সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বিপদসঙ্কুল যাত্রা - দ্বিতীয় পর্ব
মোসাব আবু তোহা
ওই শুক্রবারই সাময়িক যুদ্ধবিরতি একটা শুরু হ'ল। মারামের দুই কাকা উত্তর গাজায় যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে এক ঘন্টা পরেই ফিরে আসতে হ'ল ওঁদের। ওঁরাই জানালেন, ইজরায়েলি স্নাইপাররা দু'জনকে গুলি ক'রে হত্যা করেছে। বাজারে কাপড়ের দাম, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে, বেড়ে গেছে। ইউ এন আর ডব্লু এ-র ত্রাণ শিবিরে সামান্য ময়দার জন্যে প্রায় পাঁচ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম। খালি হাতেই ফিরতে হ'ল শেষ অব্দি। গ্যাস সিলিন্ডার ভরার জন্যে লোকে লাইন দিয়েছে, দেখলাম। প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা লাইন।

এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনীয় কবি মোসাব আবু তোহা-র বয়স একত্রিশ। উচ্চশিক্ষার জন্যে শুরুতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মাস্টার অব ফাইন আর্টস ইন পোয়েট্রি’ ডিগ্রি লাভ করেন ২০২৩ সালে। নভেম্বরে যখন গাজায় ইজরায়েলি হামলা শুরু হয়, সপরিবারে ছিলেন গাজাতেই। বিপর্যস্ত গাজায় প্রথমে বাড়ি ছেড়ে রিফিউজি ক্যাম্পে। পরে সেই ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে। শেষে গাজা ছেড়ে যাওয়ার সরকারি ছাড়পত্র পেলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে দেশান্তরের চেষ্টা। রাফা সীমান্ত পেরোনোর আগে চেকপয়েন্ট থেকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার। নিয়ে যাওয়া হয় ডিটেনশন সেন্টারে। চলে যারপরনাই নির্যাতন। কবি আবু তোহা-র মুক্তির দাবি উঠতে থাকে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকেই। অবশেষে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ইজরায়েল। এখন আছেন মিশরের কায়রোতে। গত ২৫ ডিসেম্বর সেখানে বসেই লিখেছেন এই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। লেখাটি প্রকাশিত হয় ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায়, ১-৮ জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায়। ‘আনসেফ প্যাসেজ’ শিরোনামে। মূল ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন সৌম্যজিৎ রজক।
বহু বছর ধরেই আমার একটা স্বপ্ন ছিল। উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকব আর আমাদের বাড়িটাকে দেখব উপর থেকে। যদিও কৈশোর পেরোনোর পর থেকে কোনও অসামরিক উড়োজাহাজ আমি গাজার আকাশে দেখিনি। এখানে কেবলই যুদ্ধবিমান আর ড্রোন দেখা যায়। দু-হাজারের গোড়াতেই, দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়, ইজরায়েল গাজা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরটা উড়িয়ে দিয়েছে। এখনও খোলেনি সেই থেকে।
আমার অধিকাংশ বন্ধুই গাজা ছাড়েনি কখনও। ওদের অনেকেই গত কয়েক বছরে– পরিবারের ভরণপোষণের জন্যে হন্যে হয়ে কাজ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে– মাঝেমাঝেই প্রশ্ন করেছে, আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাকে! কেউ কেউ চলে গেছে তুরস্ক, সেখান থেকে ইউরোপ। আমার তিন তিন বার আমেরিকা-যাত্রাকে হিংসেও করে কেউ কেউ। প্রতিবার যখন ফিরি– অপরিচিত সব শহরের ছবি নিয়ে, গাছেদের, বরফের ছবি নিয়ে ফিরে আসি– ওরা আমাকে ‘আমেরিকান’ বলে ডাকে। জিজ্ঞেস করে, কেন খামোখা ফিরে এলাম আবার! কিছুই তো নেই গাজায়, তারা বলে। আমি ওদের প্রতিবারই বলি এক কথা। বাড়ির লোকেদের সঙ্গে, পাড়ার লোকেদের সঙ্গে থাকতেই চাই আমি। এখানে আমার বাড়ি আছে, পড়ানোর চাকরিটা আছে, বইগুলো আছে। এখানে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে পারি আমি, তাদের সঙ্গে বাইরে খেতে যেতে পারি। গাজা ছাড়তে যাব কেন তবে?
