Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ছবির সংকট

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য
সামন্তযুগের শুরুতেই যেমন শ্রেণীবিভাগ কায়েম হল সমাজে, তেমনি ছবির আদর্শও বিভক্ত হয়ে গেল এক-এক শ্রেণীর এক-এক আদর্শের তাগিদে। সেই আদর্শভেদটা পরিণত ও স্পষ্ট দেখা গেল মুসলমান আমলে। একদিকে প্রভুত্বের এবং দাসত্বের জয়গান চলতে লাগল রাজা-বাদশাদের দরবারে ও অন্দরে, অন্যদিকে শাসিত সমাজে প্রেম-মৈত্রী-সাম্যের আদর্শ— রাজশক্তিকে উপেক্ষা না করেও মনুষ্যত্বের জোরেই টলিয়ে দেবার ভরসা নিয়ে- মাথা তুলে দাঁড়াল; জনতার এই ‘বিদ্রোহী' আদর্শের ছবি হল রাধাকৃষ্ণের ছবি—
chobir sonkot

আমাদের জীবনের আর সকল দিকের মতো ছবির দিকটাও আজ সংকটাপন্ন। কিন্তু সেটা এমনকী বেশিরভাগ চিত্রকরেরও চোখে পড়েনি। আমাদের দেশের দু-চারজন সমঝদার ভিন্ন, সাধারণ সকলেই বলবেন— 'হাটে-বাজারে, ঘরে-বাইরে ছবির তো ছড়াছড়ি, আর সেসব ছবিতে রং-চঙেরও ঘাটতি দেখিনে, কোথায় বাপু ছবির সংকট?' শিক্ষিত সম্প্রদায়ের তো প্রায় সকলেই বলেন— 'ছবি দেখাটাই তো একটা সংকট বিশেষ বলে জানি, ছবির আবার সংকট কীসের?' এক কথায়, ছবি আজ মানুষের কৃপাদৃষ্টির কাঙাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, ছবির মধ্যে যে সম্পদ থাকলে ছবি মানুষের জীবনে অপরিহার্য হতে পারে সে সম্পদ তার মধ্যে খুঁজে মিলছে না, ছবিকে মানুষ আজ দূর থেকে চলতে চলতে দেখে, পেছনে ফেলে চলে যায়; ছবির জন্যে শিল্পীর কাছে ভিড় জমে না, ছবি দেখবার জন্যে মানুষ সময় করে নেয় না— এই হল ছবির সংকট। আর এই সংকটের মূল আছে সামাজিক সংকটের মধ্যে নিহিত— কীভাবে, তারই আলোচনা করলে আমরা এই সংকট থেকে উদ্ধারের পথও দেখতে পাব।

এখন, ছবির মধ্যে সম্পদ হল শিল্পীর মনের কথা। শিল্পীর মনের কথাটা সম্পদ কেন? কারণ, শিল্পীর মন যেটা বলে সেটা সমাজের প্রাণের কথা; সমাজ যেটা গুছিয়ে বুঝতে এবং বলতে পারে না শিল্পী সেটা পারেন; আর সেই গুছিয়ে বলা আর শোনার মধ্যে দিয়ে সমাজ এগুবার বা পেছুবার একটা শক্তি পায় ভালো বা মন্দের দিকে। সেই শক্তিটাই ছবির সম্পদ এবং এই হল ছবি বুঝবার মূলসূত্রের সংক্ষিপ্তসার।

ছবি জিনিসটির মধ্যে মানুষের মন বা চিত্ত থাকে তাই তার নাম চিত্র দেওয়া হয়েছে, আর সেই চিত্তকে গুছিয়ে দশজনের কাছে সহজবোধ্য করে প্রকাশ করবার উপায় শিল্পীরা গড়ে তুলতে পারেন, তাই ছবি আঁকার আর এক নাম সৃষ্টি করা। সৃষ্টি করার মূল তাগিদটা আসে চিত্তকে প্রকাশ করার ইচ্ছার মধ্যে। চিত্তই চিত্রের আসল কথা। রেখারঙের যে কারিগরি এই চিত্তকে যত বেশি প্রবলভাবে প্রকাশ করতে পারে সে কারিগরি ততই সার্থক অর্থাৎ সেখানে ততই শিল্পীর কল্পনা শক্তির বাহাদুরি।

ছবির মধ্যে চিত্রকরের মারফতে মনগুলি প্রকাশ পায়। সমাজের মন এক-এক যুগে এক-এক রকমের হয়ে থাকে, আর সমাজ নানান শ্রেণীতে বিভক্ত হওয়ায় সমাজের মনও নানান রকমের হয়ে থাকে। তাই এক-এক যুগের চিত্রকর এক-এক রকমের মন ছবির মধ্যে এঁকেছেন এবং যে শ্রেণীর প্রভাব চিত্রকরের মনের ওপর প্রবলতম হয়েছে সেই শ্রেণীর মনকেই এঁকেছেন।

