Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

লেনিনের 'সাম্রাজ্যবাদ'

প্রদোষ কুমার বাগচী
বার কয়েক কাটছাঁটের পর রচিত হয়েছিল বইটি । ১৯১৬ সালে জুরিখে বসে লেখা। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের এপ্রিলে। পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান ও তার ভয়াবহ রূপটিকে সামনে আনতে চেয়েছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই রচনাটি বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছে।
On Lenin's 'Imperialism'

‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ শীর্ষক গ্রন্থটি লেনিনের জীবনের অসামান্য অবদান। বার কয়েক কাটছাঁটের পর রচিত হয়েছিল বইটি । ১৯১৬ সালে জুরিখে বসে লেখা। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের এপ্রিলে। পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান ও তার ভয়াবহ রূপটিকে সামনে আনতে চেয়েছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই রচনাটি বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছে। পরে তার সারবত্তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পুঁজিবাদ এখন সাম্রাজ্যবাদকে এড়িয়ে তার বিকশিত হওয়ার সামর্থ্য ধরে। ফলে সাম্রাজ্যবাদকে আর পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় বলা যায় না। বইটি তাই আর প্রাসঙ্গিক নয়।

অন্যদিকে বিশ্ব অভিজ্ঞতা তার উলটো— সাম্রাজ্যবাদকে যতই প্রসাধন মাখিয়ে ভদ্রস্থ করার চেষ্টা করা হোক না কেন, সাম্রাজ্যবাদ সাম্রাজ্যবাদই। সুযোগ পেলেই সে কতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে তার নজির রয়েছে ভুরি ভুরি। বরং সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এড়িয়ে অথবা তা অতিক্রম করে, লেনিন সেদিন যা ভেবেছিলেন, অর্থাৎ পুঁজিবাদের কোনও গতি নেই, তা যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

এই বিতর্কের পাশাপাশি লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক রচনার শিরোনাম নিয়েও চর্চা কম হয়নি। লেনিন নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে প্রথমেই তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক যে রচনার কথা মনে আসে, তার শিরোনাম ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দি হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম : আ পপুলার আউটলাইন’। কিন্তু প্রথম সংস্করণটি ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দ্য লেটেস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে লেনিন রচনাবলীর চতুর্থ রুশ সংস্করণে এই পুস্তিকাটিকে ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দি হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ বলা হয়। সুতরাং শিরোনাম নিয়ে চর্চার সলতেটা লেনিনই পাকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণা নিয়ে মানুষের কৌতুহল, আলোচনা ও বিতর্কের শেষ নেই।

আমরা এখানে বিতর্কে প্রবেশ করব না, বরং লেনিন কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণায় অগ্রসর হয়েছিলেন, কোন পরিস্থিতি তাঁকে এই ধরনের একটি দলিল লিখতে প্রণোদিত করেছিল, কীভাবে তিনি সাজিয়ে নিচ্ছিলেন তার এক একটি অধ্যায়, এমনকি গ্রন্থ শিরোনাম নিয়ে তিনি নিজে কিছু ভেবেছিলেন কি না, এই সব দিকগুলিকেই ফিরে দেখার চেষ্টা করব।

পুস্তিকাটির প্রকাশক ছিল ‘পারুশ’ পাবলিশার্স। ‘পারুশ’ ছিল বলেই তাঁর রচনার গতি হয়েছিল। কিন্তু ‘পারুশ’-এর কর্মীবৃন্দ যদি জানতেন বইটির লেখক নাম ভাঁড়িয়েছেন এবং তিনি বলশেভিক গ্রুপের সর্বোচ্চ নেতা লেনিন, তাহলে এই রচনাটি আলোর মুখ দেখতো কিনা সন্দেহ। ‘পারুশ’এর কর্মীদের বড় অংশ ছিল কট্টর মেনশেভিক পন্থায় বিশ্বাসী। লেনিন যে সময়ে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছিলেন বলশেভিক-মেনশেভিক দ্বন্দ্ব তখন চরমে। সেই পরিস্থিতিতে লেনিন নিজেই বলেছিলেন যে তিনি সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে অনেক কথাই বলতে পারেননি। অনেক কাটছাঁট করতে হয়েছিল। প্রকাশকেরও চাপ ছিল। খুশিমতো পাণ্ডুলিপি সাজাতে পারেননি। অতি দ্রুততার সঙ্গে এবং অতি সন্তর্পণে তাঁকে কাজটি করতে হয়েছিল। পুস্তিকাটিতে আরও কাটছাঁট করার কথা উঠেছিল। লেনিন রাজি হননি। সময়ের দাবি মেনে তিনি এই পুস্তিকাটি করেছিলেন। আমরা এটিকে বই হিসাবে উল্লেখ করলেও লেনিন নিজে এটিকে বই মনে করেননি। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় (২৬ এপ্রিল ১৯১৭) তিনি এটিকে পুস্তিকা বলেছেন। পরে ১৯২০ সালের ৬ জুলাই ফরাসি ও জার্মান সংস্করণের ভূমিকাতেও তিনি এটিকে পুস্তিকাই বলেছেন। বই নয়। তাঁর কাছে বইয়ের অর্থ আরও ব্যাপক। জীবনে তিনি অনেক লিখলেও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ আছে তাঁর মাত্র দুটি— ‘দ্য ডেভেলপমেণ্ট অব ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া (১৮৯৯), এবং ‘মেটেরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিও-ক্রিটিসিজম’(১৯০৯)।

