সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বাংলার নারীদের অবস্থা (প্রথম পর্ব)
উর্বা চৌধুরী
পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষার দুর্গতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবন উদ্বেগজনক মাত্রায় এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এক/দেড় দশক ধরে। পরিষেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রাবল্য, শিক্ষক নিয়োগে অস্বাভাবিক গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি শিশুদের বড়ো হয়ে ওঠার পথে এক অনিশ্চয়তার বাতাবরণ সৃষ্টি করছে। কৃষিক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়া, শিল্পের অভাব, উচ্চমানের দক্ষতা লাগে না এমন সাধারণ কাজের জন্যও পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের নিরুপায় হয়ে প্রবাসে চলে যাওয়া— সব মিলিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নড়বড়ে অবস্থায় পৌঁছানোর ফলে এ-রাজ্যের শ্রমজীবী পরিবারগুলি তাদের বাচ্চাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে পড়ছে। কিশোর-কিশোরীরা ভবিষ্যতের আলোর দিশা দেখতে পাচ্ছে কম– বুঝে নিচ্ছে যা হোক করে নয়া একটা উপায়ে বেঁচে থাকতে হবে।

অকালবিবাহ
দেশের নানা রাজ্যে বেশ কবছর ধরে বিশেষত মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহ বা নাবালকবিবাহের হার কমছে ঠিকই, তবে তা সন্তোষজনক নয়। উপরন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই হার উদ্বেগজনক রকমের বেশি, এমনকি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেখা যাচ্ছে, ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-৫ (২০১৯-২০২১)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কখনও-না-কখনও বিয়ে হয়েছে এমন ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়সের আগে। আরও জানা যায় যে, ২০০৫-২০০৬ সাল থেকে ২০১৯-২১ সালের মধ্যে সাধারণভাবে মেয়েদের মধ্যে গড় বিয়ের বয়স ১৭ বছর থেকে বেড়ে ১৮ বছর হয়েছে, অর্থাৎ ১ বছরের বৃদ্ধি। দেশের বাকি অংশে এই বৃদ্ধি গড়ে ২ বছরেরও বেশি। ২০০৫-০৬ সাল থেকে ২০১৫-১৬ সালের মধ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বাল্য বা নাবালকবিবাহের হার ১৩.৪ শতাংশ বিন্দু কমলেও, ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে কমেছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ বিন্দু। আবার তার পরবর্তী ৫-৬ বছরে প্রথম বিভাগের বয়সীদের এই হারের কোনো উন্নতি নেই। গোটা ভারতের গড় চিত্র ভিন্ন— অকালবিবাহের হার পশ্চিমবঙ্গের থেকে কম তো বটেই, ধীর মাত্রায় হলেও এই হারের হ্রাস ঘটছে। এছাড়াও, দেখা যাচ্ছে, যাদের নাবালক অবস্থায় বিবাহ হয়নি, তাদের মধ্যে এ-রাজ্যে ২০ বছর বয়সের মধ্যে ৬৬ শতাংশ মেয়ের, ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ২১ বছর বয়সের মধ্যে। এই বয়সকালকে লেট অ্যডোলেসেন্স হিসাবেও গণ্য করা হয়।
সারণি ১: পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতে অকালবিবাহের হার
|
পশ্চিমবঙ্গ |
||
|
এনএফএইচএস রাউন্ড ও সময়কাল |
সমীক্ষায় ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিবাহিতদের শতাংশ |
সমীক্ষায় ১৮-১৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিবাহিতদের শতাংশ |
|
এনএফএইচএস ৩ (২০০৫-০৬) |
৫৪% |
৪৬% |
|
এনএফএইচএস ৪ (২০১৫-১৬) |
