Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

জনতার সন্তান, জনতার কবি মেহমুদ দরবিশ 

সৌম্যজিৎ রজক
১২ বছরের এক বালকের লেখা (অবশ্য কেউ কেউ বলেন এটি ইজরায়েলের প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর ঘটনা, তাহলে তো ৮ বছরের বালকের)। বোঝাই যাচ্ছে যে বন্ধুর উদ্দেশ্যে লেখা, জন্মসূত্রে সে ইহুদি। তা যাই হোক, বালক দরবিশ স্কুলে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে এ কবিতা পাঠ করল। নিশ্চয় বেশ গর্ব হয়েছিল তার; জীবনে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠ করে কোন বাচ্চার গর্ব হবে না? তবে দরবিশের বেলায় সে গর্বের মেয়াদ ছিল, বড়জোর, একদিন। পরদিনই তাকে তলব করে ইজরায়েলি সামরিক কমান্ডার। আর এরকম কোবতে-টোবতে লিখলে তার বাবা যে সামান্য চাকরিটা করে সেটাও খোয়াতে হবে, হুমকি দেয় স্পষ্টাস্পষ্টি।
Mahmoud Darwish

এই কয়েকদিন আগে— ইউক্রেন যুদ্ধের সময়— ছোট একটা কবিতা বেশ ভাইরাল হয়েছিল স্যোশাল মিডিয়ায়। আগের কোনও যুদ্ধের সময়, নির্দিষ্ট সেই প্রেক্ষিতে লেখা কবিতাটা পরের ভিন্ন এক যুদ্ধের সময়, ভিন্ন প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। কবিতার বেলায় এরকমটা ঘটে থাকে; সাধারণভাবে সাহিত্যের বেলায়ই। নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতের সীমানা টপকে তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন। সকল লোকের, সকল কালের। কাল নিয়ে কিছু কথা চালাচালি করব আমরা, আরও অনেক কিছু নিয়েই করব, কিন্তু তার আগে কবিতাটা পড়ে ফেলা যাক! 

যে কবিতাটি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসময় পোস্ট হয়েছে, শেয়ার ইত্যাদি হয়েছে, সেটি ইংরেজিতে। বাংলা করলে দাঁড়ায় এরকম — 


এ যুদ্ধ থেমে যাবে।
 
করমর্দন করবে নেতারা হাসিমুখে।
বৃদ্ধা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকবেন তাঁর
শহিদ সন্তানের অপেক্ষায়, মেয়েটি তার প্রেমিকের। 
যুদ্ধফেরত বীর যত বাপেদের অপেক্ষায় থাকবে শিশুরাও। 
আমার স্বদেশ কারা কিনেছিল, আমি তা জানি না। 
তবে কিনা মূল্য চুকিয়েছিল যারা তাদের দেখেছি।

মাত্র ছ'টা বাক্য। সহজ সরল প্রতিটাই। কিন্তু কবিতাটার গঠন বড় সহজ সরল নয়। চলনে একটা ভাঁজ আছে। খেয়াল করলেই বোঝা যাবে। কবিতাটা শুরু হচ্ছে যেভাবে এবং কিছুদূর অব্দি চলতেও থাকছে যেভাবে তাতে ক্রিয়ার কাল ভবিষ্যৎ। ফিউচার টেন্সে লেখা। ‘যুদ্ধ থেমে যাবে’, এই হবে তাই হবে ইত্যাদি। কিন্তু যেখানে শেষ হচ্ছে— শেষ দু'টো বাক্যে, দেখুন— ক্রিয়ার কাল আর ভবিষ্যৎ নেই; অতীত হয়ে গেছে। ‘কিনে নিয়েছিল’, ‘মূল্য চুকিয়েছিল’ এসবই পাস্ট টেন্সে লেখা। কবিতাটা দেখতে সাদামাটা লাগছিল বটে, আদতে একেবারেই তা নয়। মানুষ যেদিকে চলে, ঠিক তার উল্টো চালে— ভবিষ্যৎ থেকে অতীতের দিকে— কেন চলেছে কবিতাটা? 

