Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

স্বপ্নের সেই অবিরাম ভাঙাগড়া

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
এটা তো খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, পুঁজিবাদী বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করবে, এবং সেটা তারা করেছেও। কিন্তু কেন? তাদের আপত্তিটা ছিল কোথায়? আপত্তি নয়, আসলে ছিল শঙ্কা। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক, কিংবা তাদের ভাষায় বিচ্ছিন্ন হোক এটা নিয়ে তাদের ততটা দুশ্চিন্তা ছিল না, যতটা ছিল এই যে সামাজিক বিপ্লব ঘটবার সম্ভাবনা তা নিয়ে। বাংলাদেশে একটি সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটবে এটা তখনকার পরিবেশে ওই রাষ্ট্রগুলোর জন্য মোটেই উৎসাহিত হবার মতো ব্যাপার ছিল না। তারা বরঞ্চ চিন্তিতই হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলো না, সমষ্টিগত স্বপ্নের জয় হলো, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলো।
The Dream The Struggle

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সবাই মিলে আমরা একটা বড় মাপের স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেটি হলো মুক্তির। না, কেবল স্বাধীনতার নয়, অর্থাৎ পরাধীনতার অবসানের নয়, সার্বিক মুক্তিরই। যার অর্থ, নতুন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাটা তো ছিলই, আমরা আশা করেছিলাম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নতুন সমাজও গড়ে তুলতে পারবো।

মুক্তির এই আকাঙ্ক্ষাটা নতুন নয়। এটি ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলে তো অবশ্যই ছিল। কিন্তু স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ হয়েছে একাত্তরে, যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। তার আগে মুক্তির ধ্বনি আমরা সে-ভাবে তুলি নি। ব্রিটিশ শাসনের অবসানে আমরা স্বাধীনতা পাবো ভেবেছিলাম। দেখা গেল সেটা আসে নি। তখন দাবি উঠলো স্বায়ত্তশাসনের। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় আমরা বাংলাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হোক এমন কথা বলি নি, যদিও আমরা বাঙালিরাই ছিলাম জনসংখ্যার শতকরা ৫৬জন। আমরা চেয়েছি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি। তার ভেতর থেকেই অবশ্য স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়াজ বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সেটা মূল আন্দোলনের রণধ্বনি হয়ে ওঠে নি। ছয় দফায়ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিই ছিল। তারপরে এলো এক দফা, অর্থাৎ স্বাধীনতা। স্বাধীনতার যুদ্ধ আমরা শুরু করি নি, সেটি শুরু হয়েছে হানাদারদের গণহত্যা অভিযানকে প্রতিরোধের ভেতর দিয়েই। তারপর যুদ্ধ যখন চলতে থাকলো তখনই স্বপ্নটি পূর্ণরূপ নিলো। সেটি হলো মুক্তির স্বপ্ন। ওই স্বপ্নই ছিল যুদ্ধের চালিকা শক্তি। আমরা মুক্তি চেয়েছি, কেবল স্বাধীনতা চাই নি। মুক্তির জন্য সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল, সেই সামাজিক বিপ্লবের কথাই লোকে ভেবেছে। যদিও অস্পষ্টভাবে। আমাদের যুদ্ধ স্বভাবতই হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। যারা একে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ বলেন তারা ব্যাপারটা বোঝেন না, কেউ কেউ হয়তো-বা বোঝেন, কিন্তু মানেন না; কোনো কোনো মহল হয়তোবা বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করতে চান।

একাত্তরের যুদ্ধে দুটোই ছিল। একদিকে ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্ন, অপরদিকে সমষ্টিগত মুক্তির আশা। দু'য়ের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না, সে অবস্থায় সেটা থাকবার কথাও নয়। বরঞ্চ ব্যক্তিগত দুঃস্বপ্ন সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নকে সংহত ও দৃঢ় করেছে। আমরা বুঝে নিয়েছি যে, ব্যক্তির মুক্তি নিহিত রয়েছে সমষ্টির মুক্তির ভেতর। হত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, উচ্ছেদ, আতঙ্ক সব মিলিয়ে এমন ব্যাপক দুঃসময় বাঙালির জীবনে আগে কখনো এসেছে কি না সন্দেহ। না, আসে নি। তবু ওই ভীষণ অন্ধকারও মুক্তির সমষ্টিগত আশাটিকে নির্বাপিত করে দিতে পারে নি। বরঞ্চ অত্যাচার যত বেড়েছে মানুষের মনোবল তত দৃঢ়তা পেয়েছে। অস্পষ্টভাবে হলেও মানুষ এমন একটি সমাজ গড়ে তুলবে বলে আশা করেছে যেখানে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা ঘটবে।

