Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

জো স্যাকোর ওয়ার অন গাজা: নিরন্তর বলে যাওয়া জরুরি কথা

তর্পণ সরকার
দেশ-কাল-সমাজ-মানুষ এবং তাদের যন্ত্রণা-হাহাকার, বাস্তব মাটির কথা কমিক্স শিল্পে নিয়ে আসায় জো স্যাকো’র ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং একই সাথে তিনি হয়ে উঠেছেন গোটা দুনিয়ার আরও বহু শিল্পীর প্রেরণা। জো স্যাকো ২০২৩ সালে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যা শুরুর পরেও চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। তিনি প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, তাঁর ভঙ্গিতে।
Joe Sacco's War on Gaza- What's Important to Say Constantly

২৮ অক্টোবর ২০২৩ সেনাদের একটি জমায়েতে বক্তৃতার সময় ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হিব্রু বাইবেল-এর আমালেকের প্রসঙ্গ তোলেন বাইবেল অনুযায়ী আমালেক ইজয়ারেলিদের শত্রু লোহিত সাগর ও মৃত সাগরের মাঝের অঞ্চলে এদের বাস হামেশাই আমালেকদের অ-মানুষ হিসেবে দেখানো হয়ে থাকে আর তাই ইহুদিদের স্বয়ং ঈশ্বর কর্তৃক সমর্পিত দায়িত্ব হল—আমালেকদের সমূলে বিনাশ করা বাইবেলের এই সূত্রকে সামনে রেখেই নেতানিয়াহু রচনা করেন প্যালেস্তিনীয়দের গণহত্যার এক ঐশ্বরিক আত্মপক্ষ সমর্থন, গাজা ভূখণ্ডকে পরিণত করেন বিশ্বের মহা-হত্যাশালা হিসেবে আর এই সমূলে বিনাশের ছবিই আমাদের সামনে অস্বস্তিকরভাবেই, হাজির করেন জো স্যাকো, তাঁর ওয়ার অন গাজা কমিক্সে শুধু ইজরায়েল না, গাজা গণহত্যায় আমেরিকা আর ইউরোপের ভূমিকা গ্রাফিকায়িত করেন জো স্যাকো একটি প্যানেলে (পাতায়) দেখা যায় পূর্বতন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের মুখ থেকে শয়ে শয়ে শিশুর কাটা মুণ্ডু বেরিয়ে আসছে জো তাঁর কমিক্সে বাইডেন এবং ট্রাম্পকে একই ধর থেকে বেরোনো দুটি মাথা হিসেবে দেখিয়ে বলেন, মার্কিনীদের বেছে নিতে হবে একজন রাষ্ট্রপতি যিনি একটি গণহত্যাকে মদত দিয়েছেন, আরেকজন যিনি আমাদের গণতন্ত্র শেষ করবেন—এই দুইয়ের মধ্যে কমিক্সটি তৈরির থেকে ট্রাম্পের জয়ের দূরত্ব পাঁচ মাসের এবং ট্রাম্পের পরিকল্পিত ‘শান্তি স্থাপন’-এর দূরত্ব ষোলো মাসের কিন্তু এতদিন আগেই যেন ভবিষ্যতের খোঁজ দিয়েছিলেন তিনি এইভাবেই গাজা ভূখণ্ডে ঘটা গণহত্যা নিয়ে পরপর তাঁর বলতে চাওয়া কথাগুলো তিনি জানিয়ে দেন—তাঁর চেনা ভঙ্গিতেই




