Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অসাম্যের যুগে কৃষির চালচিত্র

পি. সাইনাথ
শহর থেকে গ্রামে ‘ফিরতি অভিবাসন’ সম্ভবই হত না যদি তার আগে গ্রাম থেকে শহরে বিপর্যয়তাড়িত দেশান্তর না ঘটে থাকত। এই দেশান্তর এতটাই ব্যাপক ছিল যে মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তা যোজনার উপর বিপুল পরিমাণ চাপ সৃষ্টি হয়, এবং সরকারকে যোজনায় নতুন করে টাকা ঢালতে হয়। এখন কিন্তু আবারও এই যোজনাকে অবহেলা করা হচ্ছে, আর্থিকভাবে এবং অন্যান্য উপায়ে।
agriculture in the age of inequality

[“ভারতবর্ষের কৃষিক্ষেত্রে জাঁকিয়ে বসা সংকটের প্রকৃত কারণ কর্পোরেটের থাবা আর গ্রামাঞ্চলের যথেচ্ছ বাণিজ্যীকরণ।… বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক ক্ষুদ্র জমি-জোতের মালিকদের যদি স্রেফ টিকে থাকার জন্য এমন লড়াই করতে হয়, তবে হয়তো বলা যায় আমাদের সামনে যেটা ঘটছে সেটা আদতে সভ্যতার সংকট। এমন এক সংকট যাকে শুধু উৎপাদন ঘাটতি দিয়ে মাপা যাবে না, যাবে না মানুষের জীবনহানির ভয়াবহত্ব দিয়েও। এই ঘাটতি আমাদের মানবিকতার, সহমর্মিতার, আমাদের মনুষ্যচেতনারই।” — পিপলস আর্কাইভ অব রুরাল ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি মার্কসবাদী পথ পুনরায় প্রকাশ করছে ‘বিকশিত ভারত’-এ কৃষকদের হালহকিকত তুলে ধরার জন্য।] 

১৯৮৪ সালে, যে বছর ফ্রন্টলাইন-এর জন্ম, ভারতের যে কোনও জায়গায় যে কোনও কৃষকের বাড়ি গেলেই প্রথমে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হত এক গেলাস দুধ। পশ্চিম মহারাষ্ট্রের কোথাও কোথাও বিদায় নেওয়ার সময়েও এক গেলাস মিলত। আবার উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশে প্রায়শই দুধ আসত রুপোর গেলাসে – অতিথির প্রতি সম্মানের নিদর্শন, পাশাপাশি কৃষকের জীবনে সচ্ছলতার প্রতীকও ছিল তা। 

তামিলনাড়ুর খেতিবাড়িতে দুধ আসত নিখাদ পিতলের গেলাস ভরে। মাঝে মাঝে গেলাসে থাকত ফিল্টার কফি, তার অনির্বচনীয় স্বাদ। নব্বইয়ের দশক আসতে আসতে নানা রাজ্যে রুপোর গেলাসের জায়গা নিতে শুরু করল স্টেনলেস স্টিল। ১৯৯১ সালের পর তাজা দুধ মিলত বটে, কিন্তু ফাটা চিনামাটির পাত্রে, কোণাভাঙা পিরিচে। নয়ের দশকের মাঝামাঝি এসে সব গেলাস কাচের হয়ে গেল। 

২০০০ সাল এল যতদিনে, দুধের জায়গা দখল করেছে চা। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলে ২০০৩-০৪ সালে মিলত কালো চা। চায়ে কতটা চিনি পড়বে সেটা বরাবর সম্মান দেখানোর তরিকা ছিল – ক্রমশ কমতে থাকল সেই চিনির পরিমাণও। এই দশকের মাঝামাঝি এসে কাচের গেলাসও গায়েব। ট্রেনে-বাসে যে ঝরঝরে প্লাস্টিকের কাপগুলো পাওয়া যায় তাতে করে খুব অল্প পরিমাণ কালো চা আসে আজকাল। 

২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে স্বাধীনতা সংগ্রামী গণপতি বাল যাদবের বাড়ি গেছিলাম। কয়েকঘণ্টার টানা সাক্ষাৎকার শেষে তিনি আমায় বিদায় জানিয়েছিলেন অ্যালুমিনিয়ামের গেলাস ভরা তাজা দুধ দিয়ে।

