Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বাংলার নারীদের অবস্থা (দ্বিতীয় পর্ব)

উর্বা চৌধুরী
একইসঙ্গে চলছে কেন্দ্রের শাসকদলের অভূতপূর্ব অত্যাচার। ভারতের সব রাজ্যের মতো সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থের মাধ্যমে কার্যত পশ্চিমবঙ্গের সরকারি, সরকার পোষিত স্কুলের সিংহভাগ খরচ চালাতে হয়। রাজ্য সরকারি শিক্ষা দপ্তরের খাত থেকে বরাদ্দ হয় শিক্ষকদের বেতন। সমগ্র শিক্ষা মিশনের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় কেন্দ্রীয় সরকার, ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় রাজ্য সরকারের তরফে। ২৫ বছর ধরে চলা এই প্রকল্প ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে রূপায়ণযোগ্য শিশু শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯-এর রূপায়ণকারী প্রকল্পও বটে। অন্যদিকে, ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ রূপায়ণকারী অন্যতম প্রকল্প পিএমশ্রি (প্রধানমন্ত্রী স্কুলস্‌ ফর রাইজিং ইন্ডিয়া), যার আওতায় প্রতিটি রাজ্যে কিছু কিছু মডেল স্কুল বানানো হচ্ছে, হবে। যার ৬০ শতাংশ ব্যয় বহন করবে কেন্দ্র আর ৪০ শতাংশ বহন করবে রাজ্য। এবং শর্ত রাখা হয়েছে যে-রাজ্য এই প্রকল্পে রাজি হবে না, কেন্দ্রীয় সরকার তার প্রাপ্য সমগ্র শিক্ষা মিশনের ৬০ শতাংশ বরাদ্দ অর্থও বন্ধ করে দেবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পে সই করতে রাজি হয়নি মূলত প্রকল্পের অর্থকরী শর্তের জন্য ও প্রকল্পের যুক্তিহীন নামের জন্য। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার গত দুবছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গকে সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থ (৬০ শতাংশ) দিচ্ছে না।
The Reality of Women in Bengal Part II

প্রথম পর্বের পর

শিক্ষা

রাজ্য সরকারের বয়ানে কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে অকালবিবাহ কমানোর বা রোধ করার উদ্যোগ করা হয়েছে ২০১২ সালে। সংসদীয় দলের নির্বাচনী ফায়দা তোলার জন্য এই প্রকল্প চালু করা হয়েছিল নাকি জনমুখী লক্ষ্যে, সে-চর্চায় কালব্যয় না-করে— যে-চর্চার অগ্রাধিকার পাওয়ার দরকার, তা হল, কন্যাশ্রীর মতো অর্থ প্রদানকারী উপায় আদৌ বাল্যবিবাহের মতো সমস্যার সমাধান করতে, নিদেনপক্ষে রাশ টানতে পারে কিনা? দেখা গেল ২০০৫-০৬ সালের এনএফএইচএস-৩-এর পর প্রথম কয়েক বছর মানে ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের সময়কালে বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্য রকমের কমেছে (১৩.৪ শতাংশ বিন্দু)। এই সময়কালের মাত্র শেষ চার বছরে কন্যাশ্রী সক্রিয় থেকেছে। কিন্তু তারপর আর কমেনি। আবার এই সময়কালের শুরুর দিকে সক্রিয় হয়েছে শিশুর বিনাব্যয়ে আবশ্যিক শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯)-ও। স্কুলে ভর্তির জন্য বিশেষ অভিযান, স্কুলে বাচ্চাকে ধরে রাখার জন্য বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি, বন্দোবস্ত, ভর্তির প্রক্রিয়া, স্কুলবদলের প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, নতুন স্কুল তৈরি, নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রাখা ইত্যাদি কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করা হচ্ছিল ২০০৯ সালের পর থেকে বছর পাঁচ ছয়েক। পরবর্তী সময়ে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি একেবারে স্কুল স্তর থেকেই দুর্বল হতে শুরু করে, বন্ধ হতে থাকে স্কুল, শিক্ষক সংকট গুরুতর হয়ে ওঠে, কোভিড অতিমারীর সময়ে টানা ২৩ মাস কোনোরকম বিকল্প ব্যবস্থা না-করে, কোনোরকম সহায়ক ব্যবস্থা না-করেই স্কুল বন্ধ রাখা ছিল একাধারে মহা বিপজ্জনক ও অন্যদিকে সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানহীন এক সরকারি নীতি। কেবল ভাতা বণ্টনের নীতির জনমুখিতার চেয়ে এই নীতির ভিত্তিতে বরং রাজ্যের বর্তমান শাসকদলকে জনবিরোধী হিসাবে চেনা যায় বিনা বিতর্কে। একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠা করেছে যে, বাল্যবিবাহ রোধে স্কুলশিক্ষা নানাভাবে গুরুতর ভূমিকা গ্রহণ করে; এমনকী এটাও দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্কুলই নেয় সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা। অর্থাৎ স্কুলশিক্ষা যেখানে বিপন্ন হয়ে পড়ে বা অযত্নে ফেলে রাখা হয়, সেখানে বাল্যবিবাহের মতো সংকটের সমাধান সহজ হয় না— সংকট হয় বাড়তে থাকে, নয় পচা ডোবার জলের মতো এক জায়গায় আটকে থেকে রোগ ছড়াতে থাকে।