জো স্যাকো কমিক্সবিশ্বে অত্যন্ত পরিচিত তাঁর নিজস্ব সাংবাদিকতাধর্মী কমিক্সের জন্য যদিও সেই ভঙ্গিটি তিনি তাঁর কাজের একদম শুরু থেকে ব্যবহার করা শুরু করেননি প্রথমদিকে কমিক্স তৈরি করেছেন রোমান্টিক গল্প নিয়ে, ট্রু লাভ (ইংরেজি তরজমায়, মূল কমিক্সটি মালটিজ ভাষায়) শীর্ষক কমিক্সটিকেই প্রথম মালটিজ কমিক্স হিসেবে ধরা হয়ে থাকে যদিও পরে ধীরে ধীরে তাঁর কাজ হয়ে উঠেছে অনেক বেশি বিশ্ব-রাজনীতির বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ঘটনার রিপোর্টাজ এবং ডকুমেন্টেশন একাধিক কমিক্স তৈরি করেছেন গত শতকের শেষ দশকে বসনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে—সেফ এরিয়া গরাজডে, ২০০০; দ্য ফিক্সার, ২০০৩; ওয়ার’স এন্ড: প্রোফাইল ফ্রম বসনিয়া, ২০০৫ প্যালেস্তাইনে ১৯৯১-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯২-এর জানুয়ারি অবধি কাটানো দু-মাসের অভিজ্ঞতা আর তার সাথে ইজরারেল-প্যালেস্তাইন সংকটের কয়েক দশক দীর্ঘ ইতিহাস ঘেঁটে তৈরি করেন কমিক্স প্যালেস্তাইন, যা প্রথমে ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হলেও পরে দুই মলাটে একটি বই হিসেবে প্রকাশ পায় ২০০১ সালে গাজা ভূখণ্ডে ঘটা দ্বিতীয় ইন্তিফাদার স্মৃতি নিয়ে মূল ঘটনার কয়েক দশক বাদে অসংখ্য সাক্ষাৎকার নিয়ে, সেনাবাহিনির আর্কাইভ থেকে নথি সংগ্রহ করে তৈরি করেছেন ফুটনোটস্‌ ইন গাজা, ২০০৯ এই কাজগুলি করতে করতেই তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব ভাষা, যেখানে ফিকশন, নন-ফিকশন, সাংবাদিকতা মিলেমিশে যায় 

তাঁর প্যালেস্তাইন বইটির ভূমিকা লিখেছেন এডওয়ার্ড সঈদ তাতে তিনি টিনটিন, অ্যাসটেরিক্স-এর মতো কমিক্সের সাথে প্যালেস্তাইন-এর মতো কমিক্সের একটি বিপ্রতীপ তুলনা টেনেছেন কমিক্স শিল্প মাধ্যমটিকে একটি মায়াবি, রূপকথার বা সুপার হিরোদের সমাবেশ ও অদ্ভুত রোমাঞ্চকর সব কাণ্ডকারখানার জগৎ হিসেবেই একটা বড়ো সময় অবধি গণ্য করা হত সেখানে নন-ফিকশন, রিপোর্টাজধর্মী কমিক্স তৈরি করে এক নতুন ধারা তৈরি করেন জো স্যাকো যদিও তিনিই কমিক্সের হাস্যরসাত্মক, রূপকথা বা সুপার হিরোকেন্দ্রিক প্রবণতার উল্টোদিকে প্রথম হেঁটেছেন, এমনটা নয় বিশেষত আমাদের মনে রাখা উচিত হলোকস্টের স্মৃতি নিয়ে আর্ট স্পিগেলম্যানের মাউস, কিংবা গত শতকের ষাটের দশকে মেক্সিকোর শিল্পী রিয়াসের কিউবা ফর বিগিনার্স-এর মতো কমিক্স তৈরি হয়ে গেছে জো স্যাকোর আগেই তবুও, দেশ-কাল-সমাজ-মানুষ এবং তাদের যন্ত্রণা-হাহাকার, বাস্তব মাটির কথা কমিক্স শিল্পে নিয়ে আসায় জো’র ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং একই সাথে তিনি হয়ে উঠেছেন গোটা দুনিয়ার আরও বহু শিল্পীর প্রেরণা জো স্যাকো ২০২৩ সালে প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যা শুরুর পরেও চুপ করে বসে থাকতে পারেননি তিনি প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, তাঁর ভঙ্গিতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছেন—ওয়ার অন গাজা