গেলাস ও তার ভিতরের পদার্থের এই রূপবদলকে দেখা যায় দেশের কৃষি অর্থনীতির অবক্ষয়ের একটা রূপক হিসেবেও। রূপকে আরও ধরা পড়ে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া নানান সরকারি অর্থনৈতিক নীতি, যাদের জেরে দুধের (এবং অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য) দাম জোর করে নামিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এই সংস্থাগুলি – তাও এমন একটা সময়ে যখন আমাদের দেশে “বাজারভিত্তিক দাম” নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার জোরে উপভোক্তাদের দিকে জিনিস কেনার দাম চড়চড়িয়ে বাড়ছে। 

এই নীতিগুলি যথেষ্ট জেনেবুঝে, ভেবেচিন্তে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এমন নীতিও আছে যাদের জেরে লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবারের ছোটো ছেলেমেয়েরা দুধ খাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকেছে শিশুকালে। সংসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ঘরে সন্তানের মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে গবাদি পশুর দুধের শেষ ফোঁটা পর্যন্ত বাজারজাত করতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকরা। এটা শুধু দুধের বিষয় নয়। তুলোর কথাই ধরা যাক। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি বিদর্ভের এক কৃষক এক কি দুই কুইন্টাল তুলো বেচে যে টাকা পেতেন তাতে ১০-১২ গ্রাম সোনা কেনা যেত। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় কাজে লাগত। আজ ১০ কুইন্টাল তুলো বেচেও ১০ গ্রাম সোনা কিনতে পারবেন না কোনও কৃষক। 

মহারাষ্ট্রে ঘোষিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) হল কুইন্টাল প্রতি ৭,১২২ টাকা, কিন্তু বাস্তবে ৬,৫০০ টাকার বেশি দর পাওয়া যায় না। যদি পুরো এমএসপি-তেও বিক্রি করা যায়, তাহলেও ১০ কুইন্টালের জন্য কৃষক দাম পাবেন ৭১,২২০ টাকা – আজকের দিনে ১০ গ্রাম সোনার দাম তার চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ এক কুইন্টাল তুলো বেচে এক গ্রাম সোনাও আজ কেনা যাচ্ছে না।

এটা আবারও সেই অর্থনৈতিক নীতির ফলশ্রুতিতে ঘটা অবক্ষয় বা ‘পরিবর্তন’। এইসব নীতি এবং প্রক্রিয়াগুলির সরাসরি ধাক্কা এসে লেগেছে অন্যান্য সামাজিক শ্রেণির গায়েও। আমাদের দেশে অবশ্য তার একদম জলজ্যান্ত উদাহরণ আমরা দেখেছি ১৯৯১ সালের পর থেকে। বাকি বিশ্বের দিকে তাকালে এর যেসব উদাহরণ দেখা যায়: 

গরিব মানুষের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র এবং যোজনাগুলি থেকে রাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানো। সমাজের দরিদ্রতর অংশের দিকে যাওয়া ভর্তুকিগুলিতে কোপ পড়ছে, এবং ধনী তথা কর্পোরেটের ঝুলিতে ‘ইনিসেন্টিভ’ এর নাম দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি জড়ো হচ্ছে। 

কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগে ক্রমাগত হ্রাস। কৃষিকাজ থেকে কৃষিবাণিজ্যের দিকে দ্রুত সরে যাওয়া কৃষিঋণের গতিমুখ। গরিবের হাত থেকে ধনীর হাতে চলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ। কৃষকদের ঘাড়ে চেপে বসা বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা। তার পাশাপাশি, কর্পোরেট শক্তির বেনজির উত্থান। জনসাধারণের সম্পদ বলে যা গণ্য হত সেগুলি ক্রমশ বেসরকারি সংস্থাগুলির সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া, যার অন্যতম উদাহরণ ছত্তিশগড়ের একটি নদীর গতিপথের ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটা অংশ।

সবদিকে সবকিছুর বেসরকারিকরণ, বুদ্ধিমত্তার, আত্মারও। স্থানীয় প্রশাসন কাঠামোর ধ্বসে পড়া; কর্পোরেট শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে উঠেও পরাজিত পঞ্চায়েতি রাজ। প্রাক্তন আরবিআই গভর্নর ওয়াই.ভি. রেড্ডি হলে হয়তো বলতেন: গ্রামাঞ্চলে বিকাশ প্রচুর দেখছি, গ্রামাঞ্চলের বিকাশ দেখছি না।

