Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

একবিংশ শতাব্দীর লেনিন

রতন খাসনবিশ
রুশ নিহিলিস্ট, ক্রপটকিন, এমনকী প্লেখানভও মুঝিক চাষির না-বলা কথার মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের যে-ভাষা লুকিয়েছিল, তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। লেনিন জানতেন ওই ভাষাটি কী। লেনিন জানতেন পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনে যে-সেনা সদস্যরা সম্রাটের নামে জয়ধ্বনি তুলতেন তাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সেই মুঝিক চাষিটি। লেনিনের বিদ্যাচর্চা তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে ওই পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনে রুশ মুঝিককে খুঁজে পেতে হয়। বেলচাধারী শ্রমিককে কীভাবে রেডগার্ডে রূপান্তরিত করতে হয়। লেনিনের বিদ্যাচর্চা তার উপায় অনুসন্ধানের পথও দেখিয়েছিল।
Lenin of 21st century

বিভিন্ন নৈরাজ্যবাদী দর্শনের বিপরীতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং নতুন সমাজ, যে-সমাজে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বিত্তবঞ্চিত মানুষেরা, সেই ধরনের সমাজ গঠন বৌদ্ধিক চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই। অবশ্যই এ-সমস্ত চিন্তার তাত্ত্বিক বনিয়াদ তৈরি হয়েছিল হেগেলের বামপন্থী ধারায় যে বুদ্ধিচর্চার ঘরানা তৈরি হয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই। এই ঘরানা তৈরি হয় বাম-হেগেলিয়ান দার্শনিক কার্ল মার্কস ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলসের চিন্তধারাকে অবলম্বন করে। বিষয়টিকে নৈরাজ্যবাদের জঞ্জাল অতিক্রম করিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণায় উত্তীর্ণ করা ছিল সময়সাধ্য। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর নবম দশকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংঘ যখন গঠিত হল, সে সময়েই মার্কসবাদ ও নৈরাজ্যবাদের মধ্যে বিভাজন রেখাটি স্পষ্ট হয়। কিন্তু ‘জার্মান ইডিওলজিতে’ মার্কস যে দার্শনিক বিপ্লবের কথা উল্লেখ করেছিলেন (শুধু ব্যাখ্যা নয়, পরিবর্তনও) সেটি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের রথী-মহারথীরা ক্রমশ বিস্মৃত হচ্ছিলেন। তাঁদের কাছে পরিবর্তনের অর্থ দাঁড়াচ্ছিল, ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলি যে বুর্জোয়া সাংবিধানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছিল তারই সীমিত সীমায় কমিউনিস্ট দর্শনকে প্রয়োগের ক্ষেত্র হিসাবে বেঁধে দেওয়া। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অনুমোদনপ্রাপ্ত কমিউনিস্টরা ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলির সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। সংসদের বিরোধী দল হিসাবে কমিউনিস্টরা একটি সংঘর্ষমুক্ত সমাজ তৈরি করার পথে অগ্রসর হবেন, মোটামুটি এটাই দাঁড়াচ্ছিল মার্কসের বিপ্লবী দর্শনের ভবিষ্যৎ।

