Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

গোয়ের্নিকা আঁকলেন পিকাসো

আলাঁ সেরে
আলাঁ সেরে- ফরাসী, পেশায় স্কুলশিক্ষক। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বই লেখেন। লিখলেন পিকাসোর জীবনী। গোয়ের্নিকার জীবনীও। যদিও এই সৃষ্টিকে জীবনী না বলে কবিতা বলাই ভালো। আজ, পিকাসোর জন্মদিনে তার ভাষান্তর প্রকাশ করা হল।
AndPicassoPaintedGuernica

প্যারিস, অক্টোবর ১৮৮১:  হাজার হাজার দর্শকের সামনে তাঁর নতুন আবিষ্কার তুলে ধরছেন থমাস এডিসন -  ইলেকট্রিক লাইট। আস্তে আস্তে পৃথিবীর সমস্ত রাত উজ্জ্বল  হয়ে উঠবে।

কিছুদিন পরেই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস নামের ট্রেন গোটা ইউরোপ পেরিয়ে পৌঁছবে কনস্টান্টিনোপল, এশিয়ার দরজায়। এবং তার পরেই প্রথম মোটরগাড়ি ছুটবে ঘোড়ার থেকেও জোরে। আস্তে আস্তে কমে আসবে দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব।

স্পেনে তখন গরমের শেষ। সূর্যের তাপও কিছুটা হালকা আর আন্দালুসিয়ার কমলালেবুরা মিষ্টি হচ্ছে একটু একটু করে। পেকে উঠছে। ওলিভ গাছে মোড়া মালাগার পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখানে, ২৫ অক্টোবর জন্মালো এক শিশু, বাবা নাম রাখলেন, পাবলো।

ছোটবেলা থেকেই পাবলো ছবি আঁকে। তাক লাগানোর মত সেই আঁকা। তার বাবা নিজেই একজন শিল্পী এবং স্কুলে ফাইন আর্টসের শিক্ষক। বাবা ছবি আঁকতে সাহায্য করেন তাকে। বাবা বলেন, যাকে আঁকছ ছবি যেন তার মতই হয়; লাল কাপড় যেন দেখতে লাল কাপড়ের মতই, দুঃখ দেখে যেন মনে হয় দুঃখই।

পাবলো রুইজ পিকাসো তার গভীর কালো চোখ দিয়ে গ্রাস করে চলে তার চারপাশ,  আর মনের আনন্দে সেসব এঁকে চলে তার স্কেচবুকে, তার বাচ্চা বেলার ছবিতে। বাবা শেখান কিভাবে খুঁটিয়ে দেখতে হয় চেহারা, পাখি, আলো আর পাবলো হুবহু ফুটিয়ে তোলে সবকিছু। ছেলের প্রতিভায় এতটাই ভরসা হয় যে, পাবলোর বয়স যখন মাত্র ১৩, তখনই ছবি আঁকা ছেড়ে দেন তার বাবা। তাঁর বার্সেলোনার স্টুডিওতে ছেলের হাতে তুলে দেন তাঁর তুলি, রং আর শেষবার ব্যবহার করা প্যালেট।

কিশোর পাবলোর মন ছুঁয়ে যায় বাবার দেওয়া উপহার, আর সেসব দিয়ে আঁকা শুরু হয় নিজের মনের মত ছবি, হুবহু যা চাই।

তবে কয়েক বছরের মধ্যেই এরকম প্রাণহীন ছবি আঁকার বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে পাবলো। এবার তার তুলি উড়বে ডানা মেলে। এবার থেকে, সাদা কাপড় হয়ে যেতে পারে বরফের ওপর পালকের মেঘ। আকাশ হয়ে যেতে পারে শিল্পীর ক্যানভাস।

১৯০০, নতুন শতাব্দীর শুরু। মাটির তলা দিয়ে সাপের মত চলে যাচ্ছে ট্রেন - প্রথম পাতাল রেল, প্যারিসের বুকে।

