সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাসকে ফিরে দেখা জরুরি
ইরফান হাবিব
আমি মনে করি একথা বলাটা সঠিক যে, ভারত ছাড়ো প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল ভুল সময়ে। সেই সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল না। জাপানি ও জার্মান ফ্যাসিবাদকেই তখন প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা উচিত ছিল। পরে ব্রিটিশদের মোকাবিলা করা যেতে পারত। আমি মনে করি, আজকের সময়ে একথাই আমাদের বলা উচিত। তখন কমিউনিস্ট পার্টি এই কথাই বলেছিল এবং আমি মনে করি আমাদের এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থানের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে:অর্থাৎ হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর, প্রাথমিক কাজ ছিল ফ্যাশিস্ত শক্তিগুলিকে পরাস্ত করা এবং তারপরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করা।

(প্রথম সীতারাম ইয়েচুরি স্মারক বক্তৃতা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, এইচকেএস ভবন, দিল্লি)
প্রথম অংশের পর...
আমাদের সমস্যা যে জায়গায় ছিল সেটা হল কংগ্রেস এবং মুসমিল লিগ দুপক্ষ দুদিকে দড়ি টানাটানি করছিল। কংগ্রেস চাইছিল তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা (এবং তাতে স্বাভাবিকভাবে সহমত ছিলেন কমিউনিস্টরা)। অন্যদিকে মুসলিম লিগ চাইছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এর সঙ্গে কমিউনিস্ট মতাদর্শের কোনও মিল ছিল না। হিন্দু না মুসলিম, এভাবে কী করে কমিউনিস্টদের ভাগ করা যাবে? কিন্তু আমাদের নেতারা তেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার একটা পরিণাম ছিল, এবং খোলাখুলি ভাবে আমি বলছি যে আমি মনে করি আমরা এখন ১৯৩০ এবং ১৯৪০ এর দশক থেকে যথেষ্ট দূরে চলে এসেছি। তাই ওই নির্দিষ্ট সমস্যাটি সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে।
আপনারা যারা রজনী পাম দত্তের ইন্ডিয়া টুডে (আজিকার ভারত) বইটি পড়েছেন, এবং আমি মনে করি অনেকেই পড়েছেন, সেখানে ভারত সম্পর্কে একটা গোটা অধ্যায় রয়েছে। বইটা লেখা হয়েছিল ১৯৪৫ সালে কিংবা কাছাকাছি সময়ে— ইংল্যান্ডে ও ভারতে সেই সময় যিনি ছিলেন প্রধান কমিউনিস্ট মুখপাত্র, সেই রজনী পাম দত্ত তাঁর লেখায় দেখিয়েছিলেন কেন সাম্প্রদায়িক লাইনে ভারতকে ভাগ করা উচিত নয়। এই অধ্যায়টি ভারত সংক্রান্ত তাঁর এই বইয়ের সবচেয়ে কার্যকর অধ্যায়। হয় আমাদের পাঠকেরা তখন মনোযোগ দিয়ে আর পাম দত্তের লেখা পড়েননি, কিংবা অন্য কোনও কারণ ছিল যাতে সেই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস ও মুসলিম লিগকে একইভাবে দেখার চেষ্টা করেছিল।
অবশ্যই যুদ্ধের প্রশ্নে কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য ছিল, সমস্যাও ছিল। কারণ জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করার পর আমাদের অবস্থান ছিল,যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে হবে, কিন্তু এবিষয়ে কংগ্রেসের যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। এই সমস্যাটা এখানে আলোচনার বিষয় নয়। তবে এ কথা উপলব্ধি করা জরুরি যে ১৯৪১-১৯৪২ এর পর যুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের অবস্থান জাতীয় কংগ্রেসের তুলনায় ছিল একেবারে আলাদা। এবং সেটাই ছিল বিভাজনের কারণ।
সেই বিভাজনের সময় আমরা যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেখানে আমরা কংগ্রসকে মুসলিম লিগের সঙ্গে একাসনে বসিয়েছিলাম, আমি মনে করি, সব সত্যিকারের ইতিহাসবিদের বিষয়টি এখন খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ একই ধরনের সংগঠন ছিল না। মুসলিম লিগ ছিল সাম্প্রদায়িক সংগঠন। কিন্তু কংগ্রেস তা ছিল না। মুসলিম লিগ ব্রিটিশের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। কিন্ত কংগ্রেস ব্রিটিশের বিরোধিতা করেছিল। তাহলে কোন যুক্তিতে আমরা বলতে পারি যে দুটো সংগঠন আসলে একই ছিল। মুসলিম কমিউনিস্টরা কি মুসলিম লিগে যাবে এবং বাকিরা কংগ্রেসে? এখন সময় এসেছে, আমি মনে করি, ৪০ এর দশকে আমাদের ত্রুটি কোথায় ছিল, তা নিয়ে আলোচনা করার। আমি মনে করি এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ এর ফলে বস্তুত ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলন সাম্প্রদায়িক লাইনে বিভাজিত হয়ে গিয়েছিল।
