সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শহীদ ভগৎ সিং
মুজফ্ফর আহ্মদ
লাহোরে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত মস্কো বলশেভিক ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় দণ্ডভোগী ও আমাদের কমরেড মীর আবদুল মাজীদের বাড়িতে ভগৎ সিংহের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। আমি কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় জেল-খাটা লোক বলে তিনি আমায় দেখতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আবদুল মজীদ আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ভগৎ সিংহের হাজার হাজার ফটোগ্রাফ দেশময় বিতরিত হয়েছে। সারা দেশের সংবাদপত্রসমূহেও তাঁর ফটো ছাপা হয়েছে। দাড়ি-কামানো, ছোট করে ছাঁটা এবং শর্ট শার্ট ও হ্যাট পরিহিত ফটোগ্রাফের এই ভগৎ সিংকেই সারা দেশ চিনেছেন ও মনে রেখেছেন।

ভগৎ সিংহের সঙ্গে আমার অল্প কয়েকদিনের মাত্র পরিচয়। এত কম দেখা সাক্ষাৎ যাঁর সঙ্গে হয়েছে তাঁর বিষয়ে কিছু লিখতে যাওয়া অনধিকার চর্চা। তবুও আমি একান্তভাবে অনুরুদ্ধ হয়েছি যে কমপক্ষে একটি পৃষ্ঠা হলেও যেন আমি কিছু লিখি।
১৯২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি লাহোরে গিয়েছিলাম। ইচ্ছা ছিল, ডিসেম্বরের বাকী কটা দিন ও পুরো জানুয়ারী মাস আমি সেখানে কাটিয়ে আসব। লাহোরে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত মস্কো বলশেভিক ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় দণ্ডভোগী ও আমাদের কমরেড মীর আবদুল মাজীদের বাড়িতে ভগৎ সিংহের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। আমি কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় জেল-খাটা লোক বলে তিনি আমায় দেখতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আবদুল মজীদ আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ভগৎ সিংহের হাজার হাজার ফটোগ্রাফ দেশময় বিতরিত হয়েছে। সারা দেশের সংবাদপত্রসমূহেও তাঁর ফটো ছাপা হয়েছে। দাড়ি-কামানো, ছোট করে ছাঁটা এবং শর্ট শার্ট ও হ্যাট পরিহিত ফটোগ্রাফের এই ভগৎ সিংকেই সারা দেশ চিনেছেন ও মনে রেখেছেন। কিন্তু মীর আবদুল মজীদের বাড়ীতে আমি প্রথম যাঁকে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন একজন শিখ নবযুবক। লম্বা চুলের উপরে মাথায় যত্ন করে পাগড়ি বাঁধা, পাতলা দাড়ি তখনও পুরো চেহারা ঢেকে ফেলেনি, পরনে পায়জামা, শার্ট ও কোট মিষ্ট স্বভাবের এই ভগৎ সিংহের ছবিই আমার মনে ছাপা হয়ে আছে।
আমার লাহোরে যাওয়ার আগে তো নিশ্চয়ই, কিন্তু কতদিন আগে তা মনে নেই, সেখানে 'নওজওয়ান ভারত সভা' গঠিত হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখে আমি যা বুঝেছিলেম, উদ্যোক্তাদের ভিতরে সকল মতের ও সকল পথের লোকেরা ছিলেন। তাতে ন্যাশনালিষ্টরা ছিলেন, কমিউনিষ্টরা ছিলেন, আর ভগবৎ সিং ও তাঁর বন্ধুরাও ছিলেন। তার মানে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরাও ছিলেন নওজওয়ান ভারত সভায়। বয়সের দিক হতে বিশ বছরের নবযুবকরা ছিলেন, তিরিশের কোঠার যুবকেরা ছিলেন, আর চল্লিশের কোঠার লালা কেদারনাথ সেহগলও ছিলেন। কেউ কেউ উৎসাহের আতিশয্যে বলে ফেলেন যে, ভগৎ সিংই ছিলেন 'নওজওয়ান ভারত সভা'র প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু আমি লাহোরে যা শুনেছি তাতে এই বয়ান ইতিহাসসম্মত নয়।
