Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ঘরোয়া স্মৃতি

সরযু দেবী
তখন সে পা-জামা-ই পরতো বেশির ভাগ সময়ে। বললাম, অতো তাড়া কিসের– কোথায় যাবি? –পার্টির একটা কনফারেন্স আছে, কলকাতার বাইরে যেতে হবে। সুকান্ত জবাব দিলো। আমি বললাম, কিন্তু দুটো পা-জামা তো এই সময়ের মধ্যে হয়ে উঠবে না। তুই একটা নিয়ে যা না হয়– সুকান্ত বললে, সে আমি জানি না, এই কাপড় রইলো। বিকেলের মধ্যে দুটো পা-জামা-ই চাই।...ওই সময় সুকান্ত পার্টির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতো। শুধু কলকাতায় নয়, পার্টির কাজে কলকাতার বাইরেও যেতো সে। তাছাড়া ছোটদের সংগঠন ‘কিশোর বাহিনী’, ‘স্বাধীনতা’ কাগজের ছোটদের বিভাগ ‘কিশোর সভা’ পরিচালনা করতো।
ghoroa smriti

বাংলা ১৯৩৯ সালের শ্রাবণ মাসে সুকান্তর বড়দাদা শ্রীযুক্ত মনোমোহন ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার বিবাহ হয়।

সুকান্তর বয়স তখন মাত্র ছ’বছর। খুব কালো আর রোগা ছিলো সে। ওদের ভাইয়েরা আর কেউ অতো কালো ছিলো না।

তাই আমি প্রায়ই বাড়ির সকলকে বলতাম, ওর নাম ‘কালাচাঁদ’ রাখোনি কেন?

সুকান্ত আমাদের বড় আদরের ছিলো। খুব লাজুক ছিলো সে। কথাও কম বলতো। ওর জ্যাঠামশাই অর্থাৎ আমার জেঠ-শ্বশুর ওকে, সোনা, সোনা, সোনামাখানো ছেলে-বলে ডাকতেন আদর করে। সুকান্তর সেই শৈশবকালে পড়াশোনায় হাতেখড়ি হয়েছিলো আমার কাছে। আমি প্রথম তাকে অক্ষর-পরিচয় করাই। আমার নিজেরও তখন খুব গল্পের বই পড়ার সখ ছিলো।

সে সব বই তো সুকান্তকে পড়ে শোনানো চলতো না– তাই তার ফরমাস মতো ছোটদের গল্পের বই, ছড়ার বই– এই সব আনাতে হতো আমাকে। তখনও পড়তে শেখেনি ভালোমতো।

তাই আমাকে বলতো, বৌদি, তুমি চেঁচিয়ে পড়, আমি শুনবো।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘খুকুমণির ছড়া’ বইটা আমি আনিয়েছিলাম ওর জন্যে। সে বই থেকে জোরে জোরে ছড়া পড়তাম আর সুকান্ত সেই সব ছড়া শুনে শুনেই মুখস্ত করে নিতো। তারপর শোনাতো বাড়ির সকলকে।

এক এক সময়ে আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম, তুই নিজে নিজে পড়তে শেখ। আমি আর পড়ে পড়ে শোনাতে পারবো না।

সুকান্ত ভারী অভিমানী ছিলো। তাই আমার ওই একটি কথাই যথেষ্ট হলো তার পক্ষে। অভিমান করে ক’দিন এলো না আমার কাছে। দূরে দূরে ঘুরতে লাগলো। মাথায় একরাশ চুল এলোমেলো, অবিন্যস্ত। মুখখানা ভার-ভার। ওর এই চেহারা দেখে আমি আবার থাকতে পারলাম না। ও ছাড়া আমারও যেন এক মুহূর্ত চলতো না । তাই নিজেই তাকে টেনে এনে জোর করে খাওয়ালাম।      

সুকান্ত খেলাধুলো বড় একটা করতো না। ঘুড়ি ওড়ানো কি বল খেলা এসব ওর একেবারেই ছিলো না। আমাদের তখন নতুন একটা রেডিও কেনা হয়েছিলো। সুকান্ত সেই রেডিওর কাছে কান দিয়ে দিন রাত বসে থাকতো। ওর সেই বসে থাকার ভঙ্গিটি এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে ।

রবীন্দ্র-সঙ্গীত বড় ভালোবাসতো সুকান্ত সে সময়, এখনকার মতো রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের গানকে ‘রবীন্দ্র-সঙ্গীত’ বলে ঘোষণা করা হতো না। বলা হতো ‘কাব্য-সঙ্গীত’। রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের এই ‘কাব্য-সঙ্গীত’ বড় প্রিয় ছিলো সুকান্তর। ও যখন স্কুলে ভর্তি হলো, তখন কোনো কোনো দিন একেবারে খালি গায়েই স্কুলে চলে যেতো। এমনি ছিলো আপনভোলা ৷

ওকে প্রথমে কমলা বিদ্যামন্দিরে ভর্তি করে দেওয়া হয়।

সুকান্ত করতো কি; স্কুলে গিয়ে প্রথম ভাগের ছবির পাতাগুলো ছিঁড়ে ক্লাশের ছেলেদের বিলিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে আসতো। আর দুম-দাম্ করে বাড়ি এসে, রান্নাঘরের সামনে বই শ্লেট ফেলে দিয়ে বলতো, বৌদি কি আছে দাও, বড্ড খিদে পেয়েছে।

রোজই ওকে খেতে দিয়ে ওর বই-পত্তর গুছিয়ে রাখতে হতো আমাকে। ছেঁড়া-খোঁড়া বইয়ের অবস্থা দেখে হয়তো বললাম, কিরে, তোর বইয়ের পাতা আর সব কি হলো ?

সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব এলো, জানি না যাও।

এর পরে, বইয়ের অক্ষর চেনা আর লিখতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে ছন্দের জ্ঞানও সুকান্তর ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিলো। তখন থেকেই সে অক্ষর মিলিয়ে মিলিয়ে কবিতা বানাতে পারতো। আমার শ্বশুরমশায়ের বইয়ের দোকান ছিলো। এখনও আছে সে দোকান, আমার দেওররা দেখাশোনা করেন। তা তখনকার দিনে ওই দোকানে একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন, নাম কালীরতন ভট্টাচার্য। তিনি খুব নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। খেতে বসে কথা বলতেন না। তাঁর মাথায় একটি মস্ত টিকি ছিলো। সুকান্ত দুষ্টুমি করে সেই টিকিটি জানলার পাশ থেকে কাঠি দিয়ে নাড়া দিতো। আবার কোনদিন বা রবিবার দুপুরে কালীরতনদা তাঁর নিজের ঘরটিতে শুয়ে ঘুমুচ্ছেন, অমনি সুকান্ত এসে তাঁর টিকিটি বেঁধে রেখে গেছে কোনো কিছুর সঙ্গে। একদিন হয়েছে কি, কালীরতনদা যেখানে খেতে বসতেন, সেই ঘরের দেওয়ালে কালীরতনদার একটি মুখ এঁকে তার নিচে রঙিন পেনসিল দিয়ে ছড়া লিখে দিলো সে:

খাঁদু খালি কলা গেলে
আর কালীরতনদা তাই দেখে ভোলে।

খাঁদু মানে সুকান্তর ছোটো ভাই, যার ভালো নাম প্রশান্ত ভট্টাচার্য। ছোটবেলায় প্রশান্ত খুব শান্ত ছিলো, খুব বাধ্য ছিলো কালীরতনদার। তাই প্রশান্ত আর কালীরতনদার ওপর রাগ করেই এই ব্যঙ্গ কবিতা তৈরি করেছিলো সুকান্ত।

সে যাই হোক, কিন্তু এই কবিতা আর ছবি দেখে কী রাগ কালীরতনদা আর প্রশান্তর !

সেই বয়সে পড়াশোনার দিকে বিশেষ মনোযোগ না থাকলেও, দুষ্টুমি আর দুরন্তপনার নতুন নতুন বুদ্ধি সব সময়েই আবিষ্কার করতে পারতো সুকান্ত ।

একদিন আমার শাশুড়ী (সুকান্তর মা সুনীতি দেবী) কাপড় শুকোতে দিয়েছেন, ভিজে কাপড়ের আঁচলে একটি আনি বাঁধা ছিলো। উনি বললেন, বৌমা, আনিটা খুলে নিয়ে এসো তো ।

আমি আনি আনতে দিয়ে দেখি, ওমা, আনি আবার কোথায়? তার বদলে একটা ছোটো কাগজের চিরকুট বাঁধা রয়েছে শুধু। কাগজটা এনে শাশুড়ীর হাতে দিতেই উনি খুলে দেখেন, তাতে লেখা আছে, ‘মা, তুমি সুশীলকে ভালোবাসো বেশি, আমাকে ভালোবাসো না। আমাকে দাঁত খিঁচিয়ে তুমি কথা বলো।’ সুকান্তকে খোঁজা হলো। কিন্তু কোথায় সুকান্ত!

সে তখন বাড়ি ছেড়ে, পাড়া ছেড়ে উধাও। তখনও ওর বছর এগারো বয়স। তখনও কোনো বন্ধু ছিলো না ওর যে পালিয়ে তাদের বাড়ি যাবে! আমার জেঠ-শ্বশুরের বাড়ি খবর নিয়ে জানা গেলো সুকান্ত সেখানেও যায়নি। তাহলে? এবার সত্যিই ভাববার কথা। কোথায় গেলো -সুকান্ত?

‘ওদিকে সে তখন কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে সারস্বত লাইব্রেরির সামনে ঘোরাঘুরি পায়চারি করছে।

দোকানের ভেতর থেকে কালীরতনদা ওকে দেখতে পেয়ে বুঝলেন একটা কিছু অঘটন ঘটিয়ে এসেছে বাবু। এখন দোকানের সামনে এসে সুবোধ ছেলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে!

কালীরতনদা ওর কান ধরে দোকানে টেনে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখলেন। শেষে ওঁদের সঙ্গেই রাত্রে বাড়ি এলো সুকান্ত। বাড়ি আসবার পর আমি সকলকে বারণ করলাম, যাতে ওকে কিছু না বলা হয়। 

এই সব কারণে, সুকান্তকে আমি অত্যধিক স্নেহ করতাম বলে বাড়ির সকলে অনুযোগ করতেন। বলতেন, তুমিই ওর মাথাটা খেলে। তা এতো মানুষের এতো অনুযোগ অভিযোগ সত্ত্বেও সুকান্তকে আমি স্নেহ না করে, ভালো না বেসে পারতাম না।

একদিন সুকান্তকে বললাম, তুই আর এমন দুষ্টুমি করিসনি, তোর জন্যে আমাকে সকলের কাছে কথা শুনতে হয়– তা জানিস্? এখন থেকে ভালো হ, শান্ত হয়ে থাক্।

ও তার জবাবে গম্ভীর হয়ে বললো, বুঝেছি, বুঝেছি, আমাকে বাড়ির সবাই কী ভাবে। আমাকে নিয়েই সকলের মাথা-ব্যথা এই বলে দুম্ দুম্ করে চলে গেলো সে।

তখন আমাদের বাড়িতে আমাদের গুরুবংশের এক পুরোহিত থাকতেন। তিনি ভারী সুন্দর করে কথা বলতে পারতেন ৷

একদিন আমি রান্না করছি, আর আমার ছেলে রান্নাঘরের সামনে বসে মুঠো মুঠো করে কয়লার গুঁড়ো নিয়ে খেলা করছে। এই সময় পুরোহিতমশাই সুর করে আমার ছেলেকে বললেন:

ইয়ারে আইছ কি কারণ?

