সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসের শিক্ষা
পি রামমূর্তি
পুঁজিপতিরা চায় যতদূর সম্ভব শ্রমিকের জীবনধারনের মানকে একেবারে নীচে নামিয়ে রাখতে। এবং শ্রমিকের যে শ্রমশক্তি সে কিনেছে তাকে কাজে লাগিয়ে যে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয়েছে তার যতটা বেশি অংশ সম্ভব আত্মস্যাৎ করতে। এর থেকেই সৃষ্টি হয় স্থায়ী সামাজিক সঙ্ঘাত এবং ক্রমশ তীব্র হয় শ্রেণি সংগ্রাম। কারণ এই দুই পরস্পর বিরোধী শ্রেণির স্বার্থ কখনই মেলে না,বরং তাদের স্বার্থের সঙ্ঘাতটাই নিয়ম।

ভারতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করাই লক্ষ্য— এই কথাটি তাদের পতাকায় উৎকীর্ণ করে নিয়েছে সিআইটিইউ। ভারতের প্রায় সবকটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলই সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করাকে তাদের লক্ষ্য হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছে। বস্তুত, জরুরি অবস্থা চলাকালীন ১৯৭৬ সালে কংগ্রেস (আই) দল সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশেরও সংশোধন করেছে। সংশোধিত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে:
‘আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তোলার শপথ নিচ্ছি ....’
এর আগে কংগ্রেস তাদের আভাদি অধিবেশনে যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল তাতে ঘোষণা করেছিল ‘সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ’ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। শাসকদলের পক্ষে দেশের জনগণের সামনে কেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের গাজর ঝুলিয়ে রাখা জরুরি হয়ে পড়ল?
এটা খুবই স্পষ্ট একটা বিষয় যে, সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী দেশগুলির জনগণের জীবনধারণের অবস্থার মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে— সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে দারিদ্র ও বেকারি নেই, সেখানে জণগণের জীবনধারণের মান ও সামাজিক পরিষেবার সুবিধা ক্রমশ বেড়েই চলেছে এবং এর ঠিক বিপরীত দৃশ্যগুলি দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাদী দেশগুলিতে— এই পরিস্থিতিই পুঁজিবাদী দেশগুলির জনগণের মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে যাতে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র, লক্ষ্মীছাড়া, শ্রীহীনদশা এবং কর্মহীনতাকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠানো যায়।
এমন গুরুগম্ভীর ঘোষণা সত্ত্বেও ভারতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একদিকে দারিদ্র ও কর্মহীনতা বাড়ছে, অন্যদিকে গুটিকয়েক একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। দেশীয় এই সব বহুজাতিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি আবার বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলছে। এরই পাশাপাশি, আরও বেশি সাহায্য পাওয়ার আশায় দেশের সরকার ভিক্ষাপাত্র হাতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেন এমনটাই ঘটছে ? নিজেদের স্বার্থে এবং সমগ্র শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহী শ্রমিক শ্রেণিই। তাই ওপরের প্রশ্নটির উত্তর স্পষ্টভাবে বুঝে নিতে হবে যাতে ভু্য়ো শ্লোগানের কারবারীরা তাদের প্রতারিত করতে না পারে। এবং নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে শ্রমিকশ্রেণি যেন নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারে।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব
ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল পূর্বতন সম্রাট জারের ভূখণ্ডে— এখন যা ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক নামে পরিচিত।
