সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
জনগণতান্ত্রিক কর্মসূচী ও শ্রমিকশ্রেণি
বি টি রনদিভে
একমাত্র বিপ্লবী সংগ্রামের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পার্টি শ্রমিকশ্রেণির চেতনাকে বিপ্লবী স্তরে উন্নীত করতে পারে। সুতরাং পার্টিকে অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত বিষয়ে ও বিপ্লবী সংগ্রামে সরাসরি শ্রমিকশ্রেণির সমাবেশ ঘটাতে হবে। আমাদের দেশে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, কেন্দ্রের ক্ষমতার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে এবং রাজ্যগুলির স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈদেশিক নীতির জন্যে সংগ্রাম, কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে সমস্ত শোষিত মানুষকে রক্ষা করার লড়াই এবং সর্বোপরি কৃষক সমাজের মুক্তির জন্য সংগ্রাম-সবই এর অন্তর্গত।

শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের প্রশ্নটি আধুনিক বিপ্লব প্রক্রিয়া সম্পর্কে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী উপলব্ধির সঙ্গে জড়িত। মার্কস সামাজিক বিকাশের যে-বস্তুনিষ্ঠ নিয়মগুলির (অবজেকটিভ লজ) ব্যাখ্যা করেছেন তার সাথে এই প্রশ্নটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মার্কস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলেছেন: ‘মানবসমাজের ইতিহাস হল শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস’। সামাজিক তোলপাড় ও বিপ্লবগুলির সঙ্গে পুরাতন শ্রেণিগুলির পতন ও সামাজিক অগ্রগতির প্রতিনিধিস্বরূপ নতুন শ্রেণিগুলির উদয়ের সম্পর্ক রয়েছে। এই নতুন শ্রেণিগুলি হল নতুন সামাজিক সম্পর্কের প্রতিনিধি— সে-সামাজিক সম্পর্ক হল সমাজের পতন এড়ানোর এবং তার অগ্রগতি অক্ষুন্ন রাখার জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন সম্পর্ক।
সুতরাং বিপ্লবগুলি কেবল ব্যক্তিগত বীরত্বের অথবা জনগণের সহসা কোনো কাজকর্মের ফল নয়। অবস্থার দরুন বাধ্য হয়ে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট শ্রেণিগুলির বর্তমান সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা তোলার ফলে তা ঘটে। এই বিপ্লবী উত্থানে ভূমিকা গ্রহণকারীদের প্রকৃত চেতনা যাই থাক না কেন, তাদের শ্রেণিগত অবস্থানটি এবং সামাজিক অগ্রগতি ও বিপ্লবের সঙ্গে সেই শ্রেণিগত অবস্থানের সম্পর্কের দ্বারাই তাদের ভূমিকাটা নির্ধারিত হয়। শ্রেণিগত অবস্থানের বিভিন্নতার দরুনই কেউ বিপ্লবের বিরোধিতা করে, কেউ আবার সে-বিপ্লবে দৃঢ় নেতৃত্বের ভূমিকা নেয়, আবার কেউ কেউ দোদুল্যমান, কখনও এদিকে কখনও ওদিকের প্রতি পক্ষপাতমূলক ভূমিকা নেয়।
মার্কসের শিক্ষা সম্পর্কে লেনিন লিখেছিলেন: ‘মানবসমাজের বিকাশে বৈপ্লবিক কালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নটা যুক্তিযুক্তভাবেই এসেছে ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তথাকথিত শান্তিপূর্ণ বিকাশের সময়ে অসংখ্য যে-সব দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে জমে উঠতে থাকে তার সমাধান ঘটে ঐ বৈপ্লবিক কালেই। এরকম কালেই সামাজিক জীবনের রূপ নির্ধারণকারী বিভিন্ন শ্রেণিগুলির প্রত্যক্ষ ভূমিকা সর্বাধিক শক্তি নিয়ে প্রকাশ পায় এবং রাষ্ট্রনৈতিক 'উপরিকাঠামো'-র বনিয়াদ স্থাপিত হয় এবং নতুন উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে তা দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকে”। (মোটা হরফ লেখকের) সমস্ত বিপ্লবই হল শ্রেণিবিপ্লব, পুরাতন সমাজের কিছু কিছু নিপীড়িত অংশ তাতে সমর্থকের ভূমিকা নেয়। সমাজের যে-অংশ বা শ্রেণি নিপীড়িত হয়েও নতুন উন্নত উৎপাদন সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করে সে-অংশ বা শ্রেণি প্রধান ভূমিকা নেয়।
যে-পুঁজিবাদী সমাজ সম্পূর্ণ বিকশিত হয়েছে, সেই উন্নত পুঁজিবাদী সমাজকে অনুধাবন করে মার্কস দেখতে পান এই সমাজে যে-দুটি প্রধান শ্রেণি পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে মুখোমুখি হচ্ছে তারা হল পুঁজিপতিশ্রেণি ও শ্রমিকশ্রেণি। মার্কস বলেছিলেন, সমাজের নিপীড়িত অংশগুলির মধ্যে সেই শ্রেণিটিই সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে লড়াই করে যার দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ সমাজের আরও বিকাশের সাথে অভিন্ন। সেজন্য মার্কস বলেছেন, পুঁজিবাদের অধীনে কেবল প্রত্যেক দেশের শ্রমিকশ্রেণিই সামাজিক অগ্রগতির জন্য— সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারে। কারণ একমাত্র শ্রমিকশ্রেণিই পারে উৎপাদনের উপায়গুলির সামাজিকীকরণের জন্য দৃঢ়ভাবে লড়তে এবং উৎপাদনের এই উপায়গুলির নিজেরা মালিক হবে এরকম কোনো মোহও তাদের থাকতে পারে না। কৃষক, মধ্যবিত্তশ্রেণি, পেটিবুর্জোয়া প্রভৃতি সমাজের অন্যান্য অংশগুলির মধ্যে দ্বিধা থেকে যায়, ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কে মোহ থেকে যায় এবং তারা চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলিতে দোদুল্যমানতা দেখায়। এই কারণেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণিকেই সমাজের ওই সব অংশগুলির নেতার ভূমিকা নিতেই হবে।
এর দ্বারা শ্রমিকশ্রেণিকে দেবতার পর্যায়ে তোলা হচ্ছে না কিংবা তার উপর কতকগুলি কাল্পনিক গুণ আরোপ করা হচ্ছে না। শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকাটা সমাজে তার অবস্হানটির দ্বারাই নির্ধারিত হয়— তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নেই, মালিকানার মোহও তার নেই। কারণ শ্রমিকরা হাজার হাজার সংখ্যায় বিরাট বিরাট কারখানায় কাজ করেন; সহজেই জোটবদ্ধ হবার ও শ্রেণি হিসেবে লড়াই করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং সহজেই শ্রেণিগত ঐক্য চেতনা তাদের মনে জন্মায়। ঐ চেতনা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কে মোহভঙ্গের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে একজোট হবার ক্ষমতা ছোটো ছোটো সম্পত্তির মালিক রূপে যারা কাজ করে তাদের নেই, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য বারংবার একজোট হতেও তারা অপারগ।
কিন্তু মার্কস যে সমস্যাটির সম্মুখীন হয়েছিলেন তা হল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমস্যা এবং সে-সময়ে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা। ইউরোপের কয়েকটি দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ হয়নি। সামন্ততান্ত্রিক জোয়াল থেকে তখনও কৃষকসমাজ মুক্তি পায়নি, রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতা তখনও বুর্জোয়াশ্রেণির হাতে আসেনি। তবে শ্রমিকশ্রেণি তখন সংখ্যায় বেড়ে গিয়েছিল এবং একদিকে পুঁজিবাদী শোষণ ও অন্যদিকে দেশের সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাৎপদ অবস্থার জোড়া জোয়ালের বোঝায় তারা দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছিল। এরকম একটা কথা তখন বলা হত, বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন সফল হলে পুঁজিপতিরা শক্তিশালী হবে। সুতরাং তাতে শ্রমিকদের স্বার্থ কী করে রক্ষিত হবে? অতএব অবিলম্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে শ্রমিকদের কি চুপ করে থাকা এবং দর্শকের ভূমিকা নেওয়াটাই উচিত হবে?