৪১.৬% |
৩৯.১% |
|
এনএফএইচএস ৫ (২০১৯-২১) |
৪১.৬% |
৩৪.১% |
|
জাতীয় গড় |
||
|
এনএফএইচএস ৩ (২০০৫-০৬) |
৪৭.৪% |
৩৭.৭% |
|
এনএফএইচএস ৪ (২০১৫-১৬) |
২৬.৮% |
২০.১% |
|
এনএফএইচএস ৫ (২০১৯-২১) |
২৩.৩% |
১৬.৩% |
অকালবিবাহের এই বিপজ্জনক প্রথার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক নির্ধারকের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে (এনএফএইচএস ৫), পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ বা নাবালকবিবাহ হয়েছে যে মেয়েদের তাঁদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ কখনও ইস্কুলে যাননি বা খুব জোর প্রাথমিক অবধি লেখাপড়া করেছেন। ১২ বছরের বেশি সময়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত থাকা মেয়েদের ৪ শতাংশের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের কমে। আর্থিকভাবে সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারগুলির মধ্যে ৫৬ শতাংশের ও অবস্থাপন্ন ঘরের ১৩ শতাংশের ১৮ বছরের কমে বিয়ে হচ্ছে। জেলাগতভাবে দেখলে, ২০১৫-১৬ সালে মালদা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর ছিল সেই চারটি জেলা যেখানে ৫০ শতাংশের বেশি মেয়েদের ১৮ বছরের কমে বিয়ে হয়েছে, ২০১৯-২১ সালে এই চিত্র দেখা গেছে মুর্শিদাবাদ, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরে। যদিও বীরভূম, বাঁকুড়া, কোচবিহারের মতো দরিদ্র জেলার সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান ও হুগলি জেলায়ও এই চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক– ৪০ থেকে ৪৯ শতাংশের মধ্যে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে বাঁকুড়া, হুগলি এমনকি কলকাতা জেলার অবস্থা ২০১৫-১৬ সালের থেকে ২০১৯-২১ সালে খারাপ হয়েছে।
আর্থিক অনটন, শিশুসুরক্ষা বা স্কুলজীবন শেষ না-করার সঙ্গে অকালবিবাহের যোগ স্পষ্ট হলেও আরও কয়েকটি ফ্যাক্টর খুব প্রকটভাবে নজরে আসছে। তার মধ্যে অন্যতম হল– জলবায়ু। সুন্দরবন অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বিপর্যয়মূলক জলবায়ু কারণ হচ্ছে স্কুলছুট হওয়া, অকালবিবাহ, শিশুশ্রম, পাচারের।
পশ্চিমবঙ্গে স্কুলশিক্ষার দুর্গতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবন উদ্বেগজনক মাত্রায় এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এক/দেড় দশক ধরে। পরিষেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রাবল্য, শিক্ষক নিয়োগে অস্বাভাবিক গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি শিশুদের বড়ো হয়ে ওঠার পথে এক অনিশ্চয়তার বাতাবরণ সৃষ্টি করছে। কৃষিক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়া, শিল্পের অভাব, উচ্চমানের দক্ষতা লাগে না এমন সাধারণ কাজের জন্যও পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের নিরুপায় হয়ে প্রবাসে চলে যাওয়া— সব মিলিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নড়বড়ে অবস্থায় পৌঁছানোর ফলে এ-রাজ্যের শ্রমজীবী পরিবারগুলি তাদের বাচ্চাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে পড়ছে। কিশোর-কিশোরীরা ভবিষ্যতের আলোর দিশা দেখতে পাচ্ছে কম– বুঝে নিচ্ছে যা হোক করে নয়া একটা উপায়ে বেঁচে থাকতে হবে। ফলে কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাও বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বাবা-মায়েরা নিরাপত্তার ভয়েও কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন— শীতলকুচির একদা ছিটমহলের গ্রামের শ্রমিক মায়ের কথায়, মেয়ের মাধ্যমিকের পর তিনি পড়াতে চাইলেও ‘অঘটনের’ ভয়ে মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হতে পারে।
