সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গণসংগীতের বাণী ও সুরারোপ
সলিল চৌধুরী
যেহেতু আমি গণআন্দোলন করি, যেহেতু আমি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য বা ঘনিষ্ঠ, আমি সমস্ত আন্দোলনে আছি, তার মানে এটা কখনোই নয় যে আমি গণসংগীত রচনা করতে পারব। কাজেই প্রথমে ভাবাদর্শগত দিকে সবথেকে বেশি জোর দিয়েও আমি এ কথা বলব যে ভাবাদর্শগত দিকে দক্ষতাই শেষ কথা নয়, গণসংগীত রচনার ক্ষেত্রে আমাদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যা কিছু progress হচ্ছে তার সম্বন্ধে আমাদের young composer সুরকার যাঁরা আছেন তাঁদের অবহিত হতে হবে।

প্রথম কথা, প্রত্যক্ষভাবে যাঁরা গণআন্দোলনে জড়িত নন, গণআন্দোলনকে যাঁরা নিজের করে নিতে পারেননি, তাঁদের কাছে গণসংগীত তাত্ত্বিক কচকচি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায় বিভিন্ন গণআন্দোলনে শরিক হিসেবে যে শিল্পীরা কাজ করেন তাঁদের গলায় যে সংগীত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসে তা লোকসংগীতের আঙ্গিকে হোক, আধুনিক সংগীতের আঙ্গিকে হোক, পাশ্চাত্য প্রভাবিত সংগীতের আঙ্গিকে হোক, তার বক্তব্যে, তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সংগ্রামের (যে সংগ্রাম তিনি করছেন) ছবি ফুটে ওঠে। প্রথম কথা হচ্ছে গণসংগীত যাঁরা করবেন, তাঁদের কি সংগীত জানা দরকার? নাকি আন্দোলনের সঙ্গে থাকলেই তাঁরা গণসংগীত সৃষ্টি করতে পারবেন? এটা আমি এই জন্যই বলছি যে ভাবাদর্শগত দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে অর্থাৎ গণ আন্দোলনের শরিক যে শিল্পী সে যখন সেই গণআন্দোলনের কথা বলতে পারে, বলতে চায়, তখন তার হাতে যদি তার আঙ্গিকের দক্ষতা থাকে, সুর প্রয়োগের দক্ষতা থাকে, শব্দচয়নের দক্ষতা থাকে, তা হলে যে গণসংগীত হয়- তা উতরে যায়। যুগ যুগ ধরে সে গণসংগীত মানুষের সংগ্রামের সাথি হিসেবে থাকে এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করে এবং সেটা ফুরোয় না। যদিও একটি বিশেষ আন্দোলন নিয়ে একটি গণসংগীতের শুরু হয়, (আমাদের কাছে এমন কিছু নজির আছে। হয়তো শ্রমিক শ্রেণির একটি সংগ্রাম বা কৃষকের একটি সংগ্রাম বা ছাত্রদের কোনো একটি সংগ্রাম বা শহিদ যাঁরা হয়েছেন তাঁদের উপরে একটি গণসংগীত রচিত হয়েছে) স্থান কাল পাত্রকে ছাড়িয়ে মানুষের কাছে তার উপস্থিতিটা এমন একটা জায়গায় পৌঁছায় যে প্রতি মুহূর্তে তার সংগ্রামের সাথি হিসেবে কাজ করে, তাকে প্রেরণা জোগায়। এই যে রসোত্তীর্ণ ব্যাপারটা, এটা তখনই ঘটে যখন শিল্পী যে গানটি রচনা করেন তার আবেগ, তার কথা এবং সুর তিনটে ওতপ্রোতভাবে মিলে যায়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যে, Content Form-কে Change করে একটা Accepted Form বলে কিছু থাকে না- যদি content-এর তাগিদ থাকে তা হলে সে form ভেঙে যায় ও নতুন form-এর জন্ম হয়। আমরা আমাদের বহু গানে দেখেছি এটা ঘটেছে এবং তা সাধারণ মানুষের কাছে Accepted হয়েছে, যদিও এটা কোনো প্রচলিত লোকসংগীতের form নয়। আমি আমার সামনে immediately অন্য কোনো উদাহরণ নেই বলে একটা দুটো আমারই গানের উল্লেখ করছি। যেমন ধরুন অবাক পৃথিবীর দ্বিতীয় পর্ব। 'বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে...' এটা আমাদের কোনো accepted form নয়। যেখানে minor chord দিয়ে শুরু হয়ে পরে major chord যাচ্ছে সেখানে basically এটা এখন hermonik ভিত্তি প্রধান গান কিংবা 'আমাদের নানান মতে নানান দলে দলাদলি...' যখন প্রশ্ন আসে ধ্বংস কি সৃষ্টি- এখানে completely modulation হয়ে chord change করে যাচ্ছে- এর তাত্ত্বিক দিক যদি দেখতে হয়, এব technical aspect যদি analysis করতে হয়- musically, তা হলে অনেক জটিল প্রশ্ন এসে যাবে যে, কী করে mediant-কে সুর করে relative minor থেকে relative mejor chord-এ যাওয়া হয়েছে এবং তার variation করা হয়েছে। সেগুলি আলোচনা না করে আমি বলতে পারি না যে সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে তার আকুতি, উদ্বেগটা পৌঁছোচ্ছে কি না। যদি সেটা পৌঁছোয় তবে সেটা গান হতে পারে। ভাবগত, আদর্শগত দিকের প্রথম কথা তো নিশ্চয়ই থাকবে। যে গণআন্দোলনের শরিক, গণআন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে মানুষ, সে যেভাবে এর অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারবে খুব বড়ো সংগীতজ্ঞ পণ্ডিতও সেটা করতে পারবেন না। আমরা জানি যে এভাবে বহু অমর গান রচিত হয়েছে। তাঁরা গান রচনা করেছেন আবেগ দিয়ে যে আবেগ তার সংগ্রামের আবেগ। আমি ব্যক্তিগতভাবে যে কথাটা স্বীকার করছি- এককালে আমি, (আমাদের পুরোনো কমরেডরা জানেন) প্রত্যক্ষভাবে গণআন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকে, কৃষক আন্দোলনে বিশেষ করে তার সঙ্গে জড়িত থেকে দিনের পর দিন গান রচনা করেছি এবং ছাত্র আন্দোলন এবং সাধারণ কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যে সমস্ত গান তখনকার দিনে রচনা করেছি সেগুলো বৈঠকখানায় বসে নয়, আন্দোলনের মাঠে জন্ম নিয়েছে। আজকে আমার সে অবস্থা নেই। ইতিহাসের পরিহাস বলুন আর যাই বলুন, যে মাটিতে দাঁড়িয়ে তখনকার দিনের গণসংগীতগুলো তৈরি হয়েছিল, যে মাটিতে আমার পা ছিল আজকের আমি গর্ব করে বলতে পারব না আমার পা সেই মাটিতে আছে, যেটা আপনাদের অনেকের আছে। আপনাদের কাছে আমার শিক্ষার অনেক কিছু আছে। কিন্তু একটা কথা বলব শুধু স্লোগান দিয়ে মানুষের মন জয় করা যাবে না। আপনাদের আজকের দিনে যাঁরা গীতিকার ও সুরকার তাঁদেরও শিখতে হবে। আজকের বুর্জোয়ারা যে গানগুলো তৈরি করছে- টিভি-তে বলুন, রেকর্ড-এ বলুন, ক্যাসেটে বলুন, যেসব অসাধারণ অর্কেস্ট্রেশন, অসাধারণ রেকর্ডিং, অসাধারণ পারফেকশন দিয়ে যেসব পচা জিনিস ওরা প্রচার করছে তার জৌলুসে, তার আঙ্গিকের চমৎকারিত্বে তা যুবমানসকে আপ্লুত করছে। তার বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে গেলে শুধু একটা একতারা নিয়ে বা একটা হার্মোনিয়াম নিয়ে চলবে না। নিশ্চয়ই সেটা আমরা গাইব, মাঠে ময়দানে সেরকম দরকার হলে, কিন্তু আমাদেরও ওই টেকনিক আয়ত্ত করতে হবে, তা না হলে আমরা পারব না। এটা আমার বিশেষ অনুরোধ, বিশেষ করে যারা সুরকার