সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারতে মার্কসবাদের প্রভাব
জ্যোতি বসু
মার্কসবাদের প্রয়োগ করতে গেলে সংশোধনবাদ সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হবে, কেননা সংশোধনবাদ মার্কসবাদী চিন্তাধারার মূলগতভাবে পরিপন্থী। সমাজ পরিবর্তনে শ্রেণিসংগ্রামের ভূমিকা, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনের উপকরণগুলির সামাজিক মালিকানা, শ্রেণিশোষণের অবসান, আন্তর্জাতিকতাবোধ এ সব কিছু হলো মার্কসীয় তত্ত্বের মূল কথা এবং মার্কসবাদের সৃজনশীল প্রয়োগের নামে এ সবকে কোনোভাবেই লঘু করা যায় না।

ভারতে কার্ল মার্কসের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি মার্কস মেমোরিয়াল লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। এই পৃথিবী আজ পর্যন্ত যত মহান মনীষীকে উপহার দিয়েছে কার্ল মার্কস শুধুমাত্র তাঁদের অন্যতমই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত বিপ্লবী যিনি শ্রমিকশ্রেণির বহু গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের সূচনা করেছিলেন এবং সে-সবে অংশগ্রহণও করেছিলেন। আজও মার্কস তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যান। তাঁর লেখাগুলি আমাদের শেখায় সমাজ পরিবর্তনের মৌলিক সূত্রগুলিকে এবং তাদের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণকে। সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সে-সব লেখা পালন করে নির্দেশিকার ভূমিকা। তিনি তাঁর কাজকে কখনোই শুধুমাত্র পণ্ডিতি এবং দার্শনিক অন্বেষা বলে মনে করতেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানব সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের কাজেই তিনি নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, এতদিন পর্যন্ত দার্শনিকরা পৃথিবীটাকে শুধু ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য হল পৃথিবীটাকে পালটে দেওয়া। একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং দূরদর্শী মার্কস চেয়েছেন এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করতে যেখানে ভাষাগত, বর্ণগত, জাতিগত, আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক বা অন্যান্য ভেদরেখার কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। শ্রেণিকেই একমাত্র ভিত্তি বলে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। তাঁর সে-আহ্বান পৃথিবীজুড়ে শ্রমজীবী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং এক নতুন সমাজের কথাকে মুখরিত করেছিল। যে সমাজ শাসন করবে শ্রমজীবী মানুষ, কোনও মুষ্টিমেয় শোষক সুবিধাবাদী শ্রেণি নয়। তিনি ছিলেন এক মহান মানবতাবাদী যিনি চেয়েছিলেন, বঞ্চিত ও সম্বলহীনদের শ্রেণি শোষণের জোয়াল থেকে মুক্ত করতে।
মার্কসের মধ্যে আমরা দেখতে পাই তত্ত্ব আর ব্যবহারিক কাজের এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর তিন খণ্ডের ক্যাপিটাল হলো এমন একটা দলিল যা যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণে গ্রন্থিত এবং যেখানে প্রতিটি বাক্য তার আগের বাক্যের বক্তব্যকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলে ও সুবিন্যস্ত নিখুঁত বিচার শেষে পরবর্তী বাক্যে উপনীত হয়। এখানেই মার্কস সংশয়হীন যুক্তির সূত্রে বুনন করেছেন মূল তত্ত্বটিকে এবং উৎপাদনের পদ্ধতি-র ধারণাটিকে পরিষ্কারভাবে ও বিকল্পহীনভাবে উপস্থাপনা করেছেন। তাঁর অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার গ্রন্থে মার্কস বাস্তব ঐতিহাসিক পরিস্থিতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং সমাজ গঠন-এ তিনি দেখতে চেয়েছেন কীভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিগুলি পরস্পরের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করছে। এখানে বিশেষ করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ফ্রান্সে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে শ্রেণিশক্তিগুলির নির্দিষ্ট পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে গ্রামীণ জনসমষ্টির প্রতি ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাবসম্পন্ন লুই নেপোলিয়নের মতো একনায়কের উত্থান ঘটিয়েছিল এবং কীভাবে না চাইলেও নেপোলিয়নকে ফ্রান্সের ধনতন্ত্র গড়ে ওঠার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিল। মার্কসের তত্ত্বের বিশেষত্ব ছিল তার জোরালো পর্যবেক্ষণলব্ধ ভিত্তি এবং এখানেই মার্কস অন্যান্য অপেশাদারি তাত্ত্বিকদের চেয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেননা এই তাত্ত্বিকেরা ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে শুধু কল্পনাবিলাসই করে গেছেন, কিন্তু তাদের সে-নতুন পৃথিবীতে পৌঁছানোর কোনও পথ দেখাতে পারেননি।
অধ্যয়নের বিভিন্ন শাখায় অবাধে বিচরণ করাটা ছিল মার্কসের নিজস্ব পদ্ধতি। জীবনের একটা সময়ে তিনি আইন থেকে দর্শনে মনোনিবেশ করলেন, তারপরে চলে গেলেন ইতিহাস বিদ্যায় এবং সবশেষে অর্থনীতি নিয়ে মেতে উঠলেন। মার্কসের মহত্ত্ব শুধু এটাই নয় যে এইসব শাখাগুলির প্রত্যেকটিতে তিনি মৌলিক অবদান রেখে গেছেন, তাঁর মহত্ত্ব এটাও যে এই সকল বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলিকে তিনি একত্রিত করে একটি সুসঙ্গত পূর্ণরূপ দান করেছেন এবং মানব সমাজ বিকাশের কতগুলি সাধারণ সূত্র উদ্ভাবন করেছেন। আজকের সুপার কম্পিউটারের যুগে এবং নিজস্ব বিষয়ের বাইরে উদাসীনতার যুগে মার্কসের এই সকল বিষয়ে স্বচ্ছন্দ বিচরণের ক্ষমতাটি আমাদের অবাক করে দেয়।
