সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কাজী নজরুল ইসলাম: ‘দুই সমুদ্রের মিলন’
আবুল হাসনাত
রুমির কর্মচঞ্চল, পৌরুষপূর্ণ ‘আমি’-র সঙ্গে নজরুল শোষণ-বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আধুনিক মনকে যুক্ত করেছেন। এইখানেই ‘বিদ্রোহী’-র বিশেষত্ব। আবার সাম্যবাদীর বিখ্যাত চরণ “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই” (তুলনীয় রুমির: “আজ হাজারাঁ কা’বা ইয়াক দিল বেহতর আস্ত”) এবং এই সুরের আরো সব চরণ ওমর খৈয়াম এবং রুমির কাব্য থেকেই নজরুল গ্রহণ করেছেন। আর এঁদের কাছ থেকেই তিনি তথাকথিত শাস্ত্রের বিরোধিতার ভাবটিও গ্রহণ করেছেন। অনেকেই রুমির বিখ্যাত কথা স্মরণ করতে পারেন, আমি কোরান থেকে মজ্জা গ্রহণ করেছি আর এর অস্থিগুলি চতুষ্পদ জন্তুর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি। আর আচার-সর্বস্বতার প্রতি হাফেজের বিদ্রোহ তো প্রবাদবাক্যের মতো।

[বাংলার এক বাদশা কবি হাফেজকে এ-বঙ্গে আসতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু হাফেজ আসতে পারেননি। তবে, সাহিত্য-সংস্কৃতির সূত্র ধরে এসেছিলেন হাফেজ, এসেছিলেন রুমি, সা’দি। মিলিত হয়েছিলেন আমাদের ভাষার সাথে। যাঁরা এই সাংস্কৃতিক-সমন্বয়ের সম্ভাবনা গড়ে তুলেছিলেন নজরুল ছিলেন তাঁদেরই একজন এবং গঙ্গা-ইউফ্রেটিস অববাহিকার সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের শেষ প্রতিনিধি। সাম্প্রতিক রাজনীতি ও ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হয় এই সমন্বয় বিষয়ে আমরা কেবল উদাসীন-ই নই, বরং সে-সংযোগকে ভুলতে চাইছি ক্ষুদ্র রাজনীতির স্বার্থে। এই প্রবন্ধটি সেই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ইতিহাসকে-ই তুলে ধরেছে। বিদ্বেষ ও ঘৃণার যুগে এ-ঋণের ইতিহাস স্মরণে রাখা জরুরি।–মার্কসবাদী পথ ]
ফারসি ভাষার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় আশৈশব। সম্ভবত ছোটোবেলায় পারিবারিক পরিবেশে ফারসির সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। পরে তাঁর চাচা বজলে করিমের কাছেই তিনি সত্যকার ফারসি চর্চা শুরু করেন। মুজফ্ফর আহ্মদের কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা থেকে জানতে পারি, পরে শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে হাফিজ নূরুন্নবীর কাছে তিনি ভালোভাবেই ফারসি-চর্চা শুরু করেছিলেন। নূরুন্নবীরই অনুপ্রেরণায় ক্ল্যাসিকাল ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ত্যাগ করে ফারসি গ্রহণ করেন (অর্থাৎ সংস্কৃত তিনি পঠনীয় বিষয় হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছিলেন; বাংলা শব্দ-ভাণ্ডারে তাঁর অনায়াস অধিকারের এটি একটি সম্ভাব্য কারণ বলে মনে হয়)। নূরুন্নবী শুধু ফারসি ভাষা ও ব্যাকরণেই নয়, ফারসি কাব্যেও সম্ভবত নজরুলকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এই পাথেয় অবলম্বন ক’রে নজরুল করাচির সেনানিবাসে এক পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেবের কাছে (নজরুল সম্ভবত কোথাও তাঁর নাম বলেননি বলে, একটি নতুন অদ্ভুত জগতে যিনি তাঁকে নিয়ে গেছিলেন তাঁর নাম আমরা কোনোদিন জানতে পারলাম না) ফারসি কাব্যের পাঠ গ্রহণ করেন। এর ফলে তিনি ফারসি কবিদের রচনায় গভীরভাবে আকৃষ্ট হন; মনে হয় তাঁকে সব থেকে বেশি আকৃষ্ট করেছিলেন ওমর খৈয়াম, রুমি, সা’দি এবং হাফেজ, এবং অবশ্যই হাফেজ ছিলেন তাঁর প্রিয়তম কবি ।
নজরুল বিদ্রোহী পর্বের (১৯২০-২১) প্রাক্-কলকাতা যুগে করাচির সেনানিবাসে অবস্থানকালে (১৯১৭-১৯) যে-সাহিত্য রচনার সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁর সমগ্র রচনায় তার যে-ছায়াপাত ঘটেছিল, সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। এই সাহিত্য-চর্চার একদিকে ছিল রবীন্দ্র-কাব্য, বিশেষ ক’রে তাঁর গান, অপরদিকে ছিল ফারসি সাহিত্য। আমরা সেই যুগেই তাঁর ব্যথার দান-এ (১৯১৯) উল্লেখ পাই সা’দির গোলেস্তান ও বোস্তান-এর১। বলাবাহুল্য গোলেস্তান ও বোস্তান সা’দির বিশ্ববিশ্রুত গ্রন্থের নাম। তাঁর সা’দির রচনা পাঠ সম্পর্কে পরে আরো বলছি। নজরুল ঐসব রচনায় ‘সাধকশ্রেষ্ঠ প্রেমিক রুমির’ (নজরুলেরই ভাষা) গজল উদ্ধৃত করেছেন:
ওগো প্রিয়তম! তুমি যত বেদনার শিলা দিয়ে
আমার বুকে আঘাত করেছ, আমি তাই দিয়ে যে
প্রেমের মহান মসজিদ তৈরী করেছি।২
রুমির জগদ্বিখ্যাত মসনভী থেকে প্রথম কয়েক ছত্রের বাংলা অনুবাদ (বলা ভালো verse- paraphrase) বঙ্গনূর পত্রিকার ১৩২৭ (১৯২০) সালের কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। রুমির “বেশনু আজ ন্যায় চুঁ হেকায়েৎ মি কুনাদ/ওয়াজ জুদাঈহা শেকায়েৎ মি কুনাদ” এই দ্বিপদী-কে নজরুল বাংলায় রূপান্তরিত করেছিলেন এইভাবে— “শোন দেখি মন বাঁশের বাঁশীর বুক ব্যেপে কি উঠছে সুর/সুর তো নয় ও, কাঁদছে যে রে বাঁশরী বিচ্ছেদ বিধুর”৩। কিন্তু হাফেজের গজল-সাহিত্যে তাঁর সেকালের রচনা ছিল একেবারে সম্পৃক্ত। ব্যথার দান-এ তিনি হাফেজের জন্য বলছেন, “শিরাজের বুলবুল”৪। আর রিক্তের বেদন গ্রন্থের ‘সালেক’ গল্পটি তো হাফেজের এক গজলেরই কাহিনিরূপ। সেখানে যে-দরবেশের কথা বর্ণনা করা হয়েছে তিনি তথাকথিত শাস্ত্রতাড়িত ধার্মিক নন, কিন্তু পরম ঈশ্বর-প্রেমিক। ঐ বয়সের রচনাতেই নজরুল হাফেজের উদ্ধৃতি দিয়ে দরবেশের মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন— “বমে সাজ্জাদা রঙীন কুন গরৎ পীরে মাঁগা গোয়েদ/কে সালেক বেখবর না বুদ জে রাহ ও রসমে মঞ্জেলহা,” যেটা তাঁরই বাংলায় দাঁড়িয়েছে: “জায়নামাজে শারাব-রঙীন কর, মুর্শেদ বলেন যদি/পথ দেখায় যে জানে সে যে, পথের কোথায় অন্ত আদি”।৫ (প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, এই চরণগুলি যে গজলের অন্তর্ভুক্ত— দিওয়ান-ই হাফেজ-এর প্রথম গজল— সেটি শুনতে শুনতেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন)। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় যে ঐ দরবেশই হাফেজ। “তুমি কে?” এই প্রশ্নের উত্তরে ঐ-গল্পের শেষ বাক্যে জবাব পাওয়া গেল: “খেয়া পার হতে খুব মৃদু একটা আওয়াজ কাঁপতে কাঁপতে কয়ে গেল, “মাতাল হাফিজ!”৬ করাচি থেকে ফেরার সময় তাঁর সঙ্গে যেসব জিনিসপত্র ছিল তার মধ্যে ছিল রবীন্দ্র-সংগীতের স্বরলিপি এবং দিওয়ান-ই-হাফিজ-এর মূল ফারসি পাঠ সহ উর্দু অনুবাদ (সম্ভবত পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেবের দেওয়া উপহার)। এই দুই সাহিত্যের দুই মহান কবির পদধ্বনি তাঁর সাহিত্য জীবনের শুধু প্রথম যুগেই নয়, তাঁর সমগ্র সৃষ্টিপর্বকে মুখর করে রেখেছিল। বিশেষ করে তিনি ছিলেন হাফেজের মানস-সন্তান ৷
এখানে উল্লেখ করা যায়, করাচি বাসকালে নজরুল মূলত গদ্যচর্চা করতেন। তাঁর ব্যথার দান ও রিক্তের বেদন এই গল্পগ্রন্থগুলিতে তাঁর কাব্যরসসিক্ত গদ্যের যে পরিচয় পাই সেইসব রচনায় ফারসি কাব্যের একজন সচেতন পাঠককে অনায়াসে শনাক্ত করা যায়। ‘ব্যথার দান’ গল্পে বেদৌরার মামা দারার (নায়ক) জন্য তিনি বলছেন যে সে “ইরানের পাগলা কবিদের দিওয়ান পড়ে পড়ে”৭ নিজেই পাগল হয়ে গেছে। মনে হয় নজরুল এর মধ্যে হাফেজের ‘দিওয়ান’-এরই ইঙ্গিত দিয়েছেন যা তিনি পাঞ্জাবি মৌলভী সাহেবের কাছে পাঠ করেছিলেন একজন দরদী কবির হৃদয়-উপলব্ধি দিয়ে। এর ঠিক পূর্বেই দারার মুখ দিয়ে শিরাজের বুলবুলি বা হাফেজের গানের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে বাংলা রূপান্তরে :
“দেখনু সে-দিন ফুল-বাগিচায় ফাগুন মাসের ঊষায়,
সদ্য ফোটা পদ্ম ফুলের লুটিয়ে পরাগ-ভুষায়,
কাঁদচে ভ্রমর আপন মনে অঝোর নয়নে সে
হঠাৎ আমার পড়’ল বাধা কুসুম চয়নে যে।
কইনু,– “হাঁ ভাই ভ্রমর! তুমি কাঁদচ সে কোন্ দুখে
পেয়েও আজি তোমার প্রিয়া কমল-কলির বুকে?”