চোঙা ফুঁকছিল এক সেপাই, তার চিৎকারেই ঘুম ভাঙল আমাদের। শওয়িশ ভদ্রলোক এ-সময় সবাইকে মেঝেতে নিলডাউন হয়ে বসতে বললেন। তিনিই জানালেন, আমরা এখন নেগেভ মরুভূমির মধ্যে বি’ইর শেভা নামের এক অঞ্চলে রয়েছি। ইজরায়েলে জীবনে এই আমার প্রথমবার আসা।
আমাদের মধ্যে যে ছেলেটা সবচেয়ে ছোট, তার গলাটা শুনেছিলাম লাইনে দাঁড়িয়েই। সহসা ডুকরে উঠল, ‘আমি নির্দোষ, আমি মায়ের কাছে যাব!’ আমার পা দু'টো অসাড় হয়ে এল।
চিৎকার আর মারের আওয়াজ শুধু। ‘আচ্ছা, আচ্ছা, আমি চুপ করছি’, ছেলেটার গলা, ‘কিন্তু আমাকে ফিরতে দাও।’ আরও মারধোর।
আমার পাশের লোকটা শওয়িশ ব্যক্তিটির কাছে জল চাইল একটু। ‘জল নেই’, ওঁর গলায় হতাশা। আমি সমব্যথী তাঁর প্রতি। শতাধিক বন্দি এখানে তাঁর উপর নির্ভর করে আছে। ভদ্রলোক যখন আমাকে টয়লেটে নিয়ে গেলেন, কাল সকালের পর এই প্রথমবার, দরজাটা খুলতে আমাকে সাহায্য করলেন। পেচ্ছাপ করার মতো জায়গা করে নিতে। দুর্গন্ধে সেখানে টেকা দায়।
ব্রেকফাস্টে মিলল ছোট এক টুকরো রুটি, সামান্য দই, আর কিছুটা কাদা-জল, সেটাও সরাসরি মুখে ঢেলে দেওয়া হ'ল। আমি ক্ষুধার্ত নই, এমনকি মায়ের বানানো জন্মদিনের কেকের জন্যেও আর। দুপুরের দিকে যখন টয়লেটে এলাম আবার, শওয়িশ ভদ্রলোকটি জানালেন, ছুচোনোর জল বা টয়লেট পেপারও আর নেই।
পরে একজন সেপাই তাঁকে জানাল, আমাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। চেকআপের জন্যে। ঘরে কিছুটা স্বস্তি এল যেন!
‘আমার ডায়বেটিসের কথাটা বলব ডাক্তারকে।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার ব্লাডারের সমস্যাটার কথাও বলতে হবে আমাকে।’
আমি ডাক্তারকে আমার উপরের চোয়ালে ও নাকে প্রচণ্ড ব্যথার কথা জানাব। আর ডান কানের ব্যপারটাও। কয়েক বছর আগে একটা সার্জারি হয়েছিল। এখন কানে কপালে মার খাওয়ার পর থেকে ডান কানে কম শুনছি আগের চেয়ে।
হাঁটু মুড়ে লাইন দিয়ে বসে আছি। সামনের জনের পিঠের উপর হাত প্রত্যেকের। বাতাস ঝাপটা মারছে, হাঁটুতে পাথরের খোঁচা লাগছে। একটা বাসে তোলা হ'ল আমাদের। এক সেপাই আমার মাথাটা ধ'রে হেঁট করিয়ে দিল, এমনিতেও কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না যদিও। হতে পারে ওরা আমাদের মুখগুলোও দেখতে চায় না।
যখন নামানো হল আমাদের, শুনতে পেলাম, আমারই নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। আমার পরিচিতিপত্রটা আপাতত আমার হাতে দেওয়া হ'ল। আশার আলো দেখতে পেলাম একটা। এবার সম্ভবত ছেড়ে দেবে!
একটি বাড়ির ভেতর নিয়ে যাওয়ার পর, চোখের ফেটিটা টেনে খুলে দেওয়া হ'ল। আমার মাথায় এম-সিক্সটিন তাক্ করে দাঁড়িয়ে ছিল একটা সেপাই। কম্পিউটারে ব'সা আরেকজন সেপাই কিছু প্রশ্ন করল আর আমার ছবি তুলল একটা। বাম বাহুতে আরেকটা ব্রেসলেট পরানো হ'ল, নম্বর খোদাই করা। তখনই একজন ডাক্তারকে দেখতে পেলাম। অসুস্থ কি-না জানতে চাইলেন, জানতে চাইলেন কোনও পুরনো অসুখ আছে কি-না! আমার ব্যথার ব্যপারটা শুনতে উনি একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না।
চোখ বেঁধে ডিটেনশন সেন্টারে ফিরিয়ে আনার পর, দীর্ঘক্ষণ হাঁটু মুড়ে ব'সে থাকলাম যন্ত্রণায়। ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম একটু। পাশেই একজন গোঙাচ্ছিল। একজন বেশ আশাবাদী ছিল, ডাক্তারের কাছে আরেকবার যাওয়ার সুযোগ পাবে ভেবে। পরে, সন্ধের দিকে, একজন সেপাই এসে আমার নাম ধ'রে ডাকল। শওয়িশ লোকটি আমাকে নিয়ে গেলেন সদর দরজার দিকে। একটি জিপ দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে, আমাকে নিয়ে যেতে।
......…
একটা ঘুপচি ঘরে, একটা চেয়ারে বেঁধে দিল আমায়। এক ইজরায়েলি অফিসার, কাপ্তেন টি, এলেন। আরবিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মারহাবা, কীফাক?’ মানে, ‘হ্যালো, কেমন আছেন?’
