Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কস ও ভারত

ইরফান হাবিব
ট্রিবিউনে প্রকাশিত মার্কসের স্বাক্ষরিত ভারত সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলি সামনে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নে মার্কসের রচনাসমগ্র প্রকাশের উদ্যোগ নেবার সময়ে। ভারতে তা প্রথম পাওয়া যায় মুলক রাজ আনন্দের সম্পাদনায় সোস্যালিস্ট বুক ক্লাব প্রকাশনা, সংখ্যা ৪-এ। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে। রজনী পাম দত্ত দীর্ঘ ভূমিকা ও প্রচুর টীকাসহ এই প্রবন্ধাবলী প্রকাশ করেন।
Marx and India

দীর্ঘদিন পর্যন্ত এমনকি অগ্রণী মার্কসবাদীরাও তেমন ভাবে অবগত ছিলেন না যে মার্কস ভারত নিয়ে বিশদে লিখেছেন। রোজা লুক্সেমবার্গ 'দি অ্যাকিউমুলেশন অফ ক্যাপিটাল' (১৯১৩) বা ভি আই লেনিন 'ইম্পিরিয়ালিজম, দি হাইয়েস্ট স্টেজ অফ ক্যাপিটালিজম' (১৯১৬) লেখার সময়ে নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে ১৮৫৩ থেকে ১৮৬১ পর্যন্ত ভারত ও চীন সম্পর্কে মার্কসের প্রবন্ধাবলী সম্পর্কে জানতেন না। আরো পরের পান্ডুলিপির কথা তো বাদই দেওয়া যায়। যদি লুক্সেমবার্গ বা লেনিন জানতেন তাঁদের লেখায় উপনিবেশ সম্পর্কে মার্কসের ধারণা বিশদে ব্যবহৃত হতো।

আমরা যতদূর জানি ট্রিবিউনে প্রকাশিত মার্কসের স্বাক্ষরিত ভারত সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলি । সামনে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নে মার্কসের রচনাসমগ্র প্রকাশের উদ্যোগ নেবার সময়ে। ভারতে তা প্রথম পাওয়া যায় মুলক রাজ আনন্দের সম্পাদনায় সোস্যালিস্ট বুক ক্লাব প্রকাশনা, সংখ্যা ৪-এ। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে। রজনী পাম দত্ত দীর্ঘ ভূমিকা ও প্রচুর টীকাসহ এই প্রবন্ধাবলী প্রকাশ করেন ( মার্কস, আর্টিকলস অন ইন্ডিয়া, লন্ডন, ১৯৪০)। ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩-এ বোম্বে থেকে। ভারতের অতীত এবং ঔপনিবেশিক বর্তমান সম্পর্কে ১৮৫৩-র ট্রিবিউনে মার্কসের নিবন্ধগুলি দত্তের নিজের দারুণ প্রভাবশালী গ্রন্থ 'ইন্ডিয়া টুডে'-র তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল।

কিন্তু এমনকি এই প্রবন্ধগুলিও মার্কসের মোট রচনার কেবল গোড়ার দিকের, মার্কসের নাম ছাড়াই ১৮৬৩ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লেখা প্রকাশিত হয়। সেগুলি যে মার্কসের (এবং অংশত এঙ্গেলসের) তা মার্কসের চিঠিপত্র ও নোটবুকের গবেষণা থেকে জানা যায়। ১৯২০, ১৯৩০-র দশকে মস্কোর মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন ইন্সটিটিউট এই গবেষণা চালায়। এর মধ্যে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘অন ব্রিটেন’ নাম দিয়ে, মস্কোয়, ১৯৫৩-তে।

কিন্তু ১৯৫৩ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত মার্কস-এঙ্গেলসের ‘অন কলোনিয়ালিজম’ এবং ‘ফার্স্ট ইন্ডিয়ান ওয়ার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স’ এবং তাদের পরবর্তী সংস্করণে সংযুক্ত আরো লেখা থেকে মার্কসের ভারত সম্পর্কে জ্ঞানের বিশদত্তর তথ্য পাই আমরা।

