Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ঠেকে শিখবেন? না দেখে?

রাহুল সিনহা
এটাই বিজেপি-র প্রকৃত চেহারা। এদের প্রতিশ্রুতি আসলে সুকুমার রায়ের খুড়োর কলের মতো। কখনও মানুষের হাতের নাগালে আসে না। বরং হয়রান হয়ে ছুটে মরতে হয়। এটাই ত্রিপুরার অভিজ্ঞতা।… ঠেকে শিখছেন ত্রিপুরার মানুষ।
Theke Shikhben na Dekhe

২০১৮-তে বিধানসভা নির্বাচনে ত্রিপুরায় বামফ্রন্টকে হারিয়ে সরকার গঠন করে বিজেপি। তারপর ৮ বছর সরকারে। কিন্তু তাদের কোনও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই তারা রক্ষা করেনি। ঘটা করে প্রকাশ করা হয়েছিল ভিশন ডকুমেন্ট— সে-সময়ের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির হাত দিয়ে। বার্তা দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি-র ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে টাকার অভাব হবে না। সব প্রতিশ্রুতি অনায়াসে পূরণ করা হবে। 

১০ হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

বাস্তবতা কী?  ২০১৭ সালে ত্রিপুরার ১০,৩২৩ জন স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকা হাইকোর্টের রায়ে চাকরি হারান। কোনও দুর্নীতির অভিযোগে খারিজ হয়নি এই চাকরি। সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা বেকার যুবক যুবতীদের চাকরির সুযোগ দেওয়ার বামফ্রন্ট সরকারের নিয়োগনীতিকে বাতিল করেছিল হাইকোর্ট। এর ফলে ১০ হাজারের বেশি পরিবারের একটি নিশ্চিত রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮-তে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার তাদের জন্য বিকল্প চাকরির ব্যবস্থা করার একাধিক উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে এই ১০,৩২৩ জন শিক্ষক শিক্ষিকা ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ ছিল সেই নির্বাচনে এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিজেপি তাদের ভিশন ডকুমেন্ট-এ স্পষ্ট লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা সরকারে এলে এই চাকরিচ্যুত শিক্ষক শিক্ষিকাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। 

ত্রিপুরায় বিজেপি-র হয়ে প্রচারে এসে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছিলেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। আমার এই বক্তব্য আপনারা রেকর্ড করে রাখুন। যদি প্রতিশ্রুতি পূরণ না-হয় ওই রেকর্ড ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালাবেন। 

কী সেই স্থায়ী সমাধান?  

আট-বছর পর ২৩০ জনের বেশি চাকরি হারানো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে, অথবা অসুখে মৃত্যু হয়েছে। চাকরি ফেরত চেয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বিজেপি সরকারের পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চাকরি ফেরত পাননি তাঁরা। যারা বেঁচে আছেন তাঁদের অনেকে হয় অটোরিক্সা চালান, না-হলে অনলাইন অর্ডারের ডেলিভারি করেন। অথচ, রাজ্যের স্কুলগুলো ধুঁকছে শিক্ষকের অভাবে। ৩৪৫টি স্কুল চলছে মাত্র ১জন শিক্ষক দিয়ে। 

মিসড কলে চাকরির প্রতারণা

ত্রিপুরায় কোনও বড়ো বা মাঝারি শিল্প নেই। ফলে সরকারি চাকরি ছাড়া ব্যাপক কর্মসংস্থানের কোনও সুযোগও নেই। শিক্ষিত বেকারদের সরকারি চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বামফ্রন্ট সরকার প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করছিল। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। এই সমস্যাকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। দলের কেন্দ্রীয় নেতা সুনীল দেওধর বলেছিলেন ভোটের আগে বিজেপির দেওয়া নম্বরে মিসড কল করলেই বিজেপি জিতলে চাকরি পাওয়া যাবে। শুধু মুখের কথা নয়, ভিশন ডকুমেন্ট-এ স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল বিজেপি সরকারে এলে প্রথম বছরে ৫০ হাজার সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। সঙ্গে ফোন নম্বর ৮৮৮২২৭১৯৫৫। ভোটও মিটেছে, সেই নম্বরও মারাঠি উচ্চারণে অনবরত জানান দিয়ে গিয়েছে সুইচড অফ। চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ— আর বলা হয়নি।