মানবজাতির ইতিহাসে সেটাই ছিল প্রথম সচেতন বিপ্লব। জারের রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণি, শ্রমজীবি কৃষক, কৃষি মজুর, হস্তশিল্পী সহ অন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুঁজিপতি ও জমিদারদের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে দিয়েই এই বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছিল সরকারের নতুন ধরনের একটি সংগঠন— সোভিয়েত। বিপ্লবে বিজয়ী শ্রমিকশ্রেণি সরকারের নতুন ধরনের সংগঠন সোভিয়েতকে কাজে লাগিয়ে প্রথম যে ব্যবস্থা নিয়েছিল তা হল, উৎপাদনের উপকরণ সমূহের মালিকানা শ্রমজীবীদের হাতে নেওয়া, পুঁজিপতিদের থেকে কারখানাগুলির দখল নেওয়া এবং শ্রমজীবি কৃষকদের দ্বারা জমিদারদের সব জমি দখল করা। ধীরে ধীরে দখলীকৃত জমিগুলিকে সমবায় ও যৌথ খামারে রূপান্তরিত করার কাজে কৃষকশ্রেণিকে সাহায্য করেছিল শ্রমিকশ্রেণি। সমবায় ও যৌথ খামারের মালিকানা ছিল যৌথ, এবং এর মালিক ছিলেন সংগঠনগুলির সদস্যরা। সম্পত্তি সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তরের ভিত্তিতে— অর্থাৎ আগে যে সম্পত্তি ছিল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, তাকে সামাজিক সম্পত্তিতে পরিণত করে— শ্রমিকশ্রেণির নতুন রাষ্ট্র ধাপে ধাপে এগিয়েছিল একটা বিকাশমান সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথে, যে সমাজে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে নাগরিকদের জীবনের মান ক্রমশ উন্নত করে যাওয়াটা নিশ্চিত করেছিল নতুন রাষ্ট্র। এখানে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্র বলতে বোঝানো হয়েছে জীবনধারণের মান, সাংস্কৃতিক জীবন, অবকাশের জীবন, স্বাস্থ্য ও মনোরঞ্জন ইত্যাদি।
ইউরোপ, এশিয়া, কিংবা লাতিন আমেরিকার যেখানেই সফলভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা গেছে, সেরকম সবকটি দেশের ক্ষেত্রে এটাই ছিল অগ্রগতির দিশা। বিপ্লবী প্রক্রিয়া, অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণির দ্বারা সচেতনভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কাজটি নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়েছে, কারণ ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলিকে হিসাবের মধ্যে নিতে হয়েছে।
কিন্তু এই সমস্ত দেশের বিপ্লবগুলির মধ্যে থেকেছে একটা লাল যোগসূত্র, যা নিষ্কাশন করা হয়েছে কার্ল মার্কসের আবিষ্কার করা মৌলিক নীতিমালা থেকে, যে নীতিমালাকে মার্কস ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর আরও উন্নত করেছিলেন লেনিন। এই বিপ্লবী তত্ত্বের হাতিয়ার ছাড়া এবং সেই তত্ত্বের ভিত্তিতে অটুট ঐক্য গড়ে তোলা ছাড়া শ্রমিকশ্রেণি কোনও দেশেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারত না।
শ্রেণিবিভক্ত সমাজ
সেকারণে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে এই সব বিপ্লবী নীতিমালার তত্ত্ব ও অনুশীলনের বিষয়টি অনুধাবন করা জরুরি।
শোষক ও নির্যাতনকারী শ্রেণিগুলি ও তাদের মতাদর্শের প্রবক্তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, এই নীতিমালা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানব সমাজ চিরটা কাল প্রভু ও দাস— এভাবে বিভাজিত ছিল না। একেবারে শুরুর পর্বে যখন পৃথিবীতে নারী ও পুরুষের উদ্ভব হয়েছিল, তখন তারা দল বেঁধে থাকত, একসঙ্গে কাজ করত, কাজের সমস্ত হাতিয়ার ও উপকরণের মালিকানা ছিল সেই সব দল বা সমষ্টির হাতে, এবং তাদের পরিশ্রমের ফসল তারা যৌথভাবে উপভোগ করত।
অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে মানুষ যখন প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়াল, তখন সে আরও নতুন ও উন্নত অস্ত্র তৈরি করল। ক্রমশ এমন একটা সময় এল যখন উৎপাদনের উপকরণগুলি এত উন্নত হল যে তা দিয়ে একজন ব্যক্তি শ্রম করে যে ফসল উৎপাদন করত, তাতে তার নিজের প্রয়োজন মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থেকে যেত। সেই পর্ব থেকেই সমাজে শ্রেণি বিভাজন শুরু হয়ে গেল— একদল হয়ে গেল উৎপাদনের উপকরণসমূহের মালিক, উল্টোদিকে অন্যদের হাতে উৎপাদনের উপকরণের কোনওরকম মালিকানা রইল না, বরং অলস, কর্মবিমুখ মালিকদের জন্য তাদের শুধু গতরে খেটে যেতে হত।