রাঙিয়ে তুলে কমল-বালায় অশ্রু-ভরা চুমোয়
ব’ললে ভ্রমর,— “ওগো কবি, এই তো কাঁদার সময়।
বাঞ্ছিতারে পেয়েই তো আজ এত দিনের পরে
ব্যথা-ভরা মিলন-সুখে অঝোর ঝরা ঝরে।”৮
ইরানের এই ‘পাগলা’ কবিরা ছিলেন প্রেমের পাগল, আর তাঁদের সমগ্র কাব্যে প্রেমের কত বিচিত্র রূপ! তাদের বিচিত্র অনুভূতি, আবেগ, আকুতি, সম্ভাপ, বিরহ, ব্যথা (দর্দ), আবার বিরহ আর দর্দের মধ্যেই সুখানুভূতি লাভ (ইংরেজ কবিরা যার নাম দিয়েছেন ‘aching joy’)— এইসব গভীর ভাবনা তাঁদের কাব্যকে তরঙ্গায়িত করেছে। এর সঙ্গে আর একটা সুর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল: মানবপ্রেম আর ঈশ্বরপ্রেমের সহাবস্থান। এটি ফারসি সুফি কাব্যের একেবারে অন্তর্বাণী। কিন্তু সেকথা পরে হবে।
নজরুলের কবি-জীবনের বিভিন্ন পর্বে ফারসি কাব্যের স্পর্শ বিশেষভাবে অনুভব করি। করাচি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি তো একেবারে ফারসি কাব্যে সম্পৃক্ত। তাঁর গদ্য রচনা ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা এটি লক্ষ করেছি। তাঁর ‘বাদল-প্রাতের শারাব’ (এবং ‘খেয়াপারের তরণী’) কবিতার জন্য মোহিতলাল নজরুলের কাব্য-প্রতিশ্রুতিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।৯ আমরা পূর্বেই লক্ষ করেছি, এই রসসিক্ত কবিতার জগৎ পরিপূর্ণভাবে ঐ-সময়ের গদ্য রচনায় পরিব্যাপ্ত। আর তার ভাষা? আরবি-ফারসি-বাংলায় মেশা ঐ অপূর্ব ভাষা (তা কিন্তু তথাকথিত ‘মুসলমানী বাংলায়’ কণ্টকিত ছিল না) অহরহ কাব্যের ডানায় ভর ক’রে যেন ইরান দেশে পাড়ি দিতে চায়। [আহ্মদনগর জেলে রচিত মৌলানা আবুল কালাম আজাদের গুবার-ই-খাতের (বন্ধুকে লিখিত কতকগুলি ব্যক্তিগত কাব্যময় পত্রের সমষ্টি) থেকে কয়েকটি চয়ন করে ঢাকা থেকে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল: অঙ্গবিহীন আলিঙ্গন; লেখক ‘তাজা কলম’। সেখানে ব্যবহৃত ফারসি-বাংলায় মেশা গদ্য,— আজাদের মূল রচনার স্পিরিটের প্রতি সুবিচার করার জন্য এর প্রয়োজন ছিল— নজরুলকে স্মরণ করায়। সেখান থেকে সংগৃহীত অন্তত একটি পত্র আজাদের মৃত্যু উপলক্ষ্যে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল (মার্চ, ১৯৫৮)]। এইভাবেই নজরুল বাংলা-ইরানে মাখামাখি করেছেন। এই সুর নজরুলের কাব্যিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে একটি গভীর সুর, এবং তা মিশ্র ভারতীয় সংস্কৃতিতে নিঃসন্দেহে একটি বড়ো অবদান। আর এই মিলিত সংস্কৃতির রূপ ‘বিদ্রোহী’ পর্বের রচনাগুলিতে লক্ষ করা যায়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আধুনিক রাজনৈতিক ভাব-আন্দোলনের কবিতা। কিন্তু এর মধ্যেও একজন ফারসি-কাব্য পাঠককে অনুসন্ধান করা যায়,— পাওয়া যায় রুমি ও হাফেজের কবিতা-পাঠের স্বাক্ষর। ঐ কবিতার—
“আমি দুর্মদ
মম প্রাণের পিয়ালা হরদম হ্যায় হরদম ভরপুর মদ”
ছত্রগুলি হাফেজের গজল “আলা ইয়া আইয়োহাস্ সাকি আদির কাসা ওয়া নাবিলহা” (নজরুল এর বাংলা করেছিলেন এইভাবে: “হ্যাঁ এয় সাকি শারাব ভর লাও, বোলাও পেয়ালি চালাও হরদম”)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু ফারসি কাব্যের সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’-র শুধু এমন সাদৃশ্যই দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাই নয়, ‘বিদ্রোহী’-র আত্মা ‘আমি’ ফারসি সুফি কাব্যে পদচারণকারী আমিত্ব-সচেতন একজন কবির কথা। আমিত্ব বিসর্জন সুফিভাবের অন্যতম লক্ষণ। কিন্তু রুমির কবিতায় এই আমিত্ব-অনুসন্ধান ও অনুশীলনের গভীর পরিচয় মুদ্রিত আছে (এই কারণে সুফি ভাবে আবিষ্ট আধুনিক কবি ইকবাল ফারসি কবিদের মধ্যে রুমিরই ভক্ত ছিলেন সব থেকে বেশি)। নজরুল বললেন—
“বল, মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
দ্যুলোক ভূলোক গোলোক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাতৃর” ইত্যাদি।