নারী ও শিশু পাচার
অকালবিবাহের আলোচনার সূত্রে উঠে আসে আরেকটি ভয়ংকর বাস্তব ছবি। নারী-শিশুর পাচার। জোরপূর্বক শ্রমনিযুক্তি, দেহব্যবসায় নিযুক্তি, অন্যান্য যৌন-শোষণের জন্য ব্যবহার করা, জোরপূর্বক বিয়ে, বেআইনি দত্তক, গৃহপরিচারকের কাজে নিযুক্তি, অঙ্গহানি ঘটিয়ে বা না-ঘটিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিযুক্তি, মাদক পাচারের কাজে নিযুক্তি, পর্নোগ্রাফিতে নিযুক্তি, অঙ্গপাচার— মূলত এইসব উদ্দেশ্যে ভারতে শিশু ও নারী পাচার চলে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চেন্নাই শহরের উপকণ্ঠে পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের যৌথ অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৬১ জন শিশু শ্রমিককে। এরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাচার হয়ে বাঁধা-মজুর হিসেবে বেগার খাটছিল মোট পাঁচটি গয়না তৈরির কারখানায়। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯)
২০২৩ সালের অগাস্ট মাসে রায়না থানা এলাকার নাবালিকাকে অপহরণ করা হয়। নিখোঁজ হওয়া ছাত্রীটিকে মোবাইলে কথা বলা নিয়ে অভিভাবকেরা বকাবকি করায় বাড়ি ছাড়ে সে। এরপর দুই ব্যক্তি ছাত্রীটিকে অপহরণ ও ধর্ষণ করে। পরে তাকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। প্রথমে ছাত্রীটিকে আসানসোলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। তারপর তাকে রাজস্থানে বিক্রি করে আবার বিয়ে দেওয়া হয়। রাজস্থানে একাধিক ব্যক্তি মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। সে-বছরই রাজস্থান থেকে ছাত্রীটিকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় উক্ত দুই ব্যক্তি ছাড়াও আরও ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ নভেম্বর ২০২৫)
২০২৫ সালের জুলাই মাসে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে পাটনাগামী ক্যাপিটাল এক্সপ্রেসে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং ডুয়ার্স এলাকার ৫৬ জন যুবতীকে। একটি মোবাইল কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ দেওয়া হবে বলে বেঙ্গালুরু নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল এঁদের। কলকাতার এক পুরুষ ও শিলিগুড়ির এক নারীকে এই ঘটনায় দায়ী হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ জুলাই ২০২৫)
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিশু সুরক্ষা কমিশনের আধিকারিকেরা নিউ মার্কেট থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯ জন শিশুকে উদ্ধার করে। এই শিশুদের মধ্যে ১ জন ওড়িশা এবং বাকি ৮ জন বিহারের বাসিন্দা। এদের পাচার করে আনা হয় পশ্চিমবঙ্গে ও রাস্তার ধারের বিভিন্ন পাইস হোটেল, খাবারের দোকানে শিশু-শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হয়। জোরপূর্বক শ্রমনিযুক্তির এই ঘটনায় শিশুরা বাড়ি যেতে চাইলে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে তাদের আটকে রাখা হচ্ছিল। (এই সময় অনলাইন, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫)