সুকান্ত কাছেই কোথায় ছিলো৷ পুরোহিতমশায়ের সামনে এগিয়ে এসে সঙ্গে সঙ্গে একই সুরে সুর মিলিয়ে জবাব দিলো:

ধাই কিরি কিরি ধাঁই কিরি কিরি

চলো বৃন্দাবন–

সেই থেকে ওই কথাটা আমাদের মধ্যে চালু হয়ে গেলো। মাঝে মাঝে ঠাট্টা চলতো ওই কথা নিয়ে।

একবার বৈশাখ মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে আমাদের একটি নিমন্ত্রণ ছিলো, আমাদের পাড়ায় বিখ্যাত প্রকাশক উপেন্দ্রনাথ দাসের বাড়িতে। বাড়ির ছেলেরা সকলেই সেই নিমন্ত্রণে গেলো। কিন্তু সুকান্ত গেলো না। 

বললাম, কি রে, তুই যাবি না? সবাই তো গেলো– সুকান্ত গেলো না।

জবাব হলো, যাকগে সবাই, আমি যাবো না। আমাকে যদি ওরা ডাকতে আসে, তাহলে যেতে পারি।

বাড়ির ছেলেরা, যারা খেয়ে এলো, তারা নানা কথায়, সুকান্তকে শুনিয়ে শুনিয়ে লোভ দেখিয়ে নিমন্ত্রণ-বাড়িতে কি কি রান্না হয়েছে। বলতে লাগলো ফলাও করে, এতে ও আরো রেগে যেতে লাগলো মনে মনে। আর অস্থিরভাবে ঘরময় পায়চারি করতে লাগলো।

সে এক ভারী মজার দৃশ্য!

সুকান্ত ঘরময় পায়চারি করছে আর হাত মুঠো করে অস্থিরভাবে বিড় বিড় করে বলছে, এখনও আমাকে ডাকতে আসছে না– এখনও আমাকে ডাকতে আসছে না– না ডাকতে এলে ভস্ম করে দেবো উপেন দাসেদের সকলকে।

সত্যিই, অস্থির হবারই তো কথা! এতো ভালো ভালো রান্না হয়েছে উপেন দাসেদের বাড়ি– অথচ না ডাকলে সুকান্ত যেতে পারছে। অন্তত একবারও যদি এসে তাকে ডাকে, তাহলে গান-সম্মান বজায় রেখে নেমন্তন্ন খেতে যেতে পারে সে। শেষে ও-বাড়ি থেকে আমাদের মেয়েদের যখন ডাকতে এলো, তখন সুকান্ত গেলো আমার সঙ্গে-সঙ্গে ৷

ও-বাড়ির মেয়েরা ওকে আমার সঙ্গে যেতে দেখে বলতে লাগলেন, এই এসেছে বৌদির আঁচল ধরে!

সুকান্তর ওই ‘না ডাকতে এলে ভস্ম করে দেওয়ার’ ব্যাপারটা ওঁরাও শুনেছিলেন। সেজন্যে ও-বাড়ির সকলে ওর নাম দিয়েছিলেন ‘ভস্মকারী ঠাকুর’।

উপেন দাস মশাই আমার শ্বশুর মশায়ের যজমান ছিলেন! সেই জন্যেই এই ‘ঠাকুর’ কথাটা যোগ করা হয়েছিলো। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই আমি আমার সংসার নিয়ে আলাদা হয়ে যাই। পাশের বাড়িটি ছিলো প্রাক্তন এমএলএ কে জি বসুর বাড়ি। আমরা ওই বাড়িতেই উঠে গেলাম।

এর কিছুদিন পরেই আমার শাশুড়ী মারা যান ৷

মা মারা যাবার পর অবলম্বন হিসাবে আমি ছাড়া সুকান্তর আর কেউই রইলো না। তাই সব সময়েই প্রায় আমার কাছে থাকতো সে। এমনও সময় গেছে, সুকান্ত চার-পাঁচদিন বাড়ি না যাওয়ার পরও ও-বাড়ি থেকে তার খোঁজ করা হতো না। ও আমাদের বাড়িতে থাকার সময় হয়তো ওকে জোর করে বসালাম পড়ার বইয়ের সামনে, তা ও করতো কি– সঙ্গে সঙ্গে রেডিওটি খুলে তার সামনে কান দিয়ে বসে থাকতো। 

কানে কম শুনতো সুকান্ত। তাই একেবারে রেডিওর কাছে না বসলে ওর পোষাতো না। ওর ওই পড়ার বই সামনে রেখে রেডিওয় কান দিয়ে বসে থাকা দেখে মাসীমা (কে জি বসুর মা) এসে আমাকে বলতেন, এই জন্যেই তোমার শ্বশুর আর সুশীল বকে। এমন করে কি প্রশ্রয় দিতে আছে?

আমি এই শুনে রেডিও বন্ধ করে দিয়ে বই পড়ার জন্যে বকাবকি করতাম ওকে। বলতাম, না পড়লে পাশ করবি কি করে, ক্লাশে উঠবি কি করে ?

সুকান্ত তার জবাবে হাসি মুখে বলতো, পাশ করে কি হবে, ক্লাশে উঠবো– এই তো ? ক্লাশে উঠে উঠে ডিগ্রি নেবো! কিন্তু ডিগ্রি নিয়ে কি হবে ? আমি যদি ডিগ্রি না নিয়ে আরো বেশি পড়ি? লোকে তো আমাকে বাজালেই বুঝতে পারবে খালি কলসি কি ভর্তি কলসি! এই বলে সে পড়ার বই মুড়ে রেখে আলমারি খুলে গল্পের বই নিয়ে বসতো।