ওঁকে বললাম, যা যা হয়েছে আমার সঙ্গে তাতে বিমর্ষ আমি।
‘বিমর্ষ হবেন না’, বললেন, ‘আমরা ব্যাপারটা নিয়ে বাতচিত করব।’
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন কাপ্তেন। কফি নিয়ে ফিরলেন খানিক পরে। একজন সেপাই এগিয়ে এসে ডান হাতটা খুলে দিল আমার। নিজের কাপটা যাতে নিতে পারি।
সব খুলে বললাম ওঁকে। এমনকি অক্টোবরের ৭ তারিখ কোথায় ছিলাম আমি, কী কী করেছি সারাদিন, সেসবও বললাম। ‘তবে আমার একটা প্রশ্ন আছে।’
‘বলুন না, আমি শুনছি।’
আমার নামে যা যা অভিযোগ, তার কোনও প্রমাণ না খুঁজে পেলে ওরা আমাকে মুক্তি দেবে তো?
কথা দিলেন, দেবে।
আমার আমেরিকা যাওয়া, আমার কবিতার বই আর আমার ইংরেজির ছাত্রদের ব্যাপারে যা যা বললাম, একটা কাগজে সব তিনি টুকে নিলেন। বললাম, ৭ই অক্টোবর সকালে যখন হামাস বাহিনী ইজরায়েলে রকেট হামলা করল, সেদিন সকালে নতুন একটা জামা পরেছিলাম আমি। আমার স্ত্রী একটা ছবি তুলে দিয়েছিল আমার। রকেটের আওয়াজে, আমাদের ছয় বছরের মেয়েটা যাফ্ফা কান্না জুড়েছিল, আমার ফোন থেকে ইউটিউব ভিডিও দেখাচ্ছিলাম আমি। ভোলাতে চাইছিলাম। বাড়ির অন্য অন্য তলায় আমার বাবা, মা, ভাইয়েরা ছিল। জানালা দিয়ে চেঁচিয়েই কথোপকথন চালিয়েছিলাম আমরা। ব্যাপারটা কী ঘটল? কোনও পরীক্ষামূলক নিক্ষেপ, নাকি?
পরে টেলিগ্রামে হামাস সেনাদের ভিডিও পেতে শুরু করলাম। জিপে, মোটরসাইকেলে ঢুকে পড়েছে তারা ইজরায়েলের ভেতর। বিভিন্ন বাড়ি ঘিরে ফেলছে, ইজরায়েলি সেনাদের দিকে গুলি ছুঁড়ছে। শুরুতে গাজার বেশ কয়েকজন ব্যাপারটায় খুশিই হয়েছিল। উত্তেজিত ছিল তারা। তবে আমরা অনেকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। যদিও গাজা দীর্ঘদিন ধ'রেই বিপর্যস্ত হয়ে চলেছে ইজরায়েলের হাতে, তবু আমি কিছুতেই ইজরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামলাকে ন্যায়সঙ্গত মনে করি না। কিছুতেই। কাউকে ওভাবে মারার কোনও কারণই থাকতে পারে না কখনও। ইজরায়েল যে জবাব দেবে, সেটাও জানতাম। এর আগে হামাস কখনোই এমনটা করেনি, ইজরায়েলের জবাবটাও অভূতপূর্ব রকম ভয়ঙ্কর হবে, আন্দাজ করেছিলাম।
কাপ্তেন টি আমাকে দু'টো প্রশ্ন করেছিলেন। আমি কি হামাসের কোনও সুড়ঙ্গের কথা জানি? অথবা ওদের কোনও অতর্কিত হামলার পরিকল্পনার কথা?
গত চারটে বছরের অধিকাংশটাই আমি মার্কিন মুলুকে কাটিয়েছি, বললাম। লিখে, পড়ে, পড়িয়ে আর ফুটবল খেলেই পুরো সময়টা কেটে গেছে। এসব কিছুই আমি জানি না, আর হামাসের সঙ্গে আমি যুক্তও নই।
অতঃপর কাপ্তেন টি আমার পরিবারের সদস্যদের নাম ও তাদের বয়স জানতে চাইলেন। আমি বেরিয়ে আসার আগে, বললেন, উনি মরক্কোর এক ইহুদি পরিবারের সন্তান। আরও বললেন, আমাদের অনেক কিছুই মেলে। মাথা নাড়লাম, হাসলাম আমি। ভদ্রলোক মুখে যা বলছেন, ওঁর মনের কথাও সেটাই, বিশ্বাস করতে চাইলাম।
কী করা হবে আমার সাথে, সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম। আমি যা যা বলেছি, সেগুলো ওঁরা দেখবেন, ক'টা দিন সময় লাগবে এ-কাজে, কাপ্তেন আমাকে জানালেন।
‘তারপর?’