অক্টোবর ২০২৫-এর হিসাব অনুযায়ী, গোটা ভারতে শূন্য-ছাত্র স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৮০০০। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে সবচেয়ে বেশি— ৩৮১২টি। এবং এই শূন্য-ছাত্র স্কুলে শিক্ষক নিযুক্ত রয়েছেন ১৭৯৬৫ জন। আবার বাকি স্কুলের মধ্যে বড়ো সংখ্যক, ভালো সংখ্যক ছাত্র থাকা সত্ত্বেও ভুগছে শিক্ষকের অভাবে। ২০১২ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বন্ধ হয়েছে ৭০০০ স্কুল— ২০১২ সালে ছিল ৭৪৭১৭টি প্রাথমিক স্কুল, যা ২০২২ সালে কমে হয়েছে ৬৭৬৯৯টি। কেবলমাত্র দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ১৩টি ব্লকে বন্ধ হয়েছে ১১৯২টি স্কুল। পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বন্ধ হয়েছে ১০৪৭টি ও পূর্ব মেদিনীপুরে বন্ধ হয়েছে ৯৬৭টি প্রাথমিক স্কুল।

একইসঙ্গে চলছে কেন্দ্রের শাসকদলের অভূতপূর্ব অত্যাচার। ভারতের সব রাজ্যের মতো সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থের মাধ্যমে কার্যত পশ্চিমবঙ্গের সরকারি, সরকার পোষিত স্কুলের সিংহভাগ খরচ চালাতে হয়। রাজ্য সরকারি শিক্ষা দপ্তরের খাত থেকে বরাদ্দ হয় শিক্ষকদের বেতন। সমগ্র শিক্ষা মিশনের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় কেন্দ্রীয় সরকার, ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় রাজ্য সরকারের তরফে। ২৫ বছর ধরে চলা এই প্রকল্প ২০১০ সালের এপ্রিল থেকে রূপায়ণযোগ্য শিশু শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯-এর রূপায়ণকারী প্রকল্পও বটে। অন্যদিকে, ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ রূপায়ণকারী অন্যতম প্রকল্প পিএমশ্রি (প্রধানমন্ত্রী স্কুলস্‌ ফর রাইজিং ইন্ডিয়া), যার আওতায় প্রতিটি রাজ্যে কিছু কিছু মডেল স্কুল বানানো হচ্ছে, হবে। যার ৬০ শতাংশ ব্যয় বহন করবে কেন্দ্র আর ৪০ শতাংশ বহন করবে রাজ্য। এবং শর্ত রাখা হয়েছে যে-রাজ্য এই প্রকল্পে রাজি হবে না, কেন্দ্রীয় সরকার তার প্রাপ্য সমগ্র শিক্ষা মিশনের ৬০ শতাংশ বরাদ্দ অর্থও বন্ধ করে দেবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পে সই করতে রাজি হয়নি মূলত প্রকল্পের অর্থকরী শর্তের জন্য ও প্রকল্পের যুক্তিহীন নামের জন্য। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার গত দুবছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গকে সমগ্র শিক্ষা মিশনের অর্থ (৬০ শতাংশ) দিচ্ছে না। স্কুলশিক্ষায় এরকম প্রকট এবং বেপরোয়া অত্যাচার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বিরল। শিক্ষাক্ষেত্রে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের এই যাবতীয় প্রবঞ্চনার ফলে রাজ্যে বাড়ছে মেয়েদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা।  

