সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
‘আপন হতে বাহির হয়ে’
মহম্মদ সেলিম
সংসদে অমিত শাহ নতুন কিছু বলেননি। ওদের দাবি, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিনের ছবি কেন থাকবে? আমাদের পার্টির রাজ্য দপ্তরে সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের ঘরে তো এঁদের কারো ছবি নেই। আছেন শুধু রবীন্দ্রনাথ। শিল্পী অন্য কেউ নন, সনাতন দিন্দা। নিচে কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের মূর্তি। বাড়ির নাম মুজফ্ফর আহ্মদ ভবন। দিল্লিতে পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরের বাড়ির নাম এ কে গোপালন ভবন। পার্টির নতুন বাড়ির নাম হরকিষেন সিং সুরজিৎ ভবন। যেমন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরের নাম অজয় ভবন। বরং, নেপালে সঙ্ঘের নেপালি সংস্করণ এইচএসএসের সদরদপ্তরের নাম কেশব ধাম (সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের স্মরণে), যেমন দিল্লিতে কেশব কুঞ্জ। বীরগঞ্জে পশুপতি শিক্ষা মন্দিরে প্রধান শিক্ষকের ঘরের নাম ‘হেডগেওয়ার রুম’। স্কুলের তিনতলায় সঙ্ঘের দ্বিতীয় সর-সঙ্ঘচালক গোলওয়ালকারের ছবি।

বছরদুয়েক আগের বিজয়া দশমী। নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সদরদপ্তরে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত ব্যবহার করেন এক নতুন শব্দবন্ধ– সাংস্কৃতিক মার্কসবাদী।
যদিও, ভাগবতের এই শব্দবন্ধ মোটেই ‘ভারতীয়’ নয়। বিদেশ থেকে আমদানি করা। যেমন বলে ফেলেছেন সঙ্ঘের তাত্ত্বিক নেতা রাম মাধব, ‘সাংস্কৃতিক মার্কসবাদ ও জাগ্রতবাদ নিয়ে তাঁর সমালোচনায়, (এবার) পশ্চিমের অনেক বন্ধু খুঁজে পাবেন ভাগবত’ (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৮ অক্টোবর, ২০২৩)।
রাম মাধব ঠিকই বলেছেন। সাংস্কৃতিক মার্কসবাদকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে শোনাতে পারে, তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ, বিষাক্ত ইতিহাস (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮)। একশো বছর ধরে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা এটি ব্যবহার করে আসছেন। এখন নব্য ফ্যাসিবাদীরা প্রায়শই ব্যবহার করে চলেছেন। ফ্যাসিবাদ গোড়া থেকেই মার্কসবাদকে কখনও ইহুদি বলশেভিকবাদ, বা কখনও সাংস্কৃতিক মার্কসবাদ বলে দেগে দিয়ে আক্রমণ শানিয়েছে। নরওয়ের উগ্র দক্ষিণপন্থী আন্ডের্স ব্রেইভিক, যিনি ২০১১-র জুলাইয়ে অসলোয় এক সামার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ৭৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছেন, তিনি তাঁর দেড় হাজার পাতার ইশ্তেহারে ৬০০-বার উল্লেখ করেছেন এই শব্দবন্ধ।
কে-না জানেন, দেশের ভিতরে-বাইরে শত্রু খোঁজা স্বৈরাচারী শাসনের এ এক অতি পরিচিত রণনীতি। ভারতে, বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলি, যারা— সঙ্ঘের ফ্যাসিস্ত মতাদর্শ ও ভারতীয় সমাজের বহুত্বের পরম্পরাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মোদী সরকারের কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপের বিরুদ্ধাচারণ করে চলেছেন— তাঁদের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ছড়াতেই ভাগবত এই শব্দবন্ধটি আমদানি করেছেন। ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’ থেকে বামপন্থীদের বিচ্ছিন্ন করে দেখাতেই ধার করেছেন পশ্চিমের উগ্র দক্ষিণপন্থীদের ভাষা ও ভাষ্য।
বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের পাশপাশি প্রগতিশীল লেখক-গবেষক-অধ্যাপক সমাজের বিরুদ্ধতার কণ্ঠরোধ করতেই এই কুৎসা অভিযান: কমিউনিস্টদের সবকিছুই বিদেশের— ওদের দর্শন, বিশ্বাস, প্রবক্তা, তীর্থ— সবকিছুই এসেছে বিদেশের মাটি থেকে— বহিরাগত।
উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানের সঙ্গে-সঙ্গেই জোরালো হচ্ছে এই প্রচার। এখন কথায় কথায় ‘বহিরাগত’ তকমা সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা। যদিও, এই প্রবণতা শুধু এদেশে নয়। গোটা বিশ্বেই উগ্র দক্ষিণপন্থীদের পরিচিত কৌশল: জেনোফোবিয়া— বিদেশিদের সম্পর্কে অহেতুক ভীতি-আতঙ্ক তৈরি। ট্রাম্প আমেরিকায় করছে। ফ্রান্সে করছে লি পেনের নব্য-ফ্যাসিবাদী দল ন্যাশনাল র্যালি, জার্মানিতে নয়া নাৎসি অলটারনেটিভ ফর জার্মানি, ইতালিতে মুসোলিনির উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ব্রাদার্স অব ইতালি থেকে স্পেনে নব্য ফ্র্যাঙ্কোবাদী ভক্স পার্টি— প্রত্যেকেরই একই কৌশল।
আর ভারতে, আরএসএস সেই কবে থেকেই তো শত্রু চিহ্নিত করে রেখেছে। সঙ্ঘের সর্বোচ্চ মার্গদর্শক, দ্বিতীয় স্বরসঙ্ঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর বাঞ্চ অব থটস-এ ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ তিনটি ‘অভন্তরীণ বিপদ’কে চিহ্নিত করেছিলেন: মুসলিম, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট। তীব্র মুসলিম-বিদ্বেষী বয়ানে ‘গুরুজি’ গোলওয়ালকর লিখেছিলেন, এই দেশে মুসলমানদের যদি থাকতে হয়, তবে থাকতে হবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য মেনে, তাহাদের অত্যাচার সহ্য করে।
মোদী, মোহন ভাগবতরা এখন তেমনই বলছেন। নতুন কিছু নয়। কমিউনিস্টদের সবকিছুই বিদেশের। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন থেকে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো।
।দুই।
কে বলবে, এই বিশ্বের সমস্ত আবিষ্কার, ধ্রুপদি মতাদর্শ, অনন্য চিন্তা-ভাবনা, অনিন্দ্যসুন্দর সাহিত্য-দর্শন, অপরূপ ভাস্কর্য-শিল্পকলার মধ্যে রয়েছে এক সর্বজনীন আবেদন। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসা কি শুধুই ইতালির! তবে আজও কেন এই দূর বাংলার প্রতিটি মহল্লায় মেলে কোনও না কোনও মোনালিসার সন্ধান। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে মাইকেল অ্যাঞ্জোলোর রেনেসাঁ ভাস্কর্যের মাস্টারপিস ডেভিডের মূর্তি! কিংবা ভ্যান গখ, পিকাসোর অসাধারণ কাজ! শুধুই কি ইতালি, নেদারল্যান্ড, স্পেন কিংবা ফ্রান্সের। শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ কি শুধুই ব্রিটেনের, তবে আজও কেন তা মঞ্চস্থ হয় এই বাংলায়। কিংবা গোর্কির ‘মা’ অবলম্বনে ব্রেশটের লেখা নাটক ‘ডী মুটার’! পাভেলের মৃত্যুতে মা ভেঙে পড়েছেন, তাঁর উদ্দেশে শ্রমিকদের গান তর্জমা করছেন উৎপল দত্ত! কোথায় গোর্কি, কোথায় ব্রেশট, আর কোথায় উৎপল দত্ত— মিলেমিশে একাকার।
আলবার্ট আইনস্টাইন জার্মান বলে কি পড়ানো হবে না আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র! জেনারেল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি! যদি না পড়ি, কীভাবে বুঝব একশো বছর আগে জটিল অঙ্ক কষে তিনি যা যা বলেছিলেন, তার প্রায় সবটুকুই ঠিক। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড মোটামুটি তাঁর বলে দেওয়া গাণিতিক নিয়মেই চলে। চলছে। নোবেল-জয়ী কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান একদা বলেছিলেন: বিজ্ঞানের আবিষ্কার, বিজ্ঞানীর জীবন এক-একটি মহাকাব্য। দুঃখের হল, এ-সব লেখার জন্য কোনও হোমার নেই। ঠিকই তো, ইলিয়াড, ওডিসি কি শুধুই গ্রিসের? রামায়ণ, মহাভারত কি কেবলই ভারতের! অথবা, বিস্ময়-প্রতিভা মোজার্ট-বেঠোভেনের সুরের মূর্ছনা কেবলই কি অস্ট্রিয়ার!
কোথায় রুশদেশে ভ্লাদিমির লেনিন, আর কোথায় ইকুয়েদর— অথচ, লাতিন আমেরিকার পৌনে দু’কোটির এই একরত্তি দেশটিতে ১৯৫০-২০১৫ সালের মধ্যে ১৮,৪৬৪ জনের নাম রাখা হয়েছে লেনিন! সংখ্যায় এগিয়ে স্তালিন: ১৮,৭২৮ (মিয়ামি হেরাল্ড, ৩ এপ্রিল, ২০১৭)!