দ্য কমিক্স জার্নাল-এ দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ওয়ার অন গাজা-কে জো স্যাকো নিজেই একটি রাজনৈতিক প্যামফ্লেট বলেছেন তিনি জানিয়েছেন অক্টোবর ৭, ২০২৩-এ হামাসের জঘন্য হামলার অভিঘাতে তিনি নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু তারপর সেটাকে শিখণ্ডী করে ইজরায়েল যেভাবে গণহত্যার ন্যায্যতা তৈরি করেছে, সেটা আরও ভয়াবহ তিনি জানান অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজায় যা ঘটছে, তাতে গণহত্যা শব্দটি যথার্থ নয়; এটা আরও বেশি কিছু তা প্রকাশের হয়তো কোনও শব্দ বা শব্দবন্ধ নেই একে ব্যাখ্যা করা আমাদের চেনাপরিচিত শব্দভাণ্ডারের আয়ত্তের বাইরে প্রথম পৃষ্ঠাতেই তিনি এই কমিক্স তৈরির কারণটি সোজাসুজি জানিয়ে দেন প্যালেস্তাইন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বারবার ভেবেছেন তাঁর কিছু বলা উচিত এই ভাবনা থেকেই খানিক সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে তাঁর ভিতরে বেশ কিছু কথা জমেছে সেগুলোই তিনি জানাচ্ছেন, সোচ্চারে


এটি তাঁর আগের দুই প্যালেস্তাইন বিষয়ক কমিক্সের থেকে বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা তাঁর নিজস্ব সাংবাদিকতাধর্মী শৈলী এখানে তিনি ব্যবহার করেননি পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এটি তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত ওয়ার অন গাজা গবেষণা ও ক্ষেত্রসমীক্ষা করে তুলে আনা তথ্য থেকে তৈরি করা নয় প্যালেস্তাইনফুটনোটস্‌ ইন গাজা-র মতো এতে প্যালেস্তিনীয় মানুষদের বয়ান তুলে ধরা হয়নি এটি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক, মানবিক ও নৈতিক প্রতিক্রিয়া যদিও অন্য দুই কমিক্সের মতো এখানেও তিনি নিজে একটি চরিত্র হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন ফারাকটি হল, সেখানে তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রোতার ভূমিকায় থেকেছেন কিন্তু এখানে তিনিই বক্তা পাঠকের কাছে সাধারণ প্যালেস্তিনীয় মানুষের বয়ান পৌঁছে দিতে তিনি নিজের চরিত্রটি যেভাবে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, ওয়ার অন গাজা-তে সেটি অনুপস্থিত বরং তিনি নিজের টুকরো পুরোনো স্মৃতি এবং বর্তমানে ঘটা ঘটনার এক বিমূর্ত মিশেল ঘটান এখানে প্যানেলের বিন্যাস এবং কাহিনির ভিতরের ঘটনাগুলি অনেকটাই বিমূর্ত যদিও তা বাস্তব ঘটনারই উপস্থাপনা এই বিমূর্ততা আসলে জো-কে স্থানসংকুলান করে দিয়েছে নিজের হতাশা, ক্ষোভ, ঘৃণা প্রকাশ করার ডকুমেন্টারির ভঙ্গিতে হয়তো এত সরাসরি নিজের কথাগুলো বলা সম্ভব হয় না কথক হিসেবে এক নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান না নিলে তাঁর প্যালেস্তাইন ফুটনোটস্‌-এর লক্ষ্য পূরণ হত না আবার সেই নৈর্ব্যক্তিকতাই তাঁর অন্তরায় হওয়ায় তা তিনি সযত্নে বর্জন করেছেন ওয়ার অন গাজা-তে প্যালেস্তাইন-এ ইজরায়েলি সেনাদের কাছে বন্দি প্যালেস্তিনীয় নাগরিকদের কাহিনি তিনি দেখিয়েছেন প্রায় নজরদারি ক্যামেরার কোণ থেকে—বেশ খানিকটা উঁচু এবং নিচের দিকে কোণ করে এই দৃষ্টি আসলে এক ধরনের বৈধতা নির্মাণ করে পাঠক অজান্তেই ইজরায়েলি জেলখানার ক্যামেরার দৃষ্টিতেই দেখতে পান ইজরায়েলিদের প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপরে অত্যাচার তখন এই অত্যাচারের বর্ণনা শুধু বন্দিদের বয়ান হয়েই থাকে না, ইজরায়েলির ক্যামেরায় পাঠক নিজেই তা দেখে ফেলতে পারেন, জো সেই ব্যবস্থাটুকু করে দেন