লেনিন কোথায় অন্যদের থেকে আলাদা সেটা বুঝতে হবে এই প্রেক্ষাপটেই। শুধু ব্যাখ্যা নয়, পরিবর্তনও— বুদ্ধিচর্চার জগতকে যদি এভাবে সাজিয়ে নেওয়া হয় তাহলে জ্ঞানতত্ত্বে একটা ছেদ ঘটে। লাইব্রেরিতে বসে প্রচুর পড়াশোনা করা, ভিয়েনা সার্কেলের সঙ্গে যুক্তির লড়াইয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা— বুদ্ধিচর্চা এই পরিসরে সীমিত থাকতে পারে না। বিত্তহীনের হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর, ব্যক্তিগত সম্পদের বিপুল বৈভবের বিপরীতে সম্পদকে সামাজিক সম্পদে রূপান্তরিত করা, আর তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা— বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠা উচিত এই সব বিষয়গুলির। বুদ্ধিচর্চায় সেক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে। এই রূপান্তর কী ধরনের মানুষের জন্ম দেয়, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার শ্রেষ্ঠ ফসলগুলি তিনি আয়ত্তে এনেছিলেন এবং তার ওপর দাঁড়িয়েই বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রীয় বিষয় যে সমাজ পরিবর্তনের চর্চায় রূপান্তরিত হয়, লেনিনের সারা জীবনের সাধনায় তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে যাঁরা লেনিন চর্চার প্রাসঙ্গিকতা খোঁজার চেষ্টা করেন তাঁদের সবার আগে বুঝতে হবে এই সত্যটি। পাঠাগারে আবদ্ধ থাকা জ্ঞানকে রূপান্তরিত করতে হয় সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারে— এই ঘরানার যে বিদ্যাচর্চা, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে যা অবহেলিত ছিল, লেনিন সেই বিদ্যাচর্চার ঘরানা ফিরিয়ে এনেছিলেন। আজ যারা লেনিনবাদী বিদ্যাচর্চার ঘরনায় ফিরে আসতে চান, জার্মান দর্শনের সেই বামপন্থী বিচ্ছেদের জায়গাটি তাঁদের বুঝতে হবে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক যেভাবে এই বিচ্ছেদের ক্ষেত্রগুলিকে সীমিত করে আনছিল, যার বিরুদ্ধে লেনিন তৈরি করেছিলেন বিদ্যাচর্চার নতুন ঘরানা, ফিরিয়ে আনতে হবে বিদ্যাচর্চার সেই ঘরানাকে। লেনিনের রাশিয়ার কী রূপান্তর ঘটেছে কিংবা আজকের মার্কসবাদ কীভাবে ভদ্রলোকের বিদ্যাচর্চায় রূপান্তরিত হয়েছে, এসব নিয়ে কথা এবং আরও কথা,  বলা যায় কথার পাহাড় গড়ার কাজটি সন্তর্পণে পরিহার করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে লেনিনীয় বিদ্যাচর্চার ঘরানাকে। দ্বিতীয় কমিউনিস্ট  আন্তর্জাতিক মার্কসবাদকে যেভাবে সূক্ষ্ম বিদ্যাচর্চায় রূপান্তরিত করছিল, কার্ল কাউটস্কির লেখায় যার অবয়বটি স্পষ্ট হচ্ছিল, লেনিনের বিদ্রোহ ছিল সেসবের বিরুদ্ধেই। আর তার মধ্যে দিয়েই বোঝা গিয়েছিল মার্কসের বিদ্যাচর্চার যে ঘরানা, তার সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন লেনিন।