জীবিকা

মেয়েদের এই ঘরোয়াকরণের পরিণাম কেবলই সামাজিক, এমনটা নয়। এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর মাত্রায় অর্থনৈতিক। এদেশে ২০১৭ সাল থেকে ‘পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ (পিএলএফএস) নামক একটি সমীক্ষার কাজ হয় ফি বছর। সমীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখিত কর্মী বাহিনীর তিনটি রকম – ১) স্বনিযুক্ত (‘সেলফ এমপ্লয়েড’), ২) অস্থায়ী শ্রমজীবী (‘ক্যাজুয়াল লেবার’), ৩) নিয়মিত মজুরি বা বেতনপ্রাপক কর্মী (‘রেগুলার ওয়েজ/ স্যালারি হোল্ডার’)। ‘স্বনিযুক্ত’ অর্থাৎ প্রথম বিভাগটির দুটি উপ-বিভাগ – ক) নিজ-মালিকানার আর্থিক উদ্যোগে যুক্ত কর্মী বা সেই উদ্যোগের নিয়োগকারী, খ) পারিবারিক উদ্যোগে (আর্থিক) উপার্জনহীন সহায়ক (‘আনপেইড হেল্পার ইন হাউজহোল্ড এন্টারপ্রাইজ’)। এই দ্বিতীয় উপ-বিভাগের কর্মীরা পারিবারিক আর্থিক উদ্যোগে যুক্ত হয়ে পূর্ণ বা আংশিক সময় কাজ করেন, কিন্তু সেই কাজের বিনিময়ে কোনো বেতন বা মজুরি পান না। 

দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ মায় গোটা ভারতের গোটা নারী কর্মীবাহিনীর মধ্যে পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত উপার্জনহীন সহায়ক নারী কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি শতাংশ দখল করেছে। গত ৭ বছরের এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, কী বিরাট সংখ্যক নারীরা সরাসরি দেশের উৎপাদন বা আর্থিক কার্যকলাপের সঙ্গে কর্মী হিসাবে যুক্ত, এমনকী গণ্য হয়েও ‘বেরোজগার’। এঁরা পারিবারিক উদ্যোগে স্ব-নিযুক্ত কর্মী হয়েও ‘মালিক’ নন, এঁদের নামে মালিকানা নেই বলে এই উদ্যোগগুলির মোট উপার্জন মোটেই এঁদের নয়, আবার পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত কর্মী হওয়ায় এঁরা ‘মজুর’-ও নন, তাই এঁদের কোনো মজুরি বা বেতন নেই— বাইরের কোনো কর্মী দিয়ে এঁদের কাজটি করাতে হলে কিন্তু বেতন বা মজুরি সেই কর্মীকে দিতে হত। জাতীয় গড়ের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এই উপার্জনহীন কর্মরত নারীদের শতকরা হার কম হলেও, শ্রমবাহিনীতে যোগদানের হার এমনকি কর্মী জনসংখ্যা অনুপাতের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় গড়ের চেয়ে পিছিয়ে থাকছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, শ্রমবাহিনীতে যোগদানের হার বলতে উক্ত সমীক্ষায় বোঝানো হয়েছে, নারীদের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মোট কর্মরত (রোজগেরে এবং বেরোজগেরে) এবং যাঁরা কাজ খুঁজছেন বা কাজ করতে প্রস্তুত আছেন সেই সকল নারীর শতকরা হার এবং কর্মী জনসখ্যার অনুপাত বলতে বোঝানো হয়েছে, নারীদের মোট জনসংখ্যার মধ্যে কেবলমাত্র মোট কর্মরত (রোজগেরে এবং বেরোজগেরে) নারীর শতকরা হার। 

 সারণি ২: নারীদের শ্রমবাহিনীতে যোগদান, কর্মসংস্থান এবং উপার্জনহীন আর্থিক উদ্যোগের কর্মী হিসাবে যোগদান 