ওয়ার অন গাজা-তে জো একাধিক ‘অবাস্তব’ দৃশ্যপট তৈরি করেছেন যেমন বুক অফ জেনেসিস-এর প্যারোডি করে ‘আ রিডিং ফ্রম দ্য বুক অফ জেনোসাইড’ নামে দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে গাজা শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর বাইডেন দাঁড়িয়ে আকাশের মেঘের ওপরে ঈশ্বরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলছেন কোনও সন্দেহই নেই এটি ‘অবাস্তব’ দৃশ্য কিন্তু শেষ দু-বছরের বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, গাজা গণহত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদত, এসব দেখে কি আমরা এই ছবিটিকেই চরম বাস্তব হিসেবেই দেখব না? বিমূর্ততার এই সুবিধেটাই জো করে নিয়েছেন এই বইয়ে

একদম শেষে তিনি ইতালীয় কবি দান্তের শরণাপন্ন হন গাজায় ঘটা ঘটনাকে বোঝাতে ঠিক যেভাবে শব্দভাণ্ডারে শব্দ কম পড়ছিল; তেমনই জো যেন বোঝাতে চান লোভ (দান্তের ডিভাইন কমেডি অনুযায়ী নরকের চতুর্থ বলয়), হিংসা (সপ্তম বলয়), বিশ্বাসঘাতকতা (নবম ও শেষ বলয়)—এইসব পাপের সংজ্ঞায় নেতানিয়াহু, বাইডেন ও তাদের সহযোগীদের বিচার করা যাবে না তাদের জন্য কবি দান্তে যেন দশম একটা কোনও বলয় তৈরি করেন এখানে জো তাঁর কমিক্স শেষ করেন এবং দান্তের হাতে ছেড়ে দেন এইসব দোষী নেতাদের বিচারের ভার

আগের দুটি বইয়ে জো-এর আঁকা ঘরবাড়ি এখন আর নেই সেগুলির ভাঙা ইট-কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে জো জড়ো করেছেন এই বইয়ে, তাই এটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শুধুই ভাঙাচোরা শহরের, সভ্যতার স্মৃতি বর্তমান গাজা ভূখণ্ডের কাছে আগের দুটি বইয়ের ছবিগুলি এখন স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই না ক্রমাগত হামলায় নির্মাণ হয়েছে এক বিনির্মিত শহরের সেখানেই এই কমিক্সে হেঁটে বেড়ায় জো বাইডেন সারি সারি পুঁটলি করা লাশের ওপর প্যারাসুট করে এসে পরে ত্রাণ আর তাই জো লেখেন—গাজা হল সেই জায়গা যেখানে পাশ্চাত্য মরতে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকেই, হয়তো টেলিভিশন ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রম উন্নতির জন্যই যুদ্ধ হয়ে উঠেছে ভাষ্যের যুদ্ধ। কোন ভাষ্য মানুষকে কতটা প্রভাবিত করছে, তাই দিয়েই প্রায় ঠিক হয়ে যায় কোনও যুদ্ধের ‘নিয়তি’। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেষ কিছু বছরে পরপর বিভিন্ন মার্কিন খবরের চ্যানেল কিনে নেওয়া কিংবা আমাদের দেশে আদানি-আম্বানি মিলে বেশিরভাগ জাতীয় খবরের চ্যানেলগুলি কিনে নেওয়ার লক্ষ্য একটিই—নিজেদের ভাষ্যকে জয়ী করা। প্যালেস্তাইন নিয়েও এই একইরকম একটি সমস্যা দেখা যায়। গোটা বিশ্বের আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্যালেস্তিনীয় ভাষ্যের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছে সবরকমভাবে। রাষ্ট্রের দমনমূলক সমস্ত পরিকাঠামো ব্যবহার করে– কখনও প্যালেস্তাইনের পক্ষে থাকা মানুষদের ইহুদি-বিদ্বেষী তকমা দিয়ে, কখনও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালেস্তিনীয় ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে কিংবা গাজায় ইজরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাসজমিতে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদরত ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এখানেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জো স্যাকোর কাজ। তিনি নিরন্তর কাজ করে গেছেন উপনিবেশবাদ বিরোধী, আগ্রাসন বিরোধী, মানবতাপন্থী এই ভাষ্যকে আর বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে; কমিক্সের মতো এমন একটি আকর্ষণীয় মাধ্যমে

