সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
'সম্রাট' ট্রাম্প ও সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সম্প্রসারণবাদ
আর অরুণ কুমার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একথা বুঝতে পেরেছে যে, তাদের আধিপত্যের সামনে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হল চীন। আমেরিকার নতুন প্রতিরক্ষা সচিব কোনও রকম রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনও দেশ তাদের কাছে বিপদের উৎস নয়। চীন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টিই মার্কিন আধিপত্যবাদকে মোকবিলা করার একমাত্র পাল্টা ও প্রধান শক্তিএবং সেকারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপদস্বরূপ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে চিহ্নিত করে ট্রাম্প প্রশাসন একথা স্বীকার করে নিয়েছে যে সমাজতন্ত্র এবং বামেরাই একমাত্র শক্তি যারা পুঁজিবাদের নির্মম শোষণ ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।

ক্ষমতায় ফিরেছেন ট্রাম্প। বিদেশ নীতি সংক্রান্ত তাঁর ঘোষণা, কিংবা বরং, তাঁর হস্তক্ষেপ, স্পষ্ট করে তুলেছে তাঁর আসল মতলব। প্রথমে ভাবা হয়েছিল তাঁর কথাগুলি যেন পাগলের প্রলাপ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে পূর্ণ গুরুত্ব দিয়েই তিনি এসব ঘোষণা করেছিলেন। ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলা’ ট্রাম্পের এই একথাগুলোর আসল মানে এখন জলের মতো স্পষ্ট।
দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট পদে বসার প্রথম দিনেই ট্রাম্প অনেকগুলি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের একটা হল মেক্সিকো উপসাগরকে আমেরিকান উপসাগর হিসাবে ঘোষণা করা। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টাকে নিরীহ মনে হলেও আসলে তা নয়। এটা আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ মাত্র। ঐতিহাসিক ভাবে, মেক্সিকোর বহু এলাকা জোর করে দখল করে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এখন উপসাগরের নাম বদলে দিয়ে ট্রাম্প পুরনো ইতিহাস মুছে দিয়ে নিজের মতো করে নতুন করে ইতিহাস রচনা করতে চাইছেন।
তবে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর উত্তর দিয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া সিনবাউম। ১৬০৭ সালের একটি ঐতিহাসিক মানচিত্র দেখিয়ে তিনি বলেছেন যে, ইতিহাস ও মানচিত্রের কথা ধরলে সমগ্র উত্তর আমেরিকাকে বলা উচিত ‘মেক্সিকান আমেরিকা।’ ট্রাম্প নাম বদল করার কথা বলামাত্রই সেই হুমকির কাছে মাথা নুইয়ে ম্যাপে মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলে দেওয়ায় গুগলেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট গুগলকে বলেছেন, কোনও দেশের উপকূলরেখাকে ঘিরে থাকা ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকার মানচিত্রে কোনও নাম বদল করা যায় না। এর মানে ট্রাম্প উপসাগরের যে নামবদল করতে চাইছেন, তা উপসাগরের পুরো এলাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তা শুধু আমেরিকার জলসীমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মেক্সিকোর জলসীমায় প্রযোজ্য নয়। এবং সারা বিশ্বের ক্ষেত্রে এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ক্লডিয়া সারা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প এবং তার ঘোষিত নীতির মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে।
পানামা ক্যানাল
পানামা নামে দেশ ও পানামা ক্যানাল নিয়ে আরও খোলাখুলি যে বিবৃতি দিয়েছেন ট্রাম্প, তাতে তাঁর সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা আরও ভালভাবে ফুটে উঠেছে। পানামা ক্যানাল চালায় চীন, তাঁর এই দাবি পুরোপুরি ভুল। বৈষম্য দেখিয়ে মার্কিন জলযান এবং জাহাজের ওপর থেকে বেশি পরিমাণে টোল আদায় করার দাবিটিও ভ্রান্ত। পানামার প্রেসিডেন্ট এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে কী, ট্রাম্প সত্যিটাকে স্বীকার করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি উল্টে পানামাকে হমকি দিয়ে বলেছেন, দরকার হলে শক্তি প্রয়োগ করে পানামা ক্যানাল দখল করে নেবেন। ঘটনা হল, ক্যানালের দেখাশোনা পানামাই করে থাকে এবং টোল আদায়ের ব্যাপারে কোনও রকম বৈষম্যই নেই।
ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে পানামা তার হুমকির কাছে মাথা নত করেছে এবং মার্কিন জাহাজগুলিকে নিখরচায় ক্যানাল পার করে দিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন বিদেশ দপ্তরের এমন দাবি পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন পানামার রাষ্ট্রপতি হোসে রাউল মুলিনো। পানামা ক্যানাল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে যে ‘ফি নিয়ে তারা কোনও রকম রদবদল করেনি।‘ মার্কিন প্রশাসন যেসব বিবৃতি দিচ্ছে ও দাবি করছে, পানামার জনগণ সেসবের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা যে কোনও মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে প্রত্যয়ী। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামায় যে আগ্রাসন চালিয়েছিল সেকথা তাঁরা ভোলেননি এবং বলছেন: ‘আমরা উঠে দাঁড়াই, আমরা প্রতিরোধ গড়ি, আমরা ঐক্যকে জোরদার করি। আমরা এসব করি আমাদের দেশকে ও আমাদের জনগণকে রক্ষা করার জন্য। কারণ এটা শুধুমাত্র ক্যানালের বিষয় নয়, এখানে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।’ এমনকী সোশাল মিডিয়ার এই পোস্টেও পানামার জনগণের প্রত্যয়ের প্রমাণ মিলেছে: ‘কোনও কথাই হবে না —এসব আর কখনই ঘটবে না।‘
কানাডা নিয়ে উদ্ভট ভাবনা
কানাডা নিয়েও ট্রাম্পের একটা বিবৃতি সেদেশের জনগণকে স্তম্ভিত করেছে এবং বিষয়টির দিকে নজর দিতে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চান কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম প্রদেশ হোক। এই বিবৃতি সবাইকে বিস্মিত করে দিয়েছে। কারণ পানামার মতো ছোট দেশ নয় কানাডা। আয়তন ও অর্থনীতির বিচারেই শুধু নয়, কানাডা ন্যাটো জোটেরও সদস্য দেশ। এবং ‘ফাইভ আইজ অ্যালায়েন্স’ এর অন্যতম সদস্য এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলি অপরাধ প্রকল্পের অংশীদারও। এতকিছু সত্ত্বেও ট্রাম্প বেপরোয়া এবং ক্রমাগত সজোরে একই দাবি করে চলেছেন। এর ফলে কানাডা সরকার ধীরে ধীরে একথা বুঝতে পেরেছে যে ট্রাম্প এই বিষয়ে যা বলছেন তা মোটেই হাল্কাভাবে বলছেন না এবং যা বলছেন সেটাই আসলে বোঝাতে চাইছেন। যদি কানাডা প্রশাসনের এর পরেও কোনও সংশয় থেকে থাকে, আমেরিকায় রপ্তানি করা কানাডার সমস্ত পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক চাপানোর ঘটনায় (আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কী ধরনের হবে তা বিবেচনা করার জন্য পরে কানাডাকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে এবং ততদিন বাড়তি শুল্ক চাপানো বন্ধ রাখা হয়েছে) বাস্তব যে কত কঠোর সেব্যাপারে কানাডা প্রশাসনের চোখ খুলে গেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ‘সারা বিশ্ব থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করা হবে তার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে, এবং তা কার্যকর হবে ১২ মার্চ থেকে।‘ এটা কানাডার অর্থনীতির ওপর আরও একটা বড় আঘাত নামিয়ে আনবে।
ট্রাম্পের হুমকিতে ভয় পেয়ে কানাডার ১৩টি প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীরা ওয়াশিংটনে গিয়ে নতুন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেছেন। সেই আলোচনায় তাঁরা যা জানতে পেরেছেন সেটা ছিল তাঁদের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো। ওই ১৩ জন ভেবেছিলেন যে সবাই মিলে গিয়ে মার্কিন প্রশাসনকে বোঝালে বাড়তি শুল্কের বোঝা চাপিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের শাস্তি দেবে না। তবে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড এবি স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন যে, ‘হোয়াইট হাউজের পরামর্শদাতারা আমাদের বলেছেন প্রেসিডেন্ট যে কথাটা বলছেন সেই কথাটাকে প্রকৃত অর্থেই নিতে হবে। সেটা যেন আমরা বুঝে নিই।’
কানাডা যা রপ্তানি করে তার ৭৫ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দু’দেশের অর্থনীতি, বলা যায়, গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বছরে আমদানি করে ৬০ লক্ষ টন কানাডার ইস্পাত এবং ৩০ লক্ষ টনের বেশি অ্যালুমিনিয়াম জাত পণ্য। সেই ১৯৮৮ সালে থেকে, ইউ এস-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে, কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এর ফলে অনেক ধরনের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে যেগুলি আগে কাজে লাগানো যেত এবং তাতে কানাডার মার্কিন-নির্ভরতা বেড়েছে। দুই দেশ ‘একই মূল্যবোধের অংশীদার’ এবং দুদেশের উচিত একসঙ্গে চলা — এই ধরনের নানান বিবৃতি দিয়ে এতদিন কানাডাকে থামিয়ে রাখা হয়েছিল। আর এখন কঠোর বাস্তব কানাডার মুখে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছে।