সমাজ যে কথাটা গুছিয়ে বলতে পারে না, সেটা হল তার এগিয়ে যাবার বা পেছিয়ে পড়বার ইচ্ছার বা শক্তির কথা— অর্থাৎ তার আদর্শের কথা। প্রত্যেক যুগের চিত্রের মধ্যে সে-যুগের সমাজের আদর্শের কথাটাই আঁকা হয়েছে; চিত্রকরের মনের উপর যে শ্রেণীর আদর্শের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সেই শ্রেণীর আদর্শকেই ছবিতে আঁকা হয়েছে, আদর্শকে সামাজিক জীবনে সক্রিয় করে তুলবার জন্যে।

প্রাগৈতিহাসিক যুগে শিকারি-জীবনই ছিল আদিম সমাজের আদর্শ, তাই ছোটনাগপুরের প্রাগৈতিহাসিক গুহার মধ্যে দেখি আদি চিত্রকর এঁকেছে শিকারের ছবি। শুধু সময় কাটাবার জন্যে সেসব ছবি আঁকা হত না, পণ্ডিতেরা সবাই একমত, জাদুবিদ্যার দ্বারা শিকারের পশুসংগ্রহের জন্যে, তখন সামাজিক খাদ্য ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক উপায় হিসাবে, এক কথায়, সমাজের ভালোর জন্যে সমাজের হাতের হাতিয়ার হিসেবে আদি চিত্রকর পশু চিত্র, শিকারচিত্র এঁকেছেন, তাই আদি চিত্রে ফুল পাখি নদী প্রভৃতি সৌন্দর্যসর্বস্ব ছবি আঁকেননি।

ছবি যেমন একদিকে সমাজের ভালো হবার ইচ্ছাকে প্রকাশ করেছে, তেমনি আদর্শের আর এক অঙ্গ হিসাবে ভালো হবার পথে এগিয়ে যাবার শক্তিও জুগিয়েছে, সামাজিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে— এজিটেটর হিসেবেও দেখা দিয়েছে, অর্গানাইজার হিসেবেও। আরও ঠিক করে বলা চলে, সমাজ তার নিজের ভালোর জন্যে বা নিজের ইতিহাসকে গড়বার কাজে ছবিকে হাতিয়ার রূপে প্রয়োগ করেছে। অর্থাৎ, সমাজের কাজের পথ ছেড়ে চিত্রকর আপন খেয়ালে বেপরোয়া ভাবে সমাজের যে-কোনো মনকে প্রকাশ করে যাননি। বৌদ্ধযুগের ছবিগুলি সমাজের মনকে নিয়ন্ত্রিত করবার জন্য আঁকা হয়েছিল। (সে যুগে ছবি ধর্মের অঙ্গ ছিল, অর্থাৎ পুরোহিত বা আচার্যদের অনুগত থাকতে বাধ্য ছিলেন সে যুগের চিত্রকর, ইচ্ছা করে তাঁরা সমাজের হাতিয়ার জোগানদার হননি— এই কথা বলে যাঁরা ছবির তথা শিল্পীর সামাজিক মূল্যকে সৌন্দর্যগত মূল্যের তথা শিল্পীর খেয়ালের মূল্যের তুলনায় উপেক্ষণীয় বলতে গৌরব বোধ করেন— তাঁদের কাছে সকল মানুষের, এমনকী, শিল্পীরও স্বাধীনতার অর্থ মানুষের আপন হাতে আপন উন্নতির পথ গড়ে চলা নয়— হয় অদৃষ্টের হাতে আত্মসমর্পণ করা, নয়তো এনার্কি। এই শ্রেণীর ‘খেয়ালসর্বস্ব' শিল্পীদের হাতে পড়েই আজ ছবির রাজ্যে মারাত্মক সংকট ঘটেছে। অন্যদিকে বৌদ্ধ চিত্রকরদের ছবিতে যে সৌন্দর্য ফুটেছে তা চিরকালই অম্লান থাকবে, আর সে-সব চিত্রকরদের কল্পনাশক্তি যে অসীম ছিল তা নিয়েও জগতে কোথাও কারও দ্বিমত মেলেনি।)

এখন সমাজের সবারকার ভালো হবার ইচ্ছাতেই, সুখে-শান্তিতে বাঁচবার ইচ্ছাতেই নেতা আর নিয়ন্ত্রিত হিসেবে শ্রেণীভেদ সৃষ্টি সমাজই করে নিয়েছিল। আদিকালে ‘যাদু-বৈজ্ঞানিক’ বা পুরোহিতরাই হয়েছিলেন নেতাশ্রেণী। আদিকাল থেকেই ছবি ‘যাদু-বিজ্ঞানের' বা ধর্মের অঙ্গ ছিল, অর্থাৎ নেতাশ্রেণীর অধিকারে ছিল— নিয়ন্ত্রিত শ্রেণীর কাজে লাগানো হত, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত শ্রেণী নিজের শ্রেণীর ইচ্ছামতো বা দরকারমতো ছবিকে ব্যবহার করতে পারত না। পরবর্তিকালে দেবদেবীর মূর্তি বা ছবি সমাজের সর্বশ্রেণীর হিতের জন্যই গড়া হত, কিন্তু শিল্পশাস্ত্রের আইনকানুন বেঁধে দিতেন পুরোহিতশ্রেণী। আবার অন্য যুগে যখন রাজা-বাদশারা সমাজের নেতা হলেন তখন তাঁদের তৈরি শাস্ত্রেই ছবি আঁকা হতে লাগল। মুসলমান শক্তির অভ্যুদয়ে ভারতে সামন্ততন্ত্র যখন কায়েম হল, ধর্মের হাত থেকে ছবির আদর্শ রাজশক্তির হাতে পাকাপাকি চলে এল; রাজা-বাদশাদের মূর্তি, শাহজাদা, শাহজাদী, সেনাপতি, রাজকুমারীদের মূর্তি, ভারী ভারী যোদ্ধাদের ছবি, ঢাল-তলোয়ার, কামান বন্দুক ছোরা, রাজপ্রাসাদ প্রমোদ-উদ্যান, যুদ্ধক্ষেত্রে হাতির লড়াই, শোভাযাত্রা প্রভৃতির ছবি— এক কথায় রাজমহিমায় মহিমান্বিত যা-কিছু অর্থাৎ রাজতন্ত্রই ছবির আদর্শ হিসাবে দেখা দিল।