ভারতের রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে পাচার প্রসঙ্গে মান্য পরিসংখ্যন-সূত্র ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর প্রতিবেদন। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিকতম। সব রাজ্যের ক্ষেত্রেই তথ্যের দুর্বলতা স্পষ্টত আন্দাজ করা গেলেও, সবচেয়ে বেশি খটকা লাগায় পশ্চিমবঙ্গের তথ্য। পশ্চিমবঙ্গে লিঙ্গ, বয়স নির্বিশেষে ২০২১ সালে ৬১টি, ২০২২ সালে ৬৭টি ও ২০২৩ সালে ৫৬টি মানবপাচারের কেস রিপোর্টেড হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১৮ বছরের নিচে মাত্র ৬ জন ছেলে (উদ্ধার হয়েছে ৪ জন) ও ৪৪ জন মেয়ে (উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জন) এবং ১৮ বছরের উপরে বয়স এমন মাত্র ১৭ জন নারী (উদ্ধার হয়েছেন ১৫ জন) পাচার হয়েছে। এদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে ১৪ জন পাচার হয়েছেন জবরদস্তি দেহব্যবসায় নিযুক্তির জন্য আর ২ জন পাচার হয়েছেন জবরদস্তি বিয়ে করানোর জন্য। আরেকটি পরিসংখ্যান বস্তুত ভয়াবহ এক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। ২০২২ ও ২০২৩ সাল মিলিয়ে নিখোঁজ ও প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ইস্তক সন্ধান না-পাওয়া ১৮ বছরের কম বয়সী ছেলের সংখ্যা ৩,৮২২ এবং মেয়ের সংখ্যা ১৭,৮৩৯— মোট নিখোঁজ শিশু ২১,৬৬১ জন। ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এবং ২০২২ ও ২০২৩ সাল মিলিয়ে নিখোঁজ ও প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ইস্তক সন্ধান না-পাওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক মোট নারীর সংখ্যা ৮১,৯০২ জন। এক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সব রাজ্যের শীর্ষে।
এই পরিসংখ্যানগুলির তুল্যমূল্য বিচার করলে বোঝা যায়, শিশু ও নারী পাচারের ক্ষেত্রে নগণ্য পরিসংখ্যান ও নিখোঁজ শিশু-নারীর প্রাবল্য, যা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তা এক বিরাটকায় ধামাচাপা অপরাধের প্রতিফলন। যে-অপরাধের পরিণাম অবধারিতভাবে বীভৎস, প্রাণসংশয়কারী।
অপুষ্টি ও অ্যানিমিয়া
উপরে উল্লেখিত দারিদ্র্য, অসুরক্ষা, স্বাস্থ্যবঞ্চনা ও শিক্ষাবঞ্চনার মর্মান্তিক পরিণাম স্বাস্থ্যক্ষয়। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির একটি পাইলট সমীক্ষা চলাকালীন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে কিছু তথ্য। তাতে খ্যাদ্যাভ্যাসে যথেষ্ট পুষ্টিগুণযুক্ত খাবার সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হয়ে দেখা দেয় নারীদের মধ্যে নিজেদের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে ধারণা সম্পর্কিত তথ্যও। বীরভূমের সাঁইথিয়া ব্লকের চারটি গ্রামের মোট ৭৪ জন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এঁদের মধ্যে ৫০ জন নারী সপ্তাহে একদিন বা তার কম আমিষ খাবার খেতে পারছেন। এবং এঁদের মূল খাবার ভাত, আলু, টমেটো, মাঝেমধ্যে শাকসবজি আর মাসে কখনো-সখনো ডাল। পুষ্টিকর খাবারের নিত্য অভাবের কারণে ‘খাবার’ তাঁদের ক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়িয়েছে পেট ভরে থাকার সামগ্রী বা যখন তখন খিদের জ্বালা চাগিয়ে না-ওঠার উপায় মাত্র; পুষ্টির উৎস নয়। তবে, এই সমীক্ষার উত্তরদাতারা নিজেদের খাদ্যাভ্যাসের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানাচ্ছেন, গোষ্ঠীগত সংস্কৃতি নয়, ধর্মীয় রীতি নয়, বেছে নেওয়া স্বাদ নয়, এমনকি ‘অশিক্ষা’-‘অসচেতনতা’-‘অজ্ঞানতা’ও নয়, তাঁদের অপর্যাপ্ত-পুষ্টি খাদ্যাভ্যাস আসলে রোজগারহীনতার পরিণাম, দারিদ্র্যের পরিণাম— উপায় (ক্রয়ক্ষমতা) থাকলে তাঁরা পুষ্টিকর খাবারই খেতেন, উপায় নেই তাই খান না।