এই লেখা থেকে ভারত সম্পর্কে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন আলোকপাত হয়। ট্রিবিউনে স্বাক্ষরিত প্রবন্ধ ( ২৩শে জুন, ১৮৫৩) থেকে আমরা দেখেছি এমন একটি ধারণা যে নিজের মুনাফার স্বার্থেই ব্রিটেন ভারতে আধুনিক উপাদান চাপিয়ে দিচ্ছে বলে তার ধ্বংসাত্মক এবং নিপীড়ণমূলক আচরণকে উপেক্ষা করা চলে। মার্কস এমনকি গোটের কবিতা উদ্ধৃত করেছিলেন যেখানে গোলাপের কুঁড়ি সুগন্ধী তৈরির জন্য তাকে ধ্বংস করার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাচ্ছে। কিন্তু পরে অস্বাক্ষরিত প্রবন্ধ থেকে আমরা দেখছি ১৮৫৭-র বিদ্রোহের খবর যখন ইংলন্ডে পৌঁছোলো মার্কস তাঁর পুরনো পরামর্শ বিস্মৃত হলেন এবং দ্রুত বিদ্রোহীদের পক্ষ নিলেন। মার্কস আশা প্রকাশ করলেন যে বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে রাখতে পারবে, এই বিদ্রোহকে ‘বিপ্লব’ বলে চিহ্নিত করলেন এবং ব্রিটিশ অত্যাচারের তীব্র নিন্দা করলেন।’

মূলত হেগেলের ফিলোসফি অফ হিস্টরি-র ভিত্তিতে মার্কস প্রাক-আধুনিক ভারতীয় সমাজকে ‘প্রতিরোধহীন ও পরিবর্তনহীন’ বলে ব্যাখা করছিলেন (ট্রিবিউন, ৮ আগস্ট, ১৮৫৩)। চিত্তাকর্ষক ব্যাপার হলো তাঁর সেই প্রথম দিকের ধারণার সঙ্গে বিদ্রোহকে কী ভাবে মেলালেন তিনি। ১৮৫৭-র পরে ভারতের সামাজিক গঠন সম্পর্কে ওই ধারণা আর কিন্তু উচ্চারিত হয়নি।

ট্ৰিবিউন পর্বে (১৮৫২-৬৩) মার্কস ভারত সম্পর্কে প্রচুর পড়াশোনা করেছিলেন। ইউরোপীয় সামস্ততান্ত্রিক ধাঁচের থেকে পৃথক এক প্রাক ধনতান্ত্রিক মডেলের চিত্র তাঁর সামনে উপস্থিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট ইশতেহারে (১৮৪৮) কেবল দুটি প্রাক ধনতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল প্রাচীন রোম এবং ‘মধ্য যুগের’ ইউরোপ। মার্কস ভারতে দেখলেন আরেক ধরনের সামাজিক কাঠামো, যার ভিত্তি দাসপ্রথা নয়। ১৮৫৭-৫৮ সালের নোটসের পান্ডুলিপি, যা এখন গ্রুন্ড্রিসে নামে পরিচিত, সেখানে মার্কস দেখালেন এই সামাজিক ব্যবস্থা দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপরে ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। যৌথ কৃষিকাজ বাদ দিয়ে 'গ্রাম সমাজ', এবং 'স্বৈরাচারী' রাষ্ট্র ('প্রাচ্যের স্বৈরতন্ত্র') যা প্রকৃতপক্ষে জমিদারদের খাজনাই কর হিসাবে আদায় করে। এই ধাঁচ ধ্রুপদী দাস ব্যবস্থা বা সামস্ততন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। মার্কস ‘এ কন্ট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকনমি’-র (১৮৫৯) ভূমিকায় প্রাচীন, সামস্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘এশিয়াটিক’ কথাটি জুড়েছিলেন।

