Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

আদর্শগত প্রশ্নে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির স্থান

প্রমোদ দাশগুপ্ত
সংশোধনবাদ, বুর্জোয়া মতাদর্শকে মার্কসবাদের নামাবলী পরিয়ে লোককে বিভ্রান্ত করতে চায়। শ্রমিকশ্রেণির পার্টিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। এই সংগ্রামেরও বিভিন্ন স্তর আছে এবং সে কারণেই তার অগ্রাধিকার আছে।
Communist Party of India on Ideological Questions

কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ৭ম পার্টি কংগ্রেসে কর্মসূচী গৃহীত হবার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে যে কর্মসূচী তারা গ্রহণ করলো বটে, কিন্তু বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন প্রশ্নে যে মতভেদ সে সম্পর্কে কোন মত তারা প্রকাশ করেনি। সংশোধনবাদী ডাঙ্গেগোষ্ঠী অপপ্রচার শুরু করলো- এদের মধ্যে এ সম্পর্কে মতভেদ আছে বলেই কংগ্রেসে তা আলোচনা হয়নি, তাই যে কর্মসূচী গৃহীত হলো তাতে গোঁজামিল আছে।

আমাদের সভ্য ও সমর্থকদের মধ্যে এ অপপ্রচার কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পেরেছে; কারণ পার্টি কংগ্রেসের দুমাসের মধ্যেই যখন সর্বভারতীয় নেতৃত্ব প্রায় সবাই ধরা পড়ে গেলেন, তখন কর্মসূচীর বৈপ্লবিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা এবং পার্টিকে তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লো। এই অবস্থায় সরকারের প্রচারযন্ত্রের সহযোগিতায় সংশোধনবাদীদের অপপ্রচার কিছু পরিমাণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে যদি সক্ষম হয়ে থাকে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

সর্বভারতীয় নেতারা মুক্তি পাবার পর তেনালিতে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে আন্দোলন ও সাধারণ নির্বাচনের পর আমরা এ আলোচনা সংগঠিত করবো। সুতরাং আমি এই আলোচনার মধ্যে না গিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সে সম্পর্কে আমাদের কর্মসূচী কী বলে এবং তার স্থান কোথায় তাই বলার চেষ্টা করবো।

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে যে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে মতভেদ দেখা দিয়েছে তা আজ আর অস্পষ্ট নয়। দুটি পরিষ্কার চিন্তাধারা – একটি মার্কসবাদী- লেনিনবাদী চিন্তাধারা ও আর একটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-বিরোধী সংশোধনবাদী চিন্তাধারা, এবং এও দেখা যাচ্ছে যে কিছু কিছু দেশে কমিউনিস্ট পার্টি নেতা ও রাষ্ট্র নেতাদের মধ্যে সংশোধনবাদী চিন্তাধারার ঝোঁক প্রাধান্য লাভ করছে। এবং সেই কারণে ১৯৫৭ ও ১৯৬০ সালের ঘোষণা ও বিবৃতিতে সংশোধনবাদকেই এসময়কার সবচেয়ে বড় বিপদ মনে করা হয়। আমাদের কর্মসূচীকে বিচার করতে হবে, তা কোন্ চিন্তাধারার অন্তর্ভুক্ত; কর্মসূচীর ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই দুটি দলিলের বৈপ্লবিক নীতিসমূহকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং সমস্ত সংশোধনবাদী ও গোঁড়ামির বিচ্যুতির বিপদের বিরুদ্ধে সতর্ক থেকে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে।” লক্ষ্য করতে হবে যে, আমাদের কর্মসূচী- আন্তর্জাতিক দলিল দুটির বৈপ্লবিক নীতিগুলো উর্দ্ধে তুলে ধরছে এবং মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের সংশোধনবাদী ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে পূর্ব ইউরোপের দেশে দেশে জনগণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা; এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের প্রবল মরণ-বিজয়ী আন্দোলন; মহান চীন বিপ্লবের ঐতিহাসিক বিজয় এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবির গঠন— এইসব মিলিয়ে দুনিয়ায় শক্তি-সমাবেশের ভারসাম্য বদলে গেল। তাই এই যুগকে বলা হলো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অবসানের যুগ এবং সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যুগ। সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকবাদ আজ দ্রুত ভেঙে পড়ছে। অনুন্নত দেশগুলোর জাতীয় পুনর্জাগরণের পথ রুদ্ধ করে ইতিহাসের অগ্রগতিকে প্রতিহত করা আজ আর সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সমাজের বিকাশধারায় বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হয়ে দাঁড়িয়েছে চালিকাশক্তি। শক্তির এই ভারসাম্য ও যুগের এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে কোন মতভেদ নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশে দেশে বৈপ্লবিক শক্তিগুলো কী কৌশল অবলম্বন করলে বিপ্লবকে সফলভাবে ত্বরান্বিত করা যাবে, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