মার্কসের আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল, তা হলো তথ্যের প্রতি তাঁর আপসহীন আনুগত্য। যখন তথ্য অন্যরকম বলছে তখন মার্কস তাঁর পূর্বের ধারণা পরিত্যাগ করে ফেলতেন কোনোরকম দোদুল্যমানতা ছাড়াই। যদি প্রাপ্ত প্রমাণের সাথে তত্ত্বের বিরোধ বাধত মার্কস কখনোই তথ্যকে তত্ত্ব অনুযায়ী বিন্যস্ত বা নিয়ন্ত্রণ করতেন না, বরং তিনি সে তত্ত্বকে ছুঁড়ে ফেলতেন অথবা অবকাশ থাকলে তথ্য অনুযায়ী তত্ত্বকে আরও উন্নীত করতেন যাতে এই সমস্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ করা যায়। তাঁর পদ্ধতিটা কেবল ভালো অথবা মন্দ, সাদা অথবা কালোর সরল ব্যাখ্যা ছিল না, আসলে তা ছিল প্রকৃতই দ্বন্দ্বমূলক। আর এই দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়েই মার্কসবাদ আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী মতবাদ।
আমরা মার্কসবাদকে কোনও গোঁড়ামি হিসেবে দেখি না। আমরা, মার্কসবাদীরা, মার্কসকে কখনও পূজার বেদীতেও বসাই না। তিনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তি, এক প্রতিভা, ধনতন্ত্রকে পূর্ণ বিকশিত অবস্থায় না-দেখেই তিনি ধনতন্ত্রের পরিণতির মৌলিক সূত্রকে আবিষ্কার করেছিলেন। তবু তিনি কোনও ‘ঈশ্বর’ ছিলেন না। তিনিও নিজেকে কখনও-ই প্রশ্নাতীত তাত্ত্বিক বলে মনে করতেন না। পরিস্থিতির সাথে সংযুক্ত না-করে যান্ত্রিকভাবে মার্কসের লেখাগুলি পড়ে যাওয়ার পুঁথিগত প্রবণতা হলো মার্কসবাদের বিজ্ঞান থেকে সবচেয়ে বড়ো বিচ্যুতি। আমাদের প্রাত্যহিক সংগ্রামের প্রতিটি বিষয়ে মার্কসের লেখা থেকে নির্দেশিকা খুঁজতে যাওয়াটা কোনও কার্যকরী পদ্ধতি নয়। কার্যকরী বা সৃজনশীল হল সেই পদ্ধতিকে অনুসরণ করা যা মার্কস নিজেই প্রয়োগ করতেন। আর তা হলো, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের পদ্ধতি। এ আলোকেই আমরা সমসাময়িক ঘটনাবলী বিচার করতে এবং বর্তমান গতি-প্রকৃতি বুঝতে সমর্থ হই। কোনও একটি দেশের মার্কসবাদীদের কর্তব্য হলো তাদের নিজস্ব সমাজটার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলিকে অনুধাবন করা, অর্থাৎ তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণায় সমৃদ্ধ হওয়া। একমাত্র তাহলেই মার্কসবাদের সামগ্রিক সূত্রগুলিকে তারা তাদের বিশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন ঠিক এপথেই এগিয়েছিলেন এবং অন্যান্য যাঁরা সংগ্রামকে পরিচালনা করেছেন সাফল্যের সাথে তাঁরাও একই পদ্ধতির অনুগামী হয়েছেন এবং তাঁরা সকলেই মার্কসবাদের ক্ষেত্রকে এভাবে প্রসারিত করেছেন। মার্কসবাদ শুধুমাত্র মার্কসের লেখার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মার্কসের মৌলিক শিক্ষাগুলিকে প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা মার্কসবাদকে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় ক্ষেত্রেই সার্থক করে তুলেছেন। যেসব বিশেষ বিষয় ও পরিস্থিতিকে কার্ল মার্কস দেখে যেতে পারেননি সেসব ক্ষেত্রে মার্কসবাদের প্রয়োগ করতে গেলে সংশোধনবাদ সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হবে, কেননা সংশোধনবাদ মার্কসবাদী চিন্তাধারার মূলগতভাবে পরিপন্থী। সমাজ পরিবর্তনে শ্রেণিসংগ্রামের ভূমিকা, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনের উপকরণগুলির সামাজিক মালিকানা, শ্রেণিশোষণের অবসান, আন্তর্জাতিকতাবোধ এসব কিছু হলো মার্কসীয় তত্ত্বের মূল কথা এবং মার্কসবাদের সৃজনশীল প্রয়োগের নামে এ সবকে কোনোভাবেই লঘু করা যায় না। নানা আকারে, নানা বর্ণে, বামপন্থী অথবা দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির পথ ধরে সংশোধনবাদ আসতে পারে এবং তা আসলে মার্কসবাদের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করতে চায়।
আমাদের দিক থেকে একথা বলতে পারি যে আমরা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিভিন্ন ঘটনাবলী এবং অভিজ্ঞতাকে নিরন্তর পর্যবেক্ষণ করে চলেছি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি তাদের অতীতের ভুলভ্রান্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনা করেছে এবং কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ভুলভ্রান্তি সংশোধনের কথায় তাদের সিদ্ধান্তসমূহ এবং নতুন সমাধানের পদ্ধতিতে আমরা কিছুটা আশ্চর্যান্বিত হয়েছি। কিন্তু এসবও আমরা বিশ্লেষণ করে দেখছি। আমরা মনে করি যে সমাজতান্ত্রিক সমাজ তার উদ্ভূত সমস্যাগুলির সমাধানে কীভাবে এগোবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে আমাদের আরও সময় লাগবে। ধনতন্ত্রের আধিপত্য বিস্তার করা এই দুনিয়ায় এবং ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির সাথে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক চুক্তিতে আবদ্ধ থেকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি আজ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সেসব বিষয় মার্কসের লেখায় অল্পই পাওয়া যাবে। পুঁজিবাদী সমাজ তার পুনঃ পুনঃ সঙ্কট সত্ত্বেও আধা-ঔপনিবেশিক শোষণ ও কারিগরি উন্নতির পথ ধরে কিছু অগ্রগতি ঘটাতে পেরেছে, এটাও আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে। মূলত লেনিনই সমাজতান্ত্রিক সমাজ কীভাবে কাজ করবে তার মূল নিয়মগুলিকে গ্রথিত করেছিলেন। কিন্তু তিনিও প্রধানত সেইসব বিষয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন যেগুলি কিনা একটা পশ্চাদপদ দেশে বলশেভিক বিপ্লবের পর নানা অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছিল এবং বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। লেনিন, যেহেতু তিনি লেনিন, এইসব সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাগুলিকে এক জায়গায় সংহত করতে পেরেছিলেন এবং সার্থক সামগ্রিক সিদ্ধান্তসমূহে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন এবং অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে এখনকার পরীক্ষানিরীক্ষা সম্পর্কে আমরা চোখ-কান খোলা রেখেছি এবং যথাসময়েই আমরা নিজস্ব সিন্ধান্তে পৌঁছাবো। কিন্তু এ কথাটা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে সাতটা দশকের অভিজ্ঞতা সমাজতান্ত্রিক সমাজ পরিচালনার চূড়ান্ত নির্দেশিকা অর্জন করার পক্ষে কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। অন্য সব সামাজিক ব্যবস্থা পূর্ণতা অর্জন করতে কয়েক শতক সময় নিয়েছে। যখন সবকিছু করা হয়ে যাবে তখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মৌলিক নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির শ্রেষ্ঠত্ব অবশ্যই প্রশ্নাতীত হবে। শোষণ ও অত্যাচারের অবসান, ক্ষুধা, বেকারি, গৃহহীনতা ও বার্ধক্যে নিরাপত্তার অভাবের সমস্যার সমাপ্তি হবে এবং এমন একটা সমাজ তৈরি করা যাবে। যেখানে মানুষ হয়ে উঠবে ‘সমাজতান্ত্রিক মানুষ’, যেখানে মানুষ তার স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে সহানুভূতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একে অন্যের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে আর সকলের সমষ্টিগত স্বার্থে কাজ করবে। এসবের কিছু ইতোমধ্যেই সমাজতান্ত্রিক সমাজগুলিতে বিভিন্ন মাত্রায় অর্জন করা সম্ভবপর হয়েছে। কিন্তু, এতগুলো বছর ধরে কিছু নতুন সমস্যাও জড়ো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, সমাজতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই যা সমাধান করতে হবে।
ভারতবর্ষের প্রসঙ্গে এলে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মার্কসের রচনা এদেশের উল্লেখযোগ্য অংশের বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে কাজ করে এমন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। ১৮৫৩ সালের গ্রীষ্মকালে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে মার্কস সরাসরি ভারতবর্ষ এবং তার সমস্যাবলী প্রসঙ্গে কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সব মিলিয়ে হয়তো ৫০০টি শব্দ বা তার চেয়েও কম। কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় সমাজ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সেসব ছিল কিছু নিখুঁততম বর্ণনা। এমনকি যাঁরা মার্কসীয় তত্ত্বের বিরোধী তাদের অনেকেই ভারতীয় অর্থনীতি ও সমাজের ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব সম্পর্কে লেখা এই প্রবন্ধগুলির প্রশংসা করেছেন এবং প্রবন্ধগুলি ব্যাপকভাবে আজও পড়া হয়। ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে তিনি যে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন তা এদেশের কিছু ইতিহাসবিদকে চমৎকৃত করে, যার পরিণামে এদেশে মার্কসবাদী ঐতিহাসিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সনাতন গ্রামীণ অর্থনীতির ধ্বংসসাধন, কৃষক ও কারুশিল্পীদেরকে নির্মম শোষণ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তার কর্তাদের হাতে দেশের সীমাহীন দুর্দশা এবং ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের জন্য ভারত থেকে রসদ পাচার এ সবকে মার্কস সমালোচনা করেছেন সুতীক্ষ্ণ ভাষায়। ভারতের উদাহরণ টেনে এনে মার্কস দেখিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক শোষণ কীভাবে পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শিল্প অগ্রগতির প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করে। ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মার্কস বলেছেন, “বুর্জোয়া সভ্যতার অন্তর্নিহিত ভণ্ডামি এবং সহজাত বর্বরতা আমাদের চোখের সামনে আজ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, তা সে স্বদেশে কিছু উন্নতরূপেই হোক অথবা উপনিবেশগুলিতে নগ্নরূপেই হোক। একই সাথে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অন্যদিকটিও মার্কসের দৃষ্টি এড়ায়নি এবং তিনি বলেছেন যে সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা সেখানে ‘ইতিহাসের অচেতন যন্ত্র’ হিসেবে কাজ করছে। ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে কর্মচ্যুত কারুশিল্পী এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত কৃষকদের প্রতি মার্কস সমবেদনা জানিয়েছেন, ব্রিটিশ শাসকদের ধিক্কার দিয়েছেন, সাথে-সাথে সনাতন কাঠামোর ধ্বংস সাধনের ইতিবাচক দিকটির প্রতিও অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। মার্কস বলেছেন, এর ফলে বহির্দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে উৎপাদন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নততর সামাজিক ব্যবস্থার রূপান্তরের পথ প্রশস্ত হয়েছে। তিনি জানতেন যে ব্রিটিশ রাজত্ব অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না। তাঁর কথায়, ‘ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা ভারতীয় সমাজে যে নতুন উপাদানগুলি এনেছে ভারতীয়রা তার সুফলকে ব্যবহার করতে পারবে না যতক্ষণ না গ্রেট ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণি শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে জয়লাভে সমর্থ হবে অথবা হিন্দুরা নিজেরাই ইংল্যান্ডের শাসকদেরকে ছুঁড়ে ফেলবার মতো যথেষ্ট শক্তি অর্জন করবে।’
