Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

কত না অশ্রুজল 

সায়ন্তন সেন
চার্লি যে হাসায়, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হল, সেই হাসির ফাঁকে-ফাঁকে, কোথায়— অতর্কিতে— লুকিয়ে থাকে রুদ্ধ অশ্রুধারা। কান্নাধারার দোলা... কেউ জানে না, কেউ আগে থেকে বুঝতেই পারে না, কখন সে গলায় এসে ধাক্কা দেবে। অথচ সেটাই হয়।
koto na ashrujol

চার্লি যে হাসায়, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হল, সেই হাসির ফাঁকে-ফাঁকে, কোথায়— অতর্কিতে— লুকিয়ে থাকে রুদ্ধ অশ্রুধারা। কান্নাধারার দোলা... কেউ জানে না, কেউ আগে থেকে বুঝতেই পারে না, কখন সে গলায় এসে ধাক্কা দেবে। অথচ সেটাই হয়।

এই-যে ভবঘুরে, ভ্যাগাবন্ড, এমনি, এলেবেলে লোকটা— বলুন তো, এর মধ্যে কী এমন আছে যা এত হাস্যকর? সে তো শখ করে মূর্তির কোলে উঠে শোয়নি। ভালো করে দেখুন। চালচুলো নেই বেচারার, যাবে কোথায়? তাই সে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে মূর্তির কোলে। কোনো অনিয়ম, বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্যের টিকে তার কপালে নেই। যেই-না ঢাকা সরে গেছে, সবার চোখের সামনে সে আর এক মুহূর্ত থাকতে চায়নি। তার জন্য কত রকম কসরত! গোটাটাই পালাতে গিয়ে। আরেকটু হলে উঁচিয়ে রাখা তলোয়ারটাই কি পেছনে ঢুকে যেত না? এটা তো ঘোর বিপদের কথা, উদ্বেগের কথা। তাহলে হাসি পায় কেন? হাসি পায়, কারণ লোকটা অতিশয় গরিব। বড়লোকের বিনোদনের জন্যেই খোদাতালা একে বানিয়েছেন। যতবার এর পা হড়কাবে, মাথায় টব ভেঙে পড়বে, পাতলুনে বর্শা ঢুকে যাবে, ততবারই আমাদের হাসি পাবে। আর, যদি কেউ তাকে ভুল-করে ভালোবেসে ফ্যালে? ভালোও তো বাসে কেউ-কেউ। আমাদের সেই ভালোবাসার ধন, যার বুকে অন্ধ ফুলওয়ালি শুভ্র গোলাপ গুঁজে দেয় (‘সেই গোলাপের থেকে ঝরে পড়ে বিষাদ’)— সেই হল আমাদের চার্লি, আসল চার্লি।

বড্ড গরিব হলে কী হবে, সে সকলেরই ভালো চায়। এমনকি শ্রেণিশত্রুরও মঙ্গল কামনা করে। শুধু কামনা নয়, সে মঙ্গল করেও। অন্তত করতে চায়। সে প্রেয়সীর লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করে দেয়, ফুলওয়ালির কাছে ফুল কিনে খুচরো ফেরত নেয় না, যে খাদ থেকে ঝুলছে তাকে টেনে তোলে, যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে তাকে জীবনে ফিরিয়ে আনে। শুধু তাই নয়, হৃদয়েরও শুশ্রূষা করে, বলে ‘বাঁচো’। এমনকি হঠাৎ কোনও ঝামেলার সম্ভাবনা দেখলে বিবাদমান দু-পক্ষকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করে, যাতে বড়ো কোনো কেলেঙ্কারি না-ঘটে। এই হল আমাদের চার্লি। নিপাট ভদ্রলোক। একটু আদর পেলেই যে গলে জল হয়ে যায়। আর হঠাৎ বড়োলোকের খপ্পরে পড়ে গেলে যতটা সম্ভব মানিয়ে নিতেই চেষ্টা করে। পারে না, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু চেষ্টার কোনও ত্রুটি আছে কি? ভাবুন তো, কেনই বা এত অনুগ্রহ করবে বড়োলোকেরা? বড়োলোকদের সঙ্গে মানিয়ে, অ্যাডজাস্ট করে চলা তো সত্যিই কঠিন। 