মার্কসের চোখে ভারতে প্রাক-আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা দাস-ভিত্তিক বা সামন্ততান্ত্রিক কোনোটাই ছিলো না ( ইউরোপে যে দুই রূপ স্বীকৃত ছিলো)। কিন্তু তা শ্রেণীহীন কোনো ব্যবস্থা ছিলো, তা নয়। মার্কস এমনকি গ্রামীণ সমাজের মধ্যেও শ্রেণীর অস্তিত্ব দেখেছিলেন; তাছাড়া স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরাট কাঠামোয় শাসক শ্রেণী ছিলো যারা উদ্বৃত্তের বিপুল অংশ আত্মসাৎ করত। হবসবাম বলেছিলেন, ‘এশিয়াটিক ব্যবস্থা তখনও শ্রেণী সমাজ নয়, বা হলেও সবচেয়ে আদিম ধরনের’। এই ব্যাপারে হবসবাম ঠিক বলেননি। সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় এমন এক উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে এক বিরাট দেশ থেকে রাষ্ট্র কর হিসাবে খাজনা সংগ্রহ করে (যেমন মোঘল সাম্রাজ্য, যার কথা মার্কসের চিন্তায় ছিলো যখন তিনি আওরঙজেবের সময়ে ভারত সফরকারী ফরাসী পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বের্নিয়েরকে প্রভূত পরিমাণে উদ্ধৃত করেছেন) তা সুদূর কল্পনাতেও ‘আদিম’ সমাজ হতে পারে না।

অবশ্যই ব্যবস্থাটি ছিলো প্রাক-ধনতান্ত্রিক। সে-কারণে মার্কস ক্যাপিটাল প্রথম খন্ডে অ-ধনতান্ত্রিক সমাজ কীভাবে ধনতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া কাজ করে তা বোঝাতে ভারত সম্পর্কে অনেক তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। ভারতে হস্তশিল্পের উৎপাদন ছিলো শ্রমবিভাজনের এক স্তর; ঢাকার তন্তুবায়ী নিজের ‘উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত’ দক্ষতাকে সামান্যতম যন্ত্র ব্যবহার করে সূক্ষ্ণতম মসলিন উৎপাদন করতে পারত। অন্যদিকে মেশিনের ব্যবহারের আগে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় আরো বিশদ শ্রমবিভাজন আরো সুনির্দিষ্ট বিভাজিত দক্ষতা ও পৃথক পৃথক যন্ত্রের ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিত। অন্যত্র তিনি ভারতীয় ‘বড় ব্যবসায়ীদের’ (ম্যাগনেট) কথাও উল্লেখ করেছেন যারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য কারিগর নিয়োগ করছে যেখানে ‘পুঁজির কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদন। ক্রমবৃদ্ধি পেয়েই চলেছে।’

কৃষি ও হস্তশিল্পে বিরাট অ-ধনতান্ত্রিক ক্ষেত্র ছাড়াও ভারতে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির বিপরীতে আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিলো; টাকার ব্যবহার এবং পণ্য সঞ্চরণের সীমাবদ্ধতা। মার্কস লিখেছিলেন প্রাক-আধুনিক ভারতীয় অর্থনীতিতে ‘শুধুমাত্র উদ্বৃত্তই পণ্য হয়, তা-ও তার একাংশ হয় না যতক্ষণ তা রাষ্ট্রের হাতে না পৌঁছোচ্ছে।’ অন্যভাবে বললে, গ্রামে একটি ‘স্বাভাবিক’ অর্থনীতি ছিলো, পণ্য চলাচল হত তার বাইরে শহরে এবং বাজারে। অন্যদিকে ধনতন্ত্রে প্রত্যেক ক্ষেত্র পণ্য অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, প্রত্যেক লেনদেনের জন্য টাকার সার্বজনীন ব্যবহার যার ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

মার্কস ভারত সম্পর্কে তাঁর তথ্য ব্যবহার করেছিলেন ধনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য আরো ভালো ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। কিন্তু সম্ভবত এর থেকেও আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের জন্য ভারতে ব্রিটিশ শোষণ সম্পর্কে জ্ঞানকে ব্যবহার করছিলেন তিনি। ধনতন্ত্রের বিকাশের প্রক্রিয়ায় 'আদিম সঞ্চয়ের' ভূমিকা সম্পর্কে মার্কসের পুনর্মূল্যায়কে সম্ভবত পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কমিউনিস্ট ইশতেহারে মার্কস -এঙ্গেলস তখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক অর্থনীতি যতটা এগিয়েছিল তার পরিধির বাইরে যাননি। অর্থাৎ তখনও এই ধারণাই ছিলো যে ‘পুঁজি’ বৃদ্ধি পায় কেবলমাত্র ব্যক্তিগত সঞ্চয় এবং দেশে (ইংলন্ডে) ও উপনিবেশ-সহ বিদেশে বাণিজ্যের মাধ্যমে।

