সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গ্রামশি, স্রাফার অকৃত্রিম বন্ধুত্ব
দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য
৮ নভেম্বর, ১৯২৬। গ্রামশিকে রোম থেকে আটক করে ফ্যাসিস্ত পুলিশ। কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় সব নেতৃত্বই গ্রেপ্তার হন। ইতিমধ্যে স্রাফাও মুসোলিনির রোষে পড়ে দেশ ছেড়ে কেমব্রিজে চলে গিয়েছেন জন মেনার্ড কেইনসের আগ্রহে। ব্রিটেন-সহ গোটা ইউরোপের বুদ্ধিজীবি মহলে জায়গা করে নিয়েছেন। গ্রামশির গ্রেপ্তারের খবরে স্রাফা বিচলিত। পরের ১১ বছর (যতদিন গ্রামশি বেঁচেছিলেন) সমানে চেষ্টা করে গিয়েছেনে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে। কখনও জেলে গিয়ে দেখা করছেন। গ্রামশির শারিরীক অবস্থায় উদ্বিগ্ন স্রাফা নিজের পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন।

‘আগামী কুড়ি বছরের জন্য এই মগজটাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে হবে!’ মুসোলিনির জেলে বন্দি গ্রামশির বিচারের সময় আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন সরকারি আইনজীবী। আর্জি ছিল যেন কুড়ি বছরের জেল হয় গ্রামশির।
গত শতকের বিশ দশকের অন্যতম চিন্তাশীল মানুষকে কারগারে পাঠিয়ে তার যুক্তি-বুদ্ধি শানিত লেখাকে এভাবেই খতম করে দিতে চেয়েছিল ফ্যাসিস্তরা। পারেনি। পৃথিবী জেনেছে গ্রামশি তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজগুলি করেছেন কারাগারের অভ্যন্তরে - তাও, মুসোলনির ফ্যাসিস্ত কারাগার।
জেলের মধ্যে তাঁকে পড়তে লিখতে সাহায্য করেছিলেন দু’জন। তাতিয়ানা স্কুখট এবং পিয়েরো স্রাফা। তাতিয়ানা ছিলেন গ্রামশির স্ত্রী জুলিয়ার বোন। আর স্রাফা, তার সময়ের অন্যতম সেরা অর্থনীতিবিদ। এরিক হবসবম লিখছেন, ‘স্রাফা তাঁকে (গ্রামশিকে) কারাগারের মধ্যে পড়তে ও চিন্তা করতে সাহায্য করেছিলেন... একটি বৌদ্ধিক যোগাযোগ রেখেছিলেন, যার পরিমাপ করা এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’ প্রিজন নোটবুকস লেখার জন্য প্রয়োজনীয় বইপত্র স্রাফাই জেলখানার ভিতরে নিয়ে যেতেন। একথা গ্রামশির আত্মজীবনীতে উল্লেখ করা আছে। কেউ কেউ তো আবার বলেন, ওই রচনা জেলখানার ভিতর থেকে বাইরে নিয়ে আসার কাজটা স্রাফাই করতেন। যদিও, সেটা হওয়ার সুযোগ ছিল না বললেই চলে।
১ মে, ১৯১৯। গ্রামশি তখন তাস্কা, তেরাচিনি এবং তোগলিয়াত্তির সঙ্গে তুরিন থেকে বের করছেন ল’অরদিনে ন্যুভো নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এই পত্রিকাটিই পরে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯২১ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর স্রাফার সঙ্গে গ্রামশির আলাপ করিয়ে দেন ‘দান্তে স্কলার’ এবং তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমবার্তো কসমো। প্রথম আলাপেই বন্ধুত্ব।
স্রাফা নিজে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না, এমনকি ল’অরদিনে ন্যুভো পত্রিকার পরিচালন সমিতিতেও ছিলেন না। যদিও, ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং মানবিক দু’দিক থেকেই স্রাফার অবদান অসামান্য। জেলবন্দি গ্রামশির ভাবনা তাতিয়ানার মাধ্যমে স্রাফা পৌঁছে দিতেন পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইতালি) ‘এক্সটার্নাল’ কেন্দ্রে, বিশেষ করে তোগলিয়াত্তির কাছে।