মার্কস শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনে একটা প্রধান ভূমিকা নিতে বললেন। কারণ গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ না-হলে সমাজতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত হবে না। শ্রমিকশ্রেণি নিঃসন্দেহে সমাজতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুতরভাবেই আগ্রহী ছিল, নিজেকে ও সমাজকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু প্রথমে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদনের কাজটি সফল না-হলে তা সম্ভব হবে না। মার্কস আরও দেখালেন, শ্রমিকশ্রেণি সে-সংগ্রামে একটি প্রধান ভূমিকা না-নিলে সামন্ততন্ত্রবিরোধী বিপ্লব সম্পূর্ণ হবে না; কারণ এখন গন-বিপ্লবের ভয়ে ভীত বুর্জোয়াশ্রেণি সামন্ততান্ত্রিক উপাদানগুলির সাথে আপসরফার মনোভাব নিয়েছে।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে বুর্জোয়াশ্রেণি যে অক্ষম সেটা খুবই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কারণ বিলম্বিত গণতান্ত্রিক বিপ্লব এখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী প্রক্রিয়াগুলির সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়েছিল। এ-জন্যই মার্কস এই বলে জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণির বর্ণনা করেছেন: “এর না-আছে নিজের উপর আস্থা না-আছে জনগণের উপর বিশ্বাস; উপরে যারা রয়েছে তাদের প্রতি এর অভিযোগ; নিচে যারা রয়েছে তাদের ভয়ে এ কাঁপছে” (মোটা হরফ লেখকের) এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
পুঁজিবাদ যখন ইতিমধ্যেই সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এবং ধনতান্ত্রিক সম্পর্ক যখন পৃথিবীতে দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল তখন রুশ বিপ্লবের সময়, এই একই প্রশ্নগুলি দেখা দিয়েছিল। মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেনিন বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণিকেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হবে, কারণ আপসকামী ও সুবিধাবাদী মনোভাবের দরুন রুশ বুর্জোয়াশ্রেণি ঐ নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। এই ধারাটি অনুসরণ করার এখন আরো কারণ ঘটেছে। অবস্থাটা এখন এমন যে, শ্রমিকরা এখন যদি গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে এবং তা-সম্পাদন করতে সক্ষম হয় তাহলে স্বল্পতম সম্ভাব্য সময়ের মধ্যে তারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পৌঁছাতে পারবে। ১৯০৫ সালে লেনিন লিখেছিলেন: “গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে আমরা তৎক্ষণাৎ এবং আমাদের শক্তি অনুযায়ী, সর্বহারার শ্ৰেণিচেতনা ও সংগঠিত শক্তি অনুযায়ী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়ে চলে যেতে শুরু করব। আমরা নিরবিচ্ছিন্ন বিপ্লবের পক্ষপাতী।”
“হঠকারিতার মধ্যে নেমে না-গিয়ে অথবা আমাদের বৈজ্ঞানিক বিবেকের বিরুদ্ধে না-গিয়ে, সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের চেষ্টা না-করে, আমার শুধু একটি কথা বলতে পারি: গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদন করতে সমগ্র কৃষক সমাজকে সাহায্য করার জন্য আমরা সর্বতোভাবে চেষ্টা করব, যাতে যথাসম্ভব শীঘ্র আমাদের পক্ষে, সর্বহারার পার্টির পক্ষে, নতুন ও উচ্চতর কর্তব্য, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে চলে যাওয়ার কাজটা সহজতর হয়” এখানে সাফল্যের পূর্বশর্তটা ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব। সমস্ত দেশে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের বিস্তারের ফলে এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সংকট সৃষ্টি হওয়ার দরুন গণতান্ত্রিক বিপ্লবগুলির সঙ্গে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী প্রক্রিয়াটির যোগসূত্র রচিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির পথটি সুগম করে দেয়।
বিপ্লবী প্রক্রিয়ার এই বৈজ্ঞানিক উপলব্ধিটি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি ফেব্রুয়ারি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লবে এগিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালের সমস্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস দেখিয়ে দিচ্ছে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণি নেতৃত্ব দিয়েছিল বলেই এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবগুলি সফল হয়েছিল।
রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণি জনসাধারণের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। কৃষকরাই ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। রুশ বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের অর্থ ছিল কৃষক সমাজের নেতৃত্ব, কৃষি বিপ্লবের জন্য কৃষকদের দাবি সমর্থন করা। যে-সব দেশে অ-প্রলেতারীয় জনগণই, বিশেষতঃ কৃষক সমাজই হল জনসংখ্যার সর্বাধিক অংশ, সেখানে বিপ্লবে আধিপত্যের প্রশ্নটি থেকে শ্রমিক ও কৃষকের মৈত্রীর প্রশ্নটি দেখা দেয়, এই মৈত্রীটি হল গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়ের জন্য কৃষিবিপ্লবের মৈত্রী। লেনিনের নির্দেশে রুশ সর্বহারাশ্রেণি ঠিক এই কাজটি সম্পাদন করেছিল এটি ছিল কৃষক সমাজের দাবির প্রতি দৃঢ় সমর্থন ও কৃষক সমাজের সাথে দৃঢ় মৈত্রী গঠনের কাজ এবং বাস্তবে সমস্ত দোদুল্যমানটা কাটিয়ে ওঠার কাজ।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গঠিত হবার পর রুশ বিপ্লবের এই সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাটি উপনিবেশগুলির বিকাশমান জাতীয় বিপ্লবের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল। এই সব দেশের অনেকগুলিতেই অর্থনীতিবিদ বিকাশ প্রায় ঘটেনি বলা যেত এবং শ্রমিকশ্রেণিও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ভারত ও চীনের মতো কিছু দেশে শ্রমিক শ্রেণির অভ্যুদয় ইতিমধ্যেই ঘটেছিল। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামগুলিকে শ্রেণিগত ধারণাহীন, জাতীয় প্রশ্ন বলে গন্য করা হত না, গন্য করা হত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ধরা হত সাম্রাজ্যবাদের বিতাড়ন এবং যাবতীয় প্রাক-পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কগুলির অবসান। তা না-হলে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ পরিষ্কার হবে না। উদীয়মান শ্রমিকশ্রেণিকে সমস্ত খাঁটি বিপ্লবী জাতীয় আন্দোলনগুলিকে সমর্থন করতে বলা হত, সেই সাথে বলা হত তাকে কৃষক জনগনের মধ্যে একইসঙ্গে তার নিজস্ব স্বতন্ত্র কাজকর্ম চালাতে ও সংগঠন গড়ে তুলতে। পরিস্হিতির পরিপক্কতা লাভের সাথে সাথে তা গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিকশিত করার জন্য যোগসূত্র রূপে কাজ করবে। যে-সব দেশে বুর্জোয়াশ্রেণি ও শ্রমিকশ্রেণি উভয়েরই অস্তিত্ব যৎসামান্য, সে-সব দেশ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিজয়ী সর্বহারা শ্রেণির সহায়তায়, ধনতন্ত্রের পর্যায়টিকে এড়িয়ে, গণ-বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায়ে চলে যেতে পারবে বলে মনে করা হত।