সুইজারল্যান্ডে কনস্টান্স লেকের ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ ওড়ালেন ফার্দিনান্দ ভন জেপেলিন। আর মালাগার এই প্রতিভাবান ছেলেটি পা দিল উনিশে। সিদ্ধান্ত নিল সে হবে এক চিত্রশিল্পী,  যার নাম পাবলো পিকাসো।

পাবলো পিকাসো বাসস্থান হিসাবে বেছে নেন প্যারিসকে। প্যারিসের  রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। নিত্য নতুন সাজে প্যারিসের রমণীদের  দেখেন, আফ্রিকান আর্টের মিউজিয়ামে যান বা কখনো চলে যান মেড্রানো সার্কাসে। কিন্তু এ সব কিছুর থেকেও

তার কাছে সব চেয়ে প্রিয় জিনিস হল ছবি আঁকা।

ভালবাসেন ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলের ছবি আঁকতে। যে পায়ের নীচে পৃথিবীর লাট্টু ঘুরিয়ে খেলা দেখায় বা তারাদের হাতে নিয়ে জাগলিং করে, তাদের ছবি। যারা এই ভাবে শহরের মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, তাদের ছবি। ছবি আঁকেন এক পায়ে, মাধ্যাকর্ষণের নিয়মকে বোকা বানিয়ে, নাচ দেখানো সাটিন কাপড়ে মোড়া বহুরূপীর। এরা সবাই আসলে একই পরিবারের সদস্য। শিল্পীর পরিবারের। শিল্পীদের দুনিয়ায় সবই সম্ভব।

সবই সম্ভব। গরিব থাকা সম্ভব। গুমরে থাকা সম্ভব। পাশাপাশি থাকা সম্ভব। একই সাথে সবদিকে দেখা সম্ভব। এমনকি একই ছবিতে চেহারার ডান দিক আর বাঁদিক একসাথে দেখানো সম্ভব।  কিন্তু কি হবে যদি কেউ আবেগের দাবানলে দগ্ধ হয়ে দুনিয়াকে এমনভাবে দেখতে থাকেন যা তার কাছে বাইরের বাস্তবতার থেকেও বেশি বাস্তব। পিকাসো এরকমই এক দেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন যা আগে কেউ করেনি। তাঁর চোখ যেন ম্যাজিকের মত সব কিছু দেখতে শুরু করল "কিউবিস্ট" কাঁচের মধ্যে দিয়ে।

প্যারিসের বাতাসে উড়ে বেড়ায় ব্যতিক্রমী ভাবনার বুদ বুদ। ফ্রেঞ্চ আকাদেমির প্রস্তাবিত সরকারি ভাষাকে চ্যালেঞ্জ জানান লেখকরা। শিল্পীরা ভাঙেন শিল্পের নিয়ম। দাদায়িস্টরা পুরোপুরি দাদা, আর পরাবাস্তববাদীরা বাস্তববাদের থেকে বহু দূরে থাকেন। সবাই চায় চূড়ান্ত স্বাধীনতা।  সেই স্বাধীনতা  যা  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারানো ৮০ লক্ষ মানুষের জন্য বদলে দিতে পারে  দুনিয়ার সমস্ত কুৎসিত জিনিসকে ।

বদলে দেওয়ার আগুনে যেন ঘি ঢালছেন পিকাসো। কোলাজ বানাচ্ছেন। যে কোলাজে ছবির মধ্যে পুরে দিচ্ছেন খবরের কাগজের আর্টিকেল। এমনকি কখনও উস্কে দিচ্ছেন তাঁর  বাবার ন্যাচারালিস্টিক ছবি আঁকার ঘরানায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেকে……

সুইজারল্যান্ড,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেনে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর ছবি। গোটা দুনিয়ার উঠতি শিল্পীরা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন তাঁর ছবি দেখে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুবছর পরে, ১৯২১ সালে, জন্মালো তার প্রথম পুত্রসন্তান,  পল। পিকাসো পরে আঁকবেন,  স্নিগ্ধ পল-এর ছবি আঁকার ছবিও।

