সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বিশ্বায়নের অন্তিম লগ্ন কি আসন্ন?
প্রভাত পট্টনায়েক
আমরা আগেই দেখিয়েছি যে ‘বিশ্বায়ন’ বলতে আমাদের মতে দুনিয়ার সব দেশ পরস্পরের ওপরে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এমনটা বোঝায় না, বরং বোঝায় ক্ষমতার সম্পর্ক, অর্থাৎ ক্ষমতাবান কতিপয় দেশের সাথে ক্ষমতাহীন দেশগুলির সম্পর্ককে বোঝায়। এই ক্ষমতা বা শক্তির প্রয়োগ ঘটে কিছু বেয়াড়া দেশের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মধ্য দিয়ে এবং অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ঘুর্ণিপাকে তাদেরকে টেনে আনার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা বা আধিপত্যের প্রদর্শন হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশক চিহ্ন। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা একদিকে যেমন সাম্রাজ্যবাদের নির্মমতার লক্ষণ, অন্যদিকে তেমনই বিশ্বায়ন হচ্ছে বিশ্বায়িত পুঁজির আধিপত্যের লক্ষণ। কথাটা অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে তথাকথিত ‘ডি-গ্লোবালাইজেশন’-এর অর্থ মোটেই বিশ্বায়নের নেতিকরণ নয়, বরং বিশ্বায়নের পরিপূরক।

ইদানিং অনেক অর্থনীতিবিদ এই প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, অতীতের বছরগুলিতে নয়া উদারনীতিবাদের যে জমানা দেখা গিয়েছিল তার আর অস্তিত্ব নেই। কোনও কিছুই অবশ্য চিরকাল একই রকম থাকে না— গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস যেমন বলেছিলেন, ‘নদীর একই জলে তুমি দু’বার স্নান করতে পার না।’ সুতরাং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী রূপে নয়া উদারনীতিবাদী ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন এসেছে এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আসল বিষয়টা হলো বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য যে বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো আমরা ব্যবহার করি, তা কি তামাদি হয়ে গিয়েছে? তার আমুল সংশোধন কি জরুরি হয়ে উঠেছে? মার্কসবাদীরা বর্তমান অবস্থার ব্যাখ্যা করেন তাকে পালটানোর জন্য। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে যদি বিশ্লেষণ না করা যায় তাহলে তাকে পালটানো যাবে কেমন করে?
মনে রাখা দরকার যে ‘বিশ্বায়ন’ মানে এটা কখনই নয় যে পরস্পরের সুবিধার জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন দেশগুলি স্বেচ্ছায় সকলে মিলিত হয়ে এক সর্বহিতকারী ‘বিশ্ব-ব্যবস্থা’ গড়ে তুলেছে। প্রায় পঞ্চাশটির মতো দেশ এই মুহূর্তে নানারকম নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন। বিশ্ব বাজার থেকে কিছু ক্ষেত্রে জীবনদায়ী ওষুধ কেনা-সহ আরও নানাবিধ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কিনতে তাদের বলপূর্বক বাধা দেওয়া হয়। এক দশক আগে যখন ‘বিশ্বায়ন’ পূর্ণ গতিতে চলছে বলে সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছিল, তখনও নিষেধাজ্ঞা কবলিত দেশের সংখ্যা একই রকম ছিল।
বিশ্বায়ন বলতে সাধারণভাবে আমজনতার যে ধারণা রয়েছে তার সঙ্গে আধুনিক অর্থে বিশ্বায়নের ধারণার তফাৎ আকাশ-পাতাল। বিশ্বায়ন মানে হচ্ছে পুঁজিবাদের এমন একটি পর্যায়ের আবির্ভাব যেখানে পুঁজি, সর্বোপরি লগ্নী পুঁজির অবাধ চলাচলের জন্য সমস্ত দেশের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে মুক্ত করে দেওয়া। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে জাতি-রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক পুঁজি তার স্বার্থবিরোধী এই ধরণের হস্তক্ষেপ অনুমোদন করে না। বিশ্বায়িত পুঁজির দুনিয়া জোড়া কর্মকাণ্ডের পিছনে মুখ্য মদতদাতা হিসাবে রয়েছে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলি (metropolitan states) এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলির মৌন সম্মতি। পাশ্চাত্য দেশগুলি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক করে দেয় কোন কোন দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে এবং অন্যরা নীরবে সেটা মেনে নেয়।