আর এসবের পাশাপাশি, প্রত্যাশিতভাবেই চড়চড়িয়ে বাড়ছে অসাম্যের পারদ। ভারতে এই মুহূর্তে ডলারের নিক্তিতে বিলিয়নেয়ার আছে ২১৭ জন; ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪ তারিখে তাদের সম্মিলিত সম্পদমূল্য ছিল (ফোর্বস-এর হিসেবে) ১,০৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ব্যাপারটা বিলিয়ন ছাড়িয়ে ট্রিলিয়নে পৌঁছে গেছে। ভারতের কৃষিখাতের বাজেট ১৭.৯১ বিলিয়ন ডলার; তার প্রায় ৫৮ গুণ হবে পূর্বোক্ত সংখ্যাটা। দেশের গোটা বাজেট ৫৬২ বিলিয়ন ডলার; তার প্রায় ১.৮ গুণ। ভেবে দেখুন: দেশের ২১৭ জন ব্যক্তির (জনসংখ্যার ০.০০০০১৫ শতাংশ) হাতে জমা হয়েছে আমাদের জাতীয় মোট আয় বা জিডিপি-র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ। 

১৯৯১ সালের পরের দশকগুলিতে ক্রমান্বয়ে অবক্ষয়ের পথে গেছে কৃষকদের জীবনধারণের সহায়ক নীতিমালা। যেমন ধরুন, সরকারি-নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজার বা মান্ডিগুলির গুরুত্ব কমে আসা। কিংবা, সরকারি ক্ষেত্রের পরিকল্পনামাফিক, বিধ্বংসী অবমূল্যায়ন, যা কৃষিক্ষেত্র তথা কৃষকদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তার জেরে টান পড়েছে খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সহজলভ্যতার উপরেও। 

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এককালে জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত, কাফকার উপন্যাসের মতো দুঃস্বপ্নগহ্বরে পড়ে তারা আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট কৃষিবাণিজ্যের পরীক্ষাগার। কৃষকদের হাত থেকে পরিকল্পনামাফিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বিকল্প, লক্ষ লক্ষ কৃষক বাধ্য হয়েছেন নতুন-পুরোনো সাহুকার বা মহাজনদের থেকে ধার করতে। কৃষকদের প্রাপ্য দাম কমেছে, কিন্তু উপভোক্তাদের কেনার দাম বিস্ফারিত হয়েছে ক্রমশ। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বিদর্ভ অঞ্চলে তুলো চাষের খরচের খতিয়ানে একবার চোখ বোলালে দেখা যাবে, এই সময়কালের মধ্যে এক একর তুলো চাষের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ তথা সার্বিক চাষের খরচ বেড়েছে ২৫০-৩০০ শতাংশ, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু কৃষকদের আয়? চাষের খরচ, বিশেষ করে বীজের দাম যেমন বিদ্যুৎগতিতে বেড়ে চলেছে তার তুলনায় চাষ থেকে আয় বেড়েছে নিতান্তই সামান্য, যদি আদৌ বেড়ে থাকে। 

আয়ের কথাই ধরি? জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে বা এনএসএস) ৭৭তম সংস্করণ, যাতে কৃষকবাড়িগুলির শেষতম তথ্য ধরা আছে, তাতেও দেখাচ্ছে যে কৃষকবাড়ির গড় মাসিক আয় হল ১০,২১৮ টাকা। সংগঠিত ক্ষেত্রে এমন একটাও চাকরি দেখাতে পারবেন যার মাসিক বেতন এর অন্তত দ্বিগুণ নয়? মাথায় রাখতে হবে, এটা কিন্তু একজনের আয় নয়, গোটা পরিবারের আয়। ২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করে দেবে, মনে আছে? আদতে ২০১২-১৩ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের মধ্যে চাষ থেকে আয় ১০ শতাংশ কমে গেছে। কৃষকবাড়িগুলিতে এখন মজুরি, চাকরির বেতন, গবাদি পশু ইত্যাদি থেকে আয় হয় চাষের আয়ের তুলনায় বেশি। 