ওরা বলে হিন্দু, হিন্দুস্থান, হিন্দুত্বের কথা।
সামান্যতম ইতিহাস জ্ঞান-ও বলে, খোদ ‘হিন্দু’ শব্দটা পর্যন্ত পারসিকদের দেওয়া। সিন্ধু নদের সঙ্গে সম্পর্কিত, স্থান (স্তান) শব্দটির অর্থ জায়গা। বিবেকানন্দও বলেছেন। আমেরিকা থেকে ফিরে জাফানা-বক্তৃতায়। প্রাচীন পারসিকদের উচ্চারণে ‘সিন্ধু’ শব্দই পরিণত হয় ‘হিন্দু্’-রূপে। তাঁরা সিন্ধু নদের অপর তীর-বাসী সকলকেই বলতেন হিন্দু।
‘হিন্দুত্ব’ আর হিন্দু ধর্ম এক নয়। মোদীর ‘বীরপুরুষ’ বিনায়ক দামোদর সাভারকার নিজেই বলেছেন সেকথা: ‘হিন্দুত্ব একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই।’ এই হিন্দুত্ব কেমন? তা-ও বলেছেন তিনি। তাঁর উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড-এ ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ বস্তুতই হিটলারের মডেলে তৈরি: ‘জার্মানদের জাতিত্বের গর্ব আজ মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জাতীয় সংস্কৃতিকে কলুষমুক্ত করতে জার্মানি গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে সেমিটিক জাতি— ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়ন করেছে। জাতিত্বের গর্ব এখানে তার সর্বোচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। জার্মানি এটাও প্রমাণ করেছে যে, নিজস্ব ভিন্ন শিকড় আছে এমন জাতি বা সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা তৈরি করা অসম্ভব। এই শিক্ষা হিন্দুস্থানে আমাদের গ্রহণ করা এবং তার থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।’
সঙ্ঘের দ্বিতীয় স্বরসঙ্ঘচালক কার থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন? হিটলারের থেকে। মতাদর্শগতভাবে সঙ্ঘ মুসোলিনি, হিটলারের অনুগামী সংগঠন।
সঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বি এস মুঞ্জে ১৯৩১ সালের মার্চে দশদিনের সফরে গিয়েছিলেন ইতালিতে। ১৯ মার্চ, রোমে ফ্যাসিস্ত জমানার সদরদপ্তরে গিয়ে দেখা করেন বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মুগ্ধ হয়ে ঘুরে দেখেন ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট অ্যাকাডেমি, মিলিটারি কলেজ, সেন্ট্রাল মিলিটারি স্কুল। মুসোলিনির ব্ল্যাক শার্টস বাহিনীর কাজ। এরপরে মুঞ্জে ঘোষণা করেন, ভারতে বিশেষ করে হিন্দু ভারতে এরকম সংগঠন প্রয়োজন। হিন্দুদের সামরিক নবজাগরণের জন্য এমনটাই দরকার। মুঞ্জে তখন ছিলেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি। পরবর্তীতে সঙ্ঘের প্রথম স্বরসঙ্ঘচালক হেডগেওয়ারের রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু। 
এই ভারতের অজন্তা-ইলোরার গুহার দেওয়াল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। অতীতের শিল্পীরা অসীম আদরে আর অক্লান্ত শ্রমে সেখানে এঁকে রেখেছেন শিল্পের সহজ পাঠ। অপূর্ব গুহাভাস্কর্যে জাতকের কাহিনি। যেমন ছিল আফগানিস্তানের বামিয়ান প্রদেশে ১৫০০ বছরের পুরোনো ১১৫ ফুট আর ১৭৪ ফুট লম্বা প্রকাণ্ড দুটি বুদ্ধমূর্তি। ২০০১ সালের মার্চ তা ধ্বংস করে দেয় তালিবানরা। মূর্তি দুটি সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কোর পদক্ষেপ ছাড়াও নিউ ইয়র্কের মিউজিয়ম অব মডার্ন আর্টের সঙ্গেই থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মতো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী-প্রধান দেশ, এমনকি ইরান পর্যন্ত ওই দুটি মূর্তি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কোনও লাভ হয়নি। অথচ, ইতিহাস, ধর্ম আর শিল্প এখানে ঘুমিয়ে ছিল পাথরের খাঁজে-ভাঁজে। ধর্মের নামে ধূলিসাৎ হয় সেই মহার্ঘ ইতিহাস। পঁচিশ দিন ধরে। রকেট, ট্যাঙ্ক, শেষে ডিনামাইটের সাহায্যে— সব বিদেশি সরঞ্জাম দিয়ে! যেমন এখানে মুখে স্বদেশীর কথা বললেও, মোদীর চোখে ইতালির চশমা, হাতে সুইস ঘড়ি, ব্যবহার করেন মার্কিন ফোন, চড়েন জার্মান গাড়ি!