আট বছর পর রাজ্যে কতজনের চাকরি হয়েছে? সাকুল‍্য ২৩ হাজার। 

শূন্যপদে নিয়োগের বদলে অবলুপ্তি 

নতুন সরকারি চাকরি দেওয়ার বদলে চাকরির সুযোগ ক্রমশ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮-র ১ জানুয়ারি ত্রিপুরায় নিয়মিত সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫২০ জন। ২০২৬-এর ১ জানুয়ারি নিয়মিত, অনিয়মিত, বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত মিলিয়ে রাজ্যে কর্মচারীদের সংখ্যা কমে হয়েছে ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ৫০১। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৩৫,০০০ হাজার কর্মচারী অবসর নিয়েছেন। সে-সব শূন্যপদে নিয়োগের বদলে সরকার পদের অবলুপ্তি ঘটাচ্ছে।

সপ্তম বেতন কমিশনই অধরা

সরকারি কর্মচারীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা একেবারে কেন্দ্রীয় হারে হয়ে যাবে। কার্যকর করা হবে সপ্তম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ। এটাই প্রতিশ্রুতি ছিল বিজেপি-র। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০১৮-র নির্বাচনের আগে এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন যেদিন ত্রিপুরায় বিজেপির সরকার শপথ নেবে, তার পরদিন থেকেই কর্মচারীরা সপ্তম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের সুবিধা পাবেন।

৮ বছর কেটে গিয়েছে। অষ্টম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ত্রিপুরার শিক্ষক কর্মচারীরা এখনও সপ্তম বেতন কমিশনের সুবিধা পাননি। এখনও ডিএ বকেয়া ১৭ শতাংশ। বামফ্রন্ট সরকার বছরে দুবার ডিএ দিত। ২৫ বছরে মোট ২৬৮ শতাংশ, বা বছরে গড়ে ১০.৭২ শতাংশ ডিএ দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি সরকারের সময়ে প্রথম তিন বছর কোনও ডিএ দেওয়া হয়নি। আট বছরে সব মিলে ৮ বারে ৪১ শতাংশ ডিএ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে বছরে একবার করে ৫.১২৫ শতাংশ ডিএ পেয়েছেন কর্মচারীরা।

সপ্তম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের আর্থিক সুবিধা রাজ্যের কর্মচারীদের দেয়নি বিজেপি। তবে তাদের সুপারিশ মেনে ২০১৮-র ১ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরায় এতদিন চালু থাকা নিশ্চিত পেনশনের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে চালু করা হয়েছে নয়া পেনশন ব্যবস্থা। 

রেগায় কাজ মাত্র ৪৩ দিন!

প্রতিশ্রুতি ছিল এমজিএনরেগায় ৩৪০ টাকা মজুরি, ২০০ দিন কাজ দেওয়া হবে। ত্রিপুরা রেগার মজুরি এখন ২১২ টাকা, কাজ গড়ে ৪৩ দিনও হচ্ছে না। অথচ, ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে গড়ে ৯৬ দিন পর্যন্ত কাজ হয়েছে। 

প্রতিশ্রুতি ছিল, সব বিধানসভা কেন্দ্রে একটি করে কলেজ হবে। আট বছরে সরকার একটিও নতুন কলেজ খোলেনি। বরং ভুঁইফোড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজ্যে ঢোকার পথ করে দেওয়া হচ্ছে। 

চাকরি ঠেকাতে খরচ ১২ হাজার কোটি টাকা

বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সব অনিয়মিত কর্মচারীকে নিয়মিত করা হবে। বাস্তবে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে অনিয়মিত কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত করার যে ব্যবস্থা ছিল তা তুলে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশিক্ষার শিক্ষকদের নিয়মিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তব হল, হাইকোর্ট এদের নিয়মিত করার নির্দেশ দিলে রাজ্য সরকার এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গেছে। 

বেকার যুবক, শ্রমিক, কর্মচারীদের কর্মসংস্থান, নিয়মিতকরণ, ইত্যাদি দাবি পূরণ করার বদলে সরকার এদের দাবির বিরুদ্ধে এদের বঞ্চিত করতে এ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে ২৪০টি SLP দাখিল করেছে। চাকরি দেওয়া, নিয়মিতকরণ, বকেয়া মেটাতে টাকা খরচ না-করে সরকার এ-পর্যন্ত এ-সব মামলায় আইনজীবীদের ফি দিতে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে।

