সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারত কি হিন্দু রাষ্ট্রের কিনারায়? (প্রথম পর্ব)
সৌমিত্র বসু
প্রধানমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যের উৎস বোধহয় হীনমন্যতা, কারণ RSS বা সংঘ পরিবারের কোনো ব্যক্তিরই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের অংশগ্রহণের কোন ইতিহাস নেই। এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায় আন্দামানের সেলুলার জেলে। ব্রিটিশ আমলে প্রধান প্রধান স্বাধীনতা সেনানী যাদের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট মনে করত তাদের প্রধান শত্রু সেইসব ব্যক্তিদের দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হত, পাঠিয়ে দেওয়া হত আন্দামানের সেলুলার জেলে। সেখানে এখনও খোদাই করা আছে সেই সমস্ত স্বাধীনতা সেনানীদের নাম যাদের ব্রিটিশরা সেখানে বন্দী করে রেখেছিল। সেখানে এই সংঘ পরিবারের কোনো ব্যক্তির নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না এক সাভারকার ছাড়া, যে সাভারকার আবার একাধিকবার ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিল যে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ব্রিটিশ বিরোধী কোনো কার্যে লিপ্ত হবে না।

৫ই আগষ্ট এই তারিখটি এমনিতে স্মরণীয়। ১৮৯৫ সালের ৫ই আগষ্ট প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এর প্রয়াণ দিবস। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস যৌথভাবে একটি মতবাদের প্রতিষ্ঠা করেন- যা মার্কসবাদ নামে পরিচিত। শোষণমুক্ত এক উন্নত মানবসমাজের পথের সন্ধান দিয়েছে এই দর্শন, সেই কারণে স্বাভাবিকভাবেই এই মতবাদের একজন অন্যতম স্রষ্টার প্রয়াণ দিবসও স্মরণীয়। আবার, ৫ই আগষ্ট আর একটি কারণেও স্মরণীয়। ৫ই আগষ্ট, এই দিনটি ভারতবর্ষের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা কমরেড মুজফফর আহমেদ এর জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়।
কিন্তু ২০১৯ ও ২০২০ সাল, পর পর এই দুবছর ৫ই আগষ্ট তারিখে যে দুটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে আমাদের দেশে তাতে করে আগামী দিনে ৫ই আগষ্ট তারিখটি আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
২০১৯ এর ৫ই আগষ্ট জম্মু ও কাশ্মীর এর Special Status বাতিল করা হয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকাকে দু-টুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে।
আর, ২০২০ সালের ৫ই আগষ্ট রামমন্দিরের ভূমিপুজো ও শিলান্যাস করলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। উপস্থিত ছিলেন উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে RSS প্রধান মোহন ভাগবত। এ কী ধর্মের রাষ্ট্রীয়করণ? নাকি রাষ্ট্রের ধর্মান্তকরণ !!
RSS এর ২টি পাইলট প্রোজেক্টই পরপর ২ বছরে বিজেপি সরকারের দ্বারা কার্যকরী করা হল।
আর এবারের ২০২৫ সালের ১৫ই আগষ্ট, লাল কেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী RSSকে glorify করেছেন। তাকে উল্লেখ করেছেন বিশ্বের বৃহৎ NGO হিসাবে। এবং RSS এর প্রতিষ্ঠার ১০০তম বার্ষিকী উপলক্ষে যে ডাকটিকিট ও ১০০ টাকার মুদ্রা প্রকাশ করেছেন তা ভারতের সংবিধানের প্রতি এক গভীর আঘাত ও অপমান। যা আরও গুরুতর হলো, সরকারি মুদ্রায় RSS প্রচারিত হিন্দু দেবী ভারতাত্মা প্রতীকটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। ঐ প্রতীক সংঘের সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ব রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণার প্রতিফলন। এই গোটা প্রয়াসের উদ্দেশ্যই হলো RSS এর লজ্জাজনক ভূমিকা আড়াল করা। RSS শুধু স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে দূরে ছিল তা নয়, স্বাধীন ভারতের সংবিধানও তারা স্বীকার করে নি। আজও RSS ও সংঘ পরিবার সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিশানা করছে। মনুবাদী মতাদর্শকে উৎসাহিত করছে। এই হল RSS এর প্রকৃত ইতিহাস, যাকে নিজের পদকে অপব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী গোপন করতে চাইছেন এবং RSSকে আইনবদ্ধ করা এবং তাদের মুসলিম, খৃস্টান ও কমিউনিস্ট বিদ্বেষকে মান্যতা দেওয়ার নজীর সৃষ্টি করলেন RSSএর প্রচারক নরেন্দ্র মোদী। এখানে সাম্প্রতিক কালের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য, ছত্তিশগড় গ্রামাঞ্চলে গ্রামসভা পাদ্রীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। ছত্তিশগড় হাইকোর্ট ও মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামসভার এই সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়েছে। এর থেকে সহজেই অনুমেয় RSS এর ভাবধারায় বিচার ব্যাবস্থারও একটা অংশ প্রভাবিত হচ্ছে।