যদি নিজেদের স্বাধীনতা ও সংহতির প্রশ্নে কানাডাকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে কানাডাকে ভিন্ন পথের কথা ভাবতে হবে। সেদেশের সাধারণ লোকেরা বলছেন যে, স্বাধীনতা ও সংহতি বজায় রাখার জন্য দরকারে মূল্য চোকানোও ভাল। কিন্ত সেদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, যারা শাসক শ্রেণির স্বার্থ দেখে, তারা কতটা মূল্য চোকাতে হবে সেই হিসাব কষতেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পায়ে ধরে ভিক্ষা করছে, বোঝাচ্ছে আমেরিকা যেন তাদের স্বার্থটাও একটু দেখে। যদিও পাল্টা শুল্ক বসিয়ে শোধ নেওয়ার কথাও উঠছে, তবে দেখেশুনে মনে হচ্ছে এসব কথার পিছনে নিষ্ঠা ও সাহস কোনওটাই নেই। ঠিক এইসব কারণেই কানাডার সব প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীদের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে গিয়েছিল দরবার করতে।
গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো ও গাজা
ট্রাম্প নতুন করে এই প্রস্তাবও দিয়েছেন যে তিনি ডেনমার্কের কাছ থেকে ‘গ্রিনল্যান্ড’ কিনে নেবেন। ২০১৯ সালে তিনি প্রথম এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, মার্কিন অর্থনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে, এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও সারা বিশ্বের স্বাধীনতার জন্য’ গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়াটা জরুরি। তিনি বলেছেন, ‘আমি সত্যিই জানি না গ্রিনল্যান্ডর ওপর ডেনমার্কের কী দাবি থাকতে পারে। কিন্ত আমেরিকা গ্রিনল্যান্ড কিনে নেবে এটা যদি ডেনমার্ক আটকায় তাহলে সেটা আদৌ মিত্রসুলভ কাজ হবে না। কারণ মুক্ত দুনিয়াকে রক্ষা করার জন্যই এটা দরকার।’ তিনি এবিষয়ে আত্মবিশ্বাসী যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘এটা পেয়ে যাবে’ এবং উদ্ভট এই দাবিও করেছেন যে, ‘গ্রিনল্যান্ডের লোকেরাও চায় আমাদের সঙ্গে থাকতে।’
এটাও ট্রাম্পের আরেকটা ভুয়ো দাবি। কারণ একটি মিডিয়া এজেন্সি সমীক্ষা করে দেখেছে যে, গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের ৮৫ শতাংশই জানিয়েছেন যে তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকতে চান না। ট্রাম্পের এই অযৌক্তিক দাবির কড়া সমালোচনা করেছে ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড।
শুল্ক প্রসঙ্গে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলেছেন। একইসঙ্গে মেক্সিকোর জনগণের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন এবং জোর দিয়েছেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংহতির নীতি রক্ষা প্রসঙ্গে। অবৈধ অভিবাসী এবং ড্রাগ পাচার বিষয়ে আমেরিকার যে উদ্বেগ, সেই সমস্যা নিয়ে কথা বলতে রাজি ক্লডিয়া। তবে একইসঙ্গে জানিয়েছেন সেজন্য কোনও মূল্যেই দেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আপোস করা হবে না। ‘কার্টেলদের নিরাপদ স্বর্গ রক্ষায় মদত রয়েছে মেক্সিকোর’, মেক্সিকো সরকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই অপবাদ খারিজ করে দিয়েছেন ক্লডিয়া এবং কড়া বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘যদি এমন কোনও আঁতাত থেকে থাকে তাহলে সেটা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুকের দোকানমালিক ও অপরাধীদের গ্যাংগুলির মধ্যে।‘ যে রকম কড়া হাতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করেছেন তাতে বহু লোক তাঁর প্রশংসা করেছেন। এই প্রশংসা শুধু মেক্সিকোর লোকেরাই করেননি, করেছেন সারা বিশ্বের লোকজন।
গোটা বিশ্বের জনগণকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, যে ভাবে ধ্বংস হয়েছে হয়েছে তাতে এখন গাজা জায়গাটা ‘নরকের সমান, ওটা বসবাসের উপযোগী কোনও জায়গাই নয়।’ গাজাকে ‘সাফ করা’ দরকার। তিনি চাইছেন গাজায় যত প্যালেস্তিনীয় থাকতেন তাদের জর্ডন কিংবা ইজিপ্টে সরিয়ে নিয়ে যেতে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজা দখল করে জায়গাটাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের তটভূমি’ হিসাবে সাজিয়ে তুলবে। তাঁর কথায়, এটাই ‘মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার’ স্থায়ী সমাধান। গত ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলটা জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতনিয়াহু, যিনি ট্রাম্পের পাশেই দাঁড়িয়েছেন, তিনি এসব কথা শুনে নিজের আনন্দ আর চেপে রাখতে পারেননি। ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে চাইছেন সব প্যালেস্তিনীয় তাদের বাড়িঘর, তাদের স্বভূমির দখল ছেড়ে দিন এবং গোটা এলাকাটা তুলে দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের হাতে যাতে ওরা গোটা জায়গাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে পারে। প্যালেস্তিনীয়দের প্রতি এবং তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র নির্মাণের দাবির প্রতি এতটাই তীব্র ঘৃণা ট্রাম্পের।