হানাদারেরা পরাজিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা বাধ্য হয়েছে তাদের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আত্মসমর্পণে। অপ্রত্যাশিত এই জন্য যে তাদের তো কোনো কিছুর অভাব ছিল না। অস্ত্র প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ, সরবরাহ, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন, যা ইচ্ছা তা করবার অবাধ স্বাধীনতা-সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণেই পেয়েছে। তাহলে হারলো কেন? হারলো কার কাছে? হারলো সমষ্টিগত স্বপ্নের কাছে। যত আঘাত করেছে ততই তারা টের পেয়েছে ওই স্বপ্ন শক্তিশালী ও অপরাজেয় হয়ে উঠছে। হারলো এই স্বপ্নের কাছেই। বাইরে তারা আত্মসমর্পণ করেছে ভারতীয় ও বাংলাদেশী যৌথ বাহিনীর কাছে, কিন্তু ভেতরে তাদের আত্মসমর্পণ বাঙালির সমষ্টিগত মুক্তির যে-স্বপ্ন তার কাছেই। মুক্তিযুদ্ধের জন্য আমরা মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রশিক্ষণ তো ছিলই না, অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ, অভাব ছিল সবকিছুরই। যুদ্ধ যে করতে হবে এই ধারণাটিও ছিল অনুপস্থিত। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্রোতের মতো মানুষ এসেছে যোগ দিতে এসেছে কৃষক, শ্রমিক, সেনাবাহিনীর সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র, নারী, কে আসে নি। এসেছে স্বপ্নের ডাকে, এসেছে দুঃস্বপ্নের দ্বারা তাড়িত হয়ে।

কিন্তু জয়ের পরেই সূত্রপাত ঘটলো আমাদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের। অন্য কারো কাছে নয়, পরাজয় ঘটলো আমাদেরই ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলোর কাছে। হানাদারেরা যা পারে নি, না-পেরে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছে আমরা তা করলাম, আমরা সমষ্টিগত স্বপ্নটাকে ভেঙে খান খান করে দিলাম ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলোর আঘাতে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধিকেই মনে করা হলো মুক্তির পথ। লোভ, লালসা, দখলদারিত্ব উগ্র হয়ে উঠলো। বিদেশি হানাদারদের হাঁকিয়ে দিয়ে আমরা নিজেরাই হানাদার হয়ে উঠলাম। লুণ্ঠন, ছিনতাই, ভেজাল, ঘুষ, চোরাচালান, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট সংগ্রহ, পরিত্যক্ত এবং সামাজিক সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত করা, জাতীয়করণের নামে কলকারখানা দখলে নেওয়া, পরীক্ষায় নকল, চাকরিতে অবৈধ উন্নতি, সম্পদ পাচার- কোনটা বাদ রইলো । বাঙালি বাঙালির সঙ্গে এমন ব্যাপক শত্রুতা আর কখনো করে নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও ইতর রকমের টানাটানি শুরু হয়ে গেল। ব্যক্তি বড় হয়ে উঠতে চাইলো সমষ্টিকে পেছনে ফেলে। তাই আমার একাত্তর, একাত্তরের আমি, মুক্তিযুদ্ধে আমি, আমার এলাকায় যুদ্ধ এসব কাহিনী সরব হয়ে উঠলো, লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের ভূমিকাকে দমিত করে দিয়ে। অসংখ্য 'আমি'কে পাওয়া গেল, 'আমাদের' জায়গাতে। গৌরব ছিনতাইয়ের উন্মাদ প্রতিযোগিতায় স্বভাবতঃই বিপন্ন হলো গৌরব নিজে। একাত্তরে আমরা সমাজতন্ত্রী ছিলাম, তারপর থেকে আমরা ক্রমাগত পুঁজিবাদী হচ্ছি, এবং পুঁজিবাদের যত রকম গ্লানি, বিচ্ছিন্নতা, অপরাধ সব প্রবল হয়ে উঠেছে।

এটা তো খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, পুঁজিবাদী বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করবে, এবং সেটা তারা করেছেও। কিন্তু কেন? তাদের আপত্তিটা ছিল কোথায়? আপত্তি নয়, আসলে ছিল শঙ্কা। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক, কিংবা তাদের ভাষায় বিচ্ছিন্ন হোক এটা নিয়ে তাদের ততটা দুশ্চিন্তা ছিল না, যতটা ছিল এই যে সামাজিক বিপ্লব ঘটবার সম্ভাবনা তা নিয়ে। বাংলাদেশে একটি সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটবে এটা তখনকার পরিবেশে ওই রাষ্ট্রগুলোর জন্য মোটেই উৎসাহিত হবার মতো ব্যাপার ছিল না। তারা বরঞ্চ চিন্তিতই হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলো না, সমষ্টিগত স্বপ্নের জয় হলো, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলো।