আমার তখন এক আলমারি বই ছিলো।

আর দুষ্প্রাপ্য গল্পের বই থাকতো তার মধ্যে। বহু প্রাচীন পত্রিকা। সে সব বই সুকান্ত খুব মন দিয়ে পড়তো। শরৎচন্দ্রের সমস্ত বই আমার ওই আলমারি থেকে নিয়ে নিয়ে পড়ে শেষ করেছিলো সে। তাছাড়া আমার বাবা, মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’, টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ আর ‘কথাসরিৎ-সাগরের’ একটি বড় সংস্করণ আমাকে এনে দিয়েছিলেন। সুকান্তকে আমি সেই সব বই আগ্রহের সঙ্গে পড়তে দেখেছিলাম ।

আমিই প্রথম ওকে জোর করে মহাভারত পড়িয়েছিলাম। 

মহাভারতখানা পড়ার পর ও আমাকে শ্বশুর মশায়ের সারস্বত লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত একখানি রামায়ণ এনে দিয়েছিলো। বইয়ের সমস্ত ছাপা ফর্মা বাড়িতেই থাকতো। ও তার থেকেই একটি বই নিয়ে আসে।

বইটিতে লিখেছিলো:

‘বৌদিকে দান করলাম

ইতি সুকান্ত–’

ছেলে মানুষের বুদ্ধি তো! এর থেকে বেশি আর কি লিখবে? ওর দেওয়া সেই রামায়ণ বইটি এখনও আমার কাছে আছে। সুকান্তর খুব ইচ্ছা ছিলো, পৈতের সময় একটা আংটি দিই ওকে। কেন না, ওর ওপরের ভাই সুশীলের পৈতের সময়েও তাকে একটা আংটি দিয়েছিলাম। সেই থেকে সুকান্ত কেবলই বলতো, আমাকেও ওই রকম একটা আংটি দিতে হবে। নাম লেখা আংটি। তা আমি ওর পৈতের সময় আংটি দিতে পারিনি।

সেজন্যে সুকান্ত অভিমান করে প্রায়ই বলতো, বৌদি, তুমি আমাকেই ফাঁকি দিলে। 

আমি আদর করে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলতাম, ওরে না, না, আমি কি মরে যাচ্ছি, পরে দেবো তোকে আংটি।

এ কথা মনে পড়লে আজও দুঃখ হয়। আমি আজও মরিনি বটে, কিন্তু সুকান্ত আমার দেওয়া নাম লেখা আংটি নেবার জন্যে আজ আর নেই।

পৈতের আগের দিন সুকান্ত আমার কাছে আসতেই তার হাতে একটি টাকা দিলাম। বললাম, এটা তুই নে। যা খাবার ইচ্ছে হয় খেগে যা। তা তখন ওর মুখ চোখের অবস্থা যদি কেউ দেখতো! দু’আনা চার আনা নয়, একেবারে পুরো একটা টাকা! এক টাকায় তখন ছোটোরা রাজ্য কিনতে পারে! সুকান্ত কিন্তু সে টাকায় কিছু খায়নি। মাথার চুল বড় যত্নের ছিলো তার। পৈতের সময় তো মাথা কামিয়ে নেড়া হতে হবে! তাই চুলের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্যে সেই টাকাটিতে ক’খানা ছবি তুলেছিলো সুকান্ত। এখন ওই যে গালে হাত দেওয়া ছবিটা ওর দেখতে পাওয়া যায়, ওটা সেই ছবিগুলিরই একটি।

ওর বড় দাদার চেষ্টায় সে সময় রেডিওর ‘গল্প দাদুর আসরে’ একটি কবিতা আবৃত্তি করার প্রোগ্রাম পেয়েছিলো সুকান্ত। তা যেদিন আবৃত্তি করতে যাবার কথা, তার আগেই ওর পৈতে হয়ে গেছে। মাথা নেড়া। বললো, নেড়া মাথায় কি করে রেডিও অফিসে যাই বলোতো? তুমি আমাকে একটা গান্ধী ক্যাপ তৈরি করে দাও। সারা দুপুর ধরে আমার কাছে বসে থেকে টুপি তৈরি করালো। তারপর বিকেলে ধুতি পাঞ্জাবী গান্ধী টুপি পরে চললো রেডিও অফিসে! যাবার সময় আবার কী বিড়ম্বনা! পাড়ার একটি ছেলেকে আমার পাহারায় রেখে গেলো। বললো, এই দেখবি তো, বৌদি রেডিও খুলে আমার আবৃত্তি শোনে কি না।

আমি ওকে রাগাবার জন্যে বলেছিলাম এক সময়, তুই আমাকে এতো জ্বালাচ্ছিস, যা আমি তোর আবৃত্তি শুনবো না।

সেই জন্যেই এই পাহারার ব্যবস্থা!

‘গল্প দাদুর আসর’-এ স্বর্গীয় নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তখন ‘দাদুমণি’। তিনি সময়মত সুকান্ত ভট্টাচার্যর নাম ঘোষণা করলেন।

সুকান্ত রেডিওতে আবৃত্তি করলো রবীন্দ্রনাথের ‘শীতের আহ্বান’ কবিতাটি। বাড়ি এসেই আগে আমার কাছে ছুটে এলো, বৌদি শুনেছো আমার আবৃত্তি?

বললাম, হ্যাঁ শুনেছি। কিন্তু ও কি রে, এখন তো মাঘ মাস– এই মাঘ মাসে শীতের আহ্বান, কি রে? এখন তো শীত চলে যাচ্ছে!

বেচারী মুখ কাচুমাচু করে বললো, হ্যাঁ ঠিকই বলেছো, আমি অনেকদিন আগে অডিসন দিয়েছিলাম তো, দিন আসতে আসতে দেরি হয়ে গেলো।

এই রেডিওর কথায় মনে পড়লো, সুকান্তর যতো কাজই থাক প্রতি রবিবার সকালবেলায় এসে ও ঠিক রেডিও খুলে বসে থাকতো। আজকালকার মতো তখনকার দিনেও রবিবার সকালে রেডিওতে পঙ্কজকুমার মল্লিকের রবীন্দ্র-সঙ্গীত শিক্ষার আসর বসতো। সুকান্ত নিবিষ্ট মনে শুনতো সেই প্রোগ্রাম। অনেক সময় আবার গভীর ভাবনায় মাথা ঘামাতে লেগে যেতো। বলতো, আচ্ছা বৌদি, যখন পঙ্কজ মল্লিক থাকবেন না, তখন কে রেডিওতে গান শেখাবে বলোতো?