পিকাসো সারাক্ষণ ছবি আঁকেন। যা খুশি আঁকেন। সব কিছু আঁকেন। স্পেন, প্রেম, নারীর কমনীয়তা, লোকের বই পড়া, ছবি আঁকা। তাঁর ছেলের ছবি আঁকেন। তাঁর মেয়ে মায়া, যখন তার বয়স মাত্র ৯ মাস, ১৯৩৬ এর গ্রীষ্মে হঠাৎ তাঁর দেশ স্পেনে শুরু হল এক যুদ্ধ।

স্পেনে গত পাঁচ বছর ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। বামপন্থীরা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে পুরনো রাজতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেছে স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তা সকলের মনপসন্দ ছিল না। ১৯৩৬ সালে যখন প্রজাতন্ত্রীরা আবার জিতল, তখনই জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর নেতৃত্বে  সেনাবাহিনীর একাংশ এই প্রজাতন্ত্রের বিরূদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিল। ১৯৩৬ এর ১৮ জুলাই, তারা এক সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত করল যার পরিণতি হল আগামী তিন বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।

১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল, সোমবার,  স্পেনের উত্তর প্রান্তের বাস্ক অঞ্চলের ছোট্ট শহর গোয়ের্নিকার আকাশ কালো হয়ে উঠল। শহরের ঘন্টাধ্বনিতে যেন অশুভ সংকেত। পনেরো মিনিট পর শহরের বিভিন্ন চত্বরে, রাস্তায়,  বাড়িতে প্রথম বোমা নিক্ষেপ করল যুদ্ধ বিমান। কন্ডোর লেজিওনের জার্মান বোমারু বিমান। ঠিক তার পেছনেই ইতালির যুদ্ধ বিমানও।

গোয়ের্নিকায় সেদিন বাজারবার। হাঁস, মুরগি, গরু, সবজি কেনাবেচার জন্য চারপাশের গ্রাম থেকে সেদিন মানুষ এসছিলেন। প্রথম বোমার শব্দেই একটি ষাঁঢ় উন্মাদের মত দৌড়ে চারিদিক তছনছ করতে লাগল। ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য দৌড়তে লাগলেন। চলল বোমা বৃষ্টি। ভেঙে পড়ল ছাদের পর ছাদ। আগুন ছড়িয়ে পড়ল এ ঘর থেকে ও ঘর।

প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর শহরের মাটি ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে বোমারু বিমান। দলে দলে সপরিবারে জঙ্গলের দিকে পালানো মানুষের ওপর ওই বিমান থেকেই হচ্ছে গুলিবর্ষণ। ভয়াবহ ৩ ঘন্টা ১৫ মিনিটঃ ৫০ টন বোমা,  ৩০০০ ফায়ারবোম।

কাসা ডি জুন্তাস, ছোট্ট শহর গোয়ের্নিকার এক গুরুত্বপূর্ণ বাড়ি, যা বাস্ক জনগণের ইতিহাস ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যের স্তম্ভ। তাঁদের স্মৃতির সংরক্ষণশালা। এই প্রতীকী বাড়ির দালানে ছিল এক ওক গাছ। কয়েক শতক ধরে এই গাছ বাস্কের ঐক্যের স্তম্ভ- গোয়ের্নিকা বৃক্ষ, গোয়ের্নিকাকো আরবোলা

শেষ প্লেন উড়ে গেল সন্ধ্যে ৭:৪৫ মিনিটে। তখন জ্বলছে আগুন; গোটা শহর ছাই হয়ে মিশে গেছে মাটিতে। চার্চ তখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাস্কের সেই ঐতিহ্যশালী বাড়ি আর তার ওক গাছও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মানুষ কই? পুরুষ, মহিলা এবং শিশুরা কই?