সংশোধনবাদীরা বলছে দুনিয়ার বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আজ দাঁড়িয়েছে তিনটি স্বপ্নের উপর যথা- শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান, শান্তিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ। বক্তব্য হিসেবে কোন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী একে অস্বীকার করে না। কারণ শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান বৈপ্লবিক শক্তিকে সংগঠিত হতে সময় দেয়; সাম্রাজ্যবাদ বা ধনতন্ত্র শান্তিতে বাঁচতে পারে না, কিন্তু সমাজতন্ত্র ও বৈপ্লবিক শক্তি শুধু বাঁচাই নয়, আরও শক্তিশালী হয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকটকে আরও তীব্র করে। নিরস্ত্র, অত্যাচারিত, শোষিত জনসাধারণ সবসময়ই কামনা করে শান্তিপূর্ণভাবে তাঁদের লক্ষ্যে পৌঁছতে। কিন্তু কথা হচ্ছে এই কি একমাত্র বক্তব্য বা কৌশল? সংশোধনবাদীদের বক্তব্য আরও পরিষ্কার হবে এই বক্তব্যকে আরও বিশ্লেষণ করলে।

তারা শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানকে কীভাবে দেখেন? প্রথমে তারা একে শ্রেণীসংগ্রামের শ্রেষ্ঠ পর্যায় বলে মনে করেন। কিন্তু লেনিন বলেছেন, শ্রেণীসংগ্রামের শ্রেষ্ঠ পর্যায় হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত তারা বলছেন- হিটলার যদি জানতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার এরকম শোচনীয় অবস্থা হবে তাহলে সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাতো না। তার অর্থ হলো, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বুর্জোয়ারা আর বিশ্বযুদ্ধ বাধাবে না। তাই দুনিয়ার ক্ষেত্রে কৌশল নিতে হবে বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত এবং প্রধান শত্রু আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বুর্জোয়াদের খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের যুদ্ধবাজদের (War-Pentagon) কাছ থেকে আলাদা করতে হবে। তাই আমরা দেখতে পাই আইজেনহাওয়ার, কেনেডি ও জনসনকে শান্তির শক্তি (man of peace) বলা হচ্ছে, এবং চেষ্টা করা হচ্ছে এদের যুদ্ধবাজ ম্যাকনামারা গোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখতে এবং স্বপ্ন দেখা হচ্ছে যে এই যুদ্ধবাজদের থেকে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং তার জন্য শান্তিভাবাপন্ন আমেরিকান রাষ্ট্রনায়কদের আলাদা করা যাবে এবং তখন দুটি প্রধান রাষ্ট্রনায়কদের বিশ্বে শান্তি রক্ষার জন্য মিলন সম্ভব হবে।

শান্তিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে সংশোধনবাদীরা কল্পনা করে থাকেন যে, অনুন্নত দেশের জাতীয় বুর্জোয়ারা দুই সমাজ-ব্যবস্থার অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নেবে। সমাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি, সমাজতান্ত্রিক শিবিরে নিঃস্বার্থ সাহায্য, ক্রমশ ক্রমশ এই সব অনুন্নত দেশে জাতীয় বুর্জোয়াদের নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও অ-ধনতান্ত্রিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে দেবে। এই অ-ধনতান্ত্রিক কথাটির সঠিক অর্থ আজও ঠিক করা যায়নি। যেখানে একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ হয়েছে সেখানেও নাকি জাতীয় বুর্জোয়ার নেতৃত্বে অধনতান্ত্রিক বিকাশের সম্ভাবনা আছে!