আমার মনে হয় যে আমার স্মৃতি খুব দুর্বল। আমি নাম ভুলে যাই। কিন্তু ১৯৬০এর দশকে পাকিস্তানের একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। উনি ছিলেন আমার বাবার ছাত্র। আমার বাবা কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি, দুদলেরই সমর্থক ছিলেন। এই নির্দিষ্ট অবস্থানটি উনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বজায় রাখতেন। কারণ, বিশেষ করে ৪০ এর দশকের কিছুটা পর্ব জুড়ে
কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরা বলা যায় একে অপরের ‘কণ্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি’ অবস্থায় ছিল। তবে আমার বাবা দুপক্ষকেই চাঁদা দিতেন এবং দুপক্ষকেই খুশি রাখতেন।
যাই হোক, আমার মনে হয়, পাকিস্তানের ওই রাজনীতিবিদ এসেছিলেন ১৯৬০ নাগাদ (তাঁর নাম আমি ভুলে গেছি)। তিনি ছিলেন মুসলিম লিগের সেক্রেটারি, এবং নিজের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ওপর দোষারোপ করা শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি একেবারে সঠিক অবস্থানে ছিলাম। ছিলাম একেবারে এখানকার কমিউনিস্ট নেতাদের মতোই। মসজিদে নামাজ পড়তে যেতাম না। ওসবের ধারেকাছে ঘেঁষতাম না। তবু কমিউনিস্ট পার্টি আমাকে পাঠিয়ে দিল মুসলিম লিগে। কমিউনিস্ট হিসাবে আমি কাজকর্ম ভালই পরিচালনা করতে শিখেছিলাম,ওরা উত্তরপ্রদেশে আমাকে মুসলিম লিগের সেক্রেটারি নির্বাচিত করে দিল। যখন দেশভাগ হল,তখন আমি পাকিস্তানে যেতে চাইনি। কিন্তু পার্টি বলল আমাকে পাকিস্তানে গিয়ে পার্টি গড়ে তুলতে হবে। অতএব আমি সেখানে গেলাম। এবং সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের নামে কোনও পার্টি ছিল না।’ তিনি বলছিলেন, ‘আমি পুরোপুরি দিশাহীন হয়ে পড়লাম।’ বেশ কিছু কারণে উনি বর্তমান কমিউনিস্টদের দোষারোপ করলেন, আমাকেও দোষারোপ করলেন (এবং আমার বাবা কমিউনিস্ট ছিলেন না তবে কমিউনিস্ট পার্টিকে চাঁদা দিতেন)। এবং তিনি বললেন, ‘যেহেতু আপনারা মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে ভাল করে লড়াই করেননি, তাই কমিউনিস্ট আন্দোলন আমাকে হারাল। বলা চলে , সবরকম গুরুতর ইস্যু থেকেই আমি হারিয়ে গেলাম, কারণ পাকিস্তান নিয়ে আমার কোনও আগ্রহই ছিল না।’
যাই হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক সমস্যাটা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে ছিল বিশেষভাবে একটা কঠিন সমস্যা। তবে দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, মুসলিম কমিউনিস্টরা মুসলিম লিগে যাবে এবং হিন্দু কমিউনিস্টরা কংগ্রেসে যাবে, আমি মনে করি এটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত ছিল। আমার মনে হয় অতীতের এই বিষয়গুলি নিয়ে এখন আমাদের খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত কারণ বর্তমানের ঘটনায় এসবের ছায়াপাত ঘটে চলেছে। আমাদের একথা স্বীকার করতে হবে যে, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগকে এক সারিতে বসানোটা সামান্য ভুল ছিল না, বরং ছিল গুরুতর ত্রুটি। তখন দেশে ছিল একটা সাম্প্রদায়িক দল ও একটা জাতীয় পার্টি। সেই সময়ে কংগ্রেসের অন্ততপক্ষে একটা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি ছিল। ওরা ওটাকে সোশালিস্টই বলত। আমরা একে সমাজতান্ত্রিক নাও বলতে পারি, কিন্তু কর্মসূচিটা ছিল জলকল্যাণ মূলক। মুসলিম লিগের এমন কোনও কর্মসূচিই ছিল না। তাহলে কীভাবে মুসলিম কমিউনিস্টদের মুসলিম লিগে যেতে বলা যাবে?
