Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

কারাকাসে অপহরণ

তারিক আলি
আমি তখন কারাকাসে ছিলাম। এই শহরের সবুজে ঘেরা পূর্বদিকের প্রান্ত এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। ওই এলাকাতেই ভেনেজুয়েলার বুর্জোয়ারা থাকে। সেই রেস্তোরাঁতেই স্থানীয়রা কার্টারকে দেখে গালাগালি দিয়েছিল। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের কোথাও আমি কখনও এ-ধরনের বিরোধী দেখিনি’। যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, নির্বাচন কেমন দেখলেন? তিনি উত্তর দেন, ‘কোনও দেশে তিনি এত স্বচ্ছ নির্বাচন দেখেননি’। স্পষ্টতই তিনি এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও হিসাবের মধ্যে রেখেছি
Abduction in Caracas

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অপহরণ করেছে দিন কয়েক আগে। এই ঘটনার দু’দশক আগে উগো সাভেজ ঠিক এমন কৌশলের ভবিষ্যদ্বাণীই করেছিলেন— ‘অনেক বছর আগে একজন আমাকে বলেছিলেন: ‌‌ওরা আপনার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ আনবে যে আপনি ড্রাগ পাচারকারী— আপনি, সাভেজ— আপনি ব্যক্তিগতভাবে ড্রাগ পাচারকারী। এর মানে এই নয় যে সরকার এটাকে সমর্থন করে, কিংবা এতে তাদের অনুমতি রয়েছে— না, না, না। ওরা আপনার ব্যাপারে নোরিয়েগা ফর্মুলা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।’‌ ওরা এমন একটা পথ বের করতে চাইছে যাতে সাভেজকে সরাসরি ড্রাগ পাচারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায়। আর তাহলে ‌‘‌ড্রাগ পাচারকারী রাষ্ট্রপতির’‌ বিরুদ্ধে যা কিছু করা যাবে, ঠিক না?

৩ জানুয়ারি ভোরে ট্রাম্প শুভ নববর্ষের বার্তা টুইট করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘‌ভেনেজুয়েলা ও সে-দেশের নেতার ওপর’‌ বড়ো ধরনের হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়াকে ‘‌গ্রেপ্তার করে দেশের বাইরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’‌। ট্রাম্প জানালেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশদে আরও জানানো হবে। তবে বিশদ খবরগুলো ছিল সংশয় ও বিভ্রান্তিতে ভরা।

ওই দিনই পরের দিকে, কারাকাস থেকে আমার এক পুরোনো বন্ধু ফোন করেন। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলার সরকার ও আমেরিকানদের মধ্যে কিছুদিন যাবৎ গোপন আলোচনা চলছিল। আমেরিকা চাইছিল মাদুরোর মাথা, তবে মাদুরো তাতে রাজি হননি। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, মাদুরোকে বলা হয়েছিল তাঁকে তুরস্কে খুব আরামের অবসরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রস্তাব মাদুরো সরাসরি উপহাসের সঙ্গে উড়িয়ে দেন। এটা তাঁর বিরাট কৃতিত্ব। তেল ও আমেরিকায় ড্রাগ আমদানি নিয়ে তিনি বার বার আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। তবে একইসঙ্গে তিনি ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের ক্যারিবিয়ানে ট্রাম্পের সমরসজ্জার বিরুদ্ধে সংগঠিত করছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্টতই পছন্দ ছিল উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগেজ এবং অন্যদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। আরেকদিকে রয়েছেন আরও দুই গুরুত্বপূ্র্ণ মন্ত্রী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী– দিয়োসদাদো কাবেলো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো। সেনাবাহিনীতে দুজনেরই সমর্থন রয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্য ১০ লক্ষ। ক্যাবেল্লোর অধীনে রয়েছে গণ-মিলিশিয়া। শোনা যায়, তাদের সংখ্যা আরও বেশি। গত কয়েকমাস ধরে ট্রাম্প তাঁর শক্তিশালী নৌবহর সাজাচ্ছিলেন। এর পাল্টা মাদুরো সরকার জনগণের একাংশকে সশস্ত্র করে তুলছিল।

