সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব- ৭)
আর বি মোরে
আমি যখন স্কুল ছেড়ে দাশগাঁওতে থাকা শুরু করি, লকড়ি কুড়িয়ে, বড়বাড়ির ফাইফরমাশ খেটে যখন দিন গুজরান হচ্ছে, তখন বোম্বে থেকে বড়বাড়িতে এক অতিথি এলো। উনি জিগ্যেস করেন আমি কদ্দূর পড়েছি, কী করছি ও আরও নানান খুঁটিনাটি তথ্য। তারপরে উনি আমার চার জ্যাঠতুতো দাদাকে জানান যে রামচন্দ্র অর্থাৎ আমাকে যদি বোম্বেতে ওঁর সঙ্গে পাঠানো সম্ভব হয়, তবে উনি টিকিট কালেক্টর হিসাবে ৪৫ টাকা মাসমাহিনার এক চাকরি জুটিয়ে দিতে পারবেন আমায়। সেই সময়ে আমার সকল দাদাই মাহার স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করে মাস গেলে এগারো টাকা করে কামাচ্ছিল। ওরা হিসাব করে দেখল : চার ভাই মিলে যেখানে মোট চুয়াল্লিশ টাকা উপার্জন করছে, সেখানে রামচন্দ্র একাই তার থেকেও এক টাকা বেশি উপার্জন করবে! ফলে ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে বোম্বেতে আমাকে কালেক্টর করতে পাঠাবে।

[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ।
প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।
কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]
ষষ্ঠ পর্বের পর......
এককালে, সত্যশোধক আন্দোলন মাহাদে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। সত্যশোধক আন্দোলনের অন্যতম নেতা ভাস্কররাও ভিথোজি যাদব মাহাদেরই বাসিন্দা ছিলেন। কায়স্থ গোত্রের টিপনি আর পোতনি পরিবার ছিল সত্যশোধক আন্দোলনের সমর্থক। এঁরা সকলেই আমার স্কুলে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। বাজারে মাহারদের নিজস্ব হোটেল খুলবার চিন্তারও সমর্থক ছিলেন। ওঁরা আমার জন্যে, আমার মতো অন্যান্য মাহারদের জন্যে সহানুভূতিপ্রবণ ছিলেন। যখন বাজারে ব্রাহ্মণ কেরানি ছাড়া সামান্য দস্তাবেজ লিখবার মতনও কেউ ছিল না, আমি মাহার আর মারাঠাদের জন্যে চিঠিপত্তর লিখে দিতাম এন্তার। ফলত মাহাদের মহাজনদের জমির ভাগচাষিরা আমার কাছের হয়ে উঠল। যখন নদীর জল মাত্রাছাড়া বেড়ে উঠত, কারাঞ্ঝোলের মারাঠা চাষি আমাকে কাঁধে চাপিয়ে লাডাওয়ালিতে নিয়ে যেত।
ওয়াগন ইয়ার্ডে আমাদের প্রথম হোটেলখানি শুধু গরমের সময়েই চলত। বাজারের মধ্যিখানে এই দ্বিতীয় হোটেলখানা চলতে শুরু করল বছরভর। যখন নদীর জল উপচে বাজারে ঢুকত, সমগ্র পুরানা বাজার বানভাসি হয়ে পড়ত। সমস্ত দোকানপাট বেশ কিছুদিনের মত বন্ধ থাকত। আমাদের হোটেলখানাও কয়েকদিন বন্ধ থাকত সে-সময়। হোটেলের জমিখানার মালিকানা ছিল পুরসভার। কিন্তু আমরা ফি বচ্ছর লিজ নিতে নিতে হোটেলটা পাকাপাকি আমাদেরই হয়ে গেল। বাজারের মধ্যে এটা ছিল আমাদের নিজস্ব আড্ডাখানা, জমায়েতের জায়গা। গোড়াতে রাত্তিরে সেখানে কেউই থাকত না। বেশ কিছুটা সময় কাটলে, মানুষ সেখানে রাত্তিরে থাকাও শুরু করে।
