Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ছেচল্লিশের নৌবিদ্রোহ- সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অসম্প্রদায়িক চেতনার জলন্ত নিদর্শন

অর্ণব ভট্টাচার্য
নৌ বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়াতে জাতীয় নেতৃত্ব অস্বীকার করলেও বিদ্রোহীদের সমর্থনে আমজনতা বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নেমে আসে। সৈন্যবাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলে নাবিকদের অনাহারে মারবার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয় বোম্বের সাধারণ মানুষ। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় জড়ো হয়ে তারা বিদ্রোহীদের খাবার পৌঁছে দেয়। নৌ বিদ্রোহের দিনগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্রোহী নাবিকদের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় বোম্বে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা গঙ্গাধর অধিকারী এক বিবৃতিতে নাবিকদের দাবির বিষয়ে সহানুভূতি ও আনুগত্য প্রকাশ করেন
Naval mutiny of forty-six - vivid sign of anti-imperialist non-communal spirit

পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ লগ্নে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তা কার্যত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দেয়। ব্রিটিশ শাসকদের সবচেয়ে ভরসার জায়গা ঔপনিবেশিক সৈন্যবাহিনীর অন্যতম অংশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে যে এইরকম বিদ্রোহ ঘটে যাবে তা তারা প্রত্যাশা করেননি। স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক গ্রাস করে ব্রিটিশ শাসককে। তাছাড়া সে সময় ভারতবর্ষে যে ধর্মীয় ভেদাভেদের রাজনীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল তাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাবিক এবং জনগণকে তাদের অভিন্ন শত্রু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে সামিল করেছিল এই বিদ্রোহ। নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে বম্বের রাস্তায় নেমে আসা জনস্রোতে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে যেভাবে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল তার তুলনীয় ঘটনা ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে নৌ বিদ্রোহ বরাবর উপেক্ষিত। অথচ এই বিদ্রোহ ছিল বিভিন্ন কারণে অনন্য। এই বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিলেন নৌবাহিনীতে পদমর্যাদার দিক থেকে নিচুস্থানে থাকা সাধারণ নাবিকরা যারা রেটিং নামে পরিচিত ছিলেন। তাদের অতুলনীয় সাহস জনতাকে আন্দোলিত করে। বিদ্রোহী রেটিংরা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত। বিদ্রোহী নাবিকরা কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা একত্রে উত্তোলিত করেছিলেন এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বদলে জনসাধারণের ঐক্যে বিশ্বাসী এবং একই সাথে দেশের শ্রমজীবী জনগণের সার্বিক মুক্তি যা কমিউনিস্টদের লক্ষ্য তার সাথে সহমত। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় রাজকীয় নৌবহরের (Royal Indian Navy) আয়তন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ১৯৩৯ সালে নৌবাহিনীর যে আয়তন ছিল তা ১৯৪৫ সালে দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যরা গ্রীস, ইটালি, বার্মা, ইন্দোচীনে অক্ষশক্তিকে পরাস্ত করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন অথচ তাদের নিজেদের দেশ তখনো ব্রিটিশ শাসকের পদানত। কোন সন্দেহ নেই যে বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভারতীয় সৈনিকদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এদিকে নৌবাহিনী সহ সমগ্র সেনাবাহিনীতেই ব্রিটিশ শাসকদের জাতিগত বৈষম্য ছিল অত্যন্ত প্রকট। ভারতীয়দের তুলনায় ব্রিটিশদের বেতন কয়েক গুণ বেশী ছিল। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ভালো খাবার, ভালো পোশাক ও উন্নত মানের থাকার জায়গা। অন্যদিকে ভারতীয় নাবিকদের জুটতো নিম্নমানের খাবার, পোশাক ও বাসস্থান। তার সাথে ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের চরম দুর্ব্যবহার। নৌবাহিনীতে এই অবিচার ও বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশ দানা বাঁধছিল। রাজকীয় নৌবহরে বিদ্রোহ শুরুর মাসখানেক আগে বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে জাতিগত ও আর্থিক বৈষম্যের প্রতিবাদে ভারতীয় বৈমানিকরা প্রতিবাদী ধর্মঘটে শামিল হন। কিন্তু পেশাগত ক্ষোভকে বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনায় জারিত করে উত্তাল গণ আন্দোলন গড়ে তোলায় নৌবাহিনীর কুড়ি হাজার রেটিং যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা অবিস্মরণীয়।