তাদের মেঝেতে হাঁটতে গেলে পা পিছলে যায়। তাদের খাবার প্যাঁচানো রিবনের মতো দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। তাদের পোশাক পরলে হাঁটাচলা করা মুস্কিল, তার উপর গা চুলকায়। আর এতসব ঝক্কির পরেও, বড়োলোকেরা কখন চুমু খাবে আর কখন লাথি মারবে, কখন বুকে টেনে নেবে আর কখন চিনতে পারবে না কেউ জানে না। মুড সুইং বলেও একটা ব্যাপার আছে। এই ধরা যাক একশো ডলার দিয়ে দিল, তো পরক্ষণেই পুলিশকে বলবে, ‘না না একে আমি চিনি না’, তখন ঠ্যালা সামলাবে কে! এত সব ঝামেলা বড়োলোকদের। তবু বড়োলোকেরা তাকে অনুগ্রহ করে। এই অনুগ্রহ তার প্রভূত বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, ‘হিউমিলিয়েশন’ (চ্যাপলিন বলতেন?)! নিশ্চয়ই দস্তোইয়েভস্কিও তাই বলতেন। কিন্তু মুজতবা আলি মনে করিয়ে দিয়েছেন, চ্যাপলিন দস্তোইয়েভস্কি নন। তার কৃতজ্ঞতার কোনও তুলনা নেই। চ্যাপলিন ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলেন, কোন ফিকিরে মানুষের মন পাওয়া যায়, অর্থাৎ বড়োলোকদের কাছে গরিবের আহত অভিমান কেমন করে বিক্রি করতে হবে (‘আমার মধ্যে ছোট থেকেই একটা বেনিয়া ছিল, হা হা…’)। এ আর কী এমন কঠিন কথা? গরিব মানুষের গোটা অস্বিত্বটাই কি একেবারে বেঢপ রকমের হাস্যকর নয়? তার হাতে ছেঁড়া দস্তানা, এক পায়ে পট্টি বাঁধা, পাতলুনের পশ্চাদ্দেশ ফুটো, পকেটে বড়লোকের উচ্ছিষ্ট চুরুট ও কলা— সব কত নিখুঁত, কত অভ্রান্তভাবে হাস্যকর। পেটের ভিতরটাও হাস্যকর। বাঁশি, রিবন, মোমবাতি, জুতোর সুকতলা, এমনকি বড়োলোকের টাক পর্যন্ত একটু চেষ্টা করলেই সেই পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।