‘আমরা হয় জেলে পুরব তোমাকে, নয় ছেড়ে দেব।’
......…
শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল আমাকে। একটা বিছানায়। ডিটেনশন সেন্টারে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। একজন নিতে আসছিল আমাকে, সহসা দাঁড়িয়ে পড়ল, আরেকজনের সঙ্গে কিছু কথা বলল সে। ঘরটায় আমাকে একা ফেলে চলে গেল ওরা। একটা হিব্রু গান বাজছিল, সেটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। গায়কটির গলা ভারি পছন্দ হয়েছিল আমার।
যখন উঠলাম, একজন সেপাই কিছু কথা বলল আমাকে, ইংরেজিতেই বলল। ওর কথা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আমি।
‘আমাদের ভুলের জন্যে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি বাড়ি যেতে পারবেন এবার।’
‘তুমি কি সিরিয়াস?’
নিঃশ্চুপ।
‘গাজা ফিরে যাব আমি? আমার পরিবারের কাছে?’
‘সিরিয়াস নয় এমন কথা কেন বলব আমি?’
অন্য একটা গলা ভেসে এল তখুনি, ‘এই সেই লেখকটি না?’
ডিটেনশন সেন্টারে ফিরে, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শুয়ে শুয়ে সেপাইটার কথাগুলোই মনে পড়েছিল সেদিন খালি। ‘আমাদের ভুলের জন্যে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’ বটে! ইজরায়েলি সেনারা এমন কত কত ভুল যে করেছে এতদিন! আর কত জায়গায়, আর কত জনের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে ওরা?
মঙ্গলবার, আমি স্কুলবাড়িটা ছেড়ে আসার দিন দুই পরে হাত-মাইকওয়ালা সেপাইটি, হিব্রুতে সুপ্রভাত কীভাবে বলতে হয়, শেখাল আমাদের। ‘বোকের তোভ, ক্যাপ্টেন’, একসুরে আমরা বললাম। নতুন কয়েকজন বন্দিকে ধ'রে আনা হয়েছে, দেখলাম। ঘেরাটোপের মধ্যে তাদের নিয়ে এল যে সেনারা, তাদের তো ফুর্তির শেষ নেই। ছোটদের একটা আরবি গানের কিছুটা গাইছিল ওরা একসাথে, ‘ওহ, আমার ভেড়া!’, আর উত্তরে বন্দিদের বাধ্য করছিল ‘ব্যা ব্যা’ আওয়াজ করতে।
ঘন্টা খানেক পর একজন আমার নাম ধ'রে ডাকল, ফটকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে বলল। শওয়িশ ভদ্রলোকটি আমাকে সতর্ক করে দিল। ওরা জিজ্ঞাসাবাদ করবে, মারধোরও করবে হয়তো ফের। ‘মনে জোর রেখো, আর মিথ্যে কথা ব'লো না।’ একটু ভয় করছিল।
আরও এক ঘন্টা পর কয়েকটা সেপাই এল। একজনের হাতে আমার পরিচিতিপত্রটা, আরেকজনের হাতে এক জোড়া চপ্পল। সেগুলো ফেলে দিয়ে পরতে বলল। বলল হাঁটতে। ওদেরই একজন বলল, ‘রিলিজ’!
