সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নারীমুক্তি ও সোভিয়েত বিপ্লব
রতন খাসনবিশ
নারীর মধ্যে কিছু স্বাভাবিক গুণাবলি আছে। এগুলি তাদের পুরুষের থেকে আলাদা করে। সেগুলির কারণে সমাজে পুরুষ শাসন হয়ত অনিবার্য হিসাবে দেখা দিতেও পারে। কিন্তু রুশ সোশাল ডেমোক্র্যাটদের অভিন্ন অবস্থান ছিল এটাই যে, মেয়েদের অধীনতার পিছনে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক উপাদানের অস্তিত্ব থাকে। সোশাল ডেমোক্রেসির প্রাথমিক কর্তব্য হল এই উপাদানগুলির অবসান ঘটিয়ে নারী এবং পুরুষের একটি সমান অধিকারের সমাজ তৈরি করা।

১৯০৯ সালে আলেকজান্দ্রা কোলনতাই একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘দ্য সোশাল বেসিস অফ উইমেন কোয়েশ্চেন’। তৎকালীন রাশিয়ায় নারীমুক্তির বিষয়টি ছিল বহু আলোচিত। জারতন্ত্রের মধ্যেই তৎকালীন রাশিয়ায় যেসব সামাজিক সংস্কারের ইস্যুগুলি তীব্র আলোচনার বিষয় ছিল, নারীমুক্তির বিষয়টি ছিল তার মধ্যে অন্যতম। এই বিতর্কে কোলনতাই এনেছিলেন একটি মার্কসবাদী মাত্রা। মনে রাখা দরকার ওই সময় নাগাদই মার্কসবাদ একটি বিশেষ শক্তিশালী মতবাদ হিসাবে ইউরোপের, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। কিছুটা মার্কসের রচনা, অনেকটাই ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের পরিপূরক রচনাগুলি এবং অগাস্ট বেবেলের মার্কসবাদী দিশায় লেখা নারীমুক্তি সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি এই সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল। রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি বিদ্যমান রুশ বিতর্কে নারী প্রশ্নটিকে দেখতে চেয়েছিল এই দৃষ্টিভঙ্গী দিয়েই। কোলনতাইয়ের বইটি ছিল এই বিষয়ে গড়ে ওঠা ভাবনাচিন্তার একটি আকর গ্রন্থ। কোলনতাই লিখেছিলেন, ‘স্পেশিফিক ইকনমিক ফ্যাক্টরস অয়্যার বিহাইন্ড দ্য সাবঅর্ডিনেশন অফ উইমেন, ন্যাচারাল কোয়ালিটিস হ্যাড বিন এ সেকেন্ডারি ফ্যাক্টর ইন দিস প্রসেস।’
রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি মেনশেভিক ও বলশেভিকে ভাগ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এটাই ছিল নারীমুক্তির দিশা অন্বেষণে তৎকালীন রুশ মার্কসবাদীদের অভিন্ন মতবাদ। নারীর মধ্যে কিছু স্বাভাবিক গুণাবলি আছে। এগুলি তাদের পুরুষের থেকে আলাদা করে। সেগুলির কারণে সমাজে পুরুষ শাসন হয়ত অনিবার্য হিসাবে দেখা দিতেও পারে। কিন্তু রুশ সোশাল ডেমোক্র্যাটদের অভিন্ন অবস্থান ছিল এটাই যে, মেয়েদের অধীনতার পিছনে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক উপাদানের অস্তিত্ব থাকে। সোশাল ডেমোক্রেসির প্রাথমিক কর্তব্য হল এই উপাদানগুলির অবসান ঘটিয়ে নারী এবং পুরুষের একটি সমান অধিকারের সমাজ তৈরি করা। নারী প্রথমত মানুষ। সুতরাং প্রয়োজন মানবিক অধিকারগুলি নারীর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রতিষ্ঠা করা, পুরুষশাসিত সমাজ সচেতন বা অবচেতন ভাবে যে কাজটি করতে চায় না। নারীর প্রাকৃতিক গুণগুলি নিয়ে যত মহান কাব্যই রচনা করা হোক না কেন, নারীও যে মানুষ, তার যে মানবিক অধিকারগুলি পাওয়া দরকার, না পাওয়ার মূল কারণ যে অর্থনৈতিক বঞ্চনা, কোলনতাইয়ের বইয়ে সেই কথাগুলি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্যণীয় যে, সোভিয়েতের পতনের পর নারীমুক্তির বিষয়টি নিয়ে আবার পৃথিবীজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়। সে সময়ে বেজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক নারী সম্মেলনে তৎকালীন মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনও তাঁর ভাষণে যে কথাটি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তা হল, নারীও আসলে মানুষ। মানুষের যত অধিকার, নারীরও তা সমানভাবে প্রাপ্য।