এই কথাগুলি থেকে বোঝা যায় যে মার্কস ব্রিটেনের প্রলেতারীয় সংগ্রামের সাথে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে সম্পর্ককে পূর্বানুমান করতে পেরেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংখ্যায় অল্প হলেও ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের জোরালো এবং সার্বিক অঙ্গীকার সে-দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিশেষত মার্কসবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আমি তখন ইংল্যান্ডে পড়তে এসেছি। সে-সময় আরও অনেকের সাথে আমিও মার্কসবাদ চর্চা শুরু করি। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিজিবি) এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করে এবং আমরা মার্কসবাদের প্রতি অনুরাগী হই। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে লেবার পার্টিতে একাধিক মতামত ও বিভ্রান্তি ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিক বিপ্লব তখন হয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যেই ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন জানালেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা শুরু করলেন। এসব কিছু মার্কসবাদীদের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতারই প্রমাণ। এই অনুপ্রেরণাতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন পরে গড়ে উঠলো সারা ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এবং ১৯৩৬ সালে সারা ভারত কৃষক সংগঠন, যেখানে মার্কসবাদীরা এবং বুর্জোয়া উদারনৈতিক রাজনৈতিক কর্মীদের বাম ঘেঁষা অংশটি যোগ দিল। শ্রমিক ও কৃষকদের এই দুই সংগঠন জাতীয় স্বাধীনতার সাথে-সাথে শ্রমিক ও কৃষকদের শ্রেণিভিত্তিক দাবিগুলিকেও তুলে ধরল। মার্কসবাদীরা ছাড়া ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু অংশও সে-সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্যান-ধারণার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হলেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য ছিলেন জওহরলাল নেহরু যিনি স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রূপে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জওহরলাল সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর আসক্তির কথা তিরিশের দশকে প্রথম ঘোষণা করলেন এবং কোনও সন্দেহের অবকাশ না রেখেই বললেন যে ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে তিনি ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই’ বোঝেন। এইসময় তার বিভিন্ন লেখায় জওহরলাল আরও ব্যাখা করলেন যে তিনি অক্টোবর বিপ্লবের রাজনৈতিক গুরুত্বকে উপলব্ধি করেন এবং পরিকল্পিত বিস্ময়কর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাদির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাপক অগ্রগতিকে স্বীকার করেন। সারা ভারত কৃষক সংগঠন এবং সারা ভারত ছাত্র ফেডারেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন, যদিও পরে এই দুটি সংগঠনেরই নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়ান। মার্কসবাদীদের তোলা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে ফৈজপুর প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনিই সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেন। ফৈজপুর প্রস্তাবে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস জমিদারি প্রথার অবসান এবং ভূমিহীনদের ভূমি বিতরণের অঙ্গীকার গ্রহণ করে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের তত্ত্বাবধানে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি এবং কৃষি সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। জীবনের শেষবেলায় এসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতি জওহরলালের বিশ্বাসটি ফিকে হয়ে পড়ে এবং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তিনি নানা ধরনের কথা বলা শুরু করেন। তবু এটা উল্লেখ্য, স্বদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে তুললেও তিনি নানা সময়ে মার্কসবাদীদের মতো কথাবার্তা বলতেন যাতে সাধারণ জনসমষ্টির কাছে বাহাদুরি পাওয়া যায়। উন্নত পশ্চিমী পুঁজিবাদী দেশগুলির বজ্রমুষ্টির কবল থেকে ভারতে স্বাধীন পুঁজিবাদী বিকাশের পথ অবলম্বনের জন্য তিনি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির কারিগরি ও অর্থনৈতিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন। কখনও কখনও তিনি দমনমূলক নীতি নিয়েছিলেন, বিশেষ করে মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে এবং বিনা বিচারে তাদেরকে বছরের পর বছর বন্দী করে রেখেছিলেন। তবুও নেহরুর সময়কার ভারত এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর সময়েও ভারত তার রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের শিল্প ও আধুনিক শিল্প নির্মাণ, ভারসাম্যযুক্ত বাণিজ্য ও বিস্তৃততর রপ্তানি বাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্মানজনক শর্তে ঋণ বা কারিগরি সাহায্য পাবার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির উপরই প্রধানত নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিল। যদিও তারপরে পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক দেশগুলি ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সেদিন কিন্তু তাদের সাথে কিছুটা দর-কষাকষির মতো অবস্থান ভারত গ্রহণ করতে পেরেছিল। জোট-নিরপেক্ষতা এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ভারতের বৈদেশিক নীতির অন্যতম স্তম্ভ এবং এটা ভারতীয় পুঁজিবাদীদের স্বাধীন থেকে উন্নতির ইচ্ছার সাথে অবশ্যই সঙ্গতিপূর্ণ।
