সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ছাঁচতলার শ্রমিকরাও লড়ে চলেছে
পৃথা তা
দেশ জুড়ে আনন্দের বন্যার নকল ছবি এঁকে কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও গুটিকয়েক পরিবারের উৎসব দেখিয়ে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের নিজেদের আত্মীয় পরিজনদের কথা৷ ৪১ দিন সুড়ঙ্গে কাটানো শ্রমিকের সাথে আত্মীয়তা অনুভূত হচ্ছে না। ফলে তার বাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে যখন তখন আপামর শ্রমিক বা তার শ্রেণির মানুষেরা নিজের বাড়ি ভাঙার যন্ত্রণা অনুভব করছেন না। তার বাড়ির লোকেদের, বাড়িতে থাকা মহিলা শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণার কথা অনুভূত হচ্ছে না।

সারা দুনিয়া জুড়ে শ্রমিকদের বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ একটু একটু করে বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই মহিলা শ্রমিকদের বেঁচে থাকার লড়াই আরও তিনগুন বেড়ে যাচ্ছে অংকের হিসেব মত। কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, সামাজিক জীবনে ক্রমাগত স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে হচ্ছে তাদের।
পুঁজিবাদের কল্যাণে বর্তমান অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রতিবাদও তাদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কয়েক বছর আগেও ইউরোপের নানা শহরে কসাইখানার মেশিনে মহিলা শ্রমিক-ই নিয়োগ করা হত। কারণ মেশিনের ফাঁক গলিয়ে মাংসের টুকরো দ্রুত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বের করে আনার জন্য হাতের আঙ্গুল সরু হওয়া প্রয়োজন। যে কারণে বিড়ি শ্রমিকদের ৮৭% বর্তমানে মহিলা। আঙ্গুল সরু হলে বিড়ি রোলিং করার বাঁধন শক্ত হবে। আগে তাও পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কিছু বেশি ছিল কারখানা-ভিত্তিক উৎপাদনের কারণে। এখন বাড়ি-বাড়ি মুনশি-ভিত্তিক ডিস্ট্রিবিউশনের কারণে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
যাই হোক ওই মেশিন একবার চালু হলে আর বন্ধ করা যায় না। তাই এই শর্তে মহিলা শ্রমিকদের কাজ দেওয়া হত যে ওই মহিলাদের সারাদিন ডায়াপার পরে কাজ করতে হবে। বেশ কিছুদিন এই ব্যবস্থা চললেও পরে এ নিয়ে হইচই শুরু হয়। আইন কানুনের ভয় দেখিয়ে এসব বন্ধ করার জন্য কাগুজে নিয়ম হলেও বিভিন্ন শহরে এখনও এই ব্যবস্থা চালু থাকছে গোপনে। কোভিডের পরবর্তীকালে অতিরিক্ত পয়সার লোভ দেখিয়ে বা মন্দার বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে।
আগে কোলিয়ারিতে মহিলা শ্রমিকরা কাজ করতেন। বর্তমানে আইন করে তা বন্ধ করা হয়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে কর্মহীনতার সুযোগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে (উৎপাদনে অক্ষম বা কমজোরি হওয়ার কারণে এবং বিপজ্জনক বলে) বন্ধ মুখ কয়লাখনির মুখ খুলে অতিরিক্ত পয়সার লোভ দেখিয়ে মহিলা শ্রমিকদের নামানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ এমনকি তাদের মধ্যে রয়েছেন গর্ভবতী মহিলারাও৷ গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতিও হয়েছে তাতে। বিড়ি বাঁধতে গিয়ে তামাকের গুঁড়ো শ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকে গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে।
মৃত্যু সবসময়ই যন্ত্রণার। কোনটার সাথেই কোনটার তুলনা চলে না। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পরে সেখানে টাওয়ার দুটি যখন আবার মেরামত হয় তখন তার সামনে একটি জলাশয় নির্মাণ করে তার চারপাশ স্টিলের পাতে বাঁধিয়ে, পাথরের ফলকে দুর্ঘটনায় মৃত সব কর্মীদের নাম খোদাই করে দেওয়া হয়। তাতে আছে গর্ভবতী কর্মীদের নাম-ও। যাতে বছরের পর বছর যাঁরাই ওখানে যাবেন তাঁরা নিহত মানুষদের কথা, তাঁদের নাম জানতে পারবেন। অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ বটে বইকি। তবে এই ছবি, ভিডিওগুলি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় গাজায় গণহত্যার ফলে, ইরাকে-ইরানে গণহত্যা ও যুদ্ধের ফলে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে পাশাপাশি শোয়ানো বাচ্চাদের লাশের নাম, গর্ভবতী মহিলাদের নাম কোথাও লেখা থাকবে না। জোর করে খনিতে নামিয়ে কাজ করাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত গর্ভবতী মহিলা, মৃত গর্ভবতী পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম কোথাও লেখা থাকবে না।