তাদের কাছে, এই টেকনিককে যদি আমরা আয়ত্ত করতে না পারি ওদের সঙ্গে আমরা পাল্লা দিতে পারব না। ওরা যদি মেশিনগান চালায় আমরা তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে পারব না। অস্ত্রাগার যেটা ওদের হাতে রয়েছে সেই অস্ত্রাগারের অধিকাংশ অস্ত্র আমারও দরকার। I want to be a fantastic pianist, I want to be fantastic violin player, যেমন তবলা প্লেয়ার, সেতার প্লেয়ার, সরোদ প্লেয়ার- আমার যদি এই দক্ষতাগুলো না জন্মায় যেমন সুর অ্যারেঞ্জ করা, তাতে নতুন ডাইমেনশন নিয়ে আসা, তাতে নতুন কথাকে নতুন আবেগ নিয়ে বলা ইত্যাদি। এ ক্ষমতা অর্জন করতে গেলে আমাদের শিখতে হবে, খাটতে হবে। যেহেতু আমি গণআন্দোলন করি, যেহেতু আমি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য বা ঘনিষ্ঠ, আমি সমস্ত আন্দোলনে আছি, তার মানে এটা কখনোই নয় যে আমি গণসংগীত রচনা করতে পারব। কাজেই প্রথমে ভাবাদর্শগত দিকে সবথেকে বেশি জোর দিয়েও আমি এ কথা বলব যে ভাবাদর্শগত দিকে দক্ষতাই শেষ কথা নয়, গণসংগীত রচনার ক্ষেত্রে আমাদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যা কিছু progress হচ্ছে তার সম্বন্ধে আমাদের young composer সুরকার যাঁরা আছেন তাঁদের অবহিত হতে হবে।
কোনো বিশেষ একটা গণসংগীতে সুর দিতে গেলে তা কীভাবে করতে হবে সেটাই আমাদের আলোচনার বিষয়। অর্থাৎ ধরে নিতে হবে যে গীতটি পূর্ব-রচিত, তাতে সুর দিতে হবে। প্রথমে স্বভাবতই দেখতে হবে গানের কথা কী-জাতীয়। তা কি গ্রামীণ লোকগীতির ছাঁদে লেখা না ছন্দোবদ্ধ পদ্ধতিতে রচিত কিংবা আধুনিক স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে লেখা। দ্বিতীয়ত, দেখতে হবে তার মধ্যে দিয়ে কোনো জাতীয় ভাব প্রকট হচ্ছে বা প্রকাশ পাচ্ছে। তা কি বিদ্রূপাত্মক, না বীররসাত্মক, না কি বিশেষ কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ করে শ্রোতাকে সচেতন করার জন্য রচিত। যেটা স্বভাবত তার পরে বিবেচ্য হবে, যে,(যেটা আরো বেশি দরকার) শ্রোতা কারা। অবশ্য যিনি গীতরচনা করেছেন তাঁর চিন্তাধারায় এটি প্রকট থাকতেই হবে। নয়তো তিনি গীতরচনা করতে পারেননি, করতে পারেন না। কাজেই সেই ভিত্তি ধরেই সুরকারকে এগোতে হবে। চতুর্থত, এবং সবচেয়ে জরুরি হল শ্রোতার সঙ্গে সহমর্মিতা অর্জন করা। অর্থাৎ communication। শ্রোতা কারা আমরা যদি জানতে পারি তবে কোন আঙ্গিকে, কোন বিশেষ ভঙ্গিতে একটা গানে সুর করতে পারলে সেই শ্রোতার কাছে পৌঁছোতে পারব সেটা ভাবা যেতে পারে। এ ছাড়া আর একটা ব্যাপার আছে- সর্বজনীন একটা সুর, সর্বজনগ্রাহ্য একটা আঙ্গিক যেটা (আমরা দেখতে পাই) কৃষকের কাছে, মধ্যবিত্ত, মজুর এবং বুদ্ধিজীবী সকলের কাছেই আবেদন সমানভাবে পৌঁছে দেয়। এমনও ঘটেছে, ঘটছে।