কিন্তু তাদের দিক থেকে বাংলাদেশ বিরোধিতা তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে নির্মূল করবার কাজটা চলতেই থাকলো। তারা সাহায্য ঋণ ইত্যাদি নিয়ে এগিয়ে এলো এবং দেশের নতুন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব তাকে পুঁজিবাদের দিকে টেনে ধরলো। এই নেতৃত্বের ভেতরে পুঁজিবাদী আকাঙ্ক্ষাটা পুরোপুরি ছিল। তারা ক্ষমতার হস্তান্তর চেয়েছে, বৈপ্লবিক রূপান্তর চায় নি। জাতীয়তাবাদীরা যে সমাজতন্ত্রী হতে পারবে না, এমন কোনো বিধান নিশ্চয়ই নেই। কিন্তু তার জন্য যে অঙ্গীকার দরকার ছিল আমাদের জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব তার ধারে কাছে ছিল না, দূরেই ছিল। সমাজতন্ত্রের কথা এই নেতৃত্ব বলেছে, কিন্তু বলেছে বাধ্য হয়ে, অন্তর থেকে নয়। নতুন শাসক শ্রেণির কাছে সমষ্টিগত স্বপ্ন নয়, ব্যক্তিগত স্বপ্নই হয়ে দাঁড়ালো নিয়ামক শক্তি। সাতচল্লিশের জাতীয়তাবাদীরা এমনকি ধর্মনিরপেক্ষও ছিল না, যে-ধর্মনিরপেক্ষতা হলো গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত: একাত্তরের জাতীয়তাবাদীরা ধর্মনিরপেক্ষতা চেয়েছে, কিন্তু তাকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয় নি; এবং তাদের মুখ্য চেষ্টা ছিল নিজেদের স্বার্থকে বিকশিত করার প্রয়োজনে সমাজ বিপ্লবের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে দেওয়া। পুঁজিবাদীরা তাদের ধর্মে দীক্ষিত শাসকদের হাতে পেয়ে খুশি হলো, এবং তাদেরকে আরো বেশি বেশি করে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের ব্যাপারে লোভী করে তুলতে থাকলো ওদিকে সঙ্গতভাবেই সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নকে যারা লালন করে তারা পরিণত হলো শত্রুতে। এ ঘটনা পাকিস্তানের কালেও ঘটেছে। তখনও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছে যে রাজনৈতিক দল সেই কংগ্রেস নিষিদ্ধ হয় নি, নিষিদ্ধ হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। কেবল নিষিদ্ধ করে সন্তুষ্ট হয় নি, কমিউনিস্টদেরকে যতভাবে পারা যায় নির্যাতিত করা হয়েছে, এবং তাদের অনেককে বাধ্য করা হয়েছে দেশত্যাগ করতে ।

বাংলাদেশের বামপন্থিরা নানা রকম বিভ্রান্তির ভেতর ছিল। তাদের মধ্যে পিকিংপন্থী বলে যারা চিহ্নিত তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারে নি, এবং না-পারার গ্লানিতে পরবর্তীকালে পীড়িত ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনও চলেছে প্রচণ্ড রকমের। অন্যদিকে মস্কোপন্থী বলে পরিচিতরা যে জাতীয়তাবাদী শাসকদের মূল থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে নিয়ে স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলবে সেটা পারে নি। ফলে বামের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হলো না। এবং সমাজবিপ্লবের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। এই শূন্যতায় জাতীয়তাবাদীদের ভেতর থেকেই একটি দল বের হয়ে এলো যারা জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রকে একত্র করার কথা বলে জনগণের ভেতর বিদ্যমান সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাকে ছিনতাই করে নিয়ে গেল।

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু মোটেই অপ্রত্যাশিত নয় এমন ঘটনাও ঘটলো যে, রাজাকার আল-বদরেরা ক্ষমা পেয়ে গেল। কেবল ক্ষমা পেল না এক সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারই হয়ে বসলো। পাকিস্তানি শাসকেরা যেমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা বিরোধিতা করেছে তাদেরকে শত্রু মনে করে নি, শত্রু ভেবেছে সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নের পক্ষের মানুষদেরকে; বাংলাদেশের শাসকেরাও তেমনি, এবং একই নিয়মে, রাজাকার আল-বদরদের কাছে টেনে নিয়েছে, যন্ত্রণা যা দেবার দিয়েছে বামপন্থীদেরকে যেমন বিরোধিতা করে, তেমনি কাউকে কাউকে আদর দিয়েও। ফলে বামপন্থীরা তেমন সুবিধা করতে না পারলেও পোয়া বারো হয়েছে ধর্মব্যবসায়ীদের। তারা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। দেশে অভাব, সুবিচারের অনিশ্চয়তা, এবং জাতীয়তাবাদীদের ব্যর্থতা যে হতাশা তৈরি করেছে তা তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের জন্য উর্বর লালনভূমিতে পরিণত হয়েছে। ধর্মব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুঁজিবাদীদের আপাত-পার্থক্যের অভ্যন্তরে চমৎকার আত্মীয়তা রয়েছে। উভয় পক্ষই ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মুনাফায় বিশ্বাসী। ইসলামী জঙ্গি বলে যারা পরিচিত তাদের স্বপ্নটাও ব্যক্তিগত পুণ্য সঞ্চয়ই। পুণ্যের সঙ্গে মুনাফার মূল ব্যবধানটা নামেরই। নইলে পুণ্যসঞ্চয়ী যেমন মুনাফালোভীও তেমনি, ব্যক্তিগত লাভের কথাই ভাবে, সমষ্টিগত অর্জনকে লাঞ্ছিত করে।

