সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যুদ্ধের বিপদ: আমাদের দায়িত্ব
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
যদিও সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ প্রচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি। কিন্তু, অপরপক্ষে বলা যেতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্ব মানবতাকে সচেতন করার চেষ্টা যেমন চালিয়েছে, তেমনি সাম্রাজ্যবাদীদের সামরিক একাধিপত্যকে খর্ব করার জন্য স্বাভাবিকভাবে তাদেরও সামরিক প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হয়েছে, যে প্রস্তুতির প্রধান লক্ষ্য হ'ল 'আত্মরক্ষামূলক' 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান' এবং 'আঁতাতের' প্রস্তাবকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বানচাল করে দিয়ে যখনই ঠাণ্ডা যুদ্ধের মহড়া শুরু করেছে তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ- গুলিকেও অনিবার্যভাবেই তাদের অর্থনীতির খানিকটা ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করেও সামরিক প্রস্তুতিকে জোরদার করতে হয়েছে।

"ছোট মালিকদের শ্রমের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, স্বাধীন প্রতিযোগিতা, গণতন্ত্র প্রভৃতি বিভিন্ন মুখরোচক কথার আড়ালে পুঁজিপতিরা ও তাদেত প্রেস, শ্রমিক ও কৃষকদের যা ব'লে বঞ্চনা করতো তা এখন সুদূর অতীতের বিষয় হয়ে গেছে। পুঁজিবাদ এখন ঔপনিবেশিক দমননীতির বিশ্ব-ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে যা কিছু 'অগ্রসর' দেশ কর্তৃক সারা পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে জড়িয়ে রেখেছে আর্থিক ফাঁসে। আর এই লুঠের ভাগ, ভাগ করে নিচ্ছে বিশ্বের দু'তিনটি লুণ্ঠনকারী রাষ্ট্র (আমেরিকা, গ্রেটব্রিটেন, জাপান) যাদের আপাদমস্তক অস্ত্রে সজ্জিত, যারা সারা পৃথিবীকে তাদের এই লুঠের ভাগ করার লক্ষ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলছে।" (সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর" গ্রন্থের ভূমিকায় লেনিন)।
লেনিন যখন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মার্কসবাদী ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন তখন দুনিয়ার মানুষ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিধ্বংসী রূপকে শুধু প্রত্যক্ষ করেছেন। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজরা যুদ্ধের অন্তর্নিহিত কারণ হিসাবে পুঁজিবাদ ও তার লুঠের বাস্তবতাকে গোপন ক'রে উগ্র জাতীয়তাবাদের সাহায্যে যুদ্ধকে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা করছিল তখন লেনিনই প্রথম যুদ্ধের পেছনে প্রকৃত রসহস্যকে উন্মোচিত করেন, বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনকে হুঁশিয়ার করেন এবং "সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করার" বৈপ্লবিক তত্ত্ব উপস্থিত করেন। কিন্তু দুটি দশক অতিক্রম করতে করতেই সারা পৃথিবীকে আর একটি বিশ্ব যুদ্ধের সম্মুখীন হ'তে হলো। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধেরও পেছনে ছিল সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলির দেশকে নতুন করে ভাগ বাঁটোয়ারা করার লক্ষ্য। ফ্যাসিবাদের আবির্ভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে এই বিশ্ব যুদ্ধ স্বভাবতই আরও হিংস্র চেহারা নিয়ে এল। আধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার, ব্যাপক সম্পদ হানি, লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু যার পরিণতি হলো হিরোসিমা নাগাসাকীতে এ্যাটম বোমার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হলো। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্হা দুর্বল হলো, সমাজতন্ত্র ও জাতির মুক্তি আন্দোলনের শক্তিগুলির পক্ষে ভারসাম্য পরিবর্তিত হলো।
'কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধের বিপদ'-লেনিনের এই আপ্ত বাক্যটি স্মরণ ক'রে বলা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল হলেও সেখানে নতুন ক'রে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে শুরু করলো এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সাম্রাজ্য- বাদী শিবিরের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হলো, দুনিয়ার সমস্ত মানুষের পয়লা নম্বরের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হলো। ১৯৫৭ সালে ও ১৯৬০ সালে কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিগুলির যুক্ত ঘোষণা পত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকেই বিশ্বের বৃহত্তম 'আন্তর্জাতিক শোষক' ও 'দুনিয়ার পয়লা নম্বরের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
বর্তমান দুনিয়ার এক-তৃতীয়াংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। স্বভাবতই সেখানে সাম্রাজ্যবাদের শিবিরে শোষণের চির অবসান ঘটেছে। তাই তাকে প্রধানত নির্ভর করতে হচ্ছে তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতে নয়াউপনিবেশবাদের নীতির মাধ্যমে। কিন্তু তা' সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদের অর্থনীতি আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। মন্দা, বেকারী, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানী সমস্যা, ডলার সংকট এ সব কিছু থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এবং এই সংকট থেকে পরিত্রাণের পথ হিসাবে তার সামনে খোলা রয়েছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকাল থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ক্রমশই নিজেকে অস্ত্র সজ্জায় সজ্জিত করে তুলছে এবং সমস্ত দুনিয়ায় যুদ্ধের প্ররোচনা দিচ্ছে ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বাধিয়েছে। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে প্রায় ২১৫ বার সে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। তার মধ্যে কয়েকটি মূল ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৫৪ তে সি আই এ ও আমেরিকান বিমান বাহিনী গুয়াতেমালায় সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে। ১৯৫৮তে চোদ্দ হাজার মার্কিন নৌ-সেনা লেবাননে বিপ্লবী আন্দোলনকে ধ্বংস করতে সৈন্য নামায়। ১৯৬১তে কিউবাতে সামরিক অভিযান চালায়। ১৯৬২ থেকে '৭২ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনাম, কাম্পুচিয়া ও লাওসে সামরিক অভিযান চালায় এবং ব্যর্থ হয়। ১৯৬৫তে ডোমিনিকান রিপাবলিকে অভিযান চালায়, প্রতি বিপ্লবী শক্তিকে ক্ষমতায় বসায়। ১৯৭৩-এ চিলিতে জনপ্রিয় সরকারের পতন ঘটিয়ে ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থান ঘটায়। বলা বাহুল্য, এই অভিযান অব্যাহত আছে। দক্ষিণ আমেরিকায় গুয়াতেমালা, এল সালভাডোরে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে, নিকারাগুয়ায় প্ররোচনা দিচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সমর্থনে নামিবিয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। অ্যাঙ্গোলা মোজাম্বিকে প্ররোচনা সৃষ্টি করছে। ইজিপ্ট এবং সুদানকে হাতে নিয়ে মধ্য প্রাচ্য, আফ্রিকাতেও অনুপ্রবেশ করছে। ইজরায়েলকে মদত দিয়ে সেনাই দখলে রেখেছে। পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে, তাইওয়ানকে মদত দিচ্ছে। এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলির মাধ্যমে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে প্ররোচনার সৃষ্টি করছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধনীতি যে কোন সময়ই রক্ষণমূলক নয়, আক্রমণাত্মক তার প্রমাণ দুনিয়ার দেশে দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা। রেগান প্রশাসন পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের যে কোন ঘটনাতেই 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার' বিপদ দেখছে। বর্তমানে সারা বিশ্বের ৩২টি দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেড় হাজার সামরিক ঘাঁটি আছে।
আমেরিকার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত জাতীয় সামরিক ঘাঁটি, বিমানপোত এবং বন্দরের সংখ্যা।
মিশর- ৫ বিমান ঘাঁটি
ওমান- ৩ বিমান খাঁটি
সুমালিয়া- ১ বিমান ঘাঁটি, ১ নৌ ঘাঁটি
সৌদী আরব- ১ বিমান ঘাঁটি
কেনিয়া- ৩ বিমানপোত, ১ বন্দর
বাহারিন- ১ বিমানপোত, ১ বন্দর।