১৯০৯ সালে কোলনতাই যখন ‘দ্য সোশাল বেসিস অফ উইমেন কোয়েশ্চেন’ বইটি লিখেছিলেন, রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি তখন দুভাগে বিভক্ত। কোলনতাই সেসময় রুশ সোশাল ডেমোক্রেসির মেনশেভিক অংশের প্রতিনিধিত্ব করতেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আগেই তিনি মেনশেভিক অংশ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে বলশেভিক দলে যোগদান করেন। তিনি লেনিনের এপ্রিল থিসিসের সমর্থক হিসাবে প্রচারকাজে অংশগ্রহণ করেন, কারাবরণ করেন এবং ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাওয়ার পর নভেম্বরের বলশেভিক অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম যে বলশেভিক অস্থায়ী সরকার তৈরি হয়, তিনি সেই সরকারের নারীমুক্তি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব লাভ করেন। যেসব সরকারি ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বলশেভিকরা রাশিয়ার সমাজের আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল নারীমুক্তি সংক্রান্ত বিষয়টি। শিক্ষা এবং জীবিকা, দুই ক্ষেত্রেই নারীর সমান অধিকার স্বীকার করে বলশেভিক বিপ্লব। রাশিয়ায় শুরু হল এক নতুন সমাজ গড়ার প্রচেষ্টা। পুঁজিবাদ চালিত পরিবারের একটি ভণ্ড যৌন নীতিবোধ থাকে। এর একদিকে থাকে বিবাহ নামক একটি ‘পবিত্র’ প্রতিষ্ঠান যার ভিত্তি হল মেয়েদের অর্থনৈতিক পরাধীনতা, আর অন্যদিকে থাকে বেশ্যাবৃত্তি। মার্কসবাদীদের মতে এ হল একই মুদ্রার দুই পিঠ। নতুন রাশিয়া চ্যালেঞ্জের সামনে নিয়ে এল এই পুঁজিবাদী পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের ধারনাটিকেই।
নতুন রাশিয়া আনতে চাইল এমন এক সমাজ যেখানে থাকবে একটি দায়িত্বসম্পন্ন যৌন জীবন, ভালবাসার ভিত্তিতে যৌন মিলন যেখানে পরিবারের ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে, যেটা আনার জন্য সব অর্থেই নারীমুক্তির গ্যারান্টি সৃষ্টি করবে রাষ্ট্র, বিনা পয়সার গার্হস্থ্য শ্রমে যেখানে নারী বাঁধা থাকবে না। এভাবেই ঘটবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন যা আনবে সমমর্যাদাভিত্তিক সমাজ। নারীও যে মানুষ তার স্বীকৃতি থাকবে সেই সমাজে। বিনা পয়সার গার্হস্থ্য শ্রম ও যৌন দাসত্ব অথবা তার বিপরীতে বেশ্যাবৃত্তি, এই বীভৎস পরিণাম থেকে মুক্তি পাবে নারী। ১৯১৭র রুশ বিপ্লব বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিল মানবসমাজের বহুকাঙ্ক্ষিত এই সমানাধিকার ভিত্তিক পারিবারিক জীবন। বলা বাহুল্য, এটি একটি মস্ত বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। বৌদ্ধিক দিক থেকে মার্কসবাদের মূল যে শিক্ষা তার ভিত্তিতে চিন্তা করা হয়েছিল এই ধরনের একটি সমাজ। এই চিন্তা বৈপ্লবিক চিন্তা। মানবসমাজ চিরকাল এই সমাজকে কুর্নিশ জানাবে। নারী যদি মানুষ হয়, নরনারীর সম্পর্ক যদি ভালবাসাভিত্তিক যৌনতা দিয়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজন হবে এরকম একটি সমাজের। ১৯১৭ থেকে ১৯৩০ সালের ভেতরে রাশিয়া অর্জন করেছিল সেরকম একটি সমাজ, নারী যেখানে মুক্ত, পরিবার যেখানে