মাদ্রাসাশিক্ষাকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে আমাদের শাসক শ্রেণির ক্রমবর্ধমান তৎপরতা সমষ্টিগত স্বপ্নকে পর্যুদস্ত করবার আগ্রহেরই বহিপ্রকাশ বৈকি। অনুপ্রেরণাটা থাকে ব্যক্তিগত সম্মান ও পুণ্য সঞ্চয়ের। প্রচ্ছন্ন থাকে আরেকটি অভিসন্ধি, সেটা গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদেরকে মাদ্রাসায় ঠেলে দিয়ে ইংরেজি-মাধ্যমে পড়ুয়া নিজেদের সন্তানদের উন্নতির পথটাকে প্রশস্ত করা। গরিব মানুষ মাদ্রাসাশিক্ষায় আটকা পড়ে থাকুক, আমরা এগিয়ে যাই— মনোভাবটা এই রকমের। তৃতীয় একটা ব্যাপারও আছে। সেটা হলো এই যে, আমাদের স্বদেশি পুঁজিবাদী শাসক এবং তাদের বিদেশি প্রভু উভয়েরই প্রধান শত্রু ইসলামী জঙ্গিরা নয়, জঙ্গিরা বরঞ্চ সহযোদ্ধা-সমাজবিপ্লবীদেরকে নির্মূল করবার কাজে। দু'পক্ষের ভেতর বাইরে কলহের ধ্বনি যতই উঠুক না কেন, ভেতরে রয়েছে পরস্পরের প্রতি আত্মার টান। বামপন্থীদেরকে পুঁজিবাদীরা বলে গণতন্ত্রবিরোধী, ইসলামী জঙ্গিরা বলে নাস্তিক- তফাৎ ওইটুকুই। স্মরণীয় যে, পুঁজিবাদীরা যেমন ইসলামী জঙ্গিরাও তেমনি অসংশোধনীয়রূপে পিতৃতান্ত্রিক ।

একাত্তরের পরে দেশে যে নতুন প্রজন্ম এসেছে তারা পাকিস্তান দেখে নি, মুক্তিযুদ্ধও দেখে নি, তাদের সামনে দেশপ্রেমের ও আত্মত্যাগের কোনো দৃষ্টান্ত নেই, এবং অন্যদিকে তারা সঠিক ইতিহাসও জানে না, সুযোগ পায় না জানবার, শাসক শ্রেণি তাদেরকে সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে রাখে। তরুণ প্রজন্ম মনে করে এ- দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়াটা যে সম্মানজনক এটাও তারা বোধ করে না। তাদের স্বপ্ন ব্যক্তিগত।

কিন্তু ব্যক্তিগত স্বপ্নের লালনপালন যা করে, এবং করতে পারে তাতো আমরা দেখছি। ওই সব স্বপ্নের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সার্বক্ষণিক দৌরাত্ম্যে বাংলাদেশ এখন নৈরাজ্যের দিকে এগুচ্ছে। এ থেকে মুক্তির পথ আমাদের অবশ্যই জানা আছে। সেটা হলো সমষ্টিগত স্বপ্নের কাছে ফিরে যাওয়া। সেই স্বপ্নকে চালিকা শক্তি করে তোলা। কারা করবেন? করবেন তাঁরা যাঁরা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক, যাঁরা মনে করেন ব্যক্তিগত স্বপ্নকে মুখ্য করে আমরা উন্নতি নয় অধঃপতনের রাস্তা ধরেছি। মুক্তির স্বপ্নকে সামনে রেখে তাঁরা সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হবেন। যে-যুদ্ধ শেষ হয় নি, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। নইলে আমরা নামতেই থাকবো, উঠতে পারবো না।


এমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


প্রকাশের তারিখ: ১৬-ডিসেম্বর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুব ভালো সময় উপযোগী লেখা,যা আজকের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
- তাপস চট্টোপাধ্যায় , ১৬-ডিসেম্বর-২০২২


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