‘অবাক পৃথিবী’ সুর করতে গিয়ে সুরকার হিসেবে আমার যেটা ভাবনা হয়েছে সেটা আজকের দিনের যুব সুরকারদের হয়তো কাজে লাগবে। সেটা হচ্ছে আমি কবিতাটাকে অন্তত একশোবার আবৃত্তি করেছি। আমার প্রচেষ্টা ছিল আবৃত্তির যা সুর এবং গানের যা সুর তার মাঝখানে যে margin or borderline সেটা কত পাতলা হতে পারে অর্থাৎ আবৃত্তির সুর থেকে গানের সুরে যে মাইগ্রেশন সেটা কত জার্ক ছাড়া হতে পারে, সেটার কত হ্রাস করা যেতে পারে। অর্থাৎ directly যে কথাটা আমি আপনাদের সামনে বলতে চাইছি একটা কবিতা আবৃত্তির সঙ্গে তার সুরের তফাতটা যাতে খুব বেশি না হয়। কিন্তু ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে... এটাকে সুর করতে আমায় প্রচণ্ড হোঁচট খেতে হয়েছে। এইজন্য যে চতুর্দিকে বিদ্রোহের যে আভাস সেটা কোন harmony-র মধ্যে, কি chord-এর মধ্যে ধরলে পারা যাবে। সেখানে আমাকে ভাবতে হয়েছে যে প্রচলিত সুর এতে প্রয়োগ করা যাবে না। তার কারণ যখনই আমি জানব যে অস্থায়ীর পরে অন্তরা কী তখনই আমার surprise চলে যাবে এবং সংগীতে Surprise is a very vital thing- অর্থাৎ আমি অস্থায়ীর পরে অন্তরায় কী যাব, সঞ্চারী আভোগে কী যাব এটা আমি যতক্ষণ না গাইব ততক্ষণ আপনি বলতে পারবেন না। কিন্তু যখন গাওয়া হবে তখন মনে হবে বাঃ এটা তো ভালো। এই যে প্রচেষ্টাটা সেটা কিন্তু ভাবতে হবে। আমাদের মার্গ সংগীতে অস্থায়ী অন্তরায় একটি বিশেষ রাগের ক্ষেত্রে, বাঁধা পরদার মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সেটা খারাপ আমি বলছি না। আমরা যখন গেমস খেলি, ধরুন ফুটবল খেলি, আমরা কতগুলো নিয়ম মেনেই খেলি। হাতে বল লাগলে হ্যান্ড বল হয়, বাইরে গেলে থ্রো, পেনাল্টি এরিয়ার মধ্যে ফাউল করলে পেনাল্টি, এগুলো মেনে নিয়েই আমরা খেলি। এগুলো মেনে নিয়ে খেলার মধ্যেও ‘পেলে’-র মতো খেলোয়াড় জন্মায়। তেমনি মার্গ সংগীতের বাঁধাধরা নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে বিশাল বিশাল প্রতিভা তার মধ্যে নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। সেটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু যখনই accepted কোনো একটা রাগের পরদার মধ্য দিয়ে আমি একটা নতুন কথায় সুর করতে যাচ্ছি তখনই একটা precondition created হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমি অস্থায়ী থেকে অন্তরায় যাব কোথায়, আমি গাইবার আগে আপনি মনে গুনগুন করবেন। কিন্তু কিছু কিছু গানে চমক দরকার হয়। অর্থাৎ মাইনর কর্ড থেকে মেজর কর্ড-এ- অর্থাৎ প্রথমে সারে জ্ঞা পা ধা পা মা জ্ঞারে ণ সা- ইত্যাদি পরদা দিয়ে ‘বিদ্রোহ আজ’ গেছে, কিন্তু পরে ‘আমি যাই তার দিন পঞ্জিকা লিখে’ এখানে গা দিয়ে যাচ্ছে।... তো এর মধ্যে আমরা সেই চমকটা সৃষ্টি করতে পারছি যেটা কবিতার মধ্যে আছে। এরপর ‘দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ’ এখানে এই যে স্ক্যানিং এই যে ছন্দ ভাঙা, কবিতাতে তা নেই। কিন্তু সুর করতে গিয়ে এই প্রয়োগগুলো দরকার হয় বৈচিত্র্য আনার জন্য। এখন ‘প্রত্যহ যাঁরা...’ এখানে যেটা কয়্যার ফর্মের মতো আসছে, যেন বহুলোক একসঙ্গে গাইছে। এরপর ‘তাই তো চলেছি পঞ্জিকা লিখে...’-এখানে আমরা আবার ফিরে এলাম মাইনর কর্ডে। সুরকার হিসেবে গানকে analyse করে, কী করে সুর সৃষ্টি করতে হয় তার একটা উদাহরণ রাখছি। এটাই last word নয়। এর চেয়েও ভালো হয়তো এতে সুর করা যেতে পারে। কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয়, কথা হচ্ছে এটা একটা প্রক্রিয়া।