ল’অরদিনে ন্যুভো-তে স্রাফার প্রথম মৌলিক লেখা প্রকাশিত হয় ১৯২১ সালে। তখন তিনি ব্রিটেনে। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন ল’অরদিনে ন্যুভো’র প্রেস কার্ড। রজনী পাম দত্তর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দ্য লেবার মান্থলি’-তে ইতালির সংবাদদাতা (প্রতিনিধি) হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯২২ সালে স্রাফা দ্বিতীয়বারের জন্য ইতালিতে ফিরে আসেন। ততদিনে ল’অরদিনে ন্যুভো’র বন্ধুদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে এসেছে। গ্রামশিও তখন মস্কোতে। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের কার্যকরী সমিতির সভায় ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯২২-এর মার্চেই ইতালির ক্ষমতায় মুসোলিনি। আমাদেও বোর্দিগার নির্দেশে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি তৃতীয় আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অনুরোধে গ্রামশি পার্টিতে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনার কাজ শুরু করেন। এবং ভিয়েনায় ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির ‘এক্সটার্নাল’ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এই সময়ে আবার স্রাফার সঙ্গে গ্রামশির যোগাযোগ তৈরি হয়। গ্রামশির অনুরোধে স্রাফা ইতালির বর্তমান অবস্থা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ নিয়ে লিখতে রাজি হন। তাদের মধ্যে বেশ কিছু চিঠিপত্রের আদানপ্রদান এই সময়ে হয়।
এরকমই একটি চিঠিতে, ১৯২৪ সালে স্রাফা তার বন্ধুকে রাজনীতির পাঠ দিচ্ছেন। সম্ভবত এটাই স্রাফার গ্রামশিকে লেখা একমাত্র রাজনৈতিক চিঠি। ‘স্বাধীনতা’ বনাম ‘শৃঙ্খলা’-ই জরুরি সমস্যা। অন্যরা এদের অনুসরণ করবে। এখন সময় গণতান্ত্রিক বিরোধী পরিসর তৈরি করার। বিরোধী দলগুলির কথা শোনা। এমনকি তাদের সাহায্যও করা দরকার। প্রকাশ্যে তাদের বিরোধিতা এবং বুর্জোয়া স্বাধীনতাকে পরিহাস করা এ সময়ের বড় ভুল। নিজেকে একজন অনিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট মনে করে স্রাফা এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য গ্রামশি এবং তার নেতৃত্বাধীন ল’অরদিনে ন্যুভো’র ওপরই ভরসা রাখছেন। বলাই বাহুল্য, গ্রামশি এই চিঠির বক্তব্যের সাথে সহমত হননি। নিজের যুক্তি সাজিয়ে স্রাফাকে খণ্ডন করেছেন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, গ্রামশি তাঁর লেখা শেষ করছেন (স্রাফার এই চিঠির উত্তরে) ‘বিশ্বাস’ এবং ‘বন্ধুত্ব’ এই দুটো শব্দ দিয়ে। লিখছেন, আমাদের বন্ধু স্রাফার মত বুদ্ধিজীবি, যিনি কোনওদিন ফ্যাসিবাদের কাছেক নতিস্বীকার করেননি, তিনি আবারও বিশ্বাস রেখেছেন ল’অরদিনে ন্যুভো’র প্রতি।
৮ নভেম্বর, ১৯২৬। গ্রামশিকে রোম থেকে আটক করে ফ্যাসিস্ত পুলিশ। কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় সব নেতৃত্বই গ্রেপ্তার হন। ইতিমধ্যে স্রাফাও মুসোলিনির রোষে পড়ে দেশ ছেড়ে কেমব্রিজে চলে গিয়েছেন জন মেনার্ড কেইনসের আগ্রহে। ব্রিটেন-সহ গোটা ইউরোপের বুদ্ধিজীবি মহলে জায়গা করে নিয়েছেন। গ্রামশির গ্রেপ্তারের খবরে স্রাফা বিচলিত। পরের ১১ বছর (যতদিন গ্রামশি বেঁচেছিলেন) সমানে চেষ্টা করে গিয়েছেনে বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে। কখনও জেলে গিয়ে দেখা করছেন। গ্রামশির শারিরীক অবস্থায় উদ্বিগ্ন স্রাফা নিজের পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। কখনও বা রাশিয়ায় গিয়ে দেখা করেছেন জুলিয়া ও তাঁর সন্তানদের