সাল

শ্রমবাহিনীতে যোগদানের হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশান রেট)

কর্মী জনসংখ্যা অনুপাত (ওয়ার্কার পপুলেশান রেশিও)

পারিবারিক উদ্যোগে (আর্থিক) উপার্জনহীন সহায়ক 

জাতীয় গড়

পশ্চিমবঙ্গের গড়

জাতীয় গড়

পশ্চিমবঙ্গের গড়

জাতীয় গড়

পশ্চিমবঙ্গের গড়

২০১৭-১৮

২৩.৩

২০.৮

২২

২০.১

৩১.৭

১৩.৮

২০১৮-১৯

২৪.৫

২২.২

২৩.৩

২১.৭

৩০.৯

১৫.৬

২০১৯-২০

৩০

২৪

২৮.৭

২৩.১

৩৫

১৭.৩

২০২০-২১

৩২.৫

২৮.৭

৩১.৪

২৮.১

৩৬.৬

১৮.১

২০২১-২২

৩২.৮

২৭.৯

৩১.৭

২৭.৪

৩৬.৭

২০.২

২০২২-২৩

৩৭

৩৩.৮

৩৫.৯

৩৩.১

৩৭.৫

২৩.৩

২০২৩-২৪

৪১.৭

৪০.৪

৪০.৩

৩৯.২

৩৬.৭

২২.৯

সূত্র: পিএলএফএস বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪

এই সবের সঙ্গে রয়েছে পাহাড়-সমান ঘরের কাজ, যা করতে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের নারী সদস্যের। দ্য টাস্কস অফ দি ওয়ার্কিং উইমেন’স মুভমেন্ট ইন দ্য সোভিয়েত রিপাবলিক-এ লেনিন লিখছেন- 

নারীদের যখন পূর্ণ অধিকারও নিশ্চিত হচ্ছে, তখনও তাঁরা শোষিত হচ্ছেন, কারণ যাবতীয় ঘরের কাজ তাঁদের জন্য বরাদ্দ থাকছে। নারীর সব কাজের মধ্যে ঘরের কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অনুৎপাদনশীল, সবচেয়ে বর্বরোচিত ও সবচেয়ে কষ্টসাধ্য। এটি অতি সাধারণ বিষয় এবং নারীর বিকাশে সাহায্য করতে পারে, এমন কোনো উপাদান এতে সেভাবে থাকে না।  

ভারতের স্টেটিস্টিক্স অ্যান্ড প্রোগ্র্যাম ইমপ্লিমেন্টেশন মন্ত্রকের ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪’-এর রিপোর্ট অনুসারে, এদেশে নারীরা দৈনিক গড়ে ২৮৯ মিনিট ঘরের কাজে ব্যয় করেন, আর পুরুষেরা সে-জায়গায় ব্যয় করেন ৮৮ মিনিট। ৪১% নারী পরিবারের শিশু, বয়স্ক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সেবাযত্নের কাজে যোগ দেন আর ওই একই কাজে ২১.৪% পুরুষ যোগ দেন। আর আর্থিক কার্যকলাপে (আয়যুক্ত বা আয়হীন) ৭৫% পুরুষ ও ২৫% নারী যোগদান করছেন। 