তেমনি ‘রানার’ গানে এই যে রানারের যাত্রা সেখানে সে বিভিন্ন মাঠ, ঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে যাত্রা করে কোনো সময়েই তার প্রথম জায়গায় ফিরে আসছে না। যেখান থেকে start করল সেখান থেকে বেরিয়ে সে চলেছে। কিন্তু কখনোই মুখড়ায় ফিরছে না। আমরা যেটা করি-সাধারণত গানে অস্থায়ী থাকে, অন্তরা থাকে, সঞ্চারী থাকে, আবার আমরা অস্থায়ীতে ফিরে আর কি সাধারণত গানে অস্থায়ী কবিতা যেখানে অস্থায়ীতে ফিরবার কোনো সুযোগই নেই। কারণ রানার যে একবার ছুটে বেরিয়ে গেল সে তো আর তার আরম্ভের প্রথম খুঁটিতে ফিরছে না। অনন্ত তার যাত্রা। এই যাত্রাকে লক্ষ করতে গিয়ে এই কবিতাটিও আমার বোধহয় এক মাস লেগেছিল সুর করতে। কবিতার মানে কিছু কিছু ধরছি, কিছু কিছু ধরতে পারছি না। এখানে ব্যাপারটা যেটা হয়েছে রচনাটিকে আমি হাজার বার উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি, ধরবার চেষ্টা করেছি ভিতরে। একটা ‘সা’ থেকে আরম্ভ করে রানার-এ ছবার ষড়জ পরিবর্তন আছে। অর্থাৎ ‘সা’-টা বদলে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও উপলব্ধি করা যায় না, কানে ধরা যায় না। একবার কোমল ‘রে’ টা সা হয়ে যাচ্ছে, একবার মধ্যম ‘সা’ হয়ে যাচ্ছে, একবার কোমল ‘নি’ সা হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে ‘সা’ পরিবর্তন করতে করতে বিভিন্ন গন্তব্যের জায়গা বদলাতে বদলাতে রানার গিয়ে তার destination-এ পৌঁছাচ্ছে। পালকির গানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছে। যেখানে থেকে আরম্ভ করল পালকি কাঁধে নিয়ে, সে তো আর সে জায়গায় ফিরল না। সে সেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত নতুন একটা দিগন্তে পৌঁছাল। এখন এই যে একটা Given piece of lyric-কে tune up করার ব্যাপারটা সেটা-(এগুলো আমি নিজে সুরকার হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা) আমাদের যাঁরা যুব সুরকার আছেন তাঁদের সামনে ব্যক্ত করছি। কারণ এভাবে ব্যক্ত করার সুযোগ ইতিপূর্বে জীবনে কোনোদিন হয়নি। আজ সে সুযোগ গণনাট্য দিয়েছে বলে আমি আপনাদের সামনে বলতে পারছি। ‘রানার’ সুর করতে গিয়ে, যেমন ধরুন ‘দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে’- এই যে একটা দিগন্ত আর একটা দিগন্ত। একটা মেজর কর্ড-এর দিগন্ত, একটা মাইনর কর্ড-এর দিগন্ত, ‘এই দিগন্ত থেকে দিগন্তে’ছবিটা এইভাবে সুরে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ‘আরো পথ, আরো পথ বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ’-এখানে ভোরের ভাবটার জন্য কিছুটা ‘ভায়রোঁ’ বা ‘কোমল রেখাব’ ইত্যাদি লাগিয়েছি। কিন্তু যেখানে শুদ্ধ নিষাদ এসে ফের ‘কোমল নিষাদ’ দিয়ে যাচ্ছে সেখানে কিছুটা মার্গ সংগীতের ধাঁচ দিচ্ছে। এখানে ‘রানার চলেছে বুঝি ভোর হয় হয়... দুর্বার দুজয়’ এর অবধি। কিন্তু ‘তার জীবনের স্বপ্নের মতো’ এখানে ধাঁচটা ভেঙে গেল। তারপরে-
অবাক রাতের তারারা আকাশে মিটিমিটি করে চায় কেমন করে রানার সবেগে হরিণের মতো ধায়...