পঙ্কজকুমার ওর খুব প্রিয় গায়ক। অনেক সময় তাঁর মতো গলা করে সুকান্ত রবীন্দ্র-সঙ্গীত গাইতো। তবে এই গায়কদের বিষয়ে একটা উল্লেখযোগ্য খবর হলো, সুকান্ত সে সময় রেডিও-র যে কণ্ঠ-সঙ্গীত শিল্পীকে মোটেই পছন্দ করতো না, তিনি হলেন হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়। এ কথা শুনলে আজকের দিনে নিশ্চয়ই সকলে খুব অবাক হবেন। কিন্তু কথাটা একেবারেই মিথ্যে নয়। হেমন্তকুমার তখন নতুন শিল্পী। সবে রেডিওতে গান গাইছেন। তাঁর নরম নিচু কণ্ঠস্বর মোটেই পছন্দ হতো না সুকান্তর। হেমন্তর প্রোগ্রামের আগেই সে বলতো, বৌদি, এবার একজন ভদ্রমহিলা গান গাইবেন। শুনবে তো এসো।

আজ হেমন্তকুমার এ কথা শুনলে নিজেও নিশ্চয়ই হাসবেন। সে সময় সুকান্ত তাঁকে পছন্দ না করলেও পরবর্তীকালে তিনিই সুকান্তর গান গেয়ে তাকে সাধারণ মানুষের কাছে অনেকখানি জনপ্রিয় করে তুলতে পেরেছিলেন। যা সুকান্ত দেখে যেতে পারেনি। সুকান্তর পৈতের ক’দিন পরেই ঢাকা মেল দুর্ঘটনা হয়েছিলো। বহু মানুষ তাতে মারা যায়। আর তার ক’দিন পরে-পরেই আমার এক সম্পর্কীয়া ননোদের বিয়ে হয়।

বিয়ের দিন সন্ধ্যাবেলা বর আসতে সারা বাড়িতে হৈ-চৈ। সুকান্ত এরই মধ্যে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এসে কানের কাছে মুখ এনে বললো, বৌদি সাবধান, বর কিন্তু ঢাকা মেল দুর্ঘটনা!

বললাম, সে কিরে, তার মানে?

–দেখতেই পাবে ঠিক সময়ে।

বিয়ের সময় উঠোনে বরকে বরণ করতে গিয়ে দেখি, তার মুখের একদিক সামান্য বাঁকা। সুকান্তর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ও আমাকে ইশারা করলো, ভালো করে দেখে নাও!

এই রকম দুষ্টুমীর ঘটনা ওর আরো আছে।

একবার বৃষ্টির সময় রান্নাঘরে বসে আমি রান্না করছি। ওদিকের বড় ঘরে সুকান্ত কি করছিলো যেন। দেখলাম দরজা দিয়ে হাওয়া আর বৃষ্টির ছাঁট আসছে। ওকে বললাম, সুকান্ত, দরজাটা দে। দু’একবার বলাতে সুকান্ত কথাটা গ্রাহ্য করলো না। এই দেখে ভারী রাগ হলো আমার। বৃষ্টির জলে ঘর ভিজে যাচ্ছে, বাচ্চারা শুয়ে, হাওয়ায় ঠাণ্ডা লাগবে– বলছি, তবু কথা গ্রাহ্য করছে না! তাই এবার চেঁচিয়ে বললাম, সুকান্ত কথাটা কানে যাচ্ছে না? দরজাটা দে–

সুকান্ত করলো কি, দরজাটা দু’চারবার টেনে ধরে হতাশ ভঙ্গি করে বললো, বৌদি, তোমার কথা রাখতে পারলাম না। দরজাটা তুমি চাইছো, কিন্তু আমি দিতে পারছি না। এটা বড্ড ভারী! তখন আমি কোন রকমে রাগ চেপে গম্ভীর গলায় বললাম, দরজাটা বন্ধ কর– ও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো, তাই বলো, ব্যাকরণ শুদ্ধ করে বলবে? দরজা ভেঙ্গে দিতে বলছো– দরজা কি দেওয়া যায়?

আমি বললাম, বাঁদর

সুকান্ত সঙ্গে সঙ্গে মুখ কাচুমাচু করে জবাব দিলো, না বৌদি, তোমার দিক ভুল হলো, ওটা বাঁ-দোর নয়, ডান দোর ৷

এর পরে কি আর থাকা যায় রাগ করে? সন্ধ্যার সময় আমি আমি যখন রান্নাঘরে বসে জলখাবার তৈরি করতাম, তখন রান্না ঘরের চৌকাঠে বসেই সুকান্তর মনের কথা বলবার সময় হতো যেন। আমাকে বলতো, আমি আর ইস্কুলে যাবো না। এতক্ষণ পর্যন্ত মাস্টারদের শাসনের মধ্যে থাকতে পারবো না। তার চেয়ে তুমি আমাকে এই রকম করে তেলেভাজা ভেজে দেবে ভেতর থেকে, আমি একটা দোকান করে এই সব বিক্রি করবো। আমি দই পাততাম। সুকান্ত সেই বিক্রির তালিকার সঙ্গে জুড়ে দিতো। আমি দইও বিক্রি করবো। দই খেতে খেতে ওটাও বলতো, বাঃ, বেশ দই তো!