মনে হয় নজরুল রুমির এই চরণগুলির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন:
“আজ বাহায়েম বহরাদারী ওয়াজ মালায়েক নিজ হম
বাগুজার আজ বাহায়েম তা আজ মালায়েক হম বাগুজারী”
—অর্থাৎ তোমার মধ্যে পশুপ্রাণী ও ফেরেশতা দুয়েরই স্বভাব আছে/তুমি পশু প্রকৃতি অতিক্রম করে ফেরেশতাদেরও ঊর্ধ্বে উঠে যাও। রুমি শিষ্য ইকবালও একই সুরে কবিতা রচনা করেছেন; নজরুল তাও দেখে থাকবেন। রুমির কর্মচঞ্চল, পৌরুষপূর্ণ ‘আমি’-র সঙ্গে নজরুল শোষণ-বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আধুনিক মনকে যুক্ত করেছেন। এইখানেই ‘বিদ্রোহী’-র বিশেষত্ব।
এর পর তাঁর বিশিষ্ট কবিতাগুচ্ছ ‘সাম্যবাদী’। সেখানেও ফারসি কাব্যের একজন আবেগময় অনুসারীকে প্রত্যক্ষ করি। একথা অনেকেই আলোচনা করেছেন, নজরুলের সাম্যবাদের ধারণা মার্কসীয় তত্ত্ব অনুশীলনজাত ছিল না। এগুলির মূল সুর কবিতাগুলির বিভিন্ন চরণে বিধৃত। ইতিমধ্যে করাচির সেনানিবাসে তিনি ফারসি সুফি কবিদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, আমরা দেখেছি। ঐসব কবিদের রচনার মূল সুর: শাস্ত্রের চেয়ে মানুষ বড়ো, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ঈশ্বর প্রেমের প্রথম সোপান,— আচার আনুগত্যের চেয়ে মানবতা বড়ো। ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছে শাস্ত্রের প্রতি যে বিদ্রোহ, এটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ততটা নয়, যতটা একজন সুফির গভীর বিশ্বাস থেকে, যিনি আচার-অনুশাসনের মানবতা বিরোধী ভূমিকার প্রতিবাদ করেন, কিন্তু পরম ঈশ্বর-আনুগত্যকে, এমনকি তাঁর মধ্যে অন্তর্লীন হওয়াকে, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারিত করেন। নজরুল কবিতার যে অংশ শুরু করেছেন এই বলে: “মসজিদে কাল শিরণী আছিল...” সেই অংশে একজন মুসাফির শুধু নামাজ পড়ে না বলে ধর্মগুরুর কাছে খাদ্য না-পেয়ে ফিরে যায়। এই অংশটা তো অবশ্যই শেখ সা’দির বোস্তান গ্রন্থের ‘ইব্রাহীম ও অগ্নি-উপাসক’ শীর্ষক কাহিনির ভারতীয় রূপ।১০ (স্মরণ করা যায়, বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় কাহিনিটি পল্লবিত, এবং লে হান্টের ইংরাজি কবিতা ‘Abraham and the Fire Worshipper’-এর উৎসও সা’দির ঐ-রচনা)। আবার সাম্যবাদীর বিখ্যাত চরণ “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই” (তুলনীয় রুমির : “আজ হাজারাঁ কা’বা ইয়াক দিল বেহতর আস্ত”) এবং এই সুরের আরো সব চরণ ওমর খৈয়াম এবং রুমির কাব্য থেকেই নজরুল গ্রহণ করেছেন। আর এঁদের কাছ থেকেই তিনি তথাকথিত শাস্ত্রের বিরোধিতার ভাবটিও গ্রহণ করেছেন। অনেকেই রুমির বিখ্যাত কথা স্মরণ করতে পারেন, আমি কোরান থেকে মজ্জা গ্রহণ করেছি আর এর অস্থিগুলি চতুষ্পদ জন্তুর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি। আর আচার-সর্বস্বতার প্রতি হাফেজের বিদ্রোহ তো প্রবাদবাক্যের মতো। হাফেজের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা তিনি এইভাবে প্রকাশ করেছেন: “হাফেজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মতো। কূলের পথিক যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গ-লীলা দেখিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল-তলের সন্ধানী ডুবুরী তেমনি তাহার তলদেশে অজস্র মণিমুক্তার সন্ধান পায়! তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নর্তন, বিপুল বিশালতা; নিম্নে তেমনি অতল গভীর প্রশান্তি, মহিমা।...”১১ নজরুল স্মরণ করেছেন, হাফেজের সমস্ত রচনার অনুপ্রেরণার উৎস ‘শাখ্-ই-নবাত’ নামের কোনো এক রহস্যময়ী-নারী।১২ তাঁকে উদ্দেশ করেই তাঁর সকল কবিতা নিবেদিত। নজরুল ‘শাখ্-ই-নবাত’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতাও রচনা করেছিলেন।১৩