লেনিনের বিদ্যাচর্চা রূপান্তরিত হয়েছিল সোভিয়েত বিপ্লবে। ৮০০ বছরের রোমানভ বংশের শাসন, ধর্মের নামে গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের নিপীড়ন, বিত্তবানের এক কুৎসিত সমাজ গড়েছিল রাশিয়ায় যেখানে মুঝিক চাষি বিহ্বল দৃষ্টিতে ক্রেমলিনের শোভা দেখতেন, নতজানু হয়ে অর্থোডক্স চার্চের সেই বাণী গ্রহণ করতেন যা তাঁর বঞ্চনার একটা তথাকথিত ন্যায়সঙ্গত ব্যাখ্যা জোটায়। রুশ অভিজাত সমাজে টলস্টয়ের লেভিন-এর মতো কেউ কেউ বিত্তবানদের এই সমাজ কেন টিকে থাকে, যুক্তি অথবা আবেগ কোনও কিছু দিয়েই তার ব্যাখ্যা খুঁজে পেতেন না। লেভিনরা কিন্তু বিদ্যাচর্চার সেই ঘরানাটি গ্রহণ করতে পারেননি যেটি বিত্ততাড়িত এই সমাজকে নির্বাসনে পাঠাতে পারে। উল্টোদিকে, রুশ নিহিলিস্ট, ক্রপটকিন, এমনকী প্লেখানভও মুঝিক চাষির না-বলা কথার মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের যে-ভাষা লুকিয়েছিল, তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। লেনিন জানতেন ওই ভাষাটি কী। লেনিন জানতেন পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনে যে-সেনা সদস্যরা সম্রাটের নামে জয়ধ্বনি তুলতেন তাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই মুঝিক চাষিটি, বিহ্বল দৃষ্টিতে যিনি রুশ অভিজাতদের বিত্তবৈভবের সীমানা খোঁজার চেষ্টা করতেন। লেনিনের বিদ্যাচর্চা তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে ওই পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনে রুশ মুঝিককে খুঁজে পেতে হয়। বেলচাধারী শ্রমিককে কীভাবে রেডগার্ডে রূপান্তরিত করতে হয়। লেনিনের বিদ্যাচর্চা তার উপায় অনুসন্ধানের পথও দেখিয়েছিল। উল্টোদিকে, যে রুশ বুদ্ধিজীবীরা অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকারের পক্ষে জনমত গঠনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, কোন ভাষায় কথা বললে সেই বুদ্ধিজীবীরা মস্কো ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন, লেনিন সেটিও জানতেন। বিপ্লব যে বিদ্রোহ, বিপ্লব যে উগ্র বলপ্রয়োগের কাজ, এটা যে সূচিকর্মের মতো পক্ষপাতহীন কুশলতা প্রকাশের ক্ষেত্র নয়, অথবা পক্ষপাতহীন ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রও নয়, লেনিনের বিদ্যাচর্চা তাঁকে এই বোধেও উত্তরণ ঘটিয়েছিল।

বলা বাহুল্য, এই মানুষেরা চিরকালই বিপজ্জনক মানুষ। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের মর্মর মূর্তিতে মালা দেওয়া যায়, তার জন্য একটি পরিশীলিত শোকসভা আহ্বান করা যায়, কিন্তু কখনই তাঁর শিক্ষায় বুদ্ধিচর্চার জগতকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া যায় না। পাঠ্যপুস্তকে লেনিনের জায়গা করে দেওয়া যায়। অল্পস্বল্প শব্দপ্রয়োগের মধ্যে দিয়ে মার্কসীয় বিদ্যাচর্চার জগতে তাকে এককোণে সরিয়ে দিয়ে পশ্চিমা মার্কসবাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পণ্ডিতি আলোচনা করা যায়, কখনও বা সংকটজর্জর পুঁজিবাদ লেনিনের নামে জয়ধ্বনি তুলে তাদের অপকর্ম আড়াল করতে চায়। একবিংশ শতাব্দীর লেনিন কিন্তু বেঁচে আছেন তাঁদের মধ্যেই যাঁরা জানেন এতো কাল ধরে দার্শনিকেরা জগতকে শুধু ব্যাখ্যা করে গেছেন, আসল কথা হল সেই সমাজকে এমন এক পরিবর্তনের ভাষায় পুনঃশিক্ষিত করা যেখানে ধনবৈষম্যের ইতরতা থেকে বিদ্যমান সমাজ মুক্তি লাভ করে। এই মানুষেরা সংখ্যালঘু কিনা এ-নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। অসাম্যতাড়িত সমাজ যদি কিছু লেভিন তৈরি করে, উল্টোদিকে আবার তা কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত এক উলিয়ানভকেও সৃষ্টি করে, জ্ঞানচর্চার জগতে যিনি বিপ্লব ঘটাতে পারেন।


প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Proyojonio lekha
- Tapas guha , ২২-এপ্রিল-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