যে-সব দেশে শ্রমিকশ্রেণি বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বিকশিত হচ্ছে সে-সব দেশে শ্রমিকশ্রেণিকে আহ্বান জানান হত কৃষক সমাজের সাথে তার নিজস্ব যোগ সূত্র গড়ে তুলতে এবং বুর্জোয়াশ্রেণির প্রভাবের বাইরে একটি শ্রমিক কৃষক মৈত্রী গড়ে তুলতে। লেনিন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এ-সম্পর্কে বলেছিলেন: "শোষণকারী দেশগুলির বুর্জোয়াশ্রেণির সাথে উপনিবেশগুলির বুর্জোয়াশ্রেণির একটা আপসরফা হয়েছে, তার ফলে প্রায়ই দেখা যায়, সম্ভবতঃ এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নিপীড়িত দেশগুলির বুর্জোয়াশ্রেণি জাতীয় আন্দোলনকে সমর্থন করলেও সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে সম্পূর্ণ একমত, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে তারাও সমস্ত বিপ্লবী আন্দোলন ও বিপ্লবী শ্রেণিগুলির বিরুদ্ধে হাত মেলায়... এই পরিবর্তনের তাৎপর্য হল এই, কমিউনিস্ট হিসেবে আমাদের উচিত হল উপনিবেশগুলিতে বুর্জোয়া মুক্তি আন্দোলনগুলিকে একমাত্র তখনই সমর্থন করা যখন সেগুলি প্রকৃতই বৈপ্লবিক এবং যখন তাদের প্রবক্তারা কৃষক সমাজকে ও শোষিত জনগণকে বিপ্লবী মনোভাবে শিক্ষিত ও সংগঠিত করে তোলার কাজে আমাদের বাধা দেয় না এবং তখন আমরা তা সমর্থন করব। এই অবস্থা যদি না-থাকে তাহলে এসব কমিউনিস্টদের সরাসরি বুর্জোয়াদের মোকাবিলা করতেই হবে।" কৃষি বিপ্লব সম্পর্কে বুর্জোয়াশ্রেণির আপসরফা ভূমিকাটি এখানে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিপ্লবের সাথে সর্বহারার নিজেকে দূর করার প্রয়োজনীয়তার উপর এখানে জোর দেওয়া হয়েছে। (বড়ো হরফ লেখকের)
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ষষ্ঠ কংগ্রেসে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাতীয় মুক্তি বিপ্লব সম্পাদন করতে হলে এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করতে হলে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের প্রয়োজন। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ষষ্ঠ কংগ্রেস মন্তব্য করেছিলেন: "সর্বহারার নেতৃত্ব ছাড়া, যার একটা অচ্ছেদ্য অঙ্গ হল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকারী ভূমিকা, বুর্জোয়া বিপ্লবকে তার শেষ পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায় না, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তো দূরের কথা।"
চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া এই উপলব্ধির সঠিকতা প্রমাণ করেছে। এই সব দেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব বিকশিত করা সম্ভব হয়েছিল, শ্রমিক কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলা হয়েছিল, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল এবং দারিদ্র্য ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে জনগণ সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছিল। ভারত নেতিবাচকভাবে এই উপলব্ধিটির সঠিকতা প্রমাণ করছে। এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায়নি। বুর্জোয়াশ্রেণির নেতৃত্ব থেকে গিয়েছিল, কৃষি বিপ্লবের জন্য শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী ফলবতী হতে পারেনি, অন্তর্ঘাতের দ্বারা কৃষি বিপ্লবকে বিনষ্ট করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবটি অসম্পূর্ণ হয়ে গেছে। জনগণের ক্ষমতার পরিবর্তে আমরা পেয়েছি বুর্জোয়া সরকার: সমাজতন্ত্রের পথে উত্তরণ হবার পরিবর্তে আমরা বুর্জোয়া শাসন এবং কৃষক ও অন্যান্য মেহনতী মানুষের বা গ্রামীণ সম্পর্কের জোড়া জোয়াল বহনের যাতনা ভোগ করতে বাধ্য হয়েছে।
এ নয় যে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের প্রয়োজনটা মেনে নেয়নি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির খসড়া কর্মসূচীতে (Draft Platform of Action) (১৯৩০) বলা হয়েছিল: “প্রথমত, পৃথিবীর ইতিহাস এবং ভারতে শ্রেণিসংগ্রামের শিক্ষা প্রমাণ করে যে, একমাত্র শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে ভারতীয় জনগনের মুক্তি, জাতীয় দাসত্বের অবসান, জাতীয় বিকাশের পথে সমস্ত শৃঙ্খলের অপসারণ, জমির বাজেয়াপ্তকরণ এবং বৈপ্লবিক চরিত্রের সুদূরপ্রসারী গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করার ঐতিহাসিক কর্তব্যটির সম্পাদন সুনিশ্চিত করতে পারে।"
কোনো মার্কসবাদীই বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বকে বাদ দেবার কথা চিন্তা করতে পারে না। শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের স্বীকৃতিই সমস্ত রকমের সুবিধাবাদী ও পেটি বুর্জোয়া বামপন্থী হঠকারীদের থেকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের পৃথক করে। সিপিআই যে ভারতের জনগণের সামনে বিপ্লবী সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির আধিপত্যকে স্বীকার করে না, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। সিপিআই আস্থা রাখছে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি ও শ্রমিকশ্রেণির যুক্ত নেতৃত্বের উপর -এটা হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণি-সহযোগিতার একটা করুণ সূত্র- এটা হল জাতীয় বু্র্জোয়া শ্রেণির শর্তে তার সাথে সহযোগিতা। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা মুখে বিপ্লবী বুলি কপচিয়ে গ্রাম দিয়ে শহরগুলি ঘেরার স্লোগান দিয়ে এবং আজকের দিনের বিপ্লবে বিভিন্ন শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে তাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে লেনিনবাদী ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করছে।
আজ ভারতে আমাদের সামনে যে-পরিস্হিতি রয়েছে। তাতে কি আমরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের এই শিক্ষাকে অবহেলা করতে পারি এবং পেটিবুর্জোয়াশ্রেণি কিংবা কৃষক সমাজের সাথে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকাকে সমপর্যায়ের বিবেচনা করে, শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকাটিকে অবহেলা করে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব বলে আশা করতে পারি? ভারতের জনগণের বিভিন্ন নিপীড়িত ও শোষিত অংশগুলির মধ্যে কে সমাজের কোন অবস্থানে রয়েছে তা বিবেচনা না-করে, সামাজিক উৎপাদন ব্যবহার তাদের কার কোথায় স্থান, সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার সাথে তাদের কার কী সম্পর্ক, যে অংশগুলির পক্ষে একমাত্র সমাধান হল— উৎপাদনের উপায়গুলির সামাজিকীকরণ সে আশাগুলির যোগ সূত্রের কথা চিন্তা না-করে, যে অংশগুলি নতুন উন্নত উৎপাদন-সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করে সে সব বিবেচনা করে সমস্ত নিপীড়িত ও শোষিত অংশকে কি আমরা একই স্তরের বলে গণ্য করতে পারি? আজকের দিনের সমস্ত বিপ্লবী দল বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ পরিণত হয়েছে। সুতরাং যে শ্রেণিটি সমাজতন্ত্রের সবচাইতে নিকটবর্তী সেই শ্রেণি নেতৃত্বের ভূমিকা, প্রধান ভূমিকা নিতে বাধ্য, বিপ্লব সফল হতে হলে তাকে সে ভূমিকা পালন করতেই হবে। আমাদের দেশের পরিস্থিতিটা কী? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের পরে বুর্জোয়া-জমিদার শ্রেণিগুলির হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা এসেছে। এই শাসন বড় বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে এবং বড় বুর্জোয়ারা ক্রমশ বেশি করে সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতা করছে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবটি মাত্র অর্ধসমাপ্ত হয়েছে। কৃষি বিপ্লবকে অন্তর্ঘাতের দ্বারা নষ্ট করা হয়েছে। চাষী আধুনিক শোষণের সাথে সামন্ততান্ত্রিক শোষণেও জর্জরিত হচ্ছে। ত্রিশ বছরের কংগ্রেসি শাসন এবং তার জমি সংক্রান্ত আইনগুলি জমি বন্টনের প্রশ্নটির মীমাংসা করেনি কিংবা জমির মালিকানার কেন্দ্রীকরণের প্রশ্নটির মীমাংসা করেনি। দারিদ্র্য ও নিঃস্বতা, বেকারি ও শিল্পের নেতা বেড়েই চলেছে; মুদ্রাস্ফীতি ও চড়া দরদামের মারফত জনগনকে নিংড়ে নেবার প্রক্রিয়াটার গতিবেগ ক্রমাগতই বাড়ছে। সমাজের অন্যান্য অংশের মতোই শ্রমিকশ্রেণির উপরেও গুরুতর আক্রমণ চলেছে তাদের একটা বড়ো অংশের অবস্থাটার সাথে আধুনিক শিল্প শ্রমিকের অবস্থার চাইতে বরং ঋণের দায়ে আবদ্ধ শ্রমিকের (বণ্ডেড লেবার) অবস্থার মিলটাই বেশি। খেতমজুরদের একটা বড়ো অংশের অবস্থাও তাই। বিদেশি ঋণের বোঝা ক্রমাগতই বাড়ছে এবং বিদেশি ঋণের উপর বুর্জোয়া-জমিদার সরকারের নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। আইএমএফের সর্বশেষ ঋণের শর্ত এই সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাটিকে দেশের আর্থিক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দিয়েছে। আইএমএফের হুকুমে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে, যে খাদ্য ভর্তুকি সাধারণ মানুষকে সাহায্য করত তা কেটে নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি জিনিস ও সাজসরঞ্জামের আমদানি বাড়ানো হচ্ছে, বহুজাতিক সংস্থাগুলিকে আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ভারতের মধ্যে অল্প কয়েকটি একচেটিয়া কারবারীগোষ্ঠী বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠছে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে দারিদ্রসীমার নিচে ঠেলে নামিয়ে দিচ্ছে।
এই যে একটা অচল অবস্থা যা একইসঙ্গে দারিদ্র চাপিয়ে দিয়েছে এবং স্বাধীনতা হারানোর বিপদও সৃষ্টি করছে- এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোন ধরনের বিপ্লব দরকার? প্রথমেই এই বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অসমাপ্ত— কৃষি বিপ্লব, জমি বণ্টন ও প্রাক-পুঁজিবাদী সামন্ততান্ত্রিক শোষণের রূপগুলির অবসান ঘটাতে হবে। চীন ও ভিয়েতনামে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের দরুন বিপ্লবের এই কাজগুলি মুক্তিসংগ্রামের অংশ হিসেবেই সম্পাদিত হয়েছিল।
বিতাড়িত সাম্রাজ্যবাদ নয়া-উপনিবেশবাদী পদ্ধতিতে আবার তার শুঁড়গুলি বাড়ানোর ও ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। আগেকার কৃষি-সম্পর্ক নিশ্চিহ্ন করতে বুর্জোয়াশ্রেণির ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ আভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি করার আশাও করছে।
একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলির ও বড় বুর্জোয়াদের কবলে দেশের মোটা অর্থনীতির শ্বাসরোধ ঘটছে; প্রতিদিন একদিকে তাদের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার আরো কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে জনসাধারণের মধ্যে দারিদ্র্য ব্যাপকতর হচ্ছে। এই পরিস্হিতিতে অনিবার্যভাবেই চট-কাপড়কলের মতো বৃহৎ শিল্পের একচেটিয়া সংস্থাগুলির জাতীয়করণের দাবি উঠছে। বৃহৎ বুর্জোয়াদের স্বার্থে, ভূস্বামীদের সাথে আপসরফা করে এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে যে পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করা হচ্ছে তা বারংবার অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি করছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী বাজারের উপর তার নির্ভরশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির সংকট দেশের মধ্যে আমদানি করছে এবং এই অবস্থায় গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য বৃদ্ধির দরুন ভারতের অর্থনীতি তার যৎসামান্য শিল্প-উৎপাদন ক্ষমতাও কাজে লাগতে পারছে না। এই অবস্হার পরিবর্তন না-হলে দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। অবস্থার এই পরিবর্তনের অর্থ হল বর্তমান শাসকশ্রেণিগুলির জোট–বর্তমান বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র- বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণি ও ভূস্বামীদের ক্ষমতা থেকে অপসারিত করতে হবে, অর্থনীতির পথ থেকে সরে আসতে হবে, উৎপাদনের উপায়গুলির উপর একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মালিকানা বড়ো রকমভাবেই ক্ষুণ্ন করতে হবে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রটিকে জনগণের কাছে সরিয়ে আনতে হবে- বর্তমান বুর্জোয়া গণতন্ত্রের স্থানে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে যেখান থেকে তা সহজেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এই হল আমাদের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের চরিত্রটি। গণতান্ত্রিক বিপ্লব বুর্জোয়া বিপ্লবের স্তর পার হয়ে এসেছে। ক্ষমতা এখন বুর্জোয়াশ্রেণির হাতে কিন্তু ভূস্বামীদের সাথে বুর্জোয়াশ্রেণির আপসরফাটা অব্যাহতই রয়েছে। এখন কোন শ্রেণি বিপ্লব সংগঠিত করবে, তাতে নেতৃত্ব দেবে? যে বুর্জোয়াশ্রেণি ক্ষমতায় রয়েছে অথবা জাতীয় বুর্জোয়ারা- বুর্জোয়াশ্রেণির একটা অংশ যারা খানিকটা দুর্দশা ভোগ করছে? কিন্তু তারা কি একচেটিয়া পুঁজিপতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়বে, অথবা বিক্ষিপ্ত কৃষক সমাজ কিংবা শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবে? সামন্ততান্ত্রিক কিংবা পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে যে শ্রেণির কিছুমাত্র স্বার্থ নেই, শোষণ থেকে যে শ্রেণির মুক্তির বিষয়টি সম্পত্তির এই দু’রকম মালিকানার রূপের অবসানের সঙ্গে জড়িত একমাত্র সে শ্রেণিই পারে এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে। সে শ্ৰেণি হল শ্রমিকশ্রেণি। এটা আর নিছক তত্ত্বগত বিষয় নয়। চীনে, ভিয়েতনামে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে তা যাচাই হয়ে গেছে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, এই শ্রেণিকে যদি তার ইতিহাস নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হয় তা হলে তার নেতৃত্বে থাকা চাই একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি। শ্রমিকশ্রেণিকে যদি বিপ্লবের অগ্রগামী সেনাবাহিনী রূপে কাজ করতে হয় তা হলে, পার্টিকে কাজ করতে হবে সেই শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী রূপে। শ্রমিকশ্রেণির এই অগ্রগামী বাহিনী হল তার সচেতন উপাদান এই অগ্রগামী বাহন। শ্রমিকশ্রেণির চেতনা ও তার বিপ্লবী ভূমিকা সম্পর্কে উপলব্ধির স্তরটি উন্নত না-করতে পারা পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণি শীঘ্র তার নিজের ভূমিকা উপলব্ধি করতে ও সে অনুযায়ী শ্রমিকশ্রেণিকে তাঁর ভূমিকা পালন করতে পারে না। শ্রমিক শ্রেণিকে তার ভূমিকা পালন করতে হলে এবং সফল বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হলে যা দরকার তা হল:
(১) শ্রমিকশ্রেণির একটি গণ-পার্টি