সামন্তযুগের শুরুতেই যেমন শ্রেণীবিভাগ কায়েম হল সমাজে, তেমনি ছবির আদর্শও বিভক্ত হয়ে গেল এক-এক শ্রেণীর এক-এক আদর্শের তাগিদে। সেই আদর্শভেদটা পরিণত ও স্পষ্ট দেখা গেল মুসলমান আমলে। একদিকে প্রভুত্বের এবং দাসত্বের জয়গান চলতে লাগল রাজা-বাদশাদের দরবারে ও অন্দরে, অন্যদিকে শাসিত সমাজে প্রেম-মৈত্রী-সাম্যের আদর্শ— রাজশক্তিকে উপেক্ষা না করেও মনুষ্যত্বের জোরেই টলিয়ে দেবার ভরসা নিয়ে- মাথা তুলে দাঁড়াল; জনতার এই ‘বিদ্রোহী' আদর্শের ছবি হল রাধাকৃষ্ণের ছবি—। সে ছবির মধ্যে হিঁদুয়ানিটা আসল কথা ছিল না, বরং ইসলামের মনুষ্যত্বের কাছে আপিল ছিল, অহিংসার পথে তখনকার যুদ্ধ সমস্যার সমাধানের জন্যে ব্যাকুল চেষ্টা ছিল, নূতন দলের সঙ্গে পুরানো অধিবাসীদের মিলে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। (অহিংসার জন্য আরেকটা কিছু না হয়ে— এমনকী সুফীবাদ না হয়ে— রাধাকৃষ্ণ কেন? কারণ, মুসলিম জনসাধারণ সামন্তবাদেই সেদিন মশগুল— বিজয়ীপক্ষ কী না, তাই। ওদিকে পরাজিত এবং রণক্লান্ত কিন্তু হিন্দু সমাজের ‘নেতা' রাজপুতেরা রাধাকৃষ্ণভক্ত দ্বৈতবাদী ছিলেন। তারাই তখনকার ভারতের প্রজাকূলের মুখপাত্র। কাজেই রাধাকৃষ্ণ।)

মুসলিম যুগের বহুপূর্বেই ধনীদের আদর্শ ও বিলাসের ক্ষেত্রে ছবি সীমাবদ্ধ হতে শুরু করেছিল, যদিও অন্যান্য শ্রেণী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি ইংরেজ রাজত্ব কায়েম হবার পূর্বে। ইংরেজ রাজত্বে শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, শ্রেণীতে শ্রেণীতে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে গেল। বুর্জোয়া বলতে যা বুঝায় তা সাম্রাজ্যবাদেরই সৃষ্টি। আর এদেশে সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণিও দুভাগে বিভক্ত হয়ে দেখা দিল। একভাগ সরাসরি সাম্রাজ্যবাদের সুযোগ নিল — ব্যাবসাতে বিদেশির শরিক হবার জন্যে চেষ্টা করতে লাগল। তাদের মারফতে এদেশে ইউরোপীয় চিত্রের কারিগরির আমদানি হল; সেই কারিগরি দিয়ে ছবিকে বাজারের পণ্য হিসাবে চালু করবার চেষ্টা শুরু হল। এইভাবে এদেশে কমার্শিয়াল আর্টের গোড়াপত্তন হল। যদিও খোলাখুলিভাবে কমার্শিয়াল আর্টের চর্চা শুরু হতে আরো কিছুদিন সময় লাগল, তবু ব্যাবসাদারের প্রভাব ও পরামর্শকে সামাজিক আদর্শগত ছবির চেয়ে বড়ো করে দেখা এবং টাকার মূল্যে ছবির দাম ঠিক করা আরম্ভ হল, এবং যাঁরা এইভাবে ছবি আঁকলেন প্রথমে তাঁদের মধ্যে রবি বর্মা, ধুরন্ধর প্রভৃতির নাম অনেকের আজও মনে আছে।