সুতরাং সাধারণভাবে গোটা দুনিয়ার ওপরে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য ফের চাপিয়ে দেওয়ারই প্রতিনিধিত্ব করে আজকের ‘বিশ্বায়ন’। এর বাইরে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যে দেশগুলি উপনিবেশবাদের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে স্বাধীন হয়েছিল এবং যারা পুঁজিবাদী বিকাশের পথকে বেছে নিয়েছিল বটে, কিন্তু তার সাথে সাথেই সমদর্শিতার দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছিল, আজও তারা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের চাপানো জোয়াল থেকে রক্ষা পায়নি। ফলে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বের এই সব অ-সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি যে আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করতো, তা অপহৃত হয়েছে। পুঁজির অবাধ সঞ্চরণের অনুপূরক হিসাবে বিশ্বায়নের আর একটি অবদান হলো দুনিয়া জুড়ে জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্তকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করে পণ্য ও পরিষেবার অবাধ চলাচল। যেসব দেশ ‘নিষেধাজ্ঞা’ কবলিত, তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এই অবাধ চলাচল প্রযোজ্য নয়।
বিশ্বায়নের যুগে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। এর সুযোগ নিয়ে নতুন নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উদ্ভব ঘটলো যাদের উপস্থিতির ফলে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি বিপন্ন বোধ করলো। এই নতুন শক্তিগুলির অন্যতম হলো রাশিয়া, যে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে পূর্বতন সোভিয়েত ইউয়নের বিপুল উৎপাদন ক্ষমতার পরিকাঠামো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীরা ভেবেছিল দেশটাকে বশে আনা গিয়েছে। এই ভাবনা ততদিনই টিঁকেছিল যতদিন বরিস ইয়েলেৎসিন ক্ষমতাসীন ছিল। তিনি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরে রাশিয়া পুনরায় নিজেকে জাহির করতে শুরু করলো। অন্যদিকে রঙ্গমঞ্চে হাজির হলো চীন। চীন বিশ্বায়নের সাথে যুক্ত হলো বটে কিন্তু পশ্চিমী শক্তিগুলির চাপিয়ে দেওয়া শর্তে নয়, নিজের শর্তে। অন্যান্য কারণগুলির অবদান ছাড়াও চীন যে দ্রুত হারে নিজেদের অর্থনীতির উন্নয়ণ ঘটাতে পেরেছিল তার অন্যতম কারণ হলো পাশ্চাত্যের দেশগুলির বাজারে প্রবেশের সুবিধা পাওয়ার ফলে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়া এখন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। এবং চীনা আতঙ্কে ভীত হয়ে রাজনৈতিক কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমী দেশগুলি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের বহর কমিয়ে দিয়েছে, ফলে চীনের আর্থিক বৃদ্ধির হার বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী। চীনের সাথে বাণিজ্য ইচ্ছাকৃতভাবে হ্রাস করার পিছনে আমেরিকার কতগুলি কারণ রয়েছে— যথা দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের হার-কে বজায় রাখা (যদিও চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আমেরিকার প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ফলেই উৎপন্ন হয়) থেকে শুরু করে চীনের ওপর অতি নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হওয়ার উদগ্র বাসনা পর্যন্ত। আমেরিকা ব্যতীত অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশের ক্ষেত্রে উপরের কারণগুলি ছাড়াও আরো একটি বাড়তি কারণ কাজ করে, সেটা হচ্ছে আমেরিকার চাপ। এটাই তাদের ক্ষেত্রে চীনের সাথে বাণিজ্য হ্রাস করার মূল কারণ। জর্জ বুশ জুনিয়রের আমলে চীনের থেকে পণ্য আমদানী বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় যা আজকের আমেরিকার মাথাব্যথার কারণ। বুশ চেয়েছিলেন চীনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ডলারের সাপেক্ষে ইউয়ানের দাম বাড়ানো। নরমে-গরমে চীনকে বাগে আনার এই প্রচেষ্টা ওবামার আমলেও চলেছে। আমেরিকান ফার্মগুলির উৎপাদন ইউনিটগুলিকে বিদেশের মাটিতে স্থানান্তরিত করার জন্য ওবামা সেই ফার্মগুলির ওপরে জরিমানা ধার্য করেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এসে দেশীয় উৎপাদনকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে আমদানী করা পণ্যের ওপরে চড়া হারে শুল্ক চাপিয়ে ছিলেন মূলত চীনকে উদ্দেশ্য করেই।