ওয়ার অন গাজা তৈরি করেই তিনি থেমে থাকেননি এই বছর সেপ্টেম্বরের শুরতেই আরেকটি দু-পৃষ্ঠার কমিক্স বের করেন—দ্য অ্যাঞ্জেল লাফস্‌। সেখানে বড়িঘরের ধ্বংসাবশেষের ওপর কিছু সহায়সম্বলহীন মানুষের ওপর টেক্সট বসিয়ে দেন—গাজার মানুষেরা, আমরা তোমাদের বোমা মারব। অভুক্ত রাখব। তোমাদের পাঁজর গুনব। কবরখানার মতো তোমাদের ভাঙাচোরা শহরকে সমুদ্র সৈকতের ধারের সম্পত্তি হিসেবে তৈরি করব। ছবি এবং লেখাগুলো এতটাই পরস্পরবিরোধী যে এদের একত্র অবস্থান স্বাভাবিক বোধবুদ্ধির বিপর্যয়ের নকশা তৈরি করে। অথচ সত্যিই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি আর তার জামাইয়ের ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী গাজা ভূখণ্ড নিয়ে এমনই পরিকল্পনা। এই ছোট্ট কমিক্সে তিনি যেন নীৎসের সমোচ্চারণে শেষে বলেন—ঈশ্বর মৃত, তাই শাসকেরাই নিয়ম বানাবে আর তারাই সেগুলো ভাঙবে।

এই ইজরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেই তিনি হলোকস্টের স্মৃতি নিয়ে তৈরি গ্রাফিক আখ্যান মাউস খ্যাত আর্ট স্পিগেলম্যানের সাথে মিলে তৈরি করেছেন আরেকটি কমিক্স—নেভার এগেইন অ্যান্ড এগেইন… সেখানেও তিনি নিজে এবং মাউস রূপী স্পিগেলম্যান দাঁড়িয়ে আছেন ধ্বংসস্তুপের ওপর সেখানে জো বলছেন, ইজরায়েল একটি ব্যর্থ পরীক্ষা; ভাবো একবার ইজরায়েলের কোনও অস্তিত্ব নেই! আর্ট উত্তর দিচ্ছেন; অনেক দেরি হয়ে গেছে, এর অস্তিত্ব রয়েছে সবশেষে আর্ট আরও বলছেন, একদল যন্ত্রণাকাতর মানুষ আরেকদলকে যন্ত্রণা দিচ্ছে

এই কথাগুলি এইসময়ের দলিল হিসেবে রয়ে যাবে শিল্প আমাদের সমসময় কি আমাদের সমস্যার, যন্ত্রণার উপশম ঘটায়? বেশিরভাগ সময়েই ঘটাতে পারে না কিন্তু শিল্প আমাদের ব্যথার, ক্ষোভের, যন্ত্রণা, হতাশা, না-ইনসাফির, বঞ্চনার আর্কাইভ হয়ে ওঠে অনেকসময়েই ওয়ার অন গাজা-তে জো এই কাজটিই করেছেন এবং তা করেছেন বহুস্তরে এখানে জো’র ৯৫ বছর বয়সী মা’কে দেখা যায় তিনি জানান তাঁর শৈশবে যুদ্ধের স্মৃতি আট দশক আগের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিকে হাতড়ে তিনি জানান যুদ্ধ এক ভয়ানক ব্যাপার গাজার ২০২৫-এর শিশুরাও হয়তো এমন বহু দশক পরে জানাবে, যুদ্ধ এক ভয়ানক ব্যাপার আর এরমধ্যে কত শিশু গল্প শোনানোর মতো বয়সেও পৌঁছতে পারল না এই কমিক্সেই জো দেখান, কত শিশুর জন্ম আর মৃত্যু শংসাপত্র লিখতে হচ্ছে একইসাথেই শিল্পকে এইভাবেই বহুস্তরীয় আর্কাইভ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন জো