আমি মাহাদের স্কুলে যেসময় যাওয়া শুরু করি, ঝুলন্ত লম্ফ-লমনদীভা-র চল ফুরিয়ে আসছিল, বদলে কেরোসিন লণ্ঠনই ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তেলের প্রদীপ বা সামাই দেখাই যেত না প্রায়। কেরোসিন চালিত টিনের লম্ফ বা ছোটো কাঁচের উপরে ঝোলানো লম্ফের আলোয় রাতের বেলা লেখাপড়া করতে মুশকিল হত। লাড়াওয়ালিতে আমার মামাবাড়িতে একখানা লম্বা কেরোসিন লম্ফ কেনা হয়েছিল আমার পড়াশোনার জন্যে। এই লম্ফর আলোয় আমি রাত্তিরে নিজের পড়া তৈরি করতাম। মামাবাড়ির আদ্ধেকটা জুড়ে থাকত মানুষ, বাকি আদ্ধেকটায় থাকত গরু-মহিষ। মানুষদের ভাগে একখানা বেতের বেড়া বুনে লাগানো হয় মাঝামাঝি। তার একদিকে ছিল উনুন আর বাকি জিনিসপত্র, আরেকদিকে ছিল ধানপেষা চাল রাখার পাত্র, জাঁতা, হামানদিস্থা এবং আরও নানান কিছু। এই দ্বিতীয় অংশেই আমার বই রাখার একটা কাঠের বাক্স ছিল, যার কাছেই এক কোণে রাখা থাকত দুধেল গাই ও অন্যান্য পশুদের জন্যে আনা তাজা ঘাসের গাদা। আমি সেখানেই বসতাম, লম্ফের আলোয় পড়তাম, রাত বাড়লে সেখানেই ঘুমে ঢলে পড়তাম। ভোরবেলা, চারটে নাগাদ মোরগের ডাকে, সব বাড়ির বৌয়েরা জেগে উঠেই আটা-ময়দা পিষতে বসে যেত আর জাঁতাকলের সামনে বসে যূথবদ্ধভাবে এক সুরে গান গাইত। এই সময়ে আমার ঘুম ভাঙত। তারপর উঠেই লম্ফ জ্বালিয়ে, নিজের পড়াশোনা করতে বসে পড়তাম। সকালে আটটা-নটা নাগাদ স্কুলের জন্যে সেই যে রওনা দিতাম, লাড়াওয়ালির ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত্তির সাতটা-আটটা, কখনও নটা বেজে যেত। কারণ স্কুলের বাইরেও গুচ্ছের কজে নিজে জড়িয়ে পড়েছিলাম। যবে থেকে স্কুলে যাওয়া শুরু করি, হপ্তা শেষে প্রতি শনিবার দাশগাঁও যেতাম আর সোমবারে সেইখান থেকেই মাহাদে স্কুলে বেড়িয়ে পড়তাম। এই রুটিনেই আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।