এই পরিস্থিতি থেকেই উৎপাদনের উপকরণগুলি আরও উন্নত করার তাগিদ দেখা দিল। আবার এই পর্বে একইসঙ্গে শ্রেণিগুলির মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়ে গেল, উৎপাদনের উপকরণের মালিক এবং মালিকানাহীন শ্রমজীবিদের মধ্যে সংগ্রাম— কখনও সেই সংগ্রাম চলতে থাকল নীরবে, আড়ালে–আবডালে, কখনও বা তা ফেটে পড়ত উগ্র, হিংসাত্মক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। মানুষের ইতিহাস মানে এই শ্রেণি সংগ্রামেরই ইতিহাস। এই শ্রেণি সংগ্রাম দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাথমিকভাবে সেই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর যার মূল অন্তর্বস্তু হল উৎপাদনের উপকরণ সমূহ এবং উৎপাদকদের সঙ্গে সেগুলির সম্পর্ক। অবশ্যই এই সব সম্পর্কগুলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে গড়ে উঠেছিল একটা পূর্ণাঙ্গ উপরিকাঠামো, যার মধ্যে পড়ে সামাজিক প্রথা, আইন, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি ইত্যাদি। অর্থনৈতিক ভিত্তি ও উপরিকাঠামো— দুটি দিকই একে অপরকে প্রভাবিত করে, কিন্তু ঐতিহাসিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে নির্ধারক শক্তি হল অর্থনৈতিক বনিয়াদকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শ্রেণি সংগ্রাম।
পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি
সামাজিক প্রগতির এই মৌলিক নিয়মটি আবিষ্কারের পর, মার্কস তাঁর সমসাময়িক পুঁজিবাদী সমাজের বিশদে বিশ্লেষণ করেছিলেন, যে পুঁজিবাদী সমাজের অভিজ্ঞান হল আইনের চোখে সবাই সমান। এই সমাজে উৎপাদনের রূপ হল পণ্য উৎপাদন। এর মানে এখানে কোনও জিনিস উৎপাদকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি হয় না, বরং সেই সব উপভোক্তাদের জন্য তৈরি হয় যারা উৎপাদন স্থল থেকে শত শত, এমনকী হাজার হাজার মাইল দূরে রয়েছে।
সম পরিমাণ মূল্যের সঙ্গে সম পরিমাণ মূল্যেরই বিনিময় হতে পারে, এটাই যদি নিয়ম হয় তাহলে কারখানা মালিকদের মুনাফা আসে কোথা থেকে? তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘ক্যাপিটাল’ বা ‘পুঁজি’ বইয়ে মার্কস তাঁর অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণ ক্ষমতার সাহায্যে আবিষ্কার করেছিলেন যে, পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিতে এমন একটি পণ্য রয়েছে যা পুঁজিপতিরা কেনে সম পরিমাণ মূল্যের সঙ্গে সম পরিমাণ মূল্যের বিনিময়ের ভিত্তিতে। এই পণ্যটি হল শ্রমিকের শ্রমশক্তি এবং নিজের শ্রমশক্তি ছাড়া শ্রমিক আর কোনওকিছুরই মালিক নন। এবং শ্রমিকের শ্রমশক্তির মূল্য ঠিক ততটাই যতটা শ্রমিকের বেঁচে থাকা এবং পুনরুৎপাদন বা বংশবৃদ্ধির জন্য দরকার। কিন্তু উৎপাদনের উপকরণগুলি আরও উন্নত হওয়ার কারণে শ্রমিকের শ্রমশক্তি আরও অনেক বেশি উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। এই উদ্বৃত্ত মূল্যই পুঁজিপতিরা মুনাফা হিসাবে আত্মস্যাৎ করে। এই বিষয়টিই পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিতে যাবতীয় দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংঘাত ও সংকটের মূলে।
পর্যায়ক্রমিক পুঁজিবাদী সঙ্কট: ক্রমশ বেড়ে চলা দ্বন্দ্বসমূহ
প্রথমত, পুঁজিপতি চায় যতদূর সম্ভব শ্রমিকের জীবনধারনের মানকে একেবারে নীচে নামিয়ে রাখতে। এবং শ্রমিকের যে শ্রমশক্তি সে কিনেছে তাকে কাজে লাগিয়ে যে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয়েছে তার যতটা বেশি অংশ সম্ভব আত্মস্যাৎ করতে। এর থেকেই সৃষ্টি হয় স্থায়ী সামাজিক সঙ্ঘাত এবং ক্রমশ তীব্র হয় শ্রেণি সংগ্রাম। কারণ এই দুই পরস্পর বিরোধী শ্রেণির স্বার্থ কখনই মেলে না,বরং তাদের স্বার্থের সঙ্ঘাতটাই নিয়ম।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু সামাজিক উৎপাদনের একটা বড় অংশ ব্যক্তিগতভাবে আত্মস্যাৎ করে নেয় পুঁজিপতিরা এবং শ্রমিকেরা পায় একটি অংশ মাত্র, তার ফলে সমগ্র সামাজিক উৎপাদনের ফসল শ্রমজীবী জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ উপভোগ করতে পারে না। এর ফলে পর্যায়ক্রমে অবিক্রীত পণ্যের এক বিপুল পাহাড় গড়ে ওঠে, কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দেওয়ার ফলে তারা বেকার হয়ে পড়েন। পর্যায়ক্রমিক এই সঙ্কটই পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিতে ফিরে ফিরে আসে।