বুর্জোয়ার আর এক ভাগ হল জাতীয়তাবাদীদের নিয়ে গঠিত। রামমোহনের কিছুদিন পরে ওদিকে জাতীয় কংগ্রেস, এদিকে হিন্দুমেলা প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে যে-দেশপ্রেম দুরন্ত আবেগে আত্মপ্রকাশ করল, সেই দেশপ্রেমের উদ্দীপনা নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী ছবি আঁকতে আরম্ভ করলেন। কী রাজনীতি, কী সমাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, পুরাণ— কোনোকিছুই বাদ পড়ল না তখনকার ছবির মধ্যে। জাতীয় জীবনের আদর্শ মুখর হয়ে উঠল ছবির মধ্যে। ছবির মধ্যে কোনো আদর্শ, কোনো নীতি না থাকাটাই তখন ছিল ছবির চরম ত্রুটি, আদর্শকে রূপ দেবার চেষ্টাতেই কল্পবৃক্ষ হয়ে উঠল ছবি। কত রকমারি কারিগরি-কল্পনাশক্তির কত অজস্র প্রকাশ। ভারতীয় ছবি বলতে যে একঘেয়ে কারিগরিকে আজকের বাজারে বেরোতে দেখি, তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে তার চিহ্নমাত্র ছিল না নবজাত ভারতীয় চিত্রে। স্বদেশকে ভালোবাসার এত জীবন্ত, এত রকমের, এত বেশি ছবি এদেশে তার আগে বা পরে আর দেখা যায়নি। তবু, সেসব ছবি তখনকার এদেশের সমাজের বিশেষ এক শ্রেণীর দেশপ্রেমের ছবি, সমগ্র সমাজের নয়। শুধু দেশপ্রেম বললে বোঝানো যাবে না, সাম্রাজ্যবাদী ধনিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বললে ঠিক বলা হবে। এদেশের ধনিক ও শিক্ষিতের অর্থাৎ নেতৃশ্রেণীর বিদ্রোহ যে পথে চলেছিল আসল শোষিত শ্রেণীর স্বার্থের পক্ষে সে পথ ঠিক অনুকূল ছিল না, এবং তখনকার দিনে শোষিত শ্রেণীর নিজস্ব কোনও নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি, তার জন্যে যে পথ প্রয়োজন ছিল সে পথ পরিকল্পনা করাও নেতৃশ্রেণীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখনকার ইংরেজ কূটনীতিজ্ঞেরা সে পথকে ‘ভয়ঙ্কর বিপ্লব' বলে ঘোষণা করেছিল; আর এদেশের ইংরেজি সভ্যতার গুণগ্রাহী শিক্ষিত সমাজও সে পথ সম্বন্ধে ওই মতই পোষণ করে এসেছিলেন। এক কথায়, শোষিত শ্রেণীর দেশপ্রেমের তথা বিদেশি-বিদ্বেষের কোনো খবরই, স্বভাবতই, অবনীন্দ্রনাথ ও গগন ঠাকুরের ছবিতে পাই না। তাঁদের ছবিতে যে দেশপ্রেম রূপ নিল, তার আদর্শ গড়ে উঠেছিল জনতার বৈপ্লবিক শক্তিতে অবিশ্বাসের ওপর। জনতার উত্তেজনাকে তাঁরা অন্ধশক্তি বলে বুঝতেন— (তেইশ বছর আগেকার রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘মূল কথাটা এই— রায়তের বুদ্ধি নেই, বিদ্যা নেই, শক্তি নেই আর ধনস্থানে শনি। তারা কোনমতে নিজেকে রক্ষা করতে জানে না। তাদের মধ্যে যারা জানে তাদের মতো ভয়ঙ্কর জীব আর নেই।' কাজেই “আজকের দিনের নীচের থাকটাকে উপরে তুলে দিলে, কালকের দিনের উপরের থাকটা নীচের দিকে পূর্বের মতোই চাপ লাগাবে। রাশিয়ার জারতন্ত্র ও বলশেভিকতন্ত্র একই দানবের পাশ মোড়া দেওয়া।"— প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা'র ভূমিকা ১৩২৭ বঙ্গাব্দ।)

জনতার শক্তির প্রতি এই অবিশ্বাস ও ভয়, আর অন্যদিকে ঔপনিবেশিক হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী যন্ত্রসভ্যতার হাতে এদেশের ধনিকের পরাজয়ের গ্লানি— এই দুটোই এদেশের শিক্ষিত সমাজের দেশপ্রেমের আদর্শকে সমসাময়িক সমাজের বাস্তব সম্পদ ও শক্তির ক্ষেত্রের বাইরে ও মানসিক ও কাল্পনিক সম্পদ ও শক্তির দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের কাজে। সমাজ-নিয়ন্ত্রণের কাজে ক্রমবর্ধমান নাগরিক জীবনের চেয়ে পল্লীজীবনই শিক্ষিত সমাজের কাছে আদর্শ হয়ে উঠল। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাই যন্ত্রসভ্যতার চেয়ে সামন্ততন্ত্রই বড় হয়ে উঠল। প্রবল দেশপ্রেমের তাগিদেই সংস্কৃতিওয়ালারা নানান যুগের দর্শনকে, নানান কালের সামাজিক আদর্শকে পুনরুদ্ধারের সাধনা করলেন; সেসব দর্শন ও আদর্শের বহিরাবয়ব থেকে সমসাময়িক বাস্তব পরিবেশের ইতিহাসকে ধুলোর মতো ঝেড়ে ফেলা হল; এবং (যন্ত্রসভ্যতা তথা সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট ইউরোপকে এবং বাস্তববাদকে তুচ্ছ ও অমানুষিক প্রমাণ করে স্বদেশের গৌরব বৃদ্ধির জন্যে) সকল দর্শন ও আদর্শের মাঝ থেকে মূলসূত্রের এক নির্যাস বানিয়ে তাকে ভারতের চিরন্তনী বাণী বলে জগতে প্রচার করা আর স্বদেশের জনতার ওপর ‘আরোপের' চেষ্টা চলতে লাগল। দেশমাতৃকার যে ছবি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আঁকলেন তা কল্পনা হিসাবে অতুলনীয় সুন্দর, কারিগরিতে নিখুঁত জীবনের প্রতীক; কিন্তু যন্ত্রসভ্যতার ক্ষেত্রে জয়ী হবার জন্যে তখনকার জনতা যে শক্তির প্রেরণা খুঁজছিল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্ন্যাসিনীর ছবি থেকে সে শক্তি মেলে না— শুধু ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে শ্রদ্ধা জাগায়। এর ফলে ভারতীয় ছবি ভারতেই ঠিকভাবে গৃহীত হল না, দেশপ্রেমের নামেও না।