নারীর বিরুদ্ধে হিংসা 

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর ২০১৮ সালের প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, নারীদের বিরুদ্ধে ঘটা হিংসা, এমন এক বিশ্ব অতিমারিতে (গ্লোবাল প্যানডেমিক) পরিণত হয়েছে, যা কেবল হিংসার শিকার নারীদের জন্যই বিপর্যয় সাধন করছে না, এই ধরনের হিংসার মারাত্মক প্রভাব রয়েছে সাধারণভাবে আর্থিক ক্ষেত্রেও। নারীবাদীরা সমাজ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যত বেশি যোগদান করছেন, তত বেশি নারীদের অধিকার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ও দৃশ্যমান হচ্ছে, এবং ধীরগতিতে হলেও, নীতিগ্রহণের প্রশ্নে সমাজের মায় রাষ্ট্রেরও পিতৃতন্ত্র থেকে সরে আসার বাধ্যবাধকাতা তৈরি হচ্ছে। এতে করে পিতৃতন্ত্রের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নারীদের উপর হিংসা সংঘটিত করার প্রবণতা বাড়ছে— সমাজবিজ্ঞানের বোঝাপড়ায় একে ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’ বলে চিহ্নিত করছেন তাত্ত্বিকেরা। আর্থিক ক্ষেত্রে আগের থেকে নারীদের যোগদান বাড়ায়, পারিবারিক পরিসরে নারীর দর কষাকষির আপাত ‘ক্ষমতা’ বা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বেড়েছে। ফলত ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’-এ পিতৃতান্ত্রিক বাহিনীর গার্হস্থ্য হিংসা সংঘটিত করার ঝোঁক ও তাগিদও বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার কর্মস্থল বা নানা প্রতিষ্ঠানগুলিও এই ‘ব্যাকল্যাশ এফেক্ট’-এর দ্বারা বিপন্ন। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও সদর্থক হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। সদ্য কলকাতায় ঘটা আর জি কর হাসপাতালের ছাত্র-চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা লজ্জাজনক তো বটেই, উপরন্তু, কর্মক্ষেত্রে নারীকর্মীর সঙ্গে ঘটা এই অপরাধের ঠিক পরে পরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘রাতের সাথী’ নামে এক নোটিশ জারি করে— সেখানে লেখা ছিল, এ-রাজ্যের নির্দিষ্ট পেশাক্ষেত্রের নারীরা রাতের ডিউটি করবেন না, নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে। অর্থাৎ কিনা পিতৃতন্ত্র, পুঁজি-তাড়িত রাষ্ট্রব্যবস্থা, দক্ষিণপন্থী শাসকদলের হিতাহিত বোধ চাইছে, মেয়েরা ঘরে আগল দিয়ে বাস করুক। এতে করে পিতৃতন্ত্রের চিরায়ত মূঢ় আত্মশ্লাঘা যেমন যা তুষ্ট হওয়ার, তা তো হয়ই, পুঁজিতন্ত্র হয় তার চেয়েও বেশি পুষ্ট হয়। উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষের প্রায় অর্ধেক শতাংশের স্রেফ লিঙ্গ-রাজনীতির কারণে ঘর থেকে বেরোনোর অভ্যাস চাপা পড়ার এ যেন এক প্রাগায়োজন; ঘর-বিলাসী শ্রমজীবীর যেন গড়ে না-ওঠে সংগঠিত হওয়ার বোধ। সার্বিকভাবে নারীর বিরুদ্ধে হিংসার ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের এন.সি.আর.বি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে হিংসার হার ৭১.৩ (এক লক্ষ জনসংখ্যা পিছু), যা ভারতের গড়ে ৬৫.৩। হরিয়ানা, ওড়িশা, রাজস্থান, দিল্লি, তেলেঙ্গানার ক্ষেত্রে এই হার ১০০-র বেশি।

রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার, যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অর্থনীতিকে অসাম্যের প্রশ্নে গোটা বিশ্বের সামনে লজ্জাজনক জায়গায় নিয়ে গিয়ে ‘ফোর্থ ইকোনমি’ বলে ফেরেববাজির টেঁটরা পেটায়, যে-রাজ্যে সব বয়সের মেয়ে ও প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষেরা আদ্যন্ত বিপন্ন, যৌন হিংসা যে-রাজ্যের, যে-দেশের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স ২০২৪-২৫-এ যে-দেশ ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১৩১তম স্থান পায়— সেই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি নীতি-নির্মাতারা যে নানাবিধ সংকট তৈরির নীতি-নির্মাতাও বটে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সংগঠিত আন্দোলন, বিরামহীন প্রতিরোধ, প্রতিবাদই পারে এই পরিবেশে ফাটল ধরাতে। 


প্রকাশের তারিখ: ৩১-মার্চ-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৭২ টি নিবন্ধ
০৪-এপ্রিল-২০২৬

০৩-এপ্রিল-২০২৬

০৩-এপ্রিল-২০২৬

০২-এপ্রিল-২০২৬

০১-এপ্রিল-২০২৬

০১-এপ্রিল-২০২৬

৩১-মার্চ-২০২৬

৩০-মার্চ-২০২৬

২৮-মার্চ-২০২৬

২৭-মার্চ-২০২৬