সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বহুমেরু বিশ্বের মঞ্চ ব্রিকস
সুচিক্কণ দাস
১৬ বছর আগে যে ব্রিকস যাত্রা শুরু করেছিল, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সেটাই হয়ে উঠতে চলেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প একটি বহুমেরু মঞ্চ। তবে এখনই পুঁজিবাদী দেশগুলির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে যেতে চায় না ব্রিকস। বরং পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতা করতে চায়। সেই দিক থেকে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে ১৯৫৫ সালে যে বান্দুং সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতির ভিত্তিতে, সেই বার্তাকেই কার্যত ফিরিয়ে আনতে চাইছে ব্রিকস।

কাজান সম্মেলন
বহুমেরু বিশ্বে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলির মঞ্চ হল জি-সেভেন। এখানে রয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একেবারে নিখাদ পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার প্রতিভূ এই গোষ্ঠী। এছাড়া রয়েছে জি-২০ গোষ্ঠী। জি-২০ মঞ্চ অর্থনীতির দিক থেকে উন্নত এবং ভারতসহ তিন মহাদেশের পিছিয়ে পড়া কয়েকটি দেশের একটা মঞ্চ। এই মঞ্চে রয়েছে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশও। এসবের একেবারে বিপরীত দিকে রয়েছে আরেক বহুমেরু মঞ্চ ব্রিকস, যার লক্ষ্যই হল জি-সেভেনের তৈরি ডলারের দুনিয়ার বিকল্প নির্মাণ।
সম্প্রতি রাশিয়ার কাজান শহরে হয়ে গেল ব্রিকসের ষষ্ঠদশ সম্মেলন। কোন কোন দেশ এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল তা লক্ষ্য করাটা জরুরি। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা তো ছিলই। সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ৩৬টি দেশ। হাজির ছিল মিশর, ইথিওপিয়া (আফ্রিকার দেশ), তুরস্ক (ন্যাটো সদস্য), সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (পশ্চিম এশিয়ার দুটি বড় শক্তি) এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস। ছিলেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো। কিউবা ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতিরা আসতে পারেননি বলে দুঃখপ্রকাশ করে তাঁদের বিদেশ মন্ত্রীদের পাঠিয়েছেন। নিকারাগুয়া পাঠিয়েছিল উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। শেষোক্ত তিনটি দেশ লাতিন আমেরিকার। উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক দেশ ভিয়েতনাম ও লাওস। প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল শ্রীলঙ্কার নতুন বামপন্থী সরকার। এই তিনটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার। অংশগ্রহণকারী দেশগুলির নাম থেকেই স্পষ্ট এতদিনে ব্রিকস হয়ে উঠেছে এক বৃহত্তর বহুমেরু মঞ্চ।
তবে এই অংশগ্রহণের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেশি। ব্রিকসের এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান ও ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ডি-ডলারাইজেশন। অর্থাৎ মার্কিন ডলার-ভিত্তিক যে সাম্রাজ্যবাদী ও নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তার বিকল্প একটা ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে কোনও দেশের বিরুদ্ধে ডলারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না আমেরিকা। পারবে না সুইফট ব্যবস্থা থেকে ছিন্ন করে কোনও দেশের অর্থনীতিকে সঙ্কটগ্রস্ত করতে। পারবে না আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাঙ্কের কঠোর জনবিরোধী শর্ত চাপানো ঋণ নিতে। মনে রাখতে হবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো এতদিনের নির্ভরযোগ্য মার্কিন মিত্ররা, মার্কিন মদতে প্যালেস্তাইন ও লেবাননে ইজরায়েলের হামলা চলা সত্ত্বেও, এবং ডলার অর্থনীতির মধ্যে থাকা সত্ত্বেও, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। এবং এর আগে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব বৈঠক করেছে তাদের চিরশত্রু ইরানের সঙ্গেও। আবার ন্যাটোর সদস্য হয়েও ব্রিকসের সম্মেলনে যোগ দিয়েছে তুরস্ক। সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় যে মার্কিন ও ন্যাটোর প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে, তারই ইঙ্গিত রয়েছে এমনকি ব্রিকসের মঞ্চেও। ইতিমধ্যে মোট ৩৪টি দেশ ব্রিকসের সদস্যপদের আবেদন জানিয়েছে। এই দেশগুলির মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নাইজিরিয়ি, বলিভিয়া। উল্লেখ্য, প্রথমোক্ত দুটি দেশ এতদিন গোঁড়া মার্কিনপন্থী হিসাবেই পরিচিত ছিল।