‘সিটি লাইটস’-এর কথাই ভাবা যাক। একদল বড়োলোক মেয়ের  ফূর্তির মাঝে পড়ে গিয়ে চার্লি একটা বাঁশি গিলে ফ্যালে। গানের আসর শুরু হবে। সবার চোখেমুখে একটা ‘সংস্কৃতিমনস্ক’ হাবভাব। তার মাঝে চার্লির গলায় আটকে থাকা বাতাস ধাক্কা দেয়, আর বাঁশিটি পোঁ করে তার অস্তিত্ব জানান দিতে থাকে। ভারী মুস্কিল। গানের আসর ভেস্তে যাচ্ছে। বড়োলোকদের ফূর্তি ভেস্তে যাচ্ছে। চার্লি তা মোটেই চায় না। চার্লি মুখ বুজে প্রাণপণ অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তার দম আটকে যাচ্ছে যাক, বড়োলোকেরা যেন ভালো থাকে। চার্লি চেষ্টা করে, কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। দম আটকে তার মুখ ক্রমশ ন্যুরেলজিয়ার মতো ব্যথাতুর হয়ে ওঠে। শাদা… বিবর্ণ… মৃত্যুর ইমেজ। তখন সে বলে, ‘কেন হাসছ, হুজুর? আমি মরে গেলেও কি তোমাদের কিছু আসে যায় না? আমি তো তোমাদের কোনও ক্ষতি করিনি!’ চার্লি গলায় সেই নাছোড় হুইসল নিয়ে মোচ্ছব থেকে পালায়। বাইরে যেতেই রাস্তা থেকে কয়েকটি কুকুর ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গায়ে। তাদের সঙ্গে নিয়ে একটু পরে সে ফিরে যায় পার্টিতে। অথবা, তারা নিজে থেকেই সঙ্গে জুটে যায় (কুকুর তো তার আত্মজন, কুকুরই তো তার প্রকৃত বন্ধু!)। বাঁশিটা কিন্তু দিব্যি হজম হয়ে যায়। আর সেটা মোটেই অবিশ্বাস্য লাগে না। অনাহার কাকে বলে, চ্যাপলিন খুব ভালো করে জানতেন। শৈশবে সে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল। তাই তো ‘গোল্ড রাশ’-এ ঐ ‘নরভুকবৃত্তির ব্যঞ্জনা’, যে সর্বভুক, সে-ই অনায়াসে নধর মুরগি হয়ে যায়। তার বুভুক্ষু সঙ্গীটিও ভাবে, ‘মুরগি হোক ছাই না-হোক, পেট তো ভরবে’। কেবল তখন সে রাইফেল তুলে নেয়। শুধু আত্মরক্ষার জন্য। বাঁচতে তো হবেই! বাঁচতে হবে— টিকে থাকতে হবে— এর মধ্যে হাসির অনেক কিছুই আছে। কিন্তু বিস্ময় কম। বিস্ময় হল, এই ষড়যন্ত্রসঙ্কুল, আইনঅধ্যুষিত, লড়াইখ্যাপা ক্ষুধার্ত পৃথিবীতে সে কেমন করে বাঁচাতে পারল ওই হৃদয়, যার প্রিয় শব্দ ফুল আর নারী? একটা কাঙ্ক্ষিত চুমুর জন্য যা শেষ নিরাপত্তাটুকুও অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারে? 

তার যতটুকু প্রতিরোধস্পৃহা, তা ওই হৃদয়ের জন্য। ওই হৃদয়টাকে বাচিয়ে রাখার জন্য। সেটাই আসল কথা। 

এর কতকটা চ্যাপলিন পেয়েছিলেন মায়ের থেকে। মা-ই তাকে গল্প শুনিয়েছিল, ‘কোনো পাপ যে করেনি, প্রথম ইঁটটা যেন সে ছোঁড়ে’। সেই মেয়ে, যার চোখ ছিল নীল, প্রেমিকের মতো উদ্দাম— ম্যালনিউট্রিশনে পাগল হয়ে গেল। নন্দিনী, তোমাকে রেখে আসা হল পাগলীদের সেলে। তবু চ্যাপলিন বাঁচিয়ে রাখলেন ওই হৃদয়। যার বাকি অর্ধেক, হ্যাঁ, বাকি অর্ধেক জুড়ে ল্যামবেথের রাস্তায়-কেনিংটনের বস্তিতে ‘যা কিছু তুচ্ছ আর অকিঞ্চিৎকর’; চ্যাপলিন লিখেছেন, …‘ফ্রম সাচ ট্রিভিয়া আই বিলিভ মাই সোল ওয়াজ় বর্ন’। এখানে ‘ট্রিভিয়া’ মানে আমি বুঝি গরিব লোকের বাঁচার লড়াই। টিকে থাকার জন্য যেটুকু রুটি-কাপড় লাগে, সেটুকু জোটানোর লড়াই। ট্রিভিয়া— জীবন। সেটাই তো তার কবিতার উৎসমুখ। ভাঙাচোরা মানুষের ভাঙাচোরা হারমোনিয়াম আর ক্ল্যারিওনেটে যে-সুর, তার যে-মদ একদিন খিদের জ্বালা ভুলিয়ে দিত… ‘ইউ আর মাই হানি, হানি সাকল্’! লোকটার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, মায় পেট পর্যন্ত হাসির খোরাক— তবু ওই হৃদয় নিয়ে আমরা তাই মস্করা করতে পারি না। যতই এলেবেলে হোক, পথ-কুড়োনো ছেলের জন্য তার উদ্বেগের শেষ নেই। দরকারে পুলিশকেও রদ্দা মেরে দেবে! বরং, ওকে একটা ফুল দিয়ে দেখুন…‘স্মিত হাস্যে মুখের দুই প্রান্ত কানে ঠেকে গিয়েছে, শুকনো গালদুটো ফুলে গিয়ে উপরের দিকে উঠে চোখ দুটো চেপে ধরেছে, চোখের কোণ থেকে রগ পর্যন্ত চামড়া কুঁচকে গিয়ে কাকের গায়ের নকশা ধরেছে, সে চোখদুটো কিন্তু বন্ধ’— তবু যেন মনে হবে ভেজা-ভেজা। আমরা তো জানি, ওই হাসির ফাঁকে-ফাঁকে লুকোনো রয়েছে কত না অশ্রুজল! অথবা, যখন সে নিউ ইয়ার ইভ-এ তার গরিবখানায় প্রেয়সী জর্জিয়া ও সখিগণের জন্য ডিনার সাজিয়ে অপেক্ষা করে আর অপেক্ষা করে, তার আহত অভিমান কি কষ্ট দেয় না আমাদের? হায় জর্জিয়া, কেন এই নিষ্ঠুর করুণা? গরিব বলে কি সে মানুষ নয়? অথবা, আরও নিষ্ঠুর— যখন সেই অন্ধ ফুলওয়ালির দৃষ্টি আর ভাগ্য ফিরে গেছে আর চার্লিকে সে ভিক্ষা দিতে যায়, চার্লি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে সরে আসে— তখন একটা অস্ফুট বেদনায় আমাদের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। চার্লি গরিব, তার চালচুলো নেই, তবু সে তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে তোমায়, ওকে ভিক্ষা দিয়ে ছোট করো কেন?— আমরা মনে-মনে বলি। গরিব প্রেমিকের ব্যথাটা বুকের মধ্যে, গলার মধ্যে আটকে যায়। ‘কাব্যে সাহিত্যে টন টন করুণ রসের বর্ণনা পড়েছি, কিন্তু ভ্যাগাবন্ডের সে করুণ চাউনি এদের সবাইকে কোথায় ফেলে কহাঁ কহাঁ মুল্লুকে চলে যায়’! তারপর সে চার্লিকে ছুঁয়ে দ্যাখে। বলে, তুমিই সেই? আমার ফুল কিনেছিলে? এখন তুমি কোথায় লুকোবে, চার্লি? আমরা তোমাকে দেখে ফেলেছি। যা কিছু আমরা আলো বলে ভাবি, তার এর চেয়ে কাব্যময় দৃশ্যরূপ আর কখনও রচিত হয়নি। 

ঋণ: চার্লি চ্যাপলিন, সৈয়দ মুজতবা আলি, বুদ্ধদেব বসু ও রবীন্দ্রনাথ 

আজ চার্লি চ্যাপলিনের জন্মদিন। 


প্রকাশের তারিখ: ১৬-এপ্রিল-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

অসাধারণ একটি লেখা, ভীষণ সুন্দর হয়েছে সায়ন্তন দাদা (লেখক) লেখাটা পড়ে সত্যিই বলতে কী আমার চোখে জল চলে এসেছিল, চার্লি চ্যাপলিন এর ভক্ত কে নয়, আর যাঁরা আরো বড়ো ভক্ত তাঁদের লেখাটা পড়তে ভীষণ ভালো লাগবে, সকলকে পড়ার জন্য অনুরোধ রইলো। ধন্যবাদ।
- দেবাহুতি চ্যাটার্জী , ১৭-এপ্রিল-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৭ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

২৩-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

১৪-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