(২) বিপ্লবী প্রকার হস্তক্ষেপ করার জন্য এবং নিজের মুক্তি সুনিশ্চিত করতে তাতে নেতৃত্বের ভূমিকা নেবার জন্য সামগ্রিকভাবে শ্রমিকশ্রেণির সচেতনতা;
(৩) যাদের স্বার্থ বিপ্লবের সাফল্যের সাথে জড়িত- পেটিবুর্জোয়া, সমাজের শিক্ষিত অংশ, ছাত্র-ছাত্রী, এবং সর্বোপরি কৃষকরা- নিজের কাজকর্মের দ্বারা শ্রমিক শ্রেণির জনসাধারণের সেই সমস্ত অংশের আস্হা অর্জন। কৃষক সমাজের সাথে মৈত্রী এবং তাকে নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা- এই হল বিপ্লবী সংগ্রামে নেতৃত্বের ধারণাটির সারমর্ম। আমাদের পার্টির কর্মসূচীতে আমরা এর নাম দিয়েছি শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। শ্রমিক ও কৃষকের মৈত্রী হল এর সারবস্তু।
এটা স্পষ্ট যে, বলব যদি সফল হতে হয় তা হলে, যে কৃষক সমাজ হল জনসংখ্যার সর্বাধিক সংখ্যক অংশ, যারা সবচাইতে নিপীড়িত, বিপ্লবকে তাদের সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করতেই হবে। শোষণের অতি পুরাতন শক্তিগুলিকে নিশ্চিহ্ন করাই হল কৃষক সমাজের আশু স্বার্থ । জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণি, পেটিবুর্জোয়াশ্রেণি এবং কৃষক সমাজের বিভিন্ন অংশ দেশের মানুষের এই বিভিন্ন অংশের ভূমিকা ও তাৎপর্য আমাদের জনগনতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচীতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এদের প্রতিটি অংশের যথাযোগ্য গুরুত্ব নির্দেশ করে তার ভিত্তিতে রণ কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ভূমিকা পালনে আমাদের শ্রমিকশ্রেণির সামনে আজ বাধাটা কি? বাধাটা হল এই ঘটনা যে, শ্রমিকশ্রেণির পার্টি এখনও দুর্বল এবং এখন পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণির চেতনা তারা দৈনন্দিন সংগ্রামের বাইরে বেশি দূর বিস্তৃত হয়নি। আমাদের পার্টি বারংবার বলেছে, শ্রমিকশ্রেণির চেতনা এখনও পর্যন্ত অর্থনীতিবাদের কাঠামোর মধ্যে বন্দী রয়েছে: আর অর্থনীতিবাদটা হল বুর্জোয়াশ্রেণির মতাদর্শের প্রভাব, বুর্জোয়াশ্রেণির নীতি ছাড়া আর কিছু নয়। এর অর্থ হল, শ্রমিকশ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনও বুর্জোয়াশ্রেণির মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, তার সংসদীয় মোহ রয়েছে এবং সে বিপ্লবী সংগ্রামের দ্বারা সমাজ পরিবর্তনের আগ্রহ বোধ করছে না। সেজন্য শ্রমিকশ্রেণির অন্যদের সাথে মৈত্রী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না, তাদের জন্য লড়াই করা দরকার মনে করছে না, তাদের বিপদ-আপদ সমস্যাগুলি নিজের বলে গ্রহণ করছে না; অথচ নেতৃত্বকারী শক্তি হিসেবে এসবই তার করা উচিত।
প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশি শ্রমিক ধর্মঘট করেন এবং মাসের পর মাস ধরে লড়াই চালান। অনাহার, নির্যাতন, দুঃখ-দুর্দশা তাঁদের সংহতি নষ্ট করে না। বোম্বাইয়ের আড়াই লাখ শ্রমিক প্রায় দেড় বছর ধরে ধর্মঘট চালিয়েছেন এবং তাঁদের সংহতি নষ্ট হয়নি। 'কতকগুলি রাজ্যে শ্রমিকশ্রেণি ধর্মঘট সংগ্রামে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করছেন। নেতারা খুন হচ্ছেন ধর্ষণ করা হচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, প্রধান প্রধান নেতাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু লড়াই চলেছেই। এই শ্রেণির মতো ভারতের জনসমাজের আর কোনো অংশ, দেশের কোনো না কোনো অংশে এমন বীরের মতো লড়াই করছে না। আর এমনটিই তো হওয়া উচিত। বহু সংখ্যায় জড়ো থাকায় শ্রমিকশ্রেণি নিজের শক্তির উপর আস্হাশীল এবং যখনই আক্রান্ত হয় তখনই সে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সর্বদা তৈরি থাকে।
কিন্তু অবিরাম অর্থনৈতিক সংগ্রাম সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণি তার ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার অনুপাতে নিজস্ব শ্রেণি চেতনাকে সমৃদ্ধ করেনি। কয়েকটি রাজ্যে সে বামগণতান্ত্রিক চেতনার পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিন্তু খুব বিরল ক্ষেত্রেই সে প্রয়োজনীয় সমাজতান্ত্রিক চেতনার স্তরে পৌঁছতে পেরেছে। এর কারণ দুটি। যে সব ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে এই সংগ্রামগুলি পরিচালিত হয় তাদের অনেকগুলির দৃষ্টি হল সংস্কারপন্থী কিংবা সংশোধনবাদী এবং আমাদের শ্রমিকদের চেতনা উন্নীত করার কোন সচেতন পরিকল্পনা তাদের নেই। শ্রমিকশ্রেণির কোনো বিশেষ ভূমিকা আছে বলে তারা মনে করে না; বর্তমান সমাজ ব্যবহার কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলেও তারা মনে করে না।
দ্বিতীয় কারণটি হল অবশ্য পার্টির দুর্বলতা এবং শ্রমিকশ্রেণির উপলব্ধিটি প্রয়োজনীয় স্তরে উন্নীত করা সচেতন চেষ্টার খানিকটা অভাব। পার্টিতে শ্রমিকদের নিয়ে আমার সামান্য। পার্টি স্কুলে শিক্ষার ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাটা অবশ্যই আছে। কিন্তু তা সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না; তা করতে হলে শিক্ষা দানের জন্য অবিরাম প্রচারকার্যের মালমশলা দরকার। এই সব ঘাটতিগুলির কিছু কিছু দূর করা হচ্ছে কিন্তু ব্যাপারটা যতটা পিছিয়ে আছে তা সম্পূর্ণ দূর করা বেশি চেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। তা ছাড়া, শ্রমিকশ্রেণির ক্ষেত্রে সারা ভারতে পার্টির সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পরিমাণটা আরও বাড়ানো উচিত। কেবল দৈনন্দিন ঘটনাবলী নিয়ে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে প্রচার অভিযান চালানোটা, এইসব আন্দোলনের সাথে কিছুটা পরিমাণ রাজনৈতিক প্রচারকে যুক্ত করার ব্যর্থতা, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করার অর্থ হল শ্রমিকশ্রেণিকে অন্য যে কোনো গণতান্ত্রিক শ্রেণির মতোই গণ্য করা। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে, তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণতির সম্ভাবনাকে শ্রমিকশ্রেণির সামনে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে হবে। এটা স্পষ্ট যে, কেবল ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কিংবা রাজনৈতিক প্রচার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির চেতনাকে প্রয়োজনীয় উচ্চস্তরে তোলা যায় না। একমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে শ্রমিক শ্রেণিকে বিপ্লবী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করানোর মধ্য দিয়েই পার্টি বিপ্লবী চেতনা সৃষ্টি করতে পারে। লেনি বলেছিলেন “জনগণের প্রকৃত শিক্ষাকে কখনই তাদের স্বাধীন রাজনৈতিক, বিশেষতঃ, বিপ্লবী সংগ্রাম থেকে আলাদা করা যায় না। একমাত্র সংগ্রামই শোষিত শ্রেণিকে শিক্ষিত করে তোলে। একমাত্র সংগ্রামই তাকে তার আপন শক্তির পরিমাণের সন্ধান দেয়, তাকে দিগন্ত প্রসারিত করে, ক্ষমতা বাড়ায়, মন স্বচ্ছ করে, সংকল্প দৃঢ় করে।"
একমাত্র বিপ্লবী সংগ্রামের ক্রমবর্ধমান অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পার্টি শ্রমিকশ্রেণির চেতনাকে বিপ্লবী স্তরে উন্নীত করতে পারে। সুতরাং পার্টিকে অবশ্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত বিষয়ে ও বিপ্লবী সংগ্রামে সরাসরি শ্রমিকশ্রেণির সমাবেশ ঘটাতে হবে। আমাদের দেশে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, কেন্দ্রের ক্ষমতার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে এবং রাজ্যগুলির স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈদেশিক নীতির জন্যে সংগ্রাম, কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে সমস্ত শোষিত মানুষকে রক্ষা করার লড়াই এবং সর্বোপরি কৃষক সমাজের মুক্তির জন্য সংগ্রাম-সবই এর অন্তর্গত।
