সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ফিরছে ম্যাকার্থিবাদ
প্রভাত পট্টনায়েক
যে ভাবে সংবিধানকে পায়ে মাড়িয়ে ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নির্দেশ দিচ্ছে তারা তাদের কাজকর্ম কীভাবে চালাবে সেবিষয়ে, এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলে যেভাবে তাদের সরকারি বরাদ্দ আটকে দেওয়া হচ্ছে, তাতেই ট্রাম্পের বৃহত্তর লক্ষ্যটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের মনোমত করে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হবে এবং সেই শর্তেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি টাকা দেওয়া হবে, এমনটা চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় আর সৃজনশীল ও সমালোচনামূলক ভাবনাচিন্তার পরিসর থাকে না। ম্যাকার্থিবাদের সঙ্গে তুলনা করে দেখলে এটা একেবারে নতুন উদ্ভাবন। আমরা আসলে প্রত্যক্ষ করছি ভাবনাচিন্তার জগতের ওপর একটা নয়া-ফ্যাশিস্ত হামলা, যে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ১৯৫০ এর দশকের ম্যাকার্থিবাদের হামলার চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের এখনকার বাক স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করাটা ভয়ের সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় সেই ১৯৫০ দশকের কথা যখন সেনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির নেতৃত্বে চলেছিল বিরোধী মতের লোকজনদের খুঁজে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার পালা। সেই বিরোধী নিধন অভিযানে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের একটা গোটা প্রজন্মকেই শুধু অন্যায়ভাবে কমিউনিস্ট হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়নি, একইসঙ্গে তা এই অভিযান পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সেদেশের সৃজনশীলতায় গভীরভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। তখন বিরোধী মতের নিধন অভিযানের শিকার যাঁরা হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অসংখ্য বিশিষ্ট লোকজন। ছিলেন ডাশিয়েল হ্যামেট, ডালটন ট্রাম্বো, ব্রেটোল্ট ব্রেখট এবং চার্লি চ্যাপলিনের মতো শিল্পী ও লেখকেরা। ছিলেন লরেন্স ক্লেইন, রিচার্ড গডউইন, ই এইচ নরম্যান, ড্যালিয়েল থর্নার, মোজোস ফিনলে এবং আওয়েন ল্যাটিমোরের মতো শিক্ষাবিদেরা। এমনকি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব রবার্ট ওপেনহাইমার যিনি ম্যানহাটান প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং সেই প্রকল্প থেকে আণবিক বোমা তৈরি করা হয়েছিল, হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট যিনি ব্রেটন উডস ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা (ব্রিটেনের জে এম কেইনসের সঙ্গে), তাঁরাও ছাড় পাননি। আমেরিকায় কমিউনিজম কতটা ছড়িয়েছে তা জানার জন্য অসংখ্য কমিটি তৈরি করা হয়েছিল আর একের পর এক সেই সব কমিটিতে তাঁদের হাজির হতে বলা হয়েছিল। ভিন্নমতের লোকেদের এমন নিধন পর্বের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতি হয়েছিল। অনেকে এমনকী একথাও বলেছেন যে, আমেরিকা যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল কারণ পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সম্পর্কে ভালভাবে জানতেন যেসব মার্কিন পণ্ডিতেরা, তাঁদেরও বিপুল সংখ্যায় বিনাশ করেছিল ম্যাকার্থিবাদ। যদি তাঁরা থাকতেন, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হতে পারত, এবং এই দেশকে হয়ত ভিয়েতনাম যুদ্ধের পাঁকে ডুবতে হত না।
ম্যাকার্থিবাদের ঘটনার সঙ্গে ট্রাম্পের এখনকার পদক্ষেপের মিল অনেকেই বুঝতে পারছেন। তবে বিষয়টা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রুস রবিন্স (এমআর অনলাইন, ২১ মার্চ)। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে যে, এই ভাবে ট্রাম্পের পদক্ষেপের সঙ্গে ম্যাকার্থিবাদের তুলনা করাটা বোধহয় বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। কারণ এখনও পর্যন্ত সামান্য কয়েকজন লোককে গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাহলে এখনই এত সব বাড়াবাড়ি করে ম্যাকার্থিবাদের আমলের ভিন্ন মতাবলম্বীদের খুঁজে খুঁজে শাস্তি দেওয়ার সঙ্গে তুলনা টানার দরকার কী? একইভাবে একথাও বলা হতে পারে যে, এখন তো শুধুমাত্র মার্কিন নয় এমন নাগরিকদেরই নিশানা করা হচ্ছে। হয় সেই সব লোকেরা ভিসা নিয়ে আমেরিকাতেই বাস করছেন কিংবা তাদের গ্রিন কার্ড আছে। নিশ্চিতভাবেই এখনকার পর্বের সঙ্গে ম্যাকার্থিবাদের ফারাক আছে। কারণ তখন শুধুমাত্র ‘বহিরাগতরাই’ নয়, মার্কিন নাগরিকেরাও ভিন্ন মতাবলম্বী নিধন যজ্ঞের শিকার হচ্ছিলেন।
তবে এধরনের বিবেচনা বোধ থেকে বেশি নিশ্চিন্ত না হওয়াই ভাল। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মাহমুদ খলিলের মতো ঘটনার সবে শুরু। আরও হাজার হাজার মাহমুদ খলিলের মতো লোকজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মনে রাখা যেতে পারে যে, মাহমুদ খলিল ছিলেন গ্রিন কার্ডধারী কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি বিয়ে করেছেন একজন মার্কিন নাগরিককে। এবং মাহমুদের স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। খলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁকে দেশে ফেরানো হবে। তাঁর অপরাধ, ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে কারণ তিনি গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই ভাবে ব্যাপক হারে ভিসা ও গ্রিন কার্ডধারীদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এরপর যখন ভিসা ও গ্রিন কার্ডধারীদের ব্যাপক হারে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করে তাদের দেশ ফেরানো হবে, তখন যেসব মার্কিন নাগরিক গাজা ধরনের গণহত্যার প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন এবং যারা এভাবে জোর করে দেশে ফেরানোর বিরোধী, তারাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হাত থেকে খুব একটা রেহাই পাবেন না। বিদেশি ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ কাজে সহায়তা করার জন্য তাদেরও শাস্তি দেওয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, যখন স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের জন্য জনসংখ্যার একাংশের বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন সেই শাস্তির প্রক্রিয়া শুধু ওই অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং দেশের মানুষের বাকি অংশের গায়ে হাত পড়বে না, এবিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকা অসম্ভব। সেকারণেই আমাদের এই ভাবনা ন্যায্য যে, আমরা আরও একটা ম্যাকার্থি ধরনের ভিন্ন মতের লোকেদের নিধন যজ্ঞের শুরুর পর্যায়ে রয়েছি।
বস্তুত, যে ভাবে ভিন্ন মতের লোকেদের নিধন যজ্ঞের আশঙ্কার মেঘ এখন ঝুলে রয়েছে, সেটা এমনকী সেনেটর জো ম্যাকার্থির শুরু করা নিধন যজ্ঞের চেয়ে, নানা দিক থেকে, আরও বেশি খারাপ। প্রথমত, মাহমুদ খলিলকে দেশ থেকে বিতাড়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ১৯৫২ সালের ইউ এস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি আইনের একটি ধারায়। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যদি মার্কিন বিদেশ সচিব মনে করেন যে কোনও ‘বিদেশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যার উপস্থিতি বা কাজকর্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতির পক্ষে গুরুতর ক্ষতিকর হতে পারে বলে ধরে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে, তাহলে তাকে দেশ থেকে বিতাড়ন করা হতে পারে।’ এই ধারা কাজে লাগানোর মানে কার্যত কোনও বিদেশিই, তিনি ভিসাধারী হোন বা গ্রিনকার্ডধারী হোন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতির সমালোচনা করতেই পারবেন না। উদাহরণ স্বরূপ, খলিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠন হামাস এর ঘনিষ্ঠ হওয়া ছাড়াও (যদিও এর স্বপক্ষে কোনও প্রমাণই দেওয়া হয়নি), তাঁর ‘ইহুদি বিরোধিতা’, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সারা দুনিয়াজুড়ে ইহুদি বিরোধিতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ইজরায়েল গাজায় যে গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছে খলিল তার বিরোধিতা করায় সেই প্রতিবাদকে ‘ইহুদি বিরোধিতা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ধরে নেওয়া হয়েছে সেকারণেই মার্কিন বিদেশ নীতিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির যে কোনও দিকের সমালোচনা করবেন তেমন যে কোনও বিদেশির বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করা হতে পারে। এবং এমনকী মার্কিন নাগরিক যারা মার্কিন বিদেশনীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সামিল হয়ে এই ধরনের ‘বিদেশিদের’ ‘সাহায্য ও প্ররোচিত করবেন’, তাহলে নিরীহ ভাষায় বললে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তৎপর হতে পারবে, এবং সন্দেহ নেই তেমন মার্কিন নাগরিকদেরও তুলে এনে গ্রেপ্তার করা হবে।
অন্যভাবে বললে, এখনকার ভিন্নমতের লোকজনকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার সুযোগটা সেনেটর জো ম্যাকার্থির সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এখন শুধু কমিউনিস্ট ও তাদের দরদীদেরই নিশানা করা হচ্ছে না, এবং তাঁরাই ছিলেন ম্যাকার্থিবাদের নিশানা। বরং, এখন তাকেই নিশানা করা হচ্ছে যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির সমালোচনা করার সাহস দেখাচ্ছেন। এবং সর্বোপরি তাঁকেই নিশানা করা হচ্ছে যিনি আক্রমণাত্মক ও সম্প্রসারণবাদী ইজরায়েলি দখলদার–উপনিবেশবাদের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সংক্রান্ত যাবতীয় মার্কিন নীতির সমালোচনা করছেন।
দ্বিতীয়ত, ম্যাকার্থিবাদকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যে সম্মান অর্জন করেছিল এবং সেই দেশ সম্পর্কে যে প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের লড়াইয়ের অংশ ছিল ঠান্ডা যুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েত আগ্রাসনের ভীতি তৈরি করেছিল, যদিও যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়ার কারণে সোভিয়েত রাশিয়ার আগ্রাসনের কোনও ইচ্ছাই ছিল না। সেদিক থেকে দেখলে, ম্যাকার্থিবাদ ছিল একটা নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে একটা অত্যন্ত নির্দিষ্ট সাম্রাজ্যবাদী রণনীতি। কিন্তু এখন ট্রাম্পের যে আক্রমণাত্মক নীতি সেটা আসছে এমন একটা সময়ে যখন কোনও বিশেষ একটা শক্তির দিক থেকে হামলার কোনও নির্দিষ্ট আশঙ্কা রয়েছে, এর স্বপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ কোনও প্রমাণ দিতে পারবে না। ট্রাম্পের এ হেন আচরণের সহজ কারণ হল বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণাত্মক মনোভাবকে আড়াল করে রাখা। আড়াল করে রাখা সেই বিশ্বে যেখানে কোনও নির্দিষ্ট শক্তিকেই ভয়ের কারণ হিসাবে দেখানো যাবে না, কিন্তু যেখানে একটা বেশ বড় সংখ্যক দেশের, নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার চাপিয়ে দেওয়া সঙ্কটের কারণে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে এবং তারা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে কিছুটা স্বস্তি খুঁজতে চাইছে। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিত হল সাম্রাজ্যবাদের নৈতিক দেউলিয়াপনা। কোনও নির্দিষ্ট অ-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নৈতিক অবস্থান হঠাৎ করে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা নয়।
তৃতীয়ত বাক্ স্বাধীনতার ওপর ট্রাম্পের আক্রমণের লক্ষ্য ম্যাকার্থিবাদের চেয়ে আরও বেশি। যে ভাবে সংবিধানকে পায়ে মাড়িয়ে, সুনিশ্চিত পদক্ষেপে ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নির্দেশ দিচ্ছে তারা তাদের কাজকর্ম কীভাবে চালাবে সেবিষয়ে, এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলে যেভাবে তাদের সরকারি বরাদ্দ আটকে দেওয়া হচ্ছে, তাতেই ট্রাম্পের বৃহত্তর লক্ষ্যটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। যতক্ষণ না ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি মোতাবেক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কাজকর্মে অনেকগুলো পরিবর্তন ঘটায়, ততক্ষণ তাদের ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সরকারি বরাদ্দ আটকে দেওয়া হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিগুলি মেনে নিচ্ছে এবং তাতে শিক্ষার স্বাধীনতা দারুণভাবে সঙ্কুচিত হবে। সরকারের মনোমত করে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হবে এবং সেই শর্তেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি টাকা দেওয়া হবে, এমনটা চলতে থাকলে সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন লঙ্ঘন করা এবং লেখাপড়ার আবহকে নষ্ট করা। এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাধ্য করে সরকারের একটা অঙ্গে পরিণত হতে। এবং তখন আর বিশ্ববিদ্যালয় সৃজনশীল ও সমালোচনামূলক ভাবনাচিন্তার পরিসর থাকে না। ম্যাকার্থিবাদের সঙ্গে তুলনা করে দেখলে এটা একেবারে নতুন উদ্ভাবন।
অন্যভাবে বললে, আমরা আসলে প্রত্যক্ষ করছি চিন্তার জগতের ওপর একটা নয়া-ফ্যাশিস্ত হামলা, যে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ১৯৫০-এর দশকের ম্যাকার্থিবাদের হামলার চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত। নিশ্চিতভাবে, বাকি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে যেখানে নয়া-ফ্যাশিস্ত শাসকগোষ্ঠীর শাসন নেই, সেখানেও খুঁটিয়ে দেখে ভালমন্দ বিচার করার মতো ভাবনাচিন্তা ও বাক স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ নামছে। উদাহরণ স্বরূপ, ইওরোপে, রুশ আগ্রাসনের বিপদ সম্পর্কে শুধুমাত্র পুরোপুরি ভিত্তিহীন উন্মাদনাই তৈরি করা হচ্ছে না (আসল ঘটনা হল ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদ রাশিয়ার একেবারে দোরগোড়ায় গিয়ে হাজির হয়েছে, এমনকী লিথুয়ানিয়ান জার্মান সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে), পাশাপাশি গাজায় ইজরায়েলের হামলাকে পুরোদমে সমর্থন করা হচ্ছে। বস্তুত ইজরায়েলের কাজকর্মের যে কোনও সমালোচনাকেই ইহুদি বিরোধিতা বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকী গাজার গণহত্যা নিয়ে আলোচনা করার জন্য সভাও জার্মানিতে সরকারি নির্দেশে বাতিল করা হয়েছে।
এভাবে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি, তারা নয়া-ফ্যাসিবাদীদের শাসনের অধীনেই থাকুক অথবা লিবারাল বুর্জোয়াদের শাসন, দুপক্ষই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিপুল আক্রমণ নামিয়ে আনছে এবং ক্রমশ আরও দমনপীড়ন চালু করছে। নয়া-ফ্যাসিবাদী শাসন নিশ্চিতভাবেই তুলনামূলকভাবে আরও বেশি নিপীড়ন নামিয়ে আনে। তবে লিবারাল বুর্জোয়ারা খুব বেশি পিছিয়ে নেই। তাছাড়া এটা ঘটছে এমন একটা সময়ে যখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুিল তাদের সামরিক খাতে খরচ আরো বাড়িয়ে চলেছে। জার্মানি সংবিধানে একটা সংশোধন করেছে এবংতার সাহায্যে রাজকোষ ঘাটতির সিলিং তুলে দেওয়া হয়েছে। এবং জার্মানি এটা করছে যাতে সামরিক খাতে আরও বেশি খরচ করা যায়। ফ্রান্স ও ব্রিটেনও তাদের জিডিপির নিরিখে সামরিক খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়ে চলেছে। সংক্ষেপে বললে, মেট্রোপলিটান সাম্রাজ্যবাদ একটা দমনমূলক সামরিকবাদের পর্বে প্রবেশ করছে যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর দেখা যায়নি। এই সব লক্ষণগুলি গোটা বিশ্বের জনগণের কাছে অশুভ সঙ্কেত বয়ে আনছে।
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ০৩-এপ্রিল-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