সেকারণে আমি বলছিলাম, আমার বাবার এক ছাত্র যার নাম আমি ভুলে গেছি কারণ আমি এখন যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছি, তিনি ১৯৬০ এর দশকে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন এবং অভিযোগ করেছিলেন যে তাঁর জীবনের অস্বস্তির জন্য দায়ী কমিউনিস্ট পার্টি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মুসলিম লিগে যেতে চাইনি। কিন্তু পি সি যোশি আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, যেহেতু আপনি একজন মুসলিম এবং আমাদের মুসলিম কমরেডের সংখ্যা কম, মুসলিম লিগে আমাদের কথার বলার লোক চাই, তাই আপনার ওখানে যাওয়া উচিত। যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি আমাকে ভাল করে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, তাই আমি দ্রুত ইউ পির মুসলিম লিগের সেক্রেটারি হলাম এবং পরে পাকিস্তানে গিয়ে প্রথমে হাই কোর্টের ও পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হই। ’ তিনি তাঁর এতকিছুর পরিণতির জন্য দায়ী করেছিলেন মার্কসবাদ থেকে বিচ্যুতির কারণকে। তিনি দায়ী করেছিলেন পি সি যোশিকে এবং তাঁর মুসলিম লিগ তোষণের নীতিকে।
আমি একথা নিশ্চয় মনে করি যে,যখন আমরা কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস আলোচনা করছি, তখন খোলা মনে বিবেচনা করতে হবে গত শতকের ৩০ ও ৪০এর দশকে কংগ্রেস ও মুসলিম লিগকে এক করে দেখার সিদ্ধান্তকে এবং কার্যত কংগ্রেসকে হিন্দু সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করাকে— কারণ একবার যখন আপনি বলছেন মুসলিম কমিউনিস্টরা মুসলিম লিগে যাবেন তখন কংগ্রেসকে হিন্দু সংগঠন হিসাবেই বিবেচনা করা হচ্ছে— এটা ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। আমাদের পার্টির ইতিহাসে এই বিষয়টা ঠিক কীভাবে ঘটেছিল সেটা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
তবে একথাও আমি মনে করি যে কমিউনিস্ট আন্দোলেন জটিলতাও রয়েছে যার স্বীকৃতি দিতে হবে। বিশেষ করে যখন জার্মানি রাশিয়াকে আক্রমণ করে বসল, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী কী হওয়া উচিত ছিল। বিশ্বের প্রথম সারির ফ্যাশিস্ত পার্টি বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশকে আক্রমণ করেছে। সেই ফ্যাশিস্ত পার্টিই আবার বিশ্বের প্রথম সারির শক্তি। সেই পরিস্থিতিতে কী আমরা বলেই যাব যে এই যুদ্ধ হল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ? নাকি আমরা বলব, এই যুদ্ধ আগে ছিল দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মধ্যে, সেই যুদ্ধের চরিত্র এখন বদল হয়েছে? এবং একথা বলব যে, এই যুদ্ধটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্যাশিস্ত শক্তি জার্মানি ও জাপান এবং নেতৃত্বদায়ী শ্রমিক প্রজাতন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ গণচীনের মধ্যে একটি যুদ্ধ?