গোয়ের্নিকা ও তার চারপাশের শ'য়ে শ'য়ে মানুষ নিহত এবং আহত৷ শহরের চারভাগের তিনভাগ হয়েছে ধ্বংস;  গোটা দুনিয়া আতঙ্কিত। গোয়ের্নিকার ওপর এই বিমান হানা মানুষের ইতিহাসে প্রথম এমন পরিকল্পিত আক্রমণ যা নামিয়ে আনা হয়েছিল সামরিক ঘাঁটির ওপর নয়, বরং নিরস্ত্র অসহায় মানুষের ওপর।

১লা মে, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের খবর কাগজের পাতায় দেখলেন পিকাসো। এই বিরামহীন বোমারু আক্রমণের মতই বিরামহীন দৃষ্টিতে দেখলেন সেই ছবি। রাগ হল। আর সেই রাগের বশেই রুই-ডি-গ্র্যান্ডস-অগাস্টিনে তাঁর স্টুডিওতে কাগজের ওপর আঁকিবুকি করতে লাগলেন। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা সব চিন্তাকে দ্রুত কাগজে নামিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর রাগের মতই তীব্র শক্তিশালী এক ছবির শুরুয়াৎ করলেন পিকাসো।

স্প্যানিশ রিপাবলিক ইতিমধ্যেই এক ছবির ফরমায়েস দিয়ে রেখেছিল তার কাছে। মিরো ও ক্যাল্ডারের পাশাপাশি সেই ছবি আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রদর্শিত হবে প্যারিসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে।

তিনি তার স্টুডিও জুড়ে এক ছবি আঁকার কথা আগেই ভাবছিলেন। কিন্তু আজকে রাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে এক স্প্যানিশ চিত্রকর হিসেবেই তিনি আঁকবেন তার এই যন্ত্রণা – সেই ছবি, যার নাম গোয়ের্নিকা

ওই বছরের শুরুতেই তার ফ্রাঙ্কো বিরোধী এচিং, গোয়া ও রুশোর সাবলীল কাজ, স্পেনের ষাঁড় ও ঘোড়ার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি এবং তার সাথে পুরনো কিংবদন্তী – এসবই পিকাসোর অনুপ্রেরণা।

কী করে একজন শিল্পী তার শরীর ও মনের যন্ত্রণাকে সাদা-কালোয় প্রকাশ করতে পারে? বাচ্চাদের আঁকা ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে এমন এক হত্যাকাণ্ডকে ফুটিয়ে তোলার ইচ্ছা কি গ্রাহ্য হবে?

একটা ছবিকে কী করে ৫০ টন বোমের থেকেও শক্তিশালী করা যায়? ধুলো ও ধ্বংসস্তুপের পরেও কী করে বেঁচে থাকা যায়? মানুষ চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরেও, হৃদয়ের দৃষ্টি কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে?

৯মে, ডজন ডজন রাফ আঁকার পর, এই বিশাল মুরালের ধারনা আকৃতি পেতে শুরু করল কাগজের পাতায়। কিন্তু পিকাসো ভাবলেন আরো আঁকতে হবে, আরো পরীক্ষানিরীক্ষা চাই, আরো সূক্ষ হওয়া চাই। তারো  শক্তিশালী হতে হবে, যেতে হবে সত্যের আরো কাছাকাছি। দ্বিধা আছে। তাই আগের ভাবনা বাতিল করে নতুন করে শুরু করাও আছে।

১১মে, সাত মিটারের থেকেও লম্বা ক্যানভাস এসে পৌঁছলো তাঁর কাছে। যে মুহূর্তে তা দেওয়ালে সাঁটানো গেল, এক টুকরো চারকোল নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন পিকাসো আর আঁকতে শুরু করে দিলেন তার মাথায় থাকা চরিত্রদের।

দুদিন দুরাত প্রায় ঘুম নেই। সাদা, কালো এবং ধূসর রঙে আঁকছেন, জীবনের রঙের ছোঁয়া নেই বললেই চলে। দ্রুত এগোচ্ছে গোয়ের্নিকা ।  কিন্তু আঁকতে আঁকতে ভাবছেন পিকাসো, বার বার কল্পনা করছেন তার ছবিকে,  যেন আঁকা নামক কাজটাই তাকে আরেকবার ভাবিয়ে তুলবে।

তিনি স্থির করেছেন যে কিছুই লুকানোর নেই। শুরু থেকেই ছবিতে একজনের হাত দেখা যায়। একটা ভাঙা অস্ত্রওয়ালা হাত আর সেই হাতের মুঠো থেকে ফুটে উঠছে ফুল। এ হাত কি এক বিদীর্ণ স্বাধীনতা সংগ্রামীর? যা বোমার সামনে অসহায়?