সঙ্গে। বারবার চেষ্টা করেছেন গ্রামশির মুক্তির। জেলের মধ্যে বসে নিজের পড়াশোনা করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেজন্য মিলানের বইয়ের দোকানে গ্রামশির নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছেন। ইচ্ছেমত বই এর অর্ডার দেবেন গ্রামশি আর দাম মেটাবেন স্রাফা! তাতিয়ানার মাধ্যমে জেল বন্দির লেখা ডায়েরিগুলি এবং চিঠিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন ফ্যাসিস্ত সরকারকে ফাঁকি দিয়ে।
জেলে থাকাকালীন গ্রামশির সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতেন স্রাফা। নানা বিষয়ে তাদের মধ্যে চিঠিপত্রের আদানপ্রদান হত। ১৯৭৪ সালে স্রাফা এতদিন ধরে রক্ষা করা সমস্ত চিঠিপত্র এবং নানাবিধ নথিপত্র তুলে দেন গ্রামশি ফাউন্ডেশনের হাতে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে গ্রামশিকে নিয়ে কাজ করতে পারে।
গ্রামশির সঙ্গে সম্পর্কের বাইরে তিনি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক চিন্তা উন্মেষের কারিগর। ইতালিয় ভাষায় স্রাফার লেখার একটি নিবন্ধ ১৯২৬ সালে দ্য ইকনমিক জার্নাল পত্রিকায় ইংরেজিতে প্রকাশ করেন কেইনস। এই নিবন্ধটি অর্থনীতির তত্ত্বগত ভাবনার জগতে বিপ্লব ঘটায়। অর্থনীতির তৎকালীন ‘মূল ধারা’ তখনও পর্যন্ত কেবল ‘পূর্ণাঙ্গ প্রতিযোগিতার বাজার’কে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল। স্রাফার লেখা তুলে ধরে ‘অপূর্ণাঙ্গ একচেটিয়ামূলক প্রতিযোগিতার বাজার’কে। বামপন্থী ও ইহুদি হওয়ার কারণে তিনিও ছিলেন ফ্যাসিস্ত শক্তির স্বাভাবিক নিশানা। কেইনস-ই তাঁকে নিয়ে আসেন কেমব্রিজে। এই কেমব্রিজেই ১৯৬০ সালে স্রাফা প্রকাশ করেন তাঁর ছক-ভাঙা বই ‘প্রোডাকশান অব কমোডিটিস বাই মিনস অব কমোডটিস’। এর সাথে সাথে ডেভিড রিকার্ডোর লেখা নিবন্ধ ও চিঠিপত্র নিয়ে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়ার্কর্স অ্যান্ড করসপনডেন্স অব রিকার্ডো’ বইটি তিনি মরিস ডবের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। জ্ঞানভাণ্ডারে এই বিপুল কাজটি করার জন্য তাঁকে উৎসাহিত করেন গ্রামশি। তখনও অর্থনীতি চর্চায় নোবেল পুরস্কার শুরু হয়নি। ১৯৬১, রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করে স্রাফাকে, যা নোবেলের সমতুল্য।
গ্রামশির স্মৃতি নিয়েই আজীবন বেঁচেছিলেন। ভগ্নস্বাস্থ্য এবং নানাবিধ শারীরিক সমস্যা নিয়ে কেমব্রিজের হাসপাতালে ভর্তি স্রাফা। ১৯৮২ সালে স্রাফার এক আত্মীয়ের অনুরোধে ইতালির বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মিলান ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা তাঁকে দেখতে এসেছিলেন কেমব্রিজের হাসপাতালে। স্মৃতিসংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত স্রাফা তখন গতকাল কী করেছেন মনে করতে পারছেন না, কিন্তু রিকার্ডো এবং গ্রামশি নিয়ে কথা হলে তিনি তখনও প্রাণবন্ত এবং উচ্ছল— স্রাফাকে দেখার পর শুনিয়েছিলেন সেই ডাক্তার। রিকার্ডো এবং গ্রামশি, স্রাফার জীবনের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
গত শতকের বিশ দশকের এক অন্ধকারময় সময়ে সম্পূর্ণ নীরব এবং নিঃস্বার্থ এই বন্ধুত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় উনবিংশ শতকের মার্কস ও এঙ্গেলসের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের কথা।
প্রকাশের তারিখ: ২২-জানুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