যুদ্ধ শেষ হলে সারা দেশ জুড়ে তীব্র হচ্ছিল অর্থনৈতিক সংকট, বাড়ছিল জনগণের ক্ষোভ। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৫ সালের শেষ থেকেই জনতার বিদ্রোহী মেজাজ ব্রিটিশ শাসকের ঘুম কেড়ে নিচ্ছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের মুক্তির দাবিতে ঐ বছর নভেম্বর মাসে সংগঠিত ছাত্র মিছিলে গুলি চলে এবং দুজন ছাত্র শহীদ হন। কলকাতায় জনতার সাথে সংঘর্ষ বাদে সৈন্য ও পুলিশের। মারা যান ৩৩ জন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর অফিসার রশিদ আলীর সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডের প্রতিবাদে ১৯৪৬ সালের ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পথে নামেন মানুষ। অকুতোভয় জনতার সাথে সাম্রাজ্যবাদী শাসকের সংঘাতে ৮৪ জন শহীদ হয়েছিলন। দেশের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে বিদেশি শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নৌ বাহিনীর সদস্যদেরও আলোড়িত করে। 

১৯৪৫ সালের পয়লা ডিসেম্বর সকালে সাধারণ জনতার দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ডকে থাকা বিভিন্ন রণতরী। ওই দিনটিকেই ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বেছে নেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নাবিকরা। প্যারেড গ্রাউন্ড জুড়ে, ব্যারাকের দেওয়ালে 'কুইট ইন্ডিয়া', 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' এর মত স্লোগান লিখে দেওয়া হয়। কম্যান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল অচিনলেকের নজরে পড়ে সেইসব রাজদ্রোহী স্লোগান। রণতরী এইচ এম আই এস তলোয়ারে কর্মরত নাবিক বলাই চন্দ্র দত্ত ব্রিটিশবিরোধী পোস্টার লাগানো ও লিফলেট ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। অকুতোভয় বলাই দত্ত কম্যান্ডিং অফিসার কিংকে বলে দেন যে তিনি এর জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হতেও রাজি আছেন। বিক্ষুব্ধ নাবিকদের অধিকাংশ ছিল বয়সে অত্যন্ত তরুণ যারা দেশের মুক্তির জন্য চরম ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল । বলাই চন্দ্র দত্ত তার লেখা স্মৃতিকথা ' Mutiny of the Innocents' এ মন্তব্য করেছেন, "At their age and with their training and experience, they could understand and appreciate a Subhas [Chandra] Bose more easily than a Mahatma. The barrack walls were no longer high enough to contain the tide of nationalism "। 

১৯৪৬ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের রূপ নেয়। এইচ এম আই এস তলোয়ার জাহাজের ১৫০০ জন রেটিং প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিদ্রোহী নাবিকদের স্ট্রাইক কমিটি ঘোষণা করে যে তাদের লক্ষ্য ভারতীয় রাজকীয় নৌবহরকে দেশের জাতীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণাধীন করা। যে দাবি পত্র এই নাবিকদের পক্ষ থেকে পেশ করা হয় তার প্রথম দাবি ছিল, আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সেনানিরা সহ সমস্ত ভারতীয় রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। নৌ বিদ্রোহীরা দাবি করেন যে ইন্দোনেশিয়া ও মিশর থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং ভারত ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকদের চলে যেতে হবে। তারা এই পেশাগত দাবী উত্থাপন করেন যে ভারতীয় সেনাদের ব্রিটিশ সেনাদের সমান আর্থিক সুযোগ দিতে হবে এবং কোনরকম বৈষম্য চলবে না। বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। পরের দিন অর্থাৎ ১৯ শে ফেব্রুয়ারি সকালে বম্বেতে নোঙর করা নৌবহরের জাহাজগুলিতে এবং ক্যাসেল ব্যারাক ও ফোর্ট ব্যারাকে ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা তুলে দেয় বিদ্রোহী নাবিকরা। ২০ ফেব্রুয়ারি সকালের মধ্যে কলকাতা, করাচি, মাদ্রাজ, জামনগর, বিশাখাপত্তনম, কোচিনের মতন নানা বন্দরে বিদ্রোহে সামিল হয়ে যান আটাত্তরটি জাহাজ, চারটি ফ্লোটিলা ও কুড়িটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় কুড়ি হাজার নাবিক। প্রত্যেক জাহাজ ও ব্যারাক থেকে প্রতিনিধিদের নিয়ে যে স্ট্রাইক কমিটি তৈরি হয় তার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন সিগন্যাল ম্যান এম এস খান, সহ-সভাপতি হন মদন সিং। ভারতীয় রাজকীয় নৌবহরের নতুন নামকরণ হয় ভারতীয় জাতীয় নৌবাহিনী(Indian National Navy-INN)। বিদ্রোহী নাবিকরা ঘোষণা করেন যে তাদের আন্দোলন হবে অহিংস এবং তারা কেবলমাত্র জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণ করবেন। 