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠিত হবার পরই ভারতবর্ষ দক্ষিনপন্থার দিকে পুরোপুরি ঢলে পড়ে। ২০১৯ এর পর তা আরও সংহত হয়েছে। এবারের এই সরকার গঠনের অর্থ এই নয় যে, পূর্বে ক্ষমতাসীন একটি বুর্জোয়া দলের পরিচালনাধীন জোট সরকারের পরিবর্তে শুধুমাত্র অন্য আরেকটি বুর্জোয়া দলের নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতাসীন হওয়া। বিষয়টি অত সরল নয় কারণ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের ধারক RSS এর রাজনৈতিক শাখা হিসাবে বিজেপির অবস্থান অন্যানা বুর্জোয়া দলগুলি থেকে আলাদা। কারণ, বিজেপির মতাদর্শগত ও দর্শনগত ভিত্তি রয়েছে হিন্দুরাষ্ট্রের অত্যন্ত ক্ষতিকারক তত্ত্বের মধ্যে। 'BJP has exposed itself as the most reactionary section of the ruling classes’.
রাম ও রামমন্দির
দীর্ঘদিন ধরে RSS এর রাজনৈতিক প্রকল্প (Political Project) ছিল রামমন্দির নির্মাণ। RSS এর একজন মুখ্য প্রচারক এখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র মোদি। রামমন্দিরের শিলান্যাস করতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এক নতুন যুগের সূচনা হল'। বলেছেন রামমন্দির হল রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির আধুনিক প্রতীক।
তিনি আরও বলেছেন স্বাধীনতার আন্দোলনের মতই রামজন্মভূমির আন্দোলনও হল একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যের উৎস বোধহয় হীনমন্যতা, কারণ RSS বা সংঘ পরিবারের কোনো ব্যক্তিরই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের অংশগ্রহণের কোন ইতিহাস নেই। এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায় আন্দামানের সেলুলার জেলে। ব্রিটিশ আমলে প্রধান প্রধান স্বাধীনতা সেনানী যাদের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট মনে করত তাদের প্রধান শত্রু সেইসব ব্যক্তিদের দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হত, পাঠিয়ে দেওয়া হত আন্দামানের সেলুলার জেলে। সেখানে এখনও খোদাই করা আছে সেই সমস্ত স্বাধীনতা সেনানীদের নাম যাদের ব্রিটিশরা সেখানে বন্দী করে রেখেছিল। সেখানে এই সংঘ পরিবারের কোনো ব্যক্তির নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না এক সাভারকার ছাড়া, যে সাভারকার আবার একাধিকবার ব্রিটিশদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিল যে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন ব্রিটিশ বিরোধী কোনো কার্যে লিপ্ত হবে না। জেলা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সাভারকার তার কথা রেখেছিলেন তিনি বা তার কোনো Associateরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয় নি। বরঞ্চ সংঘ পরিবারের নেতাদের বক্তব্য ছিল ব্রিটিশদের বিরোধিতা করে নিজেদের উদ্যমকে ক্ষয় না করতে, সেই উদ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে মুসলিম ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য, কারন তারাই নাকি দেশের মূল শত্রু।

