সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গ্রুনড্রিশেঃ মার্কসের কমপ্লিট ওয়ার্ক
ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী
১৮৫৭ সাল থেকে পরবর্তী কয়েকবছর হাজার হাজার পৃষ্ঠা জুড়ে তৈরি হয়েছে গ্রুন্ড্রিশে। দীর্ঘ, গভীর অধ্যয়নের ফল; বস্তুত এক নতুন বিজ্ঞান। কার্যত মার্কসের সমগ্র চিন্তার সম্ভার।

কম বয়সের মার্কস এবং পরিণত বয়সের মার্কসের রচনার মধ্যে এক ধরনের বিভাজন তৈরি করার প্রবণতা আছে একাংশের পণ্ডিতদের মধ্যে। অনেকে আবার এই বিভাজনটিকে স্বীকার করেন না বা আস্থা রাখেন না। এরকমটা বলা হয় যে, প্রথমদিকের মার্কস অনেক বেশি 'দার্শনিক' ও 'মানবিক'; পরের দিকের মার্কস অর্থাৎ পরিণত মার্কস অনেক বেশি 'যান্ত্রিক', 'রাজনৈতিক'। এই বিতর্কে না-গিয়েও মার্কসের রচনাকালকে আমরা চারটি পর্বে ভাগ করতে পারি—
১৮৪৫— রূপান্তরের রচনা
১৮৪৫-৫৭— পরিণত হয়ে ওঠার রচনা
১৮৫৭-৮৩— পরিণত রচনা
১৮৫৭ সাল অর্থাৎ উপরের কাল-বিভাগ অনুযায়ী মার্কসের পরিণত রচনা শুরু হচ্ছে যা দিয়ে তা হল গ্রুন্ড্রিশে । মার্কসের জীবদ্দশার তো নয়ই, এমনকি লেনিন এর সময়ও গ্রুন্ড্রিশে প্রকাশিত হয়নি। যদিও মার্কস তা প্রকাশ করার জন্য লেখেনওনি। গ্রুন্ড্রিশে কার্যত মার্কসের আত্মশিক্ষার বয়ান। মার্কস নিজের কাছে নিজে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কী নিয়ে ব্যাখ্যা? ব্যাখ্যা দিচ্ছেন পুঁজিবাদের চলার অন্তর্নিহিত সূত্র নিয়ে। মার্কসের লেখাকে আরেক রকমভাবে ভাগ করা হয়। মার্কসের দার্শনিক লেখা, রাজনৈতিক লেখা ও অর্থনৈতিক লেখা। গ্রুন্ড্রিশে তৃতীয় বর্গের। অর্থাৎ মার্কসের অর্থনৈতিক লেখা (যদিও আলথুসার বলেছেন এবং তা ঠিকও যে, মার্কসের দর্শন বুঝতে হলে ক্যাপিটাল পড়া দরকার)। ১৮৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই এঙ্গেলস মার্কসকে অর্থনীতি বিষয়ে লেখার জন্য বলতে থাকেন। মার্কস সে-কাজ শুরুও করেছিলেন। যার কিছুটা প্যারিস পাণ্ডুলিপিতে আছে। কিন্তু ওই সময় আসলে মার্কস হেগেলের সাথে তাঁর দর্শন সংক্রান্ত 'বোঝাপড়া' শেষ করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তারই ফসল দ্য হোলি ফেমিলি ও জার্মান ইডিওলজি । তার পরপরই মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করতে। নানা দেশের সমাজতন্ত্রীদের সংগঠিত করেন। কমিউনিস্ট লীগে যুক্ত হন। তারপর রচিত হয় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো । অর্থনীতি বিষয়ক লেখায় তখনও মন দেননি মার্কস। কার্যত ১৮৪৮-এর বিপ্লবের ব্যর্থতার পর মার্কস পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সংকট আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। সমাজ বিপ্লবকে পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথে জুড়ে দেওয়ার কাজ করছিলেন। ১৮৫০ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিং রুমে বসে পড়ার সুযোগ আসে মার্কসের কাছে। সেখানে শুরু হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি পড়া ও নোট নেওয়া। সেই রিডিং রুমে মার্কসের অধ্যয়নের মাসভিত্তিক যে-চিত্র পাওয়া যায়, সেটা এরকম—
ফেব্রুয়ারি— হিউম এবং লক্। টাকা ও মুদ্রা বিষয়ে আরও বই।
মার্চ— রিকার্ডো, অ্যাডাম স্মিথ ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিষয়ে বই।
এপ্রিল— আবার রিকার্ডো। টাকা বিষয়ে আরও বই।
মে— ফেরি, ম্যালথাস এবং অর্থনীতি সংক্রান্ত বইপত্র।
জুন— মূল্য, সম্পদ এবং অর্থনীতি।
জুলাই— কারখানা ব্যবস্থা নিয়ে বই এবং কৃষি অর্থনীতি।
আগস্ট— জনসংখ্যা, উপনিবেশ এবং রোমান দুনিয়ার অর্থনীতি।
আগস্ট পরবর্তী— ব্যাঙ্কিং, কৃষি এবং প্রযুক্তি।
১৮৫১ সালের এপ্রিলে এঙ্গেলস মার্কসকে চিঠিতে জানতে চান তার 'অর্থনীতি' বিষয়ক লেখা কতদূর। মার্কস উত্তরে লিখলেন— "I am so far advanced that in five weeks I will be through with the whole economic shit. And that done, I will work over my Economics at home and throw myself into another science in the Museum. I am beginning to be tired of it. Basically, this science had made no further progress since A. Smith and D. Richardo, however much has been done in individual, often very subtle researches."