পানামা, মেক্সিকো, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, গাজা — এই সমস্ত এলাকা নিয়ে ট্রাম্পের যে দাবি তা সবই একটা সুতোয় বাঁধা এবং সেটা খুব পরিষ্কার। এই সব এলাকা বিরল ভূমিজ খনিজে রীতিমতো সমৃদ্ধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। একইসঙ্গে জাহাজ চলাচলের পথগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, ইউক্রেনে রয়েছে বিরল ভূমিজ খনিজের বিপুল ভাণ্ডার। এগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশ্ব বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা খুব দরকার। তারা এটাও নিশ্চিত করতে চায় যে, এই সব জলপথ যেন তাদেরই দখলে থাকে এবং কারা সেই সব জলপথ ব্যবহার করে কাদের সঙ্গে এবং কোন কোন পণ্যের বাণিজ্য করবে সেটা তারাই ঠিক করে দেবে। ট্রাম্পের কথাগুলো শুনে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে উন্মাদের প্রলাপ, কিন্তু আসলে এসবের পিছনে রয়েছে এক ধূর্তের ঠান্ডা মাথার হিসাব নিকাশ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একথা বুঝতে পেরেছে যে, তাদের আধিপত্যের সামনে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হল চীন। আমেরিকার নতুন প্রতিরক্ষা সচিব কোনও রকম রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনও দেশ তাদের কাছে বিপদের উৎস নয়। চীন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টিই মার্কিন আধিপত্যবাদকে মোকবিলা করার একমাত্র পাল্টা ও প্রধান শক্তি। এবং সেকারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপদস্বরূপ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে চিহ্নিত করে ট্রাম্প প্রশাসন একথা স্বীকার করে নিয়েছে যে সমাজতন্ত্র এবং বামেরাই একমাত্র শক্তি যারা পুঁজিবাদের নির্মম শোষণ ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।
এই কারণেই রাষ্ট্রের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের তালিকায় কিউবাকে ঢুকিয়েছেন ট্রাম্প। বাইডেনের রাষ্ট্রপতিপদ শেষ হওয়ার কয়েকদিন আগে কিউবার নাম এই তালিকা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প এসে সেই আদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে কিউবা এবং কোনও কিছুর পরোয়া না করে জানিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা মাথা নত করবে না। তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে। এই রকম একটা অবস্থান নিতে প্রচুর সাহসের দরকার হয়, বিশেষ করে কিউবার মতো একটা ছোট দেশের পক্ষে যার অবস্থান মার্কিন উপকূল রেখার ৯০ মাইলের মধ্যে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর আর্থিক অবরোধের কারণে যে দেশটা ইতিমধ্যেই তীব্র সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। জনগণের ওপর আস্থা রাখা এবং সমাজতন্ত্রে অটুট বিশ্বাসই কিউবার এহেন সাহসের উৎস।
ট্রাম্পের একটা বড় উদ্যোগ হল অভিবাসীদের দেশ থেকে তাড়ানো। হাজার হাজার অভিবাসীকে ঘেরাও করে তুলে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অভিবাসীদের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা নিজেরাই দেখেছি কীভাবে ভারতীয় অভিবাসীদের পায়ে শিকল বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে মার্কিন সামরিক বিমানে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির মার্কিন সফরের পরেও সমস্ত ইঙ্গিত থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকার কাছে ভীরুর মতোই আত্মসমর্পণ করবে মোদি প্রশাসন। যদিও মেক্সিকো, কিউবা কিংবা চীন এর ঠিক উল্টো পথেই হেঁটেছে।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, আমেরিকার মহত্ব নির্ভর করে আধিপত্য ও সম্প্রসারণবাদের ওপর। এটা সর্বৈব মিথ্যা একটা ধারণা। সত্যিকারের মহৎ তারাই যারা সাধারণ জনগণের পাশে থাকে, তাদের স্বার্থের সেবা করে, যাদের সাহস আছে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করার এবং যে ব্যবস্থায় তারা বাঁচতে চায় সেটা বেছে নেওয়ার সাহস দেখাতে পারে।
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