এই পৃথিবীতে শোকপালন করার জন্য, যন্ত্রণার ইতিহাস সম্পূর্ণ নথিবদ্ধ করে রাখার জন্যও পুঁজির প্রয়োজন আসলে। কোনও কোনও মৃত্যুর যন্ত্রণা নথিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা থাকে৷ আবার কোথাও কোথাও শিশুরা জন্মায় বা জন্মের অপেক্ষায় থাকে মারা যাবে বলেই। তফাৎ এখানেই।
কোভিড পরবর্তী সময়েও এদেশে পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকদের কাজের যে ভাগ ছিল, মজুরির বৈষম্য ছিল তা এখনও মেটেনি। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে কুটিরশিল্প বা ওই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা বেড়েছে। দ্রুত পেশা বদল করা শ্রমিকদের মধ্যে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন কোনও জেলায় বিড়ি বাঁধার হিসাব যদি দিন প্রতি অর্থাৎ হাজার বিড়ি প্রতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয় তাহলে সেই জেলায় সুপারি কাটার জন্য দিন প্রতি দেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা সিজনে, অফ সিজনে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা। ফলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক পেশা পরিবর্তন করছে৷ এই পেশা পরিবর্তন করার সময় আগের পেশায় ৬০ বছর বয়স হলে কোম্পানি প্রতি মাসে ১০০০ টাকা দেবে বলে মাসে ৫০ টাকা করে কাটিয়ে রেখেছে মুনশির খাতায়। এই মুনশির কোনও সরকারি নথি নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসকদলের বশংবদ। ফলে একবার পেশা বদলালে সেই টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না৷ ভবিষ্যতের সুযোগও মাঠে মারা গেল৷
রাখি, টিপ, জরি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও ছবিটা একই রকম। তাঁতের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। নদীয়া ও কাটোয়া অঞ্চলে নদীর দুই পাড়ে দুই রকম সুতার কাজ হত। শান্তিপুর, ফুলিয়া অঞ্চলে সরু সুতার মূলত শাড়ি ও পোষাক। কাটোয়া অঞ্চলে মোটা সুতার পর্দা, বেডকভার, গামছা ইত্যাদি। বিশ্ববাংলার নাম করে মসলিন ও মিশ্র সুতার মেশিন বসিয়ে কিছুদিন অতি সস্তায় তাদের উৎপাদন কিনে বর্তমানে তাঁত মেশিন বিক্রি করে পেট চালানোর জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে শ্রমিকদের। মহিলা শ্রমিকরা কাজ হারিয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
শিল্প ধরে ধরে এইরকম অবস্থা বর্ণনা করা যায়। মজুরিশূন্য কর্মহীনতার কারণে কমছে সামাজিক নিরাপত্তা। তীব্রভাবে নারীপাচার বেড়েছে। রূপশ্রীর দাক্ষিণ্যে বেড়েছে অপরিণত বয়সে বিবাহ। অপরিণত গর্ভধারণ, গর্ভপাত, প্রসবকালীন মৃত্যু, রিকেট রোগগ্রস্ত শিশুর জন্ম ইত্যাদি৷ পারিবারিক হিংসাও তীব্রতর হচ্ছে। গার্হস্থ্য হিংসার শিকার মহিলা শ্রমিকদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ কমছে। অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রমকোড মার্জ করার ফলে মহিলা শ্রমিকদের অনেক আইনি অধিকার পেতে আরও জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
দেশ জুড়ে আনন্দের বন্যার নকল ছবি এঁকে কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও গুটিকয়েক পরিবারের উৎসব দেখিয়ে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের নিজেদের আত্মীয় পরিজনদের কথা৷ ৪১ দিন সুড়ঙ্গে কাটানো শ্রমিকের সাথে আত্মীয়তা অনুভূত হচ্ছে না। ফলে তার বাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে যখন তখন আপামর শ্রমিক বা তার শ্রেণির মানুষেরা নিজের বাড়ি ভাঙার যন্ত্রণা অনুভব করছেন না। তার বাড়ির লোকেদের, বাড়িতে থাকা মহিলা শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণার কথা অনুভূত হচ্ছে না।
দুঃখ-কষ্ট, দুর্বিষহ অবস্থা শ্রমিকদের সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আছে। তাই তাদের কোনও নস্টালজিক বিলাসিতা থাকে না। এটা একান্তই দুবেলা আরামে খাওয়া-পরা করা ঘরের অনুভূতি। যাদের ইতিহাসের পরতে পরতে অন্নচিন্তার গল্প তাদের ইতিহাস অন্যরকম। এখন শোষণের যন্ত্রণাটুকু থাকছে তার প্রতি কোন দরদ থাকছে না। কারওরই না। রাষ্ট্রের এই দরদ না থাকার দৃষ্টান্ত আমরা অতীতে বহু দেখেছি।
এখন আমরা দেখছি রাষ্ট্র ব্যবস্থা করছে, পয়সা খরচ করছে যাতে আর কারওর এই শ্রেণির প্রতি সহানুভূতি না থাকে কিছু নিতান্ত মেকি কথাবার্তা বলা ছাড়া।
লড়াই এইটার বিরুদ্ধে। মহিলা শ্রমিকরা সেখানে নিষ্পেষিত অংশেরও সর্বাপেক্ষা নিষ্পেষিত ভাগ। তাদের হকের লড়াই চলছে। এই চূড়ান্ত অসম লড়াইয়ের ট্রফি কোনও যুগে উৎপাদকের হাত থেকে কেউ নিতে পারেনি। আমরা আজও লড়ছি এই ট্রফির ঐতিহাসিক স্থান অটুট রাখার জন্য।
প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