অনেকেই আছেন যারা ভাবতে পারেন যে আমাদের পার্টি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা ভুল ছিল। কিন্তু আমরা স্থির করেছিলাম যে, যুদ্ধটা সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যেকার যুদ্ধ থেকে পরিণত হয়েছে জনযুদ্ধে, কারণ রাশিয়া আক্রান্ত হয়েছে এবং জাপান চীনে আগ্রাসন তীব্রতর করেছে। অনেকেই রয়েছেন যারা মনে করেন এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। এবং এর ফলে আমরা ভারতের জাতীয় আন্দোলনের বাইরে চলে গিয়েছিলাম। মনে রাখবেন, এই সময়টা ছিল ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব নেওয়ার সময়— আজকের দিনেও এই প্রস্তাবটি খুবই বেমানান মনে হয়, যখন আমরা ভাবি যে জাপান তখন ভারতের সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তখন কি এই আওয়াজ দেওয়াটা সঠিক ছিল যে ব্রিটিশ ভারত ছাড়ো? তখন একথা বলা কি ঠিক ছিল যে ভারত ছাড়োর জন্য এখনই আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু করতে হবে?
যদি জওহরলাল নেহরুর নিজের লেখাপত্রের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সেই সময় ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করা দূরে থাক, তিনি ভাবছিলেন ভারতীয়রা জাপানি আগ্রাসন কীভাবে ঠেকাবে, কীভাবে তারা জাপানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তখন তাঁর মনোজগতে জাপানই শত্রু। কিন্তু কোনও কারণে, কংগ্রেস যখন ভারত ছাড়ো প্রস্তাব পাস করল, নেহরুও তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। আমি মনে করি আজকের দিনে আমাদের দিক থেকে উপযুক্ত হবে, ১৯৪২ সালে কংগ্রেস যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এই প্রস্তাবের ফলেই তথাকথিত ভারত ছাড়ো আন্দোলন এমন একটা সময়ে শুরু হয় যখন জাপানিরা আমাদের সীমান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
জানেন কি এতে ভারতীয় জনগণ কীভাবে সাড়া দিয়েছিল? পুলিসি সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছিল। পথে বিক্ষোভ হল। তবে এর আগে কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল তেমনটা কিছু হল না। মোটেই এই বিক্ষোভ আগের আন্দোলনগুলির মতো ছিল না। যদিও বিশেষ করে সোশালিস্টরা বোমা ব্যবহার করতে শুরু করল— এমনকী আলিগড় রেল স্টেশনে সোশালিস্টদের বোমার ঘায়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল, মৃতদের দুজনই রাতের রোঁদে বেরোনো পুলিশকর্মী, প্ল্যাটফর্মে থাকা সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয় — এসব ঘটেছিল ভারত ছাড়ো প্রস্তাবের জেরেই।
আমি মনে করি একথা বলাটা সঠিক যে, ভারত ছাড়ো প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল ভুল সময়ে। সেই সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল না। জাপানি ও জার্মান ফ্যাসিবাদকেই তখন প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা উচিত ছিল। পরে ব্রিটিশদের মোকাবিলা করা যেতে পারত। আমি মনে করি, আজকের সময়ে একথাই আমাদের বলা উচিত। তখন কমিউনিস্ট পার্টি এই কথাই বলেছিল এবং আমি মনে করি আমাদের এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থানের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে:অর্থাৎ হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর, প্রাথমিক কাজ ছিল ফ্যাশিস্ত শক্তিগুলিকে পরাস্ত করা এবং তারপরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মোকাবিলা করা। আরও একটা বিষয় আমাদের নজর দেওয়া দরকার, সেটা হল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একেবারে নিখাদ ভারতীয় সংগ্রাম হিসাবে বিবেচনা করা যাবে না। ব্রিটেনেও আমাদের বন্ধুরা ছিলেন। এমনকী যুদ্ধের সময়ও ব্রিটিশ লেবার পার্টি বলেছিল, যদি তারা যুদ্ধের পর ক্ষমতায় আসে তারা ভারতকে স্বাধীনতা দেবে। আপনারা জানেন, ব্রিটিশ কমিউনিস্টরাও ছিলেন যাঁরা ১৯২০র দশকে ও ১৯৩০এর দশকের গোড়ায় ভারতের জেলে বন্দি ছিলেন।