ভাতা বেড়েছে, কমেছে প্রাপক

৪০টির বেশি সামাজিক ভাতা চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। ভাতা পেতেন সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ। ২০১৮ সালে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভাতার অঙ্ক বাড়িয়ে ২০০০ টাকা করা হবে। হ্যাঁ, করা হয়েছে। তবে ভাতা প্রাপকের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে সোয়া তিন লাখ। 

উপজাতিরা কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে

এডিসি এলাকায় অনাহার, রেশন কার্ড বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া, সন্তান বিক্রি যা বামফ্রন্ট আমলে বন্ধ হয়েছিল, সে-সব আবার শুরু হয়েছে। নতুন প্রবণতা হল রাজ্যে কাজ না-পেয়ে উপজাতি যুবকরা কাজের খোঁজে বাইরে যাচ্ছে। সেখানে মারা যাচ্ছে। পরিবারের কাছে বহু ক্ষেত্রে মৃতদেহ ফেরত আনারও অর্থ নেই। 

রাজ্যের উপজাতি যুবকরা পড়াশোনা এবং চাকরির খোঁজে বাইরে গিয়ে আক্রান্ত ও খুন হচ্ছেন। যেমন উত্তরাখণ্ডে খুন হন রাজ্যের যুবক এঞ্জেল চাকমা।

ত্রিপুরায় বিজেপির শাসনে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ড্রাগস ও অন্য মাদকাসক্তি এবং এইডস।

বেড়েছে চোরাচালান ও পাচার বাণিজ্য। ত্রিপুরা এখন আন্তর্জাতিক মাদক পাচার বাণিজ্যের অন্যতম করিডর। 

বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, গোষ্ঠী কোন্দল ও তোলাবাজির দায়ে খুন সন্ত্রাস। প্রকাশ্য রাজপথে বন্দুক দেখিয়ে পুলিশের সামনে এক পাচারকারীর নেশাসামগ্রী বোঝাই গাড়ি লুট করছে আরেক পাচারকারী। তোলা না-দিলে চলছে গুলি। বেড়েছে শহরে মশার সমস্যা। 

বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর নিদান দিচ্ছেন, দরজা জানালা বন্ধ রেখে মশা এবং চোরের উপদ্রব থেকে রক্ষা পান।

বিপন্ন সম্প্রীতি

বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে যা কখনও হয়নি, কদমতলা, কুমারঘাট, উদয়পুর, কমলপুর-সহ একাধিক জায়গায় সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ও দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে সংঘ পরিবার। 

এটাই বিজেপি-র প্রকৃত চেহারা। এদের প্রতিশ্রুতি আসলে সুকুমার রায়ের খুড়োর কলের মতো। কখনও মানুষের হাতের নাগালে আসে না। বরং হয়রান হয়ে ছুটে মরতে হয়। এটাই ত্রিপুরার অভিজ্ঞতা। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসনে অতিষ্ঠ। মমতা ব্যানার্জির সরকারের পরাজয় চান তাঁরা। কিন্তু বিজেপি যে তৃণমূলের বিকল্প নয়, কংগ্রেসেরও নয় বরং আরও বেশি বিপজ্জনক, তা এখন ত্রিপুরার জনগণ ঠেকে শিখছেন জীবনের অভিজ্ঞতায়। মোদি বলেছিলেন কেন্দ্রে এবং রাজ্যে বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে ত্রিপুরার জনগণ ‘দোনো হাত মে লাড্ডু’ পাবেন। সত্যিই তাই। আট-বছরে ত্রিপুরার মানুষ দুহাতে ভরে অশ্বডিম্ব পেয়েছেন। 

ঠেকে শিখছেন ত্রিপুরার মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নিশ্চয়ই সে ভুল করবেন না।


— লেখক ত্রিপুরার ডেইলি দেশের কথা পত্রিকার বরিষ্ঠ সাংবাদিক


প্রকাশের তারিখ: ০৩-এপ্রিল-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৭২ টি নিবন্ধ
০৪-এপ্রিল-২০২৬

০৩-এপ্রিল-২০২৬

০৩-এপ্রিল-২০২৬

০২-এপ্রিল-২০২৬

০১-এপ্রিল-২০২৬

০১-এপ্রিল-২০২৬

৩১-মার্চ-২০২৬

৩০-মার্চ-২০২৬

২৮-মার্চ-২০২৬

২৭-মার্চ-২০২৬