সেই শৈশবকাল থেকেই স্কুলের প্রতি সুকান্তর একটা বিতৃষ্ণার ভাব জেগে উঠেছিলো। বিশেষ করে স্কুলের নিয়ম শৃঙ্খলা আর মাস্টারদের অত্যধিক শাসনের ওপর। টিফিনের পর বাড়ি এসে প্রায়ই সে আর স্কুলে যেতো না । এই স্কুলে না যাওয়ার জন্যে আমি আর মাসীমা (কে জি বসুর মা) ওকে বকাবকি করতাম যথেষ্ট সুকান্ত ইতিহাসে বড্ড কাঁচা ছিলো। প্রায়ই ইতিহাসে সে ফেল করতো। সেজন্যে আমি ওকে নিজে জোর করে কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত পড়িয়েছিলাম। বলেছিলাম, গল্পের বই মনে করেই মহাভারতখানা পড়। তাহলে ওই ইতিহাসও আর কঠিন লাগবে না– ঠিক পাশ করতে পারবি ।

পরে অবশ্য সুকান্ত ইতিহাসে পাকা হয়ে উঠেছিলো।

এর পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের ঘটনা। তখন ছোটো বড়ো সকলের মুখেই ‘জাপান এলে রুখতে হবে’– এই শ্লোগান । এখানে ওখানে দল তৈরি হচ্ছে। সুকান্তও পাড়ার ওই রকম একটি দলে যোগ দিয়েছিলো! আমি জানতে পেরে বললাম, ওসব আবার কি রে? বাড়িতে পুলিশের হামলা হবে শেষে।

সুকান্ত গম্ভীর ভারিক্কী চালে বললো, ওসব তুমি বুঝবে না।

আমাদের ওই অঞ্চলে, বর্তমানে যেখানে সুকান্তর ভাইয়েরা বাস করে, ওই সময়ে সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন। এসেছিলেনই শুধু নয়, সাতদিন একটি মাঠে তাঁবু খাটিয়ে ছিলেনও। কারণ, সে সময় ওখানে ধাঙড়-মেথরদের ধর্মঘট চলছিলো। সেই সমস্ত ব্যাপারেই সুভাষচন্দ্র আসেন ও থাকেন ক’দিন। পাড়ার ওই সমস্ত ব্যাপারে ভলেন্টিয়ারি করতে সুকান্তর কী উৎসাহ! পথ-ঘাট নর্দমা পরিষ্কার করার কাজেও সে যোগ দিয়েছিলো পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে। সুভাষচন্দ্র আর ভলেন্টিয়ারের দল তৈরি করে পাড়ায় জনহিতকর এই সব কাজ করা– এর থেকেই সুকান্ত পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দলে আত্মনিয়োগ করার অনুপ্রেরণা পায়– এ কথা বলা চলে। এর পর থেকে সে নিয়মিত রোজ সকালে খবরের কাগজ পড়তো, আর রেডিওর খবর শুনতো আগ্রহের সঙ্গে।

ওকে রাগাবার জন্যে বলতাম, কি রে, ‘জাপান এলে রুখতে হবে’ করবি, না ‘বন্দেমাতরম্’ করবি ?

ও তার জবাবে গম্ভীর হয়ে বলতো, দেখি কী করি।

একটি উপসর্গ বাড়লো।

ওর ফরমাস মতো ‘যুগান্তর’ কাগজ রোজ নিতে হতো আমাদের। ওই সময়ে পাড়ার ক’জন ছেলের সঙ্গে মিলেমিশে সুকান্ত একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলো। আমার এক আলমারি ভর্তি সখের বইগুলো সব নিয়ে গেলো সে সেই লাইব্রেরিতে। আমি প্রথমে দিতে চাইনি, কিন্তু এমনভাবে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো যে, ওর মুখ চোখের অবস্থা দেখে না দিয়ে পারলাম না।

ছেলেমানুষ সুকান্ত আমাকে লোভ দেখাবার জন্যে বললে, দাও, দাও বৌদি, সব বইতে তোমার নাম লেখা থাকবে, তুমি বই দিয়েছো বলে কতো সুনাম হবে তোমার, এই বলে আলমারি খালি করে বইগুলো সব নিয়ে গেলো। বেচারী জানতো না তো, আমি আমার সুনাম হবার লোভে বইগুলো দিইনি, দিয়েছিলাম আমার সুকান্তর মুখের হাসি দেখবার জন্যে! ওই যুদ্ধের মধ্যেই আমাদের বেলেঘাটার পৈতৃক বাড়ি বিক্রি হয়ে গেলো। সুকান্ত আমার শ্বশুরমশায়ের সঙ্গে বেলেঘাটার দুই রেলব্রিজের মাঝামাঝি ২০ নম্বর নারকেলডাঙা মেন রোডের বাড়িতে চলে গেলো। আর আমি কে জি বসুর বাড়ি থেকে আমার সংসার তুলে নিয়ে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের একটি বাড়িতে চলে এলাম। এই ছাড়াছাড়ি হবার মাস দু’য়েক আগে সুকান্ত এমনভাবে পাড়ার দলে মিশে রিলিফ ইত্যাদির কাজে লেগে গেলো যে, সুকান্তর ওপরের ভাই সুশীল বিরক্ত হয়ে আমাকেই এর জন্যে দোষারোপ করলো। সকলের কাছে বলতে লাগলো, বৌদিই সুকান্তর মাথাটা খেয়েছে।

ক্রমাগত এই কথা শুনে শুনে বিরক্ত হয়ে সুকান্তকে ডেকে খুব ভর্ৎসনা করলাম একদিন। সুকান্তর অভিমান আর আত্মসম্মান বোধ ছিল খুব বেশি।

আমার কাছে এই বকুনি খেয়ে রাগে দুঃখে অভিমানে আমার সঙ্গে আর দেখা করলো না ক’দিন।

যেদিন আমরা হরমোহন ঘোষ লেনে কে জি বসুর বাড়ি ছেড়ে চলে আসি সেদিন ব্ল্যাক-আউটের অন্ধকারে মা-হারা সুকান্ত আমার চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো গোঁজ হয়ে। তবু এমন অভিমানী যে একবার বললো না পর্যন্ত, বৌদি তুমি যেও না। যাও তো আমাকেও নিয়ে চলো সঙ্গে করে। অথচ, ওই কথা সুকান্তই সব চেয়ে বেশি করে বলতে পারতো। আসার সময় ওর ছোট ভাই বিভাস আমার সঙ্গে এসেছিলো।

নতুন বাড়িতে চলে আসার ন’দিন পরে এক সকালে সুকান্ত এসে হাজির। দরজায় কড়া নাড়া শুনে খুলতেই দেখি– সুকান্ত।

বললাম, কি রে তুই?