তৃতীয়ত, মুনাফার তাগিদে পুঁজিপতিরা নতুন, উন্নত ও আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের কাজে নামে। কিন্তু তার দরুন শ্রমিকদের কাজের ভার হাল্কা হয় না। বরং বেকারি আরও বেড়ে যায়।
চতুর্থত, এই প্রক্রিয়ায়, যেসব পুঁজিপতির সম্পদ অনেক বেশি তারা ছোট পুঁজিপতিদের গিলে খায়। এই প্রক্রিয়া থেকেই একদিকে জন্ম হয় একচেটিয়ার, অন্য দিকে ক্ষুদে পুঁজিপতিরা দেউলিয়া হয়ে যায়, এবং তৈরি হয় একটা তিক্ত প্রতিযোগিতা যা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।
পঞ্চমত, শিল্পোন্নত দেশগুলি বাজারের খোঁজে বেরিয়ে নানা উপায়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলিকে অধিকার করে নেয়, এবং ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করে। এতে ঔপনিবেশিক দেশগুলির নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি হয় এবং তারই জেরে উপনিবেশের জনগণ এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব আত্মপ্রকাশ করে।
ষষ্ঠত, পুঁজিবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে গোটা পৃথিবীর ভাগবাঁটোয়ারার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন জয় করার মতো আর কোনও নতুন অঞ্চল থাকে না, তখন এই বিশ্বের পুনর্বিভাজনের জন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। এভাবেই ১৯১৪–১৯১৮-র প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে শ্রমিকশ্রেণি কৃষক ও সৈনিকদের সঙ্গে জোট বেঁধে প্রাক্তন জার সাম্রাজ্যে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছিল এবং পূর্বতন শাসকশ্রেণির হাত থেকে তারা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল।
এর ফলে সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে এবং তারপর শুরু হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাধারণ সঙ্কট— সাধারণ এই অর্থে যে, পর্যায়ক্রমে ঘুরে ঘুরে আসা সঙ্কট ছাড়াও, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব বাস্তবত দৃশ্যমান হওয়ার ফলে পুঁজিবাদী দেশগুলির জনগণের জীবনের সর্বক্ষেত্রে সঙ্কট আরও বেশি বেশি করে বেড়ে উঠতে শুরু করে। এখানে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বলতে বোঝানো হচ্ছে, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, মতাদর্শগত, নৈতিক এবং বস্তুগত জগৎ ইত্যাদি।
এই পরিস্থিতির কারণেই ঔপনিবেশিক প্রভুদের জোয়াল ছুড়ে ফেলার জন্য উপনিবেশের জনগণের সংগ্রামগুলিও তীব্রতর হয়।
১৯২৯ সালে যে মহা মন্দা শুরু হয়েছিল এবং পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল সেটা ছাড়াও, সাম্রাজ্যাবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে সঙ্ঘাতের জেরেই ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের গতিপথ সম্পর্কে বিশদে না গিয়ে বলা যায়, এই যুদ্ধের শেষে পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর ইউরোপের দেশগুলি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছিল। এর পরপরই ঘটল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ঐতিহাসিক চীন বিপ্লব। এরপর জয়ী হল ইন্দোচীনের দেশগুলির ও কিউবার বিপ্লব।
তখন ঔপনিবেশিক দেশগুলির সংগ্রামও তীব্রতর হল এবং সেই সংগ্রামের পরিণতিতে বেশিরভাগ ঔপনিবেশিক দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেল।
ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত
ভারতে ১৯৪৫–৪৬ সালে ক্রমবর্ধমান বিপ্লবী সংগ্রামগুলির মুখোমুখি হওয়ার কারণে এদেশের বৃহৎ বুর্জোয়া পরিচালিত বুর্জোয়া নেতৃত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে আপোষ করে। এর পরিণামে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় পুঁজিপতিশ্রেণির হাতে, যারা আবার ব্রিটিশ এবং অন্যান্য বিদেশি পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ ও মুনাফা রক্ষা করতে রাজি হয়ে যায়। এই পুঁজিপতি শ্রেণি জমিদারতন্ত্র বিলোপ করতে অস্বীকার করে, বরং উল্টে জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে আপোষ করে।
তখন শিল্পায়নের নামে বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি বৃহৎ বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে সহযোগিতার চুক্তি করে। এই সব বৃহৎ বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিই বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আইএমএফ ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
স্বাভাবিকভাবেই, যদিও সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল, তবে অর্থনৈতিক নির্ভরতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের ফাঁস আরও শক্ত করে, একাধিক শর্ত চাপিয়ে দেয়, আমাদের দেশে উৎপন্ন জিনিসের জন্য তারা কম দাম দিত এবং তাদের রপ্তানি করা পণ্যের জন্য দাম বেশি নিত এবং এভাবেই এই দেশকে তারা আরও ব্যাপকভাবে লুঠ করত।
কিন্তু লৌহ ও ইস্পাত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি, খনিজ তেল নিষ্কাশন এবং তাকে কাজে লাগানোর জন্য রিফাইনারি গড়ে তোলা, ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প ইত্যাদি ভারী শিল্পক্ষেত্রের কারখানা নির্মাণের জন্য যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য না করত, তাহলে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতিও সম্ভব হত না। এখানে এটাও লক্ষ্য করার মতো যে, সরকার এবং একচেটিয়াবাদীরা সোভিয়েত সহযোগিতাকে কাজে লাগাত পশ্চিমের একচেটিয়া সংস্থাগুলিকে চাপ দিয়ে তাদের কাছ থেকে সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের লক্ষ্যে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে। সোভিয়েত সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের নিজস্ব গবেষণা ও উন্নতির ওপর ভিত্তি করে স্বাধীন ও স্বতোৎসারিত অর্থনীতি গড়ার পথে হাঁটেনি এদেশের বুর্জোয়া নেতৃত্ব।
এই সব একচেটিয়া ও বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে উঠেছে যে সম্পদ কাজে লাগিয়ে, তা মূলত এসেছে জাতীয়করণ করা ব্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তহবিল থেকে। একচেটিয়া ও বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি, সরকারি পরিচালকদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে তহবিলের অর্থ অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করত, এর ফলে কারখানাগুলি রুগ্ন হয়ে পড়ে এবং তারপর আরও লুঠপাটের আশায় তারা অন্য সব লাভজনক চারণক্ষেত্রে সরে গেছে।
এটা মোটেই আশ্চর্যের ব্যাপার নয় যে, এই প্রক্রিয়ায় একচেটিয়াবাদীরা, বহুজাতিকেরা, কালোবাজারিরা এবং জমিদারেরা আমলাতন্ত্র, এমনকী মন্ত্রীদের এবং জনজীবনে থাকা প্রভাবশালীদের পিছনেও বিপুল টাকা ঢেলেছে এবং তার ফলে দুনীর্তির পাহাড় তৈরি হয়েছে।
যদিও গণ আন্দোলনের চাপে জনগণের স্বার্থরক্ষায় কিছু কিছু আইন বিভিন্ন সময়ে জারি হয়েছে , যেমন প্রজাস্বত্ত্ব আইন, জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং বেঁধে দেওয়া, ন্যূনতম মজুরি আইন ইত্যাদি, তবে এগুলির কোনওটাই কার্যকর করা হয়নি সরকারি কর্মচারী, শাসক দল ও কায়েমি স্বার্থের মধ্যে যোগসাজশের ফলে এবং শ্রেণিচরিত্রের দরুন এদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে, বেকারি দিনে দিনে বাড়ছে , এটা কি খুবই আশ্চর্যের?