অতএব যে-প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তা হল, এখন কে ভেনেজুয়েলা শাসন করছে। প্রথম উত্তরটা এল ট্রাম্পের কাছ থেকে: আমরা ততদিন পর্যন্ত দেশটা চালাব, যতক্ষণ না আমরা একটা নিরাপদ, উপযুক্ত এবং বিচক্ষণ রূপান্তর ঘটাতে পারছি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন আসলে পড়ে গেছে ফাটা বাঁশের ফাঁকে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’–এর যারা সমর্থক, তারা চায় না মার্কিন সেনাদের বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হোক। এটাই ছিল ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে তাদের প্রচারের অন্যতম কেন্দ্রীয় শ্লোগান। এবং পুরোনো গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি আফগানিস্তান ও ইরাকে যা করেছিল তারা তার বিরুদ্ধে। তারা চায় না ভেনেজুয়েলার মাটিতে মার্কিন সেনারা যাক। একইসঙ্গে, কট্টর দক্ষিণপন্থী লাতিনো অভিবাসী আলট্রারা, রুবিও যাদের প্রতিনিধি, তারা বলিভারিয়রা এখনও কারাকাসে ক্ষমতায় টিকে থাকায় রীতিমতো অসন্তুষ্ট।

একটা সময়ে কথা হচ্ছিল মার্কো রুবিওকে কার্যত গভর্নর কিংবা কনসাল করে নিয়ে যাওয়া হোক এবং তিনিই ভেনেজুয়েলা সরকারকে নির্দেশ দেবেন। তবে কারাকাস থেকে আসছিল মিশ্র বার্তা। মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার পরদিন অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী ক্যাবিল্লো ঘোষণা করেন— এটা ভেনেজুয়েলার ওপর আক্রমণ। আমরাই ক্ষমতায় রয়েছি। দেশের মানুষকে বলছি শান্ত থাকতে এবং নেতাদের বিশ্বাস করতে। দেখবেন, একটা লোকও যেন হতাশ না-হয়ে পড়ে কিংবা কেউ যেন পরিস্থিতি শত্রুদের কাছে সহজ করে না-দেয়।

ডেলসি রডরিগেজকে তিন মাসের জন্য অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেছে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট। তিনিও সরকারি টিভিতে মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছেন। দ্য আটলান্টিক-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আক্রমণ করেছেন ডেলসিকে। বলেছেন, রডরিগেজ যথেষ্ট নমনীয় নন। বলেছেন, ‘যে প্রতিশ্রুতি রডরিগেজ দিয়েছেন তা তাকে অবশ্যই রাখতে হবে। এবং একই সঙ্গে  হুমকি দিয়েছেন, যেটা ঠিক কাজ সেটা ডেলসি যদি না-করেন তাহলে ওঁকে চড়া দাম দিতে হবে। সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও চড়া দাম দিতে হবে।’ ট্রাম্প আরও বলেছেন, শাসন বদল, একে যে নামেই আপনি ডাকুন না কেন, এখন যা রয়েছে তার চেয়ে সেটাই বরং ভালো। এর চেয়ে খারাপ দশা হতে দিতে পারি না।’

মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন এটা ধরতেই পারছে না যে— মাদুরো সম্পর্কে লোকে যাই ভাবুক না কেন— ভেনেজুয়েলার খুব কম লোকই নিজেদের দেশে মার্কিন আগ্রাসনকে স্বাগত জানাবেন। এই ট্র্যাডিশন চলে আসছে সাইমন বলিভারের সময় থেকে। তিনি নির্দিষ্টভাবে একথা বলেছিলেন যে, উত্তরের নতুন সাম্রাজ্য সম্পর্কে লাতিন আমেরিকাকে সাবধান থাকতে হবে। এবং স্পেনের বদলে আমেরিকার আধিপত্যের বিরোধিতা করতে হবে।

রবিবার থেকে দেশের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ চলছে মাদুরোর মুক্তির দাবিতে। কারাকাসেও একই দাবিতে বিশাল জমায়েত হয়েছে। এখন যারা ভেনেজুয়েলার শাসক তাদের সমর্থকদের বাইরেও বিভিন্ন অংশের মধ্যে মাদুরোর গ্রেপ্তারিতে ক্ষোভ রয়েছে। মাদুরো বিরোধী প্রথম সারির এক ক্যাথলিক নেতা। তাঁকে ৪ ও ৫ জানুয়ারি বিবিসি-র সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি এখন নিশ্চয়ই খুব খুশি। তিনি উত্তর দেন, ‘না, আমরা খুশি নই। আমরা চাই না আমাদের দেশ দখল হয়ে যাক। ভেনেজুয়েলার বেশির ভাগ লোকই তা চান না।’

🔍︎ আরও পড়ুন—  আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে?