কথাগুলো বলা হলো একারণেই যে, এই প্রেক্ষাপট সামনে না রেখে হঠাৎ করে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ রচনাটি পাঠ করতে গেলে কখনো কখনো যে ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তা থেকে যে ধারণা তৈরি হয় তা হল—

ক) পুস্তিকাটিকে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসাবে ভেবে নেওয়া

খ) সেই সূত্রে তাকে সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণার চূড়ান্ত ফল হিসাবে দেখা এবং

গ) তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণার একটি বিশিষ্ট অংশকে সমগ্র হিসাবে বিচার করা।

এর পরেও খেয়াল রাখতে হয় যে বইটির বেশ কিছু অংশ জটিল তথ্যে ভর্তি। বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে উদ্ধৃতির পর উদ্ধৃতি। মাঝে মধ্যে লেনিনের কিছু মন্তব্য। সবসময় তিনি চেষ্টা করে গিয়েছেন নিজে যা বলতে চান তা অন্যের মুখ দিয়ে অন্যের ভাষায় বলিয়ে নেওয়ার। যে ভাষাকে তিনি নিজেই ঈশপের কথামালার অভিশপ্ত ভাষা হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ফলে বইটি পাঠ করতে গেলে কখনো বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটে, কখনো তাৎক্ষণিক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আবার এই রচনাই বিখ্যাত হয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলির অনন্য প্রকাশে। কিন্তু সেটাই সব নয়। এর মধ্য দিয়ে মার্কসবাদের বিকাশেও তিনি একটি ঐতিহাসিক কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। তবে তাঁর ভাবনাসমূহ শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বে এসে কীভাবে মিলিত হচ্ছে উপলব্ধি করতে হলে শুধুমাত্র ‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ পুস্তিকাটির উপর নির্ভর করলে হবে না, দেখতে হবে তাঁর নোট বইগুলি যা ‘সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত নোটবই’ হিসাবে সমধিক পরিচিত। নোট বইগুলির কথা উহ্য রেখে তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণার ব্যাপকতা, বিস্তৃতি ও অভিপ্রায় বোঝা সম্ভব নয়।

সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত নোটবই

লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত নোটবইগুলি এক কথায় বিস্ময়কর! বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে তাঁর এই প্রস্তুতি বহুদিনের এবং ‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা রচনা করলেও একটা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনারই প্রস্তুতি তিনি করছিলেন। অবশ্য সেকথা তিনি কাউকে বলে গেছেন বা কোথাও লিখে গেছেন কি না একথা জানা যায়নি। তাঁর নোটবইয়ের কথাও দীর্ঘদিন অপ্রকাশ্য ছিল। কেবল সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত নয়, দার্শনিক নোটবইও তিনি লিখেছিলেন। হঠাৎ একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে আশু লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন এবং সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত অতি দ্রুত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। ফলে এই পুস্তিকাটি পূর্বপরিকল্পিত কোন প্রয়াসের ফসল নয় — একটি আকস্মিকতা এবং একই সঙ্গে এক বিশেষ মতাদর্শগত বাধ্যবাধকতার ফল।

লেনিন সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক পুস্তিকা রচনায় মন দেন ১৯১৫—১৬ সালে। এই সময়কালের কথা নানা ভাবে এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে অনেক সময়েই মনে হয় লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক চর্চা বুঝি এই সময়কালেই সূচিত,কেন্দ্রীভূত এবং একই সাথে ঘনীভূত। এই ধারণাই সত্য মনে হত যদি তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক নোটবইগুলির সন্ধান না পাওয়া যেত। এই নোটবইগুলিই আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ১৯১২ সাল থেকে তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণার সূত্রপাত। আর জানা গেছে তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ রচনাটি প্রকাশের পরেও সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক গবেষণা তিনি চালিয়ে গেছেন এবং একাধিক নোটবই রচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে—‘ নোটস অন ইগেলহাফ’, ‘ডেটা অন পার্সিয়া’, ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ ইত্যাদি। বোঝাই যায়, একটা বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগোচ্ছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সে পরিকল্পনা তাঁর বাস্তবায়িত হয়নি, তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এমনকি সদ্যোজাত সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার কাজে পরে তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদের দলিলটিকে তিনি আর পরিমার্জন করার সময় পাননি। অথচ পুস্তিকাটি প্রকাশিত হওয়ার পর নিজেই তা পাঠ করে অত্যন্ত ব্যথিত হন। তিনি বলেন— ‘সেন্সর ব্যবস্থার চাপে দোমড়ানো, মোচড়ানো, লোহার পেটিতে ঠেসে- পিষে ঢোকানো পুস্তিকাখানার অনুচ্ছেদগুলিকে আজকের এই স্বাধীনতার আমলে আবার পড়তে গেলে বেদনা বোধ হয়। কিন্তু বেদনা বোধ হলেও লেনিন যে তা পরিবর্তনে অপারগ ছিলেন সে কথা তিনি ফরাসি এবং জার্মান সংস্করণের ভূমিকাতেই লিখে যান এইভাবে— এই পুস্তিকাখানা লেখা হয়েছিল ১৯১৬ সালে জারের সেন্সর ব্যবস্থার দিকে নজর রেখে সে কথা রুশ সংস্করণের ভূমিকাতেই লেখা হয়েছে। বর্তমানে গোটা লেখাটাকেই আবার ঘষে মেজে দিতে আমি অপারগ---’