প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদরা যেমন দেখিয়েছেন, আমাদের দেশে জিনিসের দামের বিশ্বায়ন হয়েছে, আর উপার্জনের ক্ষেত্রে হয়েছে ভারতীয়করণ। 

২০২৪ সালে এসে আমরা জানি, এখনও পর্যন্ত ৪,০০,০০০ কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীতিপঙ্গুতা-জনিত কারণে হতাশাতাড়িত হয়ে। এই সংখ্যাটা সরকারি হিসাব, এবং প্রত্যাশিতভাবেই বাস্তব সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক কম।

কৃষক আর খেতমজুরদের জীবনজীবিকার উপর নেমে আসা এই পরিকল্পনামাফিক ধ্বংসলীলার জের দেখা যায় ২০০১ থেকে ২০১১ আদমসুমারির মধ্যবর্তী সময়ে ভারতে এযাবৎকালের মধ্যে সর্ববৃহৎ অভিবাসনের ঝোঁকে। চাষবাস এবং চাষকেন্দ্রিক অর্থনীতি যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রাম আর ছোটো শহর ছেড়ে কাজের খোঁজে পাড়ি দিয়েছেন বড়ো শহরগুলির দিকে। এটাকে তখন খারাপ জিনিস হিসেবে দেখা হয়নি। দ্য হিন্দু এবং ফ্রন্টলাইন ছাড়া বিশেষ কোনও মিডিয়াও এদিকে নজর দেয়নি। নয়াউদারবাদী অর্থনীতিবিদদের তখন নারা ছিল, “লক্ষ লক্ষ মানুষকে চাষাবাদ থেকে বার করে আনতে হবে।” ভালো কথা। কিন্তু সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও গুরুত্ব ছিল আদৌ? কী কী বিকল্প রাখা হয়েছিল তাঁদের সামনে? 

লক্ষ লক্ষ কৃষককে চাষবাস থেকে সরিয়ে আনা যদি আপনার মতে অবশ্যকর্তব্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে কৃষকদের কোনওমতেই বাদ রাখা যায় না। চাষবাস এবং কৃষকদের জীবনজীবিকা ধ্বংস করে দেওয়া তার উপায় হতে পারে না। 

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কে নাগরাজ বলছেন এইভাবে একমাত্র তখনই ভাবা যেতে পারে যখন “ক) কৃষিজাত উৎপাদনে উন্নতি এসেছে; খ) গ্রাম ও নগরাঞ্চলে ভালো মানের ও ভালো আয়ের চাকরির বন্দোবস্ত আছে; এবং গ) ভালো মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সবার কাছে সহজলভ্য যাতে করে একটা সুস্থ ও সুদক্ষ কর্মীগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে। বাস্তবে এর ঠিক উল্টোটা ঘটেছে। তারপরেও কীভাবে লোকে গ্রামাঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ বিপন্ন মানুষের দেশান্তর যাত্রাকে কৃষিক্ষেত্রে ‘উন্নতি’-র সূচক হিসেবে ধরে!” 

স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের প্রতিটি আদমসুমারিতে কৃষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, ১৯৯১ সালেরটিতেও। আর তার পরেই আসছে এই আকস্মিক পতন। ২০০১ সালের আদমসুমারিতে দেখা গেছিল পূর্ণ সময়ের বা ‘মূলগত কৃষিজীবী’ কৃষকদের সংখ্যা এক ধাক্কায় ৭২ লক্ষ কমে গিয়েছে! ২০১১ আদমসুমারিতে সেই সংখ্যা থেকে কাটা পড়েছে আরও ৭৭ লক্ষ। 

সংক্ষেপে বললে, ‘নয়া’ অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করার পরের প্রথম ২০ বছরে ভারতে কৃষক জনসংখ্যা প্রায় ১৫০ লক্ষ বা ১৫ মিলিয়ন কমে গিয়েছে। গড় হিসেবে দেখলে, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ভারতে ২,০০০-এরও বেশি পূর্ণ সময়ের (বা “মূলগত কৃষিজীবী) কৃষক চাষবাস থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর যে কোনও পেশায়, বিশেষ করে নগর-কেন্দ্রিক ব্যবসা বা পেশাক্ষেত্রে এমনটা হলে হাহাকারের অন্ত থাকত না। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রের খবর যেটুকুও বা মূলধারার আলোচনায় উঠে এসেছে, সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে কর্পোরেট-বন্ধু অর্থনীতিবিদদের স্বর। আর তাঁরা তো বলেই দিয়েছেন, এটা নাকি খুব ভালো হয়েছে। 