আচ্ছা কারাই বা চুকিয়েছিল দামটা? শেষ দুটো বাক্য পড়ে তো এমন প্রশ্ন করতেই পারেন পাঠক। উত্তর দেওয়ার জন্যে ততক্ষণ অব্দি কবি কিন্তু আর নেই। বাক্য দুটো লিখেই তিনি পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছেন কবিতার। কবিতাও শেষ, কবিও বসে নেই আর। এবার তাহলে উত্তর খুঁজতে হবে পাঠককে নিজেকেই। কোত্থেকে খুঁজবেন পাঠক? যে টেক্সটটা তাঁর চোখের সামনে আছে, সেটা থেকেই, সেই কবিতাটা থেকেই। 

যুদ্ধ থেমে যাবে, এই হবে তাই হবে ইত্যাদি যে যে ভবিষ্যৎবাণীগুলো করা হচ্ছে শুরুতেই, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না একবার? ভবিষ্যতে কী কী হবে এরকম নিশ্চিত হয়ে বলে দেওয়া যায় নাকি? ভবিষ্যত তো কেউই দেখেনি, কবিও না। কবিতার শেষে— ওই যে একটা লাফ, তার শেষে, আলাদা স্তবকে— দুলাইনে জানিয়েছেন তিনি অতীতের কথা। ভবিষ্যৎ দেখেননি বটে, কিন্তু তিনি অতীত দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এতক্ষণ কথা বলছিলেন, কী কী হয় এই ভয়ঙ্কর বোমাবাজি হানাহানির পরিণতিতে, কী কী হবে এইবারও, তাই বলছিলেন। মায়েরা দাঁড়িয়ে থাকে অপেক্ষায়, মেয়েরা, শিশুরাও— তাদের প্রিয় পুরুষেরা সব ফিরে আসে। ফিরে আসবে এবারও। কফিন বন্দি হয়ে 'বীর' ‘শহিদ’-এর বেশে। আদতে আর কোনোদিনই ফিরে আসে না সন্তান, প্রেমিক, পিতারা। তারা তাদের জীবন দিয়ে মূল্য চোকায়। যারা অপেক্ষায় থাকে বাকিটা জীবন, তারা চোকায় মূল্য প্রিয়জনকে হারিয়ে। এবারও চোকাবে। দাঁড়িয়ে থাকবে। অপেক্ষায়; অন্তহীন, অর্থহীন এক অপেক্ষায়। নেতারা তো হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করবে, তাদের চোকাতে হবে না। তারা কিনে নেবে। তারা জিতে নেবে। যেমন নিয়েছে আগে ‘আমার স্বদেশ’। 

কবিতাটি মেহমুদ দরবিশের লেখা। তবে তিনি যে বলছিলেন, ‘কারা কিনেছিল, আমি তা জানি না’ সেই কথাটাকে খানিক সন্দেহ হয়। আদতে তো কারা কিনে নিয়েছিল, কারা কিনে নেয় আমরা সকলে জানি। উনি তো জানেনই। ‘আমি তা জানি না’ কথাটা কাব্যের খাতিরে বলা, বোধ হয়। খানিকটা মিথ্যে করেই যেমন বলা হয় কাব্যে। অথবা কারা কিনে নিয়েছিল আমার স্বদেশ, তারা ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণই নয় এইখানে। তারা চুলোয় যাক! যারা মূল্য চুকিয়েছিল, লুট হয়ে গেছিল যাদের স্বদেশ, যাদের বাপ-বেটা-আশিক আর ফেরেনি কখনো, ‘তাদের দেখেছি’। তাদের আমি চিনি। ইমপর্টান্ট তারাই আমার কাছে। তাদের কথা বলব বলেই ফেঁদেছি কবিতা; কাব্যের এত আয়োজন! 

ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম পাড়ের বিরাট ভূভাগ, নাম প্যালেস্টাইন, আরব ও ইহুদি এই দুই জাতি পরিচিতির মানুষের বাস। সে দেশের আল-বেরো গ্রামে মেহমুদ দরবিশের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ। সে দেশ তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত; আমাদেরই মতো। দরবিশের যখন সবে ছয়, ’৪৭ সালে ইংরেজরা তল্পিতল্পা গোটায় প্যালেস্টাইন থেকে, আমাদেরই মতো। আমাদের দেশ যেমন স্বাধীন হয়েছিল মানচিত্র টুকরো করে, ওদের বেলাতেও তেমনই ঘটল। আমাদের বেলায় যেরকম মানচিত্র টুকরো করার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই, ওদের বেলাতেও তেমনই। প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিল ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে। স্বাধীনতার পরের বছর— '৪৮ সালে— রাষ্ট্রসঙ্ঘের পরিকল্পনা মতো প্যালেস্টাইনের ভেতরেই নতুন রাষ্ট্র বানানো হল। ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েল। দরবিশের তখন সাত। 

এতদিন যে ভূভাগটার পুরোটার নাম ছিল প্যালেস্টাইন, এখন থেকে তার পুব দিকে একখণ্ড গাজা আর পশ্চিমে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক — এই দু'টুকরো কেবল প্যালেস্টাইন, বাকি পুরোটায় প্রতিষ্ঠিত হল নতুন এক রাষ্ট্র।  ইহুদি রাষ্ট্র। ইজরায়েল। ফলে গাজা আর ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের জমিনটুকু বাদ দিলে গোটা ভূখণ্ডটায় আরব জনগণের ‘দেশ’ বলতে কিছু আর রইলই না।

দরবিশের গাঁ আল-বোরোও পড়ল ইজরায়েলের ভাগে, যদিও সেখানকার ১৪৬০ জনসংখ্যার সংখ্যালঘুই মাত্র ইহুদি। যেহেতু অধিকাংশই আরব তাই তাদের গ্রামটিকে কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হল। গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। সেদিন থেকেই আল-বোরো এক পরিত্যক্ত গ্রাম। ভিটে মাটি ছেড়ে আরবরা চলে গেল সব। উদ্বাস্তু, উদ্বাস্তু! সাত বছরের বাচ্চা ছেলেটাও, সেই থেকে, নির্বাসিত। সেই থেকে স্বদেশ নেই কোনও মেহমুদ দরবিশের। কারা তা কিনে নিয়েছিল, সেদিন সে বালক জানত কিনা জানি না, তবে পরে নিশ্চিতভাবেই জেনেছিল। কাদের মূল্য চোকাতে হয়েছিল, দরবিশ, বালক বয়স থেকেই বিলক্ষণ জেনেছেন। লেবাননের উদ্বাস্তু শিবিরে তাঁদের সাথেই তো ছিলেন তিনি। 

'৪৮-এ ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে আড়াই লাখ মানুষ চলে গেছিলেন অন্যত্র। অধিকাংশই লেবাননে। অর্থাৎ প্যালেস্টাইন নামে এতদিন যে অখণ্ড দেশটা ছিল, তার ঠিক উত্তরে। আরো অনেকের সঙ্গে, এক বছর পর, দরবিশ ও তার পরিবার লেবানন থেকে ফেরেন। কিন্তু এই এক বছরের মধ্যে ইজরায়েলে বসবাসকারী ‘উদ্বাস্তু আরব’দের জনগণনা হয়ে গেছে, স্বাভাবিক কারণেই সেই তালিকায় নাম তোলা সম্ভব হয়নি। তবুও কোনো মতে  তাঁদের পুনর্বাসনের একটা বন্দোবস্ত হয় লেবাননের দক্ষিণ  সীমান্তের গায়ে, উত্তর ইজরায়েলের গ্যালিলিতে। এই সেই গ্যালিলি যেখানে জলের উপর দিয়ে যীশু হেঁটে গেছিলেন বলে শোনা যায় কাহিনিতে। এই সেই গ্যালিলি যেখানে রিফিউজি ক্যাম্পে বড় হচ্ছিলেন মেহমুদ দরবিশ। নাগরিকতার দলিল ছাড়াই, এমনকি, উদ্বাস্তু আরবদের বৈধ তালিকাটিরও বাইরে। 

তাঁর যখন ১২ বছর বয়েস, স্কুলে পালিত হচ্ছিল ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। জাতীয় দিবস ওদের। স্কুলের হেডস্যারের নির্দেশে স্বরচিত কবিতা পড়েন মেহমুদ দরবিশ। জীবনে প্রথম বার। কবিতাটা ছিল তারই কোনো বন্ধুর উদ্দেশ্যে লেখা— 

তুই চাইলেই খেলতে পারিস প্রকাশ্য দিবালোকে
আমি কেন তেমন পারি না? 
খেলনা আছে তোর, আমার কেন নেই? 
বাড়ি আছে তোর, আমার কেন নেই? 
উৎসব-উদযাপন এসবও তো তোর আছে— 
তুই বল, দেখি, কেন আমরা একত্রে খেলতেও পারি না? 