বাস্তবে, আমার মা, বোনেরা যখন সবাই লাড়াওয়ালিতে থাকছে, তখন আমার ফি শনিবারে দাশগাঁওতে যাবার কী এমন প্রয়োজন ছিল? আমার মা এ-নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু দাশগাঁওয়ের বড়বাড়ির লোকেরা আমাকে স্নেহভরে ডাকত, আর আমিও কুণ্ঠার সাথেই ওদের কথার খেলাপ করতাম না। পরে যখন আমি মাসে ৫ টাকা করে স্কলারশিপ পেতে শুরু করি, সেই টাকাটা ওদের কাছেই যেত। ওরা বলত, “এ তো আমাদের ভাইব্যাটা। ওর টাকার উপরে আমাদেরই হক বর্তায়।” ফলে, আমার থাকাখাওয়ার খরচা বইছিল আমার মামা, আর আমার প্রাপ্য টাকা নিয়ে নিচ্ছিল আমার জ্যাঠতুতো দাদারা। এই অদ্ভুত পরিস্থিতির বদল আনতে আমি আর মা একবার দাশগাঁওতে আমাদের ঘরে থাকতে গেলাম। তারপরেও অবস্থা বদলালো না। পরিবর্তে, মায়ের সঙ্গে এমন ঝগড়া বাঁধাল যে মায়ের পক্ষে ওখানে থাকাটাই দুষ্কর হয়ে পড়ল। আমরা বাড়ি তালাবন্ধ করে লাড়াওয়ালিতে ফিরেই থাকতে শুরু করলাম।
আমি ক্লাসের উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন ছিলাম। ফলে কিছু শিক্ষক আমার প্রশংসার পাশাপাশি আমার সহপাঠীদের তাচ্ছিল্য করত। বার্ষিক পরীক্ষায় আমি সব বিষয়েই ভালো নাম্বার পেয়ে পাশ করি। কিন্তু আঁকা আর শারীরশিক্ষায় ওরা আমার শংসাপত্রে পাশ করেছি লিখে দিলেও তা ছিল সর্বৈব মিথ্যা। কারণ স্কুল সারাবছর আমাকে এই বিষয়ের ক্লাসগুলিতে বসতেই দেয়নি, অথচ বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বেরনোর সময় ওরা দেখিয়ে দিল যে আমি পাশ করেছি। অস্প্রৃশ্যতার চর্চাও চালিয়ে যাব, অথচ দুনিয়াকে দেখাব যে এইসব পালন করি না। সরস্বতীর আপন মন্দিরেই যদি এ-ধরনের শঠতা চলে তবে বাকি জায়গায় কী ঘটে তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। মাহাদের স্কুলে আমি দ্বিতীয় ইংরেজি স্ট্যান্ডার্ড আর মারাঠিতে ষষ্ঠ স্ট্যান্ডার্ড পাশ করলাম তখন। তারপর তৃতীয় স্ট্যান্ডার্ডের জন্যে পড়া চালু করলাম। স্কুল আমাকে জানাল যে তারপর থেকে আমি স্কলারশিপের টাকা আর পাব না। ত্রিবর্ষীয় স্কলারশিপের প্রতিশ্রুতির কী ঘটল? সম্ভবত আমি স্কুলে ভর্তি হবার আগে যে বছরটা নষ্ট হয়েছিল ওরা তৃতীয় বছর হিসাবে সেটাকেই হিসাব করে নিয়েছে। আমি যখন স্কুলে যাচ্ছিলাম, আমার পোশাক, বইপত্রের জন্যে যা খরচা হত তা স্কলারশিপের টাকা থেকেই কেটে নেওয়া হত। কিন্তু আমার স্কলারশিপ বন্ধ হয়ে গেলে কে এই খরচাটা বহন করবে সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আমার দাশগাঁওয়ের পরিজনদের স্কলারশিপের টাকা নিতে হাত কাঁপেনি, কিন্তু এই বেলা তারা গাঁইগুঁই শুরু করে আর আমার মামা এমনিতেই টানাটানির সংসারে আমাদের খোরাকি জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছিল।