সাধারণ মানুষ, যে মানুষ ছবি, গান, নাটক থেকে জীবনসংগ্রামে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাবার প্রেরণা আহরণ করে, তারা ভারতীয় চিত্রকে গ্রহণ করল না— এই ব্যাপারটা তৎকালীন চিত্রকরদের কাছে জনতারই অযোগ্যতার প্রমাণ বলে গৃহীত হল।

অন্যদিকে, যন্ত্রশিল্পের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসাবে, অর্থাৎ দেশের ও দশের কাছে, ছাপা ছবিকে ফেল পড়িয়ে, হাতের আঁকা ছবিকে পৌঁছে দিতে না পারায়, ক্ষুদ্রতর সমঝদার গোষ্ঠীর সীমায় সেসব ছবিকে আবদ্ধ রেখে, ছবির মূল্য বাড়াবার তথা চিত্রকরের মর্যাদা বাড়াবার দিকে চিত্রকরকে প্রবৃত্ত হতে হল। একদিকে দুর্বোধ্য হওয়াকে, অন্যদিকে দুষ্প্রাপ্য হওয়াকে চিত্রের পরম সার্থকতা হিসেবে গণ্য করা শুরু হল। অন্যান্য যুগে এবং এযুগের শুরুতেও ‘গুরুর আসন' থেকে ছবি দেখানো হত জনসাধারণের ওপর আদর্শ ‘আরোপের’ জন্য, এবং সমসাময়িক বাস্তবজীবন সম্বন্ধে সমসাময়িক সমাজের সিম্বলকে (যে সিম্বল চলতি ভাষার মতো দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত, তাকে) চোখের সামনে আনল না । পুরানো ইতিহাস, পুরানো দর্শন, পুরানো সমাজ— ভারতীয় ছবির মধ্যে পুরাতনের জয়জয়কার (তা না করেই বা উপায় কী ছিল, বর্তমান ইতিহাস তো ছিল— শিক্ষিত সমাজের কাছে— গভর্নরদের শাসনের কথা দিয়ে, কৃষক ও কারিগরদের হাহাকারে আর নানান কুসংস্কার ও মূর্খতার প্রমাণে পরিপূর্ণ)। কাজেই ভারতীয় ছবি সাধারণের কাছে, সংস্কৃত ভাষার মতো, দুর্বোধ্য বা পাণ্ডিত্যপূর্ণ হয়ে উঠল। আর দু-চারজন রাজা-নবাবের ঘরে, মূল্যবান গ্রন্থে, উচ্চাঙ্গের পত্রিকায়, উচ্চশ্রেণীর সমঝদারের সংগ্রহশালায় আত্মনির্বাসন ঘটিয়ে দুর্লভ হয়ে উঠল। জনতার সঙ্গে তার ন্যূনতম সম্পর্ক, দৃশ্য-দর্শক সম্পর্কটাও শেষ অবধি চুকল। ছবিটা ব্যক্তিগত জীবনের খণ্ডতার মধ্যে আশ্রয় নিল, দেশপ্রেমের ‘গবাক্ষ কোথাও একটুখানি সামান্য থাকলেও ছবি আঁকার প্রেরণার পথ হিসেবে তা রইল না। ঔপনিবেশিক জীবনের দুঃখগ্লানির শেষ রেশ হিসেবে, সামাজিক মনের সৌজন্যমার্জিত বিদ্রোহের মৃদু উত্তাপ হিসেবে, সোজা কথায়, জগতের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াবার ইচ্ছার সঙ্গে জড়িয়ে রইল সেই দেশপ্রেম। ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনে এবং কারিগরিতে ভারতীয়তা বজায় রাখার সতর্ক প্রয়াস— ছবি জনতার দখলের নয়— এমন একটা স্বাতন্ত্র্যবোধের সঙ্গে জড়িয়ে দেখা দিতে লাগল । তারই একটা ফল হল— বিষয় নির্বাচনের মধ্যে সারল্যবর্জিত হল, কারিগরিও! এই দুরূহের পথটা গত বছর দশ-বারো পূর্বে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেল— প্রথমটা, ভারতীয়তাবোধ বজায় রাখার, প্রাধান্য দেবার ও ছবির দুর্বোধ্যতাকে গৌণ করার দিকে; দ্বিতীয়টা তার বিপরীত— ছবিকে দুর্বোধ্য করার বা দুর্বোধ্য জগতের ছবি আঁকাই মুখ্য, জাতীয়তাবোধকে, বিজ্ঞানের নামে, এড়িয়ে যাওয়ার পথে। নন্দলাল বসুর মতো শক্তিমান ও বিখ্যাত শিল্পী এই প্রথম নম্বর পথের পথিক। দ্বিতীয় দলের শক্তি সম্বন্ধে বলা শক্ত এবং খ্যাতিও বিশেষ শ্রেণীর সমঝদারের সীমায় আবদ্ধ, কিন্তু ‘স্কুল’ হিসাবে তাঁদের ছবির বৈশিষ্ট্য শিক্ষিতদের কারও কারও নিকট পরিচিত; ইমপ্রেশনিস্ট, কিউবিস্ট, ফিউচারিস্ট, সুররিয়ালিস্ট প্রভৃতি বিশেষণগুলি এই দ্বিতীয় পথের পথিকদের পরিচয়পত্রের নাম। এদেশের এই দ্বিতীয় দলটির দৃষ্টিভঙ্গি যতটা ইউরোপের চিত্র-আন্দোলনের প্রতিধ্বনি, তত তাঁদের নিজেদের আবিষ্কারের ফল নয় এবং চিত্র জগতে ইউরোপের মতো ট্রাডিশন-এর বিরুদ্ধে অভিযান করার চেষ্টা এবং ব্যর্থ চেষ্টা। ব্যর্থ এই জন্যে যে, যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দেওয়াই এইসব ‘স্কুলের’ একমাত্র চেষ্টা ছিল, তার কোনো পাত্তাই মিলল না, মিলল ইউরোপের ওঁদেরই বুলি ও কারিগরির অনুকরণ করার পরিচয় মাত্র। প্রতি পদে ইউরোপের ওঁদের নজির দেওয়া ভিন্ন এক পা চলবার শক্তির পরিচয় এদেশের এইসব স্কুলের এঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে দেখাতে পারেননি— অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথের ছবিও এই স্কুলের অন্তর্গত— আরও স্পষ্টভাবে— ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের চমৎকার সৃষ্টি।