১২ বছরের এক বালকের লেখা (অবশ্য কেউ কেউ বলেন এটি ইজরায়েলের প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর ঘটনা, তাহলে তো ৮ বছরের বালকের)। বোঝাই যাচ্ছে যে বন্ধুর উদ্দেশ্যে লেখা, জন্মসূত্রে সে ইহুদি। তা যাই হোক, বালক দরবিশ স্কুলে জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে এ কবিতা পাঠ করল। নিশ্চয় বেশ গর্ব হয়েছিল তার; জীবনে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠ করে কোন বাচ্চার গর্ব হবে না? তবে দরবিশের বেলায় সে গর্বের মেয়াদ ছিল, বড়জোর, একদিন। পরদিনই তাকে তলব করে ইজরায়েলি সামরিক কমান্ডার। আর এরকম কোবতে-টোবতে লিখলে তার বাবা যে সামান্য চাকরিটা করে সেটাও খোয়াতে হবে, হুমকি দেয় স্পষ্টাস্পষ্টি। 

কবিতা লেখা, যদিও, ছাড়ে না ছেলেটা। সে যা অনুভব করে, সেই কথা লেখা সে ছাড়ে না। ছেড়ে দিলে এত কথা লিখতে-পড়তে হত না আমাদেরও। ১৯ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা-বই বেরোয়। চার বছর পর বেরোয় দ্বিতীয়টি। শীতে জুবুথুবু রাতে গোল করে বসে যেভাবে আগুন পোহায় লোকে, সেইভাবে লোকে দরবিশের কবিতাগুলোর আগুন পোহাচ্ছে তখন। ভূমধ্যসাগর তীরের ভূখণ্ডে। ২০ শতকের ছয়ের দশকে। এই দুটি বইতে সংকলিত কবিতাগুলোর আঁচে ঝলসে যাচ্ছে দখলদারেরা। নিজের স্বদেশকে পুনরুদ্ধার করার জন্যে রীতিমতো যুদ্ধে প্ররোচিত করছে তাঁর কবিতারা প্যালেস্টিনীয় জনতাকে। এসময় মেহমুদ দরবিশের কবিতা পাঠের আয়োজন হতে থাকে বিপুলভাবে, দরবিশের কবিতা পাঠের আসরগুলিতে সমবেত হন হাজার হাজার লোক। অডিটোরিয়াম, স্টেডিয়াম ছাপিয়ে লোকে আসত তাঁর কবিতা শুনতে। কবি, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপকদের সাথে কবিতার আসরে ভিড় জমাতেন দিনমজুর, চাষি, খেটেখাওয়া লোক। 

দেশের বাইরে যেতে গেলে যেমন পাসপোর্ট লাগে, ইজরায়েলের ভেতরেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে তেমনই পারমিট প্রয়োজন। পাসপোর্ট বানাতে লাগে নাগরিকতার দলিল যেমন, এই পারমিট বানাতে তেমনই প্রয়োজন রেসিডেনট্‌স সার্টিফিকেট। এর কোনওটাই দরবিশের ছিল না, সেকথা তো আগেই জেনেছি আমরা। বৈধ পরিচিতি পত্রের অভাবে হামেশাই পড়তে হত ঝামেলায়। 

\দরবিশের একটি কবিতা— ইংরাজি তর্জমায় নাম ‘আইডেন্টিটি কার্ড’— সমগ্র আরব জনগণের কাছে পরিচিত করে তোলে তাঁকে। ‘লেখো, লিখে রাখো, আমি একজন আরব’— মুখে মুখে ফেরে প্রবাদের মতো। আরোপিত হয় সুরও। হয়ে ওঠে প্রায় জাতীয় সঙ্গীত প্যালেস্টিনীয়দের। যারা বেঁচে আছেন এখানেই অথচ যাদের এখানে থাকার কোনও প্রমাণ নেই— দলিল দস্তাবেজ নেই— মেহমুদ দরবিশ যেন হয়ে ওঠেন তাদের ‘জাতীয় কবি’। 

কে দিল তাঁকে এমন শিরোপা? কোনও রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপোষিত কোনও আকাদেমি-তাকাদেমি নয়, জনগণই বানিয়ে নিয়েছে দরবিশকে নিজেদের কবি। জাতীয় জীবনের কাব্যিক কন্ঠস্বর হিসেবে বেছে নিয়েছে তাঁকে। দরবিশ তখন ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্য। নিছক বুদ্ধিজীবী নন, একজন কর্মী। যোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সম্পাদনার মুখ্য দায়িত্বে। ইজরায়েলি ওয়ার্কার্স পার্টির সাহিত্যিক মুখপত্রটিও সম্পাদনা করেছেন। 

জীর্ণ এক জাতির বুকে আশা ফোটানোর, মৌনমলিন মুখে ভাষা জোগানোর মূল্য, অবশ্যই, চোকাতে হয়েছে তাঁকে। আজীবন। প্রকাশ্য কবিতা পাঠের পর, বিভিন্ন কবিতা ও গদ্য প্রকাশের পর কখনও গৃহবন্দি হতে হয়েছে, কখনও জেলে যেতে হয়েছে, নির্বাসিত হতে হয়েছে বারবার। সাতের দশকে সোভিয়েতে দেশে যান এক বছরের জন্যে, সেখান থেকে যান মিশরে ও লেবাননে। প্যালেস্টিনীয়দের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে যে সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল, ইজরায়েল ও তার মদতদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দাবি অনুযায়ী যা কিনা ছিল একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, সেই ‘প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগঠন’-এ (পিএলও-তে) যোগ দেন তিনি। সেটা ’৭৩ সাল। সেই থেকে ইজরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ। নিজের ভিটেতে-মাটিতে, স্বদেশ ফেরার অধিকার হারান দরবিশ।

ইতিমধ্যে ১৯৬৭-র ৬দিন ব্যাপী আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছে, প্যালেস্টাইনের দু'টুকরো জমিও— গাজা স্ট্রিপ ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক— দখল করে নিয়েছে ইজরায়েল। অর্থাৎ প্যালেস্টাইন এমন একটি দেশ এখন, যার কোনও ভৌগোলিক অস্তিত্বই নেই। বস্তুগত অস্তিত্বহীন এই প্যালেস্টাইন যা কেবলই অতীতের স্মৃতিতে রয়েছে, রয়েছে ভবিষ্যতের কল্পনায়। আর বর্তমানে? দরবিশের স্বদেশ— গায়েব ভি হ্যায়, হাজির ভি! 

বিমূর্ত কোনো দার্শনিক ধাঁধা নয়, অমোঘ এক বাস্তবতা এটা। প্যালেস্টিনীয় বাস্তবতা। এই বাস্তবতাই দরবিশের কবিতার খাতায় শব্দের পর শব্দ বুনে যাচ্ছে। ধ্রুপদী আরবি শব্দ। কিন্তু ধ্রুপদী কোনো আঙ্গিকই ধারণ করতে পারছে না তাকে। '৬৭-র যুদ্ধের পর থেকে— '৭৩-এর নির্বাসনের পর থেকে আরওই— পাল্টে গিয়েছে মেহমুদ দরবিশের কাব্যভাষা। দখলদারেরা তো এতদিনে মুছেই ফেলেছে প্যালেস্টাইনের ভৌগোলিক অস্তিত্ব, এবার তারা মুছে দিতে চায় প্যালেস্টাইনের স্মৃতিকেও। ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চায় আরবদের ভাষা এবং তাদের পরিচিতিও। এতদিনের মারাকাটারি কবিতা থেকে যে ভিন্ন খাতটিতে বইতে শুরু করেছে দরবিশের কাব্য, সেখানে তথাকথিত রাজনৈতিক শব্দের বদলে বেশি বেশি ব্যবহৃত প্রাচীন কাহিনি, কিংবদন্তী, প্রবাদ ইত্যাদি। স্মৃতিকে, ভাষা ও পরিচিতিকে রক্ষা করাই শুধু নয়— বাস্তবের মাটিতে যে স্বদেশকে পুনর্দখল করা সম্ভব হয়নি এখনও, নিজের কবিতায় সেই স্বদেশকে নির্মাণ করে চলেছেন দরবিশ। এসব নিয়ে বহু গবেষক, জ্ঞানীগুণী লোক আলোচনা করেছেন। এতদিনে তিরিশটার বেশি কবিতা-বই প্রকাশিত হয়ে গেছে তাঁর, জীবনের শেষে গিয়ে যে সংখ্যা চল্লিশ ছাড়িয়ে যাবে। সে যাক। তবুও শেষ অব্দি দরবিশের কবিতা তাঁর জনতাকে ছেড়ে যায়নি কখনও। জনতাও ছেড়ে যাননি কবিকে। 