পশ্চিমের দেশগুলি যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা তাড়িত হয়েই চীনের সাথে বাণিজ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে, দু’টি উদাহরণ পেশ করলে সেকথা পরিস্ফুট হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইউরোপে কার্বন নির্গমন হ্রাস করার উদ্দেশ্যে সোলার প্যানেল ব্যবহার করার ক্ষেত্রে একটি নিয়ম জারি করার প্রস্তাব করেছে যেখানে বলা হয়েছে যে এই প্যানেলগুলি এমন কোনও দেশ থেকে আমদানী করা যাবে না যে দেশ প্যানেলের বাজারের ৬৫ শতাংশের অংশীদার। এমন নিয়ম যে চীনকে বহিষ্কার করার জন্যই করা হয়েছে তা দিনের আলোর মতই স্পষ্ট কারণ বিশ্ব বাজারের ৮৫ শতাংশই চীনের দখলে কারণ চীন খুবই কম দামে প্যানেল দিতে পারে। অর্থাৎ চীনকে বঞ্চিত করার জন্য ইউরোপ সোলার প্যানেল কেনার জন্য বরং বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত! এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই ভূ-রাজনৈতিক কারণে গৃহীত।
একই ভাবে নিজের দেশের কর্পোরেটদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাইডেন প্রশাসন চীনে সেমি-কন্ডাক্টার রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। এর ফলে চীনের সামরিক প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-সহ যাবতীয় উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প খুবই বিপদে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে এহেন সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারা চালিত, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনকে অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত ভাবে পঙ্গু করে রাখা। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই মুহূর্তে যদিও চীনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি, তা সত্ত্বেও এক পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞায় পরিণত হবে, অথবা নেহাৎই চীনকে পঙ্গু করে রাখার বাসনার বহিঃপ্রকাশ।
‘বিশ্বায়নের পিছু হঠা’ বলতে বাস্তবত বোঝানো হচ্ছে পশ্চিমী শক্তিগুলির এইভাবে চীনকে কোণঠাসা করার সম্পূর্ণ নতুন প্রবণতা, চীনের ওপরে অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ার বাসনা। এই প্রচেষ্টার মূল দিকটি হচ্ছে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা, যদিও আখেরে তাতে খরচ বেশি হচ্ছে। সম্প্রতি চীনের সাথে আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্যের আয়তনের হ্রাস এই প্রবণতারই ফলশ্রুতি। পশ্চিমী দেশগুলির ভাবখানা এমন, যেন চীন পশ্চিমী দেশগুলির জারি করা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে।
কৌতুহলের বিষয় এটাই যে এতদসত্ত্বেও কোনও ম্যাক্র লেভেল সূচকের (macro-level parameter) ক্ষেত্রে, যেমন বিশ্ব-জিডিপি ও বিশ্ব-আমদানির অনুপাতে কোনও প্রকৃত পতন পরিলক্ষিত হচ্ছে না (অর্থাৎ বিশ্ব জোড়া আমদানির পরিমাণ কমছে না –অনুবাদক)। অনেক অর্থনীতিবিদ এই অনুপাতকে বিশ্বায়নের ব্যাপ্তি মাপার পরোক্ষ সূচক বলে মনে করেন। তারা হিসাব করে দেখেছেন যে বিশ্বায়নের গতি শ্লথ হচ্ছে বটে, কিন্তু তার গতিমুখ পরিবর্তিত হচ্ছে না, অর্থাৎ বিশ্বায়নের পিছু হঠার (de-globalisation) মতো ঘটনা ঘটছে না।
