Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অশান্ত ইরানকে বোঝার ৬টি বিষয় (প্রথম পর্ব)

বিজয় প্রসাদ
সেই ১৯৭৯ সাল থেকে আরব ও মুসলিম দুনিয়ায় রাজতন্ত্র উচ্ছেদের বাইরেও আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইরান। প্যালেস্তিনীয়দের সংগ্রামেরও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ইরান। ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের বিরুদ্ধে নানা উপায়ে একটানা যুদ্ধ চলছে। ইরানের বিক্ষোভে ইজরায়েলের গোয়েন্দাদের ভূমিকা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খোলাখুলি প্রতিবাদীদের বলেছে যদি সরকারের তরফে হিংসা বাড়ে তাহলে আমেরিকা তেহরানে বোমাবর্ষণ করবে।
Six Points to Navigate the Turmoil in Iran Part I

ইরান অশান্ত। দেশজুড়ে নানা মাত্রায় চলছে প্রতিবাদ। হিংসা বেড়েই চলেছে। প্রতিবাদী ও পুলিশ, উভয়েরই দেহ পড়ে রয়েছে মর্গে। প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল কাজ বন্ধ করে। শুরু হয়েছিল মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরও নানা অসন্তোষ। প্রতিবাদে সামিল মহিলা ও তরুণেরা। কারণ তারা জীবনধারণের নিরাপত্তা পাচ্ছে না। সরকার তাদের এই সমস্যার সমাধান করতে পারছে না।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ। ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই দেশের ওপর হামলা চালিয়েছে। শুধু সীমান্তের ভেতরেই নয়। ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চলেছে গোটা পশ্চিম এশিয়া জুড়ে (হামলা হয়েছে সিরিয়ায় ইরানের কূটনৈতিক এনক্লেভে)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এই যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে তারই জেরে এই অস্থিরতা। তবে এখন এই অস্থিরতার লক্ষ্য ওয়াশিংটন নয়, লক্ষ্য দাঁড়িয়ে গেছে তেহরানের সরকার।

ইরানের ঘটনা নিয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট রয়েছে। যেমন, মূল ধারার ইজরায়েলি সংবাদপত্র হারেত্‌জ-এ ২০২৫-এর অক্টোবরে রিপোর্ট ছিল, “রেজা পহলভিকে ইরানের শাহ হিসেবে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আন্দোলনকে প্রভাবিত করছে ইজরায়েল।” ইরানের বিক্ষোভে ইজরায়েলের গোয়েন্দাদের ভূমিকা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খোলাখুলি প্রতিবাদীদের বলেছে যদি সরকারের তরফে হিংসা বাড়ে তাহলে আমেরিকা তেহরানে বোমাবর্ষণ করবে।


২০২৩ সালে ইজরায়েল সফরে রেজা পহলভি

গত বছর প্রতিবাদ সংগঠিত করা হয়েছিল সাউথ পারস তেল শোধনাগারে। সেখানে আসালুয়েহ-র বুশেহর গ্যাস রিফাইনারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ৫০০০ চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক ৯ ডিসেম্বর তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পথে নেমেছিলেন বেশি মজুরি ও ভালো কাজের পরিবেশের দাবিতে। যখন শ্রমিকেরা তেহরানে জাতীয় পার্লামেন্টে পৌঁছন, তখন তারা দাবি করেন চুক্তিপ্রথা বাতিল করতে হবে। এই প্রতিবাদ কর্মসূচির সুযোগ নেয় ইজরায়েল ও আমেরিকা। তারা বৈধ এই লড়াইকে রাজনৈতিক জমানা বদলে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে।

ইরানে ঠিক কী ঘটছে বুঝতে হলে, ঐতিহাসিকভাবে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এগুলো আলোচনার বিষয় হিসেবেই দেখতে হবে। সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, আরব ও মুসলিম দুনিয়ায় রাজতন্ত্র উচ্ছেদের বাইরেও আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইরান। প্যালেস্তিনীয়দের সংগ্রামেরও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ইরান। ইরানে বিদেশি হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ১৯০১ সাল থেকে ইরানের তেলের দখল নিয়েছিল ব্রিটেন। ১৯০৭-এর ইঙ্গ-রুশ কনভেনশনে ইরানকে নিজেদের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে ভাগ করে নিয়েছিল। ১৯২১-এর অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে রেজা খান ইরানের সিংহাসনে বসেন। ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মহম্মদ রেজা শাহ পহলভি। এবং তারপর থেকে একটানা ১৯৭৯ সালের ইরানের বিপ্লবের বিরুদ্ধে নানা উপায়ে যুদ্ধ চলছে।

এখানে ৬টি পয়েন্ট উল্লেখ করা হলো:

১। ১৯৭৮–৭৯ সালের ইরানের বিপ্লব শাহ রেজা পহলভীর জমানাকে উচ্ছেদ করে। ধর্মগুরু এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন শক্তিশালী হওয়ার কারণে ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান গৃহীত হয়। বিপ্লবের অন্য ধারাগুলি (বাম কমিউনিস্ট থেকে লিবারালরা) মূলত হীনবল হয়ে পড়ে এবং এমনকি কিছু এলাকায় নির্যাতনেরও মুখে পড়ে। মহিলাদের অধিকারের ওপর লাগাম পরানোর জেরে তেহরানে ১৯৭৯ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তীব্র প্রতিবাদ হয় (বিশেষ করে প্রতিবাদ হয়েছিল বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরার বিরুদ্ধে)। প্রতিবাদ এতটাই তীব্র ছিল যে সরকার বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে এই জয় ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৮৩ সাল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরার আইন চালু হয়েছিল।


১৯৭৯ সালের বিক্ষোভ 

২। ইরানের বিপ্লবের আগে ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। (১৯৭৮ সালের আগস্টে) ঘটেছিল আফগানিস্তানের সাওর বিপ্লব। (১৯৭৮ সালের অক্টোবরে) তৈরি হয় ইয়েমেনি সোশালিস্ট পার্টি এবং এই দল পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেনকে নিয়ে যায় সোভিয়েত শিবিরে। এর জেরে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায় (১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি–মার্চ)। ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে সাদ্দাম হুসেন ইরাকে ক্ষমতা দখল করেন। সেই সময় সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া নানা ধরনের রাজনৈতিক ওলটপালটের মধ্যে পড়ে যায়। এর মধ্যে কিছু ঘটনা (পাকিস্তান ও ইরাক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে আসে। আবার (আফগানিস্তান, ইরান ও ইয়েমেন)-এর ঘটনাবলি ওই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থবিরোধী ছিল। খুব দ্রুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সুবিধাগুলি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র, পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব আফগানিস্তানকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে।

৩। এই সব প্রক্রিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শেষে উল্লেখ করা তিনটি দেশেই যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আমেরিকা ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা সাদ্দাম হুসেনকে বলে ইরানে হামলা চালাতে। কোনো রকম উসকানি ছাড়াই ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের ওপর হামলা চালায় ইরাক। এর জেরে যে যুদ্ধ শুরু হয় তা চলে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। উপসাগরীয় আরব দেশগুলি উত্তর ইয়েমেনকে উসকে দেয় দক্ষিণ ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য। এর আগে হত্যা করা হয়েছিল সালিম রুবাইয়া আলিকে। তিনি ছিলেন একজন মাওবাদী যিনি দুই ইয়েমেনের মিল যাওয়ার আলোচনা চালাচ্ছিলেন। এবং সবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে টাকা দিতে শুরু করল মুজাহিদিনদের। মার্কিন মদতে তারা পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তানের ক্যাডারদের গোপনে হত্যা করতে শুরু করল। দেশের বাইরে থেকে হামলার কারণে ইরান, আফগানিস্তান ও ইয়েমেন দেখল তাদের সামাজিক প্রকল্পের কাজ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। আফগানিস্তানে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক টিকেছিল ১৮ বছর। তবে একই সঙ্গে চার দশকেরও বেশি সময় আফগানিস্তান ডুবে রইল ভয়ঙ্কর হিংসা ও যুদ্ধের মধ্যে।


সালিম রুবাইয়া আলি

১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল দক্ষিণ ইয়েমেনের মার্কসবাদী সরকার। তবে তাদের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, দক্ষিণ ইয়েমেনের মার্কসবাদী সরকার ছিল তার একটা বিবর্ণ ছায়ামাত্র। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের পর্ব পেরিয়ে টিকে রইল ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এই অবরোধ শুরু হয় (১৯৮৮ সালে) ইরাকের শুরু করা ইরান-বিরোধী যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর।

৪। তবে টিকে থাকলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা এল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিক থেকে। তারা ইরাককে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিল। যারা ইরানের প্রাক্তন অভিজাত শ্রেণি তাদেরও মদত দিল পুরোনো জমানা ফিরিয়ে আনার জন্য। এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে হীনবল করার জন্য ইজরায়েলের প্রয়াসে মদত দিল (এর মধ্যে ছিল ইরানে সরাসরি হামলা, নাশকতামূলক কাজকর্ম করা, দেশের সেরা বিজ্ঞানী ও সামরিক জগতের শীর্ষস্থানীয়দের হত্যা করা)।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই অঞ্চলে ইরানকে দুর্বল করে তোলার জন্য। তারা ২০২৪ সালে জেনারেল কাসেম সোলেমানিকে হত্যা করেছে। ইজরায়েলি গণহত্যা পর্বের সময় হেজবুল্লাহদের ওপর কঠোর হামলা চালিয়েছে। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে সিরিয়ার সরকারকে উচ্ছেদ করেছে। এবং দামাস্কাসে প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছে প্রাক্তন আল-কায়েদা প্রধানকে।

শেষ পর্ব আগামীকাল 

ঋণ: পিপলস ডিসপ্যাচ
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস 


প্রকাশের তারিখ: ২৪-জানুয়ারি-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