তাজমহল। বিশ্বের সাত আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। আমরা কেউ কি বলি তাজমহল আগ্রার, না কি বলি উত্তরপ্রদেশের? আমরা সবাই বলি ভারতের। তামাম বিশ্ব-ও তাই বলে। যেমন বলি চীনের প্রাচীর, মিশরের পিরামিড, ইতালির কোলোসিয়াম, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার, চিলির ইস্টার আইল্যান্ড মূর্তি, কিংবা জর্ডনের পেট্রা।
।তিন।
কিছু সৃষ্টি, কিছু সৃজনের আবেদন সর্বজনীন। নির্দিষ্ট সময় কাল দেশ ধর্ম ভাষা দিয়ে এদের বাধা যায় না। দক্ষিণপন্থীরা, মৌলবাদীরা সংকীর্ণমনা, সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে সবকিছুকে বেধে রাখতে চায়। 
গীতা, গ্রন্থ সাহিব নয়। ফাঁসির ঠিক আগে তিনি পড়ছিলেন লেনিন। তবে কি ভগৎ সিংয়ের দেশপ্রেমে খামতি ছিল! ‘বধিরকে শোনাতে’ আজকের সংসদ, সেদিনের সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে ভগৎ সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত যখন নির্বিষ বোমা ছুড়েছিলেন, তখন একইসঙ্গে ছড়িয়েছিলেন প্রচারপত্র। আর সেই প্রচারপত্রে ছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ স্লোগান। বন্দে মাতরম্ থেকে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। তাহলে কি দক্ষিণ এশিয়ার ‘চে গুয়েভারা’ দেশপ্রেমিক ছিলেন না! অন্যদিকে, লেনিন। জুলাই, ১৯০৮। ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে তিলকের ছয় বছর কারাবাসের সাজা ঘোষণা। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ লিখছেন, প্রতিবাদে সমস্ত সুতাকল ও রেলশ্রমিকদের সর্বাত্মক ধর্মঘটে স্তব্ধ বোম্বাই। নামানো হয় সেনা। রাস্তায় শহীদ হন ১৬ জন শ্রমিক। জখম আরও ৫০ জন। ভারতে শ্রমিকদের ধর্মঘট দেখে ইনফ্লেবেল ম্যাটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স নিবন্ধে ভ্লাদিমির লেনিন লিখছেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতেও সর্বহারা জনগণ সচেতন রাজনৈতিক গণসংগ্রাম গড়ে তুলছেন। এবং তার ফলে ভারতে রুশ ধাঁচের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার হালও শোচনীয় হয়েছে।’
কার্ল মার্কস। জন্ম রাইন নদীর শাখার মজেলের কোলে, জার্মানির সবচেয়ে পুরোনো শহর ট্রিয়েরে। শহরের স্কুল থেকে প্রথমে বন এবং পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্যারিস। পরে ব্রাসেলস। শেষে লন্ডন। কোথায় বেধে রাখা যাবে তাঁকে? ট্রিয়েরে, বনে, বার্লিনে, না কি প্যারিসে, ব্রাসেলসে, অথবা লন্ডনে? কোথাও কি বেধে রাখা গিয়েছে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, কিংবা দাস ক্যাপিটাল-কে? ভারত সম্পর্কেও অনেককিছু লিখেছেন তিনি। অথচ, একটা দীর্ঘ সময় দুনিয়াজুড়ে মার্কসবাদীরা সেইসব রচনাগুলির প্রসঙ্গে অবহিত ছিলেন না। ১৮৫৩ থেকে ১৮৬১, এই সময়কালে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন পত্রিকায় ভারত এবং চীন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রবন্ধ লিখেছেন। ট্রিবিউন-পর্বে ভারত সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এমনকি জীবনের শেষ দিনগুলিতে তিনি পড়ছিলেন বাংলার গ্রাম-সমাজ নিয়ে। নোট পর্যন্ত নিয়েছিলেন। কোথাও আবার মন্তব্য করেছিলেন। শুধু তাই নয়, পরে দৃষ্টি আকর্ষণে সুবিধার জন্য সেই নোটে কোথাও কোথাও টেনেছিলেন মার্জিনাল লাইন।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
মার্কসবাদ কী? মার্কসবাদ এক বিশ্ববীক্ষা। যে কোনও ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার হাতিয়ার। যে দেশে প্রয়োগ করা হবে, সেই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ-জীবন, বাস্তব পরিস্থিতিকে মনে রেখে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ। গোটা বিশ্বের দেশে-দেশে বিপ্লবের মডেল তাই এক না। আলাদা। যেমন আমাদের পার্টি সিপিআই(এম) রাশিয়া, বা চীনের হুবহু নকল নয়। আমরা ওদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। কিন্তু প্রয়োগ করেছি, করে চলেছি আমাদের মতো করে। 