ভগৎ সিং তখন ভগবতীচরণ বোহারার রাজনীতিক প্রেরণায় চলতেন। আমি 'নওজওয়ান ভারতসভা'র বিশিষ্ট সভাদের মুখে একথা শুনেছি। সভার কার্য-নির্বাহক কমিটির বৈঠকে ভগবতীচরণের প্রেরণায় ভগৎ সিং মাঝে মাঝে সন্ত্রাসবাদী প্রস্তাব উপস্থিত করতেন, কিন্তু সভার বহু মত তখন সভাকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের পরিণত করতে চাননি। ক্রমশঃ সভার কাজে ভগবৎ সিংহের উৎসাহ কমে যায়। আমি লাহোরে গিয়ে শুনলাম কেউ কেউ বলাবলি করছেন 'ভগৎ সিংকে আলস্যে ধরেছে', আসলে আলস্যে তাঁকে ধরেনি, গোপন সংগঠনের কাজে তিনি তখন বেশি বেশি আত্মনিয়োগ করছিলেন।
'নওজওয়ান ভারত সভা' সকলের নিকট হতেই চাঁদা নিতেন। একদিন আমি দেখেছিলাম রামচন্দ্র কাপুর (তিনি তখন নিজেকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করতেন) সার ফজ্ল্-ই হুসায়নের সঙ্গে টেলিফোনে সাক্ষাতের সময় নির্দিষ্ট করছিলেন। সার ফজ্ল্-ই হুসায়ন তখন গভর্নরের একজেকিউটিভ কাউন্সিলের সভ্য ছিলেন। আমি আশ্চর্য হয়ে রামচন্দ্র কাপুরকে জিজ্ঞাস করেছিলেম, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের কী প্রয়োজন? কাপুর বলেছিলেন, 'নওজওয়ান ভারত সভা'র জন্যে তাঁর নিকট হতে চাঁদা আদায় করব। বাংলাদেশে এভাবে চাঁদা আদায় করলে তখনকার দিনে কেউ ভাল চোখে দেখতেন না।
পুরো জানুয়ারী মাস আমি লাহোরে থাকতে পারিনি। ১৯২৭ সালের ১৪ই জানুয়ারী তারিখে কমরেড সাপুরজী সাকলাৎওয়ালা বম্বে পৌঁছবেন জানতে পেরে তার দু'তিন দিন আগে আমি বম্বে চলে গিয়েছিলাম। যতদিন আমি লাহোরে ছিলেম ততদিন ভগৎ সিং আমার সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার করেছিলেন। প্রয়োজন হলে আমার দু-একখানা পত্রও তিনি টাইপ করে দিয়েছেন। তাঁদের দলের আর কে কে তখন লাহোরে ছিলেন তা জানিনে, তবে, রামচন্দ্র কাপুরের ছোটভাই বংশীর সঙ্গে এসে শুকদেব একদিন আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছিলেন।
লাহোরে থাকার সময় আর একটি ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছিলাম। ভগৎ সহ কিছু সংখ্যক যুবক (বেশীরভাগ ন্যাশনাল কলেজে পড়েছিলেন) লালা লাজপৎ রায়ের কঠোর সমালোচনা করে মুদ্রিত ইশ্তিহার বিতরণ করছিলেন। এই ইশতিহারের ভাষা ছিল রাজনীতিক শত্রুতাপূর্ণ, অন্তত আমি তা বুঝেছিলাম। কিন্তু ১৯২৮ সালের ২০শে অক্টোবর তারিখে ব্যাপারটি অন্যদিকে ঘুরে গেল। সেদিন সাইমন কমিশন লাহোরে পৌঁছেছিল। লালা লাজপৎ রায়ের নেতৃত্বে সেদিন কমিশনের বিরোধিতা করে রাস্তায় মিছিল বার হল। তাঁর উপরে পুলিশ লাঠি চালনা করে। তাতে লালাজীও আঘাত পান। পরের মাসের, অর্থাৎ নভেম্বরের ১৭ই তারিখে লালাজী মারা গেলেন। ২০শে অক্টোবর লাঠির আঘাতই তাঁর মৃত্যুর কারণ এটা সকলে ধরে নিলেন। প্রতিবাদের ঝড় উঠল দেশে। ভগৎ সিংদের বিপ্লবী দল স্থির করলেন যে লালা লাজপৎ রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ তারা নেবেন। লাহোরের পুলিসের অ্যাসিন্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট সান্ডার্সকে তাঁরা হত্যা করলেন, যদিও তাঁদের হত্যা করার কথা ছিল পুলিসের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে। ফলে ভগৎ সিং, শুকদেব ও রাজগুরু ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ-বিসর্জন দিলেন। আরও অনেকের লম্বা লম্বা কয়েদ হল।
যতটা মনে পড়ে ১৯২৬ সালে (আরও আগেও হতে পারে, আমার হাতের কাছে এখন কোনো দলিল নেই) অমৃতসর হতে গুরুমুখী হরফে মুদ্রিত 'কির্তি' নামক পাঞ্জাবী ভাষার একখানি মাসিক-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালের নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাসে যখন পাঞ্জাবে ‘কিরতি কিসান পার্টি’ (দি ওয়ার্কারস্ অ্যান্ড পেজন্টস্ পার্টি অফ দি পাঞ্জাব) গঠিত হল তখন মাসিক 'কিরতি' হল তার মুখপত্র। কিন্তু পাঞ্জাবে পাঞ্জাবী ভাষা সকলেই বলতেন ও বুঝতেন। তবে, তাঁরা স্কুলে পড়তেন উর্দুভাষা। আর গুরুমুখী হরফ পড়তে পারতেন মূলত শিখেরা। এই করণে অনেক বেশী পৃষ্ঠা সংখ্যাসহ 'কিরতি' মাসিক উর্দু সংস্করণ বার করা হয়। ১৯২৮ সালে উর্দু 'কিরতি'তে সোহন সিং জোশের সহকারীরূপে ভগৎ সিং কিছুকাল কাজ করেছিলেন। কর্মক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে ভগৎ সিংহের প্রথম ও দীর্ঘ যোগাযোগ ঘটেছিল 'নওজওয়ান ভারতসভা'য় আর শেষ যোগাযোগ ঘটেছিল উর্দু 'কিরতি'তে।