ক্যাপিটাল প্রথম খন্ড, অষ্টম অংশ, পরিচ্ছেদ ২৫-এ ধনতন্ত্রের বিকাশের এই সরল ব্যাখ্যা দৃঢ়তার সঙ্গে এমনকি অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা হয়। পুঁজির আদিম সঞ্চয়ের দুটি শক্তিশালী গতিসূত্র ছিলো যা ক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইংলন্ডে ধনতন্ত্রের দ্রুত বিকাশের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রথমত, ইংলন্ডে কৃষকের জমি এনক্লোজারের মাধ্যমে জবরদখল করা যার ফলে কৃষককে সর্বহারায় পরিণত হতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে আগেই চার্চের জমি ইত্যাদি জোর করে অধিগ্রহণ করা পুঁজির রূপে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি করেছে। আদিম সঞ্চয়ের এ ছিলো প্রধান অভ্যন্তরীণ উৎস। দ্বিতীয়টি ছিলো বাইরের, অর্থাৎ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে ইংলন্ডে যে সম্পদ চালান হচ্ছিল। ১৪৯২ সালে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারের পর থেকে যা শুরু হয়। মার্কস একটি নজরকাড়া পরিচ্ছেদে লিখেছিলেনঃ

‘আমেরিকায় সোনা ও রুপোর আবিষ্কার, আদিম অধিবাসীদের সমূলে উৎপাটন, দাসত্ব ও খনিতে প্রোথিত করা, পূর্ব ইন্ডিজ (ভারত ও পূর্ব এশিয়া) দখল ও লুঠপাট শুরু, আফ্রিকাকে কালো চামড়ার বাণিজ্যিক শিকারের এক ভূখন্ডে পরিণত করা ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের স্বর্ণালী ঊষার সূচনা করেছিল। এই মনোরম প্রক্রিয়া আদিম সঞ্চয়ের মুখ্য মুহূর্ত।’ 

এই সাধারণ বিবৃতিকে তথ্য দিয়ে, উপনিবেশে লুণ্ঠনের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন মার্কস। প্রায় পুরো এক পৃষ্ঠা লিখেছিলেন ভারতে ব্রিটিশরা কী করেছে। * আদিম সঞ্চয়ের বাইরের উৎস সম্পর্কে মার্কসের এই গুরুত্বপূর্ণ সূত্রায়ণ সত্ত্বেও ইউরোপীয় মার্কসবাদীরা পুঁজি সঞ্চয়ের অভ্যন্তরীণ উৎসের তুলনায় উপনিবেশে লুন্ঠনের দিকে অনেক কম নজর দিয়েছেন।’ তাঁর প্রথম দিকের পড়াশোনার সময়েই মার্কস আমেরিকায় স্পেনের লুণ্ঠন বা আটলান্টিক পেরোনো দাস বাণিজ্য সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবহিত ছিলেন কিন্তু এটা সম্ভব যে ধনতন্ত্রের উত্থান এবং প্রসারে ঔপনিবেশিক লুঠের ভূমিকা তিনি ১৮৫৩ থেকে দেখতে থাকেন ভারত থেকে ব্রিটেনে কীভাবে সম্পদ চালান হচ্ছে তার মধ্যে দিয়ে। ১৮৫৩-তেই তিনি বলেছিলেন ব্রিটিশ ‘অর্থতন্ত্র’ ভারতকে লুঠের জন্য তৈরি আর ব্রিটিশ ‘মিলতন্ত্র’ তার বাজার দখলে প্রস্তুত। ১৮৫৯ সালে তিনি স্পষ্ট দেখেছিলেন ১৮৫৮ -তে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ব্রিটিশ ঘাটতি ৬০ লক্ষ পাউন্ডের বেশি। তা পূরণ হচ্ছে ভারত থেকে চীনে আফিম ও তুলো রপ্তানির ৯০লক্ষ পাউন্ড উদ্বৃত্তের মাধ্যমে। 