ফারসি কাব্যের সঙ্গে নজরুলের একাত্মতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় তাঁর প্রেমের কবিতায় ও গানে। এখানে তিনি একেবারে সা’দি ও হাফেজের অনুসারী। নজরুল কাব্যে ফারসি (এবং আরবি) শব্দের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নজরুল-বিশেষজ্ঞ শাহাবুদ্দীন আহ্মদ তাঁর শব্দ-ধানুকী নজরুল গ্রন্থে আলোচনা করেছেন।১৩ক তিনি নজরুল-সাহিত্য বিচার গ্রন্থের দুটি দীর্ঘ অধ্যায়ে নজরুলের উপর হাফেজ ও ওমর খৈয়ামের প্রভাব নিয়েও অত্যন্ত গভীর মূল্যবান আলোচনা করেছেন।১৩খ তবে এ-নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করা যায়। কিন্তু এই সীমিত আয়তনে সামান্য কিছু বলি। নজরুলের গানে যে unrequitted love অপরিসীম ব্যাপ্তি ও গভীরতা লাভ করেছে— যে-ভালোবাসা অপর পক্ষের প্রতিদানে ধন্য হয় না, বরং আঘাতই যাকে মহৎ ক’রে তোলে— সেটি তাঁর ফারসি-কাব্য পাঠেরই ফল বলে মনে হয়। ফারসি কাব্যের এই ভাবটি মূলত দুটি চিত্রকল্পের মধ্যে বিধৃত হতে দেখা যায়— আলো ও পতঙ্গ এবং গোলাপ ও বুলবুল। এগুলি সা’দি ও হাফেজ সহ বিভিন্ন ফারসি কবির কাব্যে ছড়িয়ে আছে। পতঙ্গ ও আলোর প্রসঙ্গ সা’দির বোস্তান গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়, “ইশক” (প্রেম)-এ সুন্দর কাহিনি-রূপ লাভ করেছে। এই চিত্রকল্পে কবি বলতে চান, পতঙ্গ আলোর কাছে আত্মাহুতি দেয় প্রেমের প্রতিদানের আশাটুকু না-রেখেই। শেলির ভাষায় “Desire of the moth for the star”-তারকার প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় পতঙ্গ আত্মাহুতি দিল, কিন্তু তারকাকে সে লাভ করল না। আবার মোমের বাতির মধ্যেও আকাঙ্ক্ষা! সে নিজেকে দগ্ধ-ক’রে ক’রে নিশ্চিহ্ন ক’রে তোলে, তার যে আলো দান করাই কাজ! কিন্তু তার এই আত্মত্যাগের খবর কেউ পেল না। সা’দির এই ভাবটি সুন্দরভাবে নজরুলের একটি গানে ফুটে উঠেছে: “আলো দিতে কত পোড়ে, কত প্রদীপের প্রাণ”। ইদানীং কালে শোনা যায়, এটি নাকি নজরুলের গান নয়। কিন্তু এ-গানে যেভাবে সুফি ভাবনা (আত্মবিলোপ) শিল্প-রূপ লাভ করেছে এবং যেভাবে একের পর এক সুফি ভাবাত্মক চিত্রকল্পে (“কী তৃষা জাগে সে নদীর হিয়াতলে/বেদনার মহাসাগরের কাছে কর কর সন্ধান”) ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে এই সিদ্ধান্ত নতুন ক’রে ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। নজরুল আরো অন্যান্য স্থানেও এই মোমের বাতির দগ্ধ হওয়ার চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন।
আর এইসব চিত্রকল্পের হাত ধ’রে তাঁর প্রেমের গানে বেদনার বর্ণবহুল আকাশ-পরিক্রমা অনুভব করি। তিনি যে বলছেন,
“কাঁটা-নিকুঞ্জে কবি
এঁকে যা সুখের ছবি
নিজে তুই গোপন রবি
তোরি আঁখির সলিলে”,
এতো ফারসি কাব্যের রক্ত-রঙীন চরণগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বুলবুল গোলাপের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত বুক নিয়ে গোলাপকে ভালোবেসেই গেল, কিন্তু সে ভালোবাসা পেল না। গোলাপ ও বুলবুলের এই ভালোবাসার কথা ইয়োরোপের রোমান্টিক কবিদের খুব প্রিয় ছিল। অসকার ওয়াইল্ডের একটি ছোটো গল্পের মূল বিষয়বস্তু এইটিই। গল্পটির নাম: ‘The Nightingale and the Rose’. কিন্তু এই চিত্রকল্পে অপার বেদনা কখন রহস্যময় সুখে (দর্দ) পরিণত হয় সাধারণ মানুষ তার সন্ধান পায় না। নজরুলের কথায়: “এত যে ব্যথা, এত শঠতা, তবু যেন তা মধুতে মাখা” (রবীন্দ্রনাথ একে গভীরতর ভাষায় বলছেন, “কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারি ঘায়ে,/নিবিড় বেদনাতে পুলক লাগে গায়ে”)। এখানে আমরা সেই নিষ্ঠুর সুন্দরীর পরিচয় পাই যাকে কীটস ‘Le Belle Dame sans Merci’ কবিতায় অমর ক’রে রেখেছেন। পণ্ডিতেরা বলেন, এই নিষ্ঠুর সুন্দরীর ধারণা প্রাচ্যদেশীয়। সেটি নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু ফারসি কাব্যে বিশেষত হাফেজের কাব্যে আমরা এই নারীর পরিচয় পাই। আর নজরুলের অনেক গজলে আমরা যে-নারীকে দেখি সে ঐ ফারসি কাব্যের