এমতাবস্থায়, মা বলল, যাই হয়ে যাক, আমাদের দাশগাঁওতে নিজেদের বাড়িতেই থাকতে হবে এখন থেকে। ফলে একদিন দিদা, মামাকে বিদায় জানিয়ে দাশগাঁওতে পাকাপাকি থাকবার সঙ্কল্প করেই আমরা বেরিয়ে পড়ি। মামা কয়েকদিন চলবার মতন চালডাল পুঁটুলি বেঁধে সঙ্গে দিয়েছিল। পরেও মাঝেমধ্যেই দানাপানি আমাদের জন্যে পাঠাত। এই সময় আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মে মাসের ছুটি কাটিয়ে বইপত্তর কিনে আমি স্কুলে যাব ঠিক করেছিলাম। আমার বাবা-মাকে কখনও বাড়ির বাইরে কাজ করতে যেতে দেয়নি। গেরস্থালির যাবতীয় কাজ মা করত, কিন্তু ক্ষেতের কাজ ছিল মায়ের অজানা। কিন্তু দাশগাঁওতে ফেরত আসবার পর থেকে মা বাইরে যেত জ্বালানি কাঠ কুড়োতে, সেগুলো ছোটো ছোটো টুকরো করে কেটে শুকনো আঁশ দিয়ে বেঁধে ঘরে নিয়ে আসত। সবশেষে ছোটো ছোটো গাঁঠ বেঁধে নিজের গ্রামে বা পাশের গ্রামে গিয়ে সেগুলি বেচত, বিনিময়ে কোনোদিন খাবার মিলত, কোনোদিন মিলত পয়সা। দাশগাঁওয়ের অগুন্তি গরিবের গ্রাসাচ্ছদনের জন্যে এই ছিল জীবিকা। দাশগাঁওয়ের অরণ্য ওদের কাছে জীবনধারণ ও ভরণপোষণের একমাত্র মাধ্যম ছিল। আমিও অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে লকড়ি কুড়াতে যেতাম। একবার এরকম জঙ্গলে গিয়েছি, তখন এক বনপুলিশ এসে আমার বয়সী তিনটে বাচ্চা আর এক জোয়ান মদ্দকে পাকড়াও করে তাদের কাস্তে বাজেয়াপ্ত করে আর পুলিশ চৌকিতে নিয়ে যায়। ফলে ওঁর সঙ্গে শুরুতে তর্কাতর্কি, পরে ধ্বস্তাধস্তি হয়। বনপুলিশের মাথায় চোট লেগে যায়। আমরা কাস্তে হাতে নিয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরে যাই। আমাদের বিরুদ্ধে মামলেদার (ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে একখানা মামলা দায়ের হয়। আমাদের শমন পাঠানো হয় আর বিচারের কাজ শুরু হয়। সাথেহ নামের এক উকিল আমরা যারা অভিযুক্ত তাদের হয়ে ওকালতি করতে রাজি হয়। তিন-চার মাস পরে রায় বেরলো। পয়লা নাম্বার অভিযুক্ত অর্থাৎ ভাগ্য সখ্য মাহার নামের যে প্রাপ্তবয়স্ক লোক আমাদের সঙ্গে ছিল তার ১৫ দিনের কঠোর কারাবাসের শাস্তি হয়। আমাদের বাকিদের হয় ২ টাকা করে জরিমানা নতুবা এক হপ্তা করে কারাবাস ভোগ করার শাস্তি ঘোষণা হয়। আমরা সকলেই ২ টাকা করে জরিমানা দিয়ে রেহাই পাই। এটি আমার প্রথম শাস্তিলাভ। তখন আমার বয়স পনেরো বছরও পেরোয়নি। এটা বলা হত কেউ কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সরকারি চাকরি আর পাবে না। ফলে আমার মা আর বাড়ির লোকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ওরা ভয় পায়, এতদূর পড়াশোনা করবার পরে সবটাই জলে না-চলে যায়!
আমি যখন স্কুল ছেড়ে দাশগাঁওতে থাকা শুরু করি, লকড়ি কুড়িয়ে, বড়বাড়ির ফাইফরমাশ খেটে যখন দিন গুজরান হচ্ছে, তখন বোম্বে থেকে বড়বাড়িতে এক অতিথি এলো। উনি জিগ্যেস করেন আমি কদ্দূর পড়েছি, কী করছি ও আরও নানান খুঁটিনাটি তথ্য। তারপরে উনি আমার চার জ্যাঠতুতো দাদাকে জানান যে রামচন্দ্র অর্থাৎ আমাকে যদি বোম্বেতে ওঁর সঙ্গে পাঠানো সম্ভব হয়, তবে উনি টিকিট কালেক্টর হিসাবে ৪৫ টাকা মাসমাহিনার এক চাকরি জুটিয়ে দিতে পারবেন আমায়। সেই সময়ে আমার সকল দাদাই মাহার স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করে মাস গেলে এগারো টাকা করে কামাচ্ছিল। ওরা হিসাব করে দেখল : চার ভাই মিলে যেখানে মোট চুয়াল্লিশ টাকা উপার্জন করছে, সেখানে রামচন্দ্র একাই তার থেকেও এক টাকা বেশি উপার্জন করবে! ফলে ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে বোম্বেতে আমাকে কালেক্টর করতে পাঠাবে।
এই সময়েই, ওরা ঠিক করল যে আমার বিয়ে দেবে। ওরা বলল, “আমরা চার ভাই সবসময় এক জায়গায় থাকি না, এখন আছি যখন তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা জরুরি।” ওরা বহু কিছু আলোচনা করল- কে বাড়ি, ক্ষেতজমির দেখ-ভাল করবে, কীভাবে গৃহঋণের কিস্তি ধীরে ধীরে মেটানো হবে, কাকে এই বছর বিয়ে দেওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বড়দার এক মেয়ে ছিল যার তখন বিয়ের বয়স হয়েছে। ছাঙদেব খোপাড়কার নামের বোম্বে নিবাসী এক কেরানি ওর পাণিপ্রার্থী ছিল। এই ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত গোপাল বাবা ওয়ালাঙ্কারের শ্যালক। উনি রাওধালে এসেছেন বিয়ে করবার জন্যে। মেয়েটির সঙ্গে ওঁর বিয়ের কথা পাকা হয়ে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। পাশাপাশি, সেই বছরেই আমায় বিয়ে দেবার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। কিন্তু পাত্রী কই? “জ্ঞাতিগুষ্ঠির বাইরের মেয়ে পেলে ঘরের ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার থাকবে না। কিন্তু রামচন্দ্র তো সেই ছেলে যে ভালো অর্থ উপার্জন করবে। ফলে নিজেদের পরিবারের মধ্যেই কাউকে খুঁজতে হবে যার সঙ্গে ওর বিয়ে দেওয়া যায়।” যার মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে সেই পরিবার আমার উপার্জনের ভাগ পাবে। ফলে এই নিয়ে দাদাদের মধ্যেই বাগবিতণ্ডা হয়ে গেল বিস্তর। শেষমেশ ওরা ঠিক করল তুকারামদাদার মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। ফলে ঠিক করে নিল ওরা যে একই দিনে একই মণ্ডপে পরিবারের তিনজনের বিয়ে হবে। বড়বাড়ির লায়েক এই প্রথম কোনো বিয়েবাড়ি হতে চলেছে যেখানে চার ভাই-ই উপস্থিত। আমি বা আমার মা কেউই আমার বিয়ের খবর পেয়ে উৎসাহিত ছিলাম না। আমার মন বিষণ্ণ ছিল কারণ অর্থাভাবে আমাকে স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছে। আর মা সবসময়েই রোজকার দুর্বিসহ বৈধব্যযন্ত্রণায় ক্লিষ্ট থাকত। আমার বিয়ে এইরকম এক পরিস্থিতিতে চলেছিল। “ঠিক আছে। তাই হোক।”- এর বাইরে আমরা আর কী-ই বা বলতে পারতাম?
বড়বাড়ির কেউ যদি মাকে কখনও আমার বিয়ে নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু বলত, মা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিত, “আমার ছেলে এখনও বিয়ের বয়সে পৌঁছায়নি। তোমরা ওর বিয়ের ইন্তেজাম করতে না-চাইলে না-করবে, কিন্তু আমার সামনে নিজেদের উদারতার দেখনদারি করতে এসো না।” আমার মা আলবাত নিজের একমাত্র ছেলের চাকরি আর বিয়ের খবরে খুশিই ছিল। সে জানত আমার আগে পরে কেউ নেই, অন্তত দেখবার মতো একজন মানুষ হবে এখন। আর আমিই বা নিজের বিয়ের খবরে তুষ্ট হব না কেন? বলতে গেলে, আমার মা আর আমি দুইজনেই আমার বিয়েতে নারাজ ছিলাম না, বিশেষত যখন ঠিকঠাক একখানা সম্বন্ধ পাওয়া গেল। আমরা আসলেই আনন্দে ছিলাম যে এই বিয়েটা হতে চলেছে। যার মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হতে চলেছে তিনি আমার বাবার গুণগ্রাহী ছিলেন। নিজের সৎমাকৃত দুর্ব্যবহারের থেকে তাকে রক্ষা করতে আমার বাবা আন্তরিক চেষ্টা করেছেন। ফলে উনি বাবার প্রতি উনি ছিলেন চিরকৃতজ্ঞ। উনি নিজেকে ধন্য মনে করছিলেন এটা ভেবে যে ওঁর মেয়ের বিয়ে এমন একজনের সঙ্গে যার বাবাকে উনি বড়দা ডেকেছেন। যেহেতু এক পুরোনো ক্ষীণ হতে চলা সম্পর্কে এই বিয়ের মাধ্যমে ফের নবপ্রাণ সঞ্চারিত হবে, তাই বেশ কিছু আচারবিধি এই বিয়ের জন্যে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। পুরোনো রীতি অনুযায়ী, বর ও বৌ দুইজনকেই তাদের বাবা-মা উভয় পরিবারের দিক থেকেই ভিন্ন গোত্রের হতে হবে। এই ক্ষেত্রে, মায়ের দিক থেকে বর-বৌ দুইজন সমগোত্রের হলেও, তা বিয়ের পথে বাধা হয়নি। গাঁয়ের কথ্য ভাষায় বলতে গেলে পাত্রপাত্রী উভয়েরই একই কোঠালি তথা গর্ত, যদিও বীজ আলাদা।
আমার বিয়ের সময়, সীতা মানে কনেবৌয়ের বয়স মাত্র ছয়-সাত বচ্ছর হবে। দুধের দাঁত ভাঙছে তখন সবে। আমার যদিও আক্কেল দাঁত গজিয়েছে তদ্দিনে। বাড়ির গুরুজনেরা আমায় কাছে-দূরের নানা গ্রামে আমাদের আত্মীয়দের নিকট বিয়ের নেমতন্ন করতে পাঠাত। তা ছাড়াও বিয়ের প্রস্তুতিতে এটা সেটা জোগাড়যন্তরের কাজও আমায় করতে হত। এইসব দেখে, বাড়ির কিছু বরিষ্ঠজনের মরমে লাগে। তারা আড়ালে বলত, ‘আহারে! বেচারা অনাথ ছেলেটার বিয়ে হচ্ছে।’ আমাদের বিয়েটা যদিও ধুমধাম করেই হল। সত্যি বলতে গেলে, এ-যেন ছিল ঠিক পুতুলদের বিয়ে দেবার মতন। সেই আমলে, কোলের বাচ্চাকেও দোলনায় রেখে বিয়ে দেবার চল ছিল। আমাদের বিয়েখানা তো ছিল একই পরিবারের দুইজনের মধ্যে। আমার পরিবারে বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যেও আমিই ছিলাম একরকমের বয়োজ্যেষ্ঠ। সকলেই আমায় তাই দাদা বা বড়দা বলে ডাকত। এমনকি আমার বিয়ে করা বৌটিও বয়ঃসন্ধিকাল অবধি আমাকে দাদা বলেই ডাকত। পাত্রীর পাত্রকে দেখে শরমের বালাই ছিল না। আমার বিয়ের দিন থেকে আজ অবধি আমরা একে অপরকে সমান চোখে দেখি। অন্য দম্পত্তিদের কাছে এই ক্ষেত্রে আমরা নিশ্চিত অনুসরণযোগ্য।
অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ১৩-এপ্রিল-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