গোলওয়ালকার তার Bunch of Thoughts গ্রন্থের ‘Internal Threats’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে এই বিষয়টি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। যদিও এখন আন্দামানের সেলুলার জেলে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড অনুষ্ঠানে সাভারকারকে Glorify করার চেষ্টা চলেছে, কিন্তু বাস্তবকে তাই বলে কি ধামাচাপা দেওয়া যায়! প্রধানমন্ত্রীর এহেন মন্তব্য সেই কারণেই। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জাতীয় ভাবাবেগে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতার আন্দোলনে যেহেতু তিনি বা তাঁর পূর্বসুরীরা সেভাবে কেউ যুক্ত ছিলেন না তাই একটি ধর্মীয় ভাবাবেগ সম্পর্কিত রামজন্মভূমি প্রতিষ্ঠার সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টাকে যেখানে তিনি ও তাঁর দলের লোকরা এবং তাঁর পূর্বসুরীরা স্বশরীরে ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তাকে আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তাকে সমার্থক করে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছেন। এক উগ্রজাতীয়তাবাদ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের ধারক ও বাহক হওয়া সত্ত্বেও। এ কাজ সততই নিন্দনীয়।
এখন প্রশ্ন হল, Article 370 বিলোপের পরিকল্পনা না হয় বোঝা গেল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুসলিম বিদ্বেষজনিত কারণে উৎসারিত। হিন্দুদের এত আরাধ্য দেবতা থাকতে হঠাৎ রামকেই কেন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির প্রতীক বলা হচ্ছে আর কেনই বা হিন্দুত্ব নামক ধারণাটির প্রচারের পুরোভাগে রামকে ব্যবহার করা হচ্ছে? এই বিষয়টা একটু বোঝা দরকার।
এমনিতে আমরা প্রায় সবাই রামায়ণ পড়েছি। ছোটবেলায় ছবিতে রামায়ণ, তারপর কৃত্তিবাসের রামায়ণ। এছাড়াও জানা যায় যে প্রায় ৩০০টির মত রামায়ণ আছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় একাধিক রামায়ণ আছে। এমনকী জৈন, বৌদ্ধদেরও রামায়ণ আছে। এরকম প্রায় ৩০০ রকম রামায়ণের গল্পের মধ্যেও পার্থক্য আছে, আবার এই রামায়ণ এর মধ্যে কিছু বিভিন্নতাও আছে। কিছু হল রামকথা। মানে রামের গল্প), আবার কিছু হচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তির যেমন বাল্মীকি, কামপান, কৃত্তিবাস এর মূল বচন যেগুলোকে কথিত ভাষায় বলা হয় রামায়ণ। এখানে কোথাও রামকে বিষ্ণুর অবতার বলা হয়েছে, কোথাও তাকে ভগবান রূপে তুলে ধরা হয়েছে কোথাও সে শুধুমাত্র এক ক্ষত্রিয় বীর, আবার কোথাও রাবণের চরিত্রটিকে ইতিবাচক করে তুলে ধরা হয়েছে।
আমরা এত দিন জেনে এসেছি, রাম হচ্ছে একটি পৌরাণিক চরিত্র-একজন ক্ষত্রিয়-বীর আর রামায়ণ হচ্ছে একটি মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের আদি রচয়িতা হলেন বাল্মীকি, যেটার ভাষা সংস্কৃত এবং পরে হিন্দি ভাষায় তুলসীদাস এর 'রামচরিতমানস' আত্মপ্রকাশ করলে সেটা আরও প্রচারিত হয়। এইসব পুরাণের পুঁথি থেকে রামকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হচ্ছে কেন এরকম একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতেই পারে। এগুলো আসলে তো একটি কল্পকাহিনি, কিন্তু, তা সত্ত্বেও 'রাম'কে বাস্তবতার রূপ দিয়ে এবং তাতে সরকারি সিলমোহর লাগিয়ে RSS এর Political Project কে কার্যকরী করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে পুরাণ ইতিহাস নয়। তাই আকর্ষণীয় হলেও কোনোমতেই বাস্তব নয়। Mao-Tse-Tung কে উদ্ধৃত করে বলা যায়- 'The myriads of changes in mythology (and also in nursery tales) delight people because they imaginatively pictures man's conquest of the forces of nature; and the best myths posses eternal charmas as Marx put it, but myths are not built out of the concrete contradictions existing in given conditions and therefore are not a scientific. That is to say, in myths or nursery tales the aspects constituting contradiction have only an imaginary identity, not a concrete identity." (On Literature and Art, reflection of reality, Myth and Reality -August, 1937)
"The mythical thinking is the mode of thinking chraracterstic of primitive man. It is perceptual, subjective, plastic...... This is thinking in complexes Ike a child, In class society, as we have seen, it gives place, on the one hand, to rational and scientific thinking, and on the other, to religious dogma. In addition to these two developments, there is a third - aesthetic thinking, in which myth becomes the raw material of art. ("The Human Essence" by George Thomson).