যদিও ভূমিকাতেই তিনি সে সময় কয়েকটি জরুরি কথা যুক্ত করে যান। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের দলিলটি ছাড়া তাঁর মৃত্যুর পর তিনি আমাদের জন্য যা রেখে গেছেন তা হলো সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত অমূল্য কয়েকটি নোট বই। এখন এগুলোই আমাদের সম্পদ। যা না পেলে তাঁর অধ্যয়নের একটি বিশিষ্ট দিক সম্পর্কে অনেক কিছু অজ্ঞাত থেকে যেত।

তখন আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে ঘোর তাত্ত্বিক সংকট

সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক চর্চায় লেনিন এমন এক বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়োজিত হয়েছিলেন যে সময় পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র ও তার সংজ্ঞা নিয়ে মতবিরোধ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এক বিরাট সংকটের মুখে ফেলে দেয়। বলা হয় সাম্রাজ্যবাদ ব্যাপারটা তেমন খারাপ কিছু নয়। খারাপ যা কিছু তা রয়েছে তার সংজ্ঞায়। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সর্বাত্মক আক্রমণ পরিচালনা করাটা হবে মূঢ়তার পরিচায়ক। শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন পরিচালনা করতে গেলে সাবেক সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বের পরিমার্জন প্রযোজন— তা হলেই সূচিত হবে শ্রমিক আন্দোলনের যথার্থ অভিমুখ। স্বাভাবিকভাবেই এতদিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা শ্রমিক ঐক্য ভাঙনের মুখে পড়ে। শুরু হয় মতাদর্শগত ভ্রান্তি— যা থেকে উদ্ভূত হয় বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জগতে-মননে ও ক্রিয়াকর্মে এক বিরাট তাত্ত্বিক শূন্যতা।

সেই সময় সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত প্রচলিত সংজ্ঞার পরিবর্তন দাবি করছিলেন যাঁরা তাঁদের অন্যতম হলেন কার্ল কাউটস্কি। তাঁর কথা হলো— সাম্রাজ্যবাদের পারস্পরিক লড়াইকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালনা করা ভুল হবে। কারণ বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ যে পথে চলছে তা এমন এক বিশেষ পর্যায় যার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ অচিরেই একটি পারস্পরিক মৈত্রীর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হবে এবং পুঁজিবাদের আমলেই যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে— সেটা হবে আন্তর্জাতিকভাবে একতাবদ্ধ মহাজনী মূলধনের দ্বারা জগতের যৌথ শোষণের পর্যায়। সংক্ষেপে এই হলো কাউটস্কি কর্তৃক প্রদত্ত সাম্রাজ্যবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। এই তত্ত্বই অতি-সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব হিসাবে পরিচিত। আর এই তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে কাউটস্কি উদ্ভাবিত কৌশলগত লাইনটি হলো এই—সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে প্রত্যেক কমিউনিস্টের জরুরি কর্তব্য হলো ‘জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের’ সমর্থনে নিজ নিজ দেশের সরকারকে উৎসাহিত করা এবং এমন কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ না করা যাতে সরকার বিব্রত বোধ করে। কারণ এ হলো পিতৃভূমি রক্ষার লড়াই।

বিভ্রান্তির শুরু এখানেই। কারণ এই মত মেনে নেওয়ার অর্থ হলো পিতৃভূমি রক্ষার নামে কার্যত সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে যুক্তিসঙ্গত ও আইনসিদ্ধ করা, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতিকে দুর্বল করে তাতে ভাঙন ধরানো এবং অতি সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্বের মোড়কে পুঁজিবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলিকে আড়াল করা।

অথচ ১৯০৭ সালের স্টুটগার্ট সম্মেলনে এই কাউটস্কিই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে জোরালো সওয়াল করেন। ১৯০৯ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত ‘রোড টু পাওয়ার’ গ্রন্থ। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে তা বিরাট প্রভাব ফেলে। এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য হল - যুদ্ধ অনিবার্য এবং তা বিপ্লবের পথ ধরেই চলবে। আসছে নতুন যুগ, সে যুগ হবে বিপ্লবের। ঐ একই বছরে লেনিনেরও বিখ্যাত ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদে’র প্রকাশ ঘটে। মার্কসবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক ভাবধারা খণ্ডনে তা মস্ত বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ততদিনে ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পতাকাতলে সমবেত হতে শুরু করেছে ইউরোপের মেহনতী জনগণ।