প্যালেস্টিনীয় জনতার সংগ্রামে অবিচলিত সেনা দরবিশ ‘প্যালেস্টাইন মুক্তি সংগঠন’ (পিএলও)-র কার্যকরী সমিতির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ’৮৭ সালে। তার আগে থেকে ‘প্যালেস্টিনীয় লেখক ও সাংবাদিক ইউনিয়ন’-এর কাজে কিংবা বেইরুটে অবস্থিত ‘প্যালেস্টাইন গবেষণা কেন্দ্র’ পরিচালনায় নিংড়ে দিয়েছেন নিজেকে। সেসময় মুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে প্রত্যক্ষ শারীরিক প্রতিরোধ গড়ছেন আরব গেরিলারা আর সেই যুদ্ধেরই ভিন্ন ফ্রন্টে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দরবিশ। কবিতাও লিখছেন, সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা সেইসব কবিতার পঙক্তি লিখে রাখছেন গ্রাম-শহরের দেয়ালে, পাঁচিলে। এমনকি ’৮৮ সালে পিএলও-র জাতীয় পরিষদে গৃহীত ‘প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’-এর খসড়াটিও প্রস্তুত করছেন দরবিশ নিজে হাতে। নিজের ভাষায় নির্মাণ করছেন কবি জনতার ভাষ্য। 

কবির সাথে জনতার সম্পর্কটা আদতে কীরকম? প্রসঙ্গত ১৯৭৩ থেকে ইজরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার পরে ’৯৫ সালে আরবি সাহিত্যিক ও ইজরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, দরবিশের দীর্ঘদিনের কমরেড এমিল হাবিবির শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে মাত্র চার দিনের জন্যে ইজরায়েলের হাইফা শহরে ঢোকার অনুমতি পান তিনি। চলে যেতে হয় চার দিন পর। ’৯৬-তে অবশেষে পাকাপাকিভাবে ইজরায়েলে ফেরার অনুমতি মেলে; তবে নিজের গ্রামে তো নয়ই, এমনকি শৈশব-কৈশোরের গ্যালিলিতেও নয়, থাকতে হবে রামআল্লাহ-তে। এই মাঝের সময়টা ছিলেন জর্ডানে। '৬৬-র ৭ ফেব্রুয়ারি সেখানেই হিব্রু কবি হেলিট ইয়েশুরন দরবিশের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন। তিনি তো আর কদিন পরেই স্বদেশে ফিরবেন, রামআল্লাহ-য় প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষা করছেন‍, কথাবার্তা প্রায় পাকা। সকলে ভাবছেন এবার  নির্বাসন ফুরোলো কবির! কবি তা ভাবছেন না, তিনি বলছেন, ‘নির্বাসন নিজেই এমন গেড়ে বসে আছে আমার ভিতর যে আমি তাকে নিয়ে যেতে পারি স্বদেশে আমার’। এই শিরোনামেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় সেবছর বসন্তে। কবির সাথে জনতার অথবা জনতার সাথে কবিতার সম্পর্ক বিষয়ে দরবিশের বোঝাপড়া খানিকটা ঝোঝা যেতে পারে এই সাক্ষাৎকারে বলা তাঁর একটি কথাতে—