এরজন্য স্বভাবতই মার্কিন শাসনের যুদ্ধখাতে বাজেটের দ্রুত বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এই বাজেট বরাদ্দের জন্য মার্কিন অর্থনীতিতে যা প্রভাব পড়ছে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। তার অর্থনীতির সংকটকে আরো গভীরতর করবে। কিন্তু সামাজ্যবাদের নিয়মেই তারা যুদ্ধের মধ্যেই অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চাইছে। নিম্নলিখিত একটি লেখচিত্র (চার্ট) থেকে যুদ্ধ বাজেটের ক্রমবর্ধমান বিপদটি উপলব্ধি করা যায়।
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক শক্তির সম্পূর্ণ তথ্য না পাওয়া গেলেও যেটুকু জানা যায় তা হল নিম্নরূপ:-
আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র- ১,০৫৩
শক্তিশালী বোমারু বিমান-৬৩৭
পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রযুক্ত সাবমেরিন-৪০
বিমান বাহিনী-৮,৭৩৪
সাহায্যকারী বিমান-৪,৪৩৫
হেলিকপ্টার ও ছোট জঙ্গী বিমান-২,৫৩০
পদাতিক বাহিনী-২৪ ডিভিসন
নৌ সেনা-৪ ডিভিসন
সাহায্যকারী বাহিনী-৪০ ডিভিসন
কিন্তু শুধু নিজেরাই সজ্জিত হওয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ নয়। পৃথিবীর সব দেশেই সবচেয়ে বেশি যুদ্ধাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ তারা। একটি নমুনা দেখা যেতে পারে:-
সত্তর দশকে শুধু সৌদি আরব আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কিনেছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ইরান ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং ইজরায়েল ১১ বিলিয়ন ডলার। গ্রেটব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ৫ বিলিয়ন ডলার। মিশর, নেদারল্যান্ড, তাইওয়ান আর জাপান-৩ বিলিয়ন ডলার।
বলা বাহুল্য, ১৯৮১ সালে আমেরিকার রাষ্ট্রসচিব মিঃ হেগ ঘোষণা করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই সমস্ত রাষ্ট্রগুলিকে অস্ত্র বিক্রি করে যাদের সঙ্গে তাদের বৈদেশিক নীতির মিল আছে। আমেরিকার ২৫টি একচেটিয়া অস্ত্র কারখানার মালিক এর থেকে লাভও করে অজস্র কোটি টাকার মুনাফা। এই কোম্পানিগুলির মধ্যে কয়েকটি হ'ল- ম্যাকডোনাল্ড ডগলাস ইউনাইটেড টেকনো- লজিস্ট, জেনারেল ডায়নামিকস, বোয়িং এবং জেনারেল ইলেকট্রিক কর্পোরেশন প্রভৃতি।
সাম্প্রতিককালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ প্রস্তুতির কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপ ভূখণ্ড। তারা ন্যাটো জোটের দেশগুলিকে সঙ্গে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে বিশেষ যুদ্ধের মহড়া দিচ্ছে। "সীমিতভাবে পারমাণবিক যুদ্ধ"-এর সম্ভাবনার কথাও বলছে। সম্প্রতি নিউট্রন বোমার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছে। শুধু ইউরোপ ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত সাতশতাধিক বিমান তারা ইতিমধ্যেই জমায়েত রেখেছে এবং ন্যাটো জোটের অন্যান্য দেশগুলির হাতে আছে প্রায় ২৫০ জঙ্গী বিমান। সম্প্রতি ন্যাটো যুদ্ধ জোট কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পেরসিং ও ক্রুজ জাতীয় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে যথাক্রমে ১০৮ এবং ৪৬৪টি। যে-ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সোজাসুজি সোভিয়েত মূল ভূখণ্ডকে আক্রমণ করতে সক্ষম হবে। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক গুরুতর ঠাণ্ডা যুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রণনীতিগত দিক থেকে বিগত দশকেও পারমাণবিক যুদ্ধ সম্পর্কে সরাসরি এই বিপদ সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু বর্তমানে রেগান প্রশাসন তাঁদের যুদ্ধ প্রস্তুতির মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিচ্ছে না এবং সেইভাবেই ইউরোপে তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেছে। নিউট্রন বোমা সম্পর্কেও বলা যেতে পারে মার্কিনীদের যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যে এটুকুও তারা বাতিল করছে না ইউরোপ ভূখণ্ড এই বোমার কার্যকারিতা নিয়ে তাদের সামরিক বিশেষজ্ঞরা গবেষণার কাজও শেষ করেছেন, যে বোমা পৃথিবীর ভূখণ্ডের যে কোন জায়গাতে সমস্ত প্রাণের অস্তিত্বকে বিলোপ করে দিতে পারে চিরকালের মত। এসব কিছুই তারা করছে কাল্পনিক 'সোভিয়েতের আগ্রাসনের' বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারের ধূম্রজালের আড়ালে এবং সোভিয়েতের থেকে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের নামে।