১৯০৭ সালের স্টুটগার্ট সম্মেলনে যুদ্ধবিরোধী যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল ১৯১২ সালে বাসলে সম্মেলনে তাকে আরও জোরদার করা হয়। গৃহীত হয় যুদ্ধ সম্বন্ধীয় ইশ্‌তেহার। এতে আসন্ন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। আহ্বান জানানো হয় শ্রমিক শ্রেণি যেন আন্তর্জাতিক সংহতি দিয়ে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের পরাক্রমের বিরোধিতা করে। এছাড়াও এই ইশ্‌তেহারে স্টুটগার্ট সম্মেলনের সিদ্ধান্ত থেকে একটি অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়। অনুচ্ছেদটি অবশ্য লেনিনেরই রচনা। তাতে বলা হয়, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যদি বাধে তবে যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সক্রিয় হতে হবে। এই ঘোষণাপত্রে কাউটস্কিও স্বাক্ষর করেন।

অথচ তার কিছুদিন পর থেকেই দেখা যেতে থাকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কতিপয় নেতার মুখে ভিন্ন সুর। তাদের বক্তব্য হলো সাম্রাজ্যবাদ ভালো কিন্তু তার সংজ্ঞাটাই খারাপ। আর তার নেতৃত্বে আছেন কাউটস্কি। তখনও বোঝা যায়নি তৎকালীন সময়ের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ মার্কসীয় তত্ত্ব বিশারদ তলে তলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নিয়েছেন। যুদ্ধ শুরু হলে দেখা যায় বাসলে সম্মেলনের মূল প্রস্তাব এড়িয়ে তিনি তুলে ধরেছেন অতি-সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব।

অতএব এই পরিস্থিতিতে লেনিনের কাছে একটি জরুরি কাজ ছিল কাউটস্কির তত্ত্বের বিরুদ্ধে একটি প্রবল মতাদর্শগত বিতর্কের সূচনা করা এবং সর্বহারা বিপ্লবের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিকল্প তত্ত্ব খাড়া করা। এই পরিস্থিতিই তাঁকে সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক একটি দলিল লিখতে প্ররোচিত করেছিল।

ডায়লেকটিক্‌স বুঝতে গেলে পড়তে হবে হেগেল

লেনিন কেবল কয়েকটি পুঁজিবাদ বিষয়ক বই বা পত্রপত্রিকার উপরই নির্ভর করেন নি, গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত করে তিনি চলে এসেছিলেন দর্শনের বৃত্তে। দর্শনের কষ্টিপাথরে সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলিকে যাচাই করতে গিয়ে, অনিবার্যভাবে তিনি চলে এসেছিলেন হেগেলের ভাবনার অভ্যন্তরে। যুদ্ধের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিনের মতো অমন উচ্চপর্যায়ের এক গবেষকও যেন চট করে ধরতে পারছিলেন না তার বিবিধ অনুষঙ্গ। তবে অনুভব করেছিলেন, মার্কসীয় ডায়লেকটিকস না বুঝে যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়—আর ডায়লেকটিকস বুঝতে গেলে পড়তে হবে হেগেল।

অবশ্য যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র বুঝতে গিয়ে তিনি যখন হেগেলের ‘দ্য সায়েন্স অব লজিক’ রচনাটি পাঠ করেন, অনুভব করেন তার প্রগাঢ় ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার কথা। কারণ হেগেলের পরিভাষা অত্যন্ত দুর্বোধ্য। আবার তার সারবস্তুটিও দার্শনিক জঞ্জালে পরিপূর্ণ। তা সাফ করে অগ্রসর হতে হতে তিনি পৌঁছে যান নতুন উপলব্ধিতে। তাই তাঁর দার্শনিক নোটবইয়ের এক জায়গায় তিনি লিখলেন—‘হেগেলের লজিক খুঁটিয়ে না পড়ে ও না বুঝে মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’ বিশেষত তার প্রথম অধ্যায় পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। ফলে অর্ধশতক পরেও কোনও মার্কসবাদী মার্কসকে বুঝতে পারেননি।’