তা ছাড়া, আমাদের গণতান্ত্রিক বিপ্লব হল বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী প্রক্রিয়ার একটি অংশ এবং আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণি সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি দৃঢ়ভাবে অনুগত না হলে, সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জয়গুলিকে রক্ষা করা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবহিত না হলে, সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধ চক্রান্ত ব্যর্থ করার জন্যে শান্তির সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলে, তার দায়িত্বগুলি পালনে সক্ষম হতে পারবে না।
এটা বুঝতে হবে শ্রমিকশ্রেণিকে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আগে শ্রমিকশ্রেণি ও আমাদের পার্টিকে অনেক বাধাবিঘ্ন, ঘাটতি ও ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে হবে। কিন্তু একবার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অগ্রগতি সত্বর ও দ্রুত হতে বাধ্য। শ্রমিকশ্রেণির চেতনার মান যে কম তা তো কেবল তার দোষ নয়।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিষয়গুলিতে শ্রমিকশ্রেণির হতক্ষেপ হচ্ছে সবচাইতে কম। যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হল তখন কেরালা ছাড়া ইউনিয়নগুলি হয় তা মেনে নিয়েছিল, নয় তো প্রতিবাদ ধর্মঘট সংগঠিত করতে পারেনি। অন্যদিকে যে আই এন টি ইউ সি এবং এ আই টি ইউ সি জরুরি অবস্থাকে খোলাখুলি সমর্থন জানিয়েছিল, শ্রমিক তাদের বর্জনও করেনি।
অন্যান্য মেহনতী মানুষদের অবস্থা সংক্রান্ত বিষয়েও ট্রেড ইউনিয়নগুলি আবার নিশ্চুপ। সবচেয়ে খারাপ হল কৃষক সমাজের অবস্থাগুলি সম্পর্কে তাদের সংগ্রাম সম্পর্কে তাদের কোনরূপ আগ্রহের অভাব।
এই দৃষ্টিভঙ্গী না বদলাতে পারলে শ্রমিকশ্রেণি তার ভূমিকা পালন করতে পারবে না এবং জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবও সফল হতে পারবে না। শ্রমিকশ্রেণির প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার বিষয়ে আমরা চেষ্টা শুরু করব কি ভাবে?
শ্রমিকশ্রেণি ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন যে নির্দিষ্ট পরিস্হিতিটির মধ্যে রয়েছে এবং যা তাকে প্রাথমিক চেতনায় সচেতন করে তুলেছে ওই অবস্থাটির বিবেচনা দিয়েই আমাদের পার্টি তার এই চেষ্টা শুরু করে। শ্রমিকশ্রেণি ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ না করলে তার চেতনার স্তর উপরে উঠতে পারে না। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনটা কতকগুলি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী মতাদর্শ বিশিষ্ট সংগঠন বিভক্ত। শুরুতেই অন্ততঃ প্রাথমিক অর্থনৈতিক সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির ঐকা অবশ্যই স্থাপন করতে হবে যাতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে পরে রাজনৈতিক দিকে অগ্রগতি ঘটতে পারে। সুতরাং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হচ্ছে ক্রমবর্ধমান ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্যের মারফত শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলার জন্য। অর্থনৈতিক দাবিতেই যদি শ্রমিকশ্রেণি ক্রমশ বেশি করে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে তা হলে জনগণকে নেতৃত্ব দেবার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্য শ্রমিকশ্রেণিকে সুসজ্জিত করে তোলার কথাটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
পার্টির নীতিগত বক্তব্যে সঠিকভাবেই ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্য স্থাপনের জরুরি প্রয়োজনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। “পার্টিকে শ্রমিকশ্রেণির ঐক্য গড়ে তুলতে হবে হবে এবং আমাদের সমগ্র জনগণ সম্পর্কে তার কর্তব্যগুলির বিষয়ে তাকে সচেতন করে তুলতে হবে। যথাসম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে সব রকম প্রচেষ্টার দ্বারা শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামগুলির বিকাশের পথে বাধাস্বরূপ শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে যে বিভেদ বর্তমানে রয়েছে তা দূর করতে হবে এবং শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ গণসংগঠনগুলি গড়ে তুলতে হবে।"
বিপ্লবী সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক ভূমিকার বিকাশের সঙ্গে যে ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্যের প্রশ্নটি যুক্ত, তা উপলব্ধি করে, আমাদের পার্টি ও আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ধৈর্যের সাথে ক্রমাগত ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্য গড়ে তোলার সংগ্রামটি চালিয়ে যাচ্ছে। আর তার সবিশেষ ফলও পাওয়া গেছে। এই কারণে শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামটি আরও জোরদারভাবে চালাতে হবে।
তবে এই অগ্রগতির সীমা হল এইখানে যে, মোটামুটিভাবে এটা হল অর্থনৈতিক স্তরে ঐক্য স্থাপন। শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামটা এই গণ্ডীর বাইরে যায়নি বললেই চলে।
দ্বিতীয়ত ট্রেড ইউনিয়ন মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের বিষয়টি ট্রেড ইউনিয়নে আমাদের পার্টির নেতারা গুরুত্বের সাথেই গ্রহণ করেছেন। এর ফলে শ্রমিক দের মধ্যে আমাদের অনুগামী অংশটির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ছে। পশ্চিমবলো, কেরালায় ও ত্রিপুরায় লাখ লাখ শ্রমিক আমাদের পার্টিকে ভোট দেন। তবুও আমাদের কাজকর্মের প্রকৃতির দরুন তাঁদের মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক চেতনার চাইতে উচ্চতর চেতনা সৃষ্টি করতে পারিনি।
পার্টি যাদের কাছে সরাসরি পৌছাতে পারে না সেই ব্যাপক অংশের শ্রমিকরা সহ সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে জাগ্রত করে তোলার কাজে ট্রেড ইউনিয়ন ঐকাটা হল একটা কার্যকর হাতিয়ার। শ্রমিকশ্রেণির বিস্তৃত আন্দোলন জনসাধারণকে প্রভাবিত করে এবং সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকে আরো ছড়িয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে ১৯৮২-র ১১ র ধর্মঘটের অভিজ্ঞতা পুরোপুরিভাবে বুঝতে হবে। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে এটা ছিল একটা অভূতপূর্ব ধর্মঘট। ন্যাশনাল ক্যাম্পেন কমিটির হিসাব অনুযায়ী (যার মধ্যে সি আই টি ইউ এ আই টি ইউ সি, এইচ এম এস, বি এম এস ছিল), তাতে অংশগ্রহণকারী শ্রমিক কর্মচারীদের সংখ্যা ১ কোটির কম ছিল না। সরকার ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছিল। ধর্মঘটের দাবিগুলির মধ্যে ছিল কৃষক সমাজের দাবি, খেতমজুরদের দাবি এবং গণতন্ত্রবিরোধী আইনগুলি প্রত্যাহারের দাবি।