‘সত্য সবসময়ই দু'মুখো অথচ আমরা কেবল গ্রিসের মুখেই গল্পটা শুনেছি।...  ট্রয় নিজের মুখে তার গল্পটা বলেনি কখনও। যে রাষ্ট্র মহান সব কবিদের জন্ম দিয়েছে, তার কি তাহলে, কবি নেই এমন জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অধিকার রয়েছে? কোনও জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাব্যের অনুপস্থিতি কি তাদের পর্যদুস্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে? কবিতা কি সাঙ্কেতিক কোনও ব্যাপার, নাকি তা ক্ষমতা দখলের একটা হাতিয়ারই বটে? আমি এমন এক জনতার সন্তান যারা আজও স্বীকৃতই নয়; আমি সেই না-থাকাদের হয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম, ট্রয়ের কবির যেটা কাজ।’

দীর্ঘজীবনে দরবিশের বহু কিছুই ঘটেছে। এমনকি নয়ের দশকের শেষ দিকে, বিরোধী কোনও অবস্থান না নিলেও, পিএলও-র সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে না পেরে সেই সংগঠন থেকে বেরিয়েও এসেছেন তিনি। কিন্তু শেষাবধি প্যালেস্টিনীয় জনতার সন্তান হয়েই বেঁচেছেন। মারা গেছেন যখন ২০০৮-এ, শেষকৃত্যে হাজির ছিলেন লাখো জনতা। প্যালেস্টিনীয় আরব জনতা। ৯২ বছরের বৃদ্ধা তাঁর জননী— কাঁপা কাঁপা ক্ষীণ এক কন্ঠে বিপুল সে জনতার উদ্দেশ্যে বলেন সেদিন— ‘আপনাদেরই সন্তান ছিল তো সে’! 

জনতার সন্তান। জনতার কবি। আমৃত্যু যে তার স্বদেশকে খুঁজেছে। খুঁজেছে শৈশব। উল্লিখিত সাক্ষাৎকার থেকেই আরও উদ্ধৃত করি—

‘আমার শৈশবের আর স্বদেশের কাহিনিতে বেড়া নেই কোনও।.... আমার শৈশব যখন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, আমার থেকে আমার ভিটেও তখনই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ট্র্যাজেডি দুটোর মধ্যে ঐক্য ছিল একটা, সমান্তরাল ছিল দুটো। ’৪৮-এ যখন জীবন তছনছ হচ্ছিল আমাদের, আমি আমার শৈশব থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম নির্বাসনে। তখন ছ-সাত বছর আমার। আমার গোটা পৃথিবীটা ওলটপালট খাচ্ছিল। শৈশবটা ওখানেই থমকে গেছিল, আমার সাথে তো আর এগিয়ে যায়নি। স্বদেশের সাথে শৈশবটাকেও কি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? সম্ভব! যদি স্বদেশকে পুনরুদ্ধার করা যায়, আমাদের জন্মভূমিকে পুনরুদ্ধার করা যায় যদি। এই খোঁজ— আদতে এক কাব্যিক খোঁজ— এই খোঁজই আমার কবিতায় ছন্দ যোগায়... ’

এরকম খোঁজ ব্যাতিরেকে নিছক ছন্দেরই নিমিত্ত যারা ছন্দের কারিকুরি করে, ছন্দের ক্রীতদাস তারা। রুটিরই জন্যে যাদের রুটিগুলো, খাবার জন্য নয়— কাব্যেরই জন্য যাদের তামাম কাব্য— তারা কিছুতেই জনতার কেউ নয়। জনতার স্মৃতিতে স্বদেশের মতো করে জাগরুক থাকেন জনতার কবিই কেবল। যেমন রয়েছেন মেহমুদ দরবিশ। 


প্রকাশের তারিখ: ১৩-মার্চ-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

লেখাটি কি ভাবে নজর এড়িয়ে গেল জানিনা। অসধারন লেখা... - (সম্পাদিত)
- Partha Dey, ০৯-আগস্ট-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