আমরা আগেই দেখিয়েছি যে ‘বিশ্বায়ন’ বলতে আমাদের মতে দুনিয়ার সব দেশ পরস্পরের ওপরে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এমনটা বোঝায় না, বরং বোঝায় ক্ষমতার সম্পর্ক, অর্থাৎ ক্ষমতাবান কতিপয় দেশের সাথে ক্ষমতাহীন দেশগুলির সম্পর্ককে বোঝায়। এই ক্ষমতা বা শক্তির প্রয়োগ ঘটে কিছু বেয়াড়া দেশের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মধ্য দিয়ে এবং অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ঘুর্ণিপাকে তাদেরকে টেনে আনার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা বা আধিপত্যের প্রদর্শন হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশক চিহ্ন। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা একদিকে যেমন সাম্রাজ্যবাদের নির্মমতার লক্ষণ, অন্যদিকে তেমনই বিশ্বায়ন হচ্ছে বিশ্বায়িত পুঁজির আধিপত্যের লক্ষণ। কথাটা অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে তথাকথিত ‘ডি-গ্লোবালাইজেশন’-এর অর্থ মোটেই বিশ্বায়নের নেতিকরণ নয়, বরং বিশ্বায়নের পরিপূরক।
বিশ্বায়িত পুঁজির প্রায় সবটাই আসে পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলি থেকে এবং ফলত এই পুঁজি এইসব দেশের কর্মকান্ডের জালে আষ্টে-পৃষ্টে বাঁধা। ঠিক এই কারণেই বিশ্বায়িত পুঁজির আধিপত্য মানে পাশ্চাত্য দেশগুলির আধিপত্য— বিশ্বের জনগণের ওপরে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের মানুষের ওপরে। বিশ্বায়নের প্রতি তৃতীয় বিশ্বের বৃহৎ বুর্জোয়াদের, সেখানকার উচ্চ বেতনের সুবিধাভোগীদের এবং প্রফেশনালদের সোৎসাহ সমর্থন থাকতে পারে কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিক, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকরা এই বিশ্বায়নের নিষ্পেষণে প্রতিদিন নিষ্পেষিত হচ্ছেন।
এই দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য যে অনুশীলন ও কর্মকাণ্ড এক দশক আগে যতটা প্রয়োজনীয় ছিল , আজও ঠিক ততটাই প্রয়োজনীয় রয়েছে। শ্রমজীবী জনতার জীবনধারণের মানের যে কোনও উন্নয়ণের জন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ একান্তই জরুরি।এই হস্তক্ষেপ করার জন্য রাষ্ট্রের যতটুকু স্বাধীনতা দরকার ততটুকু স্বাধীনতা তাকে অর্জন করতেই হবে, দেশ থেকে পুঁজি অন্যত্র চলে যাবে এই ভয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। কিন্তু যতদিন পুঁজির অবাধ বিচরণের মৃগয়াক্ষেত্র হিসাবে দেশকে পুঁজির দাসত্ব করার ছাড়পত্র দিতে বাধ্য থাকতে হবে ততদিন সে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী হবে না। পুঁজির চলাচলের ওপরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জারি করা এই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রথম পদক্ষেপ।
অন্যভাবে বলা যায় যে জনগণের জীবনযাত্রার মানের কিছুমাত্র উন্নতিসাধনের জন্য কেবল রাষ্ট্রের চরিত্র বদল (অর্থাৎ শ্রমিক ও কৃষকের সমর্থন সুনিশ্চিত) করলে চলবে না, তার সাথে সাথে পুঁজির অবাধ সঞ্চরণের দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। শ্রমজীবী জনতার সমর্থনই যথেষ্ট নয়, যদি জনতার কল্যাণের জন্য এক গুচ্ছ পরিকল্পনা রূপায়িত করতে হয় তবে পুঁজির অবাধ বিচরণের ওপরে নিয়ন্ত্রণ জারি করাও প্রয়োজন। বলা বাহুল্য, পুঁজির ওপরে এইরূপ নিয়ন্ত্রণ জারি করা হলে দেশের উপর সাম্রাজ্যবাদীদের নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া নেমে আসতে পারে।
এই আশঙ্কা এক দশক আগে যেমন সত্য ছিল আজও ঠিক ততটাই সত্য আছে। তথাকথিত ‘ডি-গ্লোবালাইজেশন’ অথবা বিশ্বায়নের পিছু হঠা অথবা বিশ্বায়নের অন্তিম লগ্ন ইত্যাদি যে ভাবেই আজকের পরিস্থিতিকে কতিপয় অর্থনীতিবিদরা ব্যাখ্যা করুন না কেন, বিশ্বায়িত পুঁজির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন আজও এক বিন্দুও হ্রাস পায়নি। আর এটা তো সকলেরই জানা যে এই বিশ্বায়িত পুঁজির ঠিক পেছনেই ব্যুহ রচনা করে দাঁড়িয়ে আছে পাশ্চাত্য দেশগুলির যাবতীয় সৈন্যবল।
পিপলস ডেমোক্রেসি, মে ২৯-জুন ৪ সংখ্যা
ভাবানুবাদঃ নন্দন রায়
প্রকাশের তারিখ: ১১-জুন-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