লক্ষ্য করার মত বিষয়টা হল, ধর্মঘটের মতো বারংবার পরীক্ষিত অস্ত্রটা ব্যাপকমাত্রায় ব্যবহার করা হলে তার ফলে অন্যান্য অংশের মানুষরাও জেগে ওঠেন। বিরোধী দলগুলির দ্বারা সমর্থিত ধর্মঘট কোনো কোনো স্থানে পুরো বনধে পরিণত হয়েছিল এবং তাতে ছাত্র দোকানদার ও বিভিন্ন পেশার মানুষরা সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন। কোনো কোনো স্থানে হাজার হাজার কৃষক তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যেখানে আমাদের পার্টি শক্তিশালী নয় এমন জায়গাতেও, যেমন বিহারে, এরকম ঘটনা ঘটেছিল।
কৃষক ও জনসাধারণের দাবিতে সোচ্চার হওয়াটা প্রতীকী হতে পারে। এটা কখনোই শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিপ্লবী চেতনার ইঙ্গিত দেয় না। তবুও এটা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিভিন্ন মতাদর্শবিশিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলির দ্বারা ওইসব দাবি েযে গৃহীত হয়েছিল তা ছিল এ যাবৎ জনসাধারণের যে সব অংশের কাছে কখনও যাওয়া যায় নি তাদের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতির প্রবেশের পরিচায়ক। ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্যের জন্যে সংগ্রামের গুরুত্বটি এইখানে। এটা যে শুধু জাতীয় রাজনীতিতে শ্রমিকশ্রেণির ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের এবং জনগনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার সাথে জড়িত তা নয়, এটা সরাসরি শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সংগ্রামের সাথে জড়িত।
এই ঐক্যকে যদি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে কোন সম্ভাবনা দেখা দেবে? দেখা দেবে গণতন্ত্র এবং কৃষক সমাজের স্বার্থরক্ষায় সামগ্রিকভাবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা। যদি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথে এবং কৃষক সমাজের দাবিগুলির স্বপক্ষে এই ঐক্যকে রক্ষা করা এবং প্রয়োগ করা যায় তাহলে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক ভূমিকা বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করার পথে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন নতুন মোড় নেবে।
ট্রেড ইউনিয়ন ঐক্যের জন্যে সংগ্রামে পার্টিকে দু’টি উদ্দেশ্য অনুসরণ করে চলতে হবে। পার্টি সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত এবং অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠণগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ ঐক্য বজায় রেখে কাজ করার সাথে সাথে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে চেষ্টা করতে হবে সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে যেন তার নিজের দাবিগুলির তেমনি কৃষক সমাজের এবং জনগনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির স্বপক্ষে সক্রিয় আন্দোলনে টেনে অঅনতে। আর নিজস্ব রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলনের মারফৎ পার্টিকে চেষ্টা করতে হবে ্ওই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে হাজার হাজার সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর চেতনাকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় পরিণত করতে।
ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলির ঐক্যবদ্ধ সংস্থা ন্যাশনাল ক্যাম্পেন কমিটির দুটি কনভেনশনের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, গণতান্ত্রিক দাবির সংগ্রামে সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে অংশগ্রহণ করানোর চেষ্টা দ্রুত ফলবতী হতে পারে। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলির মধ্যে এই বিষয়ে ক্রমবর্ধমান মতৈক্য দেখা যাচ্ছে যে, ওইসব দাবিতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের হস্তক্ষেপ করা উচিত। ন্যাশনাল ক্যাম্পেন কমিটির দ্বিতীয় কনভেনশনে গৃহীত প্রস্তাবে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলা হয়েছে: “শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম হল সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই একটা অংশ, বোম্বাই কনভেনশনে ঘোষিত এই বুনিয়াদী দৃষ্টিভঙ্গীর গুরুত্ব ও সঠিকতা জাতীয় সম্মেলন পুনরায় অনমোদন করছে। শ্রমিকশ্রেণিকে কৃষক সমাজের এবং খেতমজুরদের দাবিগুলির সাথে জনসাধারণের অন্যান্য শোষিত ও নিপীড়িত অংশের দাবিগুলিকেও জোরালোভাবে সমর্থন করতে হবে।"
নিজের আশু দাবিগুলির জন্য লড়াই করা ছাড়াও শ্রমিকশ্রেণির আরো কি কি করা উচিত, এটা অবশ্য তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মাত্র। এই উপলব্ধিটাকে কাজে পরিণত করতে হবে এবং সে কাজের দায়িত্ব এসে পড়েছে ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্বের উপর। ন্যাশনাল ক্যাম্পেন কমিটি সদস্যরা কৃষক ও খেতমজুর সংগঠনগুলির সাথে যুক্ত হয়ে শ্রমজীবী মানুষের এই দুটি অংশের সমস্যা নিয়ে এবং সংগঠিত আন্দোলনের পক্ষ থেকে তাদের কিভাবে সাহায্য করা যায় তা নিয়ে আলোচনার জন্য মিলিত হন তা হলে সেটা হবে এক বিরাট বড়ো পদক্ষেপ।
আমাদের পার্টি ও আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের উদ্যোগে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সঠিক দিকেই চলেছে বটে, কিন্তু বড়োই ধীরে। যে গতিতে তা এগোচ্ছে সেটা শ্রমিকশ্রেণির উপর অন্যান্য নিপীড়িত অংশের আস্থা উদ্দীপিত করার পক্ষে মোটেই যথেষ্ট নয়।
রণকৌশলগত দলিলে সঠিকভাবেই বলা হয়েছে: “এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিত দাবি করে শ্রমিকশ্রেণি এবং কৃষক সমাজের ঘনিষ্ঠতম মৈত্রী এবং শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের বাস্তব রূপায়ন। শ্রমিকশ্রেণির ধারা কৃষক সমাজের দাবিগুলির প্রতি প্রবল সমর্থন, মিছিল ও ধর্মঘটের দ্বারা কৃষক সমাজের সংগ্রামগুলির প্রতি শ্রমিকশ্রেণির সরাসরি সমর্থন প্রভৃতির মতো কাজগুলির মধ্য দিয়ে এই মৈত্রী গড়ে উঠবে। কেবলমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই নয়, সর্বোপরি সমগ্র জনসাধারণকে উদ্দীপিত করার জন্য, তাদের বিক্ষোভকে সুনির্দিষ্ট রূপে দেবার জন্য. আন্দোলনের মধ্যে তাদের ঐক্য গড়ে তোলার জন্য এবং গণ-আন্দোলনকে উচ্চতর স্তরে উন্নীতকরার জন্য- কৃষক সমাজের দাবি ও সংগ্রামগুলির সমর্থনে শ্রমিকশ্রেণির প্রত্যক্ষ গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব বাস্তবে রূপায়িত হবে।”
আমরা এই জায়গাটিতেই যেতে চাই। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান ব্যাপকতর ঐক্যের সহায়তায় এই হল পার্টির সামনে কর্তব্য। শ্রমিকশ্রেণিকে দিয়ে তার নিজস্ব ভূমিকা পালন করাতে হলে পাটিকে বিরামহীন ভাবে এই দিকে কাজ করতে হবে।
কিন্তু শ্রমিকশ্রেণি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরী করছে বলে পার্টি অন্যান্য নিপীড়িত অংশের মানুষের দাবিগুলির বিষয়ে চুপ করে বসে নেই। শ্রমিক কৃষক মৈত্রীকে মূল ভিত্তি করে জনগণতান্ত্রিক মোর্চা গড়ে তুলতে হবে, এই হল গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সাফল্য লাভের জন্য আমাদের কেন্দ্রীয় শ্লোগান। সুতরাং পার্টি সবাইকে সংগ্রামের সাধারণ ক্ষেত্রে টেনে আনার জন্য সমস্ত অংশের মধ্যেই, তাদের গণসংগঠনগুলি মধ্যে কাজ করে যেতে হবে। কৃষক, ছাত্র, নারী, খেতমজুর ও সমাজের অন্যান্য যে সব অংশের স্বার্থ' বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে জড়িত পার্টি তাদের সকলকেই সংগঠিত করছে। এদের যে গণসংগঠণগুলিতে পার্টি সদস্যরা কাজ করে তারা এদের চেতনা বাড়াতে সাহায্য করছে, সাহায্য করছে এদের সাধারণ সংগ্রামের পথে এগিয়ে যেতে যা সাহায্য করতে পারে জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনে।
শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটা হল জনসাধারণকে বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্ব থেকে উদ্ধার করার সংগ্রাম, বুর্জোয়াশ্রেণির প্রভাব ক্ষুণ্ন করার সংগ্রাম, বুর্জোয়া শ্রেণির দ্বারা সৃষ্ট মোহনগুলির ভেঙে দেওয়ার সংগ্রাম। এ ক্ষেত্রে পার্টি তার কাজ শুরু করে সুনির্দিষ্ট ঘটনা ও তথ্য নিয়ে এবং আকাঙ্ক্ষিত ফল লাভের সুনির্দিষ্ট রণকৌশল রচনা করে।
যে জনগনকে জনগণতান্ত্রিক মোর্চার মধ্যে এবং শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বের অধীনে আনতে হবে, জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলার ও শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্ব গড়ে তোলার সংগ্রামে পার্টি সেই জনগণের বর্তমান রাজনৈতিক আনুগত্যগুলির কথা বিবেচনা করে। পার্টির জলন্ধর ও বিজয়ওয়াড়া কংগ্রেসে বলা হয়েছিল আমাদের জনগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এখন পর্যন্ত আনুগত্যের দিক দিয়ে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির মধ্যে বিভক্ত, তারা ওই পার্টিগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাদের ভোট দেয়। পার্টি কংগ্রেসগুলি থেকে জনগণের মধ্যে শক্তি সাম্যের পরিবর্তন ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল, ক্রমেই বেশি সংখ্যায় মানুষকে বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে, সমস্ত বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে।
কিন্তু সে কোন শক্তি যাকে নিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করা যায় সে কোন শক্তি যা এখন পর্যন্ত সর্বহারা মতাদর্শ এবং দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ না করলেও যাকে দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সূত্রপাত ঘটতে পারে? বিভিন্ন বামপন্থী পার্টিগুলি হল সেই শক্তি। বামপন্থী শক্তিগুলির ঐক্য হল বর্তমানে বুর্জোয়া পার্টিগুলির দিক থেকে যারা সরে আসছে সেই সব শক্তিগুলির সর্বাধিক সমাবেশ। আমাদের পার্টি'র জলন্ধর কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হয়েছে: “যে পরিস্থিতিতে মানুষ কেবল দুটি বুর্জোয়া-জমিদার পার্টির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে পারে এবং বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই বন্দী থেকে যেতে পারে, এই ফ্রন্ট গঠনের জন্য সংগ্রামটা হল সেই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আমাদের চেষ্টার একটি অংশ।”
শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে জনগণতন্ত্রের জন্য মৈত্রী গড়ে তোলার কাজে ভবিষ্যতে যারা অংশগ্রহণ করবে, সমস্ত বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে একত্রিত করার দ্বারা পার্টি ওই সমস্ত শক্তিগুলিকে সংহত করার কাজটি শুরু করছে।
এখানে দুটি ধারণা বর্তমান রয়েছে। একটি হল, আন্দোলনে সক্রিয় জনগণ, যে জনগন ভবিষ্যতে বিপ্লবের চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। দ্বিতীয়ত, এই জনগন বিভিন্ন বামপন্থী দলের পরিচালিত, তার অর্থ হল তার অনুগামী জনগন কমবেশি পরিমাণে চিরাচরিত বুর্জোয়া-জমিদার পার্টিগুলির কবল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি ক্রমেই বেশি করে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।
এই বামপন্থী পার্টিগুলি, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি, বুর্জোয়া পার্টিগুলির প্রভাব থেকে তাদের সরে আসার প্রাথমিক পর্যায়ে এখনও সর্বহারার মতাদর্শের দ্বারা সুসজ্জিত নয়. তারা এখনও সর্বহারার নেতৃত্বকারী ভূমিকাটি কিংবা তার পার্টির ভূমিকাটি মানে না। এই কারণেই পার্টির বিজয়ওয়াড়া কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির ঐক্যের জন্য সংগ্রাম আরম্ভ হচ্ছে এমন একটা অবস্হায় যেখানে সি পি আই (এম) কিংবা শ্রমিকশ্রেণি একটা নেতৃত্বের অবস্থান আয়ত্ত করেনি। পার্টি তার কাজকর্মের দ্বারা ওই অবস্থানটিতে যাবার চেষ্টা করছে। সুতরাং বামপন্থী শক্তিগুলির মধ্যে আমাদের ধারাবাহিক ও সুসংগতভাবে উদ্যোক্তা ও সংগঠনের ভূমিকা নিতে হবে।
সুতরাং বর্তমান পর্যায়ে পার্টি বাম ঐক্যের উপর, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির ঐক্য বিকশিত ও সম্প্রসারিত করার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করছে। গণসংগ্রামগুলির সঙ্গে, পার্টির আরেকটি মূল্যবান অস্ত্রও রয়েছে- তা হল আমাদের পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত বামফ্রন্ট মন্ত্রী সভাগুলির কাজকর্ম। ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও জনগণের উপর তা প্রভাব বিস্তার করছে এবং বামপন্থী ঐক্যের পিছনে গণ-সমর্থন গড়ে তোলার জন্য পার্টির প্রচেষ্টাকে সাহায্য করছে, সাহায্য করছে শ্রেণিশক্তিগুলির ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটাতে।
বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সামনে পার্টি যে কর্মসূচী রেখেছে সেটা হল সমস্ত বুর্জোয়া-জমিদার পার্টিগুলির কর্মসূচীর বিরোধী কর্মসূচী, সে কর্মসূচী জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্টে যারা ঐক্যবদ্ধ হবে সেই সব শ্রেণিগুলিকে সক্রিয় করে তোলার জন্য বামগণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছে।
সফল বিপ্লবগুলির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিপিআই(এম) একথা উপলব্ধি করে যে, শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবী সংগ্রাম ছাড়া আমাদের কৃষক সমাজের মুক্তি সম্ভব নয়, দারিদ্র্য ও নিঃস্বতা থেকে আমাদের জনগণের মুক্তি সম্ভব নয়, সমাজতন্ত্র সম্ভব নয়, সম্ভব নয় সমস্ত শোষণের অবসান এবং দেশের সমৃদ্ধিশালী বিকাশ। পার্টি জানে এই পথে অনেক বাধা-বিপত্তি আছে- শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে পার্টির দুর্বল অবস্থা এবং নিজ ভূমিকা পালনে শ্রমিকশ্রেণির অপ্রস্তুত অবস্থা তার অন্যতম। এই দুর্বলতাগুলি কাটিয়ে উঠতে পার্টি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ : কারণ প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলি, সাম্রাজ্যবাদ, প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শগুলি, বিভেদকামী শক্তিগুলি ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাগুলি সকলেই দেশটাকে অভিভূত করে ফেলার জন্য এবং দারিদ্র্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে অবরুদ্ধ করা জন্য একযোগে চেষ্টা করছে।
এই পরিণতি এড়ানোর জন্য চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে ও নিজ ভূমিকা পালনে সম্মত করতে শ্রমিকশ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ জনগণকে করতেই হবে। একইসঙ্গে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যেই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার জন্য সমস্ত অংশের মানুষেকে উদ্দীপিত করে তুলতে হবে।
প্রকাশের তারিখ: ০৩-নভেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