সাভেজ যেমন সতর্ক করে বলেছিলেন, তেমনই ট্রাম্প ও রুবিও মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘নার্কো সন্ত্রাসের’ অভিযোগ সাজাতে চাইছেন। ইরাকে গণ বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল অদৃশ্য। সেগুলোর খোঁজ কেউ পায়নি। নার্কো সন্ত্রাসবাদ তেমনই এক অদৃশ্য অস্ত্রের পুনরাবৃত্তি। গত গ্রীষ্মে মার্কো রুবিও টুইট করেন, ‘মাদুরো ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নন। তাঁর সরকার বৈধ সরকার নয়। মাদুরো কার্টেল ডে লস সোলসের মাথা। সেটা একটা নার্কো সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। তারাই দেশটার দখল নিয়েছে। উনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড্রাগ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত।’

একথা সকলেই ভালো করে জানে যে রুবিও নিজে একটি বিশিষ্ট কোকেন পরিবারের সদস্য। গোটা দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ড্রাগ ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারে যুক্ত তার আত্মীয়েরা। বিদেশ সচিব হিসাবে এই মহাদেশের প্রতিটি মার্কিনপন্থী সরকারে তিনি বসিয়েছেন ড্রাগ ডিলারদের। এটা আশ্চর্যের নয় যে, কেউ কেউ বলছে মাদুরোর ওপর এই হামলা আসলে হতে পারে রুবিওর একটা চাল, যাতে মার্কিন মদতপুষ্ট ড্রাগ চালানকারীদের রক্ষা করা যায় আরও স্বশাসিত ড্রাগ ডিলারদের হাত থেকে। আমরিকায় তেমন ডিলার অনেক আছে।

আরেকটা পরিহাস হল ডেল্টা ফোর্স। আমেরিকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দমনের বিশেষ বাহিনীর টিম, যারা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করেছে, তাদের সম্পর্কে এই কথাটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, তারা নিজেরাই ড্রাগ চালানকারী নেটওয়ার্ক এবং কাজ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। তদন্তকারী সাংবাদিক সেথ হার্পের দ্য ফোর্ট ব্র্যাগ কার্টেল: ড্রাগ ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড মার্ডার ইন দ্য স্পেশাল ফোর্সেস (২০২৫) বইটি নথিবদ্ধ করেছে নর্থ ক্যারোলিনার ফেয়েট্টেভিলের বাইরে মার্কিন সেনার যে ঘাঁটি রয়েছে সেখানে কীভাবে খুন ও ড্রাগ পাচার হত। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার বেস্টসেলারের তালিকায় উঠে এসেছে হার্পের বইটি এবং বইটির সমালোচকেরা মূলত মেনে নিয়েছেন যে বইতে যা লেখা হয়েছে তা সঠিক। সুতরাং, এই অপরাধমূলক মার্কিন অভিযান চালিয়েছে সে-দেশের নিজেদেরই ড্রাগ কার্টেল। তাই এই অভিযান চালাতে তাদের কোনও লজ্জাবোধ কিংবা তেমন কোনও অনুভূতিই নেই। ওরা এমনটাই করে থাকে। ভাবে যদি তারা কয়েকটা সাফল্য দেখাতে পারে তাহলে লোকেরা এ-নিয়ে আলোচনা চালিয়েই যাবে।

এখন আমরা দেখছি অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বনডি তথাকথিত অভিযোগগুলি টুইট করছেন, যে অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে এক ধরনের পাগলামি—নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস অভিযুক্ত হয়েছেন নিউ ইয়র্কের দক্ষিণের জেলায়। মাদুরোর বিরুদ্ধে নার্কো সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। রয়েছে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, তার হেফাজতে ছিল মেশিনগান এবং বিধ্বংসী জিনিসপত্র, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মেশিনগান এবং বিধ্বংসী জিনিস রাখার ষড়যন্ত্র।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও আইনজীবী, যাদের বোধবুদ্ধি রয়েছে, তারা কিছুতেই মুখের কথায় এই অভিযোগ বিশ্বাস করবেন না। পুরো বিষয়টাই একটা ধাপ্পা। একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি, তার রাজধানীতে বোমা ফেলে তাকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছ, এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছ যে অটোমেটিক অস্ত্র নিজের হেফাজতে রাখার ষড়যন্ত্রের তিনি অংশীদার, এটা বিচিত্র ও উদ্ভট। বনডি একটা লোক দেখানো বিচারের আয়োজন করছেন। তবে বিষয়টা যত সহজ হবে বলে তিনি ভাবছেন ততটা সহজ নয়। সন্দেহ নেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সেরা আইনজীবী মাদুরোর হয়ে মামলা লড়বেন। এ থেকেই বোঝা যায়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় নিয়োগ করা হয়েছে আনুগত্যের ভিত্তিতে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। তাদেরই বেছে নেওয়া হয়েছে যারা রাষ্ট্রপতি ও তাঁর উদ্ভট আইডিয়াগুলো নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলবেন না। ভ্যানিটি ফেয়ার-এ ট্রাম্পের চিফ অফ স্টাফের সাক্ষাৎকার থেকেই তা স্পষ্ট। দেশে কোনও ভালো বিরোধীপক্ষ নেই যারা মার্কিন কংগ্রেসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিতে পারে। এতেই বোঝা  যায়, আমেরিকান বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে কেমন ক্ষয় ধরেছে।