১৯২০-র দশকের প্রথম দিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। প্রায় সাথে সাথেই পার্টি ঔপনিবেশিক রাজত্বের বর্বর আক্রমণের সম্মুখীন হয়। ব্রিটিশ সরকার পার্টির নেতাদের গ্রেপ্তার করে এবং কয়েক বছর ধরে তাদেরকে কারাগারের অন্তরালে আটকে রাখে। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা, কানপুর যড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই মামলাগুলির বিচার চলাকালীন বক্তব্য রাখতে গিয়ে এবং অন্যান্য আরও কিছু ঘটনা উপলক্ষে কমিউনিস্টরা প্রথম তাদের দৃষ্টিভঙ্গির কথা সোচ্চারভাবে তুলে ধরে। তিরিশের দশকের অধিকাংশ সময়টাতে পার্টি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে কাজ করতে থাকে, কেননা এই কংগ্রেস তখন ছিল সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সকল জনসমষ্টির এক মঞ্চ। বহু পার্টিকর্মী বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেসের নেতা রূপে পরিগণিত হন এবং বহু কংগ্রেস কর্মী, বিশেষত কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠীর অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। কিছু জায়গায় প্রধানত বাংলা এবং পাঞ্জাবে বহু বিপ্লবী, যাঁরা ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যধারায় বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা, এমনকি জেলের অভ্যন্তরেই পার্টিতে যোগ দেন। এই সমস্ত কিছু ট্রেড ইউনিয়ন ও ভূমি আন্দোলনে এবং কংগ্রেস সংগঠনের মধ্যে পার্টির ভূমিকাকে শক্তিশালী করে তোলে।
কিন্তু এসব কাজের সাথেসাথে ভারতীয় কমিউনিস্টরা সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি তাদের গভীর আনুগত্যকে রক্ষা করে গেছে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, নাৎসি জার্মানির ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে লড়ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারতের কমিউনিস্টরাও বিশ্বের সর্বহারার নেতৃত্বের সাথে অভিন্ন হৃদয়ে এই যুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ বলে ঘোষণা করলো এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষার সপক্ষে প্রচার কর্মসূচীতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করলো। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় মুক্তি আন্দোলন থেকে কমিউনিস্টরা এর ফলে সাময়িক বিচ্ছিন্নতার শিকার হলো। পার্টির সেসময়কার কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রতি ও আন্তর্জাতিকতার প্রতি ভারতীয় কমিউনিস্টদের ঐকান্তিকতা ও আস্থা ছিল সবরকমের সমালোচনার ঊর্ধ্বে। তৎকালীন দিনগুলিতে পার্টির প্রতি জনসমর্থনের যে-ঘাটতি দেখা দিয়েছিল তা ছিল সাময়িক। পরবর্তী দিনগুলিতে যুদ্ধের শেষদিকে পার্টির নেতৃত্বে ঐতিহাসিক সংগ্রামগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে নৌবিদ্রোহের সময় বা ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে সুভাষচন্দ্র বসু-র নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্যদের বন্দিত্ব থেকে মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে পার্টিকর্মীরা শামিল হয়েছিল। বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশের তেলেঙ্গানায় ছয় বছরব্যাপী কৃষক আন্দোলনের কথা আমরা জানি, যে-আন্দোলনে ৫০০০ মানুষ শহীদের মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আমরা জানি বাংলার তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাসও, যাতে জীবন দিয়েছিলেন বহু কৃষক। এই দুই ঐতিহাসিক আন্দোলনে এবং সারা দেশে আরও কয়েকটি কৃষক আন্দোলনে কমিউনিস্টদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ভোলার নয়।
আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি ভারতীয় কমিউনিস্টদের দায়বদ্ধতা আবার ১৯৫১-৬৪ সালে পরীক্ষার সম্মুখীন হলো। ভারত এবং চীনের মধ্যেকার সীমান্ত বিরোধ শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতে পরিণত হলো। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভারত সরকার আমাদেরকে দেশ-বিরোধী বলে আখ্যা দিলেন এবং আমাদের মধ্যে অনেককেই তারা গ্রেপ্তার করলেন এমনকি যেদিন যুদ্ধ শেষ হলো সেদিনও। এই বিষয়টি এবং আরও অন্যান্য বিষয় যেমন সামগ্রিক আন্তর্জাতিক আদর্শগত প্রশ্ন বা ভারতীয় রাষ্ট্র ক্ষমতার চরিত্র ইত্যাদি নিয়ে পার্টির মধ্যে বিতর্ক ঘনীভূত হয়ে উঠলো। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও আমাদেরকে ‘জাতিবিরোধী’, ‘চীনের দালাল’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ রূপে সে-সময় চিহ্নিত করা হলো তবু কেরালাতে ১৯৬৫ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিপিআই(এম)-র বেশ কিছু প্রার্থী জেলে বন্দী অবস্থাতেই জয়লাভ করলেন। শুধু তাই নয়, আমাদের পার্টি রাজ্যের সে-নির্বাচনে কংগ্রেসকে পরাজিত করে সর্বাধিক সংখ্যক আসন লাভে সমর্থ হলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সে-রায়কে মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং কমিউনিস্টদের সে রাজ্যে সরকার গড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে ভারত সরকার নির্বাচনটাকেই বাতিল বলে ঘোষণা করলেন। কিন্তু তাদের এ সিদ্ধান্ত জনগণ যে মেনে নেননি তার প্রমাণ মিললো ১৯৬৭ সালে। সেবছরের সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্টরা পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরালাতে বৃহত্তম পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো এবং অন্যান্য বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক পার্টিগুলির সাথে হাত মিলিয়ে সেই রাজ্য দুটিতে সরকার গঠন করলো।
সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার অর্থ কখনও-ই কোনও না কোনও বড়ো পার্টির প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য নয়। ১৯৬৪ সালে তার জন্মলগ্ন থেকে আজ ২৫ বছর পেরিয়ে আসার প্রতিটি মুহূর্তে সিপিআই(এম) এটাও মনে করে যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে নানা বিতর্কিত প্রশ্নের ও সমস্যার বিশ্লেষণে প্রত্যেক পার্টির স্বাধীন উদ্যোগ থাকাটা জরুরি। প্রতিষ্ঠার পর আমাদের পার্টির তিন বছর লেগেছিল আন্তর্জাতিক বিষয়গুলি সম্পর্কে স্বাধীন মত প্রকাশ করতে এবং ১৯৬৭ সালে এক দলিলে পার্টি প্রথম তা জানায়। পৃথিবীর বৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ভারতের শাসকশ্রেণিকে যেভাবে পরস্পরবিরোধী চরিত্রসম্পন্ন বলে মনে করেছে সিপিআই(এম) তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং ভারতীয় বাস্তবতা অনুযায়ী তার নিজস্ব ধারণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে শাসকশ্রেণির চরিত্র নির্ধারণ করে। এ ঘটনাও সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টিসহ আরও কয়েকটি পার্টির থেকে সিপিআই(এম)-কে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে। যদিও আমাদের স্বাধীন অবস্থান জনগণের সাথে আমাদের সম্পর্ককে গভীর করতে সাহায্য করেছিল। সত্তরের শেষ দিকে অবশ্য অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং মতপার্থক্য সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন সহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ এবং অন্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির সাথে আমাদের আনুষ্ঠানিক ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমাদের সাধ্যমতো আমরা জনগণকে সংগঠিত করেছি বিবিধ আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর সংহতিমূলক কর্মসূচিতে, নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবিতে, নামিবিয়াতে বর্ণবিদ্বেষী শাসনের অবসানের দাবিতে, স্বাধীন প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের দাবির সমর্থনে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিকারাগুয়ার সংগ্রামের প্রতি সাহায্যে এবং প্রবল পরাক্রমশালী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামি জনগণের সেই কিংবদন্তিসম লড়াইয়ে আমরা জনগণকে সমবেত করতে পেরেছি। আফগানিস্তান সরকারের প্রতি আমরা সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। পারমাণবিক অস্ত্রভারমুক্ত, বিপর্যয়ের সম্ভাবনামুক্ত নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরন্তর উদ্যোগকে আমরা বারবার প্রচারের মধ্যে নিয়ে এসেছি। ভারত সরকারের জোট-নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতিকে সমর্থন করেও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ প্রস্তুতি ও শান্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শাসকদলও সরকারের অনিচ্ছা ও এ বিষয়ে আমাদের দেশে জনমত গড়ে তোলায় তাদের অনীহারও আমরা সমালোচনা করেছি। এইসব প্রশ্নে আমাদের অবস্থান সারা দেশজুড়ে জনমতকে প্রভাবিত করতে পেরেছে।
স্বাধীনতার পর চার দশক ধরে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অবিরত শিক্ষা নিয়ে চলেছি এবং একই সঙ্গে ভারতের বিশেষ সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতে মার্কসবাদকে সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করতে চেষ্টা করেছি। নির্ভর করার মতো কোনও পূর্ব উদাহরণ আমাদের নেই। ১৯৫৭ সালেই ৩ কোটি জনসংখ্যার কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং রাজ্য সরকার গঠন করে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভ করা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এক অভিনব অভিজ্ঞতা। যদিও রাজ্য বিধানসভায় আমাদের গরিষ্ঠতা ছিল প্রশ্নাতীত, তবু আইন শৃঙ্খলার অবনতির অহেতুক অজুহাত তৈরি করে নেহরুর নেতৃত্বে পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার তার বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে কেরালা সরকারকে বরখাস্ত করে। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝলাম যে যদিও কমিউনিস্টরা তাদের পার্টি কর্মসূচী অনুযায়ী বুর্জোয়া সংবিধানের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এখন কাজ করতে প্রস্তুত কিন্তু ভারতীয় বুর্জোয়ারা তা মেনে নেওয়ার মতো যথেষ্ট গণতান্ত্রিক নয়। আমি আগেই বলেছি যে ১৯৬৫ সালের কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে কমিউনিস্টরা আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করলেও তাদেরকে রাজ্য সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। এটাও আমি বলেছি যে ১৯৬২ সালে চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় যাদেরকে ‘জাতীয়তা-বিরোধী’ বলে জেলে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছিল, সেই মার্কসবাদীদের নেতৃত্বে কেরালাতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করা হলো, কিন্তু পুনরায় কেন্দ্রীয় সরকার কৌশলে তার পতন ঘটায়। কেরালাতে গণতন্ত্রের ওপর এই নগ্ন আক্রমণ সত্ত্বেও কমিউনিস্টরা রাজ্যের নির্বাচনে বারবার জিততে থাকে। এখন সেখানে সিপিআই(এম)-র নেতৃত্বে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকারে রয়েছে এবং বিরোধীপক্ষে রয়েছে কংগ্রেস(আই)-র নেতৃত্বে জোট বাঁধা সাম্প্রদায়িক ও জাতপাতভিত্তিক দলগুলি। পশ্চিমবঙ্গে (প্রায় ৬ কোটি জনসংখ্যার রাজ্য) আমাদের অভিজ্ঞতা কেরালা থেকে আলাদা কিছু নয়। প্রথম থেকেই রাজ্য বিধানসভায় আমরা কমিউনিস্টরা ছিলাম প্রধান বিরোধী দল। ১৯৬৭ সালে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক অকংগ্রেসী দলগুলিকে নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট কংগ্রেসকে পরাজিত করে সেখানে সরকার গঠন করে। নয় মাসের মধ্যে রাজ্যের রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের অনুচর হিসেবে যুক্তফ্রন্টের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন এবং সরকারকে বরখাস্ত করেন। ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট আরও গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করলো এবং সিপিআই(এম) এই ফ্রন্টের বৃহত্তম শরিক রূপে আত্মপ্রকাশ করলো। কিন্তু আবার বিভেদের খেলা সংগঠিত করা হলো এবং এক বছর পর দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারেরও পতন ঘটলো এবং রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হলো। ১৯৭১ সালে নির্বাচনে সিপিআই(এম) একক বৃহত্তম দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজ্যে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। এরপর চরম নিপীড়ন নেমে এলো এবং ১৯৭২ সালের নির্বাচনে রিগিং করা হলো। তারপর শুরু হলো রাজ্যজুড়ে আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের যুগ। পাঁচ বছর ধরে তা স্থায়ী ছিল। এই রাজত্ব শেষ হলো ১৯৭৭ সালে, যখন সাধারণ নির্বাচনে সিপিআই(এম)-র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট কংগ্রেস(আই)-কে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে সরকার গঠন করলো। সেই বামফ্রন্ট সরকার এখনও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন। ১৯৮২, ১৯৮৭-র বিধানসভা নির্বাচন এবং স্থানীয় সংস্থাগুলি ও লোকসভার নির্বাচন সবেতেই বামফ্রন্ট প্রার্থীরা বিপুলভাবে জয়ী হয়েছেন। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৫১টি আসনে বামফ্রন্টের এবং ৪০টি আসন কংগ্রেস(আই) সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সিপিআই(এম) বিধানসভায় নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠ। গ্রামস্তরে পঞ্চায়েত ও পৌরসভাতেও বামপন্থীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তৃতীয় যে-রাজ্যটিতে সিপিআই(এম)-র নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ এই ১০ বছর ধরে ক্ষমতাসীন ছিল সেটি ২৫ লক্ষ জনসংখ্যার ত্রিপুরা। কিন্তু ১৯৮৮-র ফেব্রুয়ারিতে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস(আই) সে-রাজ্যের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে কোনোরকম বিবেকবোধের পরোয়া না করে নিজেদের নীতিহীন কাজে ব্যবহার করলেন, সরাসরি মিলিটারি সাহায্য নিলেন এবং রিগিং সংগঠিত করা হলো। এমনকি এ-হেন নির্বাচনেও বামফ্রন্ট আসনের সংখ্যার বিচারে গরিষ্ঠতা হারালেও ভোটের বিচারে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোট পেলো।
ভূমিসংস্কার, নির্বাচিত স্থানীয় সংস্থাগুলিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, বঞ্চিত পশ্চাদপদ উপজাতি, আদিবাসী সম্প্রদায় ও মহিলা সমাজের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করা, ট্রেড ইউনিয়ন কৃষক সংগঠন এবং অন্যান্য গণসংগঠনকে পুলিশী সন্ত্রাসমুক্তভাবে অবাধে কাজ করতে দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বন্ধে কার্যকরী ভূমিকা নেওয়া— এইসব কাজের বামফ্রন্টের শাসনে তিনটি রাজ্যেই ঐকান্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসবের মধ্যে দিয়ে বামফ্রন্ট বা বাম-গণতান্ত্রিক সরকারগুলি নিজেদের অতীতের কংগ্রেস বা কংগ্রেস(আই) সরকারগুলির বিপরীত অবস্থান সম্পর্কে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে এবং কায়েমি স্বার্থবাহীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের বর্ধিত সংখ্যায় সমবেত করতে পেরেছে। ফলত একদিকে যেমন গণসংগঠনগুলি সদস্য সংখ্যার বিচারে ও কাজকর্মের বিচারে প্রসারিত হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও পরিকল্পনা কর্মসূচি রূপায়ণে ব্যাপক অংশের জনগণ অংশগ্রহণ করেছেন। কোনোরকম অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বামফ্রন্ট সরকাররা দেয়নি এবং বারবার যে-কথাটা জোরের সাথে তুলে ধরেছে তা হল ভারতীয় সংবিধানের এই কাঠামোর মধ্যে একটা রাজ্য সরকার কখনোই দারিদ্র্য, বেকারি, বৈষম্যসহ জনজীবনের মৌলিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে পারে না। এইসব মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে হলে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্র চরিত্রের আমূল পরিবর্তন করতে হবে এবং একটা রাজ্যে ক্ষমতায় আসীন হয়ে এই আমূল পরিবর্তন করা যায় না। তবে এইধরনের পরিবর্তনের জন্য জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এই রাজ্য সরকারগুলি অবশ্যই সারা দেশের কাছে তাদের কাজকর্মের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে। রাজ্যস্তরে আমাদের সরকারগুলিকে আমরা এইরকম দিকনির্দেশক হিসেবেই দেখি এবং মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপরূপে মনে করি। এই রাজ্যগুলিতে যে-ভূমিসংস্কার করা হয়েছে তা অন্য রাজ্যের কৃষক সংগঠনগুলিকে উৎসাহিত করেছে। জমির স্বত্ত্বাধিকারের সীমা নির্ধারণের জন্য আমরা যেভাবে আইন প্রণয়ন করেছি এবং প্রাশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছি, এক বিরাট পরিমাণ উদ্বৃত্ত জমি আমরা যেভাবে বণ্টন করেছি এবং বর্গাদার উচ্ছেদ বন্ধে আমরা যে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছি সেসব ঘটনাকে অন্যান্য রাজ্যে বাস্তবায়িত করার জন্য সে রাজ্যগুলির কৃষক সংগঠন সেখানকার রাজ্য সরকারগুলির কাছে জোরালো দাবি তুলেছে। অতীতের মতো ট্রেড ইউনিয়ন সমস্যায় পুলিশি হস্তক্ষেপ আমরা বন্ধ করেছি। এটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ-দৃষ্টান্ত স্বাভাবিকভাবেই অন্য রাজ্যের ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে সাহায্য করছে ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশি হস্তক্ষেপে বন্ধ করার পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে। গ্রামীণ এলাকায় নির্বাচিত স্থানীয়-সংস্থা পঞ্চায়েতের মাধ্যমে কাজ করার যে-পদ্ধতি পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার কার্যকর করেছে তা অন্যান্য রাজ্যে এমনতরো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলতে এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারকেও বাধ্য করেছে। রাজ্যের অর্থনীতির সামগ্রিক প্রয়োজনের কথা ভেবে আমরা শিল্পক্ষেত্রে নানারকম উপায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে যৌথ ক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমরা সাহায্য করছি এবং উৎসাহ দিচ্ছি। বৃহদাকার ও আধুনিক শিল্প স্থাপন করতে আমরা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, সাথেসাথে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প যা কিনা শ্রমনিবিড় অল্প পুঁজিভিত্তিক তাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছি।