একটা স্ট্রোকে ছবির মাঝ বরাবর পিকাসোর আঁকা সরলরেখা; যা আছে ছবির শেষ অব্দি। এ যেন এক স্তম্ভ যা ধারণ করে রেখেছে একটা গোটা বাড়িকে বা আকাশকে। একদম ওপরের দিকে তিনি আঁকলেন একটা প্রদীপ। এক রমণীর হাতে ধরা সেই প্রদীপ, যে হাত জানলা দিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এই অন্ধকারের সময়ে গোটা শহরকে বাঁচাতে।

এক ট্র‍্যাজিক ত্রিকোণের মাথায় এই প্রদীপ। লাশের ভয়াবহ পিরামিডের ওপরে ক্ষুদ্র আশার আলো।

মাথা এলিয়ে মা ও তার সন্তান। ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড -এর পরিচিত চিত্রকল্পকে ভাঙছেন পিকাসো। সব ওলটপালট করে দেখাচ্ছেন দুনিয়াকে, যেভাবে ওলটপালট হয়ে গেছে সেই শিশু যার এখনও বেঁচে থাকার কথা, যেভাবে সব ওলটপালট করে দিয়েছে সেই ভয়ঙ্কর দিনের ইস্পাত বৃষ্টি ।  সব উল্টেপাল্টে গেছে – কান্নাভেজা চোখ, নাসিকারন্ধ্র। যেমন দুমড়ে মুচড়ে গেছে সেই শিশুর মুখ যে কোনো শব্দ করছে না এবং সেই মায়ের মুখও যে কাঁদছে, চিৎকার করে। এই সমস্ত উন্মাদনার মধ্যে কে আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে যে ওই শিশুটি শুধু আহত?

৩৫ দিন ও অনেক রাত জুড়ে একনিষ্ঠভাবে গোয়ের্নিকা  তৈরি করার পর পিকাসো তাঁর কালো,  সাদা ও ধূসর রঙের পাত্র তুলে রাখলেন। তার ছবিতে রঙ ফিরে এলো। ভাসিয়ে নিয়ে গেল জীবন। গোয়ের্নিকায়  ব্যবহার করার কথা ভেবে তিনি যে ওয়ালপেপারের টুকরোগুলো রেখেছিলেন সেগুলো ব্যবহার করলেন উইম্যান ওয়াশিং   নামক বিশাল কোলাজে। মৃত্যু, সর্বদাই জীবনের রূপান্তর ঘটায়।

জীবন তার রঙিন স্বরলিপি গেয়ে উঠুক, এটাই বোধ হয় বর্বরতাকে জয় করার সর্বোত্তম রাস্তা।

যাই হোক, ১৯৩৯ ছিল হতাশার। পিকাসোর মায়ের মৃত্যুর পরেই,  বসন্তকালে,  স্প্যানিশ রিপাবলিকেরও মৃত্যু ঘটল।

আরো একবার যুদ্ধ শেষ কথা বলবেঃ গ্রীষ্মের শেষে সংঘাত শুরু হবে এবং দ্বিতীয়বারের জন্য শুরু হবে বিশ্বযুদ্ধ।

দীর্ঘ পাঁচ বছর, অন্ধকারের রাজত্ব। নাজি জার্মানি দখল করছে প্রতিবেশী দেশ, এবং ষাট লক্ষ ইহুদি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়ে সংঘটিত করছে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা।

দীর্ঘ পাচঁ বছর প্রদর্শনী করতে দেওয়া হবে না পিকাসোকে।  জার্মানীর দখল করা ফ্রান্সে তাঁর সেই ছবি বিবেচিত হবে 'অধঃপতিত ' ছবি হিসেবে।

কিন্তু ওই পাঁচ বছর, পিকাসো জ্বালিয়ে রাখবেন তাঁর সেই প্রদীপ। তিনি আঁকবেন, আরো আঁকবেন, এঁকেই যাবেন।