এই পরিপ্রেক্ষিতে (perspective) সংশোধনবাদীরা বলেছেন, বিশ্বে মানুষ যখন দেখতে পারবে একটি ক্ষয়িষ্ণু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আর একটি ক্রমবর্ধমান সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তখন তাদের ভালটি বেছে নিতে কষ্ট হবে না। কল্পনা করতে হবে— আমেরিকার সদবুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, শান্তিকামী রাষ্ট্রনায়করা বিশ্বে শান্তিরক্ষার জন্য সমাজতন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তিরক্ষা করছে; অনুন্নত দেশের জাতীয় বুর্জোয়ারা ক্রমবর্ধমান সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আকৃষ্ট হয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অধনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশকে গড়ে তুলছে এবং তার সাথে যোগ দিচ্ছে কোটি কোটি মানুষ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে বেছে নেওয়ার জন্য— তখন আর রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের প্রয়োজন হবে না। তাই শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতেই সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব হবে।

এখন দেখা যাক, এই সংশোধনবাদী বিশ্ব-বিপ্লবের পরিকল্পনার সাথে আমাদের দেশের সংশোধনবাদী ডাঙ্গে-গোষ্ঠীদের কোথায় মিল রয়েছে। তাদের কর্মসূচীর প্রধান বক্তব্য হলো :

(১) বর্তমান সরকার হলো জাতীয় বুর্জোয়ার সরকার অর্থাৎ অনুন্নত দেশের জাতীয় বুর্জোয়া সরকার।

সুতরাং শ্রমিকশ্রেণীর কর্তব্য হলো দুষ্ট প্রভাব থেকে একে মুক্ত করা অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রভাব থেকে একে মুক্ত করতে পারাটাই হচ্ছে প্রধান কাজ। তাই আমরা শুনতে পাই “অশোক বনে সীতা বন্দী” এবং রাক্ষসের হাত থেকে এই সীতাকে মুক্ত করতে হবে।

তখন মুক্ত প্রগতিশীল সীতার, অর্থাৎ অনুন্নত দেশের জাতীয় বুর্জোয়ার সাথে শ্রমিকশ্রেণির মিলনের সম্ভাবনা হবে, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা (Sharing of Power) হবে। এবং তারা যে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করবে তা হবে অধনতান্ত্রিক। এবং তা-ই একদিন অজান্তে সমাজতন্ত্রে পর্যবসিত হবে। এই সীতাদের ক্ষমতা থেকে সরাবার দরকার নেই। শুধু রাক্ষসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেই মিলন সম্ভব হবে। সুতরাং শ্রমিকশ্রেণির কাছে প্রধান কর্তব্য হলো সীতাদের রাক্ষসের হাত থেকে বাঁচানো।

আমাদের কর্মসূচী কি এই পরিপ্রেক্ষিত উপস্থিত করেছে? আমাদের কর্মসূচীতে বর্তমান সরকারের চরিত্র সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করার পর একে হটাবার জন্য বলিষ্ঠ আহ্বান দিচ্ছে। সাথে দেখিয়ে দিয়েছে কারা বিপ্লবের মিত্রশক্তি এবং তার চালিকাশক্তি কে, রাষ্ট্র ক্ষমতা কাদের হাতে আসবে এবং তার চালিকাশক্তি কে। এখানে ক্ষমতা ভাগবাটোয়ারার (Sharing of Power) কোন কথা নেই। বরং দেশকে পুনর্গঠিত করতে হবে জনগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যা সমাজতন্ত্র গড়ার ভিত্তিস্থাপন করবে। এ সম্পর্কে আমাদের পার্টির সাপ্তাহিকে বিস্তারিত আলোচনা ও তুলনামূলক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই এই প্রবন্ধে সে বিষয়ে আর আলোচনা করা হলনা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কলকাতায় ৭ম কংগ্রেসে যে কর্মসূচী গ্রহণ করেছে তাতে সংশোধনবাদের সাথে রফা করা হয়নি। তা মার্কসবাদ- লেনিনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং আন্তর্জাতিক দুটি দলিলের বৈপ্লবিক নীতিসমূহকে অবলম্বন করেই গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে আমাদের যখন সংশোধনবাদ থেকে মুক্ত এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত তখন আবার আলোচনার দরকার কি? এ প্রশ্নের জবাব দেবার আগে সংশোধনবাদের প্রভাব সম্পর্কে দু-একটা কথা বলে নিতে চাই।