বাল্মীকির রামায়ণ ছিল একটি Oral Epic। পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণ প্রচারকরা রামকথা কে পরিবর্তন করার চেষ্টা করল একটি Religious Text হিসেবে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার এর কথায়- “The stories of Ram, continue to grow in popularity more because it was a tale well-told and less because of its merits as a religious text," (The Ram Myth by Romila Thapar).ওই একই রচনায় তিনি বলেছেন- হিন্দু আসলে তো কোনো ধর্ম নয়- এটা একটা জীবনধারা (way of living), সিন্ধুনদের চারিপাশে যাদের বসতি ছিল এবং তারা যা জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিল সেটার থেকেই হিন্দু কথাটির উৎপত্তি।
ইসলাম ও খ্রিস্টানদের মত হিন্দুদের কোরান বা বাইবেল এর মতো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ নেই। মহম্মদ ও যিশুর মত তাদের কোনো একক Prophetও নেই। সেই কারণে সংঘ পরিবারের মরিয়া প্রচেষ্টা হল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যসাধন করার জন্যে এবং তাদেরকে একসুরে বাঁধার জন্যে একটি একক চরিত্রকে সামনে আনার।
সেই কারণে 'রাম'কে পুরাণের পুঁথি থেকে তুলে নিয়ে এসে উপাসনার মন্দিরে অধিষ্ঠিত করা হল। কারণ সংঘ পরিবার উপলব্ধি করেছিল যে একটি আপাত সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মুখ যদি তুলে ধরা না যায় তাহলে হিন্দুত্বের জাগরণ ঘটবে না। এবং রাজনৈতিভাবে কোনো ফায়দা তোলাও সম্ভবপর হবে না। সেই কারণেই বলা হচ্ছে রামমন্দিরের প্রতিষ্ঠা করা হল সংঘ পরিবারের একটি রাজনৈতিক প্রকল্প (Political Project)। কিন্তু হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা যাবে কিভাবে? আমাদের দেশেই বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দুদের উপাস্য দেবতা বিভিন্ন। কোথাও আয়াপ্পার উপাসনা করা হয়, কোথাও ভেঙ্কটশ্বরের উপাসনা করা হয় আবার কোথাও জগন্নাথের, কোথাও কামাক্ষ্যার আবার কোথাও কালীর উপাসনা করা হয়।
সেই কারণে সংঘ পরিবার হিন্দুত্বের একটি নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করেছে। এই নয়া হিন্দুত্বের (Hindutva) তত্ত্ব (রোমিলা খাপারের ভাষায় Synidicated Hinduism) অনুযায়ী রাম হচ্ছে এই নব হিন্দুত্বের প্রতীক। রামায়ণ হচ্ছে তাদের পবিত্র গ্রন্থ আর অযোধ্যা হচ্ছে তাদের পবিত্র ভূমি। এইসব করা হচ্ছে 'হিন্দুত্ব' কে একটি আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে তুলে ধরার জন্য। সেই কারণেই রামন্দিরের শিলান্যাস পর্বে দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'রামমন্দির হল রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির আধুনিক প্রতীক।'
হিন্দুদের জীবনধারায় যেমন বৈচিত্র ছিল এখনও আছে। অঞ্চল ভিত্তিতে তাদের জীবনশৈলী, তাদের আচার আচরণ, ভাষা, তাদের সংস্কৃতিও পৃথক। যেমন উত্তরভারত, দক্ষিণভারত বা পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বসবাসকারীদর মধ্যে এই পৃথকতা পরিলক্ষিত হয়। ঠিক তেমনভাবেই রামকথা বা রামায়ণ এর গল্প ভাষার ভিত্তিতে এবং অঞ্চল ভিত্তিতে একটা আরেকটা থেকে অনেকাংশে পৃথক।
🔍︎ আরও পড়ুন —আরএসএস: সন্দেহজনক অতীতের ১০০ বছর, —আদিবাসীদের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আরএসএস, —সঙ্ঘ-মমতার বেঙ্গল চ্যাপ্টার
সংঘ পরিবার মূলত যে রামায়ণকে স্বীকৃতি দেয় তা হল বাল্মীকি ও তুলসীদাসের কথিত রাময়ণের সংমিশ্রণ। এর সূত্র ধরেই সেই রামায়ণের গল্পকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আশির দশকে রামানন্দ সাগরের রামায়ণ নামক সিরিয়াল প্রচারিত হয়, দূরদর্শনের ন্যাশনাল চ্যানেলে। এর থেকেই বোঝা যায় 'রাম'কে সর্বজনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা কতদিনের এবং কতটা সুসংহত এবং কেন্দ্রীভূত সেই কারণেই সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের হঠাৎ করে বলা হয় তাদের মর্যাদা ও অস্তিত্ব নির্ভর করছে ওই রামমন্দির নির্মাণের উপর। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই প্রচারই এক ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল এবং এর ফলশ্রুতিতে তার পরিণতি ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধুৎসের মধ্যে দিয়ে।
হিন্দুরাষ্ট্র
আসলে বিজেপি 'হিন্দুরাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিজেপি হল RSS এর রাজনৈতিক শাখা। এবং RSS এর মূল মন্ত্রই হল ভারতবর্ষকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করা। RSS এর প্রতিষ্ঠা ১৯২৫ সালে। প্রতিষ্ঠা করেন ডঃ কেশব বলিরাম হেগড়েওয়ার, সঙ্গে ছিলেন ডাঃ বি এস মুঞ্জে, ও সাভারকার প্রভৃতি। ডাঃ হেগড়েওয়ারের পরে ১৯৪০ সালে RSS এর প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হন মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার। ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনিই RSS এর প্রধান ছিলেন। তার রচিত দুটি গ্রন্থ থেকে আমরা RSS এর মতাদর্শ সম্পর্কে অবহিত হতে পারি। গ্রন্থদুটি হল "We or our Nationhood-Defined" এবং "Bunch of Thoughts".