–হ্যাঁ, এলাম ।

বললাম, আয় আয়, ভেতরে আয়।

ভেতরে আসতে বলতেই ও কি রকম যেন হয়ে গেলো। বাড়িটা চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখলো। প্রকাণ্ড ফাঁকা বাড়ি। নীচের তলাটা অন্ধকার।

সুকান্ত সব দেখে শুনে বললো, এতো বড় খালি বাড়ি– একি ভূতের বাড়ি নাকি? একলা থাকো কি করে?

সেদিন ছিলো বাংলা ৯ ই পৌষ। বড়দিন সেদিন। সুকান্ত আসাতে বড় আনন্দ হলো। ভালো খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হয়েছে বাড়িতে ৷ শুনে সুকান্ত বললো, কি রান্না করবে?

–তোর মনের মতই সব হবে। এ কথার পর সুকান্ত যা খেতে ভালোবাসতো ওর দাদা সেই সব কিনে আনলেন।

সেইদিনই কলকাতায় প্রথম বম্বিং হলো।রাত আটটা। আমি তখন রান্নাঘরে। এমন সময়ে খুব জোরে সাইরেন বেজে উঠলো। আমার দুই মেয়ে তখন ছোটো। সুকান্ত ওদের দু’জনকে দুই বগলে নিয়ে নিচে একতলায় দৌড়োলো। আমিও নেমে এলাম। নিচের ঘরের খাটে ওদের দু’জনকে শুইয়ে কানে তুলো গুঁজে দিয়ে ওদের ওপর নিজেও উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। যেন বোমা পড়লে নিজের পিঠ দিয়ে ওদের বাঁচাবে সুকান্ত, এমনি ভাবখানা।

আমি তখন জানলার পাশেই ছিলাম। জানলার একটি পাল্লা খোলা ছিলো। দেখলাম, দূরে আকাশে বিদ্যুতের মতো আগুনের ঝলক চমকে চমকে উঠছে। সুকান্ত আমাকে খালি বলতে লাগলো, আমি একটু জানলা দিয়ে দেখব বৌদি?

ওর দাদা বকলেন। তখন ও শান্ত হয়ে বসলো।

ওই সময় কবি সুনির্মল বসুর একটি যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা দৈনিক ‘যুগান্তরে’ বেরিয়েছিলো। সুকান্ত সেই কবিতাটি আবৃত্তি করে প্রায়ই আমাকে রাগাবার চেষ্টা করতো।

পর পর ক’দিন সাইরেন বাজার জন্য সুকান্তকে আমরা পাঁচদিন আটকে রাখলাম।

কলকাতায় তখন বিরাট হৈ-চৈ। বম্বিং হয়ে গেছে, বহু মানুষ মারা পড়েছে। সকলেই নিজের নিজের লোকের খোঁজ খবর নিচ্ছে তখন। এই রকম যখন অবস্থা তখন সুকান্ত আমাদের কাছে। তিন দিনের দিন আমার শ্বশুরমশাই সুকান্তর খোঁজ করতে এলেন। সব জায়গায় খুঁজে, এখানে এসে ওর দেখা পেয়ে, না বলে আসার জন্যে খুব বকাবকি করলেন। আমরা বললাম, ওর দোষ নেই, পথেঘাটে বিপদ হবে মনে করে আমরাই ওকে এখানে আটকে রেখেছি। শ্বশুরমশাই বললেন, সুকান্ত কোনো নিয়ম মেনে চলে না, পড়াশোনা ছেড়েই দিয়েছে একরকম– বাড়িতে কারো সঙ্গে কথাও বলে না বিশেষ।

সেদিন তিনি সুকান্তকে বকাবকি করলেন না শুধু, অনেক বোঝালেনও। বললেন, যদি ভাল লাগে এখানেই না হয় থাক্, ইস্কুলে ভর্তি হ, পড়াশোনা কর মন দিয়ে।

যাবার সময় জিজ্ঞেস করলেন, কবে বাড়ি যাবি বল, দিনটা আমার জানা দরকার। তুই আবার এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাবি তারপর বললেন, না, আর কোথাও যেও না। দিনকাল খারাপ– এখান থেকে সোজা বাড়ি যাবে।

সুকান্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কোনো কথা বললো না। বাবার মুখের ওপর কোনদিনই কোনো কথা বলতো না সে।

এরপর আমরা যখন শ্যামবাজারের কাছে বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে থাকি, তখনকার ঘটনা।

সেদিন ছিল বিজয়া দশমী।

সুকান্তর দাদা সন্ধ্যার সময় বাড়ি এসেছেন। ওঁর সঙ্গে সুকান্তকে দেখে আমি বললাম, ওকে কোথা থেকে ধরে আনলে?  উনি বললেন, এই পাড়ারই ভূপেন বসুর বাড়িতে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে যাচ্ছিলো, ধরে আনলাম।

সুকান্ত এই ক’দিন আগে ভারী অসুখ থেকে উঠেছে। এরই মধ্যে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে অনিয়ম শুরু করে দিয়েছে দেখে ভারী বকাবকি করলেন ওর দাদা। সুকান্ত অভিমানে কাঁদলো খানিক। খেতে চাইলো না। ওর দাদা এক সময় বললেন, সুকান্তকে মিষ্টি দাও। সুকান্ত জবাব দিলো, যা মিষ্টি তুমি দিলে!– বলে ওপাশে সরে গিয়ে দাঁড়ালো। শেষে অনেক সাধাসাধির পর খেলো সে। এর পর থেকে নিয়মিত আসতে লাগলো সুকান্ত। অনেক সময় ঘরে ঢুকে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তো।

দেখতাম ওর আধময়লা জামা-কাপড়। শুকনো মুখ। এলোমেলো মাথার চুল। জিজ্ঞেস করে জানতাম, সারাদিন পার্টির কাজে, খোরাঘুরি করেছে। বলতাম, খেয়েছিস কিছু?