মার্কসের জন্মের পর ২০৭ বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে পৃথিবী। আর পুঁজিবাদের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ, পুঁজি-র প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর কেটে গিয়েছে ১৫৭টা শীত-বসন্ত। তবুও আজও তিনি, তাঁর কাজ সমান প্রাসঙ্গিক। নোবেলজয়ী জোশেফ স্টিগলিৎ এখন বলছেন, ১ শতাংশ বনাম ৯৯ শতাংশের কথা। আর মার্কস সেই কবে, ১৮৪৮ সালে বলে গিয়েছেন জনসংখ্যার দশভাগের একভাগ বনাম নয়ভাগের কথা। ঘটনা হল, যে বছর মার্কসের জন্ম, বিশ্ব তখনও রেল দেখেনি। রেডিও-র আবিষ্কার হয়নি। তাঁর মারা যাওয়ার মাত্র বছরসাতেক আগে টেলিফোনের আবিষ্কার। অথচ, এখন এই আই-ফোনের যুগেও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। ঠিকই, মার্কস ফেসবুকের দূরদর্শন করেননি। কিন্তু তাঁর উপলব্ধিতে ছিল জুকেরবার্গের বিজনেস মডেল। আর তাই দ্য ইকনমিস্ট, লেনিনের কথায় ‘যে পত্রিকা ব্রিটিশ মিলিওনেয়ারদের কথা বলে’, সেই পত্রিকার (মে, ২০১৮) পরামর্শ: মার্কসকে পড়ুন। ‘রুলার্স অব দি ওয়ার্ল্ড: রিড কার্ল মার্কস!’, বিশ্বের শাসকরা: কার্ল মার্কস পড়ুন! নিউ ইয়র্কট টাইমস পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পাতায় শিরোনাম: হ্যাপি বার্থডে, কার্ল মার্কস। ইউ ওয়ার রাইট! শুভ জন্মদিন, কার্ল মার্কস। আপনি ছিলেন সঠিক! অস্কার নিতে উঠে অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র আমেরিকান ফ্যাক্টরি-র অন্যতম পরিচালক জুলিয়া রাইখার্টের গলায় শোনা যায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর অমোঘ আহ্বান, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। যেমন বলেছে ওয়াশিংটন পোস্ট, ‘হোয়াই স্পেক্টার অব মার্কস স্টিল হান্টস দি ওয়ার্ল্ড’, শিরোনামে লেখা নিবন্ধে পোস্টের (৮ মে, ২০১৮) অকপট স্বীকারোক্তি: ‘হোয়াটএভার ইউ থিঙ্ক অব হিম, মার্কস স্টিল ম্যাটার্স।’ তাঁকে আপনি যাই ভাবুন, মার্কস এখনও একটা ব্যাপার, মার্কসকে বাদ দিয়ে ভাবতে পারবেন না। ঠিকই, ‘মার্কস স্টিল ম্যাটার্স।’ মার্কস এখনও একটা ব্যাপার।
।চার।
রবীন্দ্রনাথ কি শুধুই অখণ্ড বাংলার, না কি গোটা বিশ্বের? রবীন্দ্রনাথের লেখা চিনা ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন ছেন দু শিয়ও, যিনি ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। কবিগুরুর নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগেই তাঁর লেখার সঙ্গে চীনের মানুষের পরিচয়। আর আজ, রবীন্দ্র সংগীত গাওয়াও রাষ্ট্রদ্রোহ! ‘আমার সোনার বাংলা’-ও গাওয়া যাবে না! গাইলে ‘দেশদ্রোহী’! রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চিত জেলে যেতেন! না-হলে অবধারিত পুশব্যাক! এবং কী আশ্চর্য, দুদেশেই দুই মৌলবাদের লক্ষ্য তিনি!
স্বাভাবিক। দেশে-দেশে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের চরিত্র এক। জেনোফোবিক। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম হল তাঁর মানবতাবাদ। সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষকে অকৃত্রিম ভালোবাসা। পক্ষান্তরে এই পৃথিবীর সকল মানুষকে ভালোবাসা। একইসঙ্গে তাই দেশপ্রেমিক এবং আন্তর্জাতিকতাবাদী। যে-ভাবনা তিনি রেখেছিলেন নৈবেদ্য-র ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য’ নামক কবিতায়—
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,’
আর উগ্র দক্ষিণপন্থীদের চরিত্রই হল জাত-ধর্ম-বর্ণের নামে বিভেদ তৈরি করা। ওরাই তো আসলে ‘টুক্রে টুক্রে গ্যাং’। মানুষকে জাত ধর্মের নামে টুকরো করতে এবং ভুলিয়ে রাখতে না-পারলে কী করে চলবে জল-জঙ্গল-জমির লুঠ!
সঙ্ঘ পরিবার ‘ভারতীয়’ বলতে বোঝে, যা কিছু ওদের ‘হিন্দুত্বের’ প্রজেক্টের সঙ্গে খাপ খায়। বিপরীতে, বাঙালির চিন্তাধারার পরম্পরার মধ্যে যে দিকগুলি নজর করার মতো, তার মধ্যে একটি গুণ হল বাঙালি সভ্যতার গ্রহণশক্তি এবং সমন্বয়প্রীতি। অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহণ, নতুন সংস্কৃতি চয়ন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ইতিহাস ও পরম্পরাকে ধারণ করা। যার সুর বেঁধে দিয়েছেন কবিগুরু—
‘পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার,
সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
যাবে না ফিরে,
এই ভারতের মহামানবের
সাগর-তীরে’
দক্ষিণপন্থীরা বরাবর বলে অভিন্নতার কথা। এক দেশ এক ভাষা, এক দেশ এক আইন, এক দেশ এক ভোট। পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, উত্তর ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত, দক্ষিণ ভারত— কারো জীবন, সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভাস, পোশাক তো এক নয়! তাহলে, কোনটাকে ‘ভারতীয়’ বলা হবে? মিজোরাম, না কি গুজরাটকে? না কি সব মিলেই ভারত মহান!