আমাদের চারিপাশ মূলত দৃশ্যকেন্দ্রিক আমরা যা দেখি, তাকেই বুঝি, তাকেই সংগ্রহে রেখে দিই তাই ভাষ্যের যুদ্ধে ইমেজ অতি দরকারি বিষয় এই কমিক্সেই জো দেখিয়েছেন, প্যালেস্তিনীয়দের হত্যা করেই ইজরায়েলি সেনারা থেমে থাকছে না, তার স্মারক হিসেবে সেলফি বা রিল তুলে রাখতে হচ্ছে। হামেশাই এআই নির্মিত হাজারটা মিথ্যা ইমেজ যেখানে মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে সেইরকম পরিস্থিতিতে কমিক্স মাধ্যমে তাঁর এই কাজ তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জো স্যাকো এতটাই স্পর্শকাতর ইমেজের জন্ম দিয়েছেন যেগুলি পাঠকের ভাবনার প্রণোদনা জোগায়, এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিরোধী তিনি জানান, তাঁর কাজে হয়তো কিছু বদলাবে না কিন্তু তাও তিনি এইরকম কমিক্স তৈরি করেন এবং করবেন কারণ, তাঁর মতে এটাই উচিত কাজ এবং তিনি কমিক্স মারফত যে কথাগুলো বলেন, সেগুলো বলে যাওয়াটা জরুরি 

আর এই নিরন্তর বলে যাওয়া মানবিক এবং উচিত কথার জোরেই একদিন হয়ত সবকিছুই বদলাবে, শুধু ততদিন কথাগুলো বলা থামানো যাবেনা, কিছুতেই।

টীকা:
১. আমালেক হল সেই সম্প্রদায়, যারা হিব্রু বাইবেল-এ অনুযায়ী ইসরায়েল জাতির শত্রু। 
২. গ্রাফিক ন্যারেটিভ একটা বড়ো ছাতার মতো শব্দ যার মধ্যে গ্রাফিক নভেল (ছবিতে আঁকা গপ্প), কমিক্স, কার্টুন-ক্যারিকেচার ইত্যাদি নানা বিষয় অন্তর্গত। জো স্যাকো নিজের কাজকে কমিক্স বলতেই পছন্দ করেন, সেকারণে এখানে কমিক্স হিসেবেই তা উল্লেখ করা হল।
৩. আর্ট স্পিগেলম্যানের মাউস বিখ্যাত একটি কমিক্স/গ্রাফিক নভেল। যেটি ১৯৮০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। স্পিগেলম্যান তাঁর বাবার সাথে কথা বলছেন যিনি হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে ফেরা একজন পোলিশ ইহুদি। কাহিনির সময়কাল মোটামুটি ১৯৩০-৪৫ পর্যন্ত। আর্ট এখানে আশ্চর্য একটা কৌশল নিয়েছেন— ইহুদিরা আদতে ইঁদুর, জার্মান নাৎসিরা বেড়াল আর পোল্যান্ড হল শূকর; শিকার এবং শিকারির অনুসঙ্গ। যে-কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইদুঁররূপী ইহুদিদের বন্দি করে রাখা হয়েছে সেটির নাম ‘মাউসভিটস’; আমাদের মনে করিয়ে দেয় নাৎসিদের তৈরি কুখ্যাত আউতভিটস কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কথা।

সূত্র:
1. Banerjee, Arunava. “The Joe Sacco Interview: ‘If My Work Is Going to Be Journalistic, It Needs to Be Representational.’” Scroll.in, 16 Dec. 2024, scroll.in/article/1076684/the-joe-sacco-interview-if-my-work-is-going-to-be-journalistic-it-needs-to-be-representational.
2. Rabiroff, Zach. “‘I’m Doing the Work I Need To Do To Live With Myself’: Joe Sacco On Democracy, Genocide, and Drawing the Truth - the Comics Journal.” The Comics Journal, 17 May 2025, www.tcj.com/im-doing-the-work-i-need-to-do-to-live-with-myself-joe-sacco-on-democracy-genocide-and-drawing-the-truth.
3. Sacco, Joe. “Joe Sacco’s the Angel Laughs - the Comics Journal.” The Comics Journal, 9 Sept. 2025, www.tcj.com/the-angel-laughs.
4. Sacco, Joe. Palestine. Random House, 2003.
5. Sacco, Joe. “The War on Gaza - the Comics Journal.” The Comics Journal, www.tcj.com/topic/the-war-on-gaza.
6. Sacco, Joe. “Two Artists, One Catastrophic War … Joe Sacco and Art Spiegelman on Israel-Gaza and the Ceasefire – Cartoon.” The Guardian, 16 Feb. 2025, www.theguardian.com/world/picture/2025/feb/14/joe-sacco-art-spiegelman-israel-gaza-war-ceasefire-cartoon.


প্রকাশের তারিখ: ২২-অক্টোবর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