যদিও সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ প্রচেষ্টার প্রধান লক্ষ্য বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি। কিন্তু, অপরপক্ষে বলা যেতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্ব মানবতাকে সচেতন করার চেষ্টা যেমন চালিয়েছে, তেমনি সাম্রাজ্যবাদীদের সামরিক একাধিপত্যকে খর্ব করার জন্য স্বাভাবিকভাবে তাদেরও সামরিক প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হয়েছে, যে প্রস্তুতির প্রধান লক্ষ্য হ'ল 'আত্মরক্ষামূলক' 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান' এবং 'আঁতাতের' প্রস্তাবকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বানচাল করে দিয়ে যখনই ঠাণ্ডা যুদ্ধের মহড়া শুরু করেছে তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ- গুলিকেও অনিবার্যভাবেই তাদের অর্থনীতির খানিকটা ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করেও সামরিক প্রস্তুতিকে জোরদার করতে হয়েছে। পাশাপাশি তারা শান্তির পক্ষেও লাগাতার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। যার ফল হিসেবে "সল্ট'-১ আলোচনার সূত্রপাত হয়, যে আলোচনাকে বর্তমানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বাতিল করে দিচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন একতরফাভাবে ইউরোপ অস্ত্রে মোতায়েন স্থগিত করা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তার প্রত্যুত্তরে কিছুই করেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন কোন অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র প্রথমে ব্যবহার করবে না-এই সুস্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তারও কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
দুর্ভাগ্যজনক হ'লেও চীনের সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ' তাদের ভ্রান্ত মূল্যায়নের ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ও তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শিবিরে অতীতের মতন স্থান করে নিতে পারছে না। চীনের সরকার যদিও 'ন্যাটো' যুদ্ধ জোটের সমস্ত আগ্রাসী নীতিকে পরোক্ষে সমর্থন করছে কিন্তু তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহের প্রশ্নে সঠিকভাবে মার্কিন বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করতে পেরেছে।
একথা আজ সুস্পষ্ট যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী চক্র সারা পৃথিবীতে যুদ্ধের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে। সাম্রাজ্য- বাদী অর্থনীতি যত জটিল হ'য়ে পড়ছে মার্কিন প্রশাসনও কুক্ষিগত হচ্ছে যুদ্ধবাজদের এক সংকীর্ণ' চক্রের হাতে। সারা দুনিয়ার ওপর খবরদারি করার ও প্রগতি গণতন্ত্র মুক্তি আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং মার্কিন পুঁজিকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা যুদ্ধ বাধাতে উন্মুখ। সারা দুনিয়ার যে কোন প্রগতিশীল আন্দোলনের বিরুদ্ধেই তারা 'মার্কিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন' এই অজুহাতে যুদ্ধাস্ত্র রপ্তানি করছে অথবা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করছে। আর যুদ্ধ বিরোধী শক্তি হিসেবে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াকে, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নকে, সে আক্রমণ করার বাস্তব পরিকল্পনা করছে।