আমি ও আমার স্ত্রী এই ধরনের একজন ব্রিটিশ এমপির শোকযাত্রায় উপস্থিত ছিলাম। আমরা জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম যে তাঁর কন্যা একথা জানতেনই না যে তাঁর বাবাকে কংগ্রেসের আন্দোলন সমর্থন করার জন্য ভারতের জেলে থাকতে হয়েছিল। একথা যখন তাঁকে বলি তিনি একেবারে যেন আকাশ থেকে পড়লেন, কারণ আপনারা জানেন, ব্রিটিশদের একটা প্রথা হল তাঁরা কখনই অহঙ্কার প্রকাশ করেন না। তাই বাবা কখনও নিজের মেয়ের কাছেও গর্ব করে বলেলনি যে তিনি ভারতীয় জেলে ছিলেন। যখন তাঁর মেয়েকে আমরা এসব কথা বললাম, তখন তিনি খুবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। যদিও ততদিনে তাঁর বাবাকে সমাহিত করা হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত সেই লেবার এমপির নাম আমি ভুলে গেছি। তবে এরকম একটা সময় যে ছিল তা আমরা এখনও মনে করতে পারি। তাঁর শোকযাত্রায়, তিনি মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় জেলে গিয়েছিলেন, শ্রীমতি পণ্ডিতের জন্যই আমি মনে করি, ব্রিটিশ হাই কমিশন একটা বিশাল পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছিলেন। এবং সেই পুষ্পস্তবকে লেখা ছিল ‘ভারতের কৃতজ্ঞতা’।
এখন এটা স্পষ্ট যে, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের অনেক বন্ধু বিদেশেও ছড়িয়ে ছিলেন এবং আজকের দিনেও তাঁদের সম্মান জানাতে হবে। আগেই বলেছি, তিন জন ব্রিটিশ এমপিকে ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে সমর্থন করার জন্য ভারতের জেলে থাকতে হয়েছিল।
আজ আমরা আমাদের পুরনো, প্রয়াত কমিউনিস্ট কমরেডকে স্মরণ করছি। আমি মনে করি, আমরা সকলে সমবেত হয়ে তাঁর স্মৃতিকে স্মরণ করছি, এটা পুরোপুরি সঠিক কাজ। তবে পাশাপাশি এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা সেই আদর্শকেও আগামী দিনে সমর্থন করে যাব যে আদর্শের পক্ষে তিনি সারা জীবন লড়াই করেছেন: সেটা হল ভারতে সমাজতন্ত্র ও জনগণতন্ত্রের আদর্শ।
শেষ করার আগে আমি একথা বলব যে, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র, দুটোই হল অমূল্য। একটা ছাড়া আরেকটার মূল্য থাকতে পারে না। আমি মনে করি, যদি আমরা ভাবি যে সমাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেটা ভুল ভাবনা। তাই আজকের ভারতে আমাদের শুধু সমাজতন্ত্রের প্রচার করলেই চলবে না, আমাদের পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষেও প্রচার চালাতে হবে। ভারতে সেই সমাজতন্ত্র দরকার যা এদেশের মানুষেরা চায়, যে সমাজতন্ত্রের কথা আমরা মানুষকে বুঝিয়েছি।
এবং আজকের দিনে আমরা স্মরণ করছি আমাদের খুবই মূল্যবান একজন কমরেডের প্রয়াণকে। তিনি আমাদের পার্টির বড় নেতা ছিলেন। একইসঙ্গে আমরা নিজেরা নিজেদের মনে একথা যেন বিবেচনা করি (আমি শপথ নিতে বলছি না), কিন্তু নিজেদের মনে মনে একথা ভাবব যে কীভাবে আমরা এই দেশে যুক্তি ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। কীভাবে আমরা একটা সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে পারি যেখানে, যতদূর সম্ভব, আমাদের সহনাগরিকদের বিশাল অংশ গ্রহণ করবেন।
আমি মনে করি, আমি যা বলতে চেয়েছি তা আপনাদের কাছে বলেছি। এর মধ্যে নতুন কিছুই নেই। এমনকি নতুন উদ্ভাবনও কিছু নেই। তবে আমি মনে করি যেসব নির্দিষ্ট বিষয় আমি উল্লেখ করেছি সেগুলো এখানে মনে করিয়ে দেওয়া খুবই দরকার ছিল। আগের মতোই শেষ করার সময় আমি আপনাদের একথা বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করব, যে বিষয়গুলি আমি এখানে উল্লেখ করেছি, সেগুলি নিয়ে যদি ইতিমধ্যেই ভেবে না থাকেন, তাহলে ভাববেন।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ২৭-সেপ্টেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