এতটাই আপ্লুত হলাম যে তাকে ধন্যবাদ জানালাম। স্ত্রী, সন্তানদের কথা মনে পড়ল আমার। বাবা, মা, ভাই, বোনেরা– আশা করি– বেঁচে আছে।
যেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, হিব্রু গান বাজছিল একটা, আন্দাজ প্রায় দু’ ঘন্টা মতো ছিলাম সেখানে। কিছু খাবার আর জল দেওয়া হয়েছিল আমাকে। তবে আমার পরিবারের পাসপোর্টটা সেনারা খুঁজে পেল না। একটা জিপে চ'ড়ে বসলাম। সেপাইরা ঘিরে ছিল আমাকে। ঘন্টা দুয়েক পরে– চোখে তখনও ফেটি বাঁধা, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম– গাড়িটা গাজার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে ইতোমধ্যেই।
সেপাইগুলো নামল একবার, ধূমপান করল, ফিরে এল সম্পূর্ণ সশস্ত্র। বর্ম, শিরোস্ত্রাণ পরিহিত। লাইনে চিনতে পেরেছিলাম সেই যে লোকটাকে, তার কথা ভাবছিলাম। কী যেন বলছিল সে, মানব-ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার ব্যাপারে! আমি ভাবতে লাগলাম, যখন ওরা আমার পরিচিতিপত্রটা ফেরত দিল তখন যদি ডিটেনশন সেন্টারেই ফিরে যেত পারতাম আবার।
দেয়ালে হেলান দিয়ে নিকটতম সেপাইটিকে বললাম, ভয় করছে।
‘ভয় পেয়ো না। শিগ্গিরি ছেড়ে দেব।’
হাতকড়া খুলে দেওয়া হ'ল, সরিয়ে নেওয়া হ'ল চোখের ফেটিটা। যেখানে কাপড়চোপড় খুলে ফেলতে হয়েছিল আমাকে, সে জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম। নতুন বন্দিদের যখন অপেক্ষা করতে দেখলাম সেখানেই, মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।
দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলাম। চেকপয়েন্টের কাছে– যেখানে বন্দিরা নিজেদের জিনিসপত্র জমা রেখে যায়– সেই স্তূপের ভেতর আমার হাত-ব্যাগটা খুঁজে পেলাম। তবে য়াজানের পিঠের ব্যাগটা, যাতে পুচকেগুলোর শীতের জামাকাপড় ছিল, সেটা পাওয়া গেল না। একটা সেপাই হম্বিতম্বি করল আমার উপর। ‘আমি সবে মুক্তি পেয়েছি’, জানালাম।
সালাহ আল-দিন রোডে ফিরে, দেখি, অনেকে সেখানে অপেক্ষা করছে। কাঁদতে কাঁদতে এক মা জিজ্ঞেস করলেন আমাকে, ছেলেকে তার আমি দেখতে পেয়েছি কি-না! ‘সোমবার অপহরণ করা হয়েছে ওকে’, বৃদ্ধা বললেন। এটা মঙ্গলবারের ঘটনা। আমি ওঁর ছেলেকে দেখিনি।
কোনও টাকা ছিল না আমার কাছে। ফোনও ছিল না। তবে এক সহৃদয় ড্রাইভার দক্ষিণের শহর দেইর আল-বালাহ অব্দি আমাকে পৌঁছে দিতে রাজি হলেন। আমার স্ত্রীর আত্মীয়রা ওখানেই আশ্রয় নিয়েছে, জানতাম। মারামও, সম্ভবত, ওঁদের কাছেই গেছে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে। ভদ্রলোক গাড়ি চালাচ্ছিলেন আর আমি তাঁর থেকে জানতে চাইছিলাম, এখন কোথায় আছি, এই জায়গাটার নাম কী ইত্যাদি। আল-নুসেইরত, আল-বুরেইজ, আল-মাঘআজি– গড়গড় করে একটার পর একটা রিফিউজি ক্যাম্পের নাম বলে যাচ্ছিলেন তিনি।
দেইর আল-বালাহ-য় একটি ব্যাঙ্কের বাইরে কয়েকটি যুবক দাঁড়িয়েছিল। ব্যাঙ্কের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করবে ব'লে। আমাদের শহরের কাউকে তারা চেনে কি-না, জানতে চাইলাম। ওঁদেরই একজন আমাকে একটা স্কুলবাড়ি দেখাল।
চপ্পল খুলে দৌঁড় লাগালাম তৎক্ষণাৎ। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছিল, আমি পাত্তা দিইনি। সহসা নজর পড়ল মাহদি-র উপর। আমার পুরনো বন্ধু। এককালে আমাদের ফুটবল টিমের গোলকিপার ছিল। ‘মাহদি আমি হারিয়ে গেছি– ভাই সাহায্য করো!’