বিস্ময়কর মন্তব্য! বিস্ফোরকও! কার প্রতি এই মন্তব্য করেছিলেন লেনিন? নিঃসন্দেহে কাউটস্কি। অবশ্য কাউটস্কি জানতেন না সেকথা। এই ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা কাউকে জানতেই দেন নি লেনিন। আড়াল করে রেখেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সঙ্গে দর্শন বিষয়ক নোটবইগুলির কথাও যেখানে তিনি লিখে রাখছিলেন তাঁর উপলব্ধির সারাৎসার ও মন্তব্য। তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় ধরে যে গবেষণা চালিয়েছিলেন সোভিয়েত সমাজবিজ্ঞানীরা, তাঁদের চেষ্টায় উদ্ধার হয়েছিল সেই সব নোটবই। এসব আজ অমূল্য গবেষণার উপাদান হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। প্রাপ্ত নোটবইগুলির মাধ্যমে এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে তার তাৎপর্য কম নয়। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে লেনিনের মতো তাত্ত্বিক যখন বলছেন হেগেল পাঠ না করে মার্কসের ক্যাপিটাল বোঝা সম্ভব নয়, তখন তাঁর সেই উপলব্ধি আজকের মার্কসীয় গবেষকের কাছেও ‘ক্যাপিটাল’ পাঠের দিগদর্শন নিঃসন্দেহে।

সাম্রাজ্যবাদের নোটবই

১৯১২ থেকে ১৯১৬। এই সময়কালে তিনি সাম্রাজ্যবাদের নোটবই তৈরি করেন। তাঁর তৈরি করা সেই নোট বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭ শতাধিক। সোভিয়েত গবেষকরা ১৯৩৯ সালে তাঁর সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত কুড়িটি নোটবই একত্রে পৃথকভাবে ছাপেন। মূল ২০টি নোটবইয়ের মধ্যে ১৫টি নোটবইয়ের নামকরণ ছিল—আলফা, বিটা, গামা থেকে শুরু করে ওমিক্রন পর্যন্ত। বাকি নোটবইয়ের কোনও নাম ছিল না। তবে ‘গামা’ নোট বইটি আকর্ষণীয়। এই নোটবইতে তিনি ছকে নিয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক পুস্তক রচনার পরিকল্পনা। নির্ধারণ করেছিলেন পুস্তিকার শিরোনাম। কতগুলো অধ্যায় হবে তার খসড়া।

শিরোনাম নির্ধারণ

প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন গ্রন্থাদি থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে করতেই পুস্তিকার শিরোনাম নিয়ে তিনি ভাবনা-চিন্তা শুরু করেন। তবে তথ্য সংগ্রহের কাজে তিনি ভালোভাবে অগ্রসর হলেও শিরোনাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেকগুলি চিন্তা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন। কোন্‌ শিরোনাম তিনি ব্যবহার করবেন— ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দি হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ না ‘প্রিন্সিপাল ফিচার্স অব মডার্ন (রিসেন্ট, দ্য রিসেন্ট স্টেজ অফ) ক্যাপিটালিজম’ ? গামা নোটবইয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রথম শিরোনামটি তাঁর প্রথম পছন্দের হলেও জারের সেন্সর ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে তিনি দ্বিতীয় শিরোনাম হিসাবে বেছে নিয়েছেন প্রিন্সিপাল ফিচার্স অব মডার্ন (রিসেন্ট, দি রিসেন্ট স্টেজ অফ) ক্যাপিটলিজম' শিরোনামটিকে। অবশ্য তাঁর পুস্তিকাটি প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল 'ইম্পিরিয়ালিজম, দি লেটেস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ নামে। পরে লেনিন রচনাবলীর চতুর্থ রুশ সংস্করণে এই পুস্তিকাটিকে ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দি হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম (এ পপুলার আউটলাইন)’ হিসাবেই লেখা হয়।

তাই বলে যে লেনিন আর কোনও বিকল্প শিরোনামের কথা ভাবেননি তা নয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি লেনিনের দ্বিতীয় পছন্দের শিরোনামটিতে প্রথম বন্ধনীর মধ্যে ‘রিসেন্ট’ এবং ‘দি রিসেন্ট স্টেজ অফ’ কথা দু'টি লেখা ছিল। সেদিক দিয়ে বলা যায় তিনি ‘মডার্ন’-এর পরিবর্তে ‘রিসেন্ট’ অথবা ‘রিসেন্ট’ স্টেজ অফ’ বসিয়ে আরও দুটি শিরোনাম যাতে ব্যবহার করা যায় তার আগাম পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। সেই হিসাবে পুস্তিকাটির শিরোনাম হতে পারত

১। প্রিন্সিপাল ফিচার্স অব মডার্ন ক্যাপিটলিজম

২। প্রিন্সিপাল ফিচার্স অব রিসেন্ট ক্যাপিটালিজম

৩। প্রিন্সিপাল ফিচার্স অব দি রিসেন্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম

লেনিনের একটা ইচ্ছা ছিল শিরোনাম যাই হোক তার সাথে ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ কথাটা যেন যুক্ত থাকে। কিন্তু তিনি জানতেন, সেন্সর ব্যবস্থার চাপে ইম্পিরিয়ালিজম শব্দযুক্ত যে কোনও শিরোনাম বাতিল হওয়া অসম্ভব নয়। তাই তাঁকে খুবই সতর্কতার সাথে শিরোনাম স্থির করতে হয়েছিল যা পুস্তিকার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে এবং একটু নিরীহ গোছের হবে। অবশ্য বইটি প্রকাশের সময় ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ শব্দটির উল্লেখ ছিল। তার অর্থ এই নয় যে, পুস্তিকাটি প্রকাশের ব্যাপারে সমস্ত পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল।

