Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

হো চি মিনঃ এক আদর্শ কমিউনিস্ট নেতা

জ্যোতি বসু
কিন্তু তখনও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিপদ কাটেনি। জাপানের পর চীনের চিয়াং কাইশেকের সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণ চালাল, এরপর ফ্রান্স এসে আবার ভিয়েতনামকে পদানত করার চেষ্টা করে। ১৯৪৬ সাল থেকে ৯ বছর ধরে চলে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধযুদ্ধ। ইতিহাসের পাতায় ভিয়েতনামের জনগণের এই বীরত্ব স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই সময় ভিয়েতনাম আর একা নয়, তার পাশে এসে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ। গোটা পৃথিবীর মানুষ ভিয়েতনামের সংগ্রামের সমর্থনে দাড়ায়। কঠিন অবস্হার মধ্যে অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে ভিয়েতনামের জনগণ বিজয় অর্জন করেন। এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন হো চি মিন।
Ho Chi Minh: An ideal communist leader

হো চি মিন শুধু ভিয়েতনামের নন, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ভিয়েতনামের জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তার জন্য সারা পৃথিবীর প্রগতিশীল মুক্তিকামী এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি তাঁর কাছে ঋণী। এ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপে তিনি ইন্দোচীনের জনগণের ওপর সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণের চিত্র তুলে ধরেন এবং ভিয়েতনামের জনগণের প্রতি সংহতি জ্ঞাপনের জন্য তিনি সর্বত্র আবেদন জানান। ভিয়েতনামের জনগণের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ফরাসী সোস্যালিস্ট পার্টির বিপ্লবী অংশের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন এবং ১৯২০ সালে ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে যোগদান করেন। এভাবেই হো চি মিন ভিয়েতনামের একজন নাগরিক হিসাবে প্রথম কমিউনিস্ট হন। এ সম্পর্কে হো চি মিন পরে বলেছেন, “কমিউনিজম নয়, দেশপ্রেমই প্রথমে আমাকে লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ওপর আস্থা স্থাপনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। পরে সংগ্রামের ধাপে ধাপে প্রত্যক্ষ কাজকর্মে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়নের মাধ্যমে আমি শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করলাম যে, পৃথিবীজুড়ে দাসত্ব থেকে শ্রমিকশ্রেণীকে এবং নিপীড়িত জাতিকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র সমাজবাদ ও সাম্যবাদই। আমি আরও বুঝলাম যে, দেশপ্রেম ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে, একটাকে আরেকটা থেকে পৃথক করা যায় না।” তিনি প্রায়ই বলতেন দেশকে যাঁরা ভালবাসেন, দেশের যারা মুক্তি চান তাঁরা মার্কসবাদ- লেনিনবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য। তাঁর মতে একমাত্র কমিউনিস্টরাই জনগণের আশা- আকাঙ্খাকে সঠিক রূপ দিতে পারে। জাতির স্বার্থরক্ষায় একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও সবচেয়ে সুসমঞ্জস হলো কমিউনিস্টরাই। স্বাধীনতা, মুক্তি ও জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য কমিউনিস্টরা সত্যিকারের নিঃস্বার্থ আত্মোৎসর্গী যোদ্ধা। এই বিশ্বাসে হো চি মিন সারা জীবন অবিচল ছিলেন এবং প্রথমে ফরাসী সাম্রাজ্যবাদ ও পরে দুর্ধর্ষ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করে ভিয়েতনামের জনগণকে মুক্ত করেন এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান। ছোট পশ্চাদপদ একটি দেশের সমগ্র জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করে পৃথিবীর সবচেয়ে পরাক্রমশালী শত্রু সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করা যায় – হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম পৃথিবীর সামনে এই সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকাজ এখনও তাঁরা করে যাচ্ছেন। জনগণের ঐক্যের শক্তি যে-কোন বাধাকে অতিক্রম করে কী বিরাট পরিবর্তন ঘটাতে পারে, ভিয়েতনাম পৃথিবীর সামনে সেই দৃষ্টান্ত হাজির করেছে।