ওই বছরই লওয়েন্থালকে মার্কসের অর্থনীতি বিষয়ক রচনা প্রকাশের জন্য রাজি করানো হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল তিন ভাগে প্রকাশ করার— (১) অর্থনীতির সমালোচনা (২) সমাজতন্ত্র (৩) অর্থনৈতিক তত্ত্বের ইতিহাস। প্রকাশক বলেছিলেন এই ক্রম পরিবর্তন করে উল্টোদিক থেকে প্রকাশ করতে, অর্থাৎ 'অর্থনৈতিক তত্ত্বের ইতিহাস' দিয়ে শুরু করতে। মার্কস সম্মত হলেন না। এঙ্গেলস মার্কসকে লিখলেন, ‘show a little commercial sense this time.’। ১৮৫১ সালের ডিসেম্বরে ফ্রান্সে কু-দে-তা সংগঠিত করেন লুই বোনাপার্ট। মার্কসের নজর ঘুরে যায় ফ্রান্সের দিকে। ১৮৫২ তে ব্রকহাউস নামের এক প্রকাশককে একটি পাণ্ডুলিপি দেন মার্কস। যার শিরোনাম, ‘Modern Economic Literature in England 1830-1852’। কিন্তু প্রকাশক তা ছাপলেন না। মার্কসের অর্থনীতি বিষয়ে কাজও তখনকার মতো বন্ধ হয়ে গেল।
১৮৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকটের পর মার্কস আবার অর্থনীতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। ওই বছর ডিসেম্বরে এঙ্গেলসকে চিঠিতে লিখলেন— "I am working madly through the nights on a synthesis of my economic studies, so that I at least have the main principles (Grundrisse) clear before the deluge." ১৮৫৭ সাল থেকে পরবর্তী কয়েকবছর হাজার হাজার পৃষ্ঠা জুড়ে তৈরি হয়েছে গ্রুন্ড্রিশে । দীর্ঘ, গভীর অধ্যয়নের ফল; বস্তুত এক নতুন বিজ্ঞান। কার্যত মার্কসের সমগ্র চিন্তার সম্ভার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যে, গ্রুন্ড্রিশে পূর্ব রচনায় মার্কসের বীক্ষার অন্যতম মৌলিক আবিষ্কার ‘উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব’ (Theory of Surplus Value) নির্মিত/উল্লেখিত হয়নি। গ্রুন্ড্রিশে রচনার সময়েই এই তত্ত্বের তত্ত্বায়িত করেন মার্কস। ১৮৬৩ সালে তাঁর অর্থনীতি বিষয়ক পরিকল্পনা কিছুটা পাল্টে যায়। লাসালকে মার্কস লিখলেন যে, তিনি মূলত ছটি বিষয়ে তার অর্থনীতি সংক্রান্ত রচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চান—
ক্যাপিটাল–এর তিন খণ্ড আসলে তাঁর পরিকল্পিত ছটি বিষয়ের মধ্যে প্রথমটি, অর্থাৎ কিনা ‘পুঁজি’। উপরে উল্লিখিত ছটি উপ-বিভাগ নিয়েই ক্যাপিটাল-এর তিন খণ্ড রচিত হয়েছে। গ্রুন্ড্রিশে রচনার সময়ই ক্যাপিটাল-এর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাকি পাঁচটি বিষয়ে স্বতন্ত্র বই লেখার সুযোগ আর হয়নি।
গ্রুন্ড্রিশে আসলে মার্কসের সমগ্র ভাবনার 'synthesis'। কার্ল কাউৎস্কি নাকি মার্কসকে বলেছিলেন, তাঁর রচনা সমগ্র প্রকাশ করা উচিত। যার উত্তরে মার্কস বলেছিলেন যে, আগে সমগ্রটা শেষ হওয়া প্রয়োজন। সে কাজ আর শেষ হয়নি। ডেভিড ম্যাকলিলানের কথায়— "In a sense, none of Marx's works is complete, but the completest of them is the Grundrisse."।
প্রকাশের তারিখ: ০৪-মে-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