পাঁচদিন ব্যাপী নৌবিদ্রোহ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। বিদ্রোহীরা তৎকালীন জাতীয় নেতৃত্বের উপর সম্পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করলেও কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতারা তাদের সেই আস্থার মর্যাদা দেননি। নৌ বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশদেরকে সচকিত করেছিল তাই নয়, তৎকালীন জাতীয় নেতৃত্বকেও বিব্রত করেছিল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্ব নৌ বিদ্রোহীদের 'অপরিণত' এবং 'অহেতুক উত্তেজনার শিকার ' বলে আখ্যা দেন এবং তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। জাতীয় নেতৃত্বের এই অসহযোগিতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে ব্রিটিশ শাসক। নৌ বিদ্রোহকে নির্মমভাবে দমন করবার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সময় ব্রিটিশ শাসকদের চমকিত করে বিদ্রোহী নাবিকদের ওপরগুলি বর্ষণ করতে অস্বীকার করে মারাঠা সৈন্যরা যা ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনার প্রসারের দিকেই ইঙ্গিত করে।। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ সৈন্যরা নৌ বিদ্রোহীদের ওপর গুলি চালালে রেটিং কৃষ্ণান প্রথম শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। বিদ্রোহীদের পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়। করাচি বন্দরের এইচএমআইএস হিন্দুস্তানের নাবিকদের গুলি করতে অস্বীকার করে গোর্খা এবং বালুচ রেজিমেন্ট। তখন ব্রিটিশ সৈন্যরা গুলি চালিয়ে ছ জন নাবিককে হত্যা করে। 

নৌ বিদ্রোহীদের পাশে দাঁড়াতে জাতীয় নেতৃত্ব অস্বীকার করলেও বিদ্রোহীদের সমর্থনে আমজনতা বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নেমে আসে। সৈন্যবাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলে নাবিকদের অনাহারে মারবার চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয় বোম্বের সাধারণ মানুষ। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় জড়ো হয়ে তারা বিদ্রোহীদের খাবার পৌঁছে দেয়। নৌ বিদ্রোহের দিনগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্রোহী নাবিকদের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় বোম্বে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা গঙ্গাধর অধিকারী এক বিবৃতিতে নাবিকদের দাবির বিষয়ে সহানুভূতি ও আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং জাতীয় কংগ্রেসকেও এই বিদ্রোহী নাবিকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানান। জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ কমিউনিস্টদের সাথে এই বিদ্রোহের অংশীদার ছিলেন এবং তারা একত্রে ব্রিটিশ বিরোধী গণ আন্দোলনকে তীব্রতর করে তোলেন । তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬- তৎকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যাটলিকে চিঠি লিখে জানান যে, এই প্রবল গণবিক্ষোভের মূল কারিগর বামপন্থী কংগ্রেসী এবং কমিউনিস্টরা। করাচিতে প্রবল বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ধের গভর্নর মুডি ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ করেন যে ,করাচিতে গোলমালের জন্য দায়ী মূলত কমিউনিস্টরা।

অবশ্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতা এবং ব্রিটিশ শাসকদের নির্মম আক্রমণের মুখে অসহায় হয়ে পড়ে বিদ্রোহী নাবিকরা। জিন্না এবং সর্দার প্যাটেল এরমধ্যেই আত্মসমর্পণ করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে মেনে নিয়ে এবং ব্রিটিশ শাসকের প্রবল সামরিক হানার মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬ সমস্ত জাহাজের নাবিকরাই আত্মসমর্পণ করে। 

এতে কোন সন্দেহ নেই যে দেশের জনগণকে যখন সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভাজন করার চক্রান্ত চলছিল তখন নৌ বিদ্রোহ ভারতীয় জনগণের সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মৌলিক দ্বন্দ্বকে আবার সামনে নিয়ে আসে। মারমুখী ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে লড়াই করে ধর্ম নির্বিশেষে বোম্বের সংগ্রামী জনগণ। নাবিকদের মধ্যেও যেমন কোন রকম ধর্মীয় বিভাজন ছাড়া গড়ে উঠেছিল সংগ্রামী ঐক্য, তেমনি জনগণ ভেদাভেদের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে অসাম্প্রদায়িক গণ আন্দোলনের নজির সৃষ্টি করেন। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি বোম্বের রাস্তায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ২২৮ জন, আহতের সংখ্যা ছিল ১০৪৬ যাদের অনেকেই পরবর্তীতে মারা যান । বিদ্রোহী নাবিকদের সাথে বস্তিতে থাকা শ্রমজীবী জনতার যে বৈপ্লবিক একাত্মতা গড়ে উঠেছিল বোম্বাই এর রাস্তায় তা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। কলকাতায় ট্রাম ও রেল কর্মীরাও নৌ বিদ্রোহীদের সমর্থনে ধর্মঘট করেন।