🔍︎ আরও পড়ুন—  ভেনেজুয়েলায় একতরফা মার্কিন আগ্রাসন

সাভেজ নিজেও উল্লেখ করেছিলেন এবং আরও অনেকে এটা খেয়াল করেছেন যে, এটা হল নোরিয়েগা চিত্রনাট্য। তবে মাদুরোর দুর্বলতা যাই থাকুক না কেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে নোরিয়েগার সঙ্গে মাদুরোর তুলনা করা যায় না। পানামার ওই স্ট্রংম্যান ১৯৫০ সালে থেকে সিআইএ-র হয়ে কাজ করেছিলেন। দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে অস্ত্রের যোগান দিয়েছিলেন। ড্রাগের ব্যবসায় নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। শেষে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার বিবাদ শুরু হয়। কুখ্যাত স্কুল অফ দ্য আমেরিকাজ-এ তাঁকে অত্যাচার করার ট্রেনিং দেওয়া হয়। সেখানেই অসংখ্য তোলাবাজ ও মাস্তানকে, এবং ড্রাগ পাচারকারী অর্থ লুঠেরাদের প্রথম অভিজ্ঞতা হয় তাদের কাছ থেকে কী চাওয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেছে। যদিও তারা যেটাই চেয়েছিল তাদের জন্য নোরিয়েগা সেটাই করেছিলেন। জাতীয় সার্বভৌমত্ব কী— সে বিষয়ে আস্তে আস্তে তাঁর ধারণা তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ই এইচ ডব্লিও বুশের সরকার ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বিচ্ছেদের পরেই আসে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন। তারপর যৌথ ডেল্টা-সিল বাহিনী তাকে তার প্রাসাদ থেকে তুলে নিয়ে আসে এবং ইউ এস মার্শালদের হাতে তুলে দেয় ভুয়ো বিচারের আগে বন্দি করা রাখার জন্য।

তবে আরও একটা নজির রয়েছে যা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। জ্যাঁ বারট্রান্ড অ্যারিসটাইডের উদাহরণ। ১৯৯০-এর গোড়ার দিকটায় তিনি ছিলেন হাইতির রাষ্ট্রপতি। এরপর ২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে আবারও তিনি রাষ্ট্রপতি হন এবং ২০০৪ সালে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। গোড়ায় তিনি ছিলেন মডারেট রাজনীতিক। অ্যারিসটাইডের এ-কথা বলার মতো সাহস ছিল যে, ফ্রান্সের উচিত হাইতিকে বিপুল ক্ষতিপূরণের টাকা ফেরত দেওয়া। কারণ ১৭৯১ থেকে ১৮০৪-এর হাইতির বিপ্লবের পর দাসত্ব প্রথা তুলে দেওয়ার ফি হিসাবে হাইতিকে বাধ্য করা হয়েছিল তাদের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভুকে বিপুল টাকা দিতে। সেটা আজকের হিসাবে ২১ বিলিয়ন ডলার। প্যারিস ভয় পেল, হাইতির দবি মেনে নিলে সেটা আলজিরিয়ার সামনে একটা নজির হয়ে থাকবে। ২০০৪ সালে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে ফরাসি ও হাইতির অফিসারেরা অ্যারিসটাইডকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