২০২২ সালে আত্মহত্যা করেছেন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মোট ১১,২৯০ জন, বলছে জাতীয় অপরাধ নথিবদ্ধকরণ ব্যুরো বা এনসিআরবি-র তথ্য। এর অর্থ প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, প্রতি ঘণ্টায় একের কিছু বেশি। ২০২২ সালের সংখ্যাটি আগের বছরগুলির তুলনায় অনেকটাই বেশি; ২০২১-এ আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১০,৮৮১, ২০২০-সালে ১০.৬৭৭, এবং ২০১৯ সালে ১০,২৮১।

বিষয়টা নিয়ে নাড়াঘাঁটা আবার শুরু হয় – কিছুটা পরিহাসের মতো শোনাবে হয়তো – কোভিড-১৯ অতিমারিকালে “ফিরতি অভিবাসন”এর ঢল নামে যখন। শহরে কাজ করা লক্ষ লক্ষ গ্রামের মানুষ – তাঁদের অনেকেই সুদক্ষ কৃষকও বটে– কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে শহর ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যান। ২০২০ সালের মে মাসে রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে তাদের শ্রমিক ট্রেনে চেপে ঘরে ফিরে গেছেন প্রায় ৯১ লক্ষ শ্রমজীবী। 

ভারি হাহাকার পড়ে গেছিল তখন। “ওরা ফেরত যাচ্ছে কেন? তাতে তো ঝুঁকি অনেক বেশি। শহরে থাকলে বাঁচার সম্ভাবনা বেশি…” কিন্তু এই হাহাকারের আসল কারণ ছিল শহরে সস্তার শ্রমিকদের জোগান কমে যাওয়া। “ফেরত যাচ্ছে কেন” সঠিক প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন করা দরকার ছিল, গ্রাম ছেড়ে এখানে তাঁরা কাজ করতেই বা এসেছিলেন কেন?

 এই প্রশ্নের উত্তর আদতে ধরা আছে একজোড়া শব্দে: কৃষিসংকট। 

শহর থেকে গ্রামে ‘ফিরতি অভিবাসন’ সম্ভবই হত না যদি তার আগে গ্রাম থেকে শহরে বিপর্যয়তাড়িত দেশান্তর না ঘটে থাকত। এই দেশান্তর এতটাই ব্যাপক ছিল যে মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তা যোজনার উপর বিপুল পরিমাণ চাপ সৃষ্টি হয়, এবং সরকারকে যোজনায় নতুন করে টাকা ঢালতে হয়। এখন কিন্তু আবারও এই যোজনাকে অবহেলা করা হচ্ছে, আর্থিকভাবে এবং অন্যান্য উপায়ে। 

এই সংকটের মাত্রা এতটাই তীব্র যে বিগত বছরগুলিতে ক্রমশ জোরদার হয়েছে নানান কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলির মধ্যে প্রথমটি ঘটে গত দশকে, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে নাসিক থেকে মুম্বই পর্যন্ত ঐতিহাসিক পদযাত্রায় শামিল হন ভারতের দরিদ্রতম এবং অনেকাংশে আদিবাসী ৪০,০০০ কৃষক। শেষতম উদাহরণটি হল ২০২০-২১ সালে দিল্লির প্রবেশদ্বারে সমবেত কৃষকদের অভাবনীয় প্রতিবাদ সমাবেশ। মূলধারার সংবাদমাধ্যম কি আপনাদের এটা জানিয়েছে, যে গত ৩০ বছরে সারা বিশ্বে সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক বিক্ষোভ ছিল এই কৃষক আন্দোলন? বিশ্ববন্দিত অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে শামিল ছিলেন মাত্র কয়েক হাজার আদর্শবাদী তরুণ-তরুণী, আর নয় সপ্তাহের মধ্যে নিউ ইয়র্কের জুকোটি পার্ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। দিল্লির কৃষক আন্দোলন ৫৪ সপ্তাহ ধরে চলেছিল, বিক্ষোভ ওঠে তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহারের পরেই।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরবর্তীকালে দাবি করেন আইন তুলে নেওয়া হয়েছে কারণ তিনি “কৃষকদের একটা অতিক্ষুদ্র অংশ”কে এটা বোঝাতে অসমর্থ হয়েছেন যে এই নতুন কৃষি আইনগুলি আদতে তাঁদেরই সুবিধা করবে। এটা অবশ্য তিনি বলেননি যে সেই বোঝানোর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, কনসার্টিনা কাঁটাতার, বিরাটাকৃতি শিপিং কনটেইনার দিয়ে তৈরি ব্যারিকেড, এবং কৃষকদের ট্র্যাক্টর মিছিল আটকাতে জাতীয় সড়ক খুঁড়ে রেখে দেওয়া। 