ক্যাপিটাল তৃতীয় খন্ডে (মস্কো, ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ২৬৯-৭০) মার্কস ভারত থেকে ইংলন্ডে ‘ট্রিবিউট’ যাবার কথা বলেন এবং হিসেব করে দেখান (পৃষ্ঠা ৫৭৭) ১৮৫৫ নাগাদ তা প্রায় ৫০ লক্ষ পাউন্ড। এ থেকে স্পষ্টই যে তাঁর ধারণায় 'আদিম সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া ইংলন্ডে ধনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পরে থেমে যায়নি, যেমন ডব মনে করতেন, বরং তা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসাবেই অব্যাহত থেকেছে। বস্তুত পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের এই ট্রিবিউটের আয়তন সম্পর্কে মার্কসের ঘৃণা আরো বেড়েছে। ১৮৮১-তে ড্যানিয়েলসনকে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে ‘ভারতীয়রা অযৌক্তিকভাবে বার্ষিক ইংলন্ডে যা পাঠাচ্ছে তা ভারতের ৬কোটি কৃষি ও শিল্পশ্রমিকের মোট আয়ের থেকেও বেশি।’

মার্কস ও এঙ্গেলসের চিত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের দিকে পরিশেষে নজর টানা যায়। তাঁদের ধারণা ছিলো ভারতে উপনিবেশ-বিরোধী বিদ্রোহ হতে পারে যাকে ইউরোপের সমাজতন্ত্রীদের সমর্থন করতে হবে। ১৮৫৩ সালেই মার্কস এমন এক সময়ের কথা চিন্তা করছেন যখন ‘ব্রিটিশ শাসন ছুঁড়ে ফেলে দিতে হিন্দুরা নিজেরাই যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’ একই সঙ্গে বিকল্প হিসাবে তিনি এমনও ভেবেছিলেন যে ব্রিটিশ ‘শিল্প সর্বহারা’ ‘ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের’ উৎখাত করবে যার ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটবে।’ ভারতে উপনিবেশ-বিরোধী এমন সংগ্রাম সংগঠিত করতে পারে ভারতীয় শিল্প সর্বহারা ব্যতীত অন্য শ্রেণীগুলি ( শিল্প সর্বহারা তখন নেহাতই শৈশবে)। ১৮৫৭-র বিদ্রোহ শুরু হলে মার্কস লক্ষ্য করলেন সিপাহীদের মধ্যে থেকে শুরু হলেও কৃষক ও জমিদার উভয়েই এতে যুক্ত হয়েছে। একে ‘বিপ্লব’ এবং ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ বলতে কোনো দ্বিধা করেননি তিনি।’ জীবনের পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েলসনকে লেখা এক চিঠিতে মার্কস আশাবাদী হয়েই উল্লেখ করেছিলেন, ভারতে ‘হিন্দু ও মুসলমানদের সহযোগিতায় প্রকৃত ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ * তাঁর সহকর্মীর দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার হয়েই এঙ্গেলস প্রায় একই সময়ে কাউৎস্কিকে লিখেছিলেন, (১২ই সেপ্টেম্বর, ১৮৮২) : 'ভারতে হয়তো, বস্তুত খুবই সম্ভবত, বিপ্লব হতে চলেছে এবং মুক্তিকামী (ইউরোপীয়) প্রলেতারিয়েত যেহেতু উপনিবেশে যুদ্ধ করতে পারবে না, সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। নিশ্চিতভাবেই সমস্ত রকমের ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে তা যাবে কিন্তু সব বিপ্লবেই তা অবিচ্ছেদ্য অংশ।'