এখানে ছোটো করে একটা ঘটনার কথা বলে নেওয়া দরকার। ২০০৪ সালের বসন্তে আমি একটা সম্মেলনে যোগ দিতে কারাকাসে গিয়েছিলাম। তখনই এই ফ্রাঙ্কো-মার্কিন অভিযান চলছিল। অ্যারিসটাইডকে অপহরণের পর দিন আমি সাভেজকে বললাম, ‘আপনি ওঁকে কেন আশ্রয় দিলেন না?’ উনি বললেন, ‘আমি এতটাই বিচলিত যে আপনাকে বোঝাতে পারব না। উনি আমাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলেন। আমরা কনফারেন্সে ব্যস্ত ছিলাম। যখন খবরটা আমি পেলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ওঁকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমার অনুশোচনা হচ্ছে।’ আমি বললাম খুব শিগগিরই আমি জোহানেসবার্গ যাব একটা বক্তৃতা দিতে। সাভেজ বললেন, ‘দয়া করে চেষ্টা করবেন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে। ওঁকে বলবেন আমাদের এখানে উনি স্বাগত। এই সব দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ওঁকে নিজের অঞ্চলেই ফিরে আসতে হবে।’ আমি সাভেজের বার্তা অ্যারিসটাইডকে দিয়েছিলাম। তবে আমার মনে হয়েছিল, প্রিটোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল যে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকাতেই রাখা হবে যতদিন না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে হাইতি ফেরার অনুমতি দেয়। এই দীর্ঘ তালিকাতেই সাম্প্রতিকতম সংযোজন মাদুরো।

মাদুরোর বিরুদ্ধে হামলা মনে করিয়ে দিচ্ছে সাভেজের বিরুদ্ধে হামলার কথা। পশ্চিমী মিডিয়া ক্রমাগত অভিযোগ করে গেছে যে তিনি ডিক্টেক্টর। কেন? কারণ সাভেজ সামরিক পোশাক পরতেন। তবে সাভেজ ছিলেন দারুন জনপ্রিয় এবং নির্বাচনের পর নির্বাচন জিতেছেন। সব বিষয়ে তাঁর চেয়ে জঘন্য লোকের দেখা পেতে হলে উপসাগরীয় দেশে বা সৌদি আরবে যাবার দরকার ছিল না। সাভেজের রাডিক্যাল-গণতান্ত্রিক সংবিধান— এমনকী দরকার হলে গণভোটে রাষ্ট্রপতিকেও ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা— সেই সংবিধান পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিল দক্ষিণন্থী বিরোধীপক্ষ। অথচ তারাই এই ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাকে সাভেজের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল।

জিমি কার্টার ভেনেজুয়েলায় গিয়েছিলেন সেখানকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। আমি তখন কারাকাসে ছিলাম। এই শহরের সবুজে ঘেরা পূর্বদিকের প্রান্ত এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। ওই এলাকাতেই ভেনেজুয়েলার বুর্জোয়ারা থাকে। সেই রেস্তোরাঁতেই স্থানীয়রা কার্টারকে দেখে গালাগালি দিয়েছিল। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের কোথাও আমি কখনও এ-ধরনের বিরোধী দেখিনি’। যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, নির্বাচন কেমন দেখলেন? তিনি উত্তর দেন, ‘কোনও দেশে তিনি এত স্বচ্ছ নির্বাচন দেখেননি’। স্পষ্টতই তিনি এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও হিসাবের মধ্যে রেখেছিলেন।

সাভেজ সবসময় এ-বিষয়ে জোর দিতেন যে, বলিভারিয় বিপ্লবকে অবশ্যই হতে হবে একটা গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা— এবং সেটাই ঘটেছিল। অনেকেই, এমন কী আমিও, এই বিষয়টি নিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ২০০৪-এর গণভোটের প্রথম ফল যখন আসতে শুরু করল, আমি সাভেজকে প্রশ্ন করি, ‘কম্পানেরো, কী করবেন যদি আমরা হেরে যাই?’ উনি বললেন, ‘কী আর করব যদি হেরে যাই? রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিতে হবে এবং আবার বাইরে থেকে লড়তে হবে। বোঝাতে হবে কোথায় লোকে ভুল করেছে।’ এ-বিষয়ে তাঁর বোধ অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। ফলে যখন একেবারে গোড়া থেকেই সাভেজের সমর্থকদের বলা হয় তারা গণতন্ত্র বিরোধী, তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ প্রতারণা। সাভেজের আমলে বিরোধী কাগজ আর টিভিগুলো একটানা প্রচার চালিয়ে সাভেজের সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে— এই জিনিসটা কখনও ব্রিটেন বা আমেরিকায় দেখা যায় না। যখন লোকেরা সাভেজকে বলত, এবার তাহলে ওদের গুঁড়িয়ে দিই? উনি বলতেন, ‘না। আমরা ওদের বিরুদ্ধে লড়ব রাজনৈতিকভাবে।’