১৯২৯ সালের ২৯শে মার্চ তারিখে মীরাট কমিউনিষ্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে আমরা অনেকে গ্রেফতার হই। মীরাট ডিস্ট্রিক্ট জেলে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। ক্যান্টনমেন্ট ইলাকার গার্ডেন হাউসে (ইষ্টার্ণ জোনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিংএর বাড়ি) কোর্টের কাঠগড়া ইত্যাদি তৈয়ার হচ্ছিল, খানাতালাশীর সময়, বিভিন্ন স্থানে যে- সব পুঁথি-পুস্তক ও দলিল-পত্র পুলিস আটক করেছিল, সে সব তখনও মীরাটে এসে পৌঁছয়নি। কাজেই অপেক্ষা আমাদের করতেই হচ্ছিল। হঠাৎ একদিন (৯ই এপ্রিল, ১৯২৯) সকালের খবরের কাগজে ছাপা হল যে আগের দিন পাবলিক সেফটি বিলের আলোচনার সময়ে দর্শকের গ্যালারি হতে দুটি বোমা কেন্দ্রীয় এসেম্বলিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং যাঁরা বোমা নিক্ষেপ করেছেন তাঁরা ধরা দিয়েছেন। তাঁদের নাম ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। আমি মনে মনে ভাবলাম, কি কাণ্ড রে বাবা! বটুকেরও পেটে পেটে এত বুদ্ধি ছিল?
১৯২৮ সালে মজুর আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছিল। আমাদের একেবারেই ফুরসত নেই। একদিন একজন এসে আমাকে বললেন যে একটি ছেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে, বাঙালী হলেও হিন্দী ভালো জানেন। ছোটবেলা থেকে কানপুরে মানুষ হয়েছেন লেখাপড়াও করছেন হিন্দী স্কুলে। আমি খুশী হলাম। বন্ধুটিকে বললাম, যেমন করেই হোক ছেলেটিকে একদিন আমাদের আফিসে নিয়ে আসুন। বন্ধু নিয়ে এলেন বটুকেশ্বর দত্তকে। লোক বর্ধমানের হলেও কানপুরের বাসিন্দা। বয়স ১৮ হতে ২০ বছরের হবে। হয়তো কিছু বেশীও হতে পারে। কলকাতার বড়বাজারে কোন এক দর্জি স্কুলে কার্টিং- এর কাজ শিখে ছিলেন, থাকতেন হাওড়ায় এক মেসে। বটুক আমাদের সাহায্য করেছিলেন। হিন্দী ইশ্তিহার লিখে তো দিয়েছিলেনই, হাওড়ায় স্কাভেঞ্জারের ধর্মঘটের সময়ে আমাদের মিটিং-এ বক্তৃতাও দিতেন। তাঁর মেসটাও আমি চিনে রেখেছিলাম, যেন দরকার হলে তাঁকে ডাকা যায়।
জেল হতে মুক্তি পাওগার পরে অন্য অনেকের মত বটুকেশ্বর দত্ত ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন নি। কিন্তু তিনি তাঁর আন্দামানের সহ-বন্দী দেবকুমার দাস ও রণধীর দাসগুপ্তের মারফতে আমায় অনুরোধ জানিয়েছিলেন যে বিহারের তাঁর এক বন্ধুকে যেন আমরা কমিউনিষ্ট পার্টিতে নিই। তাঁর বন্ধুর বিরুদ্ধে যে-সব অভিযোগ আমাদের নিকটে এসেছে, সে-সব একেবারেই ভিত্তিহীন। বটুকেশ্বরের বন্ধু ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টিতে স্থান পেয়েছিলেন।
আমি আবার 'নওজওয়ান ভারত সভা'র কথা বলছি। এই সংগঠনের আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে অন্য কোন যুব সংগঠন 'নওজওয়ান ভারত সভা'র মত এত বেশী রাজনীতিক প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারে নি। বিভিন্ন বিপ্লবীর সহিত ব্যক্তিগত সংযোগের ভিতর দিয়ে ভগৎ সিং রাজনীতিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি রাজনীতিতে বিকশিত হয়েছিলেন 'নওজওয়ান ভারত সভা'র মারফতে।
- অনুশীলন-এর মে ১৯৭৯ সংখ্যা থেকে। বানান অপরিবর্তিত।
প্রকাশের তারিখ: ২৩-মার্চ-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