ওপরে প্রথম পথ বলে যাকে বলা হল সেই পথেও ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের কথাটা অস্পষ্ট নয়, কিন্তু সেই সঙ্গে জাতীয়তাবাদ আরও স্পষ্ট থাকায় দেশের চলিত চিত্ররীতির সঙ্গে তার বিরোধ ঘটেনি বরং জাতীয় চিত্রভাণ্ডারকে ঐশ্বর্যবান করে তুলেছে। কিন্তু বাস্তব জীবনকে সমসাময়িক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার ফলে জাতীয়তাবাদী চিত্র হয়েও সেগুলি রোমান্টিক বা কাব্যিক মূল্যে মূল্যবান হল এবং সমাজের পরিবর্তনের শক্তিরূপে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারল না। তবু নন্দলালের ছবিতে আধুনিক না হলেও সমসাময়িক সমাজের খানিকটা, বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে, নন্দলালের হাতে ভারতীয় চিত্র এইদিকে কিছুটা প্রগতিশীল হয়েছে— অর্থাৎ শুরুকার পুরাণ ও পুরানো ইতিহাসের দিক থেকে সমসাময়িকের দিকে এগিয়েছে, সমাজের সঙ্গে তার বন্ধন বাস্তব না হয়ে কাল্পনিক হলেও ‘বন্ধন আছে’— এই কথাটা তার মধ্যে স্বীকৃত হয়েছে। এইখানেই চিত্রের পুনর্জীবনের প্রচণ্ড আশা নিহিত।

সমাজের সঙ্গে ছবির এই যে কাল্পনিক বন্ধন, অন্য কথায়, সমাজের ভাঙাগড়ার কাজে ইতিহাসের প্রভাব; সোজা কথায়, যন্ত্রসভ্যতার সম্ভাবনাকে এড়িয়ে গিয়ে আদর্শবাদের চোখে সমাজকে এই যে ভালোবাসা, সমাজের দারিদ্র্য-দুর্বলতাকে বাস্তব ক্ষতিবৃদ্ধির মাপে না মেপে রোমান্টিক দৃষ্টিতে, কাল্পনিক মূল্যে মূল্যবান করে তোলার এই যে চেষ্টা, তার মধ্যেই আছে ছবির সংকটের কারণ নিহিত। এরকমভাবে সমাজকে ভালোবাসা ও সমাজের মূল্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে, তার কারণ চিত্রকর নিজেকে সমাজের বাইরেকার এক জগতের মানুষ হিসেবে ধরে নিয়ে, দর্শক হিসেবে সমাজকে দেখছেন, সমাজের প্রভাবকে তাঁর মধ্যে দেখছেন না, সমাজের ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও প্রগতিকে নিজের মধ্যে প্রতিফলিত হবার সুযোগ দিচ্ছেন না, বর্তমান ইতিহাসের তাৎপর্য বুঝতে পারছেন না।