We or our Nationhood Defined -গ্রন্থে গোলওয়ালকার লিখেছেন- "We Hindus-have been in undisputed and undisturbed possession of this land for over 8 or even 10 thousand years before the land was invaded by any foreign race." এই গ্রন্থেই তিনি বললেন "Aryan Race is indigeneous", সাভারকার এরও একই বক্তব্য। সাভারকার এবং গোলওয়ালকারের বক্তব্য থেকে যেটা বেরিয়ে আসে সেটা হল বর্ণ হিন্দুরা হল "Aryan" এবং তারা এই দেশেরই প্রাচীন অধিবাসী। তারা এটাও বললেন যারা হিন্দু না যেমন মুসলিম, খ্রিষ্টান, পার্সি তারা বিদেশি, বহিরাগত। ভারতবর্ষ তাদের পিতৃভূমিও নয়, পুণ্যভুমিও নয়।
M.S. Golwalkar "We or our Nationhood-Defined"এ বলেছেন, “... Hindusthan is the land of the Hindus... and the foreign races in Hindusthan must either adopt the Hindu culture and language, must learn to respect and hold in reverence Hindu religion, must entertain no idea but those of the glorification of the Hindu race and culture, i.e. of the Hindu Nation and must lose their separate existence to merge in the Hindu race, or may stay in the country, only subordinated to the Hindu Nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment- not even citizen's rights. There is at least should be, no other course for them to adopt. We are an old nation; let us deal, as old nations ought to and do deal, with the foreign races who have chosen to live in our country."
Non-Hindu এবং সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে এমনই ধ্যান- ধারণা হিন্দু রাষ্ট্রের তত্ত্বে। প্রসঙ্গত, জার্মানি যে ভাবে তাদের দেশে সংখ্যালঘু ইহুদিদেরে সাথে ব্যবহার করেছে, সেটাকে সর্বতোভাবে সমর্থন করে RSS, হিটলার ও মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের সম্পর্কে এতটাই মোহগ্রস্ত ছিল RSS যে ১৯৩১ সালে ডঃ মুজে সুদূর ইতালি পাড়ি দিয়ে মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করেন তাদের সামরিক বিদ্যালয়গুলি পরিদর্শনের জন্য। (এই তথ্য ডাঃ মুজের ডায়েরি থেকেই পাওয়া গেছে)। এছাড়া VS. Savarkar ১৯৪০ সালে হিন্দু মহাসভার ২২তম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন "There is no reason to suppose that Hitler must be a human monster because he passes off as a Nazi or Churchil is a demi-God because he call himself a Democrat. Nazism proved undeniably the saviour of Germany under the set of circumsances Germany was pressed in.....".
M.S Golwalkar তার এই গ্রন্থে আরও বলেছেন- একদিকে হিমালয় আর তিনদিকে অনন্ত সাগর-এর মধ্যকার জনপদটি হল হিন্দুস্তান the land of Hindus সেইসঙ্গে "Nation" এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন এর ৫টি বৈশিষ্ট্য আছে Geographical (Country), Racial (Race), Religious (Religion), Cultural (Culture) and Linguistic (Language), অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জনপদ, একটি অভিন্ন ধর্ম, একটি অভিন্ন সংস্কৃতি ও একটি নির্দিষ্ট ভাষা। RSS এর মতে তাদের বর্ণিত হিন্দুরাষ্ট্রের এইসব বৈশিষ্টাগুলোই বিদ্যমান। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে।
দ্বিতীয় পর্ব আগামীকাল
প্রকাশের তারিখ: ২৮-ডিসেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