হো চি মিন যখন সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে ইন্দোচীনের জনগণকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন ভারতবর্ষেও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে। আমাদের এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণীর হাতে ছিল না, সেজন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের জয় হলেও দেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশা ঘোচে নি। গত ৪৩ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখছি, মানুষের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এই ৪৩ বছরে শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধি পেয়েছে, বামপন্হীদের শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু এখনও সমাজের বেশিরভাগ মানুষ পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণা ও মতবাদের গন্ডির মধ্যে রয়ে গেছেন। সেজন্য সমাজ পরিবর্তনের জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম আমরা করে যাচ্ছি, মানুষের চেতনা বাড়াবার চেষ্টা করছি, যেমন জনগণের দাবিদাওয়া নিয়ে এবং প্রধান রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়েও সংগ্রাম করছি। আমাদের এখনও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে, অনেক আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ভিয়েতনামের জনগণের এই বিরাট সাফল্য থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে হো চি মিন জোর দিয়েছেন ঔপনিবেশিকতার সমস্যার ওপর। প্রথম থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ঔপনিবেশিক দেশের নিপীড়িত জনগণের সঙ্গে পৃথিবীর বাকি অংশের শোষিত জনগণের ঐক্য ও সংহতি ঔপনিবেশিকতার সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বেশি জরুরী। এ সম্পর্কে লেনিনের রচিত বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে তিনি পরিচিত হয়ে আরও বেশি সমৃদ্ধ হন। সেইসময় লেনিনের লেখা রাশিয়ান ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় পাওয়া যেত না। বিদেশে হো চি মিন অনেকের সাহায্য নিয়ে লেনিনের রচনাগুলির সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর মতে লেনিনই একমাত্র ঔপনিবেশিক জনগণের মুক্তির বিপ্লবী পথ নির্দেশ করে দিয়েছেন। এরই ভিত্তিতে হো চি মিন ভিয়েতনামের মুক্তির রূপরেখা তৈরি করেন। ঔপনিবেশিক দেশগুলি ছিল মূলত অনগ্রসর ও কৃষিপ্রধান। সেজন্য কৃষকদের প্রশ্নের সমাধান ছাড়া মুক্তিসংগ্রাম অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এই গুরুত্ব উপলব্ধি করে ভিয়েতনামের নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কৃষক প্রশ্নের সমাধানের সঠিক পথ নিয়ে ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত করতে পেরেছিল। নভেম্বর বিপ্লব এবং লেনিনের নেতৃত্ব তাঁর মধ্যে এই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি জাগ্রত করেছিল।

তিনের দশকের গোড়ায় পাচ-ছ'বছর ধরে গোপন অবস্থায় কাজ করার সময় প্রচন্ড নির্যাতন ও অত্যাচারের মধ্যে পড়তে হয়েছিল ইন্দোচীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে। এরপর কিছুদিন প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ পেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অবস্হার দ্রুত পরিবর্তন হয়। রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সশস্ত্র সংগ্রাম সব পথই তাঁদের গ্রহণ করতে হয়। দেশের অবস্হা বিশ্লেষণ করে তাঁরা ঠিক করেন কখন কোন পদ্ধতি প্রাধান্য পাবে। বিভিন্ন অবস্হার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে দেশের সমস্ত অংশের মানুষকে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ময়দানে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে হো চি মিনের নেতৃত্বের দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে তাঁকেও অশেষ দুঃখকষ্ট, নির্যাতন ভোগ করতে হয়, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কাটাতে হয়।

স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রী ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিতহন তিনি। তখন দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ভিয়েতনামের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। তখন দুর্ভিক্ষে ও মহামারীতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়। এরকম একটা পরিস্হিতিতে লেনিনের সতর্ক বাণীই হো চি মিন তাঁর সহকর্মীদের কাছে সবসময় তুলে ধরতেন যে, “ক্ষমতা দখল সোজা নয়, কিন্তু ক্ষমতাকে রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন।” ৮০ বছর ধরে ভিয়েতনাম ছিল ফরাসী উপনিবেশ। শুধু তীব্র শোষণ নয়, ন্যূনতম মানবিক অধিকারও ভিয়েতনামের মানুষ তখন পাননি। হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম সেই ভয়ংকর অবস্হা থেকে উদ্ধার পেতে থাকে। দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রচার অভিযান, জনগণের ওপর আরোপিত অন্যায় কর প্রত্যাহার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা – এই ছ'দফা কর্মসূচী তিনি ঘোষণা করেন এবং তা গোটা দেশের মানুষ বিপুল উৎসাহে কার্যকর করতে থাকেন। দেখা যায়, শুধু বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনায় নয়, দেশ গঠন ও সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকাজেও হো চি মিন বিরাট কৃতিত্বের দৃষ্টান্ত স্হাপন করেন।