নিষ্ঠুর সুন্দরীর আদলে নির্মিত। তাকে উদ্দেশ্য করেই যেন কবি বলছেন, “আগে মন করলে চুরি / মর্মে শেষে হানলে ছুরি” (এ যেন অতুলপ্রসাদের কথায় “ওগো নিঠুর দরদী, এ কি খেলছ অনুক্ষণ”)। এই সঙ্গে আর একটি কথাও স্মরণ রাখতে হবে। নজরুল তাঁর সমগ্র সৃষ্টিপর্বে (শুধু প্রাক্-কলকাতা পর্বেই নয়) যে-নারীকে গড়ে তুলেছেন সে ভারতীয় ও ইরানী সত্তার মিলিত রূপ। তাই নজরুলের নারীর রূপ ও আচরণ সব সময় ভারতীয় মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। তাই “শুকনো পাতার নূপুর” বাজিয়ে যে ঘুর্ণিবায়ু নেচে চলে তাকে তাঁর মরুচারিণী “ইরানী বালিকা”র মতো মনে হয়। আর এই কারণে তাঁর unrequitted love সম্পর্কে যে-ধারণা, তার মধ্যে ফারসি গজলের অতৃপ্ত আত্মনিবেদনের সুরকে ধরতে পারা চাই। আর সেটা না-পারলেই তাঁর কাব্যকে এক অলস সেন্টিমেন্ট বলে মনে হবে। কবি যেন শারাবের পর শারাব পান ক’রে এই বেদনা ভোলার চেষ্টা করেন, আর আনন্দের জলছবি এঁকে যান। এই ভাবনাটি তাঁর “করুণ কেন অরুণ আঁখি দাও গো সা’কি দাও শরাব”, এই বিখ্যাত গজলে ফুটে উঠেছে। কবির চিরজিজ্ঞাসা: “হারাম কি এই রঙীন পানি, আর হালাল এই জল চোখের? / নরক আমার হউক মঞ্জুর, বিদায় বন্ধু, লও আদাব”, অথবা সেই বিখ্যাত চরণগুলি: “আর সহেনা দিল নিয়ে এই দিলদরদীর দিল্লগী”—মনে হয় কিটস যেন ফ্যানি ব্রনকে এই কথাগুলি বলে তাঁর বেদনা জানাচ্ছেন। প্রেম আর বেদনায় ক্ষতবিক্ষত এই হৃদয় থেকে যে-সুখের জন্ম— প্রেমের সেই সুখ যা ফারসি কবিদের গজলের ছত্রে ছত্রে বিচিত্র বর্ণবিলাসে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, বাংলা গানে (অতএব কবিতাতে, কেন-না তাঁর গান অবশ্যই গীতিকাব্য) সেইটি নজরুলের একটি বড়ো অবদান। বুদ্ধদেব বসু অত্যন্ত দরদ ও নৈপুণ্যের সাথে প্রেমিক বোদলেয়ারের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের ছবি এঁকেছেন। নজরুলের প্রেমের গান,— বিশেষ ক’রে গজল,— বিশ্লেষণের জন্য ফারসি কাব্যের অঙ্গনে প্রবেশাধিকার চাই,— বিশেষ করে হাফেজের কাব্যে।
নজরুলের গানের ক্ষেত্রে শুধু ভাবের জন্যই নয়, আঙ্গিকের জন্যও ফারসি কাব্যের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তাঁর বহু বাংলা গজলে তিনি ফারসি গজলের আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন : কক, খক, গক, ঘক, এই রীতিতে। যেমন “বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিস নে আজি দোল” এবং এই রকম আরো অনেক গজল। আবার বাংলা গানের আঙ্গিকের শাসন মেনেও তিনি গজল রচনা করেছেন: “ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান” বা “মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর” ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রথম গজল এবং তৃতীয় গজলটি ঠিকমতো অনুধাবন করতে হলে ফারসি কাব্যের সঙ্গে পরিচয় দরকার।
ফারসি কব্যের একটি বহুল প্রচলিত আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্য হল এর তখল্লুস, অর্থাৎ ভণিতা নাম। কবি তাঁর কবিতার অন্তিম বা প্রাক্-অন্তিম চরণে নিজের নাম অথবা ভণিতা নাম ব্যবহার করেন। নজরুল ফারসি কাব্যের এই পদ্ধতির সঙ্গে বাল্যকাল থেকেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর সে-সময়ের অনেক কবিতায় তাঁকে এই পদ্ধতিতে নিজের নাম ব্যবহার করতে দেখা যায়। একটি পরিচিত কবিতার কথা আমরা বলতে পারি: “রব না কৈলাসপুরে” ইত্যাদি। তার শেষ চরণটি এই রকম: “নজরুল ইসলাম ইজ টেলিং”। তাঁর বাল্য বয়সের আরো একটি রচনা ‘চাষার গীত’ ১নং কবিতার শেষ ছত্র: “কয় নজরুল ইসলামেতে”; ২নং কবিতায় শেষের আগের ছত্র: “নজরুল ইসলাম বলে”, ‘প্রেমের ছলনা’ কবিতায় শেষের আগের ছত্র: “ভেবে বলে নজরুল”। তাঁর লেটোর গানেও এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। তাঁর চাচা বজলে করিমের কবিতা ও গানেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তীকালে হাফেজের গজল অনুবাদে এই আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্যে নজরুল বরাবর মূলের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। যেমন একটি গজলের প্রাক্-অন্তিম চরণে নজরুল হাফেজের নাম ব্যবহার করেছে: “গজল গান নয়, মুক্তো গাঁথছিস, হাফেজ, আয় ফের মধুর তান ধর”। কিন্তু নিজে যখন গজল রচনা করেছেন তখন ভণিতায় ‘হাফেজ’-এর অনুসরণে নজরুল নিজের নাম ব্যবহার করেন নি, বলেছেন ‘কবি’; কখনো কখনো ‘ভ্রমর কবি’।