নৌ বিদ্রোহ সফল হতে পারেনি, অনেকে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। বিদ্রোহী নাবিকদের বরখাস্ত করা হয়েছিল। কারাগারে বন্দী হয়েছিলেন বহু বিদ্রোহী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও নৌ বাহিনীতে ঠাঁই হয়নি এই মহান দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের। এই বিদ্রোহকে অনেকে ' Food Riot' আখ্যা দিয়ে এর গুরুত্বকে লঘু করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ভারতীয় নাবিকদের সাথে পেশাগত বৈষম্য এই বিদ্রোহে কেবল অনুঘটকের কাজ করেছিল। নৌবিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ প্রহরের স্ফুলিঙ্গ এই নৌ বিদ্রোহ যা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, জাতিবিদ্বেষ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গিয়েছিল। দ্বিধাগ্রস্ত জাতীয় নেতৃত্বের বিপরীতে বৈপ্লবিক আবেগ ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন কুড়ি হাজার বিদ্রোহী নাবিক যাদের অধিকাংশই গ্রামাঞ্চল থেকে আসা তরুণ। নৌ বিদ্রোহের সমান্তরালেই চলছিল কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন প্রক্রিয়া। নির্বাচনের পরে গঠিত আইনসভার মাধ্যমে ভারতের সংবিধান তৈরীর কাজ শুরু হবে বলে বার্তা দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসক। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর চাইছিলেন যারা তাদের কাছে নৌ বিদ্রোহীরা হয়ে উঠেছিলেন চরম অস্বস্তির কারণ। কবি সমর সেনের কবিতায় ফুটে উঠেছে সেই জটিল সময়ের প্রতিচ্ছবি - 

বম্বেতে দিন রেখে গেল বারুদের গন্ধ,
রাস্তায় রক্তের ছিটে। 
বন্ধুকের খর শব্দ থামলে শহরে
বিপ্লবী নেতারা জমে বক্তৃতার মাঠে, 
সর্দারের ধমকে পার্কের রেলিং কাঁপে,
হয়তো কৃত পাপের লজ্জা জাগে
মর্গে জমা ২৭০ টা লাশে।
ধোঁকায় জব্দ জাহাজেরা বন্দরে স্তব্ধ,
মাঝে মাঝে উদ্যত সঙিন, সাম্রাজ্যের উদ্ধত প্রতীক।
আমাদের স্বাধীনতা আসন্ন প্রায়
মন্ত্রিসভার বিলিতি দূতেরা আগত প্রায়,
জয় হিন্দ। 
         (জয় হিন্দ,১৯৪৬)

এখন মুম্বইয়ে গেলে কোলাবায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ ছাড়া নৌ বিদ্রোহের কোন স্মৃতি অবশিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করেনি ভারতীয় রাষ্ট্র। নৌ বিদ্রোহে ভারতীয় অফিসারের অংশগ্রহণ করেননি। যারা করেছিলেন তারা সবাই ছিলেন অধস্তন কর্মচারী। নাবিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে নেমেছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন কারখানার শ্রমিক সহ সমাজের অপরাপর শ্রমজীবি মানুষ। এই বিদ্রোহের শ্রেণি চরিত্র তাই এখনো বিব্রত করে শাসক শ্রেণিকে। বিদ্রোহীরা একটি বারও যেমন সাভারকার বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নাম উচ্চারণ করেননি, তেমনি হিন্দু মহাসভা বা আরএসএস এই বিদ্রোহীদের কোন সমর্থন জোগায়নি। জাহাজের ডেকে, ব্যারিকেডের পেছনে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান একসাথে লড়াই করেছিল। নিয়মতান্ত্রিক পথে হিন্দু-মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কংগ্রেস- লীগ সমঝোতার অসার প্রয়াসের বদলে সংগ্রামের ময়দানে হিন্দু-মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করা যে সম্ভব তা দেখিয়েছিল নৌবিদ্রোহ। অরুণা আসফ আলী বলেছিলেন, " I would rather unite the Hindus and Muslims at the barricades than on the constitutional front"। আজ ভারতবর্ষ যারা শাসন করছে সেই সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছেও তাই নৌ বিদ্রোহের স্মৃতি এক মূর্তিমান বিপদ। ১৯৬৫ সালে উৎপল দত্ত তার 'কল্লোল' নাটকে নৌ বিদ্রোহের অমর স্মৃতিকে আবার জাগরিত করেন। সংগ্রামী চেতনায় যুদ্ধ জাহাজ খাইবার হয়ে ওঠে ভারতের ব্যাটেলশিপ পটেমকিন। ১৯৪৬ সালের সেই সব রক্ত ঝরা দিনগুলির স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার, এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব শ্রমিক শ্রেণির পার্টি ও বাম- ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির।


প্রকাশের তারিখ: ১৯-ফেব্রুয়ারি-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