সুকান্ত চুপ করে থাকতো, কোনো জবাব দিতো না। ওই ওর এক দোষ ছিলো একান্ত আপনজনের কাছেও মুখ ফুটে খাওয়ার কথা বলতে পারতো না। জোর করে খাট থেকে নামিয়ে এনে খাওয়াতে হতো ওকে ৷

একদিন হঠাৎ ঝড়ের মতো এসে হাজির হলো। তেমনি শুকনো মুখ জামাময় কালিমাখা। বললাম, একি রে, এতো কালি কোথা থেকে এলো?

বললে, তুমি আমাকে একটা কলম দিয়েছিলে না– সেটা ভেঙে গিয়ে কালি পড়েছে। তা যাকগে, তুমি আমাকে দুটো পা-জামা করে দাও তো। এই নাও কাপড় এর মধ্যে আছে। আজই চাই কিন্তু’ বলে বগল থেকে একটা কাগজের মোড়ক নামিয়ে দিলো। বললাম, কাপড় কোথায় পেলি?

দিয়েছে একজন। তুমি তাকে চেনো না। নাও নাও, তাড়াতাড়ি করো– বিকেলের মধ্যেই চাই– খুব তাড়া লাগালো সুকান্ত ৷

তখন সে পা-জামা-ই পরতো বেশির ভাগ সময়ে। বললাম, অতো তাড়া কিসের– কোথায় যাবি?

–পার্টির একটা কনফারেন্স আছে, কলকাতার বাইরে যেতে হবে। সুকান্ত জবাব দিলো।

আমি বললাম, কিন্তু দুটো পা-জামা তো এই সময়ের মধ্যে হয়ে উঠবে না। তুই একটা নিয়ে যা না হয়–

সুকান্ত বললে, সে আমি জানি না, এই কাপড় রইলো। বিকেলের মধ্যে দুটো পা-জামা-ই চাই। বলে হন্ হন্ করে ব্যস্ত পায়ে কোথায় চলে গেলো। আমি, সব কাজ ফেলে, বিকেলের মধ্যে ওর পা-জামা দুটো তৈরি করে রাখলাম।

ওই সময় সুকান্ত পার্টির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতো। শুধু কলকাতায় নয়, পার্টির কাজে কলকাতার বাইরেও যেতো সে। তাছাড়া ছোটদের সংগঠন ‘কিশোর বাহিনী’, ‘স্বাধীনতা’ কাগজের ছোটদের বিভাগ ‘কিশোর সভা’ পরিচালনা করতো।

আর এর কিছুদিন পরেই সে পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়লো। অসুস্থ অবস্থায় প্রথম দিকে ওই শ্যামবাজার অঞ্চলেই তার জেঠতুতো দাদা শ্রীযুক্ত রাখাল ভট্টাচার্যের বাড়িতে কিছুদিন ছিলো সে।

ওই সময় আমার ভাসুর শ্রীযুক্ত রাখাল ভট্টাচার্য আর তাঁর স্ত্রী রেণুকাদি অনেক চেষ্টা করেছিলেন সুকান্তকে সুস্থ করে তোলার জন্যে। কিন্তু সকলের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সুকান্তকে ভর্তি করে দেওয়া হলো যাদবপুর টিবি হাসপাতালে।

তখন সারা কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা চলছে। বিকেলের পরেই কাফু অর্ডার জারি করা হতো। তাই শ্যামবাজার থেকে যাদবপুরে গিয়ে ওকে দেখবার সুযোগ সব সময় হতো না।

রেণুকাদির বাবা পুলিশের বড় অফিসার ছিলেন। উনিই জিপে করে সুকান্তকে দেখতে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাও দু’একজনের বেশি যাবার উপায় ছিলো না।

এর ক’দিন পরেই সুকান্ত মারা যায়।

আজকাল সুকান্ত সম্বন্ধে অনেকে অনেক কিছু লেখেন শুনি। পড়িও সে সব কিছু কিছু। অনেকে লেখেন সুকান্ত অত্যন্ত দরিদ্র ছিলো। খুব কষ্টে অনাহারে কেটেছে তার জীবন। এমন কি এমনও পড়েছি না খাওয়ার জন্যে সুকান্তর টিবি হয়ে অকালমৃত্যু ঘটেছে।

কথাটা কিন্তু ঠিক নয়।

আমার শ্বশুরবাড়ির অবস্থা এমন ছিলো না যে, সে বাড়ির কোন ছেলেকে না খেয়ে মরতে হবে। এ কথা বলতে পারি যে, সুকান্ত নিজে অনিয়ম আর অমানুষিক পরিশ্রম করে অকালে নিজের জীবন দিয়েছে।

সুকান্তর অকালমৃত্যু সম্বন্ধে এই আমার মত।

অনুলিখন: বিশ্বনাথ দে
সূত্র– সুকান্ত বিচিত্রা, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত)


প্রকাশের তারিখ: ১২-আগস্ট-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ঋদ্ধ হলাম। অতুলনীয়।
- Janardan Roy , ২২-আগস্ট-২০২৫


এই ব্যক্তিগত খুঁটিনাটিতেই থাকে আসল মণি-মুক্তো। যা একটি সমগ্র সত্ত্বাকে চিনিয়ে দিতে সবচেয়ে কার্যকরী হয়। কিশোর বাহিনী কেনো গঠন করলেন, এটা জানার ইচ্ছা রইল।
- বর্ণালী রায়, ১৭-অক্টোবর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৭ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

২৩-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

১৪-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