সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠন : সূচনাপর্ব (প্রথম পর্ব)
সরোজ মুখোপাধ্যায়
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় আন্দোলনের ভিতরকার বামপন্থীদের মধ্যে, বিপ্লববাদীদের মধ্যে, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে কোন্ পথে স্বাধীনতা আসবে, স্বাধীনতার রূপ কি হবে। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মীদের মনকে এইসব প্রশ্ন আলোড়িত করে তোলে। প্রকৃত পথের সন্ধান খুঁজতে থাকেন এঁরা। বৈজ্ঞানিক রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। প্রকৃত বৈপ্লবিক পথ সন্ধানের রাজনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুত হয় এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই।
[ব্রিটিশ শাসনে শৃঙ্খলিত ভারতে ষাট বছর আগে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠনের সূচনা শুরু হয়। তদানীন্তন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এর বাস্তব অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের ভাবধারা না পৌঁছলে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি গড়ে ওঠে না। সেই প্রেরণা এসেছিল রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লবের তোপধ্বনির মাধ্যমে এবং কমরেড লেনিনের উদ্যোগে স্থাপিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সঙ্গে ভারতীয় বিপ্লবীদের যোগাযোগের ফলশ্রুতি হিসাবে। দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈপ্লবিক প্রচেষ্টার সঙ্গে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ভ্রাতৃত্বসুলভ সাহায্য ও সহযোগিতার ফলেই গড়ে ওঠে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর তাসখন্দ শহরের বুকে। এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
পুরাতন দিনের এইসব কথা নতুনদের জানা দরকার। তাই এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ।]
অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে কৃষক অভ্যুত্থান, শ্রমিক আন্দোলন ও সর্বশেষ পর্যায়ে জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলনের যে সূত্রপাত হয় সেগুলি বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯০৮ সালেই কমরেড লেনিনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এই দিকে নিবদ্ধ হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা বালগঙ্গাধর তিলকের কারাদন্ডের প্রতিবাদে বোম্বাইয়ের শ্রমিকশ্রেণীর ধর্মঘট লক্ষ্য করে কমরেড লেনিন লিখেছিলেন শ্রেণীসচেতন ও রাজনৈতিক গণসংগ্রাম পরিচালনার যথেষ্ট যোগ্যতা ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে ভারতের সর্বহারা শ্রেণী এবং এই ঘটনার জন্যই ইঙ্গো-রাশিয়ার ভারত সম্পর্কিত নীতি ও পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে উঠেছে।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসবাদী গবেষক কমরেড রজনীপাম দত্ত তাই লিখেছিলেন লেনিনই মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ভারতের এইসব ঘটনাবলীর অন্তর্নিহিত শক্তিগুলি দেখতে পেয়েছিলেন এবং তার ভবিষ্যৎ তাৎপর্য তিনি বুঝেছিলেন বলেই ১৯০৮ সালে বলতে পেরেছিলেন যে, ভারতের সর্বহারা শ্রেণী সচেতন হয়ে উঠছে এবং রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করছে। পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় আন্দোলনে, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে তাঁর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই হয়ে গেছে। (ইন্ডিয়া টু-ডে রাইজ অব লেবার অ্যান্ড সোসালিজম)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ স্তরে রাশিয়ায় বিপ্লব সাধিত হয়। সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ ও স্থায়ী সঙ্কট আরম্ভ হয়। নবজাত সোভিয়েত রাষ্ট্রকে