১৯৯১ সালের পর তিন দশকে কৃষিসংকটের সঙ্গে মিশে গেছে কৃষিভিত্তিক বৃহত্তর সমাজের সংকট। জুড়েছে বেকারত্ব সংকট, পরিযায়ী শ্রমিক সংকট, জল-স্বাস্থ্য-শিক্ষার সংকট। এবং আরও অনেক কিছু। আর এইসবের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আত্মঘাতী কৃষকের (যার মধ্যে খেতমজুররাও আছেন) সংখ্যা। সরকার কীভাবে এর মোকাবিলা করছে? জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর গণনাপদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ টানাহেঁচড়া করে। এই কারণেই ২০১৪ সালের পর থেকে কৃষক আত্মহত্যার যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তার সঙ্গে তার আগের ১৯ বছরের পরিসংখ্যানের কোনও তুলনাই করা সম্ভব নয়। 

আসল কথাটা হল: কৃষক আত্মহত্যা কিন্তু কৃষিসংকট নয়, বরং কৃষিসংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ ফলশ্রুতি। কৃষক আত্মহত্যা থেকে কৃষিসংকট উদ্ভূত হচ্ছে না, এই আত্মহত্যাগুলি সংকটের উপসর্গ। মৃত্যগুলি কারণ নয়, পরিণাম।

পাঁচটি শব্দে কৃষিসংকটের ব্যাখ্যা: কর্পোরেট কর্তৃক ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রের দখল।

যে পদ্ধতিতে এই কর্পোরেটকরণ ঘটছে তার বর্ণনা অধ্যাপক কে নাগরাজ দিয়েছেন আরও পাঁচটি শব্দে: ভারতের গ্রামাঞ্চলের সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিকরণ প্রক্রিয়া। সেই পদ্ধতির ফলশ্রুতি আরও পাঁচটি শব্দ: আমাদের ইতিহাসে ঠাঁইনাড়ার সর্ববৃহৎ দেশান্তর (সম্ভবত মানবেতিহাসেও সর্ববৃহৎ)। 

বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক ক্ষুদ্র জমি-জোতের মালিকদের যদি স্রেফ টিকে থাকার জন্য এমন লড়াই করতে হয়, তবে হয়তো বলা যায় আমাদের সামনে যেটা ঘটছে সেটা আদতে সভ্যতার সংকট। এমন এক সংকট যাকে শুধু উৎপাদন ঘাটতি দিয়ে মাপা যাবে না, যাবে না মানুষের জীবনহানির ভয়াবহত্ব দিয়েও। এই ঘাটতি আমাদের মানবিকতার, সহমর্মিতার, আমাদের মনুষ্যচেতনারই। 

অনুবাদ: দ্যুতি মুখার্জি
এই প্রতিবেদনের প্রথমবার ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। 
ঋণ- https://ruralindiaonline.org/article/agriculture-in-the-age-of-inequality-bn গত ৪ মার্চ, ২০২৫-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন।
চিত্রঋণ- পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া


প্রকাশের তারিখ: ১৩-মার্চ-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

সময়োপযোগী লেখা
- তাপস সিনহা, ১৩-মার্চ-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রমিক কৃষক বিভাগে প্রকাশিত ৫৬ টি নিবন্ধ
২০-মে-২০২৬

১৭-মে-২০২৬

১৫-মে-২০২৬

০৭-মার্চ-২০২৬

০১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৯-ডিসেম্বর-২০২৫

০২-ডিসেম্বর-২০২৫

০১-ডিসেম্বর-২০২৫

৩০-নভেম্বর-২০২৫

২৬-অক্টোবর-২০২৫