ইউনিফর্মিটি আর ইকোয়ালিটি এক নয়। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়।
বিপরীতে, বামপন্থীরা বলে সাম্য-সমতার কথা। জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনজাতি জনগোষ্ঠীর নিজস্বতা, স্বকীয়তা বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করে তাকে মর্যাদা দেওয়ায় কথা। বৈচিত্র্যকে কখনও অস্বীকার করা নয়। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যসাধন। ‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’– বিবিধের মধ্যে একটি মিলনসূত্র তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে আমাদের সভ্যতার ইতিহাস। এই বসুন্ধরায় আমাদের এ-দেশ এক বৈচিত্র্যময় দেশ। এ দেশের মাটিতে লুকিয়ে রয়েছে এক অপার সৌন্দর্য্য। যে মাটিতে যুগ যুগ ধরে হাজারো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি-খাদ্যাভাস-পোশাকে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন।
‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য
হেথায় দ্রাবিড়, চীন—
শক-হুন-দল পাঠান মোগল
এক দেহে হল লীন।’
এই বৈচিত্র্যই আমাদের আসল পরিচয়। গর্বের পরিচয়। যে পরিচয় বিশ্বের দরবারে আলাদা স্থান করে দিয়েছে ভারতকে।
বিপরীতে দক্ষিণপন্থীরা চায় বিভাজন। অস্বীকার করে এই বৈচিত্র্যকে। তথাকথিত ঐক্যের নামে জোর দেয় অভিন্নতায়। অস্বীকার করে ঐতিহাসিক সামজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ম ভাষা বর্ণ সংস্কৃতি আচার রীতিনীতির বৈচিত্র্যকে।
ইতিহাসের কিছু ঘটনাকে এক অংশের মানুষের অন্যায় ও অবিচার বলে দেগে দিয়ে তৈরি করে এক কল্পিত অনুভূতি— ‘বহিরাগত’ তকমা সেঁটে দিয়ে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে সেই অপর (আদার)-কে। তা দেশে-দেশে হতে পারে বর্ণভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু। প্রচারে তুফান তোলা হয় তোমার সমস্যার জন্য ‘ওরা’ দায়ী। তোমার দারিদ্র, তোমার বেকারত্বের জন্য পুঁজিবাদের নয়া উদারবাদ দায়ী নয়, দায়ী আসলে ‘ওরা’। এই ‘ওরা’ কোথাও হতে পারে কৃষ্ণাঙ্গ, কোথাও মুসলিম, কোথাও-বা হিন্দু, কোথাও ভিনদেশী অভিবাসী, আবার কোথাও সংরক্ষণ-কোটার বিরোধিতায় পিছিয়ে থাকা দলিতরা।
এখানেই বামপন্থার সঙ্গে সঙ্ঘের মতাদর্শের সংঘাত।
।পাঁচ।
কমিউনিস্টরা কি ভারতীয় নয়? কমিউনিস্টদের চেয়ে তবে কে বেশি ভারতীয়?
১৯২১, আমোদাবাদে কংগ্রেসের অধিবেশনে কমিউনিস্টরাই প্রথম তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। পূর্ণ স্বাধীনতার এই দাবি তোলেন একজন মওলানা, আর একজন স্বামী। মওলানা হসরত মোহানি। আর স্বামী কুমারানন্দ। পরের বছর আবার, কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে কমিউনিস্টরা তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। গান্ধীজির তখন পছন্দ হয়নি। আট বছর পর, শেষে ১৯২৯-এ কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে গৃহীত হয় পূর্ণ স্বরাজের স্লোগান। ১৯৩১, করাচি অধিবেশনে স্বাধীন ভারতের রূপরেখা।
কমিউনিস্টরা মানে, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীন ভারতের চেহারা নির্মাণে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা। জরুরি ইস্যুগুলিকে জাতীয় অ্যাজেন্ডার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। বিরাট আত্মত্যাগ। শহীদিবরন। একটি তথ্যই যথেষ্ট: ১৯৪৩ সালে বোম্বাইয়ে পার্টির প্রথম কংগ্রেসে ১৫,৫৬৩ জন পার্টি সদস্যের প্রতিনিধি হয়ে যে ১৩৯ জন উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁরা সবমিলিয়ে জেলে ছিলেন ৪১১-বছর! অন্যভাবে বললে, রাজনৈতিক জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় পার্টি নেতারা কাটিয়েছেন জেলের ভিতরে! যেমন কল্পনা দত্ত, কমলা চ্যাটার্জিরা সাড়ে সাত বছর ছিলেন কারাগারে বন্দি। পার্টির ওপর থেকে তখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও কংগ্রেস চলাকালীন ৬৯৫ জন পার্টি সদস্য ছিলেন জেলে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে।
স্বাধীন দেশে নতুন ভারত নির্মাণের প্রতিটি প্রশ্নে ছিলেন কমিউনিস্টরা। জমির প্রশ্নকে তোলা। জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে জমির লড়াই। তেভাগা থেকে তেলেঙ্গানা। ভূমি সংস্কারের প্রশ্নকে জাতীয় অ্যাজেন্ডায় পরিণত করা। ভাষার বিপুল বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ভাষার ভিত্তিতে রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরিতে অন্যান্যদের সঙ্গে সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্কের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা।
সেই ১৯৩১, কমিউনিস্ট পার্টিই প্রথম ড্রাফ্ট প্ল্যাটফরম অব অ্যাকশান-এ জাতপাত ব্যবস্থা ও অস্পৃশ্যতার অবসানের ডাক দেয়।
তাহলে, কারা দেশদ্রোহী? কারা দেশপ্রেমিক? সাভারকার, বাজপেয়ীর মতো যাঁরা মুচলেকা দিয়েছিলেন, যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা দেশপ্রিমক? না কি ভগৎ সিং, লক্ষী সায়গলরা দেশপ্রেমিক? স্বাধীনতা সংগ্রামে যাদের ন্যূনতম কোনও অবদান নেই, উলটে ব্রিটিশরাজকে সহযোগিতা করেছে— তারা দেশপ্রেমিক? না কি ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, কল্পনা দত্তরা দেশপ্রেমিক? যে সঙ্ঘ পরিবার ব্রিটিশ শাসকদের দালালি করেছে, তারা দেশপ্রেমিক? না কি যে মুসলিমরা ব্রিটিশ জমানার বিরোধিতা করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, তাঁরা দেশপ্রেমিক? স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকথা করেছে, তারা দেশপ্রেমিক? না কি সিধু, কানু, বীরসা মুণ্ডা-সহ আদিবাসীরা দেশপ্রেমিক? দেশের সরকারি কলকারখানা যারা জলের দরে বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে, জল-জঙ্গল-খনির অবাধ লুটের সুযোগ করে দিচ্ছে, তারা দেশদ্রোহী নয় তো কারা দেশদ্রোহী? যারা বিপুল অঙ্কের করের টাকা গায়েব করে দিচ্ছে, যারা কালো টাকা লুকিয়ে রেখে পিঠটান দিচ্ছে, তারা জাতীয়তা-বিরোধী নয়তো, কে জাতীয়তা-বিরোধী?
।ছয়।
তবে কমিউনিস্টরা একইসঙ্গে দেশপ্রেমিক, আবার আন্তর্জাতিকতাবাদী। দেশপ্রেমের সঙ্গে প্রলেতারিয় আন্তর্জাতিকতাবাদের কোনও বিরোধ নেই।
একজন কমিউনিস্ট যিনি একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী, একইসময়েই কি আবার দেশপ্রেমিকও হতে পারেন?’ প্রশ্ন তুলে মাও নিজেই তার জবাব দিয়েছেন: ‘আমরা মনে করি, তিনি শুধু হতেই পারেন না, তাঁর হওয়া উচিত।’ জাপান-বিরোধীযুদ্ধের সময় যেমন মাও লিখেছেন: ‘আমাদের জন্য, দেশপ্রেম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে। আমাদের স্লোগান— লড়াই করো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, রক্ষা করো আমাদের পিতৃভূমিকে।’
আবারও রবীন্দ্রনাথ। আবারও মার্কস। 
আসলে ‘দেশপ্রেম’ আর ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ দুটিকে সাধারণভাবে সমার্থক মনে হলেও, মোটেই এক নয়। আবার দেশপ্রেম আর ‘দেশভক্তি’-ও এক নয়। ‘প্রেমে’র মধ্যে থাকে দ্বন্দ্ব-বিরোধ। অন্যদিকে, ‘ভক্তির’ মধ্যে থাকে নিঃশর্ত আনুগত্য, প্রশ্নহীন সমর্পণ। আমরা প্রেমের পক্ষে। ভক্তিতে নেই। দেশপ্রেমে নিবেদন থাকে। থাকে না অন্যের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা হিংসা।
যে দেশে লেখা হয়েছিল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’, সে দেশের এক বিরাট অংশের মানুষকে না কি এখন চলতে হবে শাসকের হুকুমনামা মেনে, ‘নত শিরে’। ঘরে বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশ এক জায়গায় বলছেন, ‘দেশকে সাদা ভাবে দেশ বলে জেনে যারা সেবা করতে উৎসাহ পায় না, চিৎকার করে মা মা বলে, দেবী বলে মন্ত্র পড়ে, তাদের সেই ভালোবাসা দেশের প্রতি তেমন নয়, যতটা নেশার প্রতি।’ কিংবা বিমলার আত্মকথনে স্বামী নিখিলেশের যে মনোভাব রবীন্দ্রনাথ ব্যক্ত করেছেন: ‘তিনি (নিখিলেশ) বলতেন, দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে অনেক উপরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ হবে।’
ওদের দাবি, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিনের ছবি কেন থাকবে? আমাদের পার্টির রাজ্য দপ্তরে সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের ঘরে তো এঁদের কারো ছবি নেই। আছেন শুধু রবীন্দ্রনাথ। শিল্পী অন্য কেউ নন, সনাতন দিন্দা। নিচে কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের মূর্তি। বাড়ির নাম কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ ভবন। দিল্লিতে পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরের বাড়ির নাম এ কে গোপালন ভবন। পার্টির নতুন বাড়ির নাম হরকিষেন সিং সুরজিৎ ভবন। যেমন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরের নাম অজয় ভবন। বরং, নেপালে সঙ্ঘের নেপালি সংস্করণ এইচএসএসের সদরদপ্তরের নাম কেশব ধাম (সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের স্মরণে), যেমন দিল্লিতে কেশব কুঞ্জ। বীরগঞ্জে পশুপতি শিক্ষা মন্দিরে প্রধান শিক্ষকের ঘরের নাম ‘হেডগেওয়ার রুম’। স্কুলের তিনতলায় সঙ্ঘের দ্বিতীয় সর-সঙ্ঘচালক গোলওয়ালকারের ছবি।
তবে, আত্মসমালোচনার সুরেই আমরা বলতে পারি, প্রতিষ্ঠার সময়, প্রথম যুগের কমিউনিস্ট পার্টিতে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ ছিলেন শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, বা অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে উঠে আসা। ফলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বাহ্যিক কর্মসূচির মধ্যে অনেকটা রুশদেশ, ইউরোপ বা ইংল্যান্ডের কিছুটা হলেও প্রভাব ছিল। তার থেকে ফরম্যাট নেওয়া হয়েছিল। কৃষক-মজুরদের থেকে হলে সম্ভবত ক্লাসরুম কনসেপ্ট থাকত না। যেমন এখানে গোড়ায় কৃষক আন্দোলন ছিল, তাই নাম হল কৃষক প্রজা পার্টি, মহারাষ্ট্রে পিসেন্টস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি। পত্রিকার নাম লাঙল, নবযুগ, ধূমকেতু, স্বাধীনতা। গান যখন হল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, ঝুমুর, লোকগানের চেয়ে রুশদেশের গান, ইউরোপীয় গানের বেশি নকল হল। পরে আইপিটিএ তুলে আনল সোঁদা মাটির গন্ধ। কবীর, নানক, বাবা ফরিদ, লালনের প্রশ্নে আরও যত্নশীল হলে ভালো হত। ইউরোপ যখন মধ্যযুগের অন্ধকারে ডুবে আছে, তখন আমাদের দেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, সমন্বয়ধর্মী যে-ভাবধারা গড়ে উঠল— তাকে যদি লালন করা যেত, আরও ভালো হত। গানের সুর হতে হবে মেঠো, ভাষা হতে হবে সহজ-সরল, আমজনতার। কেরালা, পশ্চিমবঙ্গে অনেকটা করা গিয়েছে। আমাদের বাংলায় শোভাযাত্রা, প্রভাতফেরি, কোরাস গান, পুষ্পবৃষ্টি, চন্দনের টিপ দিয়ে বরন, লালপেড়ে শাড়িতে মহিলা, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে স্বেচ্ছাসেবক— এসবই হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতিকে যুক্ত করে। খাকি হাফপ্যান্ট/ ফুলপ্যান্ট, বা হাতে লাঠি/ ত্রিশূল কোনও ভারতীয় পরম্পরা নয়।
।সাত।
ঠিকই, আরও অনেক পথ আমাদের যেতে হবে। ভারতীয় সংস্কৃতি মানে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়। যে পরম্পরা পায়ে বেড়ি পরায়— তা ভার— সে ভার বহন করব না, আমাদের বর্জন করতে হবে। আর যা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে, তাকে আমরা স্বর্ণালী ধারা হিসেবে গ্রহণ করব— তাকে অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে প্রচার ও প্রসার ঘটাব।
শেষে আবারও রবীন্দ্রনাথ। তাঁর উপলব্ধি: ভারতীয় সভ্যতার আছে নানা অংশ। তার একটিকে বেছে নিয়ে তাকেই ভারতীয় ঐতিহ্য বলা ঠিক নয়। তাছাড়া, ভারতীয় সভ্যতা বা প্রাচ্য সভ্যতার সঙ্গে পাশ্চাত্য সভ্যতার কোনও মৌলিক সংঘাত নেই, আছে নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক। তাই বিচার করতে হবে খোলা মনে। যে জিনিসটায় আমরা আনন্দ পাই, তা সে যে দেশেরই হোক না কেন, সেটা আমাদের জিনিস। সেরকমই, যেটা খারাপ, তা স্বদেশের বলেই গ্রহণ করতে হবে, এ ধারণা ঠিক নয় (অমর্ত্য সেন, নোবেল পাওয়ার পর শান্তিনিকেতনে ভাষণ)।
এটাই আমাদেরও কথা,
‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া,
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’
প্রকাশের তারিখ: ০১-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay