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে
এখানে ‘মা’-টা-‘সা’ হয়ে যাচ্ছে ‘সা’ বদলে গেছে। এই যে একটার পরে একটা নতুন জায়গায় যেতে গিয়ে ‘ষড় পরিবর্তন যেটা ঘটছে তাকে ইংরাজিতে বলে Tonic Change- সেই ব্যাপারটা ঘটছে। এরপরে দেখুন-
কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে
জোনাকিরা দেয় আলো
-এই আলো এটা কোমল নি। অর্থাৎ আমি ‘বি ফ্ল্যাট’ করেছিলাম বলে ‘এ ফ্ল্যাট মাইনর-১’ হয়ে গেল।
এরপর ‘রানার রানার এ বোঝা টানার’ এখানে কোমল ‘ধা’ টা ‘সা’হয়ে গেল। অর্থাৎ এফ শার্প মেজর।
টাকাকে যাবে না ছোঁয়া- এরপর থেকে ফ্ল্যাট মেজর হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এখানে, ‘রাত নির্জন পথে কত ভয়’ এখানে আরম্ভ করেছিলাম। যেখানে সেই হিসাবে কোমল নি হয়ে গেল সা। এই যে modulation, এই যে যাচ্ছে এতে আমাদের নজর রাখতে হবে যে শ্রোতাদের কানে যেন কোনো ধাক্কা না লাগে। অর্থাৎ Migration from one key to another key should be as smooth as possible। সেটা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, দক্ষতা অর্জন করার মধ্য দিয়ে আমাদের করতে হবে। গণনাট্য শিল্পীদের দক্ষ সংগীতকার হতেই হবে। দক্ষ সংগীতকার হলেই গণসংগীতকার হতে পারবে এমন কথা নয় কিন্তু গণসংগীতকারকে দক্ষ সংগীতকার হতেই হবে এবং গণসংগীতকার হতেই হবে। It is a must. এইভাবে আমরা যদি ওয়ার্কশপ করি, বহু নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা যদি এভাবে চেষ্টা করে তো আমরা রাস্তা খুঁজে পাব। তবে প্রথম কথা যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটাতে আসছি। গণসংগীতের প্রতি যে dedication সেটা আমরা ধরে নিয়েই এসব আলোচনাগুলো করছি।
[১৯৮৮-এর ৭-১৪ জুন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের কেন্দ্রীয় নাট্য প্রশিক্ষণ কমিটির উদ্যোগে কলকাতার মৌলালি যুবকেন্দ্রে একটি গণসংগীত কর্মশালা হয়েছিল। ওই কর্মশালায় উপস্থিত হয়ে গণসংগীতের বাণী রচনা ও সুরারোপ বিষয়ে সলিল চৌধুরী যে বক্তৃতা দেন এটি তারই সম্পাদিত রূপ। কৃতজ্ঞতা: কঙ্কন ভট্টচার্য ও শান্তনু ব্যানার্জি।]
ঋণ: বাংলা সংগীত মেলা স্মারকগ্রন্থ, ১৪১৪।
প্রকাশের তারিখ: ১৯-নভেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