১৯৪৫। যখন যুদ্ধ শেষ হল এবং মুক্ত হল ফ্রান্স, বেঁচে থাকার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল আবার।  আরো একবার মনে হল সবই সম্ভব। যেন এক আলোর দ্বীপপুঞ্জে নেচে ওঠা যাবে উলঙ্গ হয়ে।

গানওয়ালার মত সংবেদনশীল হবে সব, হবে ঘোড়ার মত সাবলীল। হবে দুঃখও। সন্তান হবে, আরেকটি, দ্য জয় অফ লিভিং  ছবি আঁকার একবছর পর। পিকাসোর ছেলের নাম রাখবেন- ক্লদ।

যুদ্ধে ভরা এই শতাব্দী এক দুঃস্বপ্ন। পিকাসোর বন্ধুরা তাকে বলতে লাগলেন গোয়ের্নিকায়  ব্যবহার হয়নি এরকম এক শান্তির প্রতীক তৈরি করতে। তাদের আশা ছিল, মানুষ যত শান্তির মোলায়েম ডানা দেখতে পাবেন, ততই তাকে উড়তে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবেন তাঁরা।

১৯৪৯, প্যারিসে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের জন্য পায়রা আঁকলেন পিকাসো। ওই সময়ই তার চতুর্থ সন্তান জন্মালো। কন্যা সন্তান। নাম রাখলেন – পালোমা। পায়রার স্প্যানিশ – পালোমা। ঠিক যে ভাবে এক সময় তাঁর বাবার সাথে আঁকতেন, সেরকমই শত শত পায়রা আঁকতে থাকলেন পিকাসো।

এমন এক পৃথিবীর স্বপ্নে যা বাতাসের ছায়ার থেকেও হাল্কা। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্নে

যেখানে শুধুমাত্র সেই হিংসাই গ্রাহ্য যে হিংসা সৃষ্টির সংগ্রামে প্রয়োজন, এবং সৃষ্টি অব্যাহত রাখার সংগ্রামেও।

শিশুসুলভ  সৃষ্টি, যেখানে থাকবে বড় এক ঘর ভর্তি সুন্দর ঘোড়া, শান্তশিষ্ট ষাঁড় এবং প্রদীপ, যা কেউ নেভাতে পারে না।

যা শুধুমাত্র একটা পেন্সিল দিয়ে এক টুকরো কাগজে আঁকা।

মাঝে মধ্যে এর থেকেই তৈরি হয় এক মহান শিল্পীর যার  রেখাচিত্র কথা বলে পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের সাথে।

জীবনের শেষ অবদি পিকাসো  ৩০,০০০ এর বেশি কাজ করেছেন। এঁকেছেন, মূর্তি বানিয়েছেন, কাট আউট বানিয়েছেন, করেছেন খোদাই এর কাজ, বানিয়েছেন মডেল- বৃদ্ধ ছাগলের,খুশিতে ডুবে যাওয়া   পাগল প্রেমিক প্রেমিকার, নিজেকে না জানা ষাঁড়ের, শিশুদের নরম গালের মতো বাস্তবকে খুঁজতে চাওয়া রমণীদের, বাজারের, মাছের, গোলাকার নিতম্বের, সূর্য মুখোশের, শিশুদের, যারা মনে করে কিছুই করেনি সেই সব পাখিদের, গীটার হয়ে যাওয়া গাছের, পাখীর বাসায়  পরিণত হওয়া গীটারের, দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্যের এবং তার কুৎসিত  চেহারারও,সূক্ষ্ম  বাজিকরের নীল রঙ করা নৌকোর.......

জানি, আজও গোয়ের্নিকার আহত পাখিটা আমাদের মুখের ওপর বলছেঃ “আমার এখনও অনেক কালো মেঘলা আকাশকে নীল রঙে রাঙানো বাকি রয়ে গেছে”।

শুনুন – আপনি কী করবেন যখন দেখতে পাবেন যে সেই পাখিটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আপনার জানালার সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ?

ভাষান্তর: ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী


প্রকাশের তারিখ: ২৫-অক্টোবর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Aro erokom lekha aste thakuk. Amra porbo janbo sikhbo r somridhyo hobo.
- Sourav Ganguly, ২৫-অক্টোবর-২০২২


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