার্কিন ডলার)। এর ফলে শ্রমিক পরিবারগুলির মাসে একটা স্থির আয়ের ব্যবস্থা করা যাবে। তাঁর আরও প্রস্তাব ‘ভাইটাল ইলেকট্রিসিটি কনজামপশন’ চালু করা ও কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়া। এতে বেশির ভাগ দুঃস্থ পরিবারের অর্থনীতির হাল ফিরবে। ইউনিয়নের মাধ্যমে যৌথ দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চান তিনি। এবং পেনশন সংস্কারের মাধ্যমে যে অগ্রগতি হয়েছিল তাকে টিকিয়ে রাখতে চান। এই সব নীতিতেই সম্প্রতি সবুজ সংকেত দিয়েছে তাঁর জোট।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
অভ্যন্তরীণ নীতির কথা ধরলে জারার প্রস্তাব, বেশ কিছু ব্যাঙ্কিং অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা তিনি তুলে দিতে চান যাতে টাকা নয়ছয় বন্ধ করা যায়। এটা চিলির একটা ক্রমবর্ধমান সমস্যা। তিনি আরও বলেছেন যে, তিনি বন্দুকের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করবেন যাতে বেশ কিছু অপরাধী গ্যাংয়ের ক্ষমতা কমানো যায়। চিলিতে এখন মাদক পাচার বেড়েছে এবং তাতে জড়িত এই গ্যাংগুলি। জারার অভিবাসন সংক্রান্ত প্রস্তাব কাস্টের মতো নয়। জারা সব বিদেশিকে বহিষ্কার করতে চান না। তবে অভিবাসীদের অস্থায়ীভাবে ৬ মাসের জন্য নথিভুক্ত করাতে চান। তবে একথাও তিনি বলেছেন যে, জাতীয় পুলিশ বাহিনী এবং দরকারে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে সীমান্তে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে জোরদার করবেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে জারার অবস্থান খুবই বাস্তববাদী। বলেছেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটাবেন। সম্পর্কের উন্নতি ঘটাবেন চীনের সঙ্গেও। চীনই এখন চিলির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। চিলির সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি মনে করেন কিউবা ও ভেনেজুয়েলায় কোনও গণতন্ত্র নেই। তাঁর উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছেন রাজনৈতিক মধ্যপন্থীদের অনেকে। তবে এর ফলে তাঁর নিজের দল পিসিসির অনেক নেতা অস্বস্তিতে পড়েছেন।
কাস্টের নয়া উদারবাদী প্রস্তাব
অন্যদিকে, কাস্ট তাঁর রাজনৈতিক প্রচারে সোচ্চার হয়েছেন বর্তমান বোরিক প্রশাসনের সমালোচনায়। বলেছেন, এই প্রশাসন অকেজো ও দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁর প্রচার ঘোরাফেরা করেছে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী অভিবাসন বিরোধী ভাষ্যকে কেন্দ্র করে।
অর্থনৈতিকভাবে, কাস্ট জাভিয়ের মিলেইয়ের স্বঘোষিত অনুরাগী। তিনি রাষ্ট্রের পরিসর বিপুলভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। ভোটে জিতলে তাঁর সরকার প্রথম ১৮ মাসে সরকারি খরচ কমাবে রেকর্ড ৬০০ কোটি ডলার। এই নীতির সঙ্গে থাকছে চিরায়ত নয়া উদারবাদী সমীকরণ: বড়ো পুঁজির ওপর কর ২৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে করবেন ২৩ শতাংশ। অসংগঠিত অর্থনীতিতে কাজ করেন এমন শ্রমিকদের ভাড়া করবে যে সব কোম্পানি তাদের জন্য আরও বেশি করছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তা নীতিতে কাস্ট পিনোশে ডিক্টেটরশিপের (১৯৭৩-১৯৯০) একনিষ্ঠ অনুরাগী। পুলিশ অফিসারের সংখ্যা এবং পুলিশ বাজেট বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তৈরি করবেন একেবারে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বেশ কিছু জেলখানা। তাঁর ‘বর্ডার শিল্ড’ পরিকল্পনায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সীমান্তে পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হবে। যে সব অভিবাসীর নথি নেই তাদের সকলকে নিজেদের দেশে ফেরানো হবে দেরি না-করে। এই পদক্ষেপটিকে চিলির দক্ষিণপন্থীরা দারুনভাবে সমর্থন করেছে।
চিলির বেশ কয়েকজন কূটনীতিক ও প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী অবশ্য মনে করেন অভিবাসীদের নিয়ে সর্বশেষ প্রস্তাবটি উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ এর জেরে প্রতিবেশী দেশ পেরু ও বলিভিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। মূলত এই দুই দেশ থেকেই অভিবাসীরা আসেন। তাছাড়া কঠোর দক্ষিণপন্থী জনপ্রিয়তাবাদী ভাষ্যের কারণে, কাস্ট কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার সরকারগুলিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে মনে করা হচ্ছে, কূটনীতিতে কাস্ট সরাসরি মর্কিন স্বার্থরক্ষার দিকেই ঝুঁকবেন।

কী বলছে ভোট পূর্ববর্তী সমীক্ষা?
যদিও নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে, তবে ভোট সমীক্ষা থেকে প্রাথমিক কিছু সংখ্যাতথ্য জানা গেছে যা দিয়ে ভোটের আগাম ফলের কিছু ইঙ্গিত মিলতে পারে।
৫ ডিসেম্বর মিডিয়া আউটলেট আরটিভিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটের হিসাব কষে দেখিয়েছিল যে, যদি ওই দিনই ভোট হয় তাহলে কাস্ট পেতে পারেন ৫১ শতাংশ ভোট এবং জারা পেতে পারেন ৩৪.৯ শতাংশ ভোট।
এর মানে জারাকে অন্য প্রার্থীর সমর্থকদের ছিনিয়ে এনে নিজের সমর্থক বাড়াতে হলে প্রতিটি ভোটের জন্য লড়তে হবে। অন্যদিকে কাস্টের শক্তি বাড়ানোর সুযোগ বেশি। কারণ এটা এমন একটা ভোট যেখানে দুপক্ষের মতাদর্শগত অবস্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত (তবে এ-ধরনের অবস্থানের পিছনে ব্যক্তিগতভাবে শিবিরভুক্ত হওয়ার বিষয়টা ততটা জোরাল না। বরং এখানে কাজ করছে প্রত্যাখ্যান ও বিদ্বেষের মনোভাব)।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রচার হয়েছে তীক্ষ্ণ। ব্যক্তিগত আক্রমণও অনেক হয়েছে। ফলে মনে হচ্ছে, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনেতিক বিষয়গুলি পিছনে চলে গিয়ে নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে ব্যক্তিগত আবেগের বিষয়টি।
ভাষান্তর: সুচিক্কন দাস
সূত্র: পিপলস ডিসপ্যাচ
প্রকাশের তারিখ: ১৩-ডিসেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