পুস্তিকাটি ছাপানোর দায়িত্ব ছিল পোকরোভস্কির উপর। তিনি লেনিন ও ‘পারুশ’ পাবলিশার্সের মাঝে মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। পোকরোভস্কিকে অনেক সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হতো। প্রশ্ন উঠেছিল গ্রন্থকারের নাম নিয়ে। ১৯১৬ সালের ২রা জুলাই লেনিন পোকরোভস্কিকে লেখেন ‘আজকের রেজিস্টার্ড পোস্টেই আমি আপনার কাছে আমার পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিচ্ছি। কথা ছিল পাঁচ সিগনেচার বিশিষ্ট (যার পৃষ্ঠা সংখ্যা হবে ২০০) পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে হবে। ... এখন কাটছাঁট করে তিন সিগনেচারে কমিয়ে আনা অসম্ভব। যদি এখন তারা এটা প্রকাশ করতে না চায় তা চূড়ান্ত হতাশাজনক ব্যাপার হবে। ...আপনি জানতে চেয়েছেন আমার নাম কী হবে—এই প্রশ্নে আমি আমার সাধারণ ছদ্মনামটাই বেশি পছন্দ করব। আর এতে অসুবিধা হলে আমি আমার অন্য একটি নাম প্রস্তাব করছি— এন লেনিভ্‌ৎসিন। এছাড়া আমার অন্য যেকোনও নাম আপনি পছন্দ করে নিতে পারেন।... পুস্তিকার প্রস্তাবিত শিরোনামে ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ শব্দটিকে বাদ দেওয়ার কথা উঠেছে...তবে শিরোনাম করুন ‘দ্য বেসিক পিক্যুলিয়ারিটিজ অব কনটেমপোরারি ক্যাপিটালিজম’। তবে ‘এ পপুলার আউটলাইন’ কথাটা থাকতেই হবে। কারণ সেই রীতিতে লেখাটি সাজানো হয়েছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৯১৬ সালের ২রা জুলাই পর্যন্ত তিনি জানতেন যে তাঁর পুস্তিকার শিরোনাম হচ্ছে ‘দি বেসিক পিক্যুলিয়ারিটিজ অব কনটেমপোরারি ক্যাপিটালিজম : এ পপুলার আউট লাইন’। ইতিমধ্যে রেজিস্টার্ড পোস্টে পাঠানো লেনিনের লেখা পাণ্ডুলিপি ও চিঠি ভুল ঠিকানায় চলে গিয়েছিল। এই ঘটনায় লেনিনের উদ্বেগ যতটা বেশি ছিল চিঠিটি নিয়ে, পাণ্ডুলিপি নিয়ে ততটা নয়। পাণ্ডুলিপিটি এতই নিরীহ গোছের যে সাধারণভাবে কেউ প্রশ্ন তুলবে না—তা ছাড়া পাণ্ডুলিপিটি পরে যথাস্থানে পোকরোভস্কির হাতেই গিয়ে পৌঁছাবে, এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। কিন্তু তাঁর ছদ্মনাম জানাজানি হলেই বিপদ। ১৯১৬ সালের আগস্টে তিনি পোকরোভস্কিকে সেই প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন—

আমি ভয় পাচ্ছি এই ভেবে যে আমার পত্রটি ওরা কপি করে ফেলল কি না। আমি আমার সাধারণ ছদ্মনাম ভি ইলিনের পরিবর্তে এন লেনিভ্‌ৎসিন রাখার কথা বলেছিলাম। এখন ভি আই ইভানোভস্তি নামের কথা বলতে পারি। আমি বলেছিলাম যদি ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ শব্দটা এতই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তবে শিরোনাম পরিবর্তন করে রাখা হোক—‘দি বেসিক পিক্যুলিয়ারিটিজ অব কনটেমপোরারি ক্যাপিটালিজম’। এখন দেখছি আবার সব নতুন করে ভাবতে হবে, সব কিছু পালটে ফেলতে হবে। এখন ‘লেটেস্ট ইকনমিক ডেটা অন মডার্ন ক্যাপিটালিজম’ অথবা ওই জাতীয় অন্য কোনও শিরোনামের কথা ভাবতে হবে। এমনকি রাশিয়াতে পাঠাবার পূর্বে যাতে অধ্যায় শিরোনামগুলিও পালটে ফেলা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য তা আর করতে হয়নি। শেষপর্যন্ত পুস্তিকাটি ‘ইম্পিরিয়ালিজম, দ্য লেটেস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’ নামেই প্রকাশিত হয়েছিল।

অধ্যায় বিন্যাস

লেনিনের গামা নোটবই দেখলেই বোঝা আলোচ্য বিষয়কে তিনি কখনো ছয় ভাগে ভাগ করছেন, আবার কখনো আট ভাগে সাজাচ্ছেন। পরক্ষণেই ভাবছেন দশটি অধ্যায়ের কথা। তবে মূল আলোচনাকে প্রথমে তিনি পঁচিশটি ছোট ছোট পয়েন্টে ভাগ করে নিয়েছিলেন। প্রতি ভাগে কোন কোন নোটবই থেকে আলোচনা করবেন তা আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলেন। যেমন—