অন্যদিকে ছবি যদি সমাজেরই অঙ্গবিশেষ হয়, তবে সমাজই বা সে অঙ্গের জীবনমরণের দিকে অমন অসাড়তার পরিচয় দিচ্ছে কেন? যেমন করে সমাজ কবিতা ও উপন্যাস চেয়েছে, তেমন করে ছবিকে চায়নি কেন? সাহিত্যের মধ্যে নিজেকে মানুষ যেমন করে খুঁজেছে, খুঁজে না পেলে মাথাব্যথা দেখিয়েছে, ছবির বেলায় তেমন মাথাব্যথা নেই কেন? তার কারণ, মূলত, সমাজে সংকট যতই ঘনিয়ে এসেছে, সমাজ ততই পথ খুঁজেছে পরিত্রাণের। যে পথ যুক্তির পথ, তর্ক-সমালোচনার পথ, সাহিত্য-কবিতা সেই পথেই চলে। অন্যদিকে ছবি হল সরাসরি সিদ্ধান্তের আধার।— সমাজ সম্বন্ধে হয় প্রশ্ন নয়তো নির্দেশ। সে নির্দেশকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করবার বা সে প্রশ্নকে প্রশ্নোত্তর দিয়ে বিশ্লেষণ করবার অবসর ছবির মধ্যে অত্যন্ত অল্প— অর্থাৎ ছবি সমাজকে তার সংকট সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো এক পথে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, এজিটেট ও অর্গানাইজ করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু পথ-সন্ধানের কাজে সাহায্য করতে পারে না। এই গেল অনাগ্রহের একটা, কিন্তু গৌণ কারণ (গৌণ, যেহেতু শক্তিমান শিল্পীর হাতে পড়লে চিত্রের ওই সংজ্ঞাও বদলে যেতে পারে, এবং বিশেষভাবে বর্তমান সমাজের ওই অনুসন্ধিৎসু চিত্তের পরিচয় ছবিতে কেউ প্রকাশ করেননি— সেটাও অত্যন্তভাবে ছবির আনপপ্যুলারিটির হেতু)।

ছবির আনপপ্যুলারিটির প্রধান কারণ হল একদিকে সমাজের চরম দারিদ্র্য, অন্যদিকে বিজ্ঞানের দুর্ভিক্ষে ক্লিষ্ট সমাজব্যবস্থা। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ জমে উঠেছে, অনেকবার অনেক বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, সেটা স্বাধীনতারই ইতিহাস হওয়া সত্ত্বেও নবজীবনের একটা স্পষ্ট বা সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে একবারও দাঁড়ায়নি; ইংরেজের শেকল সহ্য হয় না, শেকলটাই আগে ছেঁড়ো, তারপরের কথা পরে হবে— অনেকটা এইরকমের মনোভাব আমাদের জাতীয় আন্দোলনের মূলে থেকে এসেছে। সেই শেকল ছেঁড়ার কাজে নেতাদের ওপর অন্ধ নির্ভরতা ভিন্ন অন্য উপায় নেই— কারণ ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বা সমাজের প্রয়োজন সম্বন্ধে সচেতনতা বা স্পষ্ট ধারণা থাকলে জাতীয় জীবনে সত্যকারের স্বাধীনতা আসে। তা না থাকার ফলে, ছবি হিসাবে একমাত্র নেতাদের প্রতিমূর্তিই পপ্যুলার হয়েছে বা সমাজ সাগ্রহে গ্রহণ করেছে, দাবি করে চিত্রকরদের কাছ থেকে আদায় করেছে। এইটুকু যোগের মধ্যেই সংকট থেকে বাঁচবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে, যদিও ছবির দারিদ্র্যটাও সমাজের এই দারিদ্র্যেরই প্রতিফলন বই আর কিছু নয়।

কিন্তু এতক্ষণ যা-কিছু আমরা দেখলাম সবই অতীতের ছবি, অতীতের ব্যাপার। তার মধ্যে থেকে আমরা ছবির সংকটের হেতুগুলি বুঝলাম, আর বুঝলাম সংকট থেকে বেঁচে উঠবারও পথ আছে। সংক্ষেপে তা এই চিত্রকরকে সমাজ থেকে ছেড়ে আত্মনির্বাসনের পথ সমাজে ফিরে আসতে হবে, এবং সমাজকেও জীবনসংগ্রামের এক প্রবল হাতিয়ার বলে চিত্রকে গ্রহণ করতে হবে।

আজ দুনিয়ার জনসাধারণ জীবনধারণের তাগিদে সংঘবদ্ধ হয়ে পুরোনো সমাজব্যবস্থাকে ভেঙেচুরে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। যন্ত্রসভ্যতাকে স্বীকার করছে কি করছে না সেইটাই দুনিয়াব্যাপী নরনারীর জীবনমরণ সমস্যা সমাধানের মধ্যে প্রধান কথা নয়, প্রধান কথা ধ্বংসের পথ থেকে মানুষ বেঁচে উঠবার আয়োজন করছে এবং সে বেঁচে উঠবেই, এগিয়ে চলবেই, পুরোনো ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে পৃথিবীর সুখ-ঐশ্বর্যের, ভোগের ক্ষেত্রে সর্বমানবের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করবেই। এই ভাঙা-গড়ার মধ্যে ছবি করবার কাজ আছে অসীম, সে কাজ করলে ছবি আজকের জীবনযাত্রার মধ্যে বাঁচবে, নইলে ভবিষ্যতের আশায় একপাশে পড়ে পড়ে আপনার শক্তির অপচয় করবে।