বামপন্থী রাজ্য সরকারগুলির শক্তি হলো শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী, ছাত্র, যুব, মহিলা, শিক্ষক এবং অন্যান্য গণসংগঠনগুলির ব্যাপক সমর্থন। এই রাজ্যগুলির জনগণের বিভিন্ন অংশকে গণসংগঠনগুলির মঞ্চে ব্যাপকভাবে সমবেত করাটা আমাদের কৃতিত্ব এবং একারণেই এই রাজ্যগুলির বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা জিতে চলেছি। সরকারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং কর্মসূচি রূপায়িত করার প্রশ্নে, কেন্দ্রের শাসকদলের চক্রান্ত ও দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে, আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই সংগঠনগুলি বিরাট ভূমিকা পালন করছে।
আমাদের দেশের বুর্জোয়া-জমিদারদের প্রতিভূ সরকারের ধনিক-তোষণ নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়ার সাথেসাথে আমাদের গণসংগঠনগুলি দেশজুড়ে মাথাচাড়া দেওয়া বিভেদকামী শক্তিগুলির বিরুদ্ধেও সাধ্যমতো রুখে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রেণিনীতি দেশের নানা প্রান্তে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এবং যেখানে বামপন্থী পার্টি ও গণসংগঠনগুলি দুর্বল বা কার্যত অনুপস্থিত সেখানে এইসব বিক্ষোভ বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন অভাব-অসন্তোষ নিয়ে জনমনকে বিষাক্ত করে তুলতে এইসব জাতপাতভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক আঞ্চলিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি তৎপর হয়ে উঠেছে। বহু রাজ্যেই স্থানীয় কংগ্রেস(আই)-এর শাখাগুলি এইসব প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে সংকীর্ণ ও তাৎক্ষণিক নির্বাচনী স্বার্থে এইসকল শক্তিগুলির সাথে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা করে চলেছে। কংগ্রেস(আই)-র এই সুবিধাবাদী ও আত্মহননকারী নীতির ফলেই আজ পাঞ্জাব, কাশ্মীর, আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি বিপজ্জনক চেহারা নিয়েছে। দেশের ঐক্য ও সংহতিকে তারা মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করতে চাইছে। দেশের ঐক্যের প্রশ্নটিকে তাই আজ আমরা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছি। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে সকলরকম সম্প্রদায়গত, জাতপাতভিত্তিক ও আঞ্চলিক মনোভাবের ঊর্ধ্বে শ্রেণি সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জনগণের বিশালত্ব এবং সাংস্কৃতিক-সম্প্রদায়গত-ভাষাগত বৈচিত্র্যেরা তুলনায় এ কাজটা মোটেই সোজা নয়। তবু সুবিধাবাদী বুর্জোয়া পার্টিগুলির বিপরীতে আমাদের নীতিনিষ্ঠ অবস্থান দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন জনগণের কাছে ক্রমশই জনপ্রিয় হচ্ছে। বামপন্থী ফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্যগুলি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মুক্ত। তফসিলী জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার এই রাজ্যগুলিতে হয় না। কিন্তু বুর্জোয়া-ভূস্বামী পরিচালিত রাজ্যগুলিতে এসব অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুই অবস্থার পার্থক্য জনগণের নজর এড়াচ্ছে না। আমাদের সমস্ত কাজকর্মে মার্কসবাদ আমাদের পথপ্রদর্শক।
আমরা জানি আমাদের এখনও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। লক্ষ্য আমাদের স্থির আর তাহলো জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। গোটা দেশের কথা ধরলে আমরা এখনও যথেষ্ট দুর্বল। আমাদের সামনে যে-পথটা পড়ে রয়েছে তা অবশ্যই ফুল বিছানো পথ নয়। সংসদীয় কাজ ও সংসদ বহির্ভূত লড়াইকে একত্রিত করে আমরা চলছি। আমরা বিশ্বাস করি গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ সংগ্রামে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে থাকা আমাদের শ্রেণিশত্রুরা আমাদেরকে সেই অনুযায়ী কাজ করতে দেবে না। আমাদের পার্টি কর্মসূচিতে আমরা ঘোষণা করেছি যে আমরা চাই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এখনই আমরা লক্ষ্য করেছি যে শাসকশ্রেণি সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপর কীরকম ক্রমবর্ধমান হারে আক্রমণ নামিয়ে আনছে। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসকে দেশের শাসকদলই কলঙ্কিত করেছে গণতান্ত্রিক ক্রিয়াপদ্ধতি ও মূল্যবোধ ভাঙার অসংখ্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্যে দিয়ে। অন্য দেশের কমরেডরা তাদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের সাহায্য করছেন এবং আমরা এরজন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের বিরাট সাফল্য থেকে যেমন আমরা অনুপ্রেরণা পাচ্ছি, তেমনই তাদের ভুলভ্রান্তি বা বিচ্যুতি থেকে আমরা অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করছি। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির দ্বারা অনুসৃত নতুন নীতিগুলি আমরা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছি ও পর্যালোচনা করছি।
জ্যোতি বসুর এই ভাষণের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল মার্কসবাদী পথ পত্রিকার আগস্ট, ১৯৮৯ সংখ্যায়
লন্ডনের মার্কস মেমোরিয়াল লাইব্রেরিতে বসু এই ভাষণ দিয়েছিলেন ১৯৮৯ সালের ৩ জুলাই
প্রকাশের তারিখ: ২১-অক্টোবর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