ধনবাদী রাষ্ট্রগুলির চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও যুদ্ধ করতে হয়। সোশ্যাল-ডেমোক্রাটরা ইতিমধ্যেই বুর্জোয়াদের সাথে যোগ দিয়েছে। মুখোশপরা শ্রমিক সংগঠকদের আসল রূপ বেরিয়ে পড়েছে ইউরোপের দেশে দেশে। বিপ্লবের স্বার্থে, বিভিন্ন দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলিকে বিপ্লবের পথে পরিচালিত করার জন্য কমরেড লেনিনের উদ্যোগে গঠিত হলো (১৯১৯) কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক অথবা তৃতীয় আন্তর্জাতিক। তখন এই সংগঠনকে বলা হতো বিশ্ববিপ্লবের কেন্দ্র। সমস্ত ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম দুর্বার হয়ে উঠছে। তখন এইসব আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ায় সোভিয়েত রাশিয়া ও তৃতীয় আন্তর্জাতিক।
এই সময় ভারত, চীন প্রভৃতি বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, বিশেষ করে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের সংগঠক ও বিপ্লবীদের সামনে কয়েকটি তাৎপর্যবাহী ঘটনা উপস্থিত হলো। ঘটনাগুলি হলো: বিশ্ববিপ্লবের অগ্রদূত সোভিয়েত রাশিয়ার জন্ম ও উত্থান, উপনিবেশগুলিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, ধনবাদী দেশগুলিতে শ্রমিকশ্রেণীর প্রকৃত বিপ্লবী সংগঠনের কর্মতৎপরতা, দুনিয়াব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে পরস্পর অন্তদ্বন্দ্বের প্রকাশ।
এইসময় ভারতের জাতীয় আন্দোলন একটা নতুন স্তরে উঠেছে। আবেদন-নিবেদনের স্তর ছাড়িয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনের স্তরে প্রবেশ করেছে জাতীয় কংগ্রেস। শ্রমিকশ্রেণীর সংগঠনগুলি সংগ্রামশীল পন্থা গ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা প্রবেশ করছে। কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধছে।
শিল্পে সঙ্কট শুরু হয়েছে। যুদ্ধজনিত শিল্পপ্রসার স্তব্ধ হয়ে গেছে। ধনবাদী মালিকরা শ্রমিকদের আর বোনাস দিচ্ছে না। বোনাস স্ট্রাইক দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এইসময়ই ভারতের সূতাকলে প্রথম সাধারণ ধর্মঘট হয়।
কৃষিতেও সঙ্কট শুরু হয়। অর্থকরী ফসলের দাম পড়ে গেছে। শিল্পজাত দ্রব্যের দাম ক্রমাগতই চড়ছে। ফলে কৃষকদের খাজনা দেনার পীড়ন বেড়েছে। দিকে দিকে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছে।
সৈন্যদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যুদ্ধে কোন কোন স্থানে "সাদা-চামড়ার" বিরুদ্ধে গুলি ছুঁড়ে তারা বাড়ি ফিরেছে। তারা গ্রামে ফিরে কৃষকদের মধ্যে বিস্ফোরণের মত কাজ করছে।
ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছে। একদিকে গান্ধীজীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে বিপ্লবীদের বিভিন্ন রাজ্যে সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ডের প্রস্তুতি চলছে। দিকে দিকে বিশেষত বোম্বাই, কলকাতা, কানপুরে শ্রমিক ধর্মঘট বিস্তৃতি লাভ করছে। শ্রমিকদের সংগঠনগুলি ব্যাপকতা লাভ করছে এবং সংগ্রামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এতদিন ব্রিটিশ শাসকদের কৌশল ছিল ব্যাপকভাবে জাতীয় কংগ্রেস ও কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন দমনের বিরুদ্ধে বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণ-আন্দোলন ও বিপ্লববাদী আন্দোলন দমন করার জন্য রাওলাট আইন প্রয়োগ করা। ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার এবং জনসমাবেশ ও মিছিলে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকরা জাতীয় আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করছে। এবার তার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো শ্রমিক সংগঠকদের উপর প্রচন্ড দমন-পীড়ন শ্রমিক আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। তথাপি ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের গতি তারা স্তব্ধ করতে পারেনি। ভারতের রাজনীতিতে এই বিশের দশকে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক পরিস্থিতি