ক। ১। ভূমিকা

খ। ২-১৫। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (উৎপাদনের প্রধান প্রধান সম্পর্ক)

গ। ১৮। (পরগাছাবৃত্তি)

ঘ। ১৬-১৭। অর্থনৈতিক নীতি (কাসটমস্ পলিসি)

ঙ।১৯-২২। সাম্রাজ্যবাদের (প্রতি.... সমালোচনা) প্রশস্তি

চ। ২৩-২৪। রাজনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগসমূহ

+১৮। পরগাছাবৃত্তি

২৫। সিগমা, সিগমা

এখানে ১, ২-১৫,১৮ ইত্যাদি হলো পয়েন্ট। ক, খ, গ, ঘ, ঙ এবং চ-এই ক্রম অনুযায়ী অধ্যায়গুলিকে তিনি সাজিয়েছেন। দেখা যায় পরগাছাবৃত্তি অধ্যায়টিকে তিনি প্রথমে একটি বন্ধনীতে রেখে পরে আবার একদম শেষে চ নং অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ভাবছেন। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তিনি পাশে ১৮ নং পয়েন্টের উল্লেখ করেছেন। এবার দেখা যাক ১৮ নং পয়েন্টে তিনি কোন নোটবইয়ের কোন অংশ যুক্ত করে নিতে চান। লেনিন রচনাবলীর ৩৯তম খণ্ডের ২৩৭ পাতায় যে কেউ দেখে নিতে পারেন ১৮নং পয়েন্টের বিষয় হলো পরগাছাবৃত্তি ও ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ। এজন্য তাকে ব্যবহার করতে হবে আলফা নোটের ২ এবং ৩নং পাতা, ‘বিটা’ নোটের ৩০নং পাতা ‘ল্যাম্বড’ নোটের ১৯, ২১ ও ২৫-২১ পাতা, ‘কাপ্পা’ নোটের ১৮, ২১, ২৫ ও ৩৪ নং পাতা ইত্যাদি।

কিন্তু এই বিন্যাসটি তাঁর পছন্দ হয়নি। নতুন পরিকল্পনায় তিনি আটটি অধ্যায়ের কথা ভাবেন,যথা—

১। উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন, একচেটিয়া কারবার, কার্টেলস

২। ব্যাঙ্ক ও মহাজনী পুঁজি ৩। পুঁজির রপ্তানি

৪। বিশ্বের অর্থনৈতিক বিভাজন: আন্তর্জাতিক কার্টেলস ৫। বিশ্বের রাজনৈতিক বিভাজন: কলোনি সংক্রান্ত

৬। সাধারণ সারমর্ম সাম্রাজ্যবাদী ধারণা ও সাম্রাজ্যবাদী নীতি

৭। সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনী

৮। গাঁটছড়া অথবা সমাজতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ?

এই আটটি অধ্যায়ের সঙ্গে ২ নং অধ্যায়কে পুনর্বিন্যাস করে, দুটো অধ্যায় বানিয়ে তার সাথে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করে ভূমিকা ও উপসংহার লেখার কথাও তিনি ভেবেছিলেন। কিন্তু এবারেও পছন্দ হয়নি তাঁর বিন্যাস। এবার নতুন ভাবনায় অধ্যায় প্রতি ক’পাতা করে লিখবেন তাও লিখে রাখেন। তাঁর নতুন পরিকল্পনাটি ছিল এইরকম—

১। উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া কারবার প্রায় ৩০ পৃষ্ঠা

২। ব্যাঙ্ক প্রায় ২০ পৃষ্ঠা

৩। ‘মহাজনী পুঁজি’ (এবং মহাজনী মোড়লবৃত্তি)—প্রায় ৩০ পৃষ্ঠা

৪। পুঁজির রপ্তানি— প্রায় ১০পৃষ্ঠা

৫। বিশ্বের অর্থনৈতিক বিভাজন প্রায় ১০ পৃষ্ঠা

৬। ঐ রাজনৈতিক বিভাজন — প্রায় ২০ পৃষ্ঠা

৭। সাধারণ সারমর্ম=সাম্রাজ্যবাদ (কে, কাউটস্কি)— প্রায় ১০ পৃষ্ঠা

৮। পরগাছাবৃত্তি—প্রায় ২০ পৃষ্ঠা

৯। সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনী— প্রায় ২০ পৃষ্ঠা

১০। সমাজতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ তাৎপর্য (?) ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদের স্থান- প্রায় ১০ পৃষ্ঠা (সিগমা) ১৮০পৃঃ

না, এই বিন্যাসও বাতিল করে দেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত তিনি যেখানে এসে থামেন, তা হলো—

১। উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন ও একচেটিয়া কারবার

২। ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্কের নতুন ভূমিকা

৩। মহাজনী পুঁজি ও মহাজনী মোড়লতন্ত্র

৪। পুঁজির রপ্তানি

৫। পুঁজিতান্ত্রিক সমাহারগুলির মধ্যে বিশ্বের ভাগ বাঁটোয়ারা

৬। বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে বিশ্বের ভাগ বাঁটোয়ারা।

৭। পুঁজিতন্ত্রের একটি বিশেষ স্তর হিসাবে সাম্রাজ্যবাদ

৮। পুঁজিতন্ত্রের পরগাছাবৃত্তি ও ক্ষয়িষ্ণুতা

৯।----------------------------

১০।---------------------------

এবার তার আর অপছন্দ হয়নি। চূড়ান্ত পর্বে তিনি ওই আটটি অধ্যায়ের সঙ্গে আরো দুটো অধ্যায় যুক্ত করেন— ১। সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনী এবং ১০। ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদের স্থান। তাঁর পুস্তিকাটি এই দশটি অধ্যায় নিয়েই প্রকাশিত হয়।

লেনিনের অবদান

প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রাক্কালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্কসূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এই পুস্তিকায় বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি পরিপূর্ণ চিত্র তিনি তুলে ধরেন। তার প্রতিপাদ্য হল পুঁজিবাদ টিকে থাকে সাম্রাজ্যবাদের উপর ভর করে। আবার সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে পুঁজিবাদ দুর্বল হয় কিন্তু উৎপাটিত হয় না। এর জন্য শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লব চাই। তাই সাম্রাজ্যবাদ শুধু পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় নয়, বিপ্লবের পূর্ব প্রহরও বটে। তিনি দেখালেন পুঁজিতন্ত্রের বিকাশ অসম বলেই যেমন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ শুরু হয় তেমনি আবার এই যুদ্ধই সাম্রাজ্যবাদের শক্তি কমিয়ে দেয়। তার ফলে সাম্রাজ্যবাদী ফ্রন্টের সবচাইতে দুর্বল জায়গাতে ভাঙন ধরানো সম্ভব। আবার এই দুর্বলতা কাটাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি নিজেদের মধ্যে মিতালি করতে পারে। কিন্তু তা পুঁজিবাদের কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। সে কারণেই লেনিন বলেন—

‘পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাস্তবতার রাজ্যে আমরা দেখছি যে, আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী মৈত্রীবন্ধন যে-আকারই ধারণ করুক না কেন—একটি সাম্রাজ্যবাদী যুক্ত সংস্থার বিরুদ্ধে আর একটি সাম্রাজ্যবাদী যুক্ত সংস্থার মৈত্রী কিংবা তামাম সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে নিয়ে একটি সামগ্রিক মৈত্রী—তা আসলে দু'টি যুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালের ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়।’ তাঁর কথা হলো—

‘শান্তিপূর্ণ মৈত্রীবন্ধন যেমন যুদ্ধের মধ্য থেকেই উদ্ভূত হয় তেমনি আবার যুদ্ধের জন্য জমি প্রস্তুত করে দেয়; একটির অস্তিত্ব আর একটিকে আসন্ন করে এবং এইভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ও বিশ্ব রাজনীতির অভ্যন্তরে সাম্রাজ্যবাদী সংযোগ ও সম্পর্কের সেই এক ও অভিন্ন ভিত্তি থেকেই শান্তিপূর্ণ ও অশান্তিপূর্ণ সংগ্রামের দুটি পরস্পর অনুসারী রূপের পারম্পর্য সৃষ্টি করে।’

অর্থাৎ বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে যদি ঐক্যও দেখা দেয় তবুও লেনিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাতে ফাটল ধরবে এবং যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। তবে সে যুদ্ধের রূপ পূর্বের দু’টি বিশ্বযুদ্ধের মতো হবে না। তার রূপ হবে ভিন্ন। সুতরাং শ্রমিকশ্রেণীর কর্তব্য হলো পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের আরো গভীর বিশ্লেষণ ও তদনুযায়ী বিপ্লবী কর্তব্য নির্ধারণের আগে পুস্তিকাটির যথার্থ অনুধাবন। পরিশেষে আমরা বলতে পারি লেনিন যেভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবনের প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করেছিলেন সেই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। যে লগ্নি পুঁজির ধারনার উপর ভর করে পুঁজি রপ্তানির প্রসঙ্গটি লেনিনের সময়ে বিবেচিত ছিল আজ তা পালটেছে। এ কারণেই অনেকে একে ধনতন্ত্রের নতুন পর্যায় হিসাবে দেখেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পুঁজির বিপুল কেন্দ্রীভবনের যে দিকটি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে তার যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়ে গেছে লেনিনেরই বর্ণনায় — স্বাভাবিক ভাবেই লেনিনের এই পুস্তিকাটি কেবল প্রাসঙ্গিক নয়, লেনিন প্রস্তাবিত যে কোনও শিরোনামই পুস্তিকাটির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে।


প্রকাশের তারিখ: ১৪-নভেম্বর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Oshadharon
- Debattam Mukherjee, ১৪-নভেম্বর-২০২২


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