স্বেচ্ছাশাসিত, নারী যেখানে সন্তান উৎপাদন করে একটা নতুন সমাজের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ থেকে। লক্ষ্যণীয় এই যে, আজ যারা নারীবাদী আন্দোলন করেন, নারী প্রশ্নটিতে গুরুত্ব আরোপ করার চেষ্টা করেন, তাদের মধ্যে রুশ বিপ্লবের এই অর্জনটিকে ঘিরে যথেষ্ট গুরুত্বদানের প্রবণতার অভাব রয়েছে। কারণ সম্ভবত এই যে, কোলনতাইরা যত গভীরে গিয়ে এই নারীমুক্তির প্রশ্নটি বিবেচনা করতেন, রুশ বিপ্লবোত্তর পৃথিবীতে এই আলোচনায় সেই গুরুত্বের অভাব ঘটছে।
সোভিয়েত মডেলটি ত্রুটিশূন্য ছিল না। গর্বাচভ যখন পেরেস্ত্রৈকা কর্মসূচি শুরু করেন তখন সোভিয়েত রাশিয়ার পারিবারিক জীবনে ত্রুটির দিকগুলি সামনে আসতে শুরু করে। নারী যখন মুক্তি অর্জন করে, পুরুষ সেই মুক্তিকে কতটা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করবে, এটা নির্ধারিত হয় বিদ্যমান সংস্কৃতির স্তর দিয়ে। রুশ নারীরা যখন মুক্তি পেয়েছে, পুরুষদের সঙ্গে সমান অধিকারে সমাজ গড়তে এগিয়ে এসেছে, পুরুষেরা সেটিকে কতটা ইতিবাচক হিসাবে গ্রহণ করেছে, প্রশ্ন ছিল সেখানেই। কমিউনিস্ট মতবাদে যে পুরুষ উদ্বুদ্ধ তার মধ্যে সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া আপামর রুশ পুরুষেরা এই নারীমুক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যাবে, এটা কিছুটা কষ্টকল্পিত। পারিবারিক বন্ধন সোভিয়েত জমানায় তীব্রতর হয়েছে কিনা, সে নিয়ে প্রশ্ন আছে। পুরুষের প্রবল মাদকাসক্তি, যথেচ্ছ ডিভোর্স, সন্তান উৎপাদনে অনীহা, সন্তানকে গার্হস্থ্য স্নেহে বঞ্চিত রাখা — পেরেস্ত্রৈকার আলোচনায় এই সব বিষয়গুলি সোভিয়েত পারিবারিক জীবনের সমস্যার গুরুতর দিক হিসাবে সামনে এসেছিল। সমস্যাগুলি সমাধানের অপেক্ষা রাখে। কিন্তু একারণে কখনই একথা বলা যাবে না যে, কোলনতাইদের মূল দিশা হল — নারীদের মুক্তিদানের প্রধান শর্তটি অর্থনৈতিক শর্ত। নারীর প্রাকৃতিক গুণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রধান নয় এই কারণে যে, নারীও মানুষের মতো অধিকার অর্জন করতে চায়, যে অধিকার অর্জন না করতে পারলে বাকি সব আলোচনা বৃথা। সোভিয়েত পারিবারিক জীবনে পেরেস্ত্রৈকার সময়ে যে ত্রুটিগুলি ধরা পড়েছিল সেগুলি সংশোধন করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে কারণে কোলনতাইদের বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এই বিসর্জন আসলে সেই পরিবারেরই সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে আসে যেখানে নারীর জন্য থাকে পারবারিক যৌনদাসত্ব অথবা সামাজিক যৌনদাসত্ব, যার নাম বেশ্যাবৃত্তি।
সোভিয়েত উত্তর পৃথিবীতে নারীমুক্তি নিয়ে পণ্ডিতি আলোচনার পরিসর প্রসারিত হয়েছে। নারীর প্রকৃতিক গুণাবলি কীভাবে নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় আনে, সেনিয়েও মনোজ্ঞ আলোচনা হয়ে থাকে। তবে যেটা ক্রমাগত পাশ কাটানোর চেষ্টা চলে সেটা আসলে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। নারী পারিবারিক যৌনদাসী নাকি সামাজিক যৌনদাসী, এর বাইরে নারীর পরিচয়ের অন্য একটি মাত্রা আছে — মানবিক মাত্রা। একমাত্র মার্কসবাদীরাই নারী আন্দোলনে সেই মাত্রাটি যুক্ত করার চেষ্টা করে। অক্টোবর বিপ্লব এই মাত্রাটি অর্জন করার চেষ্টা করেছিল।
আরও পড়ুন: ১৯১৭-এর বিপ্লবে আবার ফেরা
একুশ শতকের পৃথিবীতে সমাজবাদের বাস্তবতা প্রসঙ্গে
প্রকাশের তারিখ: ০৯-নভেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