জাতীয় রাজনীতিতে উদারনীতিবাদের অবসান ঘটতে বসেছে। গণ আন্দোলনের মুখে জাতীয় আন্দোলন প্রবেশ করেছে। বিপ্লববাদীরা যুদ্ধের সময় কয়েকটি বিদ্রোহাত্মক প্রচেষ্টা চালাবার পর কিছুকালের জন্য দিকে দিকে বিভিন্ন রাজ্যে সংগঠন ছড়িয়ে দেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। এইসময় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গণ-অসন্তোষকে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের খাতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা শুরু করলেন। দেশের নতুন বুর্জোয়াদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভারতের জাতীয়তাবাদ, গান্ধীর মতবাদ গান্ধীবাদে নতুনভাবে রূপায়িত হলো।
জাতীয় গণ আন্দোলনের, জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত আপসহীন বৈপ্লবিক শক্তির সঙ্গে গান্ধীজীর অহিংস-অসহযোগ-সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সংঘাত শুরু হলো। জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে পরবর্তী পঁচিশটি বছর এই দ্বন্দ্ব জাতীয় রাজনীতিতে বারে বারে ফুটে বেরিয়েছে- এই দ্বন্দের সংঘাত চলেছে বিভিন্ন আন্দোলনে-সংগ্রামে।
গান্ধীজী পরিচালিত ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপ্তির মধ্যেই শুরু ১৯২১ সালের আন্দোলনে অগ্রগতি পরিস্ফুট হয়নি। তার সাথে সাথে নানা পদ্ধতির (ফর্ম) গণসংগ্রাম সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্ট্রাইক, মেদিনীপুরের ট্যাক্স-বন্ধ আন্দোলন, মালাবারে মোপলা বিদ্রোহ, সরকারপুষ্ট ধনী মোহান্তদের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে আকালী আন্দোলন, অন্ধ্রের গুন্টুর জেলায় ট্যাক্স-বন্ধ আন্দোলন প্রভৃতি। সর্বোপরি, ১৭ই নভেম্বরে যুবরাজের ভারত আগমনের প্রতিবাদে ভারতব্যাপী সফল হরতাল ও ব্যাপক মিছিল। এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধীজীর নির্দেশে আমেদাবাদ জাতীয় কংগ্রেস আন্দোলন থেকে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। (ইন্ডিয়া টু-ডে, পৃ: ২৮৩-৮৪)
কৃষক জনগণের অসন্তোষ ক্রমাগতই বৃদ্ধি পেতে থাকে। গুজরাটে বারদৌলী জেলায় গণ-আইন অমান্য আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ১৯২২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি। ইতিমধ্যে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচোরা গ্রামে কৃষক অভ্যুত্থান ঘটেছে। কৃষকরা সেখানে পুলিস চৌকী দখল করে ২২ জন পুলিসকে হত্যা করেছে। এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই গান্ধীজী ১২ই ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ডেকে আইন অমান্য সহ সমস্ত প্রকার আন্দোলন বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। "চৌরিচোরায় জনগণের অমানুষিক আচরণের" পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারপর থেকে চরকার মাধ্যমে জনসেবা ও গ্রামোন্নয়নের কর্মসূচী জাতীয় কংগ্রেসে গ্রহণ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় আন্দোলনের ভিতরকার বামপন্থীদের মধ্যে, বিপ্লববাদীদের মধ্যে, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে কোন্ পথে স্বাধীনতা আসবে, স্বাধীনতার রূপ কি হবে। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মীদের মনকে এইসব প্রশ্ন আলোড়িত করে তোলে। প্রকৃত পথের সন্ধান খুঁজতে থাকেন এঁরা। বৈজ্ঞানিক রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। প্রকৃত বৈপ্লবিক পথ সন্ধানের রাজনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুত হয় এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই। কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ, লাহোর প্রভৃতি স্থানের শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের কর্মীরা রাশিয়ার বিপ্লবের পথ, শ্রমিকশ্রেণীর পথ, মার্কসবাদের পথের দিকে আকৃষ্ট হতে থাকেন। মার্কসবাদের পুঁথি-পুস্তক বেআইনীভাবে সংগ্রহ ও অধ্যয়ন-অনুশীলনের ঝোঁক বাড়তে থাকে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের দুর্গ সোভিয়েত রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতা। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত। উপনিবেশের বিপ্লবী সংগ্রাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত আলোচনার সুযোগ উপস্থিত হলো। পূর্বেও ঔপনিবেশিক আন্দোলন সম্পর্কে আন্তর্জাতিকের দৃষ্টি ছিল, কিন্তু তা ছিল অস্পষ্ট ও অস্বচ্ছ। ১৯১১ সালের চীন বিপ্লব, ভারতের জাতীয় গণ-অসন্তোষ ও স্থানীয় খন্ড খন্ড অভ্যুত্থান এসবই আন্তর্জাতিক শ্রমিক কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের পর এসব প্রশ্ন সুতীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্টভাবে সামনে হাজির হলো।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তখন এ সম্পর্কে তিনটি বিষয় লক্ষ করে।
১। উপনিবেশের জাতীয় আন্দোলন নতুন স্তরে পৌঁছেছে। ধনতন্ত্রের সঙ্কট বাড়ছে সাম্রাজ্যবাদ সমস্ত বোঝা উপনিবেশের জনগণের স্কন্ধে চাপিয়ে দিচ্ছে। বুর্জোয়া শ্রেণীর শিল্প-সৃষ্টির আন্দোলন এসব দেশে শুরু হয়েছে। আধুনিক শ্রমিকশ্রেণী ও তার আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে আধুনিকতা এসব দেশে বিশেষত ভারতের মত দেশে প্রবেশ করেছে। অর্থনৈতিক ও রাজনীতিক দাবিদাওয়া সুনির্দিষ্ট আকার নিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে এর ফলে সংঘাত হচ্ছে। এই সংঘাত-সংঘর্ষ প্রবল হয়ে উঠছে।
২। সোভিয়েত রাশিয়া নিজেদের জাতীয় ও ঔপনিবেশিক সমস্যার সফল সমাধানে অগ্রসর হয়েছে। জাতীয় সমস্যা সমাধানের এক নতুন ধারা জগতের সামনে হাজির হয়েছে। জারের অসম চুক্তিগুলি এক কলমের খোঁচায় বাতিল হয়েছে, প্রত্যেকের সঙ্গে সমান ও ভ্রাতৃত্বের সম্বন্ধ স্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন দুর্বল দেশের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির চুক্তি ও সম্পর্কে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত দিয়ে বিভিন্ন দেশ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে অস্তিত্ব ও বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির ফলে দুর্বল দেশগুলি ও উপনিবেশগুলি নিজের পায়ে সসম্মানে দাঁড়াবার সাহস অর্জন করেছে।
৩। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক উপনিবেশ সংক্রান্ত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতৃত্বে কাউটস্কির সোশ্যাল-ইম্পিরিয়েলিস্ট পলিসিকে দূরে ঠেলে দিয়ে এক বিপ্লবী কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। এই কৌশল গ্রহণের ফলে উপনিবেশ ও পরাধীন দেশের জাতীয় বিপ্লবী আন্দোলনকে সাহায্য করার নীতি স্থিরীকৃত হলো। সমস্ত অনুন্নত ও পরাধীন দেশের মুক্তি আন্দোলনকে সারা দুনিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা অচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে পরিচালিত করার নীতি গৃহীত হলো।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস (১৯২০) জাতীয় ও ঔপনিবেশিক সমস্যা সম্বন্ধে বিচার বিশ্লেষণ করে এক থিসিস রচনা করা হয়। এই থিসিসের মূল কথা ছিল: ঔপনিবেশিক বিপ্লবের রূপ হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক, ঔপনিবেশিক বুর্জোয়ারা যেখানে এবং যখন সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামে প্রগতিমূলক ও সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে, তখনও সেখানে সেইসব বুর্জোয়াদের আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীকে সক্রিয় সমর্থন করতে হবে। এই থিসিসে শ্রমিকশ্রেণীর স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমস্ত বই-কাগজপত্র অধ্যয়ন ও ঘটনা বিশ্লেষণ করে (১৯১৭-১৯১৯) কমরেড লেনিন কলোনি সম্বন্ধে থিসিস রচনা করলেন। ভারতের সম্পর্কে বিশেষভাবে চিন্তা করার জন্য কোন লোক মারফত একটা রাজনৈতিক যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করছিলেন। কোন শিল্পোন্নত আধুনিক দেশের পাশাপাশি ভারতের অবস্থান নয়। মার্কসবাদের ভাবধারা মৃদু গতিতে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে। জাতীয় আন্দোলনের ময়দানে বালগঙ্গাধর তিলক এলেন, তারপর এলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং তারপর প্রবেশ করল মার্কসবাদ। এইভাবে কুড়ি বছর কেটে গেল। লেনিন মানবেন্দ্রনাথ রায়কে পেয়ে ১৯২০ সালে ভারতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করলেন।
ভারতের অভ্যন্তরে কলকাতা, বোম্বাই, লাহোর প্রভৃতি স্থানে ছোট ছোট কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে উঠেছে লক্ষ্য করে এদেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ওপর লেনিন জোর দেন। বাকু সম্মেলন ও পূর্বাঞ্চলীয় সম্মেলনে হিজরাতীদের নিয়ে আলোচনা হয়। পরে জেনেভায় কলোনিয়াল প্রশ্ন আলোচনার মাধ্যমে এম এন রায় ও হিজরাতীদের সাহায্যে ভারতে কমিউনিস্ট মতবাদ প্রচার শুরু হয় এবং কমিউনিস্ট কর্মসূচী অনুসারে জাতীয় আন্দোলনে অংশ গ্রহণের চেষ্টা হয়। প্রথমদিকে কিছুদিন ঠিকমত কাজ করলেও এম এন রায় পরবর্তীকালে ঠিকভাবে এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। ফলে বিদেশে অবস্থিত কয়েকজন বিপ্লবী এবং তাদের পার্টির কয়েকজন কর্মী ও হিজরাতীদের উপর পার্টি গড়ার দায়িত্ব পড়ল। অবশ্য ইতিমধ্যে ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর তাসখন্দ শহরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলো এবং তাঁরা ভারতের বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ চালাতে থাকেন। ১৯২১ সালের নভেম্বরের মধ্যে এইসব গ্রুপ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কাজ চালাতে থাকেন। এই বছরের ১৮ই নভেম্বর কলকাতায় কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের নেতৃত্বে, মাদ্রাজের সিঙ্গারুভেলু চেট্টীয়ারের নেতৃত্বে, বোম্বাইয়ে এস এ ডাঙ্গের নেতৃত্বে এবং লাহোরে মজিদের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় পার্টির নিউক্লিয়াসটি গঠিত হয়। দেশের অভ্যন্তরে এই সময়ই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের সূত্রপাত হলো।
মুজাহিররা ভারতে ফেরার পথে পেশোয়ারে গ্রেপ্তার হন। তিনটি পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা চালায় ব্রিটিশ সরকার। ১৯২২ সালের ৩১শে মে প্রথমটির রায় বের হয়। তৃতীয় পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা আরম্ভ হয় ১৯২৩ সালের ৭ই মার্চ। তিনটি মামলাতেই মহম্মদ আকবর প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন। মহম্মদ আকবর, মহম্মদ হাসান, গোলাম মেহবুব প্রমুখের বিভিন্ন রকমের কারাদন্ড হয়। এটাই প্রথম কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা। এঁরা সবাই পূর্বাঞ্চলের শ্রমজীবীদের কমিউনিস্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন শেষে তাসখন্দ থেকে ভারতে ফিরে পার্টির কাজে আত্মনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত করেছিলেন।
(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আগামীকাল)
লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় মার্কসবাদী পথের প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যায় ৫ই আগস্ট, ১৯৮১ সালে।
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ১৭-অক্টোবর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