সংশোধনবাদ, বুর্জোয়া মতাদর্শকে মার্কসবাদের নামাবলী পরিয়ে লোককে বিভ্রান্ত করতে চায়। শ্রমিকশ্রেণির পার্টিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। এই সংগ্রামেরও বিভিন্ন স্তর আছে এবং সে কারণেই তার অগ্রাধিকার আছে। প্রথমে শ্রমিকশ্রেণিকে রাষ্ট্রক্ষমতা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে বুর্জোয়ার হাত থেকে নিজেদের হাতে নিয়ে আসতে হবে। তাতেই বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হয় না। সে নিরস্ত্র হয় কিন্তু সংগ্রাম করার ক্ষমতা তার থেকে যায়। সমাজের উপর তার প্রভাব বিভিন্নভাবে থেকে যায়। ধর্মীয় মনোভাব, সাম্প্রদায়িক মনোভাব, জাতীয়তাবাদী মনোভাব ইত্যাদি সব কিছুই বুর্জোয়া মতবাদকে বজায় রাখতে সাহায্য করে। বুর্জোয়া রাষ্ট্রে যে সাংস্কৃতিক প্রভাব সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সাথে আপনা-আপনিই চলে যায় না। তার জন্য শ্রমিকশ্রেণিকে সাংস্কৃতিক আদর্শ নিয়ে সংগ্রাম করতে হয়।

আমরা রাজনীতির ক্ষেত্রে সংশোধনবাদের সাথে সংগ্রাম করছি, তাই আমাদের ঘোষণা প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “ডাঙ্গে গ্রুপ কর্তৃক অনুসৃত বুর্জোয়া সংস্কারবাদী নীতিগুলি এবং সংগঠনের ভিতর ঐক্যনাশক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল এই কংগ্রেসে তার প্রথম স্তরের পরিসমাপ্তি হলো”, আমাদের এই কংগ্রেস সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রথম স্তর। এখানে আমরা আমাদের দেশের সংশোধনবাদীদের চিহ্নিত করতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের এখনও অনেক কাজ বাকী রয়ে গিয়েছে।

সংগঠনের ক্ষেত্রে সংশোধনবাদের প্রভাব নিয়ে আমরা আজও আলোচনা করিনি। আন্তর্জাতিক দলিল বলে সংশোধনবাদ সংগঠনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি বিতর্কসভায় পরিণত করে। আমরা আজও বিচার করিনি যে আমাদের পার্টি সংগঠন কতখানি শ্রেণি-সংগ্রামের হাতিয়ারের বদলে বিতর্কসভায় পরিণত হয়েছে। সঠিক কর্মসূচী হলেই হয় না, তাকে কার্যকরী করতে হলে সঠিক সংগঠনের দরকার।

যেহেতু আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব বিশ্ব-বিপ্লবেরই একটি অংশ, সেই হেতু শুধুমাত্র দেশের সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করলেই চলবে না। দেশের বাইরে যে সংশোধনবাদীরা রয়েছে তাদের চিনতে হবে। কারণ তারা আমাদের সরকার সম্পর্কে নানারকম মোহ সৃষ্টি করছে। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংশোধনবাদী নায়করা আমাদের সরকার সম্পর্কে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বক্তব্যর মধ্য দিয়ে মোহ সৃষ্টি করছে। যেহেতু তারা সমাজতান্ত্রিক দেশের নায়ক সেই হেতু তারা জনগণকে বেশি বিভ্রান্ত করতে পারছে। তাই আলোচনায় দরকার তাদের চিনবার জন্য, বোঝবার জন্য এবং বিচার করবার মানদণ্ড হচ্ছে আমাদের কর্মসূচী।

সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমে দরকার একটি সঠিক মার্কসবাদ-লেনিনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত কর্মসূচী, দ্বিতীয়ত চাই সংশোধনবাদ-মুক্ত শ্রেণিসংগ্রামের নীতিতে প্রতিষ্ঠিত একটি পার্টি সংগঠন। তাহলেই আমরা সক্ষম হবো ভিতরের ও বাইরের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে। যাঁরা মনে করছেন একটি আলোচনা দ্বারাই সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ করা যাবে তাঁরা ভুল করছেন। এ লড়াই বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রূপ নেবে। যাঁরা প্রথম স্তরের সংগ্রামে প্রথম সারিতে থাকবেন তাঁদের মধ্যে হয়ত পরের স্তরের সংগ্রামে কেউ কেউ পিছিয়ে পড়বেন। তারই জন্য বলা হয় পার্টি গড়ার ইতিহাস হচ্ছে আন্তঃপার্টি সংগ্রামের ইতিহাস।

আমাদের কর্মসূচী প্রথম স্তরের সংগ্রাম শেষ করেছে। সেখানে কোন রফা করা হয়নি। তেনালিতে আমরা পার্টিকে শ্রেণিসংগ্রামের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার রূপে গড়ে তোলবার সংকল্প নিয়েছি। আসুন, আমরা একাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পূর্ণ করি এবং পরবর্তী স্তরের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হই।

সূত্রঃ দেশহিতৈষী, শারদ, ১৯৬৬


প্রকাশের তারিখ: ৩০-অক্টোবর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