‘মোসাব!’ কোলাকুলি করলাম আমরা।
‘তোমার বউ বাচ্চারা কলেজের পাশের স্কুলটায় আছে’, সে-ই জানালো। ‘বাঁদিকে ঘুরেই দু'শো মিটার মতন হাঁটলেই পেয়ে যাবে।’
আমি দৌড় লাগালাম, আমি কেঁদে ফেললাম। রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, এই কথা মনে হ'তে না হ'তেই যাফ্ফা-র গলা কানে এল। ‘বাবা!’ আমার পাজলের প্রথম টুকরোটা ছিল ও-ই। মেয়েটাকে সুস্থ দেখাচ্ছিল। একটা কমলা-লেবু খাচ্ছিল। যখন শুধোলাম, বাড়ির বাকিরা কোথায়, মেয়েটা আমার হাত ধ'রে টানতে টানতে এমনভাবে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেল, আমি একটা বাচ্চাই যেন।
মারামের কাকা, সারি, মারামকে খুঁজতে ছুটে যান। মারামকে বললেন, রাতের খাবার খেতে এসেছেন। আমি যে ফিরে এসেছি সেটা জানালেন না। হঠাৎ আমাকে দেখে মারাম তো অবাক, যেন এক্ষুণি মূর্ছা যাবে। এক ছুটে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম।
......…
আমি যে কতটা সৌভাগ্যবান তা পরে মারামের কাছে জানতে পেরেছিলাম। আমার ফোন থেকে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা আমার বন্ধুদের সে খবরটা জানিয়ে ছিল। তাঁরা আমার মুক্তির দাবি তুলেছিলেন। আমার থেকে অনেক বেশি প্রতিভাবান হাজার হাজার ফিলিস্তিনীয়র কথা মনে পড়ল আমার, চেকপয়েন্ট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও যাঁদের বন্ধুরা তাঁদের কোনও সাহায্যই করতে পারেন না।
পরদিন, বুধবার, হাসপাতালে গেলাম গায়ের আঘাতগুলো দেখাতে। সিঁড়িতে, বারান্দায়, টেবিলে সর্বত্র রোগি আর লাশ, দেখতে পেলাম। এক্স-রে করানোর ব্যবস্থা তো হ'ল একটা, কিন্তু রেজাল্ট পেলাম না কোনও। ডাক্তারবাবুর কম্পিউটারটা কাজই করছে না। কিছু ব্যথার ওষুধের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফিরে আসতে হ'ল।
ওই শুক্রবারই সাময়িক যুদ্ধবিরতি একটা শুরু হ'ল। মারামের দুই কাকা উত্তর গাজায় যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে এক ঘন্টা পরেই ফিরে আসতে হ'ল ওঁদের। ওঁরাই জানালেন, ইজরায়েলি স্নাইপাররা দু'জনকে গুলি ক'রে হত্যা করেছে। বাজারে কাপড়ের দাম, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে, বেড়ে গেছে। ইউ এন আর ডব্লু এ-র ত্রাণ শিবিরে সামান্য ময়দার জন্যে প্রায় পাঁচ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম। খালি হাতেই ফিরতে হ'ল শেষ অব্দি। গ্যাস সিলিন্ডার ভরার জন্যে লোকে লাইন দিয়েছে, দেখলাম। প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা লাইন।
যুদ্ধবিরতির সময়টা ফুরোতেই, মাত্র চব্বিশ ঘন্টায় সাতশো ফিলিস্তিনীয়কে খুন করল ওরা। এতক্ষণ যদিও দক্ষিণ দিকটা, তুলনায়, নিরাপদ ছিল খানিক; এবার কিন্তু বেশ কাছেই বোমার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
জেরুদালেমের মার্কিন দূতাবাস থেকে আমাদের, এরপর, বলা হল, রাফাহ্ সীমান্তের দিকে চলে যেতে।
একটা গাড়ি খোঁজার চেষ্টা করলাম। কুড়ি কিলোমিটার মতো যাত্রাপথ। প্রথম দু'জন ড্রাইভার ভয়ে যেতে চাইলেন না। নিকটবর্তী খান ইউনিস শহর থেকে রাফাকে বিচ্ছিন্ন ক'রে রেখেছে ইজরায়েলিরা। বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলার পর মারামের এক খুরতুতো দাদা, ট্যাক্সি চালান, তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল। নিয়ে যেতে রাজি হলেন তিনি।