কিন্তু তখনও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিপদ কাটেনি। জাপানের পর চীনের চিয়াং কাইশেকের সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণ চালাল, এরপর ফ্রান্স এসে আবার ভিয়েতনামকে পদানত করার চেষ্টা করে। ১৯৪৬ সাল থেকে ৯ বছর ধরে চলে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধযুদ্ধ। ইতিহাসের পাতায় ভিয়েতনামের জনগণের এই বীরত্ব স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই সময় ভিয়েতনাম আর একা নয়, তার পাশে এসে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ। গোটা পৃথিবীর মানুষ ভিয়েতনামের সংগ্রামের সমর্থনে দাড়ায়। কঠিন অবস্হার মধ্যে অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে ভিয়েতনামের জনগণ বিজয় অর্জন করেন। এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন হো চি মিন।

কিন্তু জেনেভা চুক্তিতে ভিয়েতনামের লক্ষ্য অর্জিত হবার আগে থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাধা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামে তাদের পুতুল সরকার বসিয়ে ভিয়েতনামকে আবার এক যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয়। হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনামের ওয়ার্কার্স পার্টি দুটো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ঘোষণা করে: উত্তর ভিয়েতনামে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজবাদ গড়ে তোলা এবং দ্বিতীয়ত: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে মুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম গড়ে তোলা।

উত্তরাংশে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকাজে বিরাট সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে মুক্ত করতে চলে তীব্র সংগ্রাম। এই লড়াইয়ের শেষ বিজয় হো চি মিন দেখে যেতে না পারলেও তিনি বিজয় যে সুনিশ্চিত, এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে ছিলেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এবং হো চি মিনের নির্দেশিত পথে সেই যুগান্তকারী বিজয় সম্ভব হয়েছে।

ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের এই বিরাট প্রভাবের সঠিক উপলব্ধি ছাড়া আজকের সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কঠিন অর্থনৈতিক অবস্হা এবং একটানা ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্যে থেকে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকাজ সফল করতে গোটা দেশের জনগণকে উদ্দীপিত করেছিলেন হো চি মিন। হো চি মিন আন্তর্জাতিকতাবাদের যে নিদর্শন স্হাপন করেছেন, তাতে তাঁর খ্যাতি এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকে ভিয়েতনামের সমর্থনে আমাদের সংহতি আন্দোলন চলে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় এই সংহতি আন্দোলনের ওপর পুলিসের গুলিতে দু'জন ছাত্র শহীদের মৃত্যুবরণ করে। | ময়মনসিংহেও এক ছাত্র নিহত হয়। স্বাধীনতার পর এই সংহতি আন্দোলন জনগণের মধ্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করে।

আমার মনে পড়ছে ১৯৪৬ সালে হো চি মিনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের কথা। ১৯৪৬ সালে প্যারিসে আলোচনায় যোগ দিতে যাবার সময় তিনি কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে আসেন। তাঁর সঙ্গে আমি ও পার্টির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের আলোচনা হয়। ১৯৫৮ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ নয়াদিল্লিতে তাঁকে বিরাট সংবর্ধনা জানান। তখনও তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সে বছরই কলকাতার মেয়র তাঁর সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করে। এত বড় বীর নেতার সারল্যে ও অনাড়ম্বতায় সকলেই মুগ্ধ হয়ে যান। মানুষের প্রতি গভীর দরদ ও মমত্ববোধ তাঁর কথায় বারবার ফুটে ওঠ, যা দীর্ঘ লড়াইয়ের সময়ও সবাই লক্ষ্য করেছেন।