যুদ্ধের বিপদ
মানবজাতির এক তৃতীয়াংশের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পুঁজিবাদ আরও বৃহত্তর সঙ্কটে পড়েছে। সাম্রাজ্যাবাদীরা আরও একটা যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলার জন্য। অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছেই।
এসব কিছু সত্ত্বেও গত তিন বছরে পুঁজিবাদ সবচেয়ে বড় সঙ্কটে পড়েছে, সেই সঙ্কটের জেরে কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না, মুদ্রাস্ফীতির কোনও শেষ দেখা যাচ্ছে না, মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্কট বাড়ছে, অভূতপূর্ব বেকারি দেখা দিচ্ছে ইত্যাদি।
স্বাভাবিক ভাবেই সাম্রাজ্যবাদীরা এই সঙ্কটের বোঝা উন্নয়নশীল দেশগুলির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে। উন্নয়নশীল দেশগুলি আবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে আর একটু ভাল বোঝাপড়া পাবার আশায় কাতর প্রার্থনা করে চলেছে। তবে সাম্রাজ্যবাদীরা এতটুকুও ছাড় দিতে রাজি নয়।
ভারত সরকার আগের মতোই সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ওপর এবং ওই সব দেশগুলির হয়ে কাজ করে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপরেই নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। এবং তাদেরই নির্দেশে নতুন নতুন কঠোর আইন চালু করে শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমজীবী জনতার ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে ভারত সরকার।
সিআইটিইউর করণীয় কাজসমূহ
সরকার ও মালিকপক্ষের এই ধরনের ক্রমাগত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে সিআইটিইউ চাইছে সব ট্রেড ইউনিয়নকে ঐক্যবদ্ধ করে এই আক্রমণের বিরোধিতা করতে। অন্যদিকে, প্রবলতর নিপীড়ণ চাপিয়ে দিয়ে, মালিকদের ভাড়া করা গুন্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে এবং পুলিশ এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য দমনপীড়নের যন্ত্রগুলির যোগসাজশে সরকার এই প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে।
তবুও প্রতিরোধ জারি রয়েছে। এটাই হল শ্রেণি সংগ্রাম যা রয়েছে প্রাথমিক স্তরে।
শ্রমিকশ্রেণিকে একথা উপলব্ধি করতে হবে যে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের জীবনধানের মানের কোনও স্থায়ী উন্নতি হতে পারে না।
মার্কসবাদ–লেনিনবাদ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, এবং সেই শিক্ষা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত, দারিদ্র ও বেকারির অভিশাপ থেকে শ্রমজীবি জনতাকে মুক্ত করা যায় এবং তাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করা যায়— যদি তারা রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে পুঁজিবাদী ও জমিদার শ্রেণিকে উৎখাত করতে পারে এবং রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে পারে, যদি তারা উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিতে পারে এবং ধাপে ধাপে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
আজকের দিনে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নতি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে সেগুলিকে কাজে লাগিয়ে গোটা মানব সমাজের জন্য জীবনের সেরা জিনিসগুলি নিশ্চিত করা যায়। এই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে উৎপাদন সম্পর্ক— অল্প কিছু লোকের হাতে কুক্ষিগত রয়েছে উৎপাদনের উপকরণের সমস্ত সম্ভার এবং অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের কোনও সম্পত্তিই নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, এই উৎপাদন সম্পর্কের কারণেই তৈরি হয়েছে প্রবল সঙ্কট এবং তার ফলে চূড়ান্ত অভাবের মধ্যেই অতি উৎপাদনের বৈপরীত্য প্রকট হয়ে পড়ছে।