সীমান্তে কয়েকশ’ ফিলিস্তিনীয় জনতা। তাঁদের মতোই আমরাও অপেক্ষা করছিলাম। আমার পরিচিতিপত্রটা হাতে, তাতে তিন ছেলে-মেয়ের নাম লেখা। তবে মারামের পাসপোর্টটা মারামের কাছেই। সীমান্ত পেরোনোর জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব ঠিকঠাক নেই, বোধহয়, আমাদের কাছে। মনে হ'ল। তবে, সন্ধে সাতটা নাগাদ, ওদের অফিসাররা আমাদের ফটক পার হ'তে দিলেন। নিঃশেষিত প্রায় অসংখ্য পরিবার; তাঁদের সঙ্গেই আমরাও ভিড়ে গেছি। ঢুকে পড়েছি মিশরীয় ট্র্যাভেলরস' হলটিতে। আমার মনে হ'ল যেন সেরে উঠেছি। মার্কিস দূতাবাস মোস্তাফার জন্যে একটা ওয়ান-টাইম পাসপোর্ট বানিয়ে দিল। একটা মিনিবাস কায়রোর দিকে নিয়ে চলল আমাদের।
......…
‘অবরোধ কাল’-এ লিখেছিলেন ফিলিস্তিনীয় কবি মাহমুদ দরবিশ, তরজমা করা মুশকিল, তবু কথাটা এরকম, ‘বেকার লোকেরা যা করেন, আমরাও ঠিক তাই করি।’ কী সেটা? দরবিশ বলছেন, ‘আমরা সৃজন করি আশা’। আরবি শব্দ– নুরাবি– এই ক্রিয়াপদটির অর্থ সৃজন করা, লালন পালন করা, বড়ো করে তোলা। পিতা-মাতা যেভাবে মানুষ করেন সন্তানদের, অথবা কোনও চাষা যেভাবে সযত্নে বড়ো করে তোলেন ফসল। ফিলিস্তিনীয়দের কাছে ‘আশা’ বেশ কঠিন একটা শব্দ। আমাদের কাছে ‘আশা’ ব্যাপারটা এমনই, যা কেউ বাইরে থেকে জোগাতে পারে না। আমাদের কেউ দিতে পারে না ওটা। ফিলিস্তিনীয়দের নিজেদেরই রোপন করতে হয় 'আশা', চষতে হয়, লালন পালন– সৃজন করে নিতে হয়। আমাদের পেলেপুষে বড়ো করতে হয় তাকে।
আশা করি, যুদ্ধ থামলে আমি ফিরে যেতে পারব গাজায়। আমাদের বাড়িটা ফের বানাতে পারব। প্রচুর বই দিয়ে ভ'রে দিতে পারব ঘরটা। আশা করি, ইজরায়েলিরা একদিন তাঁদের সমান মনে করবে আমাদের। বিশ্বাস করবে, ওঁদের মতোই আমাদেরও নিজেদের ভিটেতে বাঁচা প্রয়োজন; নিরাপদে, কল্যাণে। নিজেদের ভবিষ্যত, আমাদেরও, নিজেদেরই গড়ে তোলা প্রয়োজন। উড়োজাহাজের জানালা থেকে গাজাকে দেখার আমার স্বপ্নটা সত্যি হবে একদিন, আমাদের বাড়িটা এমন আরও অনেক স্বপ্নের জন্ম দেবে, আশা করি। এ-কথা সত্য যে, ফিলিস্তিনেরও অনেক কিছুই সমালোচনার যোগ্য। আমরা বিভাজিত। দুর্নীতিতে জর্জরিত। আমাদের বহু নেতাই আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না। কেউ কেউ হিংস্র, সেটাও সত্য। তবুও, এই সব শেষে, একটা কথা কিন্তু ইজরায়েলিদের মতো আমাদের– ফিলিস্তিনীয়দের– জন্যেও সমান প্রযোজ্য। অতিঅবশ্যই নিজেদের একটা দেশ থাকা উচিত আমাদের। একটা দেশে– নিজেদের একটা দেশে– সকলের একসঙ্গে থাকার অধিকার রয়েছে আমাদের। সকল ফিলিস্তিনীয়দের। যেখানে সকল ফিলিস্তিনীয়দের থাকবে সম্পূর্ণ আর সমান অধিকার। মর্যাদা। আমাদের নিজস্ব বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, স্বাধীন অর্থনীতি থাকা উচিত আমাদের। যেমনটা সবার আছে।
আমার এক মিশরীয় বান্ধবী কায়রোতে স্বাগত জানাল আমাদের। সে থাকে জামালেক এলাকায়– নীল নদের একটি দ্বীপে। তার বাগানে যখন গেলাম, দেখলাম, কিছু ফুল ফুটে আছে। এই ফুলগুলোই আমার বাবা, মা লাগিয়েছিলেন বেইত লহিয়ায়। তার বইয়ের তাকে দেখলাম, সেইসব বই-ই, যেগুলো ফেলে আসতে হয়েছে আমাকে। ধ্বংসস্তূপের তলায়। ওঁর এই বাড়িটা আমাকে নিজের ঘরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, বললাম ওঁকে। সে কেঁদেই ফেলল।
পরে, ওঁর বাড়িতেই, ইজরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এ বি’ইর শেভা ডিটেনশন ক্যাম্পের উপর একটি লেখা পড়লাম। এই প্রতিবেদনটিতে যা যা লেখা হয়েছে তা আমার অভিজ্ঞতার সাথে মিলল হুবহূ। ইজরায়েলি সেনা-হেফাজতে বহু বন্দির মৃত্যুর কথা সেখানে উল্লিখিত ছিল। এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্যে যখন ইজরায়েলি সেনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, ওদের মুখপাত্র বলেছেন, ‘বন্দিদের সঙ্গে আমাদের আচরণ আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণই থাকে। কোনও গোপন অস্ত্র তাদের কাছে রয়েছে কি-না তা পরীক্ষা করা হয়। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বন্দিদের মর্যাদাকে সর্বদাই অগ্রাধিকার দেয়। এবং যেকোনো রকম প্রটোকল ভঙ্গের ঘটনা ঘটলে তার যথাযথ রিভিউ করে থাকে।’ বন্দিদের মৃত্যুর ব্যাপারে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।