২০১৩ সাল থেকে এই শাসন কিছুটা ফাঁপা হতে শুরু করে। মাদুরো ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিতেছেন বলেছেন। তবে লুলা যখন এই জয়ের প্রমাণ দিতে বলেন তখন মাদুরো তা দিতে পারেননি। অর্থনৈতিকভাবে, এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, বলিভারিয়রদের খুবই খারাপ পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এটা হয়েছিল এমনকী সাভেজের সময়েও। সেরা কেইনসীয় অর্থনীতিবিদেরা সেখানে হাজির হয়েছিলেন। ছিলেন ডিন বেকার ও মার্ক ওয়েইসব্রট। ছিলেন জোসেফ স্টিগলিৎস। তবে তাদের সুপারিশ মানা হয়নি। সেই সময়ে সম্ভবত ভালো হত যদি বলিভারিয়ানরা চীনাদের পরামর্শ চাইত। তবে মার্কিন অবরোধের কারণেই সত্যিকারের অর্থনৈতিক অধোগতি শুরু হয়েছিল। তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা, যা ২০১৭-১৮ সালে ট্রাম্প চালু করেন ও বাইডেন তা জারি রাখেন, এর জেরে ৭০ লক্ষ লোক দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তখন দেখা গিয়েছিল ভেনেজুয়েলার শরণার্থীরা ভিড় করেছেন মায়ামিতে, কলম্বিয়ায় এবং লাতিন আমেরিকার অন্যত্র। ওয়াশিংটন বুঝে গিয়েছিল যে অবরোধে কাজ হচ্ছে।

ভেনেজু্য়েলার সেনাবাহিনীর সমর্থনও এসেছিল অনেক মূল্য দিয়ে। সাভেজের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের অভ্যুত্থানের চেষ্টার পর, আমি তাঁকে বলি, ‘এখনই আপনার সুযোগ এসেছে সেনাবাহিনীকে ব্যাপক হারে ঢেলে সাজানোর।’ কিন্তু তিনি বলেন, ‘কাজটা করা এত সহজ নয়। এখন সব সিনিয়র জেনারেলদের সরানো হচ্ছে। এরা আমার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের কথা হয় জানতেন কিংবা তাতে জড়িত ছিলেন।’ তখন আমি বলি, ‘বেশ। তবে কাজটা আপনি করছেন যথেষ্ট উদারতা দেখিয়ে। কারণ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভ্যুত্থানের চেষ্টা হত, তাহলে খুব সম্ভবত দেশদ্রোহের অভিযোগে শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হত। এবং বাকি জেনারেলদের বহু বছর ধরে জেলবন্দি রাখা হত। তবে আপনি খুবই উদার। এমন বেশ কিছু জেনারেলকে আপনি রেহাই দিয়েছেন।’ উনি বললেন, ‘দুর্গন্ধটাকে চলে যেতে দেওয়াই বরং ভালো।’ তখনই আমার মনে হয়েছিল, এটা একটা দুর্বলতা।

তবুও, দীর্ঘ একটা সময় ধরে, বলিভারিয় শাসন রাডিক্যাল গণতন্ত্র, সুদূর প্রসারী সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি, সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী বিদেশ নীতিকে সমন্বিত করেছিল। এটাই ছিল নক্ষত্র-সমাবেশ। কিউবার অবদানও ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলি ছিল মিসিওনেস এবং বাকি যা কিছু। কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে পাঠ দেওয়ার মতো কিউবানদের কিছু ছিল না। ফলে অর্থনৈতিক অবরোধের ফাঁস যখন চেপে বসতে লাগল, তখন কারাকাস কার্যত সাভেজপন্থী সব সংস্কার কর্মসূচি ত্যাগ করেছিল। ২০১৯ সাল থেকে তারা ঝুঁকেছিল বি-ডলারিকরণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির দিকে। বিদেশ নীতিতে তারা সেই পথে যায়নি। মার্কিন অবরোধের কারণে কিউবায় তেল সরবরাহ তারা অনেকটা কমিয়েছিল, তবে হাভানাকে পরিত্যাগ করেনি। গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে ভেনে‌জুয়েলা। তাতে নিশ্চিতভাবে ক্রুদ্ধ হয়েছিল আমেরিকানরা। পরে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিল, ভেনেজুয়েলায় তারা চায় রুবিও-ট্রাম্প সরকার, যেটা ১০০ শতাংশ তাদের সরকার।

সরকারি স্তরে, প্রত্যাশিতভাবেই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কিছুটা মূক। স্বাভাবিকভাবেই চীন, রাশিয়া এবং আরও অনেক শক্তি মার্কিন আগ্রাসন ও অপহরণের নিন্দা করেছে। দাবি করেছে, এখনই মাদুরো এবং সিলিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে ইউরোপিয়রা অবশ্য তাদের রক্ষাকর্তার পাশেই দাঁড়িয়েছে। যদিও তাদের মধ্যে বেশি পরিমাণ দোদুল্যমানতার ছাপ রয়েছে। বরং গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যাকাণ্ডে তাদের অবস্থান ছিল তুলনায় স্পষ্টতর। ম্যাক্রঁ প্রাথমিকভাবে একটা বিবৃতি দিয়ে মাদুরোর অপহরণে ভেনেজুয়েলার বাসিন্দাদের আনন্দে নাচানাচি করতে বলেছিলেন। তারপর বিষয়টা তিনি দ্বিতীয়বার ভেবে দেখেন। তখন আরেকটা বিবৃতি দেন। বলেন, ফ্রান্স মার্কিন পদ্ধতির ‘সমর্থন কিংবা বিরোধিতা কিছুই করছে না’। এবং তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে তৃতীয় একটি বিবৃতি দেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি। বলেন, তিনি চান ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণ উত্তরণ যার নেতৃত্বে থাকবেন এডমুন্ডো গনজালেজ উরুটিয়া। মেয়ার্স মনে করেন, অপহরণ আইনসিদ্ধ কিনা তা একটা জটিল বিষয়। স্টারমারের মতামতও ফাঁকি দিয়ে পালানোর মতো। ট্রাম্পের কোনওরকম সমালোচনা তিনি করেননি। শুধু বিড়বিড় করে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে।’

ইউরোপের নাগরিকেরা দ্বিচারিতা দেখে দেখে অভ্যস্ত। একদিকে রয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাদের বিশতম নিষেধাজ্ঞা জারির প্যাকেজ তৈরি করছে। অন্যদিক রয়েছে তাদের সবচেয়ে পছন্দের দেশ ইজরায়েল। ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা— এটা এখন হল তৃতীয় একটা মানদণ্ড। তুলনায় দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর অবস্থান সোজাসাপটা। তারা এই ঘটনাকে বলেছে ‘শেষ বিচারের দিনের সাম্রাজ্যবাদ’। তাদের মতে, ‘এ হল বিশ্বে আমেরিকার স্থান নির্দিষ্ট করার জন্য একটা বিপজ্জনক ও অবৈধ পথ।’ এই পত্রিকা রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে যাঁরা তাঁদের কংগ্রেসের ভাষণে ট্রাম্পের পথের বিরোধিতা করে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। এরা হলেন সেনেটর রান্ড পল, লিজা মুরকোওয়াস্কি এবং রিপ্রেজেনটেটিভ থমাস ম্যাসি ও ডন বেকন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরও বিরোধী মত দেখা যেতে পারে। নিউ ইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান মামদানি একটি সার্বভৌম দেশের ওপর একতরফা হামলাকে বলেছেন এটা আসলে যুদ্ধ। ইতোমধ্যেই আমেরিকার ৮টি শহরে প্রতিবাদ ফেটে পড়েছ। বলিভারিয় সাধারণতন্ত্রের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন শুধু ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎই বিপন্ন নয়। কিউবার বিপ্লবের ভবিষ্যৎও বিপন্ন। কিউবাই আমেরিকার প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। হতে পারে এটাই হবে আমেররিকার শেষ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। কিউবা আমেরিকার দ্বারা অবরুদ্ধ এবং আঘাতে আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। প্লায়া গিরনে একটা আগ্রাসনকে পরাস্ত করা হয়েছে। তারপরেও চলছে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, ক্রমাগত হামলা, ক্রমাগত মিথ্যা প্রচার। ভেনেজুয়েলার তেল ছাড়া, বলিভারিয়রা ক্ষমতায় আসার পর থেকে যা কিউবায় বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছিল, কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কারণ রয়েছে।