কিন্তু নজরুলের বাংলা গজল রচনা শুধু আঙ্গিকগত কারণেই ফারসি কাব্যের কথা স্মরণ করায় তাই নয়, বিভিন্ন চিত্রকলা, রূপক (যাদের কথা আমি পূর্বেই বলেছি), বিশেষ ক’রে বিভিন্ন অর্থবহ শব্দ, এসব দিক দিয়েও তিনি ফারসি কাব্যের কাছে ঋণী। তাঁর বিখ্যাত গান “চল চল চল”-এর “নব-নবীনের গাহিয়া গান” অংশটুকু শিখা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম পাঠে এইরকম ছিল: “তাজা ব তাজার গাহিয়া গান”। বলা বাহুল্য, “তাজা ব তাজা” এই ফারসি শব্দবন্ধের নজরুল-কৃত বাংলা রূপ: “নব-নবীন”। এটি হাফেজের বিখ্যাত গজল “মত্রেবে খোশনওয়া ব গৌ তাজা ব তাজা নও ব নও”-এর অংশ। নজরুল এর বাংলা করেছেন এইভাবে: “আরো নূতন নূতনতর শোনাও গীতি গানেওয়ালা” (কবি সত্যেন্দ্ৰনাথ দত্ত অনুবাদ করেছেন: “গাও কবি গাও, কর বিরচণ/তাজা তাজা গান, কবিতা নূতন”)। কিন্তু প্রায় সমসময়ে রচিত “আয় বেহেশতে কে যাবি আয়” কবিতায় তিনি আবার ঐ শব্দ-বন্ধ ব্যবহার করলেন: “তাজা ব তাজার গাহিয়া গান”। হাফেজ চিরসৌন্দর্য এবং অম্লান প্রেমের কবি হিসাবে বিশ্ব-বিশ্রুত (এ-কারণেই জার্মান মহাকবি গ্যেটে রুমির কবিতার চেয়ে হাফেজকেই তাঁর প্রতীচ্য-প্রাচ্য দিওয়ান-এ বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন)। “আয় বেহেশতে কে যাবি আয়”, “নওরোজ” প্রভৃতি বহু কবিতায় ফারসি কাব্যের সুরভি-নির্যাস, তার গীতিময়তা এবং বর্ণবহুল ও চিত্রবহুল রূপকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু শুধু ফারসি কাব্যপাঠই নয়, তিনি ফারসি ভাষায় কিছু সিরিয়াস গদ্য-গ্রন্থও পাঠ করেছিলেন।
ওপরের আলোচনা থেকে মনে হয়, নজরুল-জীবনে ও কাব্যে ফারসি সংযোগ এক দিগম্ভবিস্তারী তাৎপর্য নিয়ে এসেছিল। নজরুলের সম্পর্কে বোহেমিয়ানা বা অশিক্ষিত পটুত্বের দায়িত্বহীন উক্তি সমূহের ফলে তাঁর কাব্য সম্পর্কে আলোচনা একদেশদর্শী হয়ে ওঠে। নজরুলের ফারসি কাব্যচর্চার মূল্য শুধু নান্দনিকই নয়, এক গভীর সামাজিক দায়িত্বসচেতন কবি হিসাবে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। বোদলেয়ার বা টি.এস. এলিয়ট, হাইনে বা ভিকটোরিয়া ওকামপো— এঁদেরকে বাংলা ভাষায় পরিচিত করানো একটা বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু এসব সাহিত্য বাঙালির হৃদয়-ঐশ্বর্যের সমৃদ্ধি ততখানি ঘটায় না, যতখানি ফারসি কাব্য ক’রে থাকে, কারণ এই কাব্য ও সংস্কৃতি এক বৃহৎ এশীয় সংস্কৃতি-পরিবারের অংশ, যাকে এখনও উঁচুভুরু পশ্চিমীরা পোশাকি ভাষায় বলেন ‘other’— ‘অপর’। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের বেদনার একটা নতুন ভাব ও ভাষা নজরুল বাংলা কাব্যকে উপহার দিয়েছেন, যে ভাষা শত শত বৎসর ভারতের চিত্ত-ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটিয়েছে। বাংলা ভাষায় যাঁদের মধ্য দিয়ে এই নিবৃত্তি সম্ভব হয়েছে, তার শেষতম প্রতিনিধি নজরুল।
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. নজরুল রচনাবলী, সম্পাদনা. আব্দুল কাদির, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৩, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৩৩৯, ৩৪৪, ৩৪৭।
২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫২।
৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮১; এটি তাঁর নির্ঝর কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। ঐ-গ্রন্থে একই সঙ্গে ‘আশায়’ নামে হাফেজের কবিতার ভাবানুবাদও স্থান লাভ করেছে। প্রথম দুই ছত্র:
“নাই বা পেল নাগাল, শুধু সৌরভেরই আশে
অবুঝ সবুজ দুর্বা যেমন জুঁই কুঁড়িটির পাশে”
নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৮১।
নির্ঝর কাব্যগ্রন্থেই অন্তর্ভুক্ত “প্রিয়ার দেওয়া শারাব” কবিতাটি হাফেজের অনুসারী (পৃ. ২৯৬)। প্রথম চরণটি এইরকম: কোঁকড়া অলক মুৰ্ছে ছিল ঘাম-ভেজা লাল গাল ছুঁয়ে...। কবিতার শেষে নজরুল নিজেই লিখেছেন,— অর্থাৎ তাঁর নামে ছাপানো হয়েছে:
“হাফিজের ‘জলকে আশতা ও থুয়ে জর্দা ও যান্দানে লবে মত্ত’ শীর্ষক গজলের ভাবাবলম্বনে।” কিন্তু ফারসি শব্দের বাংলা উচ্চারণে মুদ্রণ প্রমাদ এতই প্রকট ও দৃষ্টিকটু যে মূল চরণ থেকে সরে এসে একটি উদ্ভট চেহারা নিয়েছে। মূল শব্দগুলি এইরকম:
জল্ফে আশফ্তা ও খুয়ে করদা ও খান্দানে লব্ ও মস্ত্!
এ. জে. আরবেরির ইংরাজি রূপান্তরে দাঁড়িয়েছে:
“Wild of mien, chanting a love-song, cup in hand, locks disarrayed.”
(A. J. Arberry, Fifty poems of Hafiz, CUP, 1953, P. 90)
মুদ্রণ প্রমাদের অত্যাচারে আজও জর্জরিত নজরুলের বহুবিধ শব্দ ও শব্দবন্ধ। তিনি ধারাবাহিক অবহেলার শিকার ।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪২৷
৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৪। পরবর্তীকালে অনুদিত তাঁর দিওয়ান-ই-হাফিজ (নির্ঝর কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত) এর প্রথম গজলের (মোসলেম ভারত, অগ্রহায়ণ, ১৩২৭) তৃতীয় স্তবকে এই চরণগুলি অন্যভাবে প্রকাশ লাভ করেছে:
যদিই ক’ন তোর সাগ্নিক ঐ পীর মুসল্লায় কর শারাব রঙ্গীন,
পথেই রথ যার অচিন নয় তার কোথায় পথ-ঘাট খারাব সঙ্গীন।
নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৯৮।
বলা বাহুল্য, দ্বিতীয় অনুবাদ মূলানুগ হয়নি, সুন্দরও হয়নি, neither faithful, nor beautiful.
৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৪।
৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪২।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪২।
৯. মোহিতলাল মজুমদার, ‘একখানি পত্র’, মোসলেম ভারত, ১৩২৭, পৃ. ৩৪২-৪৪, উদ্ধৃত রফিকুল ইসলাম, কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও কবিতা, ঢাকা, ১৯৮২, পৃ. ৪০-৪১।
১০. The Bustan of Sadi, Eng. translation, G. M. Wickens, Leiden, 1974 ; দ্বিতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১১. নজরুল-রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ১২৯।
১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর অনুদিত ও সম্পাদিত দিওয়ান-ই-হাফিজ গ্রন্থের ভূমিকায় “শাখ-ই-নবাত্” প্রসঙ্গকে ‘উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা’ বলে চিহ্নিত করেছেন দিওয়ান-ই-হাফিজ, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৫৯, ভূমিকা, পৃ.II।
১৩. নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, দ্বিতীয় প্রকাশ, ১৯৮৪, পৃ. ৩৪৪-৩৪৭। কবিতাটি সওগাত পত্রিকার ১৩৩৭, আষাঢ় সংখ্যায় বেরিয়েছিল। সমগ্র কবিতাটিতে ফারসি কাব্যের মেজাজ স্ফুর্তিলাভ করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে স্মরণ করা দরকার যে, কবিতাটি শাখ-ই-নবাত নামক প্রচলিত কল্পনা থেকেই সৃষ্ট।
১৩ ক. শাহাবুদ্দীন আহ্মদ, শব্দ-ধানুকী-নজরুল, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭০ ।
১৩ খ. — নজরুল সাহিত্য-বিচার, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৭৬: ১. নজরুল ইসলাম ও হাফিজ, পৃ. ২৪৫ - ২৭২; ২. রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়ামের অনুবাদক নজরুল, পৃ. ৩০৯-৩৪৭।
প্রকাশের তারিখ: ২৬-মে-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