উক্ত সমীক্ষায় মোট ২৭২ জন উত্তরদাতা নারীর মধ্যে ১৮৯ জন জানেন না, তাঁদের অপুষ্টি বা অ্যানিমিয়া আছে কি না। এই ‘না-জানা’-র যে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে তার কারণ, ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে–৫-এর (২০১৯-২০) প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৭১ শতাংশ অ্যানিমিয়া আক্রান্ত (পুরুষদের মধ্যে এই হার ৩৯.২ শতাংশ)। ভারতে ওই বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার ৫৭ শতাংশ। স্পষ্ট বোঝা যায়, পুষ্টিকর খাবারের স্পষ্ট অভাবের বাস্তবতা সত্ত্বেও, অ্যানিমিয়ার পরিসংখ্যানের দুরবস্থা সত্ত্বেও, রাষ্ট্র এমন কোনো কার্যকরী বন্দোবস্ত রাখেনি যা দিয়ে, সর্বজনীনভাবে নারীদের বুনিয়াদি স্বাস্থ্যের ধারাবাহিক নিরীক্ষণ সম্ভব হয়, বা সমতার নীতি মেনে সকল নারীর জন্য বাড়তি খাবারের বন্দোবস্ত হয়।
রেশন ব্যবস্থায় যথেষ্ট পুষ্টিগুণ যুক্ত, প্রোটিনযুক্ত খাদ্যসামগ্রী বিতরণ না-করা, নারীদের মধ্যে দুর্বল স্বাস্থ্য, অপুষ্টি, অ্যানিমিয়ার হার অস্বাভাবিক বেশি হওয়া সত্ত্বেও সকল নারীর জন্য কার্যকরী পুষ্টিভিত্তিক বিশেষ বন্দোবস্ত, বিশেষ খাদ্যসামগ্রী বণ্টনের ব্যবস্থা না-করা, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের মাধ্যমে কিশোরী শক্তি যোজনার খাদ্যসামগ্রী বণ্টনকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হল কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির দেশের নারীদের খাদ্যে সমতার অধিকার লঙ্ঘনের তরিকা। মিড-ডে মিল-এর অকথ্য দৈন্য দশার কারণে শিশু, কিশোরীদের পাতে সপ্তাহে একটা ডিমও দেওয়া যায় না; বহু ক্ষেত্রে— ইস্কুলে তাদের দুপুরের খাদ্য বলতে ভাত, আলুর ঝোল, মটরের ঝোল, সয়াবীন বড়ির ঝোল বা কখনও কখনও সবজির ঝোল। এই মুহূর্তে মিড-ডে-মিলের বরাদ্দ প্রাথমিকে ৬.৭৮ টাকা ও উচ্চ প্রাথমিকে ১০.১৭ টাকা। এই খাবারও বণ্টন হয় কেবলমাত্র অষ্টম শ্রেণি অবধি। নারী, কিশোরীদের স্বাস্থ্যের বিশেষ দুর্দশার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ পশ্চিমবঙ্গ মায় ভারতে অন্তত কেবলই সামাজিক প্রথা-প্রবণতা নয়; প্রান্তিক লিঙ্গগত অবস্থানে থাকায় নারীর স্বাস্থ্যকে নিয়মিত বিপন্ন করে চলেছে সরকারগুলির কর্তব্যবিমুখতা, জনবিরোধী নীতি ও প্রান্তিক মানুষকে মানুষজ্ঞান না-করার মতো চারিত্রিক স্খলন। তদুপরি রয়েছে সাধারণ প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থানের উপায় সংকুচিত হতে থাকার বাস্তবতা। নারীর কর্মসংস্থান আরও অপর্যাপ্ত, ঝুঁকিপূর্ণ, বঞ্চনাক্লিষ্ট। অসহনীয় আর্থিক অসাম্য, দরিদ্রের আরও দরিদ্র হতে থাকা, স্থায়ী জীবিকা ও রোজগারের অভাব, কৃষি থেকে আয় কমতে থাকা— এ-রাজ্যের, এ-দেশের বেশিরভাগ মানুষের ধারাবাহিক ক্রয়ক্ষমতাকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার এ-প্রসঙ্গে স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়, কারণ তারা পুঁজিপতির সক্রিয় দোসর।
শেষ পর্ব আসছে আগামীকাল
প্রকাশের তারিখ: ৩০-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay






