সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লেনিন ও ‘তৃতীয় বিশ্ব’
সাত্যকি রায়
পুঁজির আধিপত্যের আজ আর কোন ভৌগোলিক বিন্যাস নেই, পুঁজিবাদী শোষণ আজ সর্বব্যাপী এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে কোন কাঠামোগত বৈষম্যের সম্পর্ক নেই।মনে রাখা দরকার সাম্রাজ্যবাদের আলোচনায় বৈষম্য ও শোষণ এই দুটি ধারণাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রে পিছিয়ে পড়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভূমিকা প্রসঙ্গে খুব একটা আলোচনা রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বের জগতে প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ছিল না বললেই চলে। তার স্বাভাবিক কারণও ছিল। পৃথিবীর বহু ভূখণ্ডের বেশ কিছুই পাশ্চাত্য জ্ঞান চর্চার দৃষ্টির বাইরে ছিল। এশিয়া আফ্রিকার নানা ভূখণ্ড বেশ কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতায় ইউরোপের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকলেও তা ইউরোপীয়দের চোখে অজানা ছিল। যখন তারা এই সমস্ত ভূখণ্ড আবিষ্কারের নামে তাদের আধিপত্য স্থাপন করল তখন ইউরোপীয় জ্ঞান চর্চার আখ্যানে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার ভূখণ্ডকে ‘অসভ্য’ জগত হিসেবেই উপস্থিত করা হল। এই সমস্ত দেশে আধুনিক রাষ্ট্রের তখনও উদ্ভব ঘটে নি। হেগেল মনে করতেন দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার এই সব ভূখণ্ডের মানুষদের কোন যৌথ সত্ত্বা নেই এবং তারা মানসিক ভাবে দুর্বল। যাদের কোনো রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা নেই তারা আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন নয় এবং সে কারণেই তাদের প্রতি ইউরোপীয় সভ্য জগতের আধিপত্য অন্যায় নয় বরং প্রয়োজনীয়। পৃথিবীর অন্যান্য অংশে সভ্যতা প্রসারের মহান দায়িত্ব ইউরোপীয় সভ্যতার রয়েছে এবং সে কারণেই তাদের আধিপত্য প্রসারের যৌক্তিকতা স্বীকার করে নেওয়া উচিত।
ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল কাঠামোর মধ্যে যে সমাজ কল্পনাটি নিহিত আছে ও আদর্শ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে আখ্যান অন্তর্নিহিত রয়েছে তার মধ্যেও এই ইউরোসেন্ট্রিক চিন্তা প্রবহমান। সভ্য জগতের যে ছবি আঁকা হয়েছে তাতে আসলে ইউরোপীয় সভ্যতা এবং এর থেকে বিচ্যুতিকেই পশ্চাদপদতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্কস এঙ্গেলসের রচনাতেও স্বাভাবিকভাবেই এর কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আবার মার্কসের এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কিত আলোচনা ও পরবর্তী সময়ে রাশিয়া সম্পর্কিত আলোচনায় পশ্চাদপদতা ও তার থেকে উত্তরণের পথ প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মার্কস তার প্রথম দিকের রচনায় একটি দ্বিমুখী ধারণা পোষণ করেছিলেন। একদিকে যেমন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিধ্বংসী প্রভাব তিনি উল্লেখ করেন আবার অন্যদিকে ভারতীয় গ্রাম সভ্যতার স্থবিরতা থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে এই ব্রিটিশ আধিপত্যের ইতিবাচক ভূমিকাও তিনি আলোচনা করেছিলেন। দেখা যাবে ১৮৬০ সালের পর থেকে উপনিবেশগুলি সম্পর্কে মার্কসের আলোচনায় এই দ্বিমুখী অভিমুখ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। যে ধারণাটি প্রাধান্য পেতে শুরু করে সেটা হল সাম্রাজ্যবাদের বিধ্বংসী রূপ যা আসলে এই সমস্ত ভূখণ্ডগুলোতে মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে। সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজি যে উপনিবেশগুলিতে পুঁজিবাদী উন্নয়ন ঘটাতে পারছে না এবং উল্টে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে এই উপলব্ধি মার্কসের আলোচনায় প্রাধান্য পেতে শুরু করে। এমনকি এই ধরনের দেশগুলি বিশ্ব বাণিজ্যে অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়েই যে এক অন্যায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তার ইঙ্গিতও মার্কসের লেখায় পাওয়া যায়। কিন্তু একথা অস্বীকার করা যাবে না যে বিভিন্ন দেশের উপনিবেশ ও সে সমস্ত ক্ষেত্রে মুক্তির পথ হিসেবে যে আলোচনা মার্কস এঙ্গেলসের লেখায় পাওয়া যায় তা সব দেশের ক্ষেত্রে সুষম ছিল এরকম নয়। যেমন মার্কস গভীরভাবে মনে করতেন যে ইংল্যান্ডের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ অথবা আয়ারল্যান্ডে স্বতন্ত্র অর্থনীতি বিকাশের পন্থা নেওয়া উচিত। অথচ একইভাবে মেক্সিকোর উপরে স্প্যানিশ, ব্রিটিশ ও ফরাসি আধিপত্যকে তিনি একই ভাবে বিবেচনা করেননি । মেক্সিকোর মানুষের উপরে নির্যাতন মার্কস এঙ্গেলসের আলোচনায় নিন্দিত হলেও আমেরিকায় পুঁজিবাদের বিকাশের প্রয়োজনীয়তাকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে যে চিন্তা প্রাধান্য পেয়েছিল তা হল সমাজতন্ত্রের বিকাশের প্রয়োজনে সাময়িক পুঁজিবাদী আধিপত্য সেই সমস্ত দেশে কাঙ্খিত হতে পারে যে দেশের স্বতন্ত্র পুঁজিবাদী পথের কোন দিশা নেই। মোটের উপর মার্কস এঙ্গেলসের পশ্চাৎপদতা বা অনুন্নয়নের ধারণাটি প্রাক পুঁজিবাদী সমাজের রূপ হিসেবেই সীমিত ছিল।বিকশিত পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরে এক অঞ্চলের উন্নয়ন যে অন্য ভূখণ্ডের অনুন্নতির কারণ হতে পারে তা ওই সময়ের আলোচনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রধান অভিমুখ ছিল না। মার্কস একচেটিয়া পুঁজির উদ্ভব ও তার সমস্যার ইঙ্গিত দিলেও পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সম্যক ধারণা পোষণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
লেনিন বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তার সময়ের পুঁজিবাদকে দেখতে পেয়েছিলেন একচেটিয়া পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী স্তর হিসেবে। পুঁজিবাদ তার প্রতিযোগিতামূলক স্তর থেকে একচেটিয়া পুঁজির স্তরে উন্নীত হওয়ায়, ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ যে তার ঐতিহাসিক প্রগতিশীল চরিত্র হারিয়েছে এটাই লেনিনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল। কিন্তু সেই সময়ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের আলোচনায় পুঁজিবাদ বিকশিত করা ও তার পূর্ণ বিকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করার তত্ত্বই কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল ধারা ছিল। এই ধারণা প্রাধান্য পেলে তার অবশ্যম্ভাবী সূত্রায়ন হল পিছিয়ে পড়া উপনিবেশের ভবিতব্য আসলে উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলির প্রভাবের উপরেই নির্ভরশীল। অর্থাৎ এই আলোচনায় পৃথিবীর রাজনীতির মানচিত্রে পশ্চাদপদ দেশগুলির কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্বের প্রসঙ্গই আসে না। অন্যদিকে লেনিনের সূত্রায়ন অনুযায়ী উপনিবেশগুলিতে পুঁজিবাদী বিকাশের পথে সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে- এই সত্য ধরে নিলে উন্নত দেশে পুঁজিবাদ বিরোধী সংগ্রাম আর উপনিবেশ গুলিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এ কারণেই লেনিনের বিশ্ব পুঁজিবাদ সম্পর্কিত মূল্যায়ন ও বৈপ্লবিক প্রকল্পে তৃতীয় বিশ্ব এই প্রথম বিশ্ব রাজনীতির আঙিনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। লেনিনের আগে সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত আলোচনা পুরোটাই উন্নত দেশগুলির মধ্যেকার সংঘাতের কাঠামোর মধ্যেই সীমিত ছিল। সেখানে তৃতীয় বিশ্ব ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলির ভূমিকা ছিল দর্শকের আসনে। সেই সমস্ত দেশের শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নিজ দেশে পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাটাই ইতিহাস নির্ধারিত পথ ছিল। এই বিশ্ববিক্ষাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন লেনিন। সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতম গ্রন্থিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা কার্যত প্রথম উপনিবেশের জাঁতাকলে আটকে থাকা দেশগুলির শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থাপন করল। প্রাক একচেটিয়া স্তরে মার্কস নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে আইরিস শ্রমজীবী মানুষের স্বাধীনতাকে ব্রিটিশ শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছিলেন। পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরে লেনিন উপনিবেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে বিশ্ব মানবমুক্তির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে স্থাপন করলেন। এর মধ্যে দিয়ে বিপ্লবী চিন্তার জগতে দুটো বড় পরিবর্তন ঘটলো। এক, ইতিহাসের ইউরোসেন্ট্রিক আখ্যান অনুযায়ী এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মানুষের ভবিতব্য ইউরোপীয় সভ্য জগতের অবদানের উপরে নির্ভরশীল—এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হল। দুই, অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ চালিত ইতিহাসের স্টেজ থিওরি থেকে বিপ্লবী চেতনার মুক্তি। সমাজ বিপ্লবের কেন্দ্রে অর্থনীতির অনড় নিয়মের যান্ত্রিক ধারণা নয়, দ্বন্দ্বতত্ত্বের সৃজনশীল প্রয়োগ ঘটিয়ে রাজনীতিকে সমাজ বিপ্লবের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় স্থাপন করা হল।
লেনিন পরবর্তী সময় সাম্রাজ্যবাদের চর্চা মূলত দুটি ধারায় চালিত হয়েছে। একটি হল লাতিন আমেরিকার পরিপ্রেক্ষিতে ডিপেন্ডেন্সি থিওরি যেখানে উন্নত ও অনুন্নত দেশের মধ্যে কাঠামোগত বৈষম্য আধিপত্যের ব্যাখ্যায় প্রাধান্য পেল। উন্নত দেশ বনাম অনুন্নত দেশ এই নিরিখে আধিপত্যকে দেখায় দুই গোলার্ধেই শ্রেণী সংগ্রামের প্রাথমিকত্ত লঘু হল। আবার অন্যদিকে বেশ কিছু পাশ্চাত্য সমাজতাত্ত্বিকদের ও মার্কসবাদীদের চোখে বিশেষত বিশ্বায়ন পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের আলোচনায় উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের কাঠামোগত বৈষম্যের ধারণাটি গৌণ অথবা অনুপস্থিত হয়ে এল। তারা বলতে শুরু করলেন যে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের পুরনো ধারণাটি অচল। পুঁজির আধিপত্যের আজ আর কোন ভৌগোলিক বিন্যাস নেই, পুঁজিবাদী শোষণ আজ সর্বব্যাপী এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে কোন কাঠামোগত বৈষম্যের সম্পর্ক নেই।মনে রাখা দরকার সাম্রাজ্যবাদের আলোচনায় বৈষম্য ও শোষণ এই দুটি ধারণাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটির কোনটিকেই অন্যটির সাপেক্ষে আলাদা ও একটির সাপেক্ষে অপরটিকে প্রাথমিকত্ত প্রদানের চেষ্টা আসলে সম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিনিময় সমমূল্যের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়ে থাকে এই ধারণা সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে অনুন্নত দেশের রপ্তানিকৃত দ্রব্যের মধ্যে নিহিত শ্রমমূল্য আর উন্নত দেশ থেকে আমদানিকৃত দ্রব্যের শ্রমমূল্য এক হয় না। মার্কসও অনুন্নত দেশ থেকে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এই মূল্য স্থানান্তরণের ইঙ্গিত করেছিলেন। এই মূল্য হস্তান্তর বা বিষম বিনিময় আজকের পৃথিবীতেও একই ভাবে বাস্তব। যা আসলে দরকার তা হল বিশ্বায়িত পৃথিবীতে এই বৈষম্য ও শোষণ পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় ভাবে সম্পর্কিত হয়ে কিভাবে সম্রাজ্যবাদের নবতম চেহারাকে উপস্থিত করছে তা গভীরভাবে অনুধাবন করা।
প্রকাশের তারিখ: ২৯-জানুয়ারি-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