এছাড়া, শ্রমজীবী মানুষের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে বিপুল সম্পদ তৈরি করা হচ্ছে, তার একটা বড় অংশ আরও একটা যুদ্ধের জন্য বিধ্বংসী অস্ত্র উৎপাদনের কাজে লাগানো হচ্ছে।
সুতরাং, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথে এই সব উৎপাদন সম্পর্কগুলি শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়িয়েছে, মানব সমাজের শান্তিপূর্ণ, সাধারণ ও স্থায়ী উন্নতির পথেও এই সব উৎপাদন সম্পর্কগুলি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কস আমাদের শিখিয়েছেন যে, এই ব্যবস্থায় যতই পচন ধরুক না কেন তা নিজের ইচ্ছায় উবে যাবে না। এই ব্যবস্থাকে কবর দিতে হবে। যে শক্তি এই ব্যবস্থাকে কবর দিতে পারে সেটা হল শ্রমিকশ্রেণির বাহিনী যা পুঁজিবাদ নিজেই সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে সিআইটিইউ-র সংগঠকদের কাজ হল:
(১) অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও মতাদর্শের ক্ষেত্র–সহ সর্বক্ষেত্রে শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। প্রতিটি অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের অবশ্যই চেষ্টা চালাতে হবে শ্রমিকদের শ্রেণি সচেতনতা পূর্ণমাত্রায় বাড়ানোর জন্য। বিশেষ করে আমাদের দেশে যে সব জনস্বার্থ বিরোধী মতাদর্শ রয়েছে, যেমন জাতপাত, ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, এবং অস্পষ্ট ও দুর্জ্ঞেয় মতবাদ ইত্যাদির ভিত্তিতে শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে বিভাজন গড়ে তোলার চেষ্টা, সেই সব জনস্বার্থ বিরোধী এবং অস্পষ্ট মতবাদের প্রতিটি প্রকাশের বিরুদ্ধে অবশ্যই সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
(২) তাদের অবশ্যই কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবীদের ইস্যুগুলির সমর্থনে শ্রমিকশ্রেণিকে জমায়েত ও সক্রিয় করে তুলতে হবে এবং কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে।
(৩) তাদের একথা অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে বুর্জোয়াদের নীতি হল জমিদারতন্ত্রের সঙ্গে আপোষ করা এবং বহুজাতিক সংস্থা ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহযোগিতা করে চলা। এই নীতি নিয়ে বুর্জোয়ারা দেশের স্বাধীনতাকে কখনই কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারবে না। দেশের স্বাধীনতার পতাকা অবশ্যই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে শ্রমিকশ্রেণিকেই।
(৪) সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে তাদের অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণিসহ সমস্ত জনগণকে সমাবেশিত করতে হবে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে ও শান্তির দাবিতে আন্দোলন গোটা পৃথিবীজুড়েই প্রতি দিন শক্তিশালী হচ্ছে, যদি আরো বেশি বেশি লোককে সফলভাবে সমাবেশিত করা যায় তাহলে এই আন্দোলনই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজদের শায়েস্তা করতে পারবে।
একমাত্র এই বৈজ্ঞানিক মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলা ঐক্যই ভারতীয় শ্রমিকশ্রেণিকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে সক্ষম করে তুলবে এবং ধাপে ধাপে ভারতের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলাটা সুনিশ্চিত করবে।
ভারতে বিপ্লব সফল হলেই গোটা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত পতনের প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
সূত্র: দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস, মান্থলি জার্নাল অফ দ্য সিআইটিইউ, ভল্যুম ১২, নাম্বার ১১, জুলাই ১৯৮৩।
প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