প্রোপাগান্ডা?— কোন ছবি একটা-না-একটা আদর্শের প্রোপাগান্ডা নয়! আর্ট? – আদর্শকে বা বক্তব্যকে প্রবল করে তোলার অবসর কোন বিষয়বস্তুর মধ্যে নেই! শিল্পীর স্বাধীনতা? —নিজের গণ্ডিতে বদ্ধ হয়ে বাইরের হাতে মার খাওয়াটাই কি স্বাধীনতা, না সমাজের ইতিহাস তৈরির কাজে সচেতনভাবে দায়িত্বগ্রহণ ও বীর্যের সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করে সমগ্র মানবসমাজের সঙ্গে মিলে এগিয়ে চলাই স্বাধীনতা! নতুন যুগকে বুঝতে হবে, নতুন যুগের আদর্শকেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার ভার নিতে হবে, তবেই চিত্রের সংকট দূর হবে, নইলে নয়। আর ছবি যদি একটা সৃজনশীল শক্তি হয় তবে তা শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকতে পারে না, বিস্তৃতির তাগিদেই সে এগিয়ে আসবে আপন জীবনের পরিচয় দেবার ক্ষেত্রে। সে-ক্ষেত্রটাই হল সমাজ, সেই সমাজকে ভালো না বাসলে যেমন শিল্পীর বাঁচার উপায় নেই, আবার সেই সমাজের ভালোবাসা অর্জন করতে না পারলেও ছবির বাঁচার উপায় নেই।

শুধু এযুগের নয়, যুগযুগান্তের শিল্পের ফসল সবই শুধু একমাত্র শিল্পীসমাজের সম্পদ নয়, সকল নরনারীর ভালোবাসা না পেলে তাদের অস্তিত্ব ব্যর্থ; আজ সেই ব্যর্থতার চেয়েও বড় বিপদ দেখা দিয়েছে— যে শিল্পকলা সমাজকে আপন স্বাধীনতা সম্বন্ধে সচেতন ও উদ্দীপ্ত করে তারই বিরুদ্ধে ফ্যাসিজম পাশবিক অভিযান চালিয়েছে। সেই অভিযানের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে সকল নরনারীর সংঘবদ্ধ ও সচেতন প্রত্যাভিযান— একা কোনো শিল্পীর বা কোনো এক শিল্পীসম্প্রদায়ের সমাজসংস্পর্শহীন চেষ্টায় শিল্পসংস্কৃতির স্বাধীনতাকে ফ্যাসিজমের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।

সমগ্র সমাজকে তার পরম সম্পদ, শিল্পসংস্কৃতির সম্পদ সম্বন্ধে সচেতন করে তাকে রক্ষা করবার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে হবে— এই প্রয়োজনের পথে গতানুগতিকতার জড়তার খোলস থেকে বেরিয়ে আসাটাই শিল্পীর স্বাধীনতার প্রথমপাদ; ও দ্বিতীয়পাদ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে, যেমন করে কোদাল ভেঙে বেয়নেট গড়ার মধ্যে, ঠিক তেমনি করেই শিল্পের রূপান্তর ঘটানোর মধ্যে। সেই স্বাধীনতার পরিচয় দেবার বেলা আজ বয়ে যাচ্ছে।

চিরন্তনী?— পরিবর্তনের অধিকারটাই চিরন্তনী। সেই অধিকারকে আজ অস্বীকার করলে আজকের ইতিহাসে চিত্রকরের স্থান নিতান্ত নগণ্য, চিত্রকরের স্বাক্ষর নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে থাকবে— ভবিষ্যতের কাছে সেই স্বাক্ষর সুবোধ্য হতে পারে, কিন্তু অভিনন্দনের বস্তু হবে না। কারণ মানুষ চিরদিনই বীর্যবানকে অভিনন্দন দিয়েছে এবং দেবে, আর সে বীর্যের পরিচয় প্রত্যক্ষ জীবন সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার মধ্যে।

আজকের জীবনসংগ্রামে বিজয়ী হতে হলে সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে মিলতে হবে— আরও স্পষ্টভাবে বললে, মানবজাতির জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যোগ দিতে হবে, ছবিকে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে জনশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে সংগ্রামের প্রত্যক্ষ হাতিয়ার হয়ে উঠতে হবে— সে হাতিয়ার বেদমন্ত্রের তুলনায় বা অজন্তা-ইলোরার তুলনায় সমান মর্যাদার পাত্র এবং সে মর্যাদা সে আজকের সমাজ থেকেও পাবে, ভবিষ্যৎ সমাজ থেকেও পাবে।— সেই মর্যাদা অর্জনের বেলা এ-যুগের মতো আজ বয়ে যাচ্ছে— তবু এ-যুগের শিল্পীরা কই?



সূত্র- অরণি, শারদীয়া সংখ্যা, আশ্বিন, ১৯৪৩।


প্রকাশের তারিখ: ২২-জুন-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৭ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

২৩-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

১৪-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