ইউএনআরডব্লুএ-র খলিফা বিন জায়েদ বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের একটা ভিডিও পেলাম টেলিগ্রামে। য়াজান, যাফ্ফা আর আমি তিনজনই এই স্কুলটাতে পড়েছি। মারামের দুই কাকা– নাসিম ও রামাদান– দু’জনেই জন্ম থেকে মূক ও বধির– ওঁরা এই স্কুলবাড়িটাতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভিডিওতে স্কুলের নামটা শুনেই, য়াজান আর যাফ্ফা খেলনা ফেলে ছুটে এল, ঝুঁকে পড়ল ভিডিওটা দেখতে। ‘এটা আমার ক্লাসঘর’, যাফ্ফা বলে উঠল। কয়েক সপ্তাহ আগেই প্রথম শ্রেণিতে পড়া শুরু করেছিল মেয়েটা আমার। য়াজানও নিজের ক্লাসঘরটা চিনতে পারল। স্কুলটা পুড়ছিল দাউদাউ ক'রে, তারই ভিডিও।
এক আত্মীয়ের থেকে জানতে পারলাম, ওই স্কুলবাড়িটায় যাঁরা ছিলেন তাঁদের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ইজরায়েলি সেনারা ওঁদের জামাকাপড় খুলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। নাসিম আর রামাদান বেরিয়েছিলেন ওঁদের ছেলেপুলেদের খুঁজতে। আত্মীয়টি জানালেন, ওঁরা যখন স্কুলবাড়িটার সদর ফটকে তখনই ইজরায়েলি স্নাইপার গুলি করে, নাসিম মারা যান।
নাসিমের ছোট ভাই সারি, একদিন আগেই যাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার, আমাকে একটা ছবি পাঠালেন। নাসিমের। গায়ে ডাক্তারের সাদা ইফনিফর্ম, রক্তে ভেজা। ‘পরার জন্যে হাসপাতালে এগুলোই শুধু খুঁজে পেয়েছিল ওঁরা’, সারি ওয়াটসঅ্যাপে জানালেন। পাশে বসে ছিল মারাম, ক্রন্দনরত।
পরেরদিন, মারাম মাকলুবা রাঁধছিল। ভাত, মাংস, সবজি দিয়ে বানানো একটা রান্না। মাস দুয়েক আমি মাকলুবা খাইনি। আমি সবে আলু আর টমেটোর গন্ধটা নিচ্ছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, এমনই সময়, একটা ব্যক্তিগত নম্বর থেকে ফোন পেলাম।
‘হ্যালো, মোসাব, কেমন আছ?’
আমার শ্বশুরমশাই, জলিল! বাবার গলা শুনেই মারামের চোখদু’টো ভরে এল জলে। উনি আমাদের বললেন, সব ঠিকঠাক আছে, যদিও বাস্তবে যে তা সম্ভব নয়, তা তো আমরা জানতামই। মারামের মা ফোনটা নিলেন এরপর।
‘যে ক্ষতিটা হ'ল আমাদের, আমি খুবই দুঃখিত, মা!’ মারাম বলল। ফোনের ওপারে ওঁর মায়ের ফোঁপানি, শুনতে পেলাম।
‘মা, তুমি ওষুধগুলো খাচ্ছো তো?’
‘আমায় নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করিস না’, উনি বললেন। ওঁদের নিয়ে আমাদের দুঃশ্চিন্তা থামবে না কোনোদিন।
আমাদের যাত্রা এই মিশরেই থামবে না-কি তা চলবে আমোরিকা পর্যন্ত, আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর একটা শৈশব প্রয়োজন। কোথাও একটা যাওয়া প্রয়োজন, প্রয়োজন লেখাপড়া। বেঁচে থাকার মতন একটা জীবন, আমার মতন নয়, এমন একটা জীবন ওদের প্রয়োজন।
মিশরে আমি একটিই মাত্র বই নিয়ে আসতে পেরেছি। আমারই কবিতা-সংকলনটার একটা জীর্ণ কপি সেটা। ওটা শেষবার যখন পড়েছি, তারপর থেকে অনেকগুলো নতুন কবিতা যাপন করেছি। যদিও লেখা হয়নি এখনও, এইবার লিখে ফেলতেই হবে। কয়েক হপ্তা ধরে– কখনো রাস্তায়, কখনো স্কুলবাড়িতে–মোবাইলে টাইপ করে লিখেছি, ল্যাপটপটা খুলতে পারিনি। কখন আবার ওটা চার্জ করার সুযোগ পাব, এমন অনিশ্চয়তায়। দরজা বন্ধ করতেও পারি না আর। তবে, এরই মধ্যে একদিন সকালে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে– আলো ঝলমলে একটা ঘরে– চমৎকার এক কাঠের টেবিলে ব'সে একটি কবিতা লিখেছি। আমার মায়ের উদ্দেশে। আশা করি, পরের বার যখন আমরা কথা বলব আবার, কবিতাটি পড়ে শোনাতে পারব।
প্রকাশের তারিখ: ২৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