কিন্তু সারা দুনিয়াতে যুদ্ধ বিরোধী শক্তিও আজ অনেক শক্তিশালী। এর প্রধান ভিত্তি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ও অন্যান্য সামাজতান্ত্রিক দেশগুলির সামরিক তৎপরতা, যা সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া ক্ষমতাকে ভেঙে দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ, জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলি সকলেই বিভিন্ন অবস্থান থেকে যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। কমিউনিস্ট ও বিভিন্ন বামপন্থী শক্তি- বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা, শান্তিবাদী, মহিলা, যুবসমাজ- সকলেই এই শান্তি শিবিরে এগিয়ে আসছেন। ইউরোপের সমস্ত রাজধানীগুলিতে খোদ মার্কিন মুলুকে সাম্প্রতিককালে তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিউট্রন বোমার বিরুদ্ধে, ইউরোপে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়োগের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এসবগুলি রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে কোণঠাসা করছে।
ভারত এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ক্রমশঃ এই যুদ্ধ পরিকল্পনার জালে জড়িয়ে পড়ছে। ভারত মহাসাগরের দরিয়াকে "শান্তির এলাকা" হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও এখানে মার্কিনীদের দৌরাত্ম ক্রমশ বাড়ছে। এর আগেই দুটি বিমানবাহী জাহাজসহ কুড়িটি যুদ্ধ জাহাজ, তিনটি পারমাণবিক সাবমেরিন এবং প্রায় দু'শোর মত বোমারু বিমান নিয়ে মার্কিনীরা এখানে আগেই ছিল। সম্প্রতি দিয়াগো গার্সিয়ায় নতুন নৌঘাঁটি তৈরি করার পর এই অঞ্চলে যুদ্ধের বিপদ বাড়ছে। এই নৌ-ঘাঁটিতে নৌসেনাদের স্থায়ী উপস্থিতি এবং আশেপাশে সমস্ত দেশগুলির উপর খবরদারি করার শক্তিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সঙ্গে পাকিস্তানের জঙ্গী শাসকদের এফ-১৬ বোমারু বিমান দেওয়ার সিন্ধান্ত গোটা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বলা বাহুল্য, ভারতের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মার্কিন পুঁজি ও মার্কিন 'সাহায্যের' চাপ ও ভারতের জাতীয় সংহতি বিপন্নতার পটভূমিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভারতের উপমহাদেশে যুদ্ধের বিপদ সম্পর্কে' আজ তাই প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। পাকিস্তানী মিলিটারী চক্রের হাতে মার্কিনী অর্থ ও অস্ত্রসজ্জা কোন মামুলি ঘটনা নয়। যে কোন মুহূর্তে উপমহাদেশের শান্তিকে তারা বিঘ্নিত করতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশ শান্তির এলাকা থাকছে না। এসব কিছুর বিরুদ্ধে এদেশের সর্বস্তরের মেহনতী মানুষের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যে শাসকশ্রেণী সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে, জনসাধারণের উপর অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সাম্রাজ্যবাদীদের পরোক্ষে সাহায্য করছে, তাদের ওপর দেশ রক্ষার দায়িত্ব নির্ভরযোগ্য নয়। দেশ রক্ষা করতে পারেন দেশের জনগণ। যাঁদেরও জীবনের শত্রু দুনিয়ার পয়লানম্বরের শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।
বিজয়ওয়াদায় অনুষ্ঠিত একাদশ পার্টি কংগ্রেসের যুদ্ধের বিরুদ্ধে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে- "একাদশ পার্টি কংগ্রেস সন্তোষের সাথে লক্ষ্য করছে যে, পৃথিবীর প্রগতিশীল শক্তি এই বিপদ উপলব্ধি করে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। শান্তির জন্য লন্ডন, ব্রাসেলস, রোম, বন, হেলসিংকিতে ব্যাপক বিক্ষোভ, মহিলাদের শান্তি মিছিল ও পৃথিবীর বিরাট শান্তি আন্দোলনের পটভূমিকায় যুদ্ধের দিকে স্রোতকে প্রতিহত করতে শ্রমিক- শ্রেণির জাগ্রত সংকল্প আগ্রাসীদের ওপর তার ইচ্ছাকে জাহির করতে পারে। রেগান প্রশাসনের অস্ত্র প্রতিযোগিতার নীতি মার্কিন জনগণকেই আর্থিক দুর্গতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে মার্কিন জনগণই এই নীতির প্রতিরোধ শুরু করেছেন। আমাদের সময়কার শান্তি আন্দোলন আসন্ন বিপর্যয়কে রোধ করতে পারে। এই বিপদের মোকাবিলা করা, জনগণের সামনে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার মুখোশ খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে সমস্ত শান্তিপ্রেমী ও সামাজ্যবাদ বিরোধী শক্তিকে সংগঠিত করা এদেশেরও শ্রমিক- শ্রেণির ও প্রগতিশীল অংশের জরুরি কাজ বলে একাদশ কংগ্রেস মনে করে।"
মার্কসবাদী পথ-এর এই সংখ্যাটি সংগ্রহ করতে পারেন আমাদের ওয়েবসাইটের আর্কাইভ সেকশান থেকে: মার্কসবাদী পথ, ১৯৮২ সাল, মে সংখ্যা
প্রকাশের তারিখ: ২২-আগস্ট-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