তবে আমেরিকা যা প্রত্যাশা করছে বাস্তব তার থেকে কঠোর হতে পারে। কারাকাসে বিক্ষোভ ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটা হুঁশিয়ারি হতে পারে। গত কয়েকদিন ধরে ডেলসি ক্রমাগত জঙ্গি ভাষণ দিচ্ছেন, যা ঘটেছে তাকে আক্রমণ করছেন, আবার আমেরিকানদের আশ্বস্ত করারও চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প বলছেন, ‘উনি কী বলছেন তাতে আমরা আগ্রহী নই। আমরা দেখতে চাই উনি কী করছেন।’ ট্রাম্প সঠিক কথাই বলছেন। তবে অনেক কিছুই শুধুমাত্র ডেলসির ওপর নির্ভর করবে না। কারণ তিনি একজন প্রতীকি প্রধান মাত্র। অনেকটাই নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর ওপর এবং সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্বিধায় পড়তে হতে পারে। বলিভারিয়রা এখনও ভেনেজুয়েলার সেনা বাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিয়ন্ত্রণ করে আদালত, তেল শিল্প। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের সব স্তরে তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

আবেগ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মাদুরোর ছেলে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতেই এটা স্পষ্ট। আমরা জানি যে, রডরিগেজ সরকার আলোচনা চালাচ্ছে। কিন্তু যদি ট্রাম্প এবং রুবিও তাদের চাপ তুঙ্গে নিয়ে যান, মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে যে কঠোর শত্রুতার মনোভাব রয়েছে, তাতে কারাকাস বাধ্য হতে পারে কোনও এক ধরনের প্রতিরোধে যেতে। যদি কখনও রডরিগেজ অ্যান্ড কোম্পানি খেলতে অস্বীকার করে, ট্রাম্প তাঁকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হতেও পারেন, কিন্তু রুবিও শিবির তা পারবে না। এই পর্যায়ে কারাকাসকে একটা পুতুল সরকার হিসাবে কাজে লাগানোর চেষ্টার যুক্তি কাজে লাগতে নাও পারে। তখন লাইনটা হবে, ‘ঠিক আছে, ওরা বিশ্বাসঘাতক, চলো ওদের দেশে গিয়ে ওদের ঘাড় মটকে ধরি।’ তখন শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনার বুটের পদভারে কাঁপবে ভেনেজুয়েলা। ফলে তখন পরিস্থিতি দ্রুত গোলমেলে হয়ে উঠবে। এর ফলে ট্রাম্পের নিজের শিবিরের মধ্যেই বিপুল উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। কারণ তিনি বারে বারে শপথ করে বলেছিলেন যে, এই কাজটা তিনি করবেন না।

২০০৫ সালে সাভেজ তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘ফিদেল একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘সাভেজ, যদি কখনও তোমার বা আমার ক্ষেত্রে এ-ঘটনা ঘটে, যদি ওরা আমাদের দেশে আগ্রাসন চালায়, তাহলে সাদ্দাম যে কাজটা করেছিলেন সেটা আমরা কখনও করব না: সেটা হল গর্তে গিয়ে লুকিয়ে পড়া। তোমাকে লড়াই করেই মরতে হবে। লড়াইয়ের প্রথম সারিতেই থাকতে হবে। এবং আমিও সেটাই করব— যদি আমাকে মরতে হয় আমি যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েই মরব। মরব ভেনেজুয়েলার দেশপ্রেমিকের মর্যাদা নিয়েই।’

অতএব, এখন কোনও কিছুরই এখনও নিষ্পত্তি হয়ে যায়নি।

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
ঋণ: নিউ লেফট রিভিউ


প্রকাশের তারিখ: ০৯-জানুয়ারি-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

লেখাটি ভালো হয়েছে।
- Chandan Sarkar, ০৯-জানুয়ারি-২০২৬


দারুণ লিখেছেন, ধন্যবাদ আপনাকে ৩২ বছর হয়ে গেল ব্রাজিল বাস করছি ,এর আগে ৭ বছর লিবিয়ায় ছিলাম, দেশে বাম রাজনীতির সাথে ছিলাম, নেতা ছিলেন আ ফ ম মাহবুবুল হক মাহবুব, মঈন উদ্দিন খান বাদল, আখতারুজ্জামান ডাকসুর সাবেক ভিপি ও মান্না ভাই, আলী রিয়াজ ভাই ছিলেন আমাদের দলে ,ল্যাটিন খুব ভাল লাগে ওরা খুবই সুখী ওদের থেকে শিখেছি, কি ভাবে সুখে থাকতে হয় । ধন্যবাদ আপনাকে
- Sirajul Hoque Sirajul, ১২-জানুয়ারি-২০২৬


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