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের গুরুত্ব
চীনের সেন্ট্রাল টিভি সূত্রে খবর, সদস্য সংখ্যা বাড়ার পর বিশ্বের জিডিপিতে ব্রিকসের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩৫.৬ শতাংশ। পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি অনুযায়ী ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির জিডিপি এখন জি সেভেন গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি। একই মানদণ্ডে ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট জিডিপি-র ৩২ শতাংশের মালিক এই সংগঠনের প্রথম পাঁচ সদস্যের। বিশ্বে যত শুকনো জমি আছে, তার এক তৃতীয়াংশের মালিক ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি। এই দেশগুলিতে রয়েছেন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। সারা বিশ্বে যত খনিজ তেল উত্তোলন করা হয় তার ৪০ শতাংশ আসে ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলি থেকে। সারা বিশ্বে মোট যত পণ্যরপ্তানি হয় তার এক চতুর্থাংশ হয় এই দেশগুলি থেকে। ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির রয়েছে নিজস্ব বিশাল বাজার, প্রচুর সম্পদ এবং বিনিয়োগের এবং উন্নয়নের প্রভূত সম্ভাবনা।
এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে অর্থনৈতিক ভাবে উঠে আসছে (ইমার্জিং মার্কেটস অ্যান্ড ডেভেলপিং ইকনমিস বা ইএমডিই) এমন দেশগুলির অর্থনৈতিক শক্তি। কারণ এই দেশগুলির মধ্যে অনেকেই ব্রিকসভুক্ত। ২০২৩ সালে দেখা গেছে, ইএমডিইদের দখলে ছিল বিশ্বের মোট জিডিপি-র ৫০ শতাংশেরও বেশি। এর আগের এক দশকে বিশ্বের মোট জিডিপি যত বেড়েছিল, তার ৬০ শতাংশই ছিল ইএমডিই দেশগুলির দখলে। এই সব দেশগুলিতেও ডলারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে হামলা চালায় আমেরিকা। ফলে ব্রিকসের ডলারের আধিপত্য কমানোর কর্মসূচি আকর্ষণ করবে এই সব দেশগুলিকেও।
কী করতে চায় ব্রিকস
ব্রিকস কী চায় কাজান সম্মেলনে তার একটা রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রথমত, ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চালাবে নিজেদের মুদ্রায়। এর ফলে দু’পক্ষের সঞ্চয়ই নিরাপদে থাকবে, আংশিকভাবে ডলার বাণিজ্যের বাইরে আসা যাবে ও মার্কিন হুমকির মুখে পড়তে হবে না। এই প্রক্রিয়া চীন ও রাশিয়া অনেক আগেই শুরু করেছে। এখন তা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভের বক্তব্য হল, এখনকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দাঁড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমী আর্থিক পরিকাঠামো ও সংরক্ষিত মুদ্রা ডলারের ওপর। এই ব্যবস্থায় ডলারকে যেহেতু অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাই এর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলাই লক্ষ্য। এজন্য ব্রিকস পে নামে একটি ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটা হবে সার্বভৌম ও সমৃদ্ধ দেশগুলির পেমেন্টস ব্যবস্থার ভিত্তি। নিজেদের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্যের জন্য ব্রিকসভুক্ত দেশগুলি ব্রিকস পে ব্যবহার করবে। এই পেমেন্টস ব্যবস্থা ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির মধ্যে সম্পর্ক গভীরতর করবে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। এবং সদস্য দেশগুলিকে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে।
আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের বিপরীতে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ককে। উন্নয়নশীল দেশগুলির পরিকাঠামো প্রকল্পে ঋণদানের জন্য এই ব্যাঙ্ক আগেই চালু করা হয়েছিল। কাজান সম্মেলনে আইএমএফের কঠোর শর্ত এড়িয়ে সহজ শর্তে ঋণদানের সংস্থা হিসাবে এনডিবির ভূমিকাকে আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই ব্যাঙ্কের পুঁজি আরও বাড়ানো হবে এবং আরও বেশি ঋণ দেওয়া হবে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থা বনাম বহুমেরু বিশ্ব
তাহলে এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি ডলারের আধিপত্য কমানো, বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা এবং আইএমএফএর পাল্টা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যাতে সহজ শর্তে উন্নয়নের জন্য ঋণ পাওয়া যায়– এই তিনটি লক্ষ্যেই কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিকস। অর্থাৎ ব্রিকস চায় বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিনি প্রভাব আলগা করে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
রাজনীতির ভাষায় বললে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগে ১৬ বছর আগে যে ব্রিকস যাত্রা শুরু করেছিল, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সেটাই হয়ে উঠতে চলেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প একটি বহুমেরু মঞ্চ। তবে এখনই পুঁজিবাদী দেশগুলির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সঙ্ঘাতে যেতে চায় না ব্রিকস। বরং পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতা করতে চায়। সেই দিক থেকে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে ১৯৫৫ সালে যে বান্দুং সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতির ভিত্তিতে, সেই বার্তাকেই কার্যত ফিরিয়ে আনতে চাইছে ব্রিকস। তখন সেটা ছিল আফ্রো-এশীয় সম্মেলন। এখন তাতে যোগ দিয়েছে লাতিন আমেরিকাও। বান্দুং সম্মেলনের নেতা ছিল ভারত ও চীন। ব্রিকসেও নেতৃত্বে রয়েছে দুই দেশ। মোদি যতই চেষ্টা করুন, বর্তমান বিশ্বে বহুমেরুতার রাজনীতি এড়িয়ে চলতে পারবে না ভারতও।
এভাবে সমসাময়িক বহুমেরু বিশ্বের প্রতিফলন হিসাবে উঠে আসছে ব্রিকসের মতো আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। এই প্রক্রিয়ারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল ব্রিকস। এর ফলে প্রমাণিত হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডসে গড়ে তোলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থা এখনকার বিশ্বের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। তাই তার ক্ষমতাও খর্ব হচ্ছে।
তবে একথা মনে রাখতে হবে যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রিজার্ভ কারেন্সি হিসাবে ডলারের ভূমিকা এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আসলে মার্কিনি ব্যবস্থা এবং ব্রিকস কাজ করে চলবে পাশাপাশি। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির বেশিরভাগই ডলার বাণিজ্য ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে। সেকারণে তাদের মধ্যে দোলাচল বৃত্তিও দেখা যাবে। স্রেফ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিলীন হয়ে যাবে একথা ভাবারও কোনও কারণ নেই। সাম্রাজ্যবাদকে ছোট করে দেখা হবে শিশুসুলভ মূর্খামি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটা সময়ে হৃত সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সামরিক শক্তিকে হাতিয়ার করতে চাইবেই সাম্রাজ্যবাদ। ততদিনে ব্রিকসের মতো একাধিক শক্তিশালী মার্কিন বিরোধী বহুমেরু মঞ্চ গড়ে উঠলে, তৈরি হয়ে যাবে একটা বাফার জোন, যাকে সমীহ করে চলতে হবে সাম্রাজ্যবাদকে। সেটাই তাদের সামরিক আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমশ পেছনে ঠেলে দিতে পারে।
আরও পড়ুন: সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বহুমেরু দুনিয়া গড়ার লড়াই ও ব্রিকস
প্রকাশের তারিখ: ০১-নভেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