ঔপনিবেশিক শক্তি যেহেতু সমগ্র জাতিকেই নিপীড়ন ও শোষণ করছে মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতারা ভারতে উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামকে বহু শ্রেণীর আন্দোলনের আলোকেই দেখেছিলেন। মার্কস এঙ্গেলসের ক্ষেত্রে এ ছিলো আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে মূল্যবান অন্তদৃষ্টি কেননা এমনকি তাঁদের শেষ বয়সেও তা ছিলো কেবল সম্ভাবনাই। আমাদের জাতীয় আন্দোলনে যেসব শক্তির মধ্যে থেকে বিকশিত হয়েছিল তার মূল্যায়ন করার সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা এখন উপেক্ষা করতে পারি না।        

 

সূত্র নির্দেশ:

 

১. ইকবাল হুসেইন সম্পাদিত 'কার্ল মার্কস অন ইন্ডিয়া' নয়াদিল্লি, ২০০৬-এ ইরফান হাবিবের ভূমিকা। 

২. ইকবাল হুসেইন সম্পাদিত 'কার্ল মার্কস অন ইন্ডিয়া'-র মার্কস-এঙ্গেলসের লেখা সম্পর্কে উল্লেখের ভিত্তিতে এই মন্তব্য।

৩. ই জে হবসবম মার্কস: প্রি ক্যাপিটালিস্ট ইকনমিক ফাউন্ডেশনস-এর ভূমিকা, লন্ডন, ১৯৬৪। 

৪. মার্কস, ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ড, সম্পাদনা: ডোনা টোর, পৃ: ৭৩৬-৩৯।

৫. ঐ ১১. মরিস ডব, এরিক হবসবাম, পি ভিলারের লেখা মাথায় রেখে বলছি।

৬. ট্ৰিবিউন, ২২ জুলাই, ১৮৫৩।

৭. ট্ৰিবিউন ১০ অক্টোবর, ১৮৫৯।

৮. প্রভাত পট্টনায়েক, "অ্যাপ্রেসিয়েশন : দি আদার মার্কস', ইকবাল হুসেইন সম্পাদিত 'কার্ল মার্কস অন ইন্ডিয়া'।

৯. কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস করেসপন্ডেন্স ১৮৪৬-১৮৯৫, কলকাতা, ১৯৪৫। এই চিঠিটি ইংরাজিতে লেখা।

১০. ট্ৰিবিউন, ৮ আগস্ট, ১৮৫৩।

১১. ইকবাল হুসেইন সম্পাদিত 'কার্ল মার্কস অন ইন্ডিয়া'-য় ১৮৫৭-র বিদ্রোহ সম্পর্কে মার্কস এঙ্গেলসের ধারণার সংক্ষিপ্তসার পেশ করেছি আমি।

১২. কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস করেসপন্ডেন্স ১৮৪৬-১৮৯৫ ১৯. ঐ।

১৩. কমরেড ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ মনে করতেন জাতীয় আন্দোলনের দুটি পৃথক ধারা ছিলো বুর্জোয়াদের নেতৃত্বাধীন এবং প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বাধীন। এই ধারণার পর্যালোচনা হওয়া উচিত। গান্ধীজীর নেতৃত্বকে বুর্জোয়া বলে চরিত্রায়িত করা যায় কিনা এই প্রশ্নে দেখুন ইরফান হাবিব, দি ন্যাশানাল মুভমেন্ট স্টাডিজ ইন আইডিওলজি অ্যান্ড হিস্টরি, দিল্লি, ২০১১।

ভাষান্তরঃ সুচিক্কণ দাস 


প্রকাশের তারিখ: ২৯-অক্টোবর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ব্রিটিশ অধীনে যাবার পর ১৮৫৩ থেকে কার্ল মার্কস যে গবেষণামূলক নিবন্ধগুলো লিখেছিলেন, তাতে এসিয়াটিক স্যোসাইটির ভারতে সমাজ বিকাশের ধারার মধ্যে ও ইউরোপের ধারার মধ্যে যে তফাত ছিল, তার প্রারম্ভিক ব্যাখ্যা করেছেন। এঙ্গেলস তাঁকে উপযুক্ত সহযোগিতা দিয়েছেন। ক্রম বিকাশের ধারা - প্রেক্ষিত ভারত , এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ এই ওয়েব ডেক্সে প্রকাশিত হলে আমরা বিশেষ উপকৃত হবো।
- Manabesh, ২৯-অক্টোবর-২০২২


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