এ বছরের ১৯শে মে হ্যানয়ে হো চি মিনের জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে আমি ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করি। সেই সময় পুরনো সায়গন বা হো চি মিন সিটি-ও সফর করি। ভিয়েতনামের নেতৃবৃন্দের কাছে শুনেছি কী অসাধারণ গুণাবলী তাঁর মধ্যে ছিল। তার মধ্যে একটা হলো সাদাসিধে অনাড়ম্বর জীবনযাপন। ভিয়েতনাম মুক্ত হবার পর পুরনো শাসকদের বিরাট প্রাসাদকে রাষ্ট্রপতির ভবন করার প্রস্তাব এলে রাষ্ট্রপতি হো চি মিন সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। কাছাকাছি ছোট্ট দু'রুমের একটি বাড়ি তিনি বেছে নেন। সেখানে তাঁর লেখাপড়ার সরঞ্জাম, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামান্য জিনিসপত্র এবং প্রেসিডেন্টের অফিসঘর সবই ছিল। এখানে বসেই তিনি লিখতেন, আলোচনা করতেন, অফিস করতেন। এই সারল্য ও সাদাসিধে জীবন চিরকাল তিনি বজায় রেখেছেন, বিলাসিতার কোন স্হান তাঁর মধ্যে ছিল না। আমি দেখেছি, এই গুণকে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি খুবই গুরুত্ব দেন এবং তাঁরা সেইভাবে চলার চেষ্টা করেন। আদর্শ কমিউনিস্ট বলতে কেমন হওয়া উচিত, হো চি মিন ছিলেন তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পাঁচ-ছ'য়ের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যখন তীব্র মতবিরোধ দেখা যায়, তখন হো চি মিন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে, ধৈর্য ও নম্রতার সঙ্গে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন যাতে ফাটল না ধরে। তিনি আন্তরিকভাবেই এই ভাঙন রোধ করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এর বিপর্যয়কর পরিণাম সুদূরপ্রসারী হবে।

পৃথিবীজুড়ে এক কঠিন অবস্হার মধ্যে ভিয়েতনাম যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সেটা আমাদের সকলের কাছেই গর্বের বিষয়। এ কাজ খুবই কঠিন। এখনও তাঁদের কঠিন অবস্হার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাঁরা আত্মসমালোচনা করছেন, পর্যালোচনা করছেন। ভিয়েতনামের নেতারা বলেছেন, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে দেশকে গড়ে তুলবেন। সেখানে পার্টির সদস্যসংখ্যা অনেক বেড়েছে। মুক্তির সময় মাত্র কয়েক হাজার সদস্য ছিল, এখন প্রায় ২০ লক্ষ। ভিয়েতনামের নেতারা বলেছেন, এঁদের মানের দিকে নজর রাখবেন। এটাও কঠিন কাজ। সমুন্নত রাজনৈতিক চেতনা ছাড়া সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা খুবই কঠিন। ভিয়েতনাম সফরের নেতৃবৃন্দ আমাকে বলেছেন, সমসাময়িক দুনিয়ায় পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে তাঁদেরও কিছু পরিবর্তন করতে হবে। বিগত পার্টি-কংগ্রেসেও তাঁরা এর পর্যালোচনা করেছেন। অর্থনীতির ভিতকে আরো শক্তিশালী করতে তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন। সর্বাগ্রে পার্টিকে টি শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

আমার বিশ্বাস, এই কঠিন কাজেও তারা সফল হবেন। যাঁরা এত বড়ো শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে ইতিহাস রচনা করেছেন এবং তাদের মধ্যে যে সঙ্কল্প ও আত্মপ্রতায় দেখেছি, তাতে তারা নিশ্চয়ই সব বাধা অতিক্রম করতে পারবেন। একাজে হো চি মিন আদর্শ হয়ে থাকবেন।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় গণশক্তির হো চি মিন শতবর্ষ সংখ্যায় 


প্রকাশের তারিখ: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

এমন দরদী মহান মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নেতা যেভাবে ফরাসী ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে সমঝোতা করেছিলেন, তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ১৯৪৫এর সেপ্টেম্বরে শ্রমিক শ্রেণীর কমিউনগুলি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই ইতিহাসটাও একটু বললে পাঠকরা সমৃদ্ধ হই। - (সম্পাদিত)
- সংকল